ধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত

আগুন-বাবা – খসরু চৌধুরী

আগুন-বাবা

মেচি নদীর বেশ খানিকটা দক্ষিণ থেকে শুরু হয়েছে নেপাল তরাইয়ের আদিম বন। দুর্ভেদ্য এই বন উত্তর আর দক্ষিণে অনেক মাইল এগোবার পর হঠাৎ করেই শেষ হয়েছে কুসি নদীর প্রান্তে। এখানকার মত বিচিত্র জাতের বড় বড় শিকার ভারতের আর কোনও বনেই নেই।

পথের মাঝে রাত নেমে আসায় আমি একবার এখানে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছিলাম গাছের ডালে বসে। সান্ত্বনা বলতে সঙ্গে ছিল অনভিজ্ঞ এক বাচাল শিকারী চৌকিদার আর প্রচুর পরিমাণে ধূমপানের ব্যবস্থা। মাংসাশী প্রাণীর আওতার বাইরে থাকলেও আমরা ছিলাম ক্ষুধার্ত মশার পুরো আওতায়। ধূমপান, চড়, গালাগালি এসব অস্ত্র তাদের বিপক্ষে কোনও কাজেই লাগল না। ফলে তাদের কামড়ে হাতে-মুখে জ্বালা ধরে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই, পাশাপাশি চৌকিদার বকর বকর করে শোনাল ম্যালেরিয়ায় ভয়াবহ মৃত্যুর পূর্বাভাস।

আমার চেহারা কেমন হলো তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে প্রথম ঊষার আলোয় চৌকিদারের ফুলে ঢোল হয়ে যাওয়া মুখ দেখে তার কিছুটা আন্দাজ পেলাম। মনে মনে নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম যে আমার চেহারা বদলে গেলেও নিশ্চয়ই চৌকিদারের মত অতটা বদলে যায়নি, তারপর অপেক্ষায় রইলাম সকালের। আলো পুরোপুরি ফোটার পর এত বিচিত্র প্রজাতির প্রাণীর আনাগোনা দেখলাম যে মশার কামড়ের জ্বলুনির কথা আর মনে রইল না।

চতুষ্পদ কোনও প্রাণীই বাদ গেল না বোধহয়। এল তারা একাকী, এল জোড় বেঁধে, এল দলে দলে। সব শেষে এল শুয়োর, হরিণ, খরগোশ আর সজারুর মত ছোট ছোট সব শিকার।

‘এমন দৃশ্য জীবনে দেখিনি, হুজুর,’ বলল চৌকিদার।

‘আর কখনও দেখবেও না, যদি না আবার মশার খোরাক হতে রাজি হও, ‘ জবাব দিলাম আমি।

তারপর চৌকিদার মশার চোদ্দগোষ্ঠির যে-বর্ণনা শুরু করল, তা এখন না বলাই ভাল। ঘণ্টাখানেকের কিছু বেশি সময় ধরে চলল প্রাণীগুলোর আনাগোনা। সর্বশেষ প্রাণীটাও ঝোপের আড়ালে হারিয়ে যেতে পুবাকাশে ঝকমকিয়ে হেসে উঠল সূর্য।

নীরবে গাছ থেকে নেমে আমি ধরলাম বাংলোর পথ, খাণ্ডারনি বৌয়ের কথা ভাবতে ভাবতে চৌকিদার চলল তার বাড়ির দিকে। এগোতে এগোতে বৌয়ের হাতে দুর্দশার এমন সব কথা বলতে লাগল সে, মাঝেসাঝে হাসি চাপতে রীতিমত কসরত করতে হলো আমার।

তিন দিন পর আমার এক বন্ধু এল কয়েকটা দিন থাকার জন্যে। এই গল্প সেই গল্পের পর সেই জায়গাটার অসংখ্য জাতের জীব-জানোয়ারের কথা বলতেই তার চোখ উত্তেজনায় চকচক করে উঠল।

ওখানে আবার যেতে সরাসরি অস্বীকার করে আমি বললাম, ‘চৌকিদারকে ভজাতে পারো কি না দেখো। আর যেহেতু একটামাত্র বনমুরগি মারার পারমিট নিয়ে এসেছ, তার বেশি কিছু মারার চেষ্টা কোরো না। এখানে পারমিট ছাড়া শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’

‘আজ বিকেলেই কথা বলব চৌকিদারের সঙ্গে, প্রয়োজনে তাকে ঘুস দেব,’ জবাব দিল বন্ধুটি।

‘তোমার সৌভাগ্য কামনা করছি,’ বললাম আমি। ‘টাকায় কাজ হতে পারে।’ বিকেলে চৌকিদার এল। বন্ধুটি প্রথমে তাকে অনুরোধ করল, তারপর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলল, তারপর ধমকাল, সবশেষে ঘুস দিতে চাইল। কিন্তু কোনও লাভ হলো না। আমার দিকে ঘুরে চৌকিদার বলল, ‘মশার ভয় আমার নেই, হুজুর, আমি যাব না আগুন-বাবার জন্যে।’

‘আগুন-বাবা, তার কথা তো কখনও শুনিনি।’

‘আমিও শুনিনি, হুজুর। কিন্তু আমার বৌ ওখানে আমাদের রাত কাটাবার কথা শুনে বলল যে আমার অনেক সৌভাগ্য, আগুন-বাবা আমাকে খতম করে ফেলেনি। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার মুখের দিকে। তারপর যখন সব খুলে বলতে বললাম, সে আমাকে পাঠাল ধনবীর সর্দারের কাছে।’

‘ধনবীরকে তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে?’

‘করেছি, হুজুর। ওই মাগীর আবোল-তাবোল কথায় অস্থির হয়ে রইলাম সারাটা দিন, তারপর গতকাল সন্ধেয় ধনবীরের সঙ্গে দেখা করে, তাকে ডেকে নিয়ে গেলাম একপাশে।’

‘সে কী বলল?’

‘যা বলল তা বলার মত নয়, হুজুর, আপনি আর আমি মানবজাতির এক শত্রুর হাত থেকে বেঁচে গেছি।’

‘বলার মত না হলেও কথাগুলো আমরা শুনতে চাই। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা তার দায়িত্ব নিতে রাজি আছি।’

‘হুজুর, সে বলল যে সেরাতে আমরা যেখানে বসে ছিলাম, তার শতখানেক গজের মধ্যেই প্রত্যেক রাতে ঘটে এক ভীষণ রহস্যময় ঘটনা। সেরাতে মশার আক্রমণে আমরা চারপাশে তাকাবার সুযোগ পাইনি। তবে সুযোগ না পেয়ে ভালই হয়েছে, হুজুর। খুব কম মানুষই আগুন-বাবার সাক্ষাৎ পায়, আর যারা পায়, তারা খুব  শিগগিরই হয় কোনও না কোনও দুর্ভাগ্যের শিকার। দিনের বেলা সে একজন যোগী হয়ে থাকে, আর রাতে রূপান্তরিত হয় আগুনে।’

‘যত্তসব বাজে কথা!’ বলল আমার বন্ধু। ‘শোনো, তুমি কি এমন কারও সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারো, যে ওই অদ্ভুত মানুষটাকে আমাদের দেখাতে পারবে? আমরা কেবল তাকে এক নজর দেখতে চাই, তারপর যা খোঁজ নেয়ার আমরা নিজেরাই নেব। এই কাজের জন্যে আমি তাকে পাঁচ টাকা দিতে রাজি আছি।’

পরদিন এক থারুকে এনে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল চৌকিদার। থারু হলো নেপালের তরাইয়ের অধিবাসী। এই অঞ্চলে বসবাসের কারণে তারা তরাইয়ের প্রাণঘাতী জ্বর থেকে নিরাপদ। আজব ব্যাপার হলো, তরাই থেকে অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে গেলে তারা জ্বরে আক্রান্ত হয়। একমাত্র সময়ই তাদের এই রোগ সারায়। ভারত জুড়ে এই থারুরা মাহুতের কাজ করে।

‘এই লোক পাঁচ টাকার বিনিময়ে আপনাদের আগুন-বাবাকে দেখাতে রাজি, ‘ বলল চৌকিদার।

আমার বন্ধুটি তো পারলে তখনই বেরিয়ে পড়ে। তাকে থামিয়ে বললাম, ‘আগে এই লোকটাকে কিছু প্রশ্ন করি, জবাব সন্তোষজনক হলে তাকে আমরা কাজ দেব। আর না হলে, আগুন-বাবা আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করুক।

থারুর দিকে ফিরে জানতে চাইলাম, আগুন-বাবাকে সে কখনও দেখেছে কী না। ‘তাকে তো প্রায়ই দেখি,’ চটপট জবাব দিল থারু। ‘অনেক বছর ধরে বাবা এখানে আছে। এক হাতি তার শত্রু, জানোয়ারটাকে বন্ধুতে রূপান্তরিত না করা পর্যন্ত সে এখানেই থাকতে চায়।’

‘তোমার কথা আমাদের বিশ্বাস হয়েছে,’ মন্তব্য করলাম আমি। ‘তুমি চাইলে এখন আমরা রওনা দিতে পারি।’

চুপি চুপি রিভলভার নিয়ে আমরা চললাম থারুর পিছু পিছু। যে বনে কেটেছিল আমাদের আর চৌকিদারের দুর্দশার রাত, সেখানেই আমাদের দু’জনকে নিয়ে গেল থারু। পথ দেখিয়ে দু’শো গজ এগোবার পর, হঠাৎ ডানে ঘুরেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল একটা ঝোপের ভেতরে। তাকে অনুসরণ করে আমরা পৌঁছুলাম ঝোপের মাঝের একটা খোলা জায়গায়। সেখানে একটা বাঘের চামড়ার ওপর বসে গভীর ধ্যানে মগ্ন একজন যোগী। সম্পূর্ণ নগ্ন, ছাই-মাখা কৃশ শরীর তার, মাথায় জটপাকানো চুল। তার সামনে মাটিতে উপুড় হয়ে আছে থারু।

আরও এগোতে বুড়ো পুরোহিত মুখ তুলে তাকাল আমাদের দিকে। ‘কৌতূহলই তোমাদের আমার সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে সমস্ত ভয় ভুলিয়ে দিয়েছে।’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন, সাধু বাবা,’ বন্ধুটি উপযুক্ত কোনও কথা খুঁজে পাবার আগেই জবাব দিলাম আমি। ‘মাত্র আজই আমি আপনার কথা শুনেছি, আর শোনার সঙ্গে সঙ্গে এসেছি শ্রদ্ধা জানাতে।’

‘সাহেব, মিথ্যে বোলো না, সত্যবাদিতার ফলে অনেক কিছু লাভ করা যায়। আমি তোমাদের কে যে আমার এই ক্ষুদ্র রাজ্যে তোমরা প্রবেশ করেছ আমাকে শ্রদ্ধা জানাতে? আমার কাছে তোমরা কিছুই গোপন করতে পারবে না। কৌতূহলই তোমাদের এখানে আসতে বাধ্য করেছে, আর সেই কৌতূহল মিটবেও না, যতক্ষণ না আমি তোমাদের খুলে বলব যে কেন এই বনে আমি একাকী বাস করি, আর কেনই বা আশপাশের সবাই আমাকে আগুন-বাবা বলে ডাকে।’

আমাদের কথোপকথনের খানিকটা বুঝতে পেরে রেগে গেল আমার বন্ধুটি। শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে, হাসিমুখে যোগী বলল, ‘যুবক, এই দেশের রহস্য ভেদ করার জন্যে অনেক বছরের সাধনার প্রয়োজন, অথচ প্রায় কিছুই না জেনে রেগে যাচ্ছ তুমি। তোমার রাগের কোনও পরোয়া আমি করি না। সবসময় শান্ত থাকো, আর যে-জ্ঞান তোমার নেই, সেটা অর্জনের চেষ্টা করো; রাগ মানুষকে কিছুই দেয় না। তোমার বন্ধু, এই সাহেব, বহু দিন এই দেশে আছে বলে দু’চারটে রহস্যের খোঁজ রাখে, কিন্তু তারপরেও আজও তার কাছে অনেকটাই অজানা। সে জানে, ভর্ৎসনা করলেও আমরা কারও ক্ষতি করি না।’

‘যোগী বাবা,’ বললাম আমি, ‘আমার এই বন্ধুটির বয়স কম, তাই অভিজ্ঞতাও কম। মনে হচ্ছে, কিছুই আপনার অজানা নয়। আমরা যে আপনার গল্প শুনতে এসেছি, আপনার এই অনুমানও সম্পূর্ণ সত্য। যদি আপনি চান, এই গল্প আমরা কাউকে বলব না।’

‘সাহেব, সারা পৃথিবী আমার গল্প জানলেও কিছুই যায় আসে না আমার। তবে কেউই যেন আমার এই আস্তানার কথা না জানে, কারণ, শান্তিই আমার একমাত্র চাওয়া। পরে এই আস্তানা ত্যাগ করে আবার হয়তো একদিন আমি ফিরে যাব মানুষের মাঝে, কিন্তু আমার একমাত্র শত্রুটিকে বন্ধুতে রূপান্তরিত করার আগে নয়। সারা পৃথিবীতে আমার সেই একমাত্র শত্রু হলো অকৃতজ্ঞ এক হাতি, যে এই মুহূর্তেও আমাদের লক্ষ করছে দূর থেকে।’

সংবাদটা মোটেই সুখকর নয়, ফলে আমরা চারপাশে দৃষ্টি বোলালাম। যোগী হাসল। ‘ভয় পাবার কিছু নেই, হাতি এগিয়ে এলে আমার পাহারাদাররা সে- সংবাদ জানিয়ে দেবে।’

‘আপনার পাহারাদার,’ বললাম আমি, ‘কই, আমরা তো কাউকে দেখছি না।’

‘দেখবেও না, যতক্ষণ না আমি দেখাব,’ ধীরে শিস দিল যোগী, তারপর জোরে।

সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দু’পাশ থেকে বিদ্যুৎবেগে ছুটে এল একটা বাঘ আর একটা চিতাবাঘ। আমাদের দিকে তাকিয়ে গজরাতে গজরাতে জানোয়ার দুটো বসল যোগীর দু’পাশে। ‘সাহেব, এরাই আমার পাহারাদার। চিতাবাঘটা বুড়ো হয়েছে,’ গভীর ভালবাসায় যোগী হাত বুলিয়ে দিতে লাগল বাঘটার গলায়, ‘আর এটা তো আমার পাহারাদার হলো ওর বাবা মারা যাবার পর। এরা পাহারায় থাকলে হাতিটা কাছে আসে না। এরা যদি এখনই চলে যায়, আমার সেই শত্রু আমাদের সবাইকে খতম করে দেবে।’

আমার বন্ধু আর আমি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলাম। দু’জনেই অনুভব করছিলাম, স্রেফ কৌতূহল মেটাতে আমরা এসে পড়েছি দারুণ অস্বস্তিকর এক অবস্থায়।

‘অনেক আগে,’ বলতে লাগল যোগী, ‘অনেক বছর আগে মানুষের মাঝে বসবাস ত্যাগ করে, আমি এসে উপস্থিত হলাম বনের এই নীরবতায় লোকালয়ের কাছে হওয়ার ফলে কেউ আমার আস্তানা সম্বন্ধে কোনও ধারণাই করতে পারল না। প্রথম প্রথম গভীর এই বনে আমার কিছুটা ভয় ভয় করতে লাগল, তবে গত দশ বছর থেকে আমি বেশ শান্তিতে আছি। প্রথমে আস্তানা গেড়েছিলাম বড় ওই গাছে, ওখানেই বসে ধ্যান করতে করতে আমি জীব- জানোয়ারের ওপর প্রভুত্ব অর্জনে সমর্থ হই। এখন বনের সমস্ত জীবই আমার বন্ধু, কেবল একটা ছাড়া, সাহেব। আমার একটা ডাকে বনের সব জানোয়ার ছুটে আসবে এখানে, কেবল আসবে না সেই হাতি। তাকে দয়া দেখাতে গিয়ে খানিকটা ব্যথা দেয়ার পর থেকে সে আমার শত্রু।

‘একদিন খোঁড়াতে খোঁড়াতে সে এল আমার কাছে। পরীক্ষা করে দেখলাম, তার পায়ের তলায় ফুটে আছে বাঁশের বড় একটা টুকরো। ‘হাতি,’ বললাম আমি, ‘তোমার ব্যথা সারানো যাবে, কিন্তু খানিকটা ব্যথা না দিয়ে নয়।’

‘ব্যথা সারাতে ব্যথা পেলে আমি কিছু মনে করব না।’

‘সাহেব, কাঁটাটা তুলে ফেললাম আমি, আর তুলতে গিয়ে প্রায় জীবন হারাতে বসলাম। গর্জে উঠল অকৃতজ্ঞ জানোয়ারটা। যে-চিতাবাঘটাকে তোমরা দেখছ— সেটা আর এই বাঘটার বাবা সময়মত হাতিটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচাল আমার, লাফিয়ে আমি উঠে পড়লাম একটা গাছে। সেই ঘটনার পর থেকে বনের সমস্ত প্রাণীর মধ্যে একমাত্র ওই হাতিই আমার শত্রু। আরেক রাতেও পা টিপে টিপে এসেছিল হাতিটা, কিন্তু সেবারেও অল্পের জন্যে রক্ষা পাই আমি। তারপর ধ্যানের মাধ্যমে অনেক বড় বড় শক্তি অর্জন করি, যেগুলোর একটার বলে রাতের বেলা আমি রূপান্তরিত হই আগুনে। এটাই আমার একমাত্র প্রতিরক্ষা, কারণ, হাতিরা কেবল আগুনকেই ভয় পায়।

‘আগামীতে এসো কোনও রাতে, তা হলে আমাকে দেখতে পাবে আগুনের রূপে। আগুনের মাঝ থেকেই তোমাদের সঙ্গে কথা বলব আমি, তবে মনে রেখো, সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে আসতে হবে তোমাদের; রাতে এই বনে ওত পেতে থাকে নানারকম বিপদ। হাতির পিঠে এলে এই থারুকে রেখো মাহুত হিসেবে। এবার যাও, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাঘটা তোমাদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবে বনের শেষ সীমা পর্যন্ত। বিদায়।’

যোগীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বন্ধুসহ ফিরতি পথ ধরলাম আমি, পেছনে পেছনে থারু। বনের প্রান্তে পৌঁছুতে, আমাদের পাশ দিয়ে ছুটে গেল একটা হলদে ঝলক। বুঝলাম, প্রভুর নির্দেশ পালন করে ফিরে গেল বাঘটা। বনের বাইরে আসতেই ফেটে পড়ল ম্যাকলড। প্রথমে খানিকটা গালাগাল করল সে, তারপর বলল, ‘আজ আমরা যা দেখলাম, তা বললে ডুয়ার্সের সবাই আমাকে আনানিয়াস কিংবা ব্যারন মুনশাউজেন মনে করবে।’

‘কিংবদন্তি আর রহস্যে ভরা ভারত,’ বললাম আমি, ‘একে কি আমরা কখনোই চিনতে পারব! এখানকার কেবল সেটুকুই আমরা দেখি, যেটুকু আমাদের দেখতে দেয়া হয়; বাইরে থেকে সেগুলোকে অবাস্তব মনে হয়, কিন্তু তার আড়ালেই লুকিয়ে আছে দারুণ বাস্তবের অস্তিত্ব। কেমন লাগবে, বন্ধু, যখন কথা বলে উঠবে আগুন?’

‘আগুন কথা বলে উঠবে, তুমি নিশ্চয়ই ওই গল্প বিশ্বাস করোনি!’

‘যা ভাবছ ঠিক তার উল্টো, বিশ্বাস করেছি প্রত্যেকটা কথা। দু’দিন পর আবার আমরা রওনা দেব সূর্যাস্তের সময়। আমাদের হাতির মাহুত হয়ে যে আসবে, সে কিন্তু এখন তোমার কাছে পাঁচ টাকা পায়।’

‘না, না, দু’জনের কাছে আড়াই টাকা করে।’

‘উঁহুঁ, দামটা তুমিই করেছ।’

ভীষণ বিরক্তির সঙ্গে সে বের করে দিল পাঁচ টাকার একটা নোট।

দু’দিন পর যেদিনের সূর্যাস্তের সময় আমাদের রওনা হবার কথা, সেদিন সকালে ম্যাকলড একটু অসুস্থ বোধ করল।

‘তা হলে না হয় বাদ দাও,’ বললাম আমি।

‘অসম্ভব,’ ভেসে এল তার দৃঢ় জবাব।

যথাসময়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা, আর ঘণ্টাখানেক ধরে হেলতে-দুলতে এসে পৌছুলাম বনে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশে আর কোনও আলো নেই। গাঢ় সেই অন্ধকারের মাঝেই চুপচাপ হাতি চালিয়ে, মাহুত এসে থামল যোগীর আস্তানার দশ গজ সামনে। বাঘের চামড়া, লাউয়ের গামলা, চিমটে সব যথাস্থানে পড়ে আছে, কিন্তু যোগীর কোনও চিহ্ন নেই। বাঘের চামড়ার সামনে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে একটা আগুন, আমাদের চোখের সামনেই সেটা পরিণত হলো একটা শিখায়, আর ঠিক তখনই ভেসে এল একটা স্বর। ‘কৌতূহল মেটাবার জন্যে তা হলে বনের বিপদের পরোয়াও তোমরা করোনি- স্বাগতম।’

‘কিছু বলবেন না, হুজুর,’ ফিসফিসিয়ে সাবধান করে দিল থারু।

মিনিটখানেক পর আবার ভেসে এল সেই স্বর। ‘সাদা চামড়ার মানুষ, তোমরা ভয় না পেলেও ভয়কে অনুভব করতে পারো। আগুনের ভেতর থেকেই কথা বলছি আমি। তোমাদের অপেক্ষায় থেকে থেকে একসময় আমি আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে এসে পৌঁছুল আমার শত্রু, এল সে আজ অন্যান্য দিনের চেয়ে সামান্য আগেই, ফলে আগুনের রূপ ধরতে বাধ্য হলাম আমি। এখনও সে দূর থেকে লক্ষ করছে আমাদের, তবে যতক্ষণ আমি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলব, সে কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।’

সারা বনের কোথাও কোনও শব্দ নেই, কেবল যোগীর স্বর ভেসে আসছে আগুনের ভেতর থেকে।

‘সকালে আমি কোত্থেকে বের হই, তা দেখার জন্যে যুবক রাতটা বনেই কাটাতে চায়। আগুনের ভেতর থেকে আমাকে কথা বলতে শুনে যাবতীয় শক্তির ওপর তার অবিশ্বাস এসেছে। আমার পাহারাদারদের ডাকলেই নিবু নিবু হয়ে আসবে আগুনের শিখা।

বনভূমির বুক চিরে ধ্বনিত হলো জোর একটা শিস, পরমুহূর্তেই চারপাশ কেঁপে উঠল বাঘের গর্জনে। গুলির মত ছুটে এল বাঘ আর চিতাবাঘটা, আমাদের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে বসল বাঘের চামড়াটার দু’পাশে। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, কমে গেল আগুনের উজ্জ্বলতা; কমতে কমতে ওটা যখন প্রায় নিবু নিবু হয়ে এল, ঠিক তখন যেন হেসে উঠল বাঘটা। এবার বাঘের শূন্য চামড়াটার দিকে তাকাতে আমরা একেবারে হতবাক হয়ে গেলাম, তার ওপর বসে শান্ত ভঙ্গিতে আমাদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে বৃদ্ধ যোগী।

‘যুবক, এই যে আমি এখানে, বিশ্বাস করো বা না করো, আগুন থেকেই আমি এসেছি। এই মুহূর্তে আমার দেহ ধারণ করা উচিত হয়নি, তবু আমি কেবল এসেছি তোমাদের বিদায় জানাতে, কারণ, একত্রে তোমাদের সঙ্গে আমার আর কখনোই দেখা হবে না। আমার আগুন নিবে আসছে, আবার তাকে প্রজ্বলিত করতে হবে আমারই দেহ দিয়ে। বিদায়।’

দপ্ করে আবার জ্বলে উঠল আগুনের শিখা, আবার শূন্য পড়ে রইল বাঘের চামড়া, বনের গভীর থেকে ভেসে এল কেবল মট মট করে ডালপালা ভাঙার শব্দ আর একটা হাতির ক্রুদ্ধ চিৎকার। বুঝতে অসুবিধে হলো না, কেন আমাদের এত শিগগির বিদায় জানাল যোগী।

ঘুরেই দ্রুত হাতি ছোটাল থারু। বনের বাইরে আসতে আঁধার খানিকটা হালকা হয়ে এল।

.

দু’বছর পর দূরত্ব খানিকটা কমাবার জন্যে আমি এগোচ্ছিলাম গয়াবাড়ি আর কার্সিয়ংয়ের মাঝের পথ ধরে। দেখলাম, লেপচাদের একশিলা বিশিষ্ট স্মৃতিস্তম্ভগুলোর কাছে বসে আছে আগুন-বাবা। তাকে দ্রুত অভিবাদন জানিয়েই পা বাড়ালাম আমি, কিন্তু হাত তুলে আমাকে থামার ইশারা করল সে।

‘তোমার বন্ধু কোথায়?’ জানতে চাইল যোগী I

‘মারা গেছে,’ জবাব দিলাম আমি।

‘হুঁ, আগেই বলেছিলাম যে একত্রে তোমাদের সঙ্গে আমার আর কখনোই দেখা হবে না। যাও, একেবারে শেষ মুহূর্তে ট্রেন ধরতে পারবে তুমি। আবার তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে মহাকালের পাহাড়ে।’

সত্যি কথা বলতে কী, আমি যেন পালিয়ে বাঁচলাম। দার্জিলিং তরাইয়ের সেই ঘটনার পর আগুন-বাবার কথা মনে পড়লেও শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে আমার। জীবনে অনেক আজব ঘটনা দেখেছি, কিন্তু এটার বেলায় চৌকিদারের সুরেই সুর মেলাব আমি, ‘এমন দৃশ্য জীবনে দেখিনি।’

আরও জোরে পা চালালাম, তারপর স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে উঠতেই ছেড়ে গেল সেটা গয়াবাড়ি থেকে।

মূল: এ. সি. রেনি
রূপান্তর: খসরু চৌধুরী