নিমন্ত্রণ – নূরুল হাসান
নিমন্ত্রণ
ঘটনাটি আমার এক বন্ধুর মুখ থেকে শোনা।
তাদের গ্রামের’ নাম নোয়াগাঁও। মাঘ মাসের এক কুয়াশাঘেরা রাতে সেই গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটছিল সে। কুমিল্লা থেকে যাবার আগে সে আমাকে নিমন্ত্রণ করে যায় তাদের গ্রামে যাবার জন্যে। অফিসে যথেষ্ট ছুটি পাওনা ছিল আমার। তাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম, ঠিক এক সপ্তাহ পর তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাব আমি। সে রাজি হয়েছিল।
.
বাজারে গিয়েছিল সে। আজই এসে পৌঁছেছে কুমিল্লা থেকে। পরিচিত অনেকের সাথেই দেখা হয়েছে। কল্যাণের চায়ের দোকানের আড্ডায়ও যোগ দিয়েছিল। কয়েকজন ওর জন্য আফসোস করেছে— আর কিছুদিন আগে এলেও নাকি ‘রসের বাইদানী’ পালাটি দেখতে পেত। এরপর চলেছে তাসের আসর। মোটামুটি ভালই কেটেছে সময়। অনেক নতুন পুরাতন খবর শুনেছে। আসবার সময় কল্যাণ আবার দু’টি সিগারেটও গছিয়ে দিয়েছে হাতে।
বাড়ি থেকে বাজার তিন মাইলের পথ। ঠিকমত হাঁটতে পারলে এক ঘণ্টাও লাগে না। কিন্তু শীতের রাত্রে অনেকক্ষণ লেগে যায়।
হাঁটছে সে। গাঁয়ের এ পথটা একটু নির্জন। অসময়ের বৃষ্টি হয়েছে এক পশলা। এখানে সেখানে পানি জমে আছে। এঁটেল মাটির রাস্তা, কাদা হয়ে আছে। কাদায় ওর স্যান্ডেল দেবে গেল। টেনে উঠাল। তারপর পাশের ভেজা ঘাসে স্যান্ডেল ঘষে নেবার জন্যে উবু হতেই ঘটল ব্যাপারটা। কে যেন ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলল। শীতল দীর্ঘশ্বাস। যেন কারও বুক থেকে বিশাল পাথর নেমে গেছে। পাব কি পাব না, এরকম একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে হঠাৎ পেয়ে যাওয়ার ফলে সুখের একটা নিঃশ্বাস।
তবে তার জন্যে ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই সুখকর ছিল না। বরং গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ঝট করে মাথা তুলল বিষ্ণু- আমার বন্ধু। এদিক ওদিক তাকায়- নাহ্, কিছু নেই তো, কিছুই নেই। স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায় আবার। শিস দিতে দিতে, আকাশের তারা গুনতে গুনতে যাচ্ছে সে, হঠাৎ নীচের দিকে তাকাতে দেখল ছোট সাদা একটা বেড়াল ওর পায়ের ঠিক একহাত সামনেই শুয়ে আছে। ওর মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে যায়। ছোট বেলার বদ অভ্যাসটা যায়নি। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বিষ্ণু। আলতো করে সাদা কালোয় ডোরা কাটা লেজের আগাটা ধরল, পুরোটা নয়। কয়েকটা লোম মাত্র। তারপরই মারল হ্যাঁচকা টান। ‘ম্যাও’ করে দাঁড়িয়ে গেল বেড়ালটা। একবার বিষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বিষ্ণুর দিকে। তারপর সোজা রাস্তা ধরে ছুটতে শুরু করল। আকাশের দিকে তাকিয়ে একবার হেসে ওঠে বিষ্ণু। তারপর আবার সামনে তাকায়। নেই বেড়ালটা। আশ্চর্য, এত তাড়াতাড়ি চলে গেল! একটু অবাক হয়ে আবার হাঁটা দেয়।
সামনের বাঁক পেরোলেই পড়বে পুরানো ভাঙা কালী মন্দিরটা। তার পাশেই কালীপুকুর, জানে ও। হঠাৎ কী খেয়াল হতেই মনে মনে মা কালীকে স্মরণ করতে লাগল। ওর বাবা বিশ্বাস করতেন, মা কালী নাকি পুরানো মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়া একলা পুরুষ পথিককে দেখা দেন। নিজ হাতে স্বামী হত্যার অপরাধবোধের কারণেই খুব সম্ভব, পুরুষ পথিকদের অমূল্য বর দেন। তার বাবা এ আশায় সারা জীবনই মন্দিরের আশপাশে কাটিয়েছিলেন। তবে বোধহয় বর পাননি। পেলে মৃত্যুর সময় তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক তিন সন্তানের জন্যে নিশ্চয়ই শুধুমাত্র একটি কুঁড়েঘর এবং মাটির ব্যাঙ্কে জমানো আড়াইশো টাকা রেখে যেতেন না।
কালী মন্দিরটা চোখে পড়তেই বিষ্ণু প্রণাম করল। এদিক ওদিক তাকাল মা কালীর খোঁজে। তখনই দেখল, পুকুর ঘাটে কে যেন বসে আছে। আরেকটু এগোল সে। আরে, বিমলদা না? বিমলদাই তো! সেই শাল, সেই বাবরি চুল, স্বল্প আলোয় ঘাড়ের দাদের সাদা দাগগুলোও স্পষ্ট। বিমলদার দিকে এগিয়ে যায় বিষ্ণু।
পাঠক, আমার বিশ্বাস- আমার এই অতীব বুদ্ধিমান বন্ধু বিষ্ণু যদি কল্যাণের দোকানে বসে গল্পের ছলে বলা কালীপুকুরে ডুবে বিমলের মৃত্যুর খবরটায় একটু মনোযোগ দিত তবে ও এভাবে এগিয়ে যেত না।
কিন্তু নিয়তি ঠেকাবে কে? নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে গেল বিমলের কাছে। সেই নিয়তিই আবার তার মুখ দিয়ে বলাল, ‘কেমন আছ, বিমলদা?’
বিমল ঘাড় ফেরাল। বিষ্ণু লক্ষ করল সেই আগের মতই আছে বিমলদা। সেই চেহারা, সেই নাক, মেয়েদের মত সেই পাতলা ঠোঁট। কিন্তু চোখ দু’টি কেমন যেন নিষ্প্রাণ বলে মনে হয়। ছমছমে গলায় বিমল বলে ওঠে, ‘আয়, বস। কখন এসেছিস?’
‘এই তো আজই,’ বলে বসে পড়ল বিষ্ণু বিমলের পাশে।
দু’জনে গল্প করতে লাগল। ছোটবেলার গল্প; কত মজারই না ছিল সেসব দিন। চেয়ারের পায়ায় লেগে বিপিন স্যারের ধুতি খুলে যাবার কথা মনে করে পেট চেপে হাসতে লাগল দু’জন। শেষ মুহূর্তে হাত দিয়ে গোলপোস্টে বল ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেদের দলকে জিতিয়ে দেয়ার আনন্দ স্মৃতিও রোমন্থন করল।
এক সময় হঠাৎ বিমল বলে উঠল, ‘চল, বিষ্ণু, চান করি।’
বিমলের প্রস্তাবে অবাক হয়ে গেল বিষ্ণু। ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে বিমলদা, এখন স্নান করবে? এই শীতে?’
‘আরে ধ্যুৎ, আয় তো!’ বলে বিষ্ণুর হাত ধরে টান দিল বিমল। বিষ্ণু অনুভব করল একটি বরফ শীতল হাতের স্পর্শ।
পাঠক, এর ঠিক এক সপ্তাহ পর এই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বিষ্ণু আমাকে বলেছিল এই ঘটনা। বলেছিল তার পরদিনই নাকি লোকে কালীপুকুরে ওর লাশ খুঁজে পায়। ফুসফুসে পানি ঢুকে মারা গিয়েছিল সে।
ওর গল্প এখানেই শেষ।
কিন্তু আমার নয়।
আমি এখন বহুরাত ধরে অপেক্ষা করছি, আমার গল্পটা কাউকে শোনাব, কেউ শুনতে আসবে, এমনই কোন কুয়াশা ঘেরা শীতের রাতে, একা, কালীপুকুরের ঘাটে বসে তাকে শোনাব আমি আমার গল্প।
আসবেন নাকি আপনি?
আসুন না একবার। মাত্র একটি বার… আমার নিমন্ত্রণ রইল।
নূরুল হাসান
