২. আদিম রাত্রির ঘ্রাণ
মৌপিয়া হালদারের বডিটা আবিষ্কার হয়েছে বিশাল ধানক্ষেতের ঠিক মধ্যখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পাম্প-হাউজ থেকে। বৃহস্পতিবার ভোরবেলা, জামাল সর্দার, যে কিনা ওই পাম্প-হাউজের অপারেটর এসে দেখেছিল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সে কাছেই এক কারখানায় নাইট-শিফট করে। চাবি তার কাছেই থাকে, ইউনিফর্মের পকেটে। সকালে কারখানা থেকে পাম্প হাউজের কাছে এসে সে দেখে চাবি পকেটে নেই। অথচ পাম্প হাউজের দরজা সাঁটিয়ে বন্ধ। সন্দেহ হওয়াতে, পিছন দিক দিয়ে এসে ঘরের ভেতর উঁকি মেরে আঁতকে ওঠে। ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা ছিল ভয়ঙ্কর। মাটিতে চিৎ হয়ে পড়েছিল এক তরুণী। পরনে সালোয়ার কামিজ। হাঁটু থেকে ভাঁজ করা বাঁ-পা। ডান পা সোজা। মুখ দেখে অবশ্য চেনা যায়, মেয়েটি স্থানীয় মণিরঞ্জন হালদারের ছোট মেয়ে। দুর্দান্ত মেধাবী, মাধ্যমিকে প্রথম দশের মধ্যে ছিল। উচ্চমাধ্যমিকেও দুর্দান্ত রেজাল্ট করার পর সম্প্রতি মেডিকেলে চান্স পেয়েছিল। আগামী মাসের বিশ তারিখে তার দিল্লি যাওয়ার টিকিট কাটা হয়েছিল।
“মণিরঞ্জন হালদার এ অঞ্চলের বেশ কেউকেটা মানুষ। ছিলেন রেলের স্টেশন ম্যানেজার, বর্তমানে রিটায়ার করে নবগ্রামেই থাকছেন। প্রচুর জমিজমার মালিক। রুলিং পার্টির মেম্বার, ঘোর পার্টি পলিটিকস করেন, সামনের ইলেকশনে নামার প্রভূত সম্ভাবনা। জামাল সর্দার ভয় পেয়ে লোক ডাকাডাকি শুরু করে, থানায় খবর আসে। ঠিক ছটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে আমি আর নিতাই দাস, সিনিয়র কনস্টেবল, আমরা দুজন পাম্প হাউজের সামনে পৌঁছাই। ম্যাজিস্ট্রেট স্যারকেও খবর দেওয়া হয়েছিল। উনি আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। আমাদের উপস্থিতিতে পাম্প হাউজের দরজা ভাঙা হয়। মণিরঞ্জন হালদারের বাড়িতে আগেই খবর পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন সেই সময়ে।” নবগ্রাম থানার ওসি রণদীপ সামন্ত রিপোর্ট দিচ্ছিলেন।
“পিছনের জানালাটায় কি রড লাগানো ছিল?”
“হ্যাঁ, অনেকদিনের পুরোনো ফ্রেম তো। খুলে নিয়ে খুনি বাইরে বেরিয়েছে।” পোস্টমর্টেম রিপোর্টটার ওপর চোখ বুলিয়েছিলাম কাল রাতেই, অফিস থেকে ফাইলটা তুলে তারপর বাড়ি ঢুকেছিলাম। কেস রিপোর্টও জমা দিয়েছে লোকাল থানা। কিন্ত ফার্স্ট হ্যান্ড রিপোর্ট প্রথম ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের কাছ থেকে সরাসরি শুনতেই পছন্দ করি আমি। এখন বেলা বারোটা, পাম্প-হাউজটার চারপাশে আমাদের দেখে বেশ ভিড় জমেছে। ক্রাইম-সিনে আরও তাড়াতাড়ি পৌঁছানো দরকার ছিল। অলরেডি দু’দিন হয়ে গেছে।
“খুনের পরে রেপের ব্যাপারটা দেখেছেন! বায়োলজিকাল রেপ নয়, গোল এবং সরু কোনো লাঠি জাতীয় কিছু ঢুকানো হয়েছে ভ্যাজাইনায়! ভাবুন, কী বিকৃত মানসিকতা!” সামন্ত বলতে বলতে দম নিলেন।
“হুম!”
“ভিক্টিমের হাতের কটা নখ ভাঙা ছিল। পাম্পঘরের মেঝের ধুলোতে ধস্তাধস্তির ছাপ ছিল।” সামন্ত আরও ইনপুট দিচ্ছিলেন।
পাম্প-হাউজটা আকারে আটফুট বাই ছয়ফুট। মেঝেতে এই মুহূর্তে কিছু নেই। পাম্পের মোটরটায় সদ্য সবুজ রঙ করা হয়েছে, একটা সিমেন্টের বেদীর ওপর বসানো রয়েছে। শুকনো রঙের কৌটোটা এখনও পড়ে আছে পাশে। দেখে বোঝা যায় রঙ এখনও শোকায়নি।
“কৌটোটা এখানেই ছিল?”
“হ্যাঁ, বোধহয় ম্যাডাম।” সামন্তকে একটু বিভ্রান্ত দেখায়।
“ফুটপ্রিন্টস নেওয়া হয়েছে তো?”
“হ্যাঁ। কিন্তু পজিটিভ কিছুর চান্স কম স্যার। অনেক মানুষের আনাগোনা এ ঘরে।”
“জামাল সর্দারকে আবার ইন্টারোগেশনে ডাকুন। কারা কারা পাম্পঘরে আসত, তাদের সবারটার সঙ্গে ম্যাচ করানোর দরকার। ডেড বডির কাছে কিছু পাওয়া গেছে?”
“একটা জগন্নাথের ছবি দেওয়া ব্যাগ। মিডিয়াম সাইজের ব্যাগ, লম্বা হাতলযুক্ত।”
“ব্যাগটায় কিছু ছিল?”
“হ্যাঁ। একটা স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার উইথড্রয়াল স্লিপ, ব্ল্যাঙ্ক। আর একটা চাবির থোকা।”
“ফিঙ্গারপ্রিন্টে গেছে?”
“হ্যাঁ, ওইদিনই।”
“ব্লাড আর বডি ফ্লুইড?”
“হ্যাঁ, এসিপি স্যার ফরেনসিকের লোক পাঠিয়েছিলেন। পরনের জামাকাপড়ও পাঠানো হয়েছে স্যার।” রণদীপ সামন্ত বলেই জিভ কাটলেন। “ইয়ে স্যরি ম্যাডাম… আসলে অভ্যেস নেই, স্যার স্যার বলে বলে চাকরির তিরিশটা বছর কেটে গেল… তবে, এখন দিনকাল পাল্টেছে, আপনার মতো ভদ্রঘরের মেয়েরা এসব লাইনে…”
“আপনি কী করে জানলেন আমি ভদ্রঘরের মেয়ে?”
“কী যে বলেন ম্যাডাম!” রণদীপ সামন্ত আকাশ থেকে পড়লেন। “এই পার্সোনালিটি, এই… ইয়ে কী বলে দীপ্ত চেহারা এসব কি সাধারণ মেয়েছেলের ব্যাপার নাকি!”
“ওটা দীপ্ত নয়, দৃপ্ত।”
“অ!”
সামন্তবাবুর কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেললাম। আজ সকালে যখন থানায় পৌঁছেছিলাম, উনি ছিলেন না। কনস্টেবল ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন রণদীপ বাবু ইলেকট্রিসিটি অফিসে গেছেন। গত চারমাস থানার ইলেকট্রিক বিল জমা পড়েনি বলে নোটিশ এসেছে। ফান্ডে টাকা নেই বলে ইলেকট্রিক অফিসের সঙ্গে কথা বলতে গেছেন ওসি স্যার।
“অন্য ফান্ড থেকে ম্যানেজ করা গেল না?” রণদীপবাবুকে প্রশ্ন করলাম। “সারা মাসে স্যার দেড়শ লিটার গাড়ির ডিজেলের জন্য টাকা আসে। কনটিনজেন্সি ফান্ড নেই। সেই টাকা ফুরালে একে তাকে ধমকে কোনোমতে চালাই। কোথা থেকে ম্যানেজ করব স্যার?” রণদীপ সামন্ত আবার জিভ কাটলেন। গত একঘন্টায় এই নিয়ে ছ-বার। ভদ্রলোক অনেকটা সিনিয়র আমার থেকে। তবে গ্রামীণ বা আধা শহুরে এলাকায়, ডিডি থেকে কাউকে পাঠালে, তাঁর র্যাঙ্ক নয়, বরং ডিডির কৌলিন্য বেশি ধারে কাটে।
“আর কিছু নোটিসেবল জিনিস পেয়েছিলেন এখান থেকে?” প্রশ্ন করলাম। “ওই পাম্পঘরটা ম্যাডাম যতরাজ্যের আস্তাকুঁড়, বুঝেছেন কিনা! সন্ধে নামলেই মদ-মেয়েমানুষের আসর বসে। ওই জামাল সর্দার, ওই শালা টাকা নিয়ে পাম্পঘর খুলে দেয়। এখানে কী ছিল না! সিনেমার টিকিট, সিগারেটের টুকরো, বিয়ারের বোতল, কনডম, তারপর গিয়ে ধরুন মিনারেল ওয়াটারের বোতল।”
“সে সব ফরেনসিকে পাঠিয়েছেন?” পাম্পঘরের মেঝেতে জমে থাকা কালো রক্তের ছাপ দেখতে দেখতে বললাম। চকমার্ক দিয়ে ডেডবডির লোকেশন বোঝানো আছে।
রণদীপ সামন্ত হেসে ফেললেন। “ম্যাডাম, আপনি নতুন কিনা, তাই জানেন না। যা যা সিজার লিস্টে আছে ফরেনসিকে পাঠালে বছর দশেক লাগিয়ে দেবে রিপোর্টে। এতেই দেখুন না কদিন লাগায়।”
“পাম্পঘরের জানালাটার রড খুলে খুনি পালিয়েছে। জানালার নিচে কোনো ফুটপ্রিন্ট পেয়েছে ফরেনসিক?”
“নাহ ম্যাডাম। জানালার নিচে বিচুটি গাছ, ঘন নলঘাস। ওদিকে কেউ যায় না। ফলে গিজগিজে ঘাস, মাটি নেই। ফুটপ্রিন্ট পাবে কীভাবে!”
“পিছনদিকটায় কী আছে চলুন তো দেখি।” জানালাটা দিয়ে উঁকি মেরে বললাম।
পাম্পঘরের জানালার বাইরে সত্যি ফুট তিনেকের বড় ঘাস। জানালার কার্ণিশ ছুঁই ছুঁই। আরও বিচিত্র ধরণের ছোট ছোট গাছ, বেশিরভাগই আগাছা জানালা দিয়ে কেউ বেরোতে চাইলে, তাকে ছোট্ট একটা লাফ দিতে হবে। গাছগুলোর ওপর ঝাঁপানোর ফলে কিছু লতাপাতার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটবে। সেটা যে হয়েছে তা খালি চোখে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। জংলা জায়গাটায় চারধারে পায়েচলা রাস্তার চিহ্ন নেই। ধানিজমি শুরু হয়েছে।
“কিন্তু জানালা দিয়ে বেরোলো কেন?”
“কিছু বললেন?”
“বললাম, খুনটা করে দরজায় তালা দিয়ে বা দরজাটা খুলে রেখে বেরোলো না কেন?”
রণদীপ সামন্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“খুনিকে পালাতে গেলে তিনটে রাস্তার যে কোনো একটা বাছতে হবে।” আমি সামন্তর দিকে তাকিয়ে বললাম। “দরজা খুলে বেরিয়ে যদি ডানদিকে যাই তবে মৌপিয়াদের পাড়াটা, আর বাঁদিকে সোজা গেলে মেইন রোড। রাস্তায় প্রায় চার হাত দূরে একটা ল্যাম্পপোস্ট। কিন্তু জানালা দিয়ে বেরোলে ধানি জমি অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া সোজা। কাজেই খুনি কারুর চোখে পড়ে যাওয়ার রিস্কটা থেকে বাঁচতে চাইছিল।”
“কিন্তু অত রাতে কে দেখবে?”
“সেটাই তো মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন।” বললাম আমি। “রাস্তাটা ভালো করে দেখেছিলেন? কিছু পড়ে টড়ে ছিল?”
“হে হে স্যার, সিনেমা সিরিয়ালে খুনিরা ওসব ব্লু-টু ফেলে ছড়িয়ে যায়। আমাদের কি আর অত ভাগ্য হয়?” রণদীপ সামন্ত দাঁত বার করলেন।
“সুরতহালের রিপোর্টটা দেখি।” গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করলাম।
ফাইলটা বাড়াতে বাড়াতে সামন্তবাবু বললেন, “আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল স্যার, ইয়ে ম্যাডাম। মণিরঞ্জন হালদার তার বাড়ি থেকে এক লাখ বিশ হাজার টাকা খোয়া যাওয়ার রিপোর্ট লিখিয়েছেন। ধান কাটার আগে লেবার পেমেন্টের জন্য তুলে এনেছিলেন। আর ওই ব্ল্যাঙ্ক স্লিপটা দিয়েই প্যাঁচানো ছিল বলেছেন আমার তদন্তে।”
“পেঁচিয়ে কোথায় রেখেছিলেন?”
“আলমারির লকারে।”
“ওই স্লিপটাই যে এটা তা কী করে কনফার্মড হচ্ছেন?”
“ঐরকমই একটা দিয়ে মোড়ানো ছিল। সই করা ছিল স্লিপে।”
“চাবিটা আইডেন্টিফাই করেছেন?”
“হ্যাঁ, ওরই বাড়ির চাবি।”
“হুম। আঠারো বছরের সাবালিকা মেয়ে ঘর থেকে লাখখানেক টাকা এবং
বাড়ির চাবি নিয়ে গভীর রাতে বেরিয়ে আসে। তার মানে ফেরার ইচ্ছা ছিল! মৃত্যুর সময়টা তো দেড়টা থেকে দুটো বলেছে অটোপসিতে?”
“হ্যাঁ।”
“মণিরঞ্জনবাবু কীভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?”
“আজ্ঞে?”
“সকালে যখন অকুস্থলে পৌঁছালেন, ওঁর বাড়ির গেটে তালা দেওয়া ছিল না খোলা ছিল গেট?”
“বন্ধ! বাইরে থেকে তালা বন্ধ করা ছিল।” রণদীপ সামন্ত যেন এতক্ষণে বুঝলেন। “উনি লোকজনের কাছে খবর পেয়ে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে গেট খুলে বাইরে আসেন।”
“বেশ! আরেকটা ব্যাপার, এই বিধান ছেলেটিকে কীসের ভিত্তিতে গ্রেফতার করলেন?”
“ও শালা বালপাকনা ছেলে স্যার।” সামন্ত হড়হড় করে বলতে শুরু করলেন। “এই নবগ্রামে হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ত ভিকটিমের সঙ্গে। ভিকটিমের থেকে বছর দুয়েকের সিনিয়র। এখন বদসঙ্গে পড়েছিল, বুঝলেন কিনা! দুজনের কিছু একটা ছিল, বেশ মাখো মাখো কথা বলতে দেখা গেছে দুজনকে স্কুলের সামনে বেশ কয়েকবার, মৌপিয়ার বন্ধুরা সাক্ষ্য দিয়েছে। আর ওই বিধানকে সকালে জামাল সর্দার দেখেছিল পাম্প-হাউজের জানালায় দাঁড়িয়ে উঁকিঝুকি মারছে। জামালকে দেখেই নাকি তাড়াতাড়ি সাইকেল চালিয়ে পালিয়েছে। ওটাকে কাস্টডিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময়ও কিছু বলেনি সেদিন রাতে কোথায় ছিল। দু-চারটে চড় থাপ্পড়ও খেয়েছে।”
“দু-চারটে?”
“এমনিতে ও অনেক রাত অবধি নয়াবাঁধের মোড়ে আড্ডা দেয়।” সামন্ত ইঙ্গিতটা না বুঝেই কন্টিনিউ করলেন। “সেদিন ও আড্ডায় ছিল না, সাক্ষীরা কনফার্ম করেছে। তারপর তো আপনি ডি.এস.পি. স্যারের কাছে শুনেইছেন যে ওর পার্টির ছেলেরা থানা ঘেরাও করেছিল।”
“পার্টি?”
“হ্যাঁ। বিধান পলিটিকস করে তো। মণি হালদারের রাইভাল পার্টি।” সামন্ত গলা নামিয়ে বললেন। “খুব সমস্যা ম্যাডাম বুঝলেন কিনা! সৎভাবে পুলিশে কাজ করা খুব চাপ। আপনি তো নতুন…দেখুন!” রণদীপ সামন্ত থেমে গেলেন।
আপনি তো নতুন, কতদূর কী করতে পারেন শব্দগুলো উহ্য কিন্তু সহজবোধ্য। আজকাল আর গায়ে মাখি না। কিন্তু গণ্ডগোল বাঁধিয়ে রেখেছে বিধান। ও যে অ্যাকটিভ পলিটিকস করে, গণেশদার মুখে কোনোদিন শুনিনি। সামন্ত ওকে অ্যারেস্ট করার পর ওর পার্টির ছেলেরা থানা ঘেরাও করে। ম্যাজিস্ট্রেটও আর ঝুঁকি না নিয়ে জুডিশিয়াল কাস্টডিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পুলিশ কাস্টডি এক্সটেন্ড করলে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাওয়া যেত। জুডিশিয়ালের জন্য স্পেশাল পারমিশন করাতে হবে। বহু ঝামেলা সেসব। এই কেসটায় সবার আগে বিধানের সঙ্গে কথা বলার দরকার ছিল।
“জামাল সর্দার ওর বয়ানে কী বলেছে? ও সেদিন বিধানকে পাম্পঘরে উঁকি মারতে দেখেছিল?” জংলাটা ভালো করে লক্ষ করতে করতে প্রশ্ন করলাম।
“হ্যাঁ। আমি ডেড শিওর স্যার ওই বিধানই…”
“বৃহস্পতিবার রাত দুটোর সময় ছেলেটার মোবাইল লোকেশন ট্রেস করেছেন? আর এই মৌপিয়া হালদারের ফোনটা কোথায় ছিল?”
“মোবাইল বাড়িতেই ছিল স্যার; মোবাইল নিয়ে বেরোয়নি।”
“আর বিধানের মোবাইল লোকেশন?”
“ওটা বার করতে দেওয়া হয়নি স্যার।”
“লোকেশনটা ট্রেস করতে দিন। বিধানের সাঙ্গপাঙ্গ আর মৌপিয়া হালদারের বাড়ির প্রত্যেকের মোবাইলের লোকেশন ট্রেস করতে দেবেন। বিধানের গায়ে কোনো আঁচড়-টাচড়ের দাগ?”
রণদীপ সামন্ত আমার দিকে তাকালেন।
“পোস্টমর্টেমে তো লেখা মৃত্যুর সময়ে প্রচুর স্ট্রাগল করেছে ভিকটিম।
আসামীর গায়ে স্ক্র্যাচ থাকবে তো এক-আধটা!”
“না, মানে ওসব কিছু ছিল না।”
“আর, ওর বাড়িতে বা ওর বন্ধুদের বাড়িতে খানাতল্লাশি করেছেন তো? মার্ডার ওয়েপনটা দরকার।”
“হ্যাঁ। কিছু পাইনি স্যার।”
“বাহ! বিধানকে গ্রেফতার করার আগে মিনিমাম গ্রাউন্ডওয়ার্ক করবেন তো? মোবাইল লোকেশন যদি না ম্যাচ করে, বেকার কেস খাবেন। কেস এর পর দায়রাতে উঠবে, ভালো উকিল হলে জামিন পেয়ে যাবে।”
রণদীপ সামন্তর মুখের ভাবটা একটু পাল্টাল। এতক্ষণ বিনয়ভারে ভারাক্রান্ত যে মানুষটাকে দেখছিলাম সেটা পাল্টে আহত শার্দূলের মতো লাগছিল ওঁকে।
“পলিটিকাল প্রেশার?” একটু সমব্যথীর গলায় বললাম।
সামন্ত উত্তর দিলেন না।
“অটোপসি-সার্জন কটা অবধি থাকেন হাসপাতালে?” গাড়িতে উঠতে উঠতে জিজ্ঞাসা করলাম।
সামন্ত বিড়ির প্যাকেট থেকে বিড়ি বার করে জ্বালালেন। উত্তর দিলেন না।
“টাইগারটা বেশি ভালো।”
সামন্ত বুঝতে না পেরে আমার দিকে তাকালেন।
“বলছি, টাইগারটা ট্রাই করেছেন? কিসমতের বিড়িটায় সেই মৌতাতটা আসে না।”
রণদীপ সামন্ত বিড়িটায় টান দিতে ভুলে গেলেন।
