নীলকুঠি হ্রদ – আলম শাইন
নীলকুঠি হ্রদ
আমার অন্যতম শখ হচ্ছে পাখি শিকার। সময় এবং সুযোগ পেলেই আমি পাখি শিকারে বের হয়ে পড়ি। বিশেষ করে শীত আসলে তো কথাই নেই, প্রতিদিন শিকারে বের হওয়া চাই। চাকরি হওয়ার পর থেকে হাতে বন্দুক ধরার সুযোগ তেমন একটা হয়ে ওঠে না। কর্মস্থল শহরে বলে শিকারে যাবার সুযোগ পাচ্ছি না। তো কিছুদিন থেকে শিকারের নেশা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে এলাম।
বাড়িতে এসে প্রথমে হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম নিয়ে ভাবতে থাকলাম কোথায় শিকারে যাওয়া যায়। হঠাৎ মনে পড়ল ঐতিহাসিক ‘নীলকুঠি হ্রদ-এর কথা। ‘জয়ন্তিয়া’ নামক স্থানে অবস্থিত নীলকুঠি হ্রদ। আমাদের বাড়ি থেকে তিন-চার ঘণ্টার পথ জয়ন্তিয়া। বাড়ি থেকে রিকশায় ৬ কি. মি. পথ গেলে সামনে পড়ে পাহাড়। সেখান থেকে নেমে বাকি পথ হেঁটে যেতে হয়। যানবাহন চলার উপযোগী রাস্তা এখনও তৈরি হয়নি। তাই একমাত্র পায়ে হেঁটে পাহাড়ী পথ বেয়ে, পাইন বন পেরিয়ে যেতে হয় নীলকুঠি হ্রদে।
যা হোক, ওখানেই শিকারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রচণ্ড শীতে মানস সরোবর থেকে তিতির, মরাল, মালয়ীবক, কালিজ ফেজান্ট, পানকৌড়ি, সারস ইত্যাদি পাখি অতিথি হয়ে আসে নীলকুঠি হ্রদে। শিকারের জন্যে উত্তম স্থান জয়ন্তিয়া। এতদূর পথ একা যাওয়া সম্ভব নয়, তাই ভাবছি আমার ছোট মামাকে সাথে নিলে কেমন হয়। মামা বেকার মানুষ, প্রস্তাব পেলে নিশ্চয়ই রাজী হবেন।
সেদিনই কাজের ছেলে মাসুদকে পাঠালাম মামার কাছে। খবর পেয়ে মামা সঙ্গে সঙ্গে চলে এলেন। খুলে বললাম তাকে আমার পাখি শিকারের পরিকল্পনা। আমার চেয়ে বয়েসে সামান্য বড় মামা, প্রায় বন্ধুর মতই সম্পর্ক। আমার প্রস্তাবে সঙ্গে সঙ্গে রাজী হলেন।
পাখির মাংস আমাদের দু’জনেরই প্রিয় খাবার। তাই বোধ হয় মামা লোভ সামলাতে পারলেন না। বিশেষ করে পানকৌড়ি, বালি হাঁসের মাংসের স্বাদের কথা মনে হলে তো কথাই নেই, সাথে সাথে আমার জিভে পানি এসে পড়ে খেতে ভীষণ সুস্বাদু এই পাখিদের মাংস। ছোট মামাকে একবার খাওয়ানোর পর থেকে তিনিও পানকৌড়ির মাংসের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
দু’জনে মিলে ঠিক করলাম কাল ভোর রাতে নীলকুঠি হ্রদের উদ্দেশ্যেযাত্রা করব। সাথে মাসুদকেও নিয়ে যাব। পরিকল্পনা মোতাবেক জিনিস-পত্র গুছিয়ে রাখলাম। খাবার হিসাবে থাকবে ভুনি খিচুড়ি, ফ্লাস্কভর্তি চা, বিস্কুট, চিড়া ও কলা। টুকিটাকি জিনিসের মধ্যে ছুরি, টর্চ, ম্যাচ, মোম, বড় প্লাস্টিক শীট ও বাড়তি জামা-কাপড়। দূরের পথ, কখন কী প্রয়োজন পড়ে বলা যায় না, তাই ইচ্ছে করে বাড়তি জিনিস সঙ্গে নিচ্ছি।
ভোর রাতে আমরা তিনজন ঘুম থেকে উঠে নীলকুঠি হ্রদে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হলাম। ভীষণ ঠাণ্ডা। পৌষমাসের মাঝামাঝি সময় তখন। আমি আর মামা গায়ে লংকোট চাপিয়ে মাথায় ক্যাপ লাগিয়ে শীত ঠেকিয়েছি। রিকশায় চড়ে পাহাড়ী এলাকা পর্যন্ত গিয়ে নেমে পড়লাম। এখান থেকে আমাদের হেঁটে যেতে হবে বাকি পথ। মাসুদের মাথায় মালামাল আর বন্দুক চাপিয়ে দিয়ে তিনজন দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। কুয়াশায় ঠিকমত পথ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে এই পথ আমার এবং মামার কাছে একেবারে নতুন। তবে মাসুদ চেনে।
শীতে হাত-পা ঠক্ঠক্ করে কাঁপছে। তার উপর পাহাড়ী পথ। হাঁটতে যে কত কষ্ট তা বোঝানো যাবে না। যত কষ্টই হোক, নীলকুঠি আমাদের যেতেই হবে, এই আমার প্রতিজ্ঞা। ভাল মত হাঁটতে পারলে ঘণ্টা তিনেকের ভিতর গন্তব্যে পৌছুনো যাবে। তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারলেই ভাল, কারণ পাখি শিকারের উপযুক্ত সময় সকাল এবং শেষ বিকেলের দিকটা।
শিশির ভেজা পাহাড়ী পথে হাঁটতে গিয়ে পা পিছলে পড়ার উপক্রম হলো কয়েকবার। মামা তো একবার পড়েই গিয়েছিলেন, আমি না ধরলে হয়তো হাত- পা মারাত্মক ভাবে কেটে যেত। ধরে ফেলা সত্ত্বেও সামান্য কেটে গেছে হাত। টের পেলাম মামার বিরক্তি ধরে গেছে। আমার কিন্তু ভালই লাগছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব লাগছে। ঘাসের উপর শিশির বিন্দু মুক্তোর মত মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যে আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে সূর্যোদয় অপূর্ব লাগছে। গাছে-গাছে ঘুঘু পাখি চুপচাপ বসে আছে। ইচ্ছে করলে শিকার করতে পারি। কিন্তু না, তাতে অযথা সময় নষ্ট হরে।
হাঁটতে হাঁটতে ঘেমে উঠেছি আমরা। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হাঁটা হলো। আর কিছুক্ষণ হাঁটলে পাইন বনে পৌঁছে যাব। পাইন বনের পরেই আমাদের গন্তব্যস্থান জয়ন্তিয়ার ‘নীলকুঠি হ্রদ’। মামাকে বেশি ক্লান্ত মনে হচ্ছে। পথে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলাম। এক সময় পাহাড় থেকে পাইন বন চোখে পড়ল। আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। মাসুদ বলল, আর অল্প একটু হাঁটলেই আমরা বনে পৌঁছে যাব। বনের উঁচু গাছগুলোর মাথা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে পুব আকাশে সূর্য অনেক উপরে উঠে এসেছে। পাহাড় পেরিয়ে আমরাও বনে পা দিয়েছি। টুপটাপ শিশির পড়ছে পাইন পাতা থেকে। সমস্ত শরীর ভিজে গেছে আমাদের। আগে কখনও আমি পাইন গাছ দেখিনি। চিকন পাতা ও শাখাযুক্ত এই গাছ দেখতে খুবই সুন্দর। তার উপর সারি দিয়ে লাগানো গাছ। কৃত্রিম বন, সারি দেখলেই বোঝা যায়। বনের মাটি ছোট ঘাসে ভর্তি। ঘাস মাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা। শিশিরে আমাদের শরীর ভিজে যাওয়াতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লাগছে।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর অবশেষে আমরা হ্রদের তীরে পৌঁছালাম। বিশাল হ্রদ। পরিষ্কার টলটলে নীল পানি। হ্রদের দু’তীরে ছোট বড় দেবদারু গাছ দাঁড়িয়ে। মাঝেমধ্যে অবশ্য দু’একটা শাল গাছও চোখে পড়ছে। ভীষণ পছন্দ হলো আমার হ্রদ এলাকা। কী যে মনোরম দৃশ্য! চারদিকে ভাল করে তাকালাম। আশপাশে কোন ঘর-বাড়ি নেই। তবে অনেক দূরে একটি পোড়োবাড়ি দেখতে পেলাম।
শোনা যায়, বৃটিশ শাসন আমলে এখানে ইংরেজদের কুঠি ছিল। নীল চাষ হত এ এলাকার আশপাশে। সেই থেকে নীলকুঠি নামে পরিচিত এই হ্রদ। বর্তমানে লোকজনের তেমন আসা-যাওয়া নেই। তবে শুনেছি মাঝে-মাঝে শুধু জেলেরা মাছ ধরতে আসে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রায় আটটা বাজে। মাসুদকে হুকুম করলাম নাস্তা দিতে। নাস্তা খেয়ে হ্রদ থেকে পেট পুরে পানি খেলাম। পানি ভীষণ ঠাণ্ডা। খেতে মিষ্টি লাগল।
খেয়ে-দেয়ে বন্দুক হাতে নিলাম। ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি পানির উপর ভাসছে। তীরে বড় আকৃতির সারস পাখির দল হেঁটে পোকা-মাকড় খাচ্ছে। পানকৌড়ি লতাগুল্মের উপর বসে রোদ পোহাচ্ছে। শত শত পানকৌড়ি পাখি। যার জন্যে এত দূর পথ পেরিয়ে শিকারে আসা তাদের দেখে আনন্দে মন ভরে উঠল। সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা প্রথমে শুধু পানকৌড়ি শিকার করব। সময় পেলে পরে অন্য সব পাখি মারব। সমস্যা হলো পানকৌড়িরা এলোমেলোভাবে বিচরণ করছে। অন্য সব পাখির মত এরা দলবদ্ধভাবে থাকছে না।
অল্প দূরে কচুরিপানার উপর একটি পানকৌড়ি বসে আছে। প্রথমে টার্গেট নিয়ে গুলি ছুঁড়লাম। ব্যর্থ হলো নিশানা। পাখিটি উড়ে গেল। সামনে এগিয়ে দেখলাম বারো-চোদ্দটি সারসের দল তীরে পোকামাকড় খাচ্ছে। মামা ইশারা দিলেন আমাকে নিশানা নেওয়ার জন্যে। নিশানা ঠিক করে ট্রিগারে চাপ দিলাম। বড় একটি সারস গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। মাসুদ আর মামা সারসটি জবাই করে থলের মধ্যে তুলে রাখল।
হ্রদের উত্তর-পশ্চিম কোণে দুটি পানকৌড়ি রোদ পোহাচ্ছে দেখে এগিয়ে গেলাম। সতর্কতার সাথে নিশানা নিয়ে ট্রিগারে হাত রাখলাম। গুলি এইবার ব্যর্থ হলো। এত সাবধান হওয়া সত্ত্বেও পানকৌড়িটির গায়ে গুলি লাগাতে পারিনি আমি। পানকৌড়িগুলো ভীষণ চালাক। এদের শিকার করাটাও দুরূহ ব্যাপার।
প্রায় ১ কি. মি. হেঁটে হ্রদের অন্য তীরে গিয়ে দেখতে পেলাম কয়েকটি পানকৌড়ি পানিতে ডুব দিচ্ছে। আর দেরি না করে নিশানা নিয়ে ট্রিগারে চাপ দিলাম। চমৎকার! এইবার গুলি পাখিটির ডানায় গিয়ে লেগেছে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করে মাত্র তিনটি পানকৌড়ি, দুটি সারস, দুটি বালিহাঁস শিকার করলাম।
মাসুদকে আমরা জিনিস-পত্র পাহারা দিতে হ্রদের অন্য তীরে রেখে এসেছি। দুপুর ২টা বাজে। তাই এখনকার মত শিকার থামিয়ে মাসুদের কাছে ফিরে আসছি। খেয়ে বিশ্রাম নেব কিছুক্ষণ। তারপর বিকেলের দিকে আবার বের হব। দু’জনে গল্প করতে করতে হাঁটছি। এমন সময় ১৭-১৮ বছরের একটি যুবতী মেয়ে আমাদের সামনে পড়ল। সকাল থেকে কোন লোকজন দেখিনি। এই প্রথম একজন মানুষের সাক্ষাৎ পেলাম। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
আঙুল দিয়ে ইশারায় অদূরের পোড়োবাড়িটি দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে।’
আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কে থাকে তোমার সাথে?’
জবাব না দিয়ে মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল।
মামা যুবতীর নাম জানতে চাইলেন।
বিষণ্ণ হেসে আস্তে করে জবাব দিল, ‘আমার নাম রেশমা।’
রেশমার শরীরের বর্ণ কুচকুচে কালো। উষ্কখুষ্ক চুল, পরনে সাদা ময়লা কাপড়। দেখে বোঝা যায় গরীবের সন্তান। মামা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন মেয়েটির দিকে। এমন বিস্ময় নিয়ে মেয়েটিকে দেখছেন, যেন মেয়ে মানুষ এই প্রথম নজরে পড়ল। রেশমার তাকানোর ভঙ্গি দেখে আমার শরীর শির শির করে উঠল। কেন জানি না আমার অসহ্য লাগল।
যা হোক, আমরা অযথা সময় নষ্ট না করে হাঁটতে লাগলাম। রেশমা আমাদের বিপরীত দিকে হেঁটে চলে গেল। মামাকে বললাম, ‘এদিকে তা হলে লোকজন বসবাস করে?’
মামা বললেন, ‘মেয়েটিকে দেখে তো তা-ই মনে হচ্ছে।
আমরা মাসুদের কাছে ফিরে এসেছি। সে ঘাসের উপর শুয়ে ঘুমাচ্ছে। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে আমরা হ্রদে নেমে গোসল করলাম। প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও মামা কিছুক্ষণ সাঁতার কাটলেন। গোসল সেরে ভুনি খিচুড়ি খেতে বসলাম তিনজনে মিলে। খাওয়া আধাআধি হয়েছে, ঠিক এমন সময় আমাদের পিছনের গাছের আড়াল থেকে কে যেন খিল খিল করে হেসে উঠল। চমকে উঠলাম আমরা। মামা বললেন, ‘মেয়েদের হাসি মনে হচ্ছে।’
মাসুদ বলল, ‘এর আগেও আমি একবার এমন হাসি শুনতে পেয়েছি, কিন্তু কাউকে দেখিনি।’
ভালমত চারদিকটা খোঁজ করলাম। কিন্তু কোথা থেকে যে হাসির শব্দ এল তা বের করতে পারলাম না। ভাবলাম হয়তো আশপাশে কেউ ঘোরাফেরা করছে। যাক গে, সেটা নিয়ে আমরা তেমন মাথা ঘামাইনি তখন।
বাকি খিচুড়িটুকু খেয়ে মাসুদকে বললাম, ‘তুই গাছে উঠে কয়েকটা ডাল কেটে নিয়ে আয়, তাঁবু তৈরি করব। রাত্রে থাকতে হবে আমাদের। তুই সন্ধ্যার আগে পাখিগুলো নিয়ে বাড়িতে চলে যাবি। আর শোন, বাড়িতে বলবি আমরা আগামীকাল আসব।’
রাতে পাখি শিকার করতে সুবিধা বেশি। টর্চের আলো পাখির চোখে মারলে একদম চুপ-চাপ বসে থাকে। আরেকটা সুবিধে হলো, গুলির আওয়াজ শুনে পাখি উড়ে যায় না।
মাসুদ ছুরি নিয়ে তরতর করে গাছে উঠে গেল, তারপর কয়েকটি ডাল কেটে নীচে ফেলল। হঠাৎ সে ‘বাবারে!’ বলে চিৎকার দিল এবং আমাদের উদ্দেশে বলল, ‘ভাই, কে যেন আমাকে একটা থাপ্পড় দিল!’
মামা আর আমি একযোগে বলে উঠলাম, ‘পাগলের মত কী যা তা বলছিস্! নীচে নেমে আয় দেখি।’
মাসুদ গাছ থেকে দ্রুত নেমে মাটিতে আছড়ে পড়ল।
মামা বললেন, ‘কী হয়েছে, খুলে বল।’
মাসুদ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘এই দেখুন আমার গাল।’
চেয়ে দেখি সত্যিই মাসুদের গালে আঙুলের দাগের মত লাগছে। ভয় পেয়ে গেলাম আমরা।
‘ব্যাপার কী!’ বলে আমি আর মামা একে অপরের দিকে তাকালাম। ভয় পাওয়া সত্ত্বেও বুকে সাহস নিয়ে বললাম, ‘দূর! হয়তো গাছের ডালে আঘাত খেয়েছিস।’
মামা মাসুদকে তাঁবু টানাবার তাগাদা দিলেন। আমিও তাঁবু তৈরির কাজে লেগে গেলাম। আসার সময় দশ-বারো গজ লম্বা দুই প্রস্থ প্লাস্টিক শীট নিয়ে এসেছি। তাই দিয়ে তাঁবু তৈরি হবে। বেশ কিছুক্ষণ খেটে পাঁচ-ছ’টি খুঁটি পুঁতে তার উপর প্লাস্টিক দিয়ে সুন্দর তাঁবু বানিয়ে ফেললাম। আপাতত গায়ে শিশির লাগবে না। তারপর শুকনো পাতা এনে বিছানা পাতলাম।
তাঁবু তৈরির কাজ শেষ করে মাসুদকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। এদিকে সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এল। আস্তে আস্তে একটা ভয় জাগছে মনে। সারা দিনে রেশমাকে ছাড়া অন্য কোন লোকজন দেখিনি। তার উপর মাসুদের গায়ে থাপ্পড় এবং হাসির শব্দ মিলিয়ে মনে হলো কেমন জানি ভৌতিক পরিবেশে এসে পড়েছি। সারাটা দিনে ভয়ের লেশ মাত্র ছিল না। এখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসায় এবং মাসুদ চলে যাওয়ায় ভয় যেন আমাকে আঁকড়ে ধরল। তবে পানকৌড়ি শিকারের নেশায় সব ভয় মন থেকে মুছে গেল একটু পরই।
সন্ধ্যার অন্ধকার পুরোপুরি নেমে গেছে। পাখিরা গাছে-গাছে আশ্রয় নিয়েছে। পাখিদের কিচির-মিচির শব্দে হ্রদ এলাকা মুখরিত হয়ে উঠল। এক সময় পাখিদের ভিতর নীরবতাও নেমে এল। মামাকে একবার ভয়ের কথা জানালাম। হেসে উড়িয়ে দিয়ে মামা বললেন, ‘চুরি ডাকাতি হওয়ার মত তেমন কিছু আমাদের সাথে নেই। সুতরাং ভয় পাওয়ার কারণ দেখছি না।’
‘না, মামা, তা নয়। আমি ভাবছি অন্য কথা।’
মামা বললেন, ‘ভূতের কথা বলছিস্?’
আমি বললাম, ‘না, ভূতের ভয় পাব কেন! নির্জন পরিবেশে একা একা এমনিই ভয় লাগছে।’ মনে মনে ভাবলাম মাসুদকে বাড়ি পাঠানো ঠিক হয়নি। তিনজন থাকলে ভয় একটু কম লাগত।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিকেল বেলায় খড়, লতা-পাতা কুড়িয়ে রেখেছি। তা-ই জ্বেলে দিলাম। আলো এবং উত্তাপ দুটোই ভাল লাগছে। অবশ্য সাথে মোমও আছে, প্রয়োজন পড়লে জ্বালব। অন্ধকার গভীর হতেই আমরা শিকার করতে বেরিয়ে পড়লাম। সাথে নিলাম টর্চ, বন্দুক, ছুরি।
শীতের রাত। কুয়াশা পড়ছে টুপটাপ করে। অন্ধকার এবং ঠাণ্ডায় গাছে-গাছে পাখিরা জড়ো-সড়ো হয়ে আছে। টর্চ মেরে পাখিদের করুণ অবস্থা দেখছি। শত- শত পাখি ডালে বসে ঝিমুচ্ছে। পাখিদের অসহায় অবস্থা দেখে আমার মনে মায়া লেগে গেল। তবুও সর্বনাশা নেশায় পাগল হয়ে উঠলাম।
মামা পাখি ও বন্দুকের নিশানা এক করে টর্চ ধরলেন। আর আমি ট্রিগারে চাপ দিয়ে যেতে লাগলাম একের পর এক। স্বল্প সময়ের মধ্যে ছ’টি পানকৌড়ি, তিনটি অন্যান্য পাখি শিকার করে ফেললাম। শিকারের নেশায় সে মুহূর্তে দুনিয়ার সব কিছু ভুলে গেলাম।
হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর পর্যন্ত চলে এলাম আমরা। সামনে বড় আকারের একটি দেবদারু গাছ দেখে মামা থামলেন। বললেন, ‘এই ঝাঁকড়া গাছে অনেক পাখি থাকতে পারে।’
মামার লোভনীয় প্রস্তাব শুনে বললাম, ‘ঠিক আছে, দেখি, টর্চ মারেন।’
পাঁচ ব্যাটারির টর্চ বোতাম টিপলেই অনেক দূর পর্যন্ত আলো ছড়ায়। আলোর বন্যায় গাছের পাতার শিরা-উপশিরা নজরে পড়ছে আমাদের চোখে। অনেকগুলো পাখি ডালে বসে ঝিমাচ্ছে। আলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রত্যেক ডালে দেখছি। হঠাৎ সাদা ও লম্বা কী যেন একটা দেখলাম মগ ডালে। এত বড় তো পাখি হয় না। ভাল করে তাকালাম দু’জন। যা দেখলাম তাতে আমাদের পিলে চমকে উঠল। দু’জন-দু’জনকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলাম। অবশ্য যা দেখলাম তাতে চিৎকার না দিয়েও পারতাম না। দুর্বল হৃদয়ের কেউ হলে হয়তো ভয়ে জ্ঞান হারাত।
মামার টর্চের আলোয় যে জিনিস আমাদের চোখে পড়ল সেটা হলো মানুষ! দুপুর বেলায় দেখা সেই যুবতী মেয়েটি। গাছের ডালে বসে আছে। মুখ দিয়ে আমাদের কোন কথা বেরোল না কিছুক্ষণ। মামার সাহস বেশি হলেও এই অবস্থায় মেয়েটিকে দেখে তিনিও ভীষণ ঘাবড়ে গেছেন। তবুও মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই, মেয়ে! এত রাতে গাছে বসে আছ কেন? কী করছ?’ তোতলাচ্ছেন মামা।
মেয়েটি হেসে হেসে জবাব দিল, ‘পাখির বাচ্চা ধরতে এসেছি। রাত না হলে ধরা যায় না।’
ভয় কিছুটা কেটেছে আমাদের। মেয়েটির জবাব শুনে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘একা এত রাতে তোমার ভয় করে না?’
খিলখিল করে হেসে জবাব দিল, ‘ভয়! কীসের ভয়! এই এলাকা তো আমাদেরই। তা ছাড়া, ওই তো আমাদের বাড়ি দেখা যায়।’
ভাবলাম গরীবের মেয়ে, এদের ভয় বলে কিছু নেই, এরা সব কিছুই পারে। গাছে ওঠা তো মামুলী ব্যাপার। কিন্তু তাই বলে এত রাতে! তাও আবার এই নির্জন পরিবেশে একা! মনকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না। মেয়েটির আচরণে আমার সন্দেহ লাগছে, কিন্তু আগা-মাথা কিছুই না বোঝার কারণে তার চিন্তা বাদ দিয়ে শিকারে মনোযোগ দিলাম।
প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা শিকার করার পর অনেকগুলো পাখি মেরেছি। এইবার তাঁবুতে ফেরার পালা। শীতে শরীর বরফের মত ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। আমরা তাঁবুতে ফিরে এলাম।
তাঁবুতে ফিরে মোম ধরিয়ে চিড়া, বিস্কুট আর কলা দিয়ে রাতের খাবার সেরে নিলাম। পেট পুরে খেয়ে শুয়ে পড়লাম। বালিশ ছাড়াই শুতে হলো আমাদের। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। কোট গায়ে দিয়েই শুয়ে পড়লাম। কিছুতেই আমার ঘুম আসছে না। বাইরে খুব শিশির পড়ছে। প্লাস্টিকের উপর শিশির পড়ার শব্দ শুনে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে।
ঘণ্টা দুয়েক পর মামা গুঙিয়ে উঠলেন পেটব্যথা বলে। আমি কিছুক্ষণ পেট মালিশ করে দিলাম। কিছুতেই উপশম হচ্ছে না। অল্পক্ষণ পর মামা বমি করে দিলেন। তার মিনিট দশেক পর শুরু হলো পুরোদস্তুর ডায়রিয়া।
মামার অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে লাগল। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। স্যালাইন খাওয়ানো একান্ত প্রয়োজন। আমাদের সাথে লবণ আছে, কিন্তু গুড় পাই কোথায়? হঠাৎ মনে পড়ল রেশমা নামের মেয়েটির কথা। তার বাড়ি গেলে হয়তো চিনি বা গুড় পাওয়া যেতে পারে। সমস্যা হলো মামাকে একা রেখে কীভাবে যাই। কেন যে মাসুদকে পাঠিয়ে দিলাম! বোকামির জন্যে মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করলাম।
ভেবে-চিন্তে মামাকে একা রেখে রেশমাদের বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। খোদা জানে মামাকে এসে জীবিত পাই কিনা। রাত তখন পৌনে একটা বাজে। মামার কাহিল অবস্থা দেখে মন থেকে ভয় চলে গেছে। এই মুহূর্তে একটাই চিন্তা যে করে হোক মামাকে সুস্থ করে তুলতে হবে।
প্রায় মিনিট পঁচিশ হাঁটার পর সেই পোড়োবাড়িতে এলাম রেশমার খোঁজে। বিশাল বাড়ি। দালানের উপর সিমেন্টের প্রলেপ একটুও নেই। সব খসে পড়ে ইঁটগুলো বের হয়ে আছে। পুরানো আমলের বাড়ি, দুর্গের মত মনে হচ্ছে। নির্জন পরিবেশ। একটু একটু ভয় লাগছে এখন আমার। বাড়িতে অনেকগুলো কামরা। কোন কামরায় যে রেশমারা থাকে তাও জানি না। জোরে রেশমা বলে কয়েকবার ডাকলাম। কোন সাড়া পাইনি। ব্যাপার কী? বাড়ির লোক সব গেল কোথায়! সামনের কামরায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। ভিতরে ঢুকে টর্চের আলো জ্বেলে দেখলাম সমস্ত ঘর ফাঁকা, কোথাও কেউ নেই। শুধু মাকড়সা ও তেলাপোকারা ছুটোছুটি করছে। আমার শরীর শিউরে উঠল। কী করে এই বাড়িতে রেশমারা থাকে? আরও কয়েকবার রেশমাকে ডাকলাম। কোন সাড়া নেই। পাশের কামরাতে ঢুকলাম। এই কামরাও ফাঁকা। আছে শুধু চামচিকা। উড়ে-উড়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। একটা চামচিকা আমার মাথায় এসে পড়ল। লাফিয়ে উঠলাম। এই মুহূর্তে আমার ভীষণ ভয় লাগছে। পরপর কয়েকটি কামরায় প্রবেশ করে একই অবস্থা নজরে পড়ল। অজানা আশঙ্কায় প্রচণ্ড শীতের মধ্যে আমার জুলফি বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল’। এই বুঝি কিছু একটা হলো। রেশমাকে ডাকতে পারছি না। যেন বাক শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। নীরব নিস্তব্ধ প্রেতপুরী মনে হচ্ছে ‘বাড়িটিকে।
খস্থস্ আওয়াজ এল পাশের একটি কামরা থেকে। এগিয়ে গেলাম সেদিকে। বাইরে থেকেই শিকল লাগানো। ভাঙা জানালা আছে একটি। এগিয়ে গিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে টর্চের আলো ফেললাম। দেখলাম ভিতরে পুরানো ভাঙা খাটের উপর কে যেন একজন কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে। এতক্ষণে ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম। ‘এই যে, ঘরে কে আছেন,’ বলে কয়েকবার ডাকলাম। সাড়া মিলল না। ভাবলাম শীতের ভিতর কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকাতে হয়তো শুনতে পাচ্ছে না। তাই শিকল খুলে ঘরের ভিতর ঢুকলাম। খাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। লোকটা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। মৃদু স্বরে দু’তিনবার ডাকলাম। ভাবছি হঠাৎ ভয় পেয়ে চোর ভেবে চিৎকার দেয় কিনা। মামার অবস্থা ভেবে সব ভুলে আবার তাকে ডাকলাম। সাড়া না দিয়ে লোকটি পাশ ফিরে শুলো। এইবার জোরে ডাকলাম। না, কোন সাড়া নেই। হাত বাড়িয়ে আমি তার মুখের উপর থেকে কাঁথাটি সরিয়ে ফেললাম। এ কী! কী দেখছি আমি! এ তো মানুষের কঙ্কাল! মানুষ গেল কোথায়। অল্পক্ষণ হলো নাক ডাকার শব্দ শুনলাম না? তা ছাড়া, নিজ চোখে দেখলাম পাশ ফিরে শুতে। অথচ এখন কী দেখছি?
ভয়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলব মনে হচ্ছে। কয়েক ফোঁটা ঘাম জুলফি বেয়ে নীচে পড়ল। পা কাঁপছে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ঘর থেকে বের হয়ে আমি দৌড়াতে লাগলাম। এক দৌড়ে দেবদারু গাছটার কাছে চলে এলাম যে গাছটাতে সন্ধ্যায় রেশমাকে বসে থাকতে দেখেছি।
পা অবশ হয়ে আসছে আমার। বুক হাপরের মত ওঠানামা করছে। সামান্য একটু জিরিয়ে তাঁবুতে ফিরে যাব। রেশমার ফাঁকির কথা মনে পড়ল। মিথ্যে কথা বলেছে সে। সে আসলে পোড়োবাড়িতে থাকে না।
কৌতূহল নিয়ে গাছে টর্চ মেরে দেখলাম। আলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে কী যেন একটা চোখে পড়ল। এইবারও আশ্চর্য হতে হলো আমাকে। চেয়ে দেখি রেশমা ফাঁসি দিয়ে মরে আছে! তার জিভ আট-দশ ইঞ্চি বেরিয়ে আছে। চোখ দুটিও বেরিয়ে পড়ার মত অবস্থা। মনে হচ্ছে আমার দিকে তাকিয়ে আছে রেশমা। আলো পড়তেই ঝলসে উঠল চোখ। অন্ধকারে কুকুর-বিড়ালের চোখ যেমন জ্বলে ওঠে, ঠিক তেমন মনে হলো। আশ্চর্য হলাম মানুষের চোখ অন্ধকারে জ্বলতে দেখে। তার উপর মৃত মানুষ। আগেও কয়েকটি ফাঁসির লাশ দেখেছি আমি। কিন্তু কারও জিভ এবং চোখ এত বেশি বেরিয়ে থাকতে দেখিনি। এতক্ষণে প্রশ্ন জাগল মনে, কে এই মেয়ে? এই জনমানব শূন্য এলাকায় ফাঁসি নিতে এল কেন?
এতকিছু ভাবার সময় নেই। আমি আবার দৌড়ে তাঁবুতে ফিরে এলাম। মামা ক্ষীণ স্বরে আমাকে ডাকছে। মামার কাছে গিয়ে বসে পড়লাম। প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছি। কোন মতে মামার মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখন কেমন আছেন?’
সামান্য মাথা নেড়ে মামা চোখ বুজে ফেলেন। এই মুহূর্তে তাঁকে কিছু বলা সম্ভব না, তাই চুপ-চাপ রইলাম।
মামার সমস্ত শরীর বরফের মত ঠাণ্ডা। আমার কোটটি খুলে তাঁকে পরিয়ে দিলাম। চিনি বা গুড় না পেয়ে শুধু মাত্র লবণ গুলানো পানি পান করাতে থাকলাম। সকাল পর্যন্ত বাঁচানো যায় কিনা সন্দেহ লাগছে। অনবরত লবণ পানি পান করাচ্ছি মামাকে।
ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। মামা মারা গেলে কী যে পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, ভেবে সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। কঙ্কাল, ফাঁসির লাশ, মামার ডায়রিয়া সব মিলিয়ে আমার ভয় কোন্ পর্যায়ে পৌঁছেছে বুঝতেই পারছেন।
সকাল হয়ে এসেছে। মামার ডায়রিয়া একটু কমেছে। বুদ্ধি করে লবণ পানি পান করানোতে পানি শূন্যতা থেকে রেহাই পেয়েছেন।
শিকারের প্রতি এখন আর নেশা নেই। দেখতে পেলাম হ্রদে অনেকগুলো পানকৌড়ি ভাসছে। দ্বিতীয়বার তাকাইনি সেদিকে। এই মুহূর্তে এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারলেই বাঁচি। কিন্তু মামাকে নিয়ে সমস্যা। অসুস্থ শরীর নিয়ে হাঁটতে পারবেন না তিনি।
রাতের সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম মামাকে। তিনি যে আমার কথা বিশ্বাস করলেন না, বুঝতে পেরেছি। মামা দেখতে চাইলেন লাশ ও কঙ্কাল। বললাম, ‘আসেন আমার সাথে।’
আস্তে আস্তে হেঁটে প্রথমে দেবদারু গাছের কাছে গেলাম। ভয়ে আমি গাছের উপর তাকালাম না। মামাকে বললাম, ‘দেখুন গাছের উপর তাকিয়ে।’
মামা গাছের উপর তাকিয়ে অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে বললেন, ‘কোথায় গেল ফাঁসির লাশ?’
অবাক হলাম মামার কথা শুনে। বলেন কী? আমিও তাকালাম গাছের উপর। সত্যিই তো লাশ নেই!
টিপ্পনি কাটলেন মামা, বললেন, ‘তোমার সে লাশ হয়তো রাতেই উড়ে চলে গেছে।’
ব্যাপারটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে আমার। নিজ চোখে রাতে লাশ দেখছি অথচ এখন কিছুই নেই। হাওয়া হয়ে গেল নাকি? এত সকালে এখানে কেউ আসেনি যে লাশ নিয়ে যাবে। তা ছাড়া, লোকজন এলে তো আমরাও দেখতাম। মামাকে বললাম, ‘ঠিক আছে কঙ্কাল দেখে যান।’
দুরু-দুরু বুকে গিয়ে ঢুকলাম পোড়োবাড়ির সেই কামরায়। ভেতরে ঢুকে ভাল মত চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম খাট ছাড়া আর কিছুই নেই। কেমন জানি গোলক ধাঁধায় পড়লাম আমি। গেল কোথায় সব!
মামা তো হেসেই খুন। বললেন, ‘মাতাল কোথাকার, আমার ডায়রিয়া দেখে হুঁশ হারিয়ে ফেলেছিলি, তাই না?’
মামার মন্তব্য শুনে আমার মন খারাপ হয়ে গেল।
সেখানে আর না দাঁড়িয়ে থেকে আমরা তাঁবুর দিকে ফিরছি। ঠিক তখনই পিছন থেকে হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। থমকে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকালাম। এ কী! এ যে দেখি রেশমা দাঁড়িয়ে আছে। মামা আবারও আমাকে টিপ্পনি কেটে বললেন, ‘কী রে, তোর ফাঁসির লাশ তো ভালই হাসতে জানে। খুব সুন্দর হরর গল্প শুনিয়েছিস।’
কথা না বলে তাঁবুতে দু’জন ফিরে এলাম।
তাঁবুতে ফিরে এসে জিনিস-পত্র গোছগাছ করে বাড়ির পথ ধরলাম। ভাবলাম যত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর পথে একদল জেলের সাথে দেখা হলো। লক্ষ করলাম, জেলেরা আমাদের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু বলার আগেই একজন জেলে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা এত সকালে কোথা থেকে এসেছেন?’
বললাম, ‘নীলকুঠি হ্রদ থেকে।
নীলকুঠি হ্রদের নাম শোনার সাথে সাথে তাদের মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল। তারা আমাদের আপাদমস্তক আরেকবার তাকিয়ে বলল, ‘নীলকুঠি হ্রদ।’
মামা বললেন, ‘কেন, কী হয়েছে?’
জেলেরা বলল, ‘ওই জায়গায় সাধারণত কেউ যায় না। গেলে অমঙ্গল হয়…’ পুরো কথা শেষ না করে তারা দ্রুত হেঁটে চলে গেল। মামা জেলেদের কথা শুনে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। বুঝতে পারলাম, মামা এইবার ভয় পেয়েছেন। কোন কথা না বলে আমাকে তাড়া দিলেন দ্রুত হাঁটার জন্যে।
আলম শাইন
