সমাধি – মাহবুবুর রহমান শিশির
সমাধি
সবুজ ঘাসে ছেয়ে যাওয়া গাড়ি বারান্দায় কনভার্টিবলের ব্রেক কষল জন বিশ্বাস, হাত বাড়িয়ে ইনিশন সুইচ অফ করে দিল
‘এসে গেছি,’ বলল সে। ‘আমার ছেলেবেলার বাড়ি। চোদ্দ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলাম— আর আজ আসা। তাও একেবারে বউসহ।’
‘এই বাড়ি!’ পলি বিশ্বাসের আয়ত চোখজোড়ায় বিস্ময় ফুটে উঠল সন্ধ্যার ম্লান আলোয় কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল সে জীর্ণ খিলান, ভাঙা জানালা আর জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়া প্রাচীন অবয়বটার দিকে। এই দোতলা কাঠামোটা আদৌ কোনওকালে সুদৃশ্য আর বসবাসের যোগ্য ছিল কিনা তা নিয়ে সন্দেহ জাগছে তার মনে।
অজস্র লতা-গুল্মে আচ্ছাদিত প্রাচীন ভবনটা শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধের মত মুখ ব্যাদান করে তাকিয়ে আছে। আশপাশে অসংখ্য ছোট-বড় ডোবা; নোংরা পানিতে নাম না জানা জলজ উদ্ভিদ। আবর্জনাপূর্ণ ডাস্টবিন যেন একেকটা। তরুণীর গা গুলিয়ে উঠল। ‘জন, তুমি ঠাট্টা করছ না তো?’
‘টাকা পয়সার ব্যাপারে কখনও ঠাট্টা করি না আমি,’ জন বিশ্বাস হালকা সুরে বলল। ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে এই সুদূর নুলিয়াছড়ির সাগর তীরের বাড়িতে খামোকা তোমাকে টেনে আনিনি, পলি। তুমি তো জানোই, আমার সমস্ত সম্পত্তি পেন্ডিং হয়ে পড়ে আছে। ওগুলোর দাবি আমি ছাড়তে পারি না।’
জন কথা শেষ করে গাড়ির দরজা খুলল। পেছনের সীট থেকে দুটো ব্যাগ উঠিয়ে নামল গাড়ি থেকে। দেখাদেখি পলিও।
‘বাড়ির যে ছিরি, এর ভেতর কী এমন লক্ষ টাকার সম্পত্তি রয়েছে তোমার?’ পলির কণ্ঠে অবিশ্বাসের স্পষ্ট ছোঁয়া।
জন বউকে আশ্বস্ত করল, ‘আছে-আছে। নইলে বড়দা টম বিশ্বাসের মরার খবর পেয়ে ছুটে আসি আমি? উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া লক্ষ লক্ষ টাকা আগলে রেখেছিল সে। বড়দা নেই, বেঁচে আছে ওই এমিলি বুড়িটা। আর আছি আমি। ভাইয়ের সম্পত্তি ভাই-ই তো দাবি করবে, তাই না? এখন চলো, বুড়ির সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।’
ব্যাগ দুটো বারান্দায় তুলে রাখল জন। ততক্ষণে দিনের আলো পুরোপুরি নিভে গেছে। ভুরু কুঁচকে আকাশের দিকে তাকাল জন। ঘন মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে সেখানে। খানিকটা যেন বেড়েও গেছে বাতাসের বেগ। অদূরে ঝাউগাছগুলো সশব্দে আন্দোলিত হচ্ছে। ঝড় উঠবে না তো আবার? জন কান পাতল। আরও যেন ভারী শোনাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন।
প্রায় অন্ধকারে ডুবে আছে বাড়িটা। কেবল একটা জানালার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আলোর আভাস দেখা যাচ্ছে। পায়ে পায়ে সেদিকে এগোল ওরা। নিঃশব্দে উঁকি দিল ভেতরে।
ঘরের ভেতরে ম্লান আলো। এককোণে একটা কাঠের পিয়ানোর ওপর রাখা কেরোসিনের ল্যাম্প থেকে মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়েছে। কালো গাউন পরা এক বৃদ্ধা বসে আছে পিয়ানোর সামনে। পাশেই রকিং চেয়ারে বসে মৃদু দোল খাচ্ছে আরেক বৃদ্ধা। তাঁর কোলে একটা খোলা বই।
কালো পোশাক পরিহিতা মৃদু সুর তুলছিল পিয়ানোতে। দু’জনেরই ঠোঁট নড়ছে। প্রার্থনা সংগীত গাইছে ওঁরা। জন আর পলি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল।
‘আমাদের সঙ্গ দাও, হে, প্রভু–’ তীক্ষ্ণ সুরে একজোড়া প্রাচীন কণ্ঠ বাজনার সাথে ক্রমশ এক হয়ে উঠল। ‘সাঁঝের আগমনের সাথে, যখন গাঢ়তর হয়ে ওঠে রাতের আঁধার, হে, প্রভু, আমাদের সঙ্গ দাও…’
জন বিশ্বাস ফিসফিস করে বলল, ‘ওই যে বুড়িটা পিয়ানো বাজাচ্ছে, ও-ই এমিলি চাচী। আর রকিং চেয়ার দুলছে, ও হলোগে মেরী চাচী। বহু বছর ধরে এ বাড়িতে ঘাপটি মেরে পড়ে আছে। সত্তুরের ওপর বয়স দু’জনেরই। আমাকে দেখে যা একটা শক্ পাবে না… ওরা জানে আমি অনেক আগেই মরে গেছি।’
সদর দরজাটা পাশেই, জন পা দিয়ে ঠেলা দিল। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল পাল্লা।
ভেতরটা ঠাণ্ডা আর গুমট। আসবাবপত্র সব প্রাচীন আমলের। দু’জনে ঘরে ঢুকতেই এমিলি চাচী ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। মুখ তুলল মেরী চাচী অসংখ্য বলি রেখায় কুঁচকে যাওয়া একজোড়া মুখমণ্ডলে ফুটে উঠল প্রশ্নবোধক ছাপ।
ততক্ষণে থেমে গেছে পিয়ানো। এমিলি চাচী শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘কে তোমরা? এই প্রাচীন জলদস্যুদের বাড়িতে কী চাও?’
‘আমি জন, এমিলি চাচী,’ জন ঘোষণা করল। ‘জন বিশ্বাস। তোমাকে দেখতে এসেছি।’
বৃদ্ধার মুখের ভাব এতটুকু বদলাল না। ‘জন মারা গেছে। পাঁচ বছর আগে ঢাকায় রোড অ্যাকসিডেন্টে মৃত্যু হয়েছে তার। খবরের কাগজে দেখেছি। টম পড়ে শুনিয়েছিল আমাকে।’
‘আমার নামের কেউ একজন মারা গিয়েছিল, এমিলি চাচী। আমি নই। ভাল করে দেখো, আমি বেঁচে আছি। আর এ হলো পলি। আমার স্ত্রী।’
‘আহ্!’ এমিলি চাচীর দৃষ্টি ঘুরে গেল পলির দিকে। ‘সুন্দর একটা পাখি দেখছি!’
‘শুনুন, আমি—’ পলি কথা শেষ করতে পারল না, জনের নীরব ইশারায় থেমে গেল।
‘কী সুন্দর মেয়ে, যদিও যতটা সুন্দরী হবার কথা ততটা নয়,’ এমিলি চাচী বলল। ‘ডাই করা লাল চুল, বাদামী চোখ। ডাইনী না তো? দুঃখজনক, সত্যিই দুঃখজনক! মেয়েটাও তো মারা গেছে।’
‘কী সব যা তা বকছেন, আমি মারা গেছি মানে?’ পলি রাগে ফেটে পড়ল। ‘জন! এ যে দেখছি পাগলের আখড়া! আগে জানলে কক্ষনো এখানে আসতাম না।’
‘শান্ত হও,’ বলল জন, যদিও এমিলি চাচীর ভাব দেখে মনে হলো না পলির কথাগুলো তার কানে গেছে।
‘অনেক ঢং হয়েছে, এমিলি চাচী,’ জন বলল। ‘দেখতেই তো পাচ্ছ- দুজনেই আমরা জীবিত।’
এবার যেন এমিলি চাচীকে একটু বিস্মিত হতে দেখা গেল। ‘জীবিতই যদি হও তবে কেন এসেছ এখানে? তোমার বাবা বলেছিলেন তুমি নাকি কখনও এ বাড়িমুখো হবে না- অবশ্য যদি না তোমাকে কবর দেয়ার প্রয়োজন হয়। তুমি কি কবরস্থ হতে এসেছ, জন?’
জন কঠিন সুরে বলল, ‘আমি এসেছি আমার সম্পত্তি কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিতে। দাদা মারা গেছে ছয় মাস হলো। বিশ্বাস বংশের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী এখন আমি, তুমি নও। কাজেই এ বাড়িতে যা ধন সম্পত্তি রয়েছে সব আমার।’
এমিলি চাচীর আঙুলগুলো হালকা ভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে পিয়ানোর গায়ে। রকিং চেয়ারে তখনও নির্জীব ভঙ্গিতে বসে আছে মেরী চাচী। খুদে একটা জন্তু যেন, কুতকুতে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখছে ওদের দিকে।
‘আচ্ছা! তুমি তা হলে জানো টম মারা গেছে। জানবেই তো। নিশ্চয়ই পরলোকে গিয়ে টম তোমার দেখা পেয়েছে। তাই হবে। মৃতরাই কেবল মৃতদের দেখতে পায়।’
‘ফালতু কথা অনেক হয়েছে, আর না।’ জন ততক্ষণে বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। ‘দু’জনেই আমরা ক্লান্ত। খিদেও লেগেছে বেশ। উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছি। এর মধ্যে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করো। …পলি, ল্যাম্পটা হাতে নাও। বিড়ালের চোখ ওঁদের, অন্ধকারে গায়ে লাগবে না।’
ব্যাগ দুটো তুলে জন হাঁটা শুরু করল। বাতি হাতে পলি দ্রুত তাকে অনুসরণ করতে লাগল। পেছন থেকে এমিলি চাচীর গলা শুনতে পেল ওরা।
‘ওদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করো, মেরী। অবশ্য ওরা যদি ভান করতে চায় ওরা বেঁচে আছে… কী আর করা! তবে আমি ভেবে অবাক হচ্ছি মেয়েটার মৃত্যু হলো কীভাবে? আহা, বেচারি!’
দোতলার ড্রইংরুমে ওদের জন্যে নাস্তার আয়োজন করল মেরী চাচী। ওমলেট, সালাদ, রুটি আর চা। ঘরটা প্রশস্ত, এক পাশে লম্বা দরজা। পায়ের নীচে জীর্ণ কার্পেট। জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। এক কোণে রাখা ডাইনিং টেবিলটার অবস্থাও করুণ। ঘুণে ধরা; একটু নাড়া লাগলেই মনে হয় এই বুঝি কোমর ভেঙে ধসে পড়বে।
দেয়ালে কতগুলো অয়েল পেইন্টিং ঝোলানো- বিশ্বাস বংশের পূর্ব পুরুষদের ছবি ওগুলো। ল্যাম্পের ম্লান আলোয় স্থির চোখগুলো তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। ধূর্ত, ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টি।
পেটে খাবার পড়তেই প্রসন্ন হয়ে উঠল জনের মন। পলিও ইতিমধ্যে খানিকটা সামলে উঠেছে- যদিও পুরোপুরি ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারেনি এখনও। খানিক পরপরই ঝড়ো হাওয়া ছাপিয়ে প্যাঁচার অশুভ ডাক শোনা যাচ্ছে। থেকে থেকে চমকে উঠছে তরুণী।
‘জন, এখানে আমরা থাকতে পারব না,’ অবশেষে দ্বিধা কাটিয়ে বলে উঠল সে। ‘আমার শখ মিটে গেছে, এই ভূতুড়ে পরিবেশ একেবারে সহ্য হচ্ছে না। তুমি না বলেছিলে কক্সবাজারের কোথায় তোমার বাপদাদার ভিটে- অথচ নিয়ে এলে কোথায়?’
‘নুলিয়াছড়ি কক্সবাজার থেকে বেশি দূরে নিশ্চয়ই নয়,’ জন বলল। মাত্র এক ঘণ্টার রাস্তা।’
‘এক ঘণ্টা না কচু! মনে হচ্ছে কক্সবাজার থেকে একহাজার মাইল দূরে চলে এসেছি।’
‘আজকের রাতটাই তো, সোনা,’ জন সান্ত্বনার সুরে বলল। ‘আগামীকাল সকাল নাগাদ সমস্ত সম্পত্তি আমার হাতের মুঠোয় এসে পড়বে। তারপর এক মুহূর্তও এই প্রেতপুরীতে নয়- সোজা ঢাকার পথে হাওয়া হয়ে যাব।’
‘যত জলদি সম্ভব এখান থেকে সরে পড়া যায় ততই ভাল।’ পলির গলা একটু কেঁপে উঠল। জোর দিয়ে বলল, ‘তবে আমি বলছি এখানে কোনও টাকা পয়সা নেই। থাকতে পারে না।’
‘আছে। থাকতেই হবে,’ জন চায়ে চিনি ঢালতে ঢালতে বলল। ‘বিশ্বাস বংশের সব কথা পুরোপুরি কখনও বলেছি তোমাকে? আমার গ্রেট-গ্রেট-গ্র্যান্ড ফাদার ছিলেন একজন দুর্ধর্ষ জলদস্যু। কক্সবাজার, মহেশখালি, টেকনাফ এমনকী সুদূর বার্মার সমুদ্র সীমানাতেও জলদস্যুতা করে বেড়াতেন তিনি।
‘এক সময় এই জায়গাটা তাঁর নজরে পড়ে। নির্জন, নিরিবিলি পরিবেশ। লোকালয়ও তখন ছিল বহু দূরে। নৌপুলিশ ধাওয়া করলেও এখানে এসে গা ঢাকা দেয়া যাবে। কাজেই এখানে বাড়িটা তুললেন তিনি। ডাকাতি করে বহু টাকার মালিক হয়েছিলেন, পরবর্তী বংশধরেরা এখনও তা খেয়ে শেষ করতে পারেনি। ওই সব টাকা পয়সার অবশিষ্টাংশ এখনও পড়ে আছে এই বাড়ির কোথাও। বিশ্বাস বংশের কেউ ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখতে ভরসা পেত না। এখন বড় ভাই না থাকায় বুড়িটা নিশ্চয়ই সবকিছু আগলে বসে আছে।’
‘কিন্তু অত সহজে বুড়ি তোমাকে এক কানা কড়িও দেবে না। তোমাকে ঘৃণা করে সে।’
‘আর কোনও উপায়ও তার নেই।’ জন হাসল। ‘আমার দ্বাদশ জন্মবার্ষিকীর দিন থেকেই এমিলি চাচী আমার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। ওই একই দিনে আমার দাদু জুলস বিশ্বাসকে কবর দেয়া হয়েছিল। একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছিল সেদিন। কবর দেয়ার সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে যাবার পরে কী এক কারণে তাঁর কফিনের ডালাটা খুলতে হয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপারটা ধরা পড়ে তখনই। দাদুর লাশটা উপুড় হয়ে পড়েছিল। অথচ পরিষ্কার খেয়াল আছে, কফিনে লাশটা চিৎ করেই শোয়ানো হয়েছিল।’
‘জ-ন!’
‘ডোন্ট বি আপ্সেট, হানি। বিশ্বাসদের ইতিহাস ঘাঁটলে এরকম অনেক উদ্ভট, ব্যাখ্যাতীত ঘটনার মুখোমুখি হবে তুমি। বাবার কথাই বলি। তাঁকে যখন কবর দেয়া হয়, তাঁর কফিনের ভেতর একটা টেলিফোন সেট ভরে রাখা হয়েছিল। সত্যিকারের টেলিফোন; সচল। বাবা ভেবেছিলেন মৃত্যুর পরেও যদি তিনি কফিন থেকে বেরিয়ে আসতে চান, সেক্ষেত্রে টেলিফোনটা তাঁর কাজে আসবে। মরার আগে সেরকমটাই বলে গিয়েছিলেন তিনি। …পলি, একবার জানালার কাছে এসো তো। জিনিসটা তোমাকে দেখানো দরকার।
জন চেয়ার ছেড়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল, রশি টেনে সামান্য ফাঁক করল পর্দা। এখান থেকে বাড়ির পেছনটা দেখা যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার, একটু একটু বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেছে। তবু প্রায় একশো গজ দূরে আবছা সাদা অবয়বটা ঠিকই পলির চোখে পড়ল। কোনও দেয়াল টেয়াল হবে হয়তো, অনুমান করল পলি। কিছু বলতে যাচ্ছিল জন, থেমে গেল। অকস্মাৎ ঢাকা পড়ে গেল দেয়ালের খানিকটা অংশ, একটা ছায়ামূর্তির উদয় ঘটল সেখানে। অন্ধকারে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। ধীর পায়ে ছায়ামূর্তিটা এগোচ্ছে বাড়ির দিকে।
‘এমিলি চাচী!’ জন অবাক হয়ে বলল। বুড়ি গোরস্থানে কী করতে ঢুকেছিল?’
‘গোরস্থান?’
‘বাড়ির আশেপাশে এত জলাভূমি যে বিশ্বাসদের কফিন মাটিতে পোঁতার রেওয়াজ কখনও হয়নি। সেজন্যেই ওই স্পেশাল ব্যবস্থা। ওই যে আবছামত ঘরটা দেখা যাচ্ছে, মার্বেল পাথরের তৈরি দুইস্তর বিশিষ্ট ভল্ট ওটা। নীচের স্তরটা মাটির তলায়- সিঁড়ির ব্যবস্থা আছে নামার জন্যে। আমার প্রয়াত দাদু একটা হাইড আউট হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে বানিয়েছিলেন ওটা, যদিও শেষ পর্যন্ত পারিবারিক কবরখানা হিসেবে টিকে গেছে।’
অকস্মাৎ সবকিছু আলোকিত করে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। এক সেকেন্ড পরেই সশব্দে বাজ পড়ল কোথাও। দ্রুত কানচাপা দিল পলি।
আরও ফুঁসে উঠেছে বাতাস।
‘ঝড় আসছে, বৃষ্টিও বেড়ে যাবে মনে হয়,’ জন বলল। ফিরে এসে চেয়ার টেনে বসল আবার। ‘ওয়েদার ব্রডকাস্টিং-এও এমনটাই বলা হয়েছিল। সমস্যাটা কী জানো, মুষলধারে বৃষ্টি হলে বাড়ির চারদিকটা দুই থেকে তিনফুট পানির নীচে তলিয়ে যায়। বৃষ্টি থেমে যাবার পরেও পানি নেমে যেতে প্রায় দুই দিন সময় নেয়। পুরো বাড়িটা তখন দ্বীপের মত ভেসে থাকে। বলা যায় না, সে রকম কিছু হলে আমাদের হয়তো পানিবন্দী হয়েই থাকতে হবে।’
‘জন, না! যেভাবেই হোক কালই এ বাড়ি ছাড়ব আমরা। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
‘টেক ইট ইজি, ওরকম না-ও তো হতে পারে… যাকগে, তোমাকে তো এমিলি চাচীর কথা বলছিলাম। যেদিন দাদুকে ওই ভল্টের নীচে কবর দেয়া হয়, এমিলি চাচীই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সবাই ভল্ট থেকে বেরিয়ে আসার পরে চুপিসারে ভেতরে ঢুকেছিলেন। আমি তখন কচি খোকা। অনেকটা বেখেয়ালেই ভল্টের প্রবেশ দ্বার লক্ করে দিয়েছিলাম। বাড়ি ভর্তি লোকজন, অথচ পরদিন সকাল পর্যন্ত কেউই এমিলি চাচীর অনুপস্থিতি টের পায়নি। পুরো একটা রাত ওই ভল্টে আটকে ছিল বুড়ি। এবং ওই রাতেই নাকি সে শুনতে পেয়েছিল দাদুর কণ্ঠস্বর। কফিন থেকে মুক্তি পাবার জন্যে সাহায্য চাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু এমিলি চাচী সে অনুরোধে কান দেয়নি। তাঁর যুক্তি হচ্ছে মরা লোকের ডাকে কান দেবার কোনও মানে হয় না। যা হোক, ওই দিন থেকে তার মনে ধারণা জন্মায় যে সে মৃতদের সাথে কথা বলতে সক্ষম।’
‘জন!’ সাদা হয়ে গেছে পলির মুখ, থর থর করে কাঁপছে সে। ‘তুমি-’
‘মনে করো ঠাট্টা করছি তোমার সাথে।’ জন মৃদু হাসল। ‘গল্পের শেষ এখনও হয়নি। দাদুর সাথে চাচীর কথোপকথন সংক্রান্ত এই গল্পে প্রথমে কেউ কান দেয়নি। কিন্তু শেষমেশ কৌতূহল জন্মাল বাবার মনে। ভল্টের ভেতর ঢুকে দাদুর কফিনের ডালাটা খুললেন তিনি। সবাই আমরা দেখলাম দৃশ্যটা। উপুড় হয়ে পড়ে আছে দাদু। ডালার গায়েও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে নখের আঁচড়ের চিহ্ন।’
‘জন, স্টপ ইট্!’ পলি আর্তনাদ করে উঠল। ‘আমি- আমি অসুস্থ বোধ করছি, জন। ঈশ্বরের দোহাই, বন্ধ করো এসব ভূতুড়ে গল্প। আর সহ্য হচ্ছে না আমার-’ দু’হাতে মুখ ঢাকল সে।
‘প্রায় শেষ হয়ে এসেছে গল্প। যদিও এর প্রতিটি কথাই সত্যি। দাদুর কাণ্ড দেখে বাবা বোধহয় বেশ ঘাবড়েই গিয়েছিলেন। কোনও রিস্ক নিতে চাননি উনি। তাঁর নির্দেশেই মৃত্যুর পরে তাঁর কফিনে টেলিফোনটা রাখা হয়। ঠিক তাঁর মাথার পাশেই… প্রয়োজনে যাতে তিনি ফোনের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে পারেন। আচ্ছা, এসব প্রসঙ্গ থাক। আমরা এখন এমিলি চাচীর সাথে কথা বলব। তার আগে অবশ্য একটা জরুরী কাজ সারতে হবে।’
জন আসন ছেড়ে দেয়ালের ধারে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে বাবার পোর্ট্রেটটা নামাল সে। এখন সেখানে একটা আয়রন সেফ্ দেখা যাচ্ছে। মুখটা বন্ধ। জন কম্বিনেশন মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রায় সাথে সাথেই খুট্ করে খুলে গেল সেফের ডালা।
‘সেই পুরানো কম্বিনেশনই রয়ে গেছে দেখছি!’ জনের কণ্ঠে উল্লাস। ‘শেষবার এটা খুলেছিলাম এ বাড়ি ছেড়ে যাবার আগের রাতে। একেবারে খালি পকেটে তো আর গৃহত্যাগ করা যায় না, কী বলো? এখন দেখি কী পাওয়া যায় এর ভেতর।’
ক্যাশবাক্সটা টেনে বের করে টেবিলের ওপর রাখল সে। ড্রয়ারটা খুলতে বেশ বেগ পেতে হলো তাকে। অবশেষে ক্ষিপ্র হাতে ভেতর থেকে একটুকরো কাগজ বের করল জন। ভাঁজ খুলে দ্রুত চোখ বুলাল। অকস্মাৎ পেছনে কারও পায়ের শব্দ কানে যেতেই ঝট্ করে মুখ তুলল সে। ঘাড় ঘুরে গেল দু’জনেরই। এমিলি বিশ্বাসকে দেখা গেল দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে।
‘কী করছ, জন? কেন তুমি তোমার বাবার আয়রন সেফে হাত দিলে?’
‘কৌতূহল, এমিলি চাচী,’ জন মৃদু সুরে বলল। ‘দারুণ ইন্টারেস্টিং একটা ডকুমেন্ট।’ হাতের কাগজটা নাড়ল সে। ‘মানি রিসিপ্টের ডুপ্লিকেট কপি এটা। বলছে টমের যাবতীয় সম্পত্তির সেটেলমেন্ট বাবদ কোন্ এক চৌধুরী অ্যান্ড চৌধুরী মাস পাঁচেক আগে নগদ এক কোটি টাকা তোমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।’
‘ঠিক, জন। কিন্তু তাতে হলোটা কী?’
‘হলো কী মানে?’ জন খেঁকিয়ে উঠল। ‘টাকাটা আমার। আমি চাই ওই টাকা। কোথায় রেখেছ?’
‘নিরাপদে আছে, জন,’ নির্বিকার মুখে বলল এমিলি চাচী। ‘নিরাপদেই আছে। তা তুমি যখন নিজেকে এতই চালাক ভেবে থাকো, নিজেই খুঁজে বের করছ না কেন?’
‘খুঁজবই তো। আরেকটা কথা- কিছুক্ষণ আগে ভল্টের ভেতর ঢুকেছিলে কেন তুমি?’
‘তোমার ভাই টমের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম। ঠাণ্ডা কফিনের ভেতরে বাছা আমার একাকী শুয়ে আছে, একটু গল্পগুজব করে ওকে চাঙ্গা করে তুললাম আর কী। যেভাবে প্রায়ই আমি কথা বলি তোমার বাবার সাথে, তোমার দাদুর সাথে… জন, বুঝেছ, তোমার দাদুর সাথে।’
‘জন, ওঁকে চুপ করতে বলো!’ পলি চিৎকার করে উঠল। ‘বন্ধ করতে বলো এসব স্টুপিড্ কথাবার্তা!’
‘গালগল্প অনেক হয়েছে, এমিলি চাচী,’ জন গলা চড়াল। ‘এখন সোজাসাপ্টা বলো, টাকাগুলো কোথায় রেখেছ?’
বুড়ি ধূর্ত দৃষ্টি মেলে সরাসরি জনের চোখে চোখ রাখল।
‘কেন টাকা চাইছ, জন? তুমি তো মৃত। মরা মানুষ টাকা দিয়ে কী করবে?’
জোরে শ্বাস টানল জন।
‘ঠিক আছে, এমিলি চাচী, তুমিই আমাকে বাধ্য করলে কঠিন হতে। এখন আমি কী করব জানো? এই চেয়ারটার সাথে তোমাকে কষে বেঁধে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরব তোমার কপালে।’
‘হুমকি দেয়ার কোনও প্রয়োজন নেই, জন। আমি বলব টাকার হদিস। একটু আগে টমের সাথে এ নিয়েই তো কথা হলো। টাকার কথা তোমাকে জানাতে ওরও নাকি কোনও আপত্তি নেই।’
‘তাই? শুনে কৃতার্থ হলাম। তা হলে বলো তাড়াতাড়ি!’
‘ওই ভল্টের ভেতরই। যেখানে খোঁজার কথা চোরেরও মনে আসবে না। ভল্টের নীচে যেখানে তোমার পূর্বপুরুষরা সবাই ঘুমিয়ে আছে— তোমার দাদু, তোমার বাবা, তোমার ভাই… ওখানেই তোমার জন্যেও একটা শূন্য কফিন অপেক্ষা করছে, জন! টাকাগুলোও আমি ওখানে রেখেছি— তোমার কফিনের ভেতর।’
জন হো হো করে হেসে উঠল
‘এক কোটি টাকা কিনা অপেক্ষা করছে আমার নিজেরই কফিনের ভেতরে। বলেছিলাম না, পলি, বিশ্বাস বংশের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা!’
‘চলো এক্ষুণি যাই,’ প্রায় মিনতি ভরা কণ্ঠে পলি বলল। ‘পানি বাড়ার আগেই এসো কাজ শেষ করে ফেলি।’
‘হ্যাঁ, জন, তোমাকে দ্রুত কাজ সারতে হবে।’ অদ্ভুত ঠাণ্ডা শোনাল এমিলি চাচীর কণ্ঠ। ‘বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছ না? খেয়াল করেছ কী রকম বইছে দমকা হাওয়া? পানি বাড়ছে, জন। হয়তো এরই মধ্যে নীচের ভল্টে পানি জমে গেছে। অবাক হয়ো না। এককালে ওয়াটার প্রুফ করে বানানো হলেও ভল্টের অবস্থা এখন আর সেরকম নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি ভেতরে ঢুকে পড়ে।’
‘ঠিক বলেছ, এমিলি চাচী, সত্যিই সময় বেশি নেই,’ জন বলল। ‘আর হ্যাঁ, যদি এতটুকু মিথ্যে বলে থাকো তো পরে পস্তাবে তুমি।’
‘একটা মরা মানুষের সাথে কেন আমি মিথ্যে বলতে যাব, জন? একবার যদি স্বীকার করতে তুমি মৃত- তুমি আর তোমার সঙ্গিনী- বিশ্বাস করো আমরা বন্ধু হতে পারতাম। গল্প করে চমৎকার সময় কাটত আমাদের। যেমনটা কাটাই আমি টমের সাথে।’
‘জন!’ পলি তাড়া লাগাল। ‘তুমি নড়বে এখান থেকে? পাগল হবার আগে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তে চাই আমি।’
‘হ্যাঁ, চলো। তার আগে নীচের রান্নাঘর থেকে কুড়ালটা নিয়ে নিই। আর হ্যাঁ, মনে করে গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে টর্চটাও বের করে নিয়ো।’
.
বাজ পড়ার বিকট শব্দ হলো। এবার আরও কাছে। পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল একবার। বাইরে ততক্ষণে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টির ধারা নেমেছে। অদূরে ঝাউগাছগুলো যেন পাগলের মত উড়ে যেতে চাইছে। কেবল মার্বেল পাথরের তৈরি ভল্টের ভেতরে ঢোকার পরেই একটু নিরাপদ বোধ করল ওরা। যদিও জায়গাটা স্যাতসেঁতে আর ঠাণ্ডা। বদ্ধ বাতাসে ভারী, গুমট গন্ধ।
অন্ধকার চিরে জ্বলে উঠল জনের টর্চ। পাথরের দেয়ালে খাঁজ কেটে কতগুলো তাক বানানো হয়েছে। কয়েকটা খালি, বাকিগুলো ভরা হয়েছে কফিন দিয়ে।
‘বিশ্বাস বংশের মহিলা আর শিশুদের এখানে কবর দেয়া হয়েছে,’ গম গম করে উঠল জনের কণ্ঠ, ভৌতিক আর অপার্থিব শোনাল পলির কানে। জন বলে চলল, ‘আর পুরুষরা শুয়ে আছে নীচের ভল্টে। পাথরের একটা স্ল্যাব ফাঁক করে ভেতরে ঢুকতে হবে আমাদের। ওটা সরাব এখন, তুমি বরং টর্চটা ধরো।’
জন দেয়াল ঘেঁষে এক কোণে হাঁটু গেড়ে বসল। দ্রুত হাত বুলোতে লাগল দেয়ালের গায়ে। কী যেন খুঁজছে সে… ক্লীক করে শব্দ হলো একবার। পলি বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল জনের সামনে পাথুরে মাটিতে চিড় ধরেছে। এরপরের দৃশ্যটা দেখার জন্যে প্রস্তুত ছিল না মেয়েটা। আর একটু হলে টর্চটা হাত থেকে পড়েই যাচ্ছিল। কর্কশ, ধাতব প্রতিবাদ করে ধীরে ধীরে ফাঁক হতে লাগল পাথরটা। একটা আয়তাকার সুড়ঙ্গের সৃষ্টি হলো সেখানে। থেমে গেল ভোঁতা গর্জন। পলি ভয়চকিত দৃষ্টিতে তাকাল সুড়ঙ্গের মুখে। এক টুকরো অশুভ অন্ধকার বাসা বেঁধে আছে সেখানে।
‘ওকে,’ জন সন্তুষ্ট চিত্তে বলল। পলির হাত থেকে টর্চ নিয়ে ভেতরে আলো ফেলল সে। পাথরের তৈরি রুক্ষ, এবড়োখেবড়ো, অমসৃণ সিঁড়িটা হারিয়ে গেছে পাতালে। ‘আমার পেছন পেছন এসো, পলি। বেসমেন্টে রাখা সেফ ডিপোজিট বাক্স হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের।’
করুণ শোনাল পলির কণ্ঠ। ‘জন, তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি না হয় এখানেই অপেক্ষা করি। ভেতরে নিশ্চয়ই খুব ঠাণ্ডা। আমার সহ্য হবে না।’
‘সামান্য ঠাণ্ডায় তোমার সোনার যৌবন ক্ষয় হবে না, ডার্লিং! চলো, চলো- ভেতরে তোমারও কাজ আছে। টর্চ ধরে থাকবে তুমি… দাঁড়িয়ে রইলে কেন? চলো!’ জন তাড়া লাগাল। একটা পা তার ততক্ষণে সুড়ঙ্গের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে। দুই হাতে দুই পাথুরে প্রান্ত ধরে আস্তে আস্তে গোটা শরীরটা ভেতরে নিয়ে এল সে, কয়েক ধাপ নেমে পলিকে ঢোকার রাস্তা করে দিল। একই ভঙ্গিতে পলিও অনুসরণ করল তাকে। কাঁপছে সে, একটু ঝুঁকে খামচে ধরল জনের কাঁধ। নরম মাংসে প্রায় গেঁথে গেল পলির নখ। ধীরে ধীরে আন্ডারগ্রাউন্ড ভল্টে নেমে এল ওরা। কফিনের সংখ্যা এখানে অনেক কম। মাত্র পাঁচটা, মেঝের ওপর সারি বেঁধে রাখা হয়েছে।
পাথর চুইয়ে বৃষ্টির পানি ভল্টের কঠিন মেঝেতে এসে জমেছে। এরই মধ্যে দুই ইঞ্চি পুরু হয়ে উঠেছে পানির স্তর। নোংরা, তেলতেলে রং, পলির গা গুলিয়ে উঠল।
সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে থেকেই বলে উঠল সে, ‘প্লীজ, জন, আমি এখান থেকেই টর্চ ধরি। তোমার কোনও অসুবিধা হবে না, দেখো।’
‘ঠিক আছে।’ জন শ্রাগ করল। ‘এদিকে একটু আলোটা ফেলো তো… গুড, হয়েছে… এই তো বড় বাবার কফিন। এর ঠিক পাশে… হুম্, দাদুর কফিন…’ জন আপন মনে বলে চলল, ‘দাদু জুলস বিশ্বাস- এই ব্যাটার লাশই তো কফিনের ভেতর আপনাআপনি উল্টে গিয়েছিল- জন্ম ১৮৯৬, মৃত্যু ১৯৭৪।’ জন কফিনের গায়ে আটকানো পেতলের নেম প্লেটটা পড়ল। ‘আর এই তো বাবার কফিন… এখনও নিশ্চয়ই ভেতরে রয়েছে টেলিফোনটা পিটার বিশ্বাস। জন্ম ১৯৩০, মৃত্যু ১৯৯২। এর পরেরটা বড় ভাইয়ের কফিন দেখছি। …আরে, আরে, এটার গায়ে দেখছি আমার নাম লেখা। নিশ্চয়ই আমার জন্যে রাখা হয়েছে… জন বিশ্বাস। জন্ম ১৯৬২-’
হঠাৎ থেমে গেল জন। একটু কেঁপে উঠল সে। পলি ব্যগ্র কণ্ঠে বলল, ‘কী হলো, জন?’
জন সামলে নিল নিজেকে। শান্ত স্বরে বলল, ‘এ নিশ্চয়ই এমিলি চাচীর ফাজলামো আর কী! নেম প্লেটে লেখা আছে- জন বিশ্বাস। জন্ম ১৯৬২, মৃত্যু ১৯৯৯। ছুরি দিয়ে আঁচড় কেটে লেখা। বোঝাই যাচ্ছে খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে সারা হয়েছে কাজটা। দাঁড়াও, বের হয়ে নিই একবার। বুড়িটার সাথে একটা বোঝাপড়া না করলেই নয়…
‘এ নিয়ে আর সময় নষ্ট কোরো না, লক্ষ্মীটি। এসব এখন কোনও জরুরী ব্যাপার নয়। আগে টাকাগুলো বের করো। প্লীজ, জন, প্লীজ! এই নরকে আমি আর বেশিক্ষণ টিকতে পারব না।’
‘আচ্ছা-আচ্ছা,’ জন অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলল। ‘আমি কফিন খুলছি। তুমি আলোটা ভাল করে ফেলো এদিকে।’
দ্রুত কফিনের সবগুলো স্ক্রু খুলে ফেলল জন। নোংরা পানিতে হাঁটু ডুবিয়ে অনেক কষ্টে ডালাটা এক পাশে সরাল। টর্চ ধরা হাতটা আরও খানিকটা সামনে বাড়াল পলি। নিমেষে সমস্ত শঙ্কা দূর হয়ে গেছে তার। জনের মত তাকেও গ্রাস করেছে লোভ আর উত্তেজনা।
কফিনের ভেতর থরে থরে সাজানো নোটের বান্ডিল। বোঝাই যায় অনেক যত্ন নিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ওগুলো। টাকার একটা বান্ডিল হাতে নিল জন, দ্রুত হিসেব করতে লাগল।
‘একশোটা পাঁচশো টাকার নোট… তার মানে প্রতি বান্ডিলে পঞ্চাশ হাজার… মোট দু’শোটা বান্ডিল… অর্থাৎ এক কোটি টাকা… মাই গড়! এমিলি চাচী তা হলে মিথ্যে বলেনি। এখন বয়ে নিই কীভাবে? দি আইডিয়া…!’
জন ক্ষিপ্র হাতে পুরনো জ্যাকেটটা খুলে ফেলল।
এবার হয়েছে,’ হাতের জ্যাকেটটা ঝোলার মত দুলোতে দুলোতে বলল সে। ‘হাত লাগাও, পলি! পানিতে পা ডুবোতে আর লজ্জা কোরো না। এক কোটি টাকার জন্যে খানিকটা সর্দি ঝরলে কী-বা যায় আসে!’
পলি সন্তর্পণে নোংরা পানিতে এসে দাঁড়াল। জনের দিকে এক পা বাড়িয়েছে মাত্র, অকস্মাৎ সিঁড়ির মাথায় মৃদু ক্লীক শব্দ হতেই পাথরের মত জমে গেল সে।
পরক্ষণেই খানিক আগে শোনা সেই পরিচিত কর্কশ শব্দ তুলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল সুড়ঙ্গের মুখ।
পলি আর্তনাদ করে উঠল। পাথরের ভারী দেয়ালে বাড়ি খেয়ে দ্বিগুণ গতিতে ফিরে এল তার চিৎকার। কেঁপে উঠল ভল্টের বদ্ধ পরিবেশ।
শরীরের সমস্ত রোম খাড়া হয়ে গেল জনের।
‘এমিলি চাচী!’ সে-ও গলা ফাটিয়ে ডাকল। ‘হারামজাদী বুড়ি নিশ্চয়ই স্ল্যাবটা টেনে দিয়েছে!’
পানিতে থপ্ থপ্ শব্দ তুলে দৌড় দিল জন, দ্রুত উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে। প্রবেশমুখটা বন্ধ। মার্বেল পাথরে হাত রাখল সে, একটু একটু করে চাপ বাড়াতে লাগল। এক চুলও আল্ল্গা হলো না ওটা।
শরীরের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে জন… মুখের রং বদলে অস্বাভাবিক লাল হয়ে উঠল দেখতে দেখতে। ঘেমে নেয়ে গেছে গোটা শরীর।
‘এমিলি চাচী! এমিলি চাচী!’ জন আবার পাগলের মত চিৎকার করে উঠল।
অনেক দূরে কে যেন খখনে গলায় হেসে উঠল। ক্রমশ আরও দূরে সরে যাচ্ছে। পেছনে ছড়িয়ে যাচ্ছে এক রাশ আতঙ্ক।
‘জন!’ পলির গলা কাঁপছে। ‘জন, ওই বুড়িটা আমাদের আটকে দিয়েছে। ইঁদুরের গর্তে বন্দী হয়েছি আমরা। কখনও আর এখান থেকে বের হতে পারব না- কক্ষনো না- না-’
পলির গলা আটকে গেল, হিস্টিরিয়া রুগীর মত সারা দেহ কাঁপছে তার। স্থির রাখতে পারছে না নিজেকে- সে চেষ্টাও করছে না। জন তাড়াতাড়ি নেমে এসে ধরল তাকে। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে ওকে দেখল পলি।
‘শান্ত হও!’ জোরে বারকয়েক ঝাঁকি দিল তাকে জন। ‘এভাবে কাঁপাকাঁপি করলে কোনও লাভ হবে না। নিশ্চয়ই বুড়ি ঠাট্টা করছে আমাদের সাথে। তবে আমরাও বসে থাকব না। কুঠারটা তো রয়েছেই। তুমি টর্চ ধরে রাখো। আমি স্ল্যাবটা ভাঙতে যাচ্ছি।’
ঘোর লাগা ভাবটুকু খানিকটা কেটে গেছে, লক্ষ্মী মেয়ের মত মাথা নাড়ল পলি। এদিকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে শক্ত পাথরের গায়ে জন সর্বশক্তি প্রয়োগ করে কুঠার চালাতে লাগল। পাথরের মিহি গুঁড়ো এসে পড়ছে তার চোখে মুখে, পাত্তা দিল না সে। দ্বিগুণ উৎসাহে একের পর এক বাড়ি মেরে যাচ্ছে।
পাথরে নয়, কখন যেন চিড় ধরেছে কুঠারের হাতলে, জন খেয়াল করেনি। অকস্মাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগে তার হাত থেকে ছুটে গেল কুঠারটা, উড়ে গিয়ে পড়ল অন্ধকারে পানির নীচে।
‘খোঁজো ওটা!’ জন চিৎকার করে উঠল। পলি পানি উপেক্ষা করে মেঝেতে হাত ডোবাল।
‘পাচ্ছি না, জন!’ খানিকক্ষণ হাতিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল সে। ‘সত্যি আমি ওটা খুঁজে পাচ্ছি না।’
খ্যাপার মত নেমে এল জন, পানিতে হাত আর হাঁটু ডুবিয়ে দিল। হামা দিয়ে পাগলের মত খুঁজতে লাগল কুঠারটা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ওভাবে সঙের মত দাঁড়িয়ে থেকো না। ঘেন্না পিত্তির সময় না এখন। হাত লাগাও, খোঁজো!’
অগত্যা ইতস্তত ভাবটা ঝেড়ে ফেলতে হলো পলিকে, জনের মত সেও উবু হয়ে পানি হাতড়াতে শুরু করল। সম্পূর্ণ বদলে গেছে ওদের চেহারা। অবিন্যস্ত চুল, নোংরা পানি লেগে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে পরনের পোশাক। অবশেষে পলিই খুঁজে পেল কুঠারটা। ওর হাত থেকে একরকম কেড়েই নিল ওটা জন। আবার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল সে। বাড়ি লাগাল শক্ত পাথরের গায়ে।
ঝাড়া পনেরো মিনিট একনাগাড়ে বাড়ি মেরে অবশেষে থামল জন। প্রচণ্ড হতাশা আর ক্লান্তিতে ঝুলে পড়ল মাথা। পাথরের গায়ে সামান্য আঁচড়ের সৃষ্টি হয়েছে মাত্র। আশান্বিত হবার মত কিছু না।
‘তিন ইঞ্চি,’ জন নির্লিপ্ত সুরে বলল। ‘এভাবে কাজ হবে না। কম করেও তিন ইঞ্চি পুরু স্ল্যাব।’ থেমে গেল সে। কপাল কুঁচকে কী যেন ভাবল কিছুক্ষণ। হঠাৎ পাগলের মত হেসে উঠল ও কোনওরকম জানান না দিয়েই। হাসতে হাসতেই একরকম গড়িয়ে নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে। দাঁড়াল পলির সামনে।
‘বাবা!’ কোনওরকমে হাসি চেপে জন বলে উঠল, ‘মানে বাবার কফিনে- সত্যি বলছি… দেখবে এসো।’
জনের নির্দেশিত কফিনের ওপর টর্চ মেলল পলি। চকচক করে উঠল পেতলের নেম প্লেট। পিটার বিশ্বাস। জন্ম ১৯৩০, মৃত্যু ১৯৯২। টেলিফোনের তারটাও পরক্ষণেই নজরে পড়ল তার। কফিনের গায়ে তৈরি একটা সূক্ষ্ম ছিদ্রপথ থেকে বেরিয়ে এসে হারিয়ে গেছে অন্ধকারে। এদিকে কফিনের ওপর প্রায় হামলে পড়ল জন। জং ধরেছে স্ক্রুগুলোতে। বেশ সময় নিল ওগুলো ছাড়াতে। অবশেষে ডালাটা একপাশে সরিয়ে দিল জন। অস্ফুট শব্দ করে উঠল পলি। থর থর করে কাঁপছে সে। ওর দিকে তখন খেয়াল নেই জনের। বিজয় উল্লাসে জ্বলজ্বল করছে তার চোখজোড়া।
পিটার বিশ্বাস শুয়ে আছে- বলা ভাল তাঁর কঙ্কালটা। যদিও প্রায় পুরোটাই ঢাকা পড়ে গেছে পরনের শতচ্ছিন্ন কালো গাউনে। টর্চের আলোতে চক চক করছে খুলি। এখনও ক’গাছি চুল গেঁথে আছে সেখানে।
নিষ্প্রাণ একজোড়া অক্ষিবিহীন কোটর সরাসরি তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। পলির মনে হলো ওর বুকের ভেতরটা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। মাংসবিহীন ঠোঁটের মাত্র দুই ইঞ্চি পাশে রক্ষিত কালো রঙের টেলিফোন সেটটা চোখে পড়ল ওদের।
‘দেখেছ!’ উল্লাসে ফেটে পড়ল জন। ‘বলেছিলাম না- বলেছিলাম না তোমাকে? বাবা আমাকে দেখতে পারতেন না, ঘৃণা করতেন। কিন্তু আজ উনিই আমাদের রক্ষা করবেন।’ দ্রুত রিসিভারটা তুলল সে।
‘কফিনের ভেতর টেলিফোন! কখনও শুনেছ? হ্যাঁ, কেবল বিশ্বাসদের মাথা থেকেই বের হতে পারে এরকম আইডিয়া। থানার নম্বরটা জানো তুমি? ওহো তোমার তো জানার কথা না… কুছ পরোয়া নেই, এক্সচেঞ্জেই ডায়াল করি। ওরাই যোগাযোগ করবে থানার সাথে। ভয়ের কিছু নেই, ওরা বিশ্বাস করবে আমাদের কথা। এমিলি চাচীর খ্যাপাটে স্বভাবের কথা এ তল্লাটের সবাই জানে।’
জন ডায়াল ঘুরাচ্ছে, পলি সন্দেহের সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘এতদিন পরে সেটা কাজ করবে তো—’
‘রিং হচ্ছে।’ ওকে থামাল জন। ‘কথা বোলো না… হ্যালো… হ্যালো… অপারেটর? আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন আপনি?’
‘হ্যাঁ, শুনছি,’ ও প্রান্ত থেকে নারী কণ্ঠে ঠাণ্ডা, নিরুত্তাপ জবাব ভেসে এল। ‘অপারেটর, মন দিয়ে শুনুন। আমি জন বিশ্বাস বলছি। বিশ্বাস ভবন থেকে। বাড়িটা চেনেন তো? শহরের শেষ মাথায় জলাভূমিটা ঘেঁষে-’
‘হ্যাঁ, চিনি,’ জবাব এল।
‘আমি সাহায্যপ্রার্থী। জলদি থানার সাথে যোগাযোগ করুন। পুলিশকে বলুন বিশ্বাস ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড কবরস্থানে বন্দী হয়ে আছি আমরা- আমি আর আমার স্ত্রী। বুঝেছেন, এক্ষুণি যোগাযোগ করুন। কুইক!’
‘হ্যাঁ, বুঝেছি।’ ভাবাবেগ বর্জিত শান্ত কণ্ঠস্বর।
জন আবার বলে উঠল, ‘বৃষ্টিতে ভেতরে পানি জমছে। এহারে বৃষ্টি হতে থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডুবে যাব আমরা। আপনি তাড়াতাড়ি থানায় খবর দিন। প্লীজ!’
‘খবর দিচ্ছি। পুলিশ সময় মত পৌঁছে যাবে,’ সেই একই রকম একঘেয়ে সুর ভেসে এল।
‘বিশ্বাস ভবন। আন্ডারগ্রাউন্ড গোরস্থান—’ জন দ্রুত পুনরাবৃত্তি করল মেসেজটা।
‘বুঝেছি। খবরও দিচ্ছি-’
ক্লিক!
কেটে গেল লাইন।
উত্তেজনায় জনের হাত কাঁপছে। কোনওমতে রিসিভারটা যথাস্থানে রেখে তাকাল স্ত্রীর দিকে। মুখে একটুকরো দেঁতো হাসি।
‘বড় জোর এক ঘণ্টা, পলি,’ বলল সে। ‘এক ঘণ্টার মধ্যেই মুক্ত হচ্ছি আমরা। তারপর- ওহ্, গড! এক কোটি টাকা! তোমাকে আমি রাণী বানিয়ে রাখব, ডার্লিং। রাজার হালে কাটবে আমাদের আগামী দিনগুলো। অপেক্ষা করো, মাত্র একটা ঘণ্টা…’
.
একশো গজ দূরে প্রবল বর্ষণ আর বাতাসের প্রচণ্ড তাণ্ডব নৃত্যে তখনও কাঁপছে পুরো বাড়িটা। দোতলার ড্রইংরুমে এমিলি চাচী শান্ত ভঙ্গিতে রিসিভার নামিয়ে রাখল। নির্বিকার মুখের ভাব, কোনওরকম উত্তেজনার ছিটেফোঁটাও নেই।
‘জনের ফোন, মেরী,’ বলল বৃদ্ধা। ‘মৃতের ভূমিকায় এখনও পুরোপুরি মানিয়ে উঠতে পারেনি। আমাকে অপারেটর ভেবে পুলিশের সাহায্য চেয়েছে। অতটা নির্দয় আমি নই। তাই আর বললাম না যে সে আর তার মেয়েছেলেটা এখন মৃত। কখনও বের হতে পারবে না ওখান থেকে। এটাই বোধ হয় ভাল হলো। ওরা ভাবতে থাকুক শিগগির পুলিশ এসে উদ্ধার করবে ওদের। সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত এ ভাবনাটুকু ওদের সময় কাটাতে সাহায্য করবে। পানি নেমে গেলে কাল বা পরশু ওখানে নামব আমি। কথা বলব ওদের সাথে। যাকগে, ওদের প্রসঙ্গ বরং এখন বাদ দিই। এসো আমরা প্রার্থনা করি আমাদের প্রভুর নামে। নতুন উৎসাহে, নতুন উদ্যমে- যাতে শান্তি পায় জন আর ওর সঙ্গের মেয়েটা। এসো, আমরা গান ধরি।
দুই বুড়ি গুটিগুটি পায়ে নীচে নেমে এল। এমিলি চাচী পিয়ানোর পাশে বসল। রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে দিল মেরী চাচী।
বাইরে প্রকৃতির বিক্ষুব্ধ উন্মাদনা। দুই বৃদ্ধাকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হতে দেখা গেল না। প্রকৃতির সমস্ত তাণ্ডবকে উপেক্ষা করে নড়ে উঠল দু’জোড়া শীর্ণ ঠোঁট। মৃদু অথচ মর্মভেদী কণ্ঠে গাইতে লাগল ওরা, ‘যখন গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে ওঠে রাতের আঁধার- হে, প্রভু, আমাদের সঙ্গ দাও…’
মাহবুবুর রহমান শিশির
(বিদেশী কাহিনির ছায়া অবলম্বনে)
