বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

সব হারিয়ে দম ফুরিয়ে

সামন্ত দুম দুম করে সারা থানায় হাঁটছিলেন। সাকুল্যে একজন এস. আই আর একজন কনস্টেবল। বাড়ি বাড়ি ঘুরে দিন তেরোর মধ্যে কারুর অ্যালার্জি, জ্বর, হাত-পা ফোলা এসব উপসর্গ হয়েছিল কিনা খোঁজ নিতে বলায় সামন্ত দৃশ্যতই মুষড়ে গেছেন। সামন্তর সোর্সের নেটওয়ার্কও সেরকম জবরদস্ত নয়। জামাল সর্দার বা মণি হালদারের অ্যালার্জি হয়েছিল কিনা জানতে সামন্তকে যেতে বলেছিলাম। পেটে কদিন ধরে ভীষণ ব্যথা হচ্ছে বলে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাবেন বললেন।

এবার হয়ত সত্যিই গণেশদার হেল্প নিতে হবে। মাথার মধ্যে নানারকম সম্ভাবনা ঘুরছিল। অনেকগুলো রাস্তা অবশেষে একটা লোকের কাছে গিয়ে শেষ হচ্ছে। জংলা গাছের সংস্পর্শে আসার ফলে হাতে পায়ে অ্যালার্জি বাঁধানো, পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির, তিরিশের আশেপাশে বয়সের, এমন এক খুনি যে ক্রাইমটা করার সময় ইতস্তত করেছিল, ঘাবড়ে গিয়েছিল। একটি আঠারো বছরের সদ্যযুবতী মেয়েকে হাতের মুঠোতে পেয়েও সে ধর্ষণ করেনি অথচ ধর্ষণ প্ৰতিপন্ন করতে চেয়েছে। এইখানেই আসল জট পাকিয়ে আছে, এখানেই খুনির মানসিকতা আমার কাছে পরিষ্কার নয়।

শ্রীবাস্তবের মেলটা পড়েই ছিল মেইল বক্সে। নানা কাজের মধ্যে মেইলটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। ইনফর্মাল একটা দু লাইনের চিঠি আর ফিনিশড উইথ এ রোমান্টিক নোট; কলকাতায় আসলে ডিনার ডিউ। মালটার সাহস আছে!

সঙ্গের যে লিঙ্কটা খুলল সেটা একটা স্পেসিফিকেশন সামারি। বিভিন্ন মডেলের এবং টাইপের ডিস্কের ডাইমেনশন। শ্রীবাস্তব লিখেছেন, ওয়েপন সার্চের সম্ভাব্য লিস্ট থেকে ওয়েট ট্রেনিংয়ের যে কোনো ধরণের চাকতিগুলোকে বাদ দিতে। ওই মাপের কোনো চাকতির অত কম ওজন নেই। তবে কী সেই মহার্ঘ্য বস্তুটি!

মণি হালদারের বাড়িতে গিয়ে বেল বাজাতে কবিতা দরজা খুলল। আমাকে দেখে মুখ অন্ধকার হল। সেটা স্বাভাবিক।

হালদারবাবু বাড়িতে নেই। বর্ধমান গেছেন। একঘন্টার মধ্যে ফিরবেন। বাড়িতে মিসেস হালদার একা। একটু দেখা করা যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করাতে কবিতা ভেতরের ঘর দেখিয়ে দিলো, আমার পিছন পিছনও এল।

মিসেস হালদার বিছানায় শুয়েছিলেন। জেগেই আছেন, কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে নিঃস্পন্দ তাকিয়ে ছিলেন। পাশের টেবিলে একগাদা ওষুধ রাখা। পাশের চেয়ারটা টেনে বসাতে মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। আগের দিনের মতো শূন্যদৃষ্টি নয়, বরং চোখেমুখে ক্ষোভ ফুটে উঠল। আমি কথা বলতে চাইছিলাম, কিন্তু কীভাবে শুরু করব বুঝছিলাম না। গলা খাঁকড়িয়ে বললাম, “আপনি কি এই ঘরেই থাকেন সবসময়?”

মিসেস হালদার মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললেন।

“এখন কেমন আছেন” প্রশ্নের উত্তরে এমন তীব্র দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন যে মনে হল পুড়ে যাব। উত্তর দিলো কবিতা।

“ভালো নেই একেবারেই। ঘাড়ের ব্যথা বেড়েছে। মাথা সোজা করে বসে থাকতে পারে না। মাথা ঘোরায়।”

“স্পন্ডিলাইসিস নাকি?”

“হ্যাঁ। ট্রাকশন দেয় তো। বাবু কদিন ধরে আসতেছে না।” কবিতা ঘরের কোণে রাখা একটা ট্রাকশন সেটের দিকে দেখাল।

“ওটা তো নিজে থেকেই নেওয়া যায়। সেটটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললাম। কদিনের অসুখ?”

“অনেক দিনের। বাবু হপ্তায় দুদিন করে আসে, পায়ের ব্যায়াম, হাতের ব্যায়াম করায়, ট্রাকশন দেয়, তারপর যায়।”

“বাবু মানে কোন বাবু?”

“কেন? আনন্দবাবু।” কবিতা মিসেস হালদারের দিকে জলের গ্লাস বাড়াতে বাড়াতে বলল।

“ও! এখন বন্ধ কেন?”

“কী জানি! ছোড়দি মরে গেলে পরে আর আসেনিকো। শুনি নাকি কী শরীর খারাপ করেছে।” কথাটা বলে কবিতা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাল। ওর হয়তো মনে পড়েছে এ বাড়িতে মৌয়ের মৃত্যুর কথা বলা এখন বারণ।

ট্রাকশন সেটটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সার্ভাইকাল ট্রাকশন সেট।

দেওয়ালের সঙ্গে লাগানো একটা ক্ল্যাম্পের সঙ্গে একটা হ্যাঙ্গার লাগানো, ফিক্সড দুটো পুলি থেকে একটা ইলাস্টিকের ব্যান্ড ঝুলছে, তার এক দিকে চিবুকটাকে শক্ত করে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য একটা চিন প্যাড আটকানো, আর অন্যদিকটায়!

অন্যদিকটা ভালো করে খেয়াল করতেই আমার হার্টবিট বেড়ে গেল।

“কোথায় বাড়ি ছেলেটার?” এত জোরে চিৎকার করলাম যে কবিতা চমকে গেল।

*******

সামন্ত বললেন, “সার্চ ওয়ারেন্ট আছে, তোমার বাড়ি সার্চ করব।” সামন্ত হতচকিত ভাবটা এখনও কাটাতে পারেননি।

আনন্দ মুখ চুন করে দাঁড়িয়েছিল। ভাঙা গলায় বলল, “এর মানে?”

“মানে এলাকায় একটা খুন হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস মার্ডার ওয়েপন আর মার্ডারার এই বাড়িতেই পাওয়া যাবে।” আমি উত্তর দিলাম। “বাড়ি অলরেডি ঘিরে ধরেছে পুলিশ। পালাবার চেষ্টা করো না।”

আনন্দ রক্ষিতের বাড়িটা ছোটখাট। একটা ঘরই পাকা, তাতে ছোট একটা টিভি, একটা পুরোনো দিনের আলমারি, দেওয়ালে ঝোলানো আয়না রয়েছে।

বাকি ঘরগুলোয় অ্যাসবেসটসের ছাদ দেওয়া। এক বৃদ্ধ খাটের ওপর বসে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন।

আনন্দ ঘরে ঢুকে বলল, “কী দেখবেন দেখুন।”

“বেশি কিছু না, তোমার ফিজিওথেরাপির সরঞ্জামগুলো দেখালেই চলবে।” আনন্দর মুখের ওপর হঠাৎ নিরাশার একটা কালো পর্দা নেমে এল। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে একটা চেয়ারের ওপর বসে পড়ে আনন্দ খাটের তলার দিকে হাত বাড়াল।

কনস্টেবল একটু ঝুঁকে চালের বস্তা, কাঠের পিঁড়ি, প্লাস্টিকের টুল সরিয়ে একটা প্যাকেট টেনে বার করল। প্যাকেটে একটা ট্রাকশন ওয়েট আর তুলি রাখা। তুলির ফেদারগুলোয় এখনও পাম্পের সবুজ রঙ লেগে! স্টেমটার সরু অংশটায় এখনও লেগে রয়েছে লালচে ছোপ। ওয়েটটা প্যাকেট থেকে বার করে দেখা গেল যে সেটা খাঁজকাটা, রিমটা আন্দাজ দু-ইঞ্চি চওড়া হবে। আর ওজন কিছুতেই এক কেজির বেশি হবে না। ওয়েট ট্রেনিংয়ের জন্য ব্যবহার হয় না বলেই শ্রীবাস্তবের পাঠানো লিস্টটায় এর উল্লেখ নেই।

কনস্টেবল সেদুটো রুমালে ধরে আমার দিকে বাড়াতেই আনন্দ দুহাতের মধ্যে মুখ চেপে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল। পাশের ঘর থেকে বৃদ্ধ বেরিয়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, “কী করেছে? কী করেছে ও?”

সেদিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, “তোমার গলায় ওগুলো কীসের দাগ আনন্দ? জামাটা খোলো।”

ছেলেটার বুকের ওপর দিক থেকে গলার নিচ অবধি কটা লম্বা লম্বা চেরা দাগ এখনও দেখা যাচ্ছে। হালকা, কিন্তু আছে!

সামন্ত একটা সাদা প্যাকেট বাড়ালেন আমার দিকে। আনন্দ রক্ষিতের নাম লেখা হোমিওপ্যাথিক বড়ির শিশি!