আমার মুখ লুকিয়ে থাকে জানা অজানার ভিড়ে
মণিরঞ্জন হালদার সোফায় গম্ভীরভাবে বসেছিলেন। দূরে খাটে তাঁর স্ত্রী। ঘরের দরজায় বড় মেয়ে প্রিয়াঙ্কা দাঁড়িয়েছিল। কথা বলতে বলতে মণিরঞ্জন হালদারের ঘরের চারপাশে তাকাচ্ছিলাম। বাড়িতে প্রচুর আসবাবপত্র, কিন্তু কোনোটাই সাজানোগুছানো নয়। ঢোকার মুখের গেটটার পাশেই আবর্জনার স্তূপ। বাড়িটা পুরোনো এবং রঙ পড়েনি অনেকদিন।
মেইন রোড থেকে মণিরঞ্জন বাবুদের পাড়াটা প্রায় আটশ মিটার মতো রাস্তা পাম্পঘরটা সেই রাস্তাটার প্রায় মাঝপথে, বাঁদিকে একই লাইনে পড়ে। পুরো রাস্তাটার ডান বাঁদিক জুড়ে ধানক্ষেত। মেইন রোড পার করে ওপারে বেশ কিছুটা হাঁটলে স্টেশন, সংলগ্ন রেল কোয়ার্টার। মণিবাবুর পাড়ায় বাড়ির সংখ্যা হাতগুণতি। দূরে দূরে
আমি একটা আর্মচেয়ারে বসে ছিলাম, যার হাতলগুলোয় পুরু ধুলো জমেছে। পর্দার রঙ কোনোকালে হলুদ ছিল, এখন ধুলো জমে জমে ধূসর হয়ে গিয়েছে। মণিবাবুর স্ত্রী, এবং দুই মেয়ে থাকা সত্ত্বেও বাড়িঘর এত অগোছালো কেন! কাজের লোকেরও অভাব নেই। মেয়ের মৃত্যুর শোকে এমনটা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। মাত্র দুইদিনের ব্যবধানে কোনো সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারে এতটা ধুলো ময়লা জমতে পারে না।
ইতিমধ্যে কেসের ডেভেলপমেন্ট উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি; ভিকটিমের সঙ্গে থাকা ব্যাগ, ব্যাংক স্লিপ এসবের ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিপোর্ট এসেছে। মৌপিয়া আর মণিরঞ্জন ছাড়া আর কারুর হাতের ছাপ নেই। পাম্প যে লোক রঙ করেছিল সে সেইরাতে বাড়িতেই ছিল, সাক্ষী আছে। রঙ করে রঙ করার তুলি সে ওই ঘরেই রেখে এসেছিল, তারপর কোথায় গেছে সে জানে না। রণদীপ সামন্ত গোটা আঠারো ঘন্টা থানায় তাকে আটকে রাখলেও সে একই কথা বারবার বলে গেছে। ফরেনসিক থেকে আসা কোনো রিপোর্টও আশাপ্রদ নয়। কোনো লিড নেই। বিধানের মোবাইল লোকেশনের রিপোর্ট এখনও আসেনি। সামন্তকে লোকাল এবং বর্ধমান শহরের সব ওষুধের দোকানে গত একমাসের মধ্যে ল্যাটেক্স গ্লাভস সিঙ্গল পিস কারা কারা কিনেছিল তার একটা লিস্ট বানাতে বলেছি। খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আপাততঃ দুটো সলিড ব্লু, ফসফরাস আর পেইন্টব্রাশ।
মণিরঞ্জন হালদারকে দেখে যতটা না শোকগ্রস্ত মনে হচ্ছিল, তার থেকে ঢের বেশি ক্রুদ্ধ লাগছিল। নাতিদীর্ঘ, বৃষস্কন্ধ, শক্তপোক্ত চেহারা। মাথায় কাঁচাপাকা ঘন চুল। আপাতত কপালে চারটে ভাঁজ; বিধান যে জামিনে ছাড়া পেতে পারে, আমার এই মন্তব্যটা মণিবাবুর কানে পৌঁছেছে। রণদীপ সামন্ত ভালোই প্রেশার রিলিজ করতে জানেন, যা বুঝলাম।
রুটিন কোয়েশ্চেনিং শুরু করলাম। প্রথমেই মণিবাবুকে।
“মৌপিয়া সেদিন রাতে কটার সময় ঘুমিয়েছিল?”
“রাত বারোটা। আমরা সবাই ওই সময়েই ঘুমাই।”
“ওর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু খেয়াল করেছিলেন? কোনো ধরণের রেস্টলেসনেস?”
“নাহ। রোজ যেমন আমরা একসঙ্গে খাই, সেরকমই খেয়ে ও বারোটা নাগাদ ওপরে চলে গিয়েছিল।”
“আপনাদের মেইন গেটের চাবি কোথায় রাখা থাকে?
“ডাইনিং রুমের দেওয়ালে, হুকে আটকানো থাকে। আর ডুপ্লিকেট চাবির গোছা ড্রয়ারে থাকে।”
“আর আলমারির চাবি?”
“ওই একই জায়গায়, এই ঘরের ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ারে। ড্রয়ার চাবি দেওয়া থাকে আর চাবিটা বালিশের নিচে থাকে।”
“টাকাটা শেষ কবে আর কখন দেখেছিলেন?”
“ওই দিনই দুপুরবেলা। পার্টির ছেলেরা এসেছিল, একটা ফান্ডে তিরিশ হাজার টাকা দিতে হতো। ওই বান্ডিলটায় দেড়লাখ টাকা ছিল, বাকি এক লাখ বিশ আমি নিজে গুনে আবার আলমারিতে রেখেছি।”
“আপনি দুপুরের পর আর আলমারি খোলেননি?”
“না। টুকটাক ক্যাশ ড্রয়ারেই থাকে, তাই দরকার পড়েনি।”
“মৌপিয়ার খবরটার পাওয়ার পরেও আলমারির চাবিটা ওখানেই ছিল? চেক করেছিলেন?”
“না। বডি মর্গ থেকে আনার আগে আবার আলমারি খোলার প্রয়োজন হয়। মানে শুক্রবার রাতে। তখন আলমারি খুলে দেখি, টাকা নেই।”
“তারপর কী করলেন?”
“থানাকে ইনফর্ম করলাম। ফিঙ্গারপ্রিন্ট থেকে এসে চাবিটা প্রিন্টের জন্য নিয়ে গেল।”
“এখন কীভাবে খুলছেন?”
“ডুপ্লিকেট চাবি ব্যবহার করে।”
“আপনি একটা কাজ করুন। আলমারিটা এ ঘরে খুলুন। আমি আসছি।” লাফ দিয়ে ওঠে বসার ঘরের দিকে এগোলাম।
“এখন!”
“খুলুন, খুলুন।” আমি বসার ঘরের দিকে এগোতে এগোতে চিৎকার করলাম।
মণিবাবু শুনতে পেলেন কিনা জানি না। তবে বসার ঘর শোওয়ার ঘরের মধ্যে ডাইনিং আর একটা লম্বা করিডর আছে। আলমারি খুললে আওয়াজ যাওয়ার কথা নয়। কোনো আওয়াজ এলও না।
“আচ্ছা এরকম তো হতে পারে আপনি ভুল করে টাকাটা অন্য কোথাও রেখেছেন?” ঘরে ফের ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞাসা করলাম।
“না। আমার এমন ভুল হয় না।” মণিরঞ্জন খোলা আলমারিটার কাছে দাঁড়িয়েছিলেন।
“টাকাটা মৌপিয়াকে আপনি নিতে দেখেননি। ব্যাংকের স্লিপটা হয়ত কাকতালীয়। কাজেই এটা তো সম্ভব যে এই দীর্ঘ সময়ে মানে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুক্রবার রাত অবধি যে কেউ টাকাটা সরাতে পারে?”
“না, পারে না। কারণ রাতে আমি ড্রয়ারের চাবি মাথার কাছে নিয়ে শুই। বৃহস্পতিবারও শুয়েছিলাম, ওর খবরটা পেয়ে যখন বেরোই তখন চাবি পকেটে নিয়ে বেরোই। তারপর থেকে চাবি আমার কাছেই ছিল। এক মুহূর্ত কাছছাড়া করিনি। টাকা গেলে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের আগেই গেছে। তাছাড়া ওই স্লিপটা দিয়েই টাকার বান্ডিল মোড়ানো ছিল। আমার সই আছে স্লিপটায়।”
“আপনার ড্রয়ারে যে ক্যাশ ছিল সেসব ঠিক ছিল?”
“পেটি ক্যাশ গোনা থাকে না আমার। তবে ঠিকই ছিল মনে হয়।”
“আন্দাজ কত ছিল ড্রয়ারে?”
“পাঁচহাজার মতো।”
“বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে রাত বারোটার মধ্যে আপনার মেয়ে এ ঘরে ঢুকেছিল? কেউ কি দেখেছে ওকে ঢুকতে?”
“না! কিন্তু ঢোকাটা অসম্ভব নয়। ঘর ফাঁকা ছিল বেশ কিছুক্ষণ। আমি পার্টির ছেলেদের সঙ্গে সামনের ঘরে বসেছিলাম। তখন এ ঘর ফাঁকা ছিল। ড্রয়ারের চাবিও তখন বালিশের নিচে ছিল।”
“সেদিন রাতে ঘুমানোর পর আপনি আর ওঠেছিলেন?”
“না। সকালে বাড়ির গেটে ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙে।”
“আর আপনার স্ত্রী?”
“না, ও ওঠেনি।”
“বৃহস্পতিবার দুপুরবেলা যখন আপনি বাইরের ঘরে ছিলেন, তখন মিসেস হালদার কোথায় ছিলেন?”
“সে পশ্চিমের ঘরটায় ছিল।”
“উনি কি কোনোকিছু দেখেছিলেন?”
“না, ওর বাঁ পা-টা বাতে প্রায় অকেজো। সাহায্য ছাড়া বিছানা থেকে উঠতে পারে না।”
“আপনার কী মনে হয়, অত রাতে টাকাগুলো নিয়ে আপনার মেয়ে কোথায় যাচ্ছিল?”
“কোথায় সেটা জানলে আগেই কি ঠেকাতাম না?” মণিরঞ্জন বিরক্তভাবে বললেন।
“হুম।” আমাকে একটা কথা বলুন মিস্টার হালদার, “মৌপিয়ার লিভার সংক্রান্ত কোনো সমস্যা ছিল?”
মণিরঞ্জন হালদার চমকে তাকালেন আমার দিকে। তারপর বললেন, “হ্যাঁ ছিল। বেশ কয়েকবার এখানকার ডাক্তার দেখানো হয়েছে। ওষুধ খায়, কিছুদিন ঠিক থাকে, আবার হয়। তবে রিসেন্টলি সমস্যাটা কমে এসেছিল।”
“কবে থেকে ছিল সমস্যাটা?”
“তা হবে…তিন চার বছর।”
“কাকে দেখাত?”
“প্রথমে এখানকার ডাক্তারকে। তারপর কলকাতার এক ডাক্তার দেখিয়েছিল নিজেই খোঁজ করে। তিনি কিছু খাবারদাবার বেঁধে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে সমস্যা হতে দেখিনি।”
“আপনার বাড়িতে রান্না কে করে?”
“আমার মেয়েই করত। সাহায্যের লোক ছিল।”
“সে কাছাকাছি থাকে? নাম কী?”
“কবিতা। পাশের গ্রামে থাকে।”
“আর আপনার স্ত্রী? উনি রান্না করেন না?”
“না, রান্না কেন যে কোনো কিছুর দায়িত্ব নিতে ও অক্ষম।” মণিরঞ্জন অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন।
আমার চোখ খাটে বসে থাকা মিসেস হালদারের দিকে গেল। ষাটের কাছাকাছি বয়স হবে মহিলার। আলুথালু শাড়ি, অবিন্যস্ত চুল এসব ছাপিয়ে চোখে পড়ছিল ভদ্রমহিলার চোখের অদ্ভুত শূন্যদৃষ্টি। এমন ভাবলেশহীন পাথরপ্রতিম শোকের মূর্তি কবে দেখেছি মনে পড়ে না।
“ওঁর কী ধরণের অসুস্থতা?”
“মানসিক। ডাক্তার কোনোরকম চাপ নিতে বারণ করেছে।”
চারিদিকে এত প্রাচুর্যের মধ্যে এত অগোছালো ভাবের কারণটা বুঝতে পারলাম।
“কত দিন অসুস্থ উনি?”
“অনেক দিন। কিন্তু তার সাথে আমার মেয়ের মৃত্যুর কী সম্পর্ক? ওকে তো ওই বিধান…”
“মিসেস হালদার কোন ডাক্তারকে দেখাতেন?”
মণিরঞ্জন থেমে গেলেন। “আগে সরকারি হাসপাতালেই দেখান হতো। মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি হলে মানকুণ্ডুর সরকারি মানসিক হাসপাতালের ডাক্তারকে। এখন পার্মানেন্টলি ওকেই দেখান হয়। কিন্তু…”
“ডাক্তারের নামটা একটু বলবেন। আর মিসেস হালদার আর মৌপিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত যা যা ফাইল আছে একটু আনতে বলুন কাউকে। আপাতত আমি নিয়ে যাচ্ছি, কপি করা হবে, আপনি থানা থেকে নিয়ে নেবেন।”
মণিরঞ্জন প্রিয়াঙ্কার দিকে তাকালেন। মেয়েটি ভেতরের দিকে চলে গেল। “এই ডাক্তার কতদিন ধরে প্রাইভেটে দেখছেন মিসেস হালদারকে?”
“এক দেড় বছর হবে।”
“হুম। আরেকটা খুব দরকারি বিষয়, আপনি অতগুলো টাকা ব্যাংক থেকে তুলে এনে বাড়িতে রেখেছিলেন?”
“হ্যাঁ, বছরের এই সময় ধান কাটা হয়, টাকা এনে রাখা থাকে বাড়িতে।” মণিবাবু কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলেন
“এত টাকা বাড়িতে রাখার খবরটা কে কে জানত?”
মণিবাবু ভুরু কুঁচকালেন।
“এত টাকা কে বলল আপনাকে? আপনি বর্ধমানের এ তল্লাটের চাষীদের ট্যাঁকের জোর জানেন?” মণিবাবু খোঁচা মারলেন বুঝলাম। গায়ে মাখলাম না।
“আপনার পরিবারের লোক বাদে আর কে কে জানত?”
“বাইরের যে কেউই আন্দাজ করতে পারে। প্রতি বছরই বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য পাঞ্জাব থেকে ধান কাটার মেশিন চালানোর লোক আনি, এবারও এসেছে। সুতরাং বাড়িতে টাকা আছে, এ তো জানা কথাই।”
“টাকাটা কবে তুলেছিলেন?”
“ডেট মনে নেই। দেখে বলতে হবে।”
“হ্যাঁ। ব্যাংকের মেসেজ তো আসে। ডেটটা একটু বলুন মোবাইল দেখে।”
“সতের তারিখ মানে সোমবার। ওই সপ্তাহেই।” মোবাইলের মেসেজ দেখলেন মণিরঞ্জন হালদার।
“এতদিন ধরে টাকাটা আলমারিতেই ছিল?”
“হ্যাঁ। আর কোথায় থাকবে? শুক্রবার পেমেন্ট দেওয়ার কথা ছিল, তাই তুলেছিলাম। মধ্যখানে একবার পার্টির কাজে কলকাতায় যেতে হতো, তাই আগে ভাগেই তুলে রেখেছিলাম।”
“আপনার ফ্যামিলির অন্য কাউকে দেখছি না, কেউ আসেননি?”
“এসেছিল। চলে গেছে আবার।” মণিরঞ্জন ক্যাজুয়ালি বললেন। “আর আত্মীয় বলতে আমার সেরকম ঘনিষ্ঠ কেউ নেই। মঞ্জুর অসুস্থতার কারণেই বিশেষ যাই-টাই না লোকের বাড়ি।”
“উনি কে?” একটা ছবির দিকে আঙুল তুললাম। মিসেস হালদারের খাটের পিছনের দেওয়ালে প্রমাণাকৃতি পোর্ট্রেটটা ঝুলছে। হাসিখুশি এক তরুণের, তার মুখের সঙ্গে মিসেস হালদারের এবং প্রিয়াঙ্কার মানে মণিবাবুর বড় মেয়ের মুখের খুব মিল। যেন মুখটা কেটে বসানো হয়েছে।
মণিবাবুর মুখের মাসলগুলো একটু শক্ত হল, সেটা চোখ এড়াল না আমার। বিছানায় বসে থাকা মিসেস হালদার অবশ্য একইরকম ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বসে রইলেন। উত্তরটা দিলো প্রিয়াঙ্কা, গোটা পরিবারটার মধ্যে একমাত্র যার আচরণই আমার স্বাভাবিক লাগছিল।
“উনি আমার ছোটমামা…” প্রিয়াঙ্কা বলল। “মারা গেছেন অনেকদিন আগে।”
“ওহ!”
“আমার পারিবারিক ব্যাপারে নাক না গলিয়ে আপনি ওই বিধান ছেলেটার ব্যবস্থা নিন ম্যাডাম। আমার বিরুদ্ধে তলে তলে ভয়ানক ষড়যন্ত্র চলছে, আমার মেয়েটাকে তারই বলি হতে হয়েছে।” মণিরঞ্জন বিরক্ত হয়ে বলে ওঠলেন।
“কী ধরণের ষড়যন্ত্র যদি একটু খুলে বলেন।” সমব্যথীর গলায় বললাম। লোকটা আত্মম্ভরী, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, এবং এদের কাছ থেকে কো-অপারেশন আশা করতে গেলে জিজ্ঞাসাবাদের টেকনিক পাল্টাতে হবে।
“কেন লোকাল থানা তো সব জানে! সব নোংরা পলিটিক্সের ব্যাপার। নবগ্রাম স্টেশনের জমি লিজ দেওয়া হবে বলে সরকার থেকে দরপত্র দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। মাল্টি ফাংশনাল ইউনিট হবে, চাষীদের জন্য ডাইরেক্ট হোলসেল মার্কেট, রেস্তোরাঁ, এটিএম ইত্যাদি। রেলওয়ে ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি দায়িত্ব নিয়ে কাজটা করবে। হওয়ার কথা ছিল গুড়াপে, আমি এডিএমের হাতেপায়ে ধরে প্রোজেক্টটা নবগ্রামে নিয়ে আসি, বিস্তর কাঠখড় পুড়াতে হয়। লোকাল লোকেদের কিছু কর্মসংস্থান হবে, ব্যবসাপাতি বাড়বে তল্লাটে। কাজ এখনও শুরু হয়নি। কিন্তু আশেপাশের গাঁয়ে-হাটের লোক জেনে গেছে। আমার সুনাম ছড়িয়েছে চারদিকে। বিধানদের এটা সহ্য হচ্ছিল না। এই জনগণের সেবা করতে গিয়ে আমার এমন ক্ষতি হল।” মণিবাবুর গলার স্বর এই প্রথমবার কেঁপে গেল।
“কিন্তু বিধান কীভাবে এর সঙ্গে জড়িত আপনার মনে হয়?”
“বিধান রাষ্ট্রীয় জনহিত পার্টির মেম্বার,” মণিরঞ্জন ফুঁসে ওঠে বললেন। “খোঁজ নিয়ে দেখবেন, ওর দলবল নবগ্রামের রেলকোয়ার্টার গত তিনবছর ধরে জবরদখল করে রেখেছে। পার্টির কাজকর্ম করে। রেলের উদ্যাগের খবরে ওদের টনক নড়ে। প্রোজেক্টটা নেমে গেলে তো ওদের রাস্তায় নামতে হবে। সরকারি কোয়ার্টারগুলো বেকার পড়ে আছে। একপয়সা ভাড়া পায় না রেল। এখন মাল্টিফাংশনাল ইউনিট তৈরিতে কাজে লাগবে। কিন্তু এরা সোজা রাস্তায় দখল ছাড়ার লোক নয়। আর.পি.এফ অলরেডি ওঠাতে এসেছিল, টাকা খাইয়ে ম্যানেজ করেছে ওর পার্টি। ওরা চায়, নবগ্রামের প্রোজেক্টটা থামিয়ে দিতে, ভোটের আগে যেন কোনোভাবেই না হয়। তারপর ভোট মিটে গেলে লিজটা নিজেরাই পলিটিকাল কানেকশন ব্যবহার করে হাত করে নেবে। বিধান বা বিধানের মতো কিছু ছেলেকে কাজে লাগিয়ে টেন্ডার জমা দেবে। তারপর লুটেপুটে মুনাফা খাবে। আবার সস্তায় নামও কিনবে। আমার মেয়েটাকে ফুঁসলে টাকা হাত করে খুন করেছে ওকে ওই বিধান। ভেবেছে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।” মণিবাবু এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নিলেন।
“এক্ষেত্রে সাপ কে? আপনি?”
মণিরঞ্জন হালদার জ্বলন্তদৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে।
“কিন্তু বিধান সম্ভবত আপনার মেয়ের বিশেষ বন্ধু ছিল?”
“কে বলেছে আপনাকে?” মণিরঞ্জন চিৎকার করে ওঠলেন। “দু একটা মেসেজ বিনিময় হলেই বিশেষ বন্ধু হয়ে যায়?”
“আপনি মেসেজগুলো পড়েছেন?”
“না, হোয়াটসঅ্যাপ লকড ছিল।”
“মানে আপনি পড়ার চেষ্টা করেছিলেন?” আমি মণিবাবুর দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করলাম। শিকার ভুল করে ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে।
মণিবাবুর মুখ ঝুলে গেল। উত্তর দিলেন না।
“আপনার সঙ্গে মৌপিয়ার সম্পর্ক কেমন ছিল?”
“কেমন ছিল মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি?”
“মানে বাবা হিসাবে মেয়ের কতটা ক্লোজ ছিলেন?”
“দেখুন ম্যাডাম। আমার মেয়েদের আমি শক্তহাতে মানুষ করেছি। মৌপিয়া শান্তস্বভাবের ছিল। বিধানের সঙ্গে ওর মেলামেশা আমার পছন্দ ছিল না, ব্যস এইটুকুই!”
দরজার সামনে প্যাকেট হাতে নিয়ে প্রিয়াঙ্কা দাঁড়িয়ে ছিল। মণিরঞ্জনের কথায় সে যে তীব্রদৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল, সেটা আমার চোখ এড়াল না। আমি একটু আসছি বলে প্রিয়াঙ্কাকে একপ্রকার ধাক্কা মেরে ঠেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন মণিরঞ্জন হালদার।
লক্ষ করলাম, প্রিয়াঙ্কার মুখটায় একটা ছায়া পড়ল।
“মিসেস হালদার!” খাটের দিকে ঘুরে বসে বললাম, “আমি জানি, কোনো প্রশ্ন করার এটা উপযুক্ত সময় নয়, তবুও আমার ডিউটি… অলরেডি দুদিন হয়ে গেছে বুঝতেই পারছেন।”
কোনো উত্তর নেই! চোখের পলক পড়ল না।
“মিসেস হালদার!”
“সব পাপ, ঘোর পাপ! পাপের শাস্তি!” গলাটা ঘড়ঘড়িয়ে বলে উঠল। চমকে তাকালাম ওঁর দিকে। চোখটা আমার দিকে ফিরেছে এতক্ষণে
“পাপ! কার?”
“সুস্বাদু মাংস! নরমাংস সুস্বাদু! তার থেকেও সুস্বাদু তাকে মেরে ফেলার ইচ্ছা!” ভদ্রমহিলা চিৎকার করে ওঠলেন। মুঠো করে নিজের চুল আঁকড়ে ধরে ফেললেন, হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠলেন এবার। গোটা শরীরটা কাঁপুনি দিয়ে উঠল। প্রিয়াঙ্কা হালদার ছুটে এল, মাকে আঁকড়ে ধরল বুকের মধ্যে।
উনি অনেক কিছু বলছিলেন, জড়িয়ে জড়িয়ে, কিন্তু মুখ চাপা থাকায় পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম না। প্রিয়াঙ্কার চোখে জল দেখতে পেলাম, একটু ভৎসনার দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। “আমার মা স্বাভাবিক নন, শুনলেন তো? আপনি যা জিজ্ঞাসা করার আমাকে করতে পারেন।”
“আমার এই মুহূর্তে আর কিছু জিজ্ঞাসা করার নেই।” বলতে বলতে ওঠে দাঁড়ালাম, “মৌপিয়ার ঘরটা কোথায়?”
মিসেস হালদার চিৎকার থামিয়ে ফোঁপাচ্ছিলেন। প্রিয়াঙ্কা কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে।
প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে দোতলায় উঠলাম। আর দোতলায় ওঠেই চমকে গেলাম। একতলাটা আগে দেখা না থাকলে বিশ্বাসই হতো না, দোতলাটা এই বাড়িরই অংশ। অবশ্য দোতলায় প্রায় পুরোটাই টেরেস, একটি বৃহদাকারের ঘর ছাড়া। কিন্তু সারা টেরেসজুড়ে অজস্র ফুলের টব। সুন্দর করে পেইন্ট করা, কোনোটায় সাদা টবে অ্যাক্রিলিক পেইন্ট ব্যবহার করে জলের ঢেউ আঁকা হয়েছে, কোনোটায় ভাঙা কাচের টুকরো দিয়ে কোলাজ করা। গাছগুলো অবশ্য জল না পেয়ে নেতিয়ে আছে, কিন্তু বোঝাই যায় খুব শৌখিন কোনো মানুষের যত্ন পেত ওরা।
ঘরটাও খুব সাজানো গুছানো। সারা দেওয়াল জুড়ে প্রচুর সার্টিফিকেট, নিউজপেপার কাটিংয়ে মৌপিয়ার ছবি, দেওয়ালের তাকে ট্রফি, মেডেল সাজানো। একের পর এক চার্ট পেপারে বিভিন্ন ফরমুলা, ডায়াগ্রাম আঁকা। দেওয়ালজোড়া সার্টিফিকেটগুলোর মধ্যে কোনোটা ছবি আঁকার, কোনোটা ডিবেটের, কোনোটা বা আবৃত্তির, তাৎক্ষণিক বক্তৃতার। মৌপিয়া হালদার শুধু পড়াশুনায় মেধাবী ছিল তা নয়, বেশ গুণী মেয়ে ছিল বোঝা যায়।
ঘরের দুদিকে দুটি খাট। প্রিয়াঙ্কা হালদার চাকুরিসূত্রে এখন কলকাতায় থাকে। আরেকটি খাট নিশ্চয়ই ওর।
“মৌপিয়া ডায়েরি জাতীয় কিছু লিখত?” প্রশ্ন করলাম।
“নাহ! আমি যতদিন এখানে ছিলাম, ততদিন তো দেখিনি।” প্রিয়াঙ্কা একটু ভেবে উত্তর দিলো। মেয়েটাকে লক্ষ করে দেখলাম। মেয়েটি বেশ সুন্দরী। মৌপিয়া হালদারও মিষ্টি দেখতে ছিল, কিন্তু এ অসম্ভব গ্ল্যামারাস। অবশ্য এখন চোখমুখ শুকনো লাগছে, একটা উদ্বেগ আর শোকের মিলিত প্রভাব পড়েছে চেহারায়।
“কত বছর হল তুমি কলকাতায় গেছ?”
“একবছর।”
“আর, কোথায় কাজ করো?” মৌপিয়ার খাতা বই হাতড়াতে হাতড়াতে জিজ্ঞাসা করলাম।
“সি ওয়েল রিয়েলটরসের অফিসে। ডাটা এন্ট্রি আর রিসেপশন সামলাই।”
“হু। বিধান আর মৌপিয়া… কোনো সম্পর্ক ছিল? জানতে কিছু?”
প্রিয়াঙ্কা আমার দিকে তাকাল।
“একই স্কুলের তো? দেখা সাক্ষাৎ, বন্ধুত্ব, আড্ডা এসবের বাইরে কিছু ছিল?”
“ঘনিষ্ঠতা ছিল। খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল ওরা।”
“তোমার সঙ্গে বিধানের প্রসঙ্গে আলোচনা হতো না?”
“হতো। মৌ বিধানকে নিয়ে অবসেসড ছিল।”
“তারপর ভাঙনটা কীভাবে ধরে?”
“বিধানের বাবার মৃত্যুর পর। বিধানের ধারণা ওর বাবাকে লোক লাগিয়ে খুন
করেছে আমার বাবা।”
“আচ্ছা! আর তোমার কী ধারণা?”
প্রিয়াঙ্কা আমার দিকে তাকাল। কোনো উত্তর দিলো না।
“তোমার সঙ্গেই তো শেষ কথা হয়?”
“হ্যাঁ, বর্ধমান পৌঁছে ফোন করেছিলাম।”
“ও হ্যাঁ, তুমি তো বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু অত রাতে?”
“ওর মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।”
“ওহ! কোথায় ভর্তি ছিলেন?”
“দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালে।” প্রিয়াঙ্কা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো।
“যখন ফোন করেছিলে কিছু অন্যরকম বুঝেছিলে? ওর কথাবার্তায়, আকারে ইঙ্গিতে?”
“নাহ। কিচ্ছু না। একদম স্বাভাবিক ছিল।”
“তোমার বোনকে কে খুন করেছে বলে তোমার মনে হয়? বিধান?”
“প্রশ্নটা তো আমিই আপনাকে করব ভাবছিলাম। দুইদিন হয়ে গেল, পুলিশ এখনও অ্যাকিউজডকে চার্জশিট দিতে পারল না!”
“ঠিকঠাক তদন্ত না করে চার্জশিট দেওয়াটা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে না?”
কিছু একটা বলতে গিয়েও মেয়েটা কথা গিলে নিল। তারপর বলল, “আমার বোনকে ঠিক কীভাবে মারা হয়েছে?”
“সেটা এখন তদন্তসাপেক্ষ।” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলাম।
“বলুন না, আমি শুনতে পারব। আমি… আমি ঠিক আছি এখন।” মেয়েটার ডান চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“কিছুদিন সময় দাও। অবশ্যই জানবে। তোমার বাবা কোন স্টেশনে পোস্টেড ছিলেন?”
“চন্দননগর।”
“রিটায়ার কবে করেছেন?”
“২০১৭ সালে।”
“ওকে। আর তোমার মামাবাড়ি কোথায়? কে কে আছেন ওখানে?”
“বড়মামা থাকেন। দাদু দিদা মারা গেছেন। চন্দননগরেই বাড়ি ওদের।” মেয়েটি আমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বলল।
“মামা বিয়ে করেননি?”
“না।”
“বিধানের সঙ্গে তোমার বোনের সম্পর্ক নিয়ে তোমার বাবার কীরকম মতামত ছিল?”
“পিঙ্কি!” দরজার বাইরে থেকে মণি হালদারের রুক্ষ আওয়াজটা ভেসে এল। “তোমার মায়ের ওষুধের সময় হয়েছে, নিচে যাও।”
“আমি পরে কথা বলব আপনার সঙ্গে” বলে প্রিয়াঙ্কা নিচে নেমে গেল।
মণি হালদারকে আবার বিরক্ত করব জানিয়ে বাইরে চলে এলাম। মৌপিয়ার ফোনটা খোলা বিশেষ দরকার। আনলক করার কাজ চলছে। পাসওয়ার্ড হ্যাকিংয়ের টিম কাজ করছে ওটা নিয়ে। আপাতত আরও দুজন ইন্টেরোগেশনের লিস্টে অ্যাড হল। রান্নার সাহায্যকারিনী মহিলা আর মিসেস হালদারের ডাক্তার। স্টেট ফরেনসিকের সঙ্গেও একবার কথা বলা দরকার। ফসফরাস বিষটা কীভাবে মেশালে লেথাল হবে না অথচ স্লো পয়জনিং করবে সেটাও জানা দরকার।
আমার ফোনটা সাইলেন্ট ছিল অনেকক্ষণ। জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় সাইলেন্ট রাখি। খুলে দেখলাম বিশটা মিসড কল, রণদীপ সামন্ত হঠাৎ এতবার ফোন করলেন কেন!
