ধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত

সিঁড়ি – শাহেদ ইকবাল

সিঁড়ি

বাড়িটা সুরভির খুব পছন্দ হয়ে গেল।

চমৎকার রেলিং ঘেরা টানা বারান্দা। মেঝে পর্যন্ত লোহার গ্রিল দেয়া জানালা। ছাদে ওঠার ঝকঝকে সিঁড়ি। ছবির মত ব্যালকনি। জানালার কাছে দাঁড়ালে বিশাল দীঘি চোখে পড়ে। ফুরফুরে বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। সুরভি বলেই ফেলল, ‘বাড়িটা খুব চমৎকার।’

জয়নাল একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বাড়িটা তার পছন্দ হয়নি। জানালায় গ্রিল থাকলেও ছাদে কোন রেলিং নেই। রেলিং নেই সিঁড়িতেও। বাড়ির একপাশে বিশাল পুকুর। অন্যপাশে রাস্তা। সারাক্ষণ গাড়ি-ঘোড়া চলছে। বাচ্চা দুটোর জন্যে বাড়িটা উপযুক্ত নয়। সুরভি তা বুঝতে পারছে না।

বাড়িওয়ালা অবশ্য বারবার বলেছে, আগামী মাসের মধ্যেই সিঁড়ি ও ছাদের রেলিং হয়ে যাবে। জয়নাল তার কথায় আশ্বস্ত হতে পারেনি। আশ্বস্ত হবার কথাও নয়। আশপাশের লোকজনের কাছে শুনেছে, বাড়িওয়ালা গত তিন বছর ধরে এই আশ্বাস দিয়ে আসছে সবাইকে।

বাড়িওয়ালার কথায় সুরভির কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। কারণ, বাড়িওয়ালার কথা তার কানেই ঢোকেনি। সে বারান্দায় ফুলের টব সাজানোয় ব্যস্ত। ওর চারপাশে ঘুরঘুর করছে পপি ও রিমি। জয়নাল আরেকবার নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়ে দুটো মায়ের মতই হয়েছে। একবার কোনকিছু মাথায় ঢুকলে আর হুঁশ থাকে না। ভোগাবে, এরা তাকে প্রচুর ভোগাবে।

রাতে সবগুলো জানালা খুলে দিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার অন করল সুরভি। জনপ্রিয় হিন্দী গানের সুর বেজে উঠল। খোলা হাওয়ায় সুরভির চুল উড়ছে। সুরভি দাঁড়িয়ে আছে জানালার সামনে। জয়নাল বুঝতে পারছে না আশপাশের লোকজনকে জোর করে হিন্দী গান শুনিয়ে কী লাভ। সে কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। সারাদিন খুব ধকল গেছে।

জয়নালকে অবাক করে দিয়ে পরের মাসে বাড়িওয়ালা ছাদের রেলিং-এর কাজ শুরু করল। সিঁড়ির কাজেও হাত দেয়া হলো। কাজ শেষ হতে হতে একমাসের কিছু বেশি সময় লেগে গেল। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল অবিশ্বাস্য সব ঘটনা।

দিন তারিখ মনে নেই কারও। সময়টা ছিল বর্ষাকাল। সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার পর একটুখানি ধরে এসেছিল কেবল। মেঘলা আকাশের কারণে বিকেলটাকে মনে হচ্ছিল সন্ধ্যা। অফিসের কাজে নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিল জয়নাল। ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। অন্ধকার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার সময় হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। তার মনে হলো কেউ একজন তার সঙ্গে উপরে উঠছে। সে জানতে চাইল, ‘কে ওখানে?’

কেউ কোন জবাব দিল না। জয়নাল পকেট থেকে লাইটার বের করল। জায়গাটা বেশি সুবিধার নয়। দিনে দুপুরেও চুরি ডাকাতি হয়। গত সপ্তাহেই পাশের বাড়ির ইসমাইল সাহেবের টু-ইন-ওয়ান চুরি গেছে।

লাইটার জ্বেলে কোন কিছু পাওয়া গেল না। জয়নাল লাইটার নিভিয়ে ফেলল। তার মনের অস্বস্তি দূর হলো না। কালকেই বাড়িওয়ালাকে বলতে হবে সিঁড়িতে বাতি লাগানোর জন্যে।

ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার উঠতে শুরু করল সে। সাথে সাথে সেই শব্দটাও শুনতে পেল আবার। একজোড়া পায়ের শব্দ। যেন কেউ সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসছে তার পেছনে পেছনে। একটা নিঃশ্বাসের শব্দও যেন শুনতে পেল। জয়নাল গলা চড়িয়ে দ্বিতীয়বারের মত জানতে চাইল, ‘কে ওখানে?’

এবারও কোন জবাব এল না।

পরের দিন বাড়িওয়ালাকে সবকিছু খুলে বলল জয়নাল। বাড়িওয়ালা হেসেই উড়িয়ে দিল। বলল, ‘এ বাড়ির ত্রিসীমানায় কারও ঢোকার সাহস নেই। হয়তো অন্ধকারে বেড়াল-টেড়াল হাঁটতে শুনেছেন। আমি এখনই সিঁড়িতে বাতি লাগানোর ব্যবস্থা করছি।’

বাড়িওয়ালা সিঁড়িতে একশো পাওয়ারের বাল্ব লাগিয়ে দিল। জয়নাল পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারল না। তার মনে হতে লাগল, বাড়িওয়ালা কিছু একটা চেপে যাচ্ছে।

সেদিন দুপুর। জয়নাল বাসায় নেই। বাচ্চা দুটো গেছে স্কুলে। সুরভি একা একা শোবার ঘরে উপন্যাস পড়ছিল। দুপুরবেলার এই সময়টা ওর সহজে কাটতে চায় না। কেমন একঘেয়েমি লাগে।

পড়তে পড়তেই সুরভি টের পেল ঘরের ভেতর আলো কমে আসছে। চট্‌ করে ঘড়ির দিকে তাকাল ও। বেলা দুটো বেজে দশ। এ সময় আলো কমে আসার কোন কারণ নেই। জানালা দিয়ে আকাশ চোখে পড়ছে। ঝকঝকে আকাশ। মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। তা হলে?

আলো কমতে কমতে একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল কামরা। বইয়ের অক্ষর দূরের কথা, নিজের হাতও দেখা যাচ্ছে না। হতবাক সুরভি বাতি জ্বালানোর জন্য সুইচ টিপল। কিন্তু বাতি জ্বলল না। সম্ভবত কারেন্ট ফেইলিওর। সুরভি দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল।

বারান্দায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। ডানে-বাঁয়ে কোন কিছু নজরে আসছে না। অনুমানের ওপর সামনে এগোল সুরভি। উদ্দেশ্য ড্রইংরুম। রিচার্জেবল ল্যাম্পটা ওখানেই।

এক ঝলক গরম বাতাস লাগল সুরভির চোখে মুখে। সেই সাথে অদ্ভুত একটা শব্দ শুনতে পেল। গোঙানির শব্দ। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল সুরভির।

কাজের ছেলে লিয়াকত বাজারে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখে সিঁড়ির কাছে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে সুরভি। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে।

‘চোখের ভুল, নিশ্চয়ই চোখের ভুল,’ জোর দিয়ে বলল বাড়িওয়ালা।

‘কিন্তু দিনের বেলায় আলো কমে যাওয়া…’

‘আকাশে মেঘ ছিল ‘হয়তো।’

‘ও যে বলল…

‘তিনি জানালা দিয়ে একদিকের আকাশ দেখেছেন, অন্য দিকের আকাশ দেখেননি।’

‘গোঙানির শব্দ…’ হাল ছাড়ল না জয়নাল।

‘নিশ্চয়ই কোন বাচ্চার কান্না।’

‘অসম্ভব। বাচ্চা দুটো ছিল স্কুলে।’

বাড়িওয়ালা হাসল। ‘আপনার বাচ্চা দুটো ছিল স্কুলে। কিন্তু আশপাশের সবগুলো বাচ্চা স্কুলে ছিল না। তাদের মধ্যেই কেউ…’

‘আমার মিসেস সুইচ টিপল, অথচ বাতি জ্বলল না।’

‘কারেন্ট ফেইলিওর,’ বলল বাড়িওয়ালা। ‘ইদানীং প্রায়ই হচ্ছে।’

‘সিঁড়ির গোড়ায় ছায়ামূর্তি দেখা…’

‘আপনাদের কাজের লোক, কী যেন নাম, মনে পড়েছে…লিয়াকত, ও-ই হতে পারে। আপনিই তো বললেন, ঘটনার পরপরই লিয়াকত এসে ঢোকে।’

‘কিন্তু পেছন থেকে ধাক্কা দেয়া…’

ওনার ব্রেইন উত্তেজিত ছিল। এ অবস্থায় মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন।’ পানের পিক ফেলল বাড়িওয়ালা।

বাড়িওয়ালার স্ত্রীর নাম নাসিমা আকতার। শ্যামলা, মোটাসোটা মহিলা। সারাক্ষণ পান খেয়ে মুখ লাল করে থাকে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বাড়িওয়ালার স্ত্রীরা খুব অহঙ্কারী হয়ে থাকে বলে শোনা যায়। কথাটা ঠিক নয়। নাসিমা আকতার বেশ মিশুক ও হাসিখুশি মহিলা। প্রথম পরিচয়েই তাকে ভাল লেগে গেল সুরভির।

বাড়িওয়ালার তিন মেয়ে। কোন ছেলে নেই। দু’মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সেই দু’জন স্বামীসহ বাহরাইন থাকে। প্রতি মাসে চিঠি লেখে। সবচেয়ে ছোট মেয়ে নীপা ইডেন কলেজে পড়ে। সেকেন্ড ইয়ার।

কথায় কথায় নাসিমা আকতার জানাল, একটি ছেলের খুব শখ ছিল তাদের। প্রচণ্ড শখ।

‘সময় তো চলে যায়নি,’ কিছু না ভেবেই বলল সুরভি।

নাসিমা আকতারের চেহারা কালো হয়ে গেল। এই পরিবর্তন সুরভির দৃষ্টি এড়াল না।

‘কী হয়েছে, ভাবী?’

‘না, কিছু হয়নি।’ নাসিমা আকতার উঠে গেল।

.

সেদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে হঠাৎ ইলিয়াসের সাথে দেখা। জয়নাল প্রথমে চিনতে পারেনি। ইলিয়াসের মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফ। সাইজেও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। পেছন থেকে জয়নালকে জাপটে ধরল ইলিয়াস।

‘আরে, দোস্ত! তুই?’

জয়নালের মুখ দিয়ে কথা সরল না। ইলিয়াস তার স্কুল জীবনের বন্ধু। দেখা হয় না প্রায় এক যুগ। মাঝখানে শুনেছিল ব্যাটা জার্মানী চলে গেছে।

‘কোথায় আছিস এখন?’ জানতে চাইল ইলিয়াস।

‘একটা কনস্ট্রাকশন ফার্মে আছি। ফকিরাপুল। তুই?’

‘বাসার ঠিকানা দে,’ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল ইলিয়াস।

ছোট্ট একটা কাগজে বাসার ঠিকানা লিখে দিল জয়নাল। কাগজটার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে উঠল ইলিয়াসের।

‘বাড়ির নাম কি তাহেরা মঞ্জিল?’

‘হ্যাঁ। কেন?’

‘বাড়িওয়ালার নাম কি মুসা?’

মাথা ঝাঁকাল জয়নাল। ‘এ.টি.এম. মুসা।

‘কতদিন ধরে আছিস ওখানে?’

‘প্রায় দু’মাস। কেন?

গলা খাদে নামিয়ে ফেলল ইলিয়াস। জয়নালের কানে কানে ফিসফিস করে বলল, ‘পালা। পালিয়ে যা ওখান থেকে।’

ইলিয়াসের গলার মধ্যে এমন কিছু ছিল, গায়ের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেল জয়নালের। সামলে উঠতে সময় লাগল তার।

‘এ কথা বলছিস কেন?’ জানতে চাইল সে।

অনেকক্ষণ ধরে হর্ন দিচ্ছিল একটা গাড়ি ওদের পেছন থেকে। এবার গাড়ির দরজা খুলে গেল। অল্প বয়সী একটা ছেলের চেহারা উঁকি দিল ভেতর থেকে। ব্যস্ত হয়ে উঠল ইলিয়াস।

‘দেরি হয়ে যাচ্ছে, দোস্ত। আমি যাই।’ গাড়ির দিকে রওনা হলো সে।

খপ করে ইলিয়াসের একটা হাত চেপে ধরল জয়নাল। ‘ফুটানির জায়গা পাও না, না? কেবল অন্যের বাসার ঠিকানা নিয়েই খালাস?’

দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করল ইলিয়াস। বাড়িয়ে ধরল জয়নালের দিকে। বলল, ‘সময় করে আসিস।’

‘গাড়িতে ওরা কারা?’

‘বিজনেস পার্টনার। ‘অল্পবয়েসী ওটা কে?’

কিছু বলার জন্যে মুখ খুলল ইলিয়াস। কিন্তু বলল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল গাড়ির দিকে। যেতে যেতে বলল, ‘বাসায় আসিস। তোর বউকেও নিয়ে আসিস। তখন কথা হবে।’

সাঁই করে নাকের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল ইলিয়াসের মিটসুবিশি জি এক্স। ভিজিটিং কার্ডের ওপর চোখ বুলিয়ে বোকা বনে গেল জয়নাল।

কার্ডটা ইলিয়াসের নয়, অন্য কারও। নিশানাথ চক্রবর্তী নামক একজন ভারতীয় আইনজীবীর নাম লেখা আছে। ঠিকানাটাও পশ্চিমবঙ্গের: ৪১ ফ্রী স্কুল স্ট্রীট, কলিকাতা। কোন সন্দেহ নেই, ভুল করে অন্য লোকের কার্ড ধরিয়ে দিয়েছে ব্যাটা।

হাঁটতে শুরু করল জয়নাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজটা দ্রুত সেরে ফেলতে হবে।

.

সপ্তাহে দু’দিন পপি-রিমিদের স্কুল থাকে না। সুরভির ভোগান্তি তখন বেড়ে যায়। বাচ্চা দুটোকে চোখে চোখে রাখাও একটা ভোগান্তি। যদিও সিঁড়িতে-ছাদে রেলিং লাগানো হয়েছে, কিন্তু বিপদের কি কোন বাপ-মা আছে?

সমস্যা হলো লিয়াকত বাচ্চা দুটোকে একদম সামলাতে পারে না। ওদের ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেই ঘুমিয়ে পড়ে। গতকাল মেয়ে দুটো লিয়াকতকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে ছাদে চলে গিয়েছিল। সুরভি এখনও শিউরে ওঠে ভাবলে। ভাগ্যিস ছাদে গিয়েছিল। যদি সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যেত?

ছুটির দিনগুলোতে জয়নাল বাচ্চাদের সাথে নাস্তা করে। দুপুরেও একসাথে খায়। আজকের দিনটি ব্যতিক্রম। সে আগেভাগে বলে দিয়েছে দুপুরে ফিরবে না। তাই পপি-রিমি সকাল সকাল লাঞ্চ করতে বসেছে। সকাল সকাল লাঞ্চ করার পেছনে অন্য কারণও আছে। আজকে সুরভি ওদের নেপচুন থিয়েটারে নিয়ে যাবে। বাচ্চাদের জন্য একটা কমেডি ছবি এসেছে, খুব নাকি মজার।

ওদের জামা পাল্টে দিয়ে ইস্ত্রী করা নতুন জামা পরাল সুরভি। চুল আঁচড়ে দিল। তারপর নিজে কাপড় পাল্টানোর জন্য শোবার ঘরে ঢুকল। লিয়াকতকে বলল ওদের নিয়ে ড্রইং রুমে খেলতে।

ড্রইং রুমে যেতে হলে সিঁড়ির পাশ দিয়ে ঘুরে যেতে হয়। জায়গাটা পেরিয়ে যাবার সময় হঠাৎ পপি লিয়াকতের কানে কানে বলল, ‘আমি তোমাকে ধাক্কা দিই?’

পপির বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল, রীতিমত চমকে উঠল লিয়াকত। ঢোক গিলে বলল, ‘ধাক্কা দিলে পড়ে যাব তো, সোনামণি।’

‘পড়ে গেলে অসুবিধা কী?’ আহ্লাদী গলায় বলল পপি।

পড়ে গেলে অসুবিধা কী মানে? লিয়াকতের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল। বলে কী হারামজাদী? লাফ দিয়ে সিঁড়ির কাছ থেকে সরে যেতে চাইল সে। কিন্তু পারল না। মনে হলো, কেউ তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে ওখানে।

‘পড়ে গেলে কোন অসুবিধা নেই,’ সুর করে বলল পপি। ওকে সমর্থন করল রিমি। সে-ও তোতাপাখির মত বলল, ‘পড়ে গেলে কোন অসুবিধা নেই।’ লিয়াকতের পেছনে এসে দাঁড়াল ওরা দু’জন। আছড়ে-পাছড়ে নিজেকে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করল লিয়াকত। কিন্তু একচুল নড়তে পারল না। সাঁড়াশীর মত একজোড়া হাত পেছন থেকে জাপটে ধরল ওকে। এই হাত কার? পপির? রিমির? অসম্ভব।

লিয়াকত আয়াতুল কুরসী পড়তে লাগল।

পেছন থেকে ফিসফিস করে কেউ বলল, ‘কোন অসুবিধে নেই। তোমাকে ধরার জন্যে নীচে একজন দাঁড়িযে আছে, দেখো।’

সিঁড়ির দিকে তাকাল লিয়াকত। ঘাড়ের কাছে সবগুলো চুল দাঁড়িয়ে গেল ওর। ইয়া মাবুদ! ইয়া রাব্বুল আলামিন! ওটা কী? ওপরের দিকে উঠে আসছে ওটা কী?

পেছন থেকে একজোড়া হাত লিয়াকতকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল নীচে।

শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁক ছাড়ল সুরভি।

‘পপি! রিমি! তোমরা কোথায়?’

কেউ কোন জবাব দিল না। মনে মনে লিয়াকতের মুণ্ডুপাত করল সুরভি। নিশ্চয়ই মেয়ে দুটোকে নিয়ে ছাদে চলে গেছে।

শোবার ঘরের ব্যালকনি থেকে ছাদের প্রায় সবটুকু দেখা যায়। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কাউকে দেখল না সুরভি। তবুও গলা চড়িয়ে আরেকবার ডাকল। প্রতিধ্বনি যেন ব্যঙ্গ করল তাকে।

কাঁপা কাঁপা হাতে কপালের ঘাম মুছল সুরভি। বুকের ভেতরটা ঢিব ঢিব করছে। কেউ কোন সাড়া দিচ্ছে না কেন? লুকোচুরি খেলছে ড্রইং রুমে?

ড্রইং রুমে যাওয়ার পথে একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল ওর। দেখল, পপি ও রিমি সিঁড়ির গোড়ায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। মাথা দুটো ঈষৎ ঝুঁকে আছে সামনে। কী দেখছে ওরা? অমন আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন? লিয়াকত কোথায়?

‘এই, কী দেখছিস?’ মেয়ে দুটোর কাঁধে হাত রাখল সুরভি।

কেউ কোন জবাব দিল না। সুরভির পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। মেয়ে দুটোর শরীর এমন শক্ত কেন? মনে হচ্ছে পাথরের গা। পলকহীন চোখে কী দেখছে ওরা সিঁড়িতে?

সুইচ টিপে সিঁড়ির বাতি জ্বালল সুরভি।

.

নিশানাথ চক্রবর্তীর ভিজিটিং কার্ডের ওপর হাতে লেখা একটি টেলিফোন নম্বর পেল জয়নাল। অকূল সমুদ্রে যেন খড়কুটো পেল। হাতের লেখাটা ইলিয়াসের। কাজেই ফোন নম্বরটাও হয়তো ওর পরিচিত কারও। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ওর নিজেরও হতে পারে।

টেলিফোন নম্বরটা ইলিয়াসের নয়। ইলিয়াসের কোন বন্ধুরও নয়। একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির। তবে কোম্পানিটি ইলিয়াসের সুপরিচিত। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গড়গড় করে ইলিয়াসের টেলিফোন নম্বর জয়নালকে জানিয়ে দিল।

টেলিফোন পেয়ে অনেকক্ষণ হো-হো করে হাসল ইলিয়াস। হাসি যেন থামতেই চায় না।

‘তোর হাসি অসহ্য লাগছে,’ ধমকে উঠল জয়নাল। ‘দয়া করে থাম।’

‘বিলিভ ইট অর নট, আজকে সন্ধ্যায় তোর বাসায় যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলাম।’

‘চাপাবাজি রাখ।’

‘ধানমণ্ডি গিয়ে টের পেলাম, তোকে ভুল করে অন্য কার্ড দিয়ে দিয়েছি।’ আবার হাসতে শুরু করল ইলিয়াস।

‘আমি রিসিভার নামিয়ে রাখছি,’ বলল জয়নাল। ‘তোর কথা অনুযায়ী তুই সন্ধ্যায় আমার বাসায় আসছিস। বউসহ। তখন বিস্তারিত আলাপ হবে।’

‘জাস্ট এ মিনিট,’ বলল ইলিয়াস। ‘তুই যে বিষয়ে আলাপ করতে চাইছিস, তা ওই বাসায় করা যাবে না।’

‘কেন?’

‘পরে বলব।’

‘কোথায় করা যাবে তা হলে?’

‘তুই সোজা ধানমণ্ডি ২৮ নং রোড ধরে আয়। একদম সোজা। আমি তোকে বুঝিয়ে দিচ্ছি…’

.

লিয়াকত মারা গেল একদিন পরে। ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। ডাক্তারী রিপোর্টে বলা হলো: মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত মৃত্যু।

পুলিশ কয়েকদফা জেরা করল সুরভিকে। জেরা করল জয়নালকেও। কিন্তু কোন কিছু উদ্ধার করতে পারল না। ছোট ছোট দুটি বাচ্চা ধাক্কা দিয়ে লিয়াকতকে ফেলে দিয়েছে-এটাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। পুলিশ তাদের ডায়েরীতে একটা ইউ.ডি. কেস লিখে রাখল।

.

‘পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’ চায়ের কাপে চুমুক দিল ইলিয়াস। ‘খামোকা সময় নষ্ট করবে।’

‘কেন পারবে না?’ জানতে চাইল জয়নাল।

‘কারণ, এটা পুলিশের কেস নয়।’

‘তা হলে? এটা কার কেস?’

‘কার কেস বলতে পারব না। ভূত-প্রেত নিয়ে কারা ডিল করে আমি জানি না।’

‘তুই কি আমার সাথে ইয়ার্কি করছিস?’

‘ইয়ার্কি করব কেন?

‘ভূত-প্রেত বিশ্বাস করিস নাকি?’

‘না।’

‘তা হলে?’

‘তোকে যতক্ষণ ধাক্কা দেয়নি, ততক্ষণ তুই ব্যাপারটা বুঝবি না। একবার ধাক্কা খেলেই বুঝবি ভূত-প্রেত বিশ্বাস অথবা অবিশ্বাস করার জন্য হাতে সময় কত কম থাকে।’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ,’ জোর গলায় সমর্থন জানাল সুরভি। ‘একদম সময় দেয় না।’

‘কারা সময় দেয় না?’ মহা বিরক্ত হলো জয়নাল।

‘ওই…মানে…ওরা আর কী।’ ইলিয়াসের দিকে আঙুল দেখাল সুরভি। ‘উনি যাদের কথা বললেন।’

বোকার মত কথা বোলো না। ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই।’

‘আমাকে ধাক্কা দিল কে তা হলে?’

‘তোমাকে কেউ ধাক্কা দেয়নি। তুমি এমনি এমনি পড়ে গেছ।’

‘বাহ্! এমনি এমনি পড়ে যাব কেন?’

‘কারণ, তোমার ব্রেইন উত্তেজিত ছিল।’

‘জাস্ট এ মিনিট,’ বলল ইলিয়াস। ‘দেখা যাচ্ছে ওই সিঁড়ির কাছে এলেই সবার ব্রেইন উত্তেজিত হয়। বিষয়টা কী?’

‘সবার কথা আসছে কেন?’ ভুরু কুঁচকে তাকাল জয়নাল।

‘তুই যখন সিঁড়িতে অশরীরী পায়ের আওয়াজ শুনেছিলি, তখন কি তোর ব্রেইন ঠিক ছিল?’

‘ঠিক থাকবে না কেন?’

গলা ছেড়ে হাসল ইলিয়াস। ‘তোর লজিক এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। একটু আগেই বলেছিস, ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই।’

কপালের ঘাম মুছল জয়নাল। তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে বয়স বেড়ে গেছে।

ব্যালকনিতে চেয়ার পেতে বসেছে ওরা। ডিনার সেরেছে একটু আগে। খোলা বাতাসে চুল উড়ছে তিনজনেরই। আকাশে গোল থালার মত চাঁদ। পূর্ণিমা না হলেও তার কাছাকাছি কিছু একটা হবে। কারেন্ট চলে যাওয়ায় বেশ ভাল লাগছে পরিবেশটা। একটা গ্রাম-গ্রাম ভাব চলে এসেছে। ধানমণ্ডির এই এলাকায় কারেন্ট চলে গেছে পনেরো মিনিট আগে।

সিগারেটের ছাই ঝাড়ল জয়নাল। ‘তোর কি ধারণা, ওই সিঁড়িতে কিছু একটা আছে?’

মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করল ইলিয়াস। ‘ওসব বাদ দে। অন্য কিছু বল। তোদের বিয়ের গল্প বল। ভাবীর সাথে কি পূর্ব পরিচয় ছিল?’

‘তুই সেদিন আমাকে ওই বাসা থেকে পালিয়ে যেতে বললি কেন?’ হিস হিস করে বলল জয়নাল।

‘এমনি বলেছিলাম।’

‘মিথ্যে কথা। তুই কিছু একটা চেপে যাচ্ছিস।’ ইলিয়াসের দিকে তর্জনী তাক করল জয়নাল। ‘ওই সিঁড়ি সম্পর্কে কী জানিস বল।’

ওই সিঁড়ি সম্পর্কে কিছুই জানি না। বিলিভ ইট অর নট।’ জয়নালকে রেগে উঠতে দেখে তাড়াতাড়ি যোগ করল ইলিয়াস, ‘তবে আমি একটা গল্প জানি। অদ্ভুত গল্প। তোর সিঁড়ির সাথে এটার কোন সম্পর্ক থাকতেও পারে। শুনবি নাকি?’

‘বল।’

ইলিয়াস পায়ের ওপর পা তুলে বসল। ‘তখন মাত্র বিয়ে করেছি। মেহেদীর আমেজ পুরোপুরি কাটেনি। ওই অবস্থায় চাকরি পেয়ে গেলাম একটা এনজিও-তে। অফিস ঢাকায়। বউ ফেলে রেখে জয়েন করতে চলে এলাম। সময়টা ছিল ১৯৮১ সাল।

ইলিয়াসকে থামিয়ে দিল জয়নাল। ‘এ-ই তোর গল্প?’

‘হ্যাঁ।’

‘এটা তোর ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা। গল্প হবে কেন?’

‘গল্প বলছি এ কারণে যে, আজ পর্যন্ত বহু লোকের কাছে এই ঘটনা বলেছি। পুলিশকেও বলেছি। কাউকে বিশ্বাস করাতে পারিনি। সবার ধারণা এটা গল্প। একটু পরে তোদেরও এই ধারণা হবে।’

‘ঠিক আছে, বল।’

‘নতুন নতুন বিয়ে করলে ছেলেরা বাসা থেকে বের-টের হয় না। সন্ধ্যা সাতটার পরে বাসায় মেহমান এলে বিরক্ত হয়। একটু পর পর ঘড়িতে সময় দেখে। হাই তোলে। অফিসের টেলিফোন ঘনঘন এনগেজড পাওয়া যায়। আমার বেলায় সেরকম কিছু হলো না। সদ্য বিবাহিত একজন লোকের চাকরি জীবন শুরু হলো ব্যাচেলারের মত।’

সুরভি হাসি চাপতে গিয়ে বিষম খেল। জয়নাল বলল, ‘তারপর? বউ নিয়ে এলি?’

ইলিয়াস হাসল। ‘বউ নিয়ে এলে কি আজ তোদের বাবুর্চির রান্না খাওয়াই?’

‘তা হলে?’

‘সবকিছু ঠিকঠাক করে ওকে নিয়ে আসব, এ সময় ছোট্ট একটি ঘটনা ঘটল। সেই ঘটনাই হলো আমার গল্প।

‘এর সাথে সিঁড়ির কী সম্পর্ক?’ জানতে চাইল জয়নাল।

‘আছে, সম্পর্ক আছে। গল্প শুনলে বুঝতে পারবি। সিগারেট চলবে?’

‘দে।’

সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল ইলিয়াস। নিজেও একটা নিল।

‘ঢাকায় বাসা পাওয়া যে কী ঝক্কি তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। সস্তা দামের হোটেলে থাকি, সারাদিন অফিস করি আর সন্ধ্যাবেলায় বাসা খুঁজে বেড়াই। এরকম ঘুরতে ঘুরতে একদিন স্টেডিয়াম মার্কেটে নাসিমা আপার সাথে দেখা।’

‘কার সাথে?’ নড়ে চড়ে বসল সুরভি।

‘নাসিমা আপার সাথে। ভাল নাম নাসিমা আকতার। আপনাদের বাড়িওয়ালার স্ত্রী।’

‘আগে থেকে চিনতেন?’

ইলিয়াস হাসল। ‘নাসিমা আপা আমার দূর-সম্পর্কীয় কাজিন। বয়সে দু’বছরের বড়। শৈশবের খেলার সাথী।’

‘তারপর?’

‘নাসিমা আপার সাথে আপনাদের বাড়িওয়ালা…কী যেন নাম…এ.টি.এম. মুসাও ছিল। লোকটাকে আগে দেখিনি। আমি থাকার জন্য বাসা খুঁজছি জানতে পেরে সে নিজেই জানাল সে বাসা ভাড়া দেবে। আমি বোকার মত রাজি হয়ে গেলাম।’

সিগারেটের ছাই ঝাড়ল ইলিয়াস। ‘দু’নম্বর ভুলটা করলাম নাসিমা আপার সাথে মাখামাখি করে। নাসিমা আপা ছিল আমার বড় বোনের মত। আমি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি যে, এ.টি.এম. মুসা আমাকে সন্দেহ করছে।’

জয়নালের চোখের দৃষ্টি আরেকটু তীক্ষ্ণ হলো।

‘একদিনের ঘটনা বলি। এ.টি.এম. মুসা গেছে টাঙ্গাইল। বাসায় নাসিমা আপা একা। কাজের ছেলেটি এসে খবর দিল নাসিমা আপার খুব জ্বর। আমি কোন কিছু না ভেবেই সিঁড়ি ভেঙে ওপরের দিকে ছুটলাম।

সিগারেটে লম্বা করে টান দিল ইলিয়াস।

‘জ্বর ছিল ঠিকই, কিন্তু খুব বেশি ছিল না। আমি কাজের ছেলেটিকে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে নাসিমা আপার পাশে বসলাম। একটা হাত রাখলাম কপালে। এই সময় এ.টি.এম. মুসা এসে ঢুকল।’

ব্যালকনিতে পিনপতন নিস্তব্ধতা। কারও মুখে কোন কথা নেই।

পরের মাসে নাসিমা আপার একটি ছেলে হলো। চাঁদের মত ফুটফুটে ছেলে। বেচারির খুব শখ ছিল ছেলের। বাড়িওয়ালারও। কিন্তু খুশি হতে পারল না কেউ। বাড়িওয়ালার চেহারা আবলুস কাঠের মত হলেও এই ছেলের গায়ের রঙ হলো ফরসা। চিবুকের কাছে একটি তিল।’

অন্ধকারে নিঃশ্বাস নিল সুরভি। চাঁদের আলোয় ইলিয়াসের ফর্সা চেহারা চিকচিক করছে। তিলটাও।

‘বছর না ঘুরতেই ছেলেটা মারা গেল। কীভাবে মারা গেল বলতে পারি না। শুনেছি হামাগুড়ি দিয়ে সিঁড়ি থেকে নীচে পড়ে গেছে।’

‘তুই তখন কোথায়?’ জানতে চাইল জয়নাল।

‘অফিসে।’

‘আর তোর বউ?’

‘লালমণিরহাট।’

‘লালমণিরহাট কেন?’

‘ও তখন চাকরি করছে একটা স্কুলে। বেসরকারী স্কুল। চাকরির খুব শখ ছিল জোবেদার। আমিও না করিনি।’

সিগারেট নিভিয়ে ফেলল ইলিয়াস। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল।

‘তারপর?’ ধৈর্য হারিয়ে ফেলল সুরভি।

‘তারপর কী হলো?’ জানতে চাইল জয়নাল।

ঘড়ি দেখল ইলিয়াস। ‘বাসায় যাবি না? রাত এগারোটা বাজে।’

‘বাসার গোষ্ঠী উদ্ধার করি, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল জয়নাল। ‘তারপর কী হলো?’

.

তারপর আর কী হবে? পরের সপ্তাহে অফিসের কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাটে চলে এলাম। ফ্ল্যাট খালি হয়েছিল আগেই। কিন্তু তাহেরা মঞ্জিল ছেড়ে যাব কি-না সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।’

ইলিয়াস জগ থেকে পানি ঢেলে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেল। কারেন্ট চলে এল এ সময়।

‘তাহেরা মঞ্জিলের সাথে ওটাই আমার শেষ সাক্ষাৎ।’

‘নাসিমা আপার সাথেও?’ জানতে চাইল সুরভি।

‘নাসিমা আপার সাথেও।’

জয়নাল তীক্ষ্ণ চোখে ইলিয়াসের দিকে তাকাল। ‘তোর কি মনে হয় না এটা একটা মার্ডার কেস?’

‘মনে না হওয়ার কী আছে? এটা তো পানির মত পরিষ্কার।’ ইলিয়াস আরেকটা সিগারেট ধরাল। ‘মজার কথা কি জানিস?’ বাড়িওয়ালা আজ পর্যন্ত একবারও ছেলের কবর দেখতে যায়নি।’

‘বলিস কী?’

‘হ্যাঁ।’

‘পুলিশকে জানিয়েছিলি?’

‘না।’

‘কেন?’

‘ওখানেই তো সমস্যা। আমি যখনই পুলিশকে জানানোর জন্য থানায় যাই, আমার সাথে সাথে ওই ছেলেটাও যায়। পা জড়িয়ে থামানোর চেষ্টা করে।’

‘কোন্ ছেলেটা?’ চমকে উঠল জয়নাল।

‘বাড়িওয়ালার সেই ছেলেটা!’

‘মরা ছেলেটা?’

‘হ্যাঁ।’

‘অসম্ভব।’

‘একটা কথা তখন বলা হয়নি। আমি যেদিন ওই বাসা ছেড়ে চলে আসি, আমার সাথে সাথে সেই ছেলেটাও চলে আসে।’

‘অসম্ভব।’

‘দিনের বেলায় মাঝে মাঝে ও বাড়ির সিঁড়িতে খেলতে যায়। লোকজনের সাথে মজা করে,’ বলল ইলিয়াস। যেন জয়নালের কথা তার কানেই ঢোকেনি ‘আবার রাতের বেলায় ফিরে আসে।’

‘তোকে থানায় যেতে বাধা দেয় কেন?’

‘ওর বিশ্বাস, মামলা হলে বাবার ফাঁসি হয়ে যাবে। তখন মা-কে কে দেখবে?’

জয়নাল স্তম্ভিত হয়ে গেল। ইলিয়াসের মাথা যে পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে, তাতে কোন সন্দেহ রইল না।

‘সে কি রোজ রাতেই এখানে আসে?’ জানতে চাইল সে।

‘হ্যাঁ।’

‘আজ আর আসবে না, তাই না?’ জয়নালের গলায় বিদ্রূপ।

ইলিয়াস শব্দ করে হাসল। ‘আমি গোড়াতেই বলেছি আমার এই গল্প কেউ বিশ্বাস করে না। তোরাও করবি না। যদি ছেলেটিকে এনে হাজির করি, তা হলেও না।’

‘কেন?’

‘আগেও বহু লোকের সামনে তাকে হাজির করেছি। কোন লাভ হয়নি। ওরা তো বাড়িওয়ালার মরা ছেলেটাকে দেখেনি। কী প্রমাণ আছে এই ছেলেই সেই ছেলে?’

সুরভি হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। ‘আমি দেখেছি। আমি চিনতে পারব। তাকে হাজির করুন।’

জয়নাল আশ্চর্য হয়ে গেল। ‘কোথায় দেখেছ?’

‘নাসিমা আপার কামরায়,’ বলল সুরভি। ‘দেয়ালে টাঙানো ছবিতে।’

ইলিয়াস আবারও হাসল। যেন খুব মজা পেয়েছে।

‘তাকে তো আপনি একটু আগেই দেখেছেন। চিনলেন না কেন?’

‘কোথায়?’ চমকে উঠল সুরভি।

‘একটু আগে যে সিগারেট দিয়ে গেল?’

খানিকক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারল না।

‘অন্ধকার ছিল,’ অবশেষে বলল সুরভি। ‘এখন কারেন্ট এসেছে। ব্যালকনির বাতিটা জ্বালান। তারপর ডাকুন।’

ব্যালকনির বাতিটা জ্বালল ইলিয়াস। তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাকে যেন ডাকল।

সময় দাঁড়িয়ে গেল স্তব্ধ হয়ে।

সিঁড়ি বেয়ে একজোড়া কচি পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে।

শাহেদ ইকবাল