ধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত

চোখের আড়াল হলে – মিজানুর রহমান কল্লোল

চোখের আড়াল হলে

ঘটনাগুলো এখনও আমাকে দুঃস্বপ্নের মত তাড়া করে ফেরে। ভুলে থাকার চেষ্টা করি। পারি না। কী করেই বা ভুলে থাকব? মাথার উপর দিয়ে অনবরত বিমান উড়ে গেলে কীভাবে ভুলে থাকা যায়? যতবার বিমানের গর্জন কানে আসে ততবার সেই আতঙ্কের কথা মনে পড়ে আমার। কাঁপতে থাকি থরথর করে। ভয়ে গায়ের রোম দাঁড়িয়ে পড়ে, ঘামে ভিজে যায় সমস্ত শরীর। কানে ভেসে আসে ইঁট, কাঁচ, পাথর ভাঙার শব্দ— আর আমার মেয়ের আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ কেবল শুনতে পাই আমি। তখন আমার সব মনে পড়তে থাকে- ব্যাখ্যাতীত, রহস্যময় ঘটনাগুলো।

ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল মিসেস বার্নেসের পেরামবুলেটর দিয়ে। আমার মেয়ে জেনিকে নিয়ে সেদিন দোকান থেকে ফিরছি। হঠাৎ আমার হাতটা চেপে ধরল ও। তারপর আঙুল তুলে দেখাল রাস্তার ওপারটা। উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘মা, দেখো- প্রামটাকে দেখো।’

তাকালাম আমি। দেখলাম পেরামবুলেটরে বসে আছে আমাদের প্রতিবেশী মিসেস বার্নেসের বাচ্চা, আর মিসেস বার্নেস দু’হাতে পেরামবুলেটর ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছেন বাজারের দিকে।

‘ও তো রোজই দেখো,’ বললাম আমি। ‘নতুন করে আর দেখার কী আছে?’

‘কিন্তু রোজ তো মিসেস বার্নেসই ওটা ঠেলে নিয়ে যান,’ বলল জেনি। ‘অথচ আজ দেখো গাড়িটা কেউ ঠেলছে না। আপনাআপনি চলছে।’

‘বাজে বোকো না,’ বিরক্তি চেপে রেখে বললাম আমি।

‘মোটেই বাজে বকছি না,’ জেনি বলল। ‘দেখছ না মিসেস বার্নেস ওখানে নেই। বাচ্চাটাকে নিয়ে প্রামটা নিজেই চলছে।’

ইদানীং জেনির মনটা ভাল নেই, জানি আমি। খুব উল্টোপাল্টা কথা বলছে ও। বুঝতে পারি নিঃসঙ্গতার জন্যেই এমনটা হয়েছে। এখানে ওর কোন বন্ধু বান্ধব নেই। সারাক্ষণ একা থাকে মেয়েটা। একটাই মাত্র মেয়ে আমাদের। আমিও খুব একটা সময় দিতে পারি না ওকে, ওর বাবার কথা তো বাদই দিলাম। তাই হয়তো এসব উল্টোপাল্টা কথা বলে মজা পায় ও। কয়েকদিন আগে ওর বাবার শার্টটা নিয়ে একই কাণ্ড করেছিল। সেদিন সকালে সাদা রঙের শার্ট পরে বেরিয়েছিল ওর বাবা। অথচ জেনি বলল, ‘বাবা সবুজ রঙের শার্ট পরে গেল কেন?’ আমি যতই বলি, তোমার বাবা সাদা শার্ট পরে গেছে, জেনি ততই বলতে থাকে- বাবা সবুজ শার্ট পরে গেছে। এক সময় ওকে বললাম, ‘তোমার বাবার তো সবুজ শার্টই নেই।’ জেনি মানল না আমার কথা। বলল, ‘অবশ্যই আছে। নইলে সবুজ শার্ট পরল কেমন করে?’

সেদিন এই নিয়ে এক ঘণ্টা ধরে তর্ক করেছিল জেনি। এখন আবার শুরু করেছে মিসেস বার্নেসের পেরামবুলেটর নিয়ে। বাড়ি পৌঁছেও সেই একই ঘ্যানঘ্যানানি। ‘মা, সত্যি বলছি, প্রামটা নিজে নিজে চলছিল তখন।’

‘বোকার মত কথা বোলো না,’ এবার সত্যিই রেগে গেলাম আমি। ‘মিসেস বার্নেস না ঠেললে গাড়িটা চলবে কী করে?’

‘তা হলে বোধহয় কম্পিউটার চালাচ্ছিল ওটাকে,’ উত্তর দিল জেনি।

‘অনেক হয়েছে, এবার থামো, ইতি টানতে চাইলাম আমি 1

জেনি বলল, ‘তুমি বোধহয় বাবার শার্টের ব্যাপারটা ভুলতে পারছ না। স্বীকার করছি মিথ্যে বলেছিলাম আমি। বাবা সাদা শার্টই পরেছিল। কিন্তু মিসেস বার্নেসের ব্যাপারটা- তুমি তো দেখলে তিনি ওখানে ছিলেন না।’

‘অবশ্যই ছিলেন।’

‘ঠিক আছে, আমি জানালার কাছে বসে রইলাম। প্রামটা যখন ফিরবে তোমাকে ডেকে ভাল করে দেখাব।’

জানালার চৌকাঠে উঠে বসল জেনি। আমি রান্নাঘরে ঢুকলাম। কাজের চাপে ভুলে গেলাম জেনি ও প্রামটার কথা। অনেকক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখি তখনও জানালায় বসে আছে জেনি। ‘খেতে এসো,’ ওকে ডাকলাম আমি।

‘এখনও ফেরেনি,’ জেনি বলল কাছে এসে।

‘কে ফেরেনি?’

‘প্রামটা। মনে হয় পথ হারিয়ে ফেলেছে।’

‘চিন্তা কী, মিসেস বার্নেস ওটা খুঁজে বের করে আনবেন,’ পরিহাসের ছলে বললাম আমি। ‘এতক্ষণে হয়তো খুঁজতেও বেরিয়েছেন।’

‘না, তিনি বেরোননি,’ বলল জেনি। ‘আমি চোখ রেখেছিলাম তাদের দরজায়। তা হলে এখনও ওটা ফিরছে না কেন বুঝতে পারছি না। লাঞ্চের সময় হয়ে গেল।’

‘তা হলে বোধহয় তিনি বাচ্চাটাকে নিয়ে কোন বন্ধুর বাড়িতে গেছেন লাঞ্চ খেতে।’

‘এখনও আমার কথা বিশ্বাস করছ না তাই না?’

‘এটা নিয়ে এখন গল্প লিখতে বসো। চমৎকার গল্প হবে।’

‘মা, এটাকে গল্প বলছ কেন? এটা তো সত্যি।’

সন্ধ্যায় শুয়ে পড়ল জেনি। হ্যারল্ড, আমার স্বামী, বাসায় ফেরার পর আমাকে ডেকে নিয়ে বলল, ‘তুমি তো মিসেস বার্নেসকে চেনো। রাস্তার ওপাশের সুন্দরী মহিলাটা।’

‘চিনব না কেন! ওর কথা শুনতে শুনতে আজ কান ঝালাপালা হয়ে গেল।’

‘আজ সকালে বড় রাস্তাটার ওপর গাড়ির নীচে চাপা পড়েছিলেন তিনি, ‘ বলল আমার স্বামী। ‘রাস্তা পার হয়ে প্রামটা সবে ফুটপাথে তুলতে যাবেন, এমন সময় ওটা কীসে যেন বেধে যায়। মিসেস বার্নেস তখন রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাস্তা দিয়ে সে সময়ে খুব জোরে একটা গাড়ি আসছিল। সময় মত থামতে পারেনি। মিসেস বার্নেসকে চাপা দিয়ে চলে যায়। সাথে সাথে মারা গেছেন ভদ্র মহিলা।’

ঠাণ্ডা হয়ে এল আমার শরীর। ‘এজন্যেই তাকে ফিরে আসতে দেখা যায়নি। জেনি সারাটা দিন পথের দিকে চেয়েছিল। বাচ্চাটা কেমন আছে?’

‘ওর কিছু হয়নি। কিন্তু জেনি পথের দিকে চেয়ে ছিল কেন?’

ঘটনাটা খুলে বললাম ওকে। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘মৃত্যুসংবাদটা ওকে জানাই, কী বলো? খুব ভেঙে পড়বে বেচারি।’

‘হ্যাঁ জানাও,’ বলল হ্যারল্ড। ‘ভবিষ্যতে যাতে আর কাউকে নিয়ে রসিকতা করতে না পারে, সেই শিক্ষাটা হবে।’

‘বারে, ওকে দোষ দিচ্ছ কেন? ও কীভাবে জানবে! থাক, ওকে জানানোর দরকার নেই।’

মিসেস বার্নেসের ঘটনা ওকে জানালাম না। পরদিনও হয়তো জানাতাম না। কিন্তু জেনি আবার শুরু করল ঘ্যানঘ্যানানি। ‘মা, গতকাল প্রামটা ফিরেছে কিনা জানো?’

বাধ্য হয়ে খবরটা দিলাম তাকে। ‘মিসেস বার্নেস কাল প্রামটাকে নিয়ে বাজারে যাচ্ছিলেন- মনে আছে তো? আগে বলতে দাও আমাকে। খুবই দুঃসংবাদ। একটা গাড়ির নীচে চাপা পড়েছিলেন তিনি। মিসেস বার্নেস মারা গেলেও নিরাপদেই আছে বাচ্চাটা।’

‘মিসেস বার্নেস মারা গেছেন!’

‘হ্যাঁ, জেনি। খুব দুঃখজনক ঘটনা।’

‘কীভাবে হলো?’

হ্যারল্ড আমাকে যেটুকু বলেছিল সেটুকু বললাম আমি। মনোযোগ দিয়ে শুনল জেনি। শান্ত গলায় বলল, ‘তিনি নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে আগেই বেরিয়ে গিয়ে প্রামটার জন্যে ওখানে অপেক্ষা করছিলেন। হলপ করে বলতে পারি প্রামটাকে নিয়ে তিনি বের হননি।’

আর কিছু বললাম না আমি। স্বস্তিবোধ করলাম মৃত্যুসংবাদ শুনে সে ভেঙে পড়ল না দেখে। সেও আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না এরপর।

কয়েক সপ্তাহ পরে স্কুলে একটা ঘটনা ঘটাল জেনি। ওর এক টীচারের রয়েছে মাকড়সা আতঙ্ক। জেনি সেই টীচারের ডেস্কে একটা মাকড়সা রেখে দিল। জেনির নামে হেডমিস্ট্রেসকে নালিশ করলেন টীচার। জেনি আমাকে বলে গেল, ‘হেডমিস্ট্রেস চারটের সময় দেখা করতে বলেছেন আমাকে। ফিরতে তাই দেরি হবে।’

কিন্তু তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরল জেনি। বললাম, ‘তোমার হেডমিস্ট্রেস তো দেখছি খুব তাড়াতাড়িই তোমাকে ছেড়ে দিলেন।’

হাসল জেনি। ‘ভাগ্য ভাল যে তিনি ছিলেনই না। চারটের সময় তাঁর রুমের সামনে গেলাম। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দরজায় টোকা দিলাম। একবার মনে হলো তিনি ভেতরে ঢুকতে বলছেন। কিন্তু ঢুকে দেখলাম রুমে কেউ নেই। মনে হয় আমার কথা ভুলেই গেছেন তিনি। কী সৌভাগ্য।’

‘কাজটা ঠিক করোনি,’ বললাম আমি। ‘তোমার উচিত ছিল ওখানে অপেক্ষা করা।’

‘আর সেধে পড়ে মার খাওয়া, তাই না?’

পরদিন স্কুলের সেক্রেটারি মিসেস লেনিং এল আমাদের বাড়িতে। কেমন যেন শুকনো দেখাচ্ছিল তাকে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম তার দিকে।

‘দুঃসংবাদ আছে,’ বলল মিসেস লেনিং। ‘কাল রাতে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন হেডমিস্ট্রেস মিস পেট্রেল। এখনও কেউ জানে না খবরটা। যে মেয়েটা ঘর ঝাড়ু দেয়, সকালে সেই প্রথমে দেখতে পায় লাশটা। বিছানায় পড়ে আছে। আমি ছাড়া তাঁকে জীবিত অবস্থায় শেষ দেখেছে আপনার মেয়ে জেনি।’

‘জেনির সঙ্গে গতকাল চারটের সময় দেখা করার কথা ছিল তাঁর-’

‘তা জানি;’ বলল মিসেস লেনিং। ‘কিন্তু জেনি তো ভয়েই পালিয়ে গেল। অফিসে বসে দেখলাম জেনি মিস পেট্রেলের দরজায় টোকা দিল। ভেতরেও ঢুকল কিন্তু সাথে সাথেই ছুটে বেরিয়ে এল আবার। দেখা করতে গেলাম আমি মিস পেট্রোলের সাথে। উনি বললেন, ‘জেনি তাঁর দিকে একবার তাকিয়েই ছুটে বেরিয়ে গেছে। দুঃখ করে মিস পেট্রেল বললেন, ‘আমাকে দেখতে কি ড্রাগনের মত লাগে যে বাচ্চারা আমাকে দেখলেই ছুটে পালাতে চায়?’

‘আচ্ছা,’ বললাম আমি। ‘ঘটনা তা হলে এ-ই।’

মিসেস লেনিং বলল, ‘খুব ক্লান্ত বোধ করছিলেন মিস পেট্রেল। আমাকে বললেন শরীরটা ভাল লাগছে না। কিন্তু বুঝতে পারিনি এতটা অসুস্থ তিনি তিনি বললেন, টীচাররা কেন যে ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে ছেলেমেয়েদের নামে তাঁর কাছে নালিশ করে? দুর্ভাগ্য আমাদের, একজন চমৎকার মহিলাকে আমরা হারালাম।’ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল তার চোখদুটো। ‘জেনি কিছু বলেছে এ ব্যাপারে?’ জিজ্ঞেস করল ও।

‘বলেছে মিস পেট্রেল নাকি রুমে ছিলেন না,’ জবাব দিলাম আমি।

‘পাজী মেয়ে,’ মাথা নেড়ে বলল মিসেস লেনিং। ‘তখন রুমেই ছিলেন হেডমিস্ট্রেস। খবরটা শোনার পর জেনি নিশ্চয়ই আঘাত পাবে। আজ বিকেলে একটি বিশেষ সভায় খবরটা প্রচার করবেন সিনিয়র মিস্ট্রেস।’

সেদিন স্কুল থেকে ফিরে জেনি বলল তার হেডমিস্ট্রেসের মৃত্যুর কথা। ‘তা হলে অসুস্থতার জন্যে কাল চারটে পর্যন্ত তিনি আর আমার জন্যে অপেক্ষা করেননি,’ বলল সে। ‘শরীর খারাপ লাগার জন্যে আগেই বাড়ি চলে গিয়েছিলেন।’

‘জেনি মিথ্যে বোলো না, প্লীজ। কেন মিথ্যে বলছ?’

‘কীসের মিথ্যে?’ অবাক হলো জেনি

‘আমি জানি মিস পেট্রেল তোমার জন্যে রুমে অপেক্ষা করছিলেন।’

‘তিনি রুমে ছিলেন না,’ জোর দিয়ে বলল জেনি। ‘আর তুমি কীভাবে জানো যে তিনি রুমেই অপেক্ষা করছিলেন?’

‘সকালে মিসেস লেনিং এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। সে-ই বলল।’

‘কী বলেছেন?’

‘বলেছে, তুমি মিস পেট্রেলের রুমে ঢুকেই তাঁর দিকে একবার মাত্র তাকিয়ে ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে। অবশ্য তোমার পালানোতে হেডমিস্ট্রেস স্বস্তি পেয়েছিলেন। কাউকে শাস্তি দেয়া তিনি পছন্দ করেন না।’

‘মা, কসম বলছি, আমি রুমে ঢুকে তাঁকে দেখতে পাইনি। রুমটা তখন খালি ছিল।’

‘আর পারি না তোমাকে নিয়ে। খুব বাড়াবাড়ি করছ।’

‘আমার কথা বিশ্বাস করো, মা,’ জেনি বলল। ‘মিসেস বার্নেসের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটল। সেদিনও তুমি বিশ্বাস করোনি আমার কথা। অথচ আমি একটুও মিথ্যে বলিনি সেদিন।’

হঠাৎ করেই আতঙ্কের একটা ঢেউ বয়ে গেল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে। বুঝতে পারলাম অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটছে। যে দুজনকে আর সবাই দেখলেও জেনি দেখতে পায়নি তারা আর বেঁচে থাকেনি। মারা গেছে অল্পসময় পরে। আমার মনের কথাটা যেন বুঝতে পারল জেনি। বড় বড় চোখে তাকাল আমার দিকে। ‘অবিশ্বাস্য ব্যাপার!’ ফিসফিস করে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল সে।

সন্ধ্যায় হ্যারল্ডকে ঘটনাগুলো বললাম আমি। হেসে উড়িয়ে দিল সে আমার কথা। বলল, ‘এটা নেহাতই কাকতালীয় ঘটনা। এরকম হতেই পারে। জেনির রূপকথার সাথে মিসেস বার্নেসের অ্যাকসিডেন্ট কিংবা মিস পেট্রেলের হার্ট অ্যাটাকের কোন সম্পর্ক নেই।’

ঘটনাগুলোকে আমার স্বামীর মতই হেসে উড়িয়ে দিতে পারতাম জেনির রূপকথা বলে। কিন্তু মাত্র কয়েকদিন পরে আমার দুধওয়ালা, খুবই নিরীহ মানুষ, ও’ব্রায়ানকে ঘিরে যে ঘটনা ঘটল তাতে আর উড়িয়ে দিতে পারলাম না রূপকথা বলে।

ও’ব্রায়ানের পাওনা আমি প্রতি শনিবারেই মিটিয়ে দিই। ওকে তখন এক কাপ কফিও খাওয়াই। সে সময়ে জেনি তার রুমেই থাকে। হোম ওয়ার্ক করে কিংবা করার ভান করে। সেদিন সকালে দিতে এল ব্রায়ান। কফি খেতে খেতে বলল, ‘মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। সন্ধ্যায় দেখতে আসবে। মেহমানদের জন্যে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু দুধের পড়েছে আকাল।

ব্রায়ান চলে যাবার পর রান্নাঘরে ঢুকল জেনি। বাটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দুধ এল কোত্থেকে?’

‘দুধওয়ালা দিয়ে গেছে,’ বললাম আমি।

‘কিন্তু সে এখানে এলে তো আমি জানালা দিয়ে তাকে দেখতে পেতাম।’

‘তুমি বোধ হয় পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলে।’

‘আমার বয়েই গেছে,’ বলল জেনি। ‘ওই একই পড়া পড়তে ভাল লাগে না। আমি বাইরেই তাকিয়ে ছিলাম। মনে হয় সামনের পথ দিয়ে না এসে ব্যাটা বাড়ির ওপাশ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকেছে।’

কথা বাড়ালাম না আমি। জেনির সঙ্গে এত বকবক করতে আর ভাল লাগে না। পরদিন ছিল রবিবার। দুপুর গড়িয়ে গেল তবু দুধওয়ালার দেখা নেই। বিকেলের দিকে দুধ নিয়ে এল অপরিচিত এক ছেলে। ‘এত দেরি কেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।

‘আর কেন,’ বলল ছেলেটি। ‘দুধের ভাণ্ডারে যা তা অবস্থা। এদিকে কালরাতে বুড়ো ও’ব্রায়ান একটা মারামারি লাগিয়ে বসল। খাওয়া দাওয়া চলছিল সেখানে।’

‘জানি,’ বললাম আমি। ‘মেয়ের বিয়ের কথা পাকা হচ্ছিল। ব্রায়ান বলেছিল আমাকে। কিন্তু কী হয়েছিল যে মারামারি করতে গেল?’

মেয়ের চরিত্র নিয়ে কথা তুলেছিল একজন,’ বলল ছেলেটি। ‘মেয়েটার চরিত্র নাকি ভাল না। অনেক পুরুষের সাথে ঢলাঢলির অভ্যেস আছে। এই শুনে খেপে যায় ব্রায়ান। লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনিতেই মাতাল ছিল ব্রায়ান, তার উপর বুড়ো। লোকটার সাথে পারবে কেন সে? লোকটার এক ঘুসিতে সে উড়ে গিয়ে পড়ল টেবিলের কোনায়। মাথাটা ঠুকে গেল। ডাক্তার এসে দেখল বেচারা মরে গেছে ততক্ষণে।’

‘কী বললে? ব্রায়ান মারা গেছে?’ ঘরটা হঠাৎ যেন দুলতে শুরু করল আমার চোখের সামনে। যেন দূর দূরান্ত থেকে ভেসে এল ছেলেটির কণ্ঠ, ‘আমি দুঃখিত। আসলে এভাবে হুট করে কথাটা বলা ঠিক হয়নি আমার। স্থির হয়ে একটু বসুন। হ্যাঁ, এখন কি ভাল লাগছে?’

ধীরে ধীরে ধাতস্থ হলাম আমি। শরীরটা ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে উঠেছে। শীত করছে খুব। ‘হ্যাঁ, এখন ভাল লাগছে।’

ঘরে ঢুকল জেনি। ছেলেটির দিকে তাকাল। ‘মি. ও’ব্রায়ান আসেননি আজ?’

‘তোমার মা পরে বলবেন সেকথা,’ বলল ছেলেটি। ‘একটু ধরো, মাথাটা ঘুরছে ওঁর।’ ছেলেটি দ্রুত চলে গেল।

‘তোমার কী হয়েছে, মা?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল জেনি। ‘মনে হচ্ছে তুমি অসুস্থ।’

‘মারামারি করতে গিয়ে কালরাতে মারা গেছে মি. ও’ব্রায়ান,’ বললাম আমি।

জেনির মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। বলল, ‘সেজন্যে কাল তাকে আমি দেখতে পাইনি।’

‘ও কথা বোলো না,’ বললাম আমি। ‘কাল সকালে সে সুস্থ ছিল। ঘটনা ঘটেছে সন্ধ্যার পরে।’

‘যখনই ঘটুক, সেকারণেই কাল সকালে তাকে আমি দেখতে পাইনি,’ বলল জেনি। ‘একই ঘটনা ঘটেছিল মিসেস বার্নেস ও মিস পেট্রোলের ক্ষেত্রে।’ ভয়ে কেঁপে গেল তার কণ্ঠ। ‘অবিশ্বাস্য! আমি বুঝতে পারছি না, মা! এমন ঘটছে কেন?’

দেখলাম ভীষণ ভয় পেয়েছে জেনি। প্রকাশ পেতে দিলাম না তাই নিজের ভয়টা। হেসে বললাম, ‘আসলে কিছুই ঘটেনি, মামণি। সবই তোমার কল্পনা।’ কিন্তু ভয়টা লুকোতে পারলাম না আমি হ্যারন্ডের কাছে। বললাম তাকে দুধওয়ালার ঘটনাটা। এবারও হেসে উড়িয়ে দিল সে। বলল, বাদ দাও এসব। জেনি আসলে চাইছে সবার নজর কাড়তে। মনে করছে সে যা বলছে সেটাই সত্য হচ্ছে। এসব ফালতু কথা যেন আমার সামনে এসে না বলে। তা হলে পিটিয়ে সোজা করে ফেলব।’

অনেকদিন হাঁটাচলা করতে পারছে না আমার শাশুড়ি। খুব অসুস্থ সে। সেদিন সন্ধ্যায় তাকে দেখতে যাবার কথা। হঠাৎ জেনি ফিসফিস করে বলল, ‘মনে করো তাকে গিয়ে আমি দেখতে পেলাম না, তা হলে কী হবে তুমি তো জানো।’ হ্যারন্ডের কথা সেই মুহূর্তে মনে পড়ল আমার। মনে হয় ঠিকই বলেছে হ্যারল্ড। জেনির মধ্যে এক ধরনের নাটক করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সে চায় সবকিছুর মধ্যমণি হতে। আচ্ছা আমার শাশুড়িকে দেখতে গিয়ে যদি সে সত্যিসত্যিই বলে সেখানে কেউ নেই- তা হলে? সেরকম কিছু ঘটল না। বাড়ি ফেরার সময় জেনি বলল, ‘ওনাকে নিয়ে ভেব না, বাবা। মরতে অনেক দেরি আছে।’

‘তোমার মতামত শুনতে চাচ্ছি না আমরা,’ তীব্র স্বরে বলল হ্যারল্ড। ‘মা এখনি মরছেন কে বলেছে তোমাকে?’

হাসল জেনি। অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। সেই দৃষ্টি দেখে আবারও ভয় পেলাম আমি।

জেনির ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করতে গেলাম ডাক্তারের সাথে। আমাদের পারিবারিক বন্ধু সে। তিনটে ঘটনাই খুলে বললাম ওকে। সব কিছু শুনে হাসল ডাক্তার। বলল, ‘বুদ্ধিমতী মেয়ে তোমার জেনি। কিন্তু বয়সটা হলো খারাপ। কৈশোর ও যৌবনের মাঝামাঝি। এ বয়সে মেয়েরা অনেক পাগলামিই করে। মনের মধ্যে থাকে ফুরফুরে ভাব। বাতাসে ভাসতে থাকে। নিজেকে মনে করে অন্য জগতের কেউ। দোষ তার না, দোষ বয়সের। শরীর ঠিক আছে তো?’

‘দেখলে তো মনে হয় সুস্থই।’

‘এ বয়সে এরকম হওয়াটা স্বাভাবিক,’ বলল ডাক্তার। ‘তার কিচ্ছু হয়নি। তবে অনেক সময় কারও কারও মধ্যে অতীন্দ্রিয় চেতনা দেখা দেয়। ভবিষ্যৎ মৃত্যুকে সে দেখতে পায়। এ নিয়ে হৈ চৈ করার কিছু নেই। স্বাভাবিকভাবে মেনে নাও। তবে তার সাথে এসব নিয়ে বেশি আলোচনা কোরো না। তা হলে তার আগ্রহ বেড়ে যাবে আরও। এ নিয়ে বেশি চিন্তা কোরো না। কী ব্যাপার, এত ফ্যাকাসে লাগছে কেন তোমাকে? রাতে বুঝি ঘুম হয় না?’

‘একদম ঘুমোতে পারি না, ডাক্তার,’ বললাম আমি। ‘ব্যাপারটা আমার মনের মধ্যে চেপে বসে আছে।’

প্রেসক্রিপশন লিখল ডাক্তার। ঘুমের ওষুধ দিয়েছে আমাকে। বাড়ি ফিরে এলাম ওটা নিয়ে।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ঘটল না কিছুই। সামনে জেনির পরীক্ষা। তাই নিয়ে ব্যস্ত ও। সেই সাথে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। পড়াশোনা বিশেষ করেনি সে। প্রস্তুতি ভাল না। তার ভয়, প্রশ্নপত্র হাতে পাবার পর সে হয়তো কিছুই লিখতে পারবে না।

দেখতে দেখতে চলে এল পরীক্ষার দিন। ওর জন্যে নাস্তা বানালাম আমি। কিন্তু নাস্তা খেতে নীচে নামল না সে। কয়েকবার ডেকেও সাড়া পেলাম না তার। শেষ পর্যন্ত আমি গেলাম তার রুমের দিকে। দেখি বিছানায় বসে আছে সে। ভয়ানক আতঙ্কে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।

‘এসো, দেরি হয়ে যাচ্ছে তো,’ ডাকলাম ওকে।

‘স্কুলে যাব না আজ। ভাল লাগছে না।’ জবাব দিল সে। ‘আমি এখানেই থাকব।’

‘তুমি কি অসুস্থ বোধ করছ?’

‘হ্যাঁ, মা। খুব অসুস্থ আমি। ভয়ানক অসুস্থ। স্কুলে যেতে পারব না।’

‘তা হলে ডাক্তারকে খবর দিই।’

‘না। তিনি এসে বলবেন যে আমার কিচ্ছু হয়নি।’

‘কিছু হলে তবে তো বলবে? জেনি তোমাকে স্কুলে অবশ্যই যেতে হবে। পরীক্ষা তুমি আগেও দিয়েছ। একটা পরীক্ষা খারাপ হলে এমন কিছু ক্ষতি হবে না। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।’

‘আমি পরীক্ষা নিয়ে ভাবছি না,’ বলল জেনি। ‘ও নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। আমি, আমি মরতে চাই না, মা।’

‘কী আজেবাজে কথা বলছ? মরতে যাবে কেন তুমি?’

‘আমি বাড়িতেই নিরাপদে থাকতে চাই, মা। বাইরে বেরোলে আমার খুব বিপদ হবে।’

‘কীসের বিপদ?’

‘যে কোন ধরনের বিপদ হতে পারে। গাড়ি আমাকে চাপা দিতে পারে, আগুন, লাগতে পারে, কেউ হামলা করতে পারে, যে কোন বিপদ একটা ঘটবেই।’

‘রাতে কি কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছ তুমি?’

‘হ্যাঁ, দেখেছি। সে তো প্রায়ই দেখি। কিন্তু স্বপ্নের কথা নয়। মা, আমাকে তুমি বাইরে যেতে বোলো না।’ হঠাৎ করে কাঁদতে শুরু করল জেনি।

হাত বুলিয়ে দিলাম তার পিঠে। গাঢ় স্বরে বললাম, ‘তোমার ভয়টা কী নিয়ে তা আমাকে বললে তোমাকে বাড়িতে থাকতে দেব। নিশ্চয়ই পরীক্ষার ব্যাপারে ভয় পাচ্ছ?’

‘ওটা তো সামান্য ব্যাপার,’ বলল জেনি। ‘যদি সত্যি কথা বলি তুমি তা হলে বিশ্বাস করবে না।’

‘বলোই না।’

‘বলছি। আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নায় মুখ দেখলাম।’

তার ভেজা, ফ্যাকাসে, ভয় পাওয়া ছোট্ট মুখটার দিকে তাকালাম আমি। আস্তে করে বললাম, ‘সকালে সবার মুখ অপূর্ব সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। তাই কি?’

আমার রসিকতা গায়ে মাখল না সে। বলল, ‘ড্রেসিং টেবিল থেকে আয়নাটা নিয়ে এসো।’

আয়নাটা এনে তার হাতে দিলাম।

‘আমার পেছনে এসে দাঁড়াও,’ বলল সে।

আমি তার কথা শুনলাম। দাঁড়ালাম তার পেছনে। আয়নাটা সামনে মেলে ধরল ও। আমি আমার ও ওর মুখটা আয়নায় দেখতে পেলাম। ঠাট্টা করে বললাম, ‘আহ্ কী সুন্দর দেখাচ্ছে আমাদের।’

‘আমাদের?’ শুষ্ক কণ্ঠে বলল ও। ‘কী দেখতে পাচ্ছ তুমি?’

‘তোমাকে ও আমাকে।’ বললাম আমি। ‘আমাদের দুজনকে।’

আয়নাটা ছুঁড়ে ফেলে দিল জেনি। বলল, ‘আমি দুজনকে দেখছি না। আমি দেখছি শুধু তোমাকে। নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না। এর কি অর্থ তুমি জানো?’

বাচ্চাদের সিজোফ্রেনিয়া রোগের কথা হঠাৎ করে মনে পড়ল আমার। বইতে পড়ছি। শুনেছি রেডিওতে। এখন দেখছি তা নিজের ঘরের মধ্যেই। ওর কণ্ঠ শুনেই বুঝছি মিথ্যে কথা বলছে না ও।

‘পরীক্ষার সময় অসুখ বাধিয়ে ভালই করেছ তুমি,’ বললাম আমি। ‘আর সবাই যখন পরীক্ষার জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়বে তখন চাদর মুড়ি দিয়ে আরামে শুয়ে থাকবে তুমি। নাও, শুয়ে পড়ো, দুশ্চিন্তা কোরো না।’

‘ধন্যবাদ, মা!’ ফুঁপিয়ে উঠল জেনি। শুয়ে পড়ল। গাল বেয়ে নেমে পড়ল অশ্রুধারা।

নীচে নেমে হ্যারল্ডকে বললাম আমি। কফিতে চুমুক দিতে যাচ্ছিল ও। থেমে গেল। বলল, ‘আয়নায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না, তাই তো? ভালই ধোঁকা দিয়েছে তোমাকে।’

‘সত্যি কথাই বলছে ও,’ বললাম আমি। ‘একেবারে ভয়ে আধমরা হয়ে গেছে মেয়েটা। আয়নায় তাকিয়ে নিজের মুখটা দেখতে পাচ্ছে না। আমার কাছে সুবিধার মনে হচ্ছে না।’

‘কল্পনার রাজ্যে আছে ও,’ বলল হ্যারল্ড। ‘সব কিছুই ওর কল্পনা। পরীক্ষা না হয়ে যদি স্কুলে উৎসব হত দেখতে সে এমন করত না। আমি বাজি রেখে বলতে পারি।’

‘আমি জেনিকে বিশ্বাস করি। ডাক্তারকে খবর দিচ্ছি আমি।’

‘আমাকে আবার এর মধ্যে জড়িও না।’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল হ্যারল্ড। ওর গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। ওকে যতটুকু ভালবাসি ততটুকুই ঘৃণা করি।

ডাক্তার এল। কাঁদতে কাঁদতে সব কথা ওকে খুলে বলল জেনি। ডাক্তার ‘হ্যাঁ’, ‘হুঁ’ করে গেল। তারপর মুখ ফেরাল আমার দিকে। ‘বিছানায় শুইয়ে রেখো ওকে। এতে কিছুটা ভাল লাগবে।’ উঠে দাঁড়াল ডাক্তার। আমাকে বাইরে এনে একটা প্রেসক্রিপশন লিখল। বলল, ‘হালকা ঘুমের বড়ি এটা। পরীক্ষার সময় অনেক ছেলে মেয়েকে খাইয়ে ভাল ফলাফল পেয়েছি। ওষুধের দোকান থেকে নিয়ে এসো। দুপুরে একটা, বিকেলে একটা, শোয়ার সময় একটা, আবার কাল সকালে একটা দিও। দেখবে স্থির মনে পরীক্ষা দিতে পারছে ও।’

‘তোমার ধারণা স্নায়ুর উপর অতিরিক্ত চাপের জন্যে এটা হচ্ছে?’

‘আমার ধারণা তাই। বেশি পরিশ্রম করে ‘হিস্টিরিয়া’-তে আক্রান্ত হয়েছে। সন্ধ্যার দিকেই অনেকটা ভাল হয়ে যাবে। ওষুধগুলো যাতে ঠিকমত খায় সেদিকে লক্ষ রেখো। ভয়ের কিছু নেই। আশা করছি তাড়াতাড়িই ভাল হয়ে যাবে। অবস্থার উন্নতি না হলে আমাকে রিং কোরো।’

ডাক্তার চলে যাবার পর উপরে উঠলাম আমি। জেনিকে বললাম, ‘ওষুধ আনতে যাচ্ছি দোকানে। আধঘণ্টা লাগবে। একা একা থাকতে পারবে তো?’

‘পারব,’ বলল জেনি। ‘বিছানায় তো কোন ভয় নেই, তাই না?’

দুহাত বাড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল জেনি। ওর হাত দুটোকে খুব সরু মনে হলো। এখনও স্পষ্ট মনে আছে আমার, তার সেই উৎকণ্ঠায় ভরা গাঢ় আলিঙ্গন অন্য সব বারের চাইতে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ওষুধ আনতে বেরিয়ে গেলাম আমি। মেয়েটা যাতে বেশিক্ষণ একা একা না থাকে সেজন্যে প্রায় ছুটতে ছুটতে দোকানের দিকে গেলাম।

ফেরার সময় চিন্তায় এতটা মগ্ন ছিলাম যে লক্ষ করিনি মাথার উপর দিয়ে বিমান উড়ে যাচ্ছে। একটু পরেই তার প্রচণ্ড শব্দ কানে এল। তাকিয়ে দেখলাম খুব নিচু দিয়ে যাচ্ছে বিমানটা। ইঞ্জিনটা একবার বন্ধ হচ্ছে, একবার চলছে। গর্জনটাও সেই সাথে একবার কমছে, একবার বাড়ছে।

হঠাৎ ইঞ্জিনটা থেমে গেল। আর কোন শব্দ নেই? কী ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা। দেখলাম প্লেনটা সোজা নেমে এল। আমি যে রাস্তা ধরে এতক্ষণ হাঁটছিলাম তার ওপাশের বাড়িগুলোর পেছনে প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল। চমকে উঠলাম আমি। ওদিকেই তো আমাদের বাড়ি। আর ঠিক তখনই শুনতে পেলাম গগনবিদারী একটা আর্তনাদ।

ছুটতে লাগলাম আমি। এত দ্রুত এর আগে জীবনে ছুটিনি কখনও। যখন বাড়িতে পৌঁছলাম দেখলাম সেটা তখন একটা ধ্বংসস্তূপ মাত্র।

আগুন জ্বলছে পুরো বাড়িতে। লক লক করে বেড়ে উঠছে আগুনের শিখা। ভাঙা প্লেনটা ইঁট, পাথর ও কাঁচের সঙ্গে একত্রিত হয়ে পড়ে আছে মুখ থুবড়ে। এবং পড়ে আছে বিমান চালকের রক্ত-মাংস-হাড়। পুড়ছে চড় চড় করে। আর পড়ে আছে একটি নিঃসঙ্গ মেয়ে। আমার মেয়ে জেনি। মৃত।

এটাই হলো অনেক দিন আগের সেই ঘটনা। আমাকে দুঃস্বপ্নের মত তাড়া করে ফেরে। আমি খুঁজে পাইনি এ রহস্যের কোন সমাধান। দুঃসহ সেই স্মৃতি এখনও ডুকরে কাঁদে আমার বুকে। এখন বুঝতে পারছেন তো বিমানের শব্দ শুনলে কেন আমি এত ভয় পাই আর কেন শুনতে পাই অপার্থিব আর্তনাদ, যে আর্তনাদের শব্দ কেবল আমি একাই শুনি- আর কেউ শুনতে পায় না।

মূল: রোজমেরি টিমপারলি
রূপান্তর: মিজানুর রহমান কল্লোল