বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

হলুদ পাতায় রক্ত

রেকর্ডস সেকশন থেকে ফাইলটা পেতে বেশি দেরি হয়নি। সবুজ রঙের ফাইল। কেস নম্বর ৩১৪/০১/২০১৭।

নবগোপাল হুঁই, বয়স ৫৪ বছর, বাবার নাম ঈশ্বর রতন হুঁই, নিবাস নবগ্রাম, জেলা বর্ধমান ২০১৭ সালের ১৩ই জানুয়ারি বাইকে চেপে দুর্গাপুর থেকে বর্ধমানের দিকে ফিরছিলেন। নিজেই বাইক চালাচ্ছিলেন। রাত নটা বাইশ নাগাদ, বাইক পানাগড় ছাড়াতেই পিছন দিক থেকে আসা একটা ট্ৰাক হঠাৎই গতি বাড়িয়ে নবগোপাল বাবুকে পিষে দিয়ে পালায়। সদর হাসপাতাল বলে ‘ব্রট ডেড। পেশেন্ট সাকাম্বড টু মালটিপল ইনজুরিজ। লরিটাকে পরদিন সকালে চান্দুলে একটা রাস্তার ধারে ডেজার্টেড পড়ে থাকতে দেখা যায়। ফাঁকা লরি। কোনো মাল নেই, কাজেই অ্যাক্সিডেন্টটা যে ইচ্ছাকৃত সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। সেদিন অ্যাক্সিডেন্টের সময় লোকাল চায়ের দোকানী নাম্বারপ্লেটের নাম্বারের খানিকটা দেখেছিল। JHK 04 **39। ফলে মেলাতে অসুবিধা হয়নি।

পুলিশ খোঁজ লাগিয়ে দেখে লরিটা মহেন ভান বলে একজনের নামে রেজিস্টার্ড। পুলিশ মহেন ভানের নামে সেকশন 279 আর 304 A এর কেস দিয়েছে। বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের জন্য খুন। কিন্তু মহেন ভান পলাতক।

নবগোপাল হুই হত্যা মামলার এই হল মোদ্দা বিবরণ। সব দেখেটেখে গণেশদাকে যখন বললাম, “তোমার নেটওয়ার্কের কী হল? ঝাড়খণ্ডের পাখি এখনও খাঁচায় আসেনি কেন?”

গণেশদা হতাশ সুরে বলল, “ভান যদি নেপালে পালিয়ে যায় তবে কোনো সোর্সের ক্ষমতা নেই তার খোঁজ এনে দেবে। তিনবছর ধরে লেগে আছি, কিন্তু চিড়িয়া উড়লবা।”

“তোমার কী মনে হয়, মণি হালদার ভানকে লাগিয়েছে? পলিটিকাল রাইভালরি?” গণেশদাকে ফোনে জিজ্ঞাসা করলাম।

গণেশদা একটু বিরক্ত হল। কিন্তু বিধানের আক্রোশের অ্যাঙ্গেলটা সঠিক কিনা জানা দরকার। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ ইত্যাদি সিনেমাটিক শোনালেও বাস্তবে যে হয় না, তা তো নয়।

“নব মারা গেছে তিন বছর আগে। বাপ মরার প্রতিশোধ নিতে বিধান তিনবছর ধরে মেয়েটাকে খেলালো?” গণেশদা চটে গেল।

“আহা! খুন বললেই তো খুন নয়!” সময় তো লাগবেই। আমি ক্যাজুয়ালি বললাম।

“না, না! তুই ভুল পথে যাচ্ছিস। ওসব কোনো কেস নয়।” গণেশদা তেড়ে উঠল। আবেগ বড় বালাই!

“তুই মার্ডার ওয়েপনগুলো পেলি?”

“খোঁজ চলছে।”

“দেখ দাশু, আমি জানি ওয়েপন বলতে লোহার চাকা মতো কিছু আর একটা দেওয়াল রঙের তুলি। খুঁজে পাওয়া কী খুব কষ্টের? তুই না পারলে বল, আমি সোর্স লাগাব। ওয়েপন পেলে হাতের ছাপ পাবি, বিধান বেকসুর খালাস হয়ে যাবে।”

“তুমি খামোকা উত্তেজিত হচ্ছ। পুকুরটুকুরগুলো অলরেডি সার্চ হয়ে গেছে, নেই ওরকম কিছু।”

“সেসব আমি জানি না। বিধানকে অ্যাট এনি কস্ট আমি বাইরে চাই।” ফোনটা কটাস করে কেটে দিলো গণেশদা,

আমার হাতে ফরেনসিক রিপোর্টগুলো ছিল। স্টেট ফরেনসিক থেকে ফ্যাক্স করে পাঠিয়েছে। ফুটপ্রিন্ট স্টাডির রিপোর্ট আগেই চলে এসেছে। ছ-জোড়া স্যান্ডল এবং হাওয়াই চটির মিলিত ছাপ আছে। অটোপসি সার্জন দয়াল মণ্ডলকে একটা হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলাম, তার উত্তরটাও এসেছে। খুনির আন্দাজ উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত। বিধানেরও তাই। সামনে কালাপানি ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। এদিকে সুমন্ত খবর দিয়েছে বিধান কিছু বলতে রাজি নয়। নট এ সিঙ্গল ওয়ার্ড। সামনে থাকলে অবশ্যই কেলিয়ে ছোঁড়ার দাঁত ভেঙে দিতাম।

রণদীপ সামন্ত ভেঙে ভেঙে জানতে চাইলেন, “কেসটার কী অন্য কোনো অ্যাঙ্গেল আছে? মানে ধর্ষণ বা প্রতিশোধের অ্যাঙ্গেল ছাড়া?”

আমি স্পষ্ট কোনো উত্তর দিলাম না। “বিষপ্রয়োগের সুযোগ অনেকেরই আছে। সেটা গৌণও হতে পারে। ধর্ষণটাও মনে হয় পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্যই করা হয়েছে। সেদিন রাতের ঘটনাক্রমের দিকে কনসেনট্রেট করুন। যার ডাকে মৌপিয়া বাড়ি থেকে বেরোলো তাকে সে বিশ্বাস করত, অথবা সে মৌপিয়াকে কোনোভাবে ব্ল্যাকমেইল করছিল।”

“ব্ল্যাকমেইল?!”

“আহা! ব্ল্যাকমেইল অনেকরকমের হয় সামন্তবাবু। মোস্ট কমন হল ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল। মেয়েটা টাকা নিয়ে বেরিয়েছিল, টাকাটা নিয়ে খুনি মৌপিয়াকে মেরে ফেলল। কিন্তু কেন? মৌপিয়া তো পরে আরও টাকা এনে দিতে পারত। সোনার ডিম পাড়া হাঁস কখন খুন হয়?”

“যখন সে আর ডিম পাড়তে পারে না।” সামন্ত উত্তর দিলেন।

“অথবা ডিম পাড়তে চায় না।”

“হুম।” সামন্ত গম্ভীরভাবে বিড়ি ধরালেন। “আর বিশ্বাসের অ্যাঙ্গেলটা?”

“ওটার তো একটাই অ্যাঙ্গেল! বিশ্বাসঘাতকতা! মনে রাখবেন ওই সময় মৌপিয়ার মোবাইলে কিন্তু কোনো ফোন আসেনি। তারমানে ও আগে থেকেই জানত, ওকে বেরোতে হবে। ও টাকাটা সেই বুঝে সরিয়ে রেখেছিল। এদিকে মণি হালদার টাকা তুলেছেন সোমবার। সোম থেকে বৃহস্পতি এই চারদিন ধরে মৌপিয়ার গতিবিধি ফলো করার দরকার। বাইরে বেরোনোর মেসেজ ও এই চারদিনেই কোনো এক সময় পেয়েছিল।”

“হুম।” সামন্তবাবু একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন।

“মৌপিয়ার : স্কুলে একবার যাওয়ার দরকার সামন্তবাবু। আর ওর বন্ধুবান্ধবের সার্কলটা একবার ঘাঁটার দরকার।”