ভীরু মেঘ তুমি ব্যর্থ ঝরেছ উষর মরুর বুকে
আনন্দ রক্ষিত মাথা নিচু করে বসেছিল। সাদা শার্ট কনুই অবধি গুটানো, হাতের আঙুলগুলো ইন্টারলক হয়ে মুঠোর মধ্যে বন্ধ ছিল। মৌপিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে ওর সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে নিয়েছে। রাত বারোটা পনেরো নাগাদ সবার অলক্ষ্যে জামাল সর্দারের পকেট থেকে চাবি তুলে ও পাম্পঘরটার কাছে অপেক্ষা করছিল। মৌপিয়া বেরোতেই ওর ওপর হামলা করে। পাম্পঘরটার সামনে প্রথমে মাথায় আঘাত করে, তারপর ঘষটিয়ে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। এর মধ্যেই মৌপিয়ার জ্ঞান ফিরে আসে, চিৎকার করতে শুরু করায় আনন্দ ভয় পেয়ে যায়। একহাতে মুখ চেপে আরেকহাত দিয়ে গলা টিপে ধরে। তারপর দ্বিতীয়বার জ্ঞান হারালে ওয়েটটা তুলে আরেকবার মোক্ষম আঘাত করে। মৌপিয়ার জ্ঞান আর ফেরেনি। তারপর খুনটাকে ধর্ষণের রূপ দিতে হাতের কাছে পড়ে থাকা পেইন্টব্রাশটাকে ইনসার্ট করে।
কীভাবে খুনটা ও করেছিল সে বিষয়ে সবিস্তারে জানালেও কারণ সম্পর্কে আনন্দ কিছু বলছিল না। মৌপিয়া কেন বাইরে এসেছিল সে নিয়েও পুরো চুপ টাকাটা কোথায় গেল সে সম্পর্কেও ওর কোনো ধারণা নেই। চোখে অসম্ভব ক্লান্তির ছাপ নিয়েও ও আমাদের একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল। এতক্ষণ আমাদের প্রশ্নোত্তরের পদ্ধতি ছিল নৈর্ব্যক্তিক, উত্তরও নৈর্ব্যক্তিকভাবেই এসেছে। ফ্রি অ্যান্ড ভলান্টারি কনফেশনের ক্রেডিট সবসময়েই বেশি।
সামন্ত কনফেশনের খুশিতে ডগমগ করছিলেন, আমার পরের প্রশ্নটায় চমকে গেলেন।
“কোনো ভয় নেই তোমার।” আমি আনন্দকে নরম গলায় বললাম। “তোমাকে দিয়ে কেউ এই কাজটা করিয়েছে?”
কোনো উত্তর এল না।
“কেউ তোমাকে বাধ্য করেছে কাজটা করতে?” আমি আবার প্রশ্ন করলাম।
আনন্দ মাথা নাড়িয়ে না বলল।
“দেখ, আমি প্রথম দিন থেকে বলে আসছি, এই খুনটা যে করেছে সে কোনো দাগী আসামী হতেই পারে না। আমি শিওর, কাজটা করার পর মনে মনে তুমি অনুতপ্ত হয়েছে। সব খুনই তো আর ক্রিমিনাল ইনস্টিংক্ট থেকে হতে পারে না। কিছু কিছু খুন সাধারণ মানুষ ঝোঁকের মাথায় করে ফেলে। আর যেহেতু সে বাই নেচার খুনি নয়, প্রতি মুহূর্তে তাকে এই খুনের স্মৃতিটা তাড়া করে বেড়ায়। তাই না, আনন্দ? সাধারণ মানুষ খুন করলে এমনই তো হয়?”
আনন্দ বোবাদৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“তোমার মোবাইল রেকর্ডস বলছে তুমি সেইরাতে কারখানা থেকে বেরোনোর আগে রথতলা মোড়ে ছিলে। খোঁজ নিয়ে দেখলাম ওটা তোমার এক ক্লায়েন্টের বাড়ি।”
“হ্যাঁ।” আনন্দ জিভ চেটে বলল।
“সেখানে তোমার কাছে একটি ফোন আসে। সামান্য সময়ের জন্য। একই নাম্বার থেকে আবার ফোন আসে তুমি কারখানা থেকে বেরোনোর পর। প্রায় দশ মিনিট কথা হয়েছে। বারোটা বিশ থেকে সাড়ে বারোটা। এই নাম্বারটি কার?” আনন্দ রক্ষিত পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছল। কোনো উত্তর দিলো না।
“তুমি না বললেও বার করতে বেশিদিন লাগবে না, কিন্তু তাও তোমার কাছ থেকে শুনতে চাই। এই নাম্বারে তোমার মাসের পর মাস, দিনের পর দিন কথা হয়েছে।”
“না, প্লিজ ওটার সঙ্গে এর কোনো যোগাযোগ নেই।” আনন্দ রক্ষিতের গলা কেঁপে উঠল।
“তুমি ফোন নাম্বারটা নিয়ে এতই সতর্ক যে ঠিকঠাক নাম দিয়েও সেভ করোনি। তোমার ফোনের এই মিস্টিরিয়াস নাম্বারটা কার?”
আনন্দ রক্ষিত কোনো উত্তর দিলো না। কিন্তু ও মুঠো বন্ধ করছিল, খুলছিল দ্রুত।
“তুমি ভালো ছেলে, তোমার অতীত রেকর্ড সব ক্লিন, কোনোদিন কোনো ঝামেলা এমনকি স্টুডেন্ট পলিটিক্সেও তোমাকে পাওয়া যায়নি। তুমি সরাসরি উত্তর দাও, এই ফোন কলের ব্যাপারটা কি কোনোভাবে মৌপিয়ার খুনের সঙ্গে জড়িত?”
আনন্দ এতক্ষণে মুখ তুলে সজোরে প্রতিবাদ করে উঠল। “না না…কোনোভাবেই না…খুনটা আমিই করেছি, আর কেউ এর সঙ্গে জড়িত নয়।”
“টাকাটা কী করেছ?”
“কোনো টাকার কথা আমি জানি না।”
দীর্ঘ একঘন্টা জেরার পরও আনন্দ একই বক্তব্যে অনড় থাকল। সামন্ত হতাশ হয়ে বাইরে এসে বললেন, “এবার ক্ষ্যামা দিন ম্যাডাম। চার্জশিট দিয়ে দিতে অসুবিধা কী?”
“চার্জশিট দিন কিন্তু কারণ তো কিছু বলছে না সামন্তবাবু। মোটিভ কী? পোস্টমর্টেম রেপের সাইকোলজিটা কী?” শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করলাম।
“চার্জশিট দিতে তো মোটিভ লাগে না ম্যাডাম।”
“যদি ডিফেন্স প্রমাণ করে দেয় যে পলিটিকাল রাইভ্যালরি চরিতার্থ করে আনন্দকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে? না, না সামন্তবাবু কোর্টে ডিফেন্স আপনার আমার পিঠের চামড়া তুলে নেবে! বেইজ্জতির একশেষ।”
“তাহলে!”
“আনন্দ একটা ক্রীড়নক মাত্র সামন্তবাবু! হাতের পুতুল বোঝেন? আসল কলকাঠি কে নেড়েছে সেটা বুঝতে গেলে মোটিভটা জানতে হবে।”
“কিছু তো বলতে চাইছে না। টাকা ছাড়া আবার কী? পুলিশকে ভুল বুঝানোর জন্য রেপের নাটক।”
“মৌপিয়াকে কী বলে বাড়ির বাইরে আনল? ভিকটিমের ফোনে তো কখনও কোনো ফোন করেনি অ্যাকিউজড। আর টাকা নিয়ে থাকলে সেটা গেল কোথায়? বাড়িতে তো নেই, ব্যাংকে জমা পড়েনি, তবে কোথায় গেল?”
“খরচ করে ফেলেছে নিশ্চয়ই।”
“মনে হয় না। যে খুন স্বীকার করে নিচ্ছে, টাকা চুরি স্বীকার করতে তার অসুবিধা কোথায়? তাছাড়া খরচ করলে আপনার সোর্সরা কিছু না কিছু বলত সামন্তবাবু। কিসে খরচ করল? বাড়িতে কোনো নতুন প্রোডাক্ট তো চোখে পড়ল না। এক লাখ বিশ হাজারে তো আপনি অস্থাবর সম্পত্তি কিনে ফেলতে পারবেন না!”
“ফোন নম্বরের ব্যাপারটা নিয়ে কী বুঝছেন ম্যাডাম?”
“টেকনিকাল উইং বলছে যে নাম্বারে ওর লাস্ট কথা হয়েছিল সেই সিমকার্ডটা রেজিস্টার্ড খড়দার এক ভদ্রলোকের নামে। এখন নম্বরটা সুইচড অফ। খোঁজ নিতে হবে, কিন্তু আমি শিওর ভুয়া ডকুমেন্ট দেখিয়ে তোলা কার্ড
“একটা উপায় আছে স্যার।” সামন্ত পুরোনো সম্বোধনে ফিরে এলেন। “যদি সিমকার্ড থেকে আই.এম.ই.আই নম্বরটা পাওয়া যায়, তবে আইটি সেল ফোনটা অন হলেই ট্র্যাক করতে পারবে। আজকাল তো শুনছি এরকম কেস হচ্ছে স্যার।”
“আপনি বোধহয় ১৪ সালের পার্কস্ট্রিট থানার ওই কেসটার রেফারেন্স দিচ্ছেন? সিমকার্ড দেখে আই.এম.আই.ই প্রথম ওই কেসটাতেই ক্র্যাক করেছিল কে.পি।”
“হ্যাঁ।”
“পাঠিয়েছি তো, দেখা যাক! ওই সেটে অন্য কোনো সিমকার্ড থাকলেও জানাতে বলেছি।”
“আপনি কি আলাদা করে কাউকে সন্দেহ করছেন?”
“করছি, কিন্তু নামটা বলার এখনও সময় আসেনি।”
রাত্রিবেলা বহুদিন পর সুমন্তর সঙ্গে কথা হল। “আনন্দর নামে চার্জশিট মানে বিধান বেকসুর খাল্লাস!” সুমন্তর গলায় উল্লাস ভেসে এল।
“তুই আমার সমস্যাটা বুঝছিস না। নাম্বারটাকে খুঁজে পাওয়া না গেলে আমার সন্দেহটা মাঠে মারা যাবে।”
“মালটার জামিন তো হয়নি? লকআপেই তো?”
“হ্যাঁ।”
“ব্যস, তাহলে দুমাদ্দুম চালা। গরম তেল ছিটা, পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে ক্যালা, বরফের ওপর ল্যাংটো করে শুইয়ে ইলেকট্রিক শক দে। তোরা তো এসব করিস।” সুমন্ত ক্যাজুয়ালি বলল।
“বরফের অনেক দাম! চড়চাপড় পড়েছে। কিচ্ছু বলেনি, ওভাবে বলবে না বলেই মনে হয়।”
“অ! তো এই মিস্টিরিয়াস নম্বরকে জড়ানোর মতো তোর কাছে কী এভিডেন্স আছে?”
“কিচ্ছু নেই। ফোনে কারুর সঙ্গে কথা বলা তো অপরাধ নয়!”
“তবে বেকার মাথা খাটাচ্ছিস!”
“একটা বিরাট লজিকাল ফ্যালাসি রয়ে গেছে যে, টাকাটা মিসিং!”
“হুম।”
“আরও একটা বিষয় কিন্তু তুই ভুলে যাচ্ছিস…
“কী?”
“বিধান যে সেদিন অত রাতে ওখানে ছিল; কেন গিয়েছিল সেটা কিন্তু ও বলেনি। কেন!”
“ধুস! বিধানকে ছাড়। ও তো আজাদ পরিন্দা!” সুমন্ত ফুরফুরে মেজাজে বলে উঠল।
“হ্যাঁ। তবুও!”
সুমন্ত গুডনাইট বলে ফোনটা রেখে দিলো।
আমি ল্যাপটপ খুলে ডিপার্টেমেন্টের পাঠানো মেইলগুলো চেক করছিলাম। ভালো খবর হল, নবগোপাল হুঁইয়ের খুনি লরিটার ড্রাইভার, সেই মহেন ভান গ্রেফতার হয়েছে কাল ঝাড়খণ্ড থেকে। আমার স্নায়ু অসম্ভব উত্তেজিত ছিল, কিন্তু শারীরিক ক্লান্তিতে ধীরে ধীরে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই। সারা রাত অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখলাম। মণি হালদার, প্রিয়াঙ্কা, কমল মিত্র, গণেশদা, সুমন্ত সবাই একটা মোবাইল নিয়ে লোফালুফি করছে, আর আমি প্রতিবার ফোনটাকে ধরার চেষ্টা করেও পাচ্ছি না!
********
থানায় যেতেই সামন্ত বেজার মুখে অভ্যর্থনা করলেন। টেকনিকাল উইং থেকে ফোন করেছিল, ওই আই.এম.ই.আই নম্বরে বিভিন্ন সময়ে মোট পাঁচটা সিম কার্ড ব্যবহার হয়েছে। সব কটাই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের আলাদা আলাদা মানুষের নামে রেজিস্টার্ড।
“ঠ্যালাটা বুঝুন স্যার! ক্রস চেক করতে কখনও শিলিগুড়ি, কখনও হাওড়া, কখনও গড়বেতা, কখনও বা খড়দা যেতে হবে! এ তো পেছন শুকিয়ে দেবে স্যার!”
“হুম।”
“কিছু বলুন স্যার!”
“এত বিভিন্ন জায়গার মানুষের ডকুমেন্টের অ্যাক্সেস সাধারণতঃ কীরকম ধরণের মানুষের কাছে থাকতে পারে সামন্তবাবু?”
“কেন স্যার, জেরক্সের দোকান, ইউনিভার্সিটি, পি.এস.সি অফিস, স্টাফ সিলেকশন সব জায়গাতেই থাকতে পারে।”
“হুম। আচ্ছা একটা কাজ করা যায় না?”
“কী কাজ স্যার?”
“নাম্বারগুলো তো জানেন, এবার একে একে আপনার ফোনে সেভ করুন।”
“সব সুইচড অফ স্যার। ফোন করে দেখে নিয়েছি।”
“আহ! করুন না।”
সামন্ত ফোন নম্বর সেভ করে আমার দিকে তাকালেন।
“এবার হোয়াটসঅ্যাপটা দেখুন তো।”
“এই তো! পাঁচটার মধ্যে দুটো নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ আছছছে…” সামন্ত কথা বলা থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ হাঁ করে আমার দিকে চাইলেন।
ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে আমার দিকে ঘোরাতেই সেই বহু প্রতীক্ষিতের ডিপিটি দেখতে পেলাম। অত্যন্ত চালাক হলেও, সে এই একটা ভুল করে রেখেছে। একটা নাম্বারে তার ডিপিটা জ্বলজ্বল করছে!
সামন্ত সামনে বসে ঘামছিলেন!
******
মোমবাতির শিখাটা দপদপ করে জ্বলছিল। থানায় কারেন্ট চলে গেছে। আনন্দ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল।
“কবে থেকে চেনো?”
“আমি জানি না আপনি কী বলছেন!”
“ওহ কাম-অন, যার সঙ্গে দিনে চারবার কথা বলো তাকে চিনতে পারছ না?” কল ডিটেইল রেকর্ডটা আনন্দর দিকে বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। আনন্দ শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ডেটাশিটটার দিকে।
“তোমাদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল তা পুলিশকে জানতে দিতে তোমার অসুবিধা কোথায়?”
“আমি ওকে এর মধ্যে জড়াতে চাই না।”
“জড়াচ্ছ কোথায়? আমি শুধু সেদিন ঠিক কী হয়েছিল জানতে চাইছি।”
“আমি অলরেডি বলেছি।”
“জানি, কিন্তু ডিটেলসটা লাগবে। প্রিয়াঙ্কা হালদারের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রপাত কী ফিজিওথেরাপি করতে গিয়ে?”
“সম্পর্ক… না, না আমরা জাস্ট বন্ধু!”
“মাঝরাতে দেড়টা দুটো অবধি তুমি আর কোনো বন্ধুর সঙ্গেই এত কথা বলোনি আনন্দ। তোমার বিলের পঁচানব্বই ভাগ এই কলগুলো থেকে এসেছে। প্রিয়াঙ্কাকে বাঁচাতে চাইছ কেন, ও খুনটায় জড়িত বলে?”
“ওকে এসবের থেকে বাইরে রাখুন। প্লিজ!” আনন্দ চেঁচিয়ে উঠল। “ও কোনোভাবেই জড়িত নয়।”
“তাহলে এই সিক্রেসির কী প্রয়োজন?”
“ওর… ওর বাড়িতে বয়ফ্রেন্ড থাকা অ্যালাউড নয়। আমি… আমি জাস্ট চাই না ওর বাড়িতে কেউ জানুক। ওর বাবা মেরে ফেলবে ওকে।
“আমাদের একজন সাক্ষী আছে, সে বলেছে মণি হালদার প্রিয়াঙ্কাকে মেরে ঠোঁট ফুলিয়ে দিয়েছিলেন। তুমি ব্যাপারটা জানতে?”
“আ…আমি কী করে জানব!”
“কীভাবে দেখা করতে?”
“কলকাতাতে বেশিরভাগ সময়। কখনও কখনও বর্ধমানে।”
“কলকাতাতে হোটেল লিন্ডসে …দুমাস আগের কথা, মার্চ, বিশ। মিস্টার আর মিসেস রক্ষিতের নামে একটা রুম বুক হয়েছিল, তোমার ডেবিট কার্ড স্টেটমেন্ট থেকে জানতে পারলাম।”
আনন্দ মাথা নিচু করে চিবুকটা প্রায় কণ্ঠায় ঠেকিয়ে ফেলল।
“তোমরা কি বিয়েটিয়ে করে ফেলেছিলে নাকি?”
আনন্দ আমার দিকে তাকাল। উদ্ভ্রান্ত, দুর্দশাগ্রস্ত দৃষ্টি।
“মৌপিয়াকে মারলে কেন? সম্পত্তির লোভে? প্রিয়াঙ্কাই একমাত্র উত্তরাধিকারী হবে সেই আশায়?”
আনন্দ রক্ষিত প্রচণ্ড শকড হয়ে আমার দিকে তাকাল। “আ… আপনি ভাবছেন আমি টাকার জন্য এই কাজ করেছি?”
“তাহলে কীসের জন্য করেছ?”
“জানি না।”
আমার হাতটা অনেকক্ষণ থেকে নিশপিশ করছিল। সপাটে ওর গালে একটা চড় কষিয়ে বললাম, “ঢ্যামনামি হচ্ছে? মাঝরাতে একটা বাচ্চা নিরপরাধ মেয়েকে ভুলিয়ে বাড়ির বাইরে এনেছ, গলা টিপেছ, মাথায় হিট করে খুলি ফাটিয়েছ, তার শরীরের ভেতরে একটা মোটা তুলি ঢুকিয়েছ, আর বলছ কেন করেছ জানো না!”
“আপনি বুঝতে পারছেন না…” আনন্দর গলা বাচ্চা ছেলেদের মতো কান্নায় ভেঙে গেল। “সবাই জানে মৌপিয়ার মতো মেয়ে আর হয় না, গঙ্গাজলের মতো পবিত্র, নিষ্পাপ! সত্যিটা শুধু আমি জানি। আপনাকে বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না!”
“করব। বলো।”
আনন্দর চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে যেন ওর। হাত পা থরথর করে কাঁপছিল। দম নিয়ে ও বলল, “মৌপিয়া পিঙ্কিকে সহ্য করতে পারত না ম্যাডাম। পিঙ্কি হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়তে চেয়েছিল, শুধু মৌয়ের জন্য পারেনি। মৌ চাইত না, পিঙ্কির পিছনে টাকা খরচা হোক। নিত্যি তিরিশ দিন ওর পিছনে লেগে থাকত। পিঙ্কি প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল…বদলে…”
“বদলে?”
“লোকটা ওকে মেরেছিল। মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল, দেওয়ালে এমন জোরে ঠেলে ফেলেছিল যে ওর…ওর হাত ভেঙে গিয়েছিল।” আনন্দ ওর চোখ থেকে গড়িয়ে আসা পানি মুছল।
“লোকটা মানে মণি হালদার?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু মণি হালদার তো মৌপিয়াকেও মারধোর করত?”
“ভুল কথা ম্যাডাম। একদম ভুল কথা।”
“প্রিয়াঙ্কা এসব কথা তোমাকে বলল?”
“একমাত্র আমাকেই…আমাকে ছাড়া ও কাউকে বিশ্বাস করত না!” আনন্দর বিধ্বস্ত মুখটায় হঠাৎ একটা আলগা দীপ্তি ফুটে উঠল
“কখন বলল?”
“ভেঙে ভেঙে, মাঝে মাঝে…হোটেল লিন্ডসেতে যখন আমরা একসঙ্গে সময় কাটাব বলে গেলাম, পিঙ্কিকে ছুঁতেই পিঙ্কি শিউরে উঠল। আমাদের তখন অনেকদিনের সম্পর্ক, আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম ও কেন
এমন অদ্ভুত ব্যবহার করছে…তারপর…তারপর…”
“তারপর?”
আনন্দ মাথাটাকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল, “আসল কথাটা খুব নোংরা ম্যাডাম!”
“কী কথা?”
“পিঙ্কি…পিঙ্কির…” আনন্দ ফুঁপিয়ে উঠল।
“দেখ আনন্দ, যদি সত্যিই এধরণের ঘটনা ঘটে থাকে তবে আইনের চোখে তোমার অপরাধ লঘু হয়ে যেতে পারে। তুমি পুরোটা খুলে বল।”
ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরে আনন্দ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। কান্নার প্রবল উদগত বেগ সামলাতে সামলাতে তারপর বলল, “মৌয়ের সঙ্গে ওর বাবার একটা নোংরা সম্পর্ক ছিল ম্যাডাম। সেইজন্যেই মণি হালদার মৌকে অত সুযোগ দিত। পিঙ্কি রাজি ছিল না, তাই পিঙ্কিকে সহ্য করতে পারত না। এভাবেই চলছিল কিন্তু গতবছর পিঙ্কি আর আমার সম্পর্কটা মৌ জেনে গিয়েছিল। আমার সঙ্গে পিঙ্কির সম্পর্ক ফাঁস করে দেবে বলে পিকি বাধ্য করেছিল নোংরা লোকটার কাছে যেতে.. “ আনন্দ আবার ডুকব কেঁদে উঠল।”
“মানে!”
“ওই লোকটা…ওই লোকটা পিঙ্কির সঙ্গে…পিঙ্কি বলেছিল ও কোনোদিন আমার সঙ্গে সুস্থ শারীরিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না।”
“তুমি বলতে চাইছ, মৌপিয়া হালদারের সঙ্গে মণিরঞ্জন হালদারের অবৈধ সম্পর্ক ছিল! আর তোমাদের সম্পর্কের কথা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মৌপিয়া প্রিয়াঙ্কাকে রাজি করেছিল ওর বাবার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে? প্রিয়াঙ্কাকে মণি হালদার ধর্ষণ করেছিলেন?”
“হ্যাঁ। ওই নোংরা মেয়েটার তো জন্মটাই ওইভাবে! ওর জন্মের আগে ওর মায়ের সঙ্গে ওর বাবার কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওর মাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য দিনের পর দিন লোকটা…ওদের বাড়ির বিরাট কেচ্ছা আছে ম্যাডাম!”
“হ্যাঁ, জানি।”
“পিঙ্কির পড়াশুনো, শখ আহ্লাদ সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছিল লোকটা। আর ওই নোংরা মেয়েটা একটার পর একটা সুযোগ পেয়ে যাচ্ছিল। তবু পিঙ্কি এসব মুখ বুঝে সহ্য করেছিল। কিন্তু যখন আমাদের ব্যাপারটা জানতে পারল মৌ, ও অস্থির হয়ে গেল। পিঙ্কি রাজি না হলে মৌ সবকিছু মণি হালদারকে বলে দেবে বলল। বলল, আমি যা করছি তোকেও একই জিনিস করতে হবে। আসলে বিধান ওকে পাত্তা দিত না বলে মৌ আরও রেগে ছিল। আমাদের প্রেমের সম্পর্ক ও সহ্যই করতে পারত না। প্রথমবার ওর ওপর অত্যাচার হওয়ার পর বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য পিঙ্কি কলকাতায় পালিয়ে গেল। কিন্তু মৌ ওকে সমানে ভয় দেখাচ্ছিল…”
আমার মাথাটা পাঁই পাঁই করে ঘুরছিল। চোখের সামনে পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা ভেসে এল। দয়ালহরি মণ্ডল পরিষ্কার লিখেছেন, ‘দ্য হাইমেন ইজ রাপচার্ড বাই ইনসার্টিং দ্য উডেন স্টিক। শি ডায়েড ভার্গো ইনট্যাক্টা!’ কুমারী অবস্থায় মৃত্যু।
আমি আনন্দর দিকে তাকালাম। মূর্খ ছেলেটা একফোঁটা ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করেনি!
“নোংরা লোকটা…নোংরা লোকটা চাইত শুধু ওর সঙ্গে পিঙ্কি শুক। অন্য কারুর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখছে জানতে পারলে মেরেই ফেলত পিঙ্কিকে। তাও পিঙ্কি নিজের প্রাণের ভয় পায়নি, কিন্তু আমাকে নিয়ে ও খুব ভয়ে থাকত, যদি আমাকেও…” আনন্দ বিড়বিড় করে বলল।
“তুমি প্রিয়াঙ্কার মাথা ফাটানোর দাগ, হাত ভেঙে যাওয়ার এক্স-রে এসব দেখেছ?” আমার মাথার মধ্যে একটা বিষাক্ত রাগী সাপ ফণা তুলছিল। মনে হচ্ছিল আনন্দকে পিষে মেরে ফেলি।
“না! পিঙ্কি দেখাতে চায়নি। আমি কষ্ট পাব বলে সেরে না ওঠা অবধি আমাকে কলকাতা আসতে পর্যন্ত দেয়নি।”
“হুম। তারপর কী হল?” বহু কষ্টে রাগ চেপে বললাম।
“আমি…আমি বললাম মৌকে সরিয়ে দেব। পিঙ্কি কোনোদিন ভাবতেই পারেনি যে ওর জন্য কেউ এগিয়ে আসবে, কেউ ওকে এমনভাবে ভালোবাসবে। ও স্পষ্ট না বলল। কিন্তু আমি চাইছিলাম না ও এইভাবে বেঁচে থাকুক।”
“পুলিশের কাছে এলে না কেন? মণি হালদারের এগেন্সটে কমপ্লেইন করতে?”
আনন্দ ব্যাঙ্গের হাসি হাসল। ওর হাসির অর্থ বুঝতে আমার অসুবিধা হল না। “সুযোগ পেলে মণি হালদারকেই আগে মারতাম! কিন্তু ঠিক করলাম আগে সাপের বাচ্চাটাকে মারি, তারপর সাপটাকে…” ভয়ানক ঘৃণায় আনন্দ রক্ষিতের মুখটা কুঁকড়ে গেল।
আমার ভীষণ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল। দানবীয় অন্ধকার ঘিরে ধরছিল আমায়। জোর করে নিজের মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করলাম। সম্পূর্ণ ব্যাপারটা ওর কাছ থেকে জানতেই হবে।
“তারপর বলো কী করে প্ল্যানটা করলে?”
“এক দিন পিঙ্কি বলল, মৌ দিল্লী চলে যাওয়ার আগে শিওর আমার আর ওর কথা ওর বাবাকে জানিয়ে যাবে, তারপর আমরা আর কোনোদিন… আমি তখন ওকে বললাম পালিয়ে যাই চলো, কিন্তু ও রাজি হল না, বলল ওর মাকে কে দেখবে? ও খুব আশা করেছিল যে আমি একটা উপায় বার করব, কিন্তু কাজটা সত্যিসত্যি করতে হবে ভেবে আমি একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।”
“হু, তারপর গত মাসের একুশ তারিখ, আবার হোটেল লিন্ডসে …এবার আর ডেবিট কার্ডের ভুলটা করোনি। ক্যাশ পেমেন্ট। কিন্তু হোটেলের রেকর্ডে নামটা রয়ে গেছে।”
আনন্দ অসহায় ভঙ্গিতে তাকাল আমার দিকে। “হ্যাঁ, আমি কাজটা করতে ইতস্তত করছিলাম দেখে পিঙ্কির মন ভেঙে গিয়েছিল। মানসিকভাবে এত ভেঙে পড়েছিল! ওর মনটা আসলে ভীষণ নরম; আর আ…আমি ডিসিশন না নিতে পেরে ওকে কষ্ট দিচ্ছিলাম। কথা বলার জন্য একটা নিরিবিলি জায়গা দরকার ছিল। সে রাতে ও খুব কাঁদল। তারপর…”
“তারপর তোমরা শারীরিকভাবে একে অপরকে প্রথমবার কাছে পেলে?”
“হ্যাঁ।” একটু থেমে আনন্দ উত্তর দিলো।
“তারপর মৌপিয়াকে খুন করার প্ল্যান থেকে পিছিয়ে আসা তোমার কাছে
অসম্ভব হয়ে গেল।”
“কী করে পিছাব ম্যাডাম! ও নিশ্চয়ই ভাবত ওর সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়েছি আমি। আমি…..আমাকে ও যে কতটা বিশ্বাস করত, কতটা ভালোবাসত আপনি জানেন না…আমি ওর জন্য কিছু না করে পিছিয়ে এলাম দেখলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকত না ওর কাছে।”
“হুম ঠিকই। আচ্ছা মৌপিয়া যে জন্ডিসে ভুগত তুমি জানতে?”
“জন্ডিস! কই নাতো!” আনন্দ অবাক হয়ে বলল।
“হুম। তারপর ডেট আর টাইম কীভাবে ঠিক হলো?”
“ওই দিন মানে বৃহস্পতিবার সাড়ে দশটা নাগাদ পিঙ্কি হঠাৎ ফোন করে বলল, ওই দিনই রাত দেড়টার সময় বিধানের সঙ্গে মৌ দেখা করতে বেরোবে। এই একটাই সুযোগ, এটাকে কাজে লাগাতে হবে।”
“বিধান!”
“হ্যাঁ, বিধান নাকি রাজি হয়েছিল দেখা করতে। দেখা করে ফেরার পথে আমাকে কাজটা করতে হতো।”
“বিধান যে রাজি হয়েছিল সেটা প্রিয়াঙ্কা কীরকমভাবে জানল?”
“মৌ বলে ফেলেছিল ওকে। খানকিটা সবাইকে দিয়েই…” আমার দিকে তাকিয়ে আনন্দ কথাগুলো গিলে নিল।
“টাকাটা কি বিধান নিয়েছে? তুমি কিন্তু আগেরদিন বলেছ মৌপিয়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতেই তুমি ওকে মেরেছ। আজ অন্যরকম বলছ।” দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞাসা করলাম।
“পিঙ্কি ফেঁসে যেত ম্যাডাম! আর কোনো টাকার কথা আমি জানি না ম্যাডাম। সত্যি বলছি!”
“তুমি যখন ওকে মারলে ও কোথায় ছিল?”
“বাড়ির দিকে ফিরছিল ম্যাডাম।”
“তোমার সম্ভবত মৌপিয়াকে রেপ করার কথা ছিল?”
আনন্দ অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল।
“কী হল বল?”
“হ্যাঁ, মানে খুনটাকে ধর্ষণ দেখালে সুবিধা হয়, টিভিতে দেখায়, পুলিশের তদন্ত অন্যদিকে….” আনন্দ আবার কথা গিলে নিল।
“ধর্ষণের আইডিয়াটা কার, প্রিয়াঙ্কার?”
‘আনন্দ কোনো উত্তর দিলো না।
“কিন্তু তুমি তো রেপ করোনি?”
“না ম্যাডাম! আমি…আমার খুব মাথা ঘুরছিল।”
“তাই এখন তোমাদের দুজনের মধ্যে কথা বন্ধ? লাস্ট কল শুক্রবারে হয়েছে।”
“পিঙ্কি বলেছিল সব মিটে গেলে তারপর আমরা আবার আগের মতো হয়ে যাব। আপাতত কিছুদিন কথা বন্ধ রাখতে হবে।”
“প্রিয়াঙ্কা কোথায় ছিল তুমি যখন মৌপিয়াকে মারলে?”
“কেন, কলকাতায়। অত রাতে ও কোথায় থাকবে? খুনটা আমিই করেছি ম্যাডাম। পিঙ্কির কিছু হবে না তো?” আনন্দর শেষ কথাগুলো আর্তচিৎকারের মতো শোনাচ্ছিল।
*****
“ছেলেটা ডাহা মিথ্যে কথা বলছে স্যার। ওকে আমার হাতে তুলে দিন। বুটের তলায় ওর গলাটা পিষে যদি সত্যিটা না বার করতে পারি, তবে আমার বাপের নামে আপনি কুকুর পুষবেন।” সামন্ত ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন।
“আনন্দ রক্ষিত নিজের তরফ থেকে কোনো মিথ্যে বলেনি সামন্তবাবু। খুনটা যেভাবে ও করেছে বলছে তার সবটাই ফরেনসিক এভিডেন্স আর পোস্টমর্টেম রিপোর্টের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ছেলেটা এতই ভয় পেয়ে ছিল, মৌপিয়াকে অ্যাটাক করলে মেয়েটা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে বোঝেনি। ওর চিৎকার থামাতে সঙ্গে থাকা ফিজিওথেরাপির ডিস্কটা দিয়েই হিট করেছে। এত পাথর বা ইঁটের টুকরো চারিদিকে থাকা সত্ত্বেও। কতটা আনপ্রিপেয়ার্ড অবস্থায় খুন ভাবুন!”
“তাহলে চার্জশিট দিয়ে বাড়ি যাই চলুন। অনেক তো হল?”
“সেটা হয় না। ওর বক্তব্যে যতটুকু পানি আছে সেটা অন্য কারুর মেশানো। তাকে এত সহজে ছেড়ে দেবেন? সেই অন্য কেউ যে মেয়েটাকে বছরের পর বছর ধরে স্লো পয়জন করেছে, সেই অন্য কেউ যে আনন্দ রক্ষিতের মাথাটাকে ভালো করে ধুয়ে তাকে দিয়ে খুন করিয়েছে, সে পার পেয়ে যাবে?” আমার গলার আওয়াজে হয়ত এমন কিছু ছিল যে সামন্ত গম্ভীর হয়ে গেলেন।
“বাইবেলের কেইন আর অ্যাবেলের গল্পটা জানেন তো?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
সামন্ত মাথা নাড়ালেন।
“জেনেসিসে লেখা আছে, কেইন আর অ্যাবেল হল আদম আর ইভের প্রথম দুই সন্তান। দুজনেই ভগবান ইয়ায়োহেকে সন্তুষ্ট করার জন্য উপচার সাজাল। ইয়ায়োহে অ্যাবেলেরটা গ্রহণ করলেন কিন্তু কেইনের উপচারকে দূর দূর করে ফেলে দিলেন। রেগে গিয়ে কেইন তখন অ্যাবেলকে খুন করে, অ্যাবেলের রক্তে ভিজে যায় মাটি। অ্যাবেলের রক্ত শুষে ছিল বলে, ইয়ায়োহের অভিশাপে অভিশপ্ত মাটি নিষ্ফলা হয়ে পড়ে থাকে যুগের পর যুগ।”
“আচ্ছা!”
“কথায় বলে, ব্লাড ইজ থিকার দ্যান ওয়াটার। পরিবারের ভিত্তি স্থাপিত হয় রক্তের সম্পর্ক দিয়ে। কিন্তু কথাটা কি আদৌ ঠিক?”
“কেন নয় স্যার?”
“পরিবারের ভিত্তিটা আসলে বিশ্বাস দিয়ে তৈরী হয় সামন্তবাবু! ট্রাস্ট একটা বিরাট বড় ইস্যু। রক্তের টান, সামাজিক দায়বদ্ধতা, ন্যায়নীতির নিগঢ় এসব অনেক…অনেক পরে আসে। যে পরিবারের ভিত্তিটাই তৈরী হয়েছে অবিশ্বাস থেকে, সেখানে কোনো সম্পর্কই স্বাভাবিক থাকতে পারে না। কোনো না কোনো এক দিন বিষবৃক্ষ মাথা চাড়া দিয়ে উঠবেই।”
“আপনি বলছেন প্রিয়াঙ্কা হালদার…”
“প্রিয়াঙ্কা আমার সন্দেহের তালিকাতে ছিলই, প্রথমত যদি খেয়াল করে দেখেন খুনের বারোঘন্টা আগে মৌপিয়াকে করা একমাত্র উল্লেখযোগ্য ফোন প্রিয়াঙ্কার। বিষপ্রয়োগের ফ্রিকুয়েন্সিটা যদি খেয়াল করেন তবে দেখবেন একবছর আগে প্রিয়াঙ্কার কলকাতায় শিফট করার সঙ্গে সঙ্গে মৌপিয়ার শারীরিক অবস্থা বেটার হয়েছিল। কিন্তু প্রিয়াঙ্কার প্রতি সন্দেহ দৃঢ় হল ওর হোস্টেলে গিয়ে। আপনি কি কোনোদিন মেস বা হোস্টেলে থেকেছেন?”
“ওই, কলেজে পড়তে দু এক বছর।” সামন্ত বললেন।
“হোস্টেলে সাধারণত মানুষ নিজেদের প্রিয় কিছু স্মৃতি, যেমন ধরুন পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু সময়ের ছবি, কিছু কার্ড বা নিদেনপক্ষে নিজের শিল্পকর্ম দিয়ে ডেকরেট করে। বিশেষতঃ মেয়েদের হোস্টেলে গেলে আপনার এগুলোতে চোখ পড়তে বাধ্য। প্রিয়াঙ্কার টেবিল বা বিছানার পাশের দেওয়াল ছিল শূন্য। একটাও… নট ইভেন এ সিঙ্গল অ্যালফাবেট… কিচ্ছু ছিল না ওর আশেপাশে যা দিয়ে ওর ইমোশনটাকে আমি বুঝতে পারি। শি ইজ এ সাইকোপ্যাথ সামন্তবাবু!”
“সাইকোপ্যাথ!” সামন্ত ঢোঁক গিললেন।
“ওসব তো স্যার হলিউডি সিনেমায় দেখায়।”
“আমি সিনেমার সাইকোপ্যাথের কথা বলছি না। সাইকোপ্যাথের ক্লিনিকাল ডেফিনিশন অনুযায়ী সাইকোপ্যাথরা হল বিবেকহীন, সহানুভূতিহীন, মিথ্যেবাদী, ম্যানিপুলেটিভ, নার্সিস্টিক, অ্যাটেনশন সিকিং সেইসব মানুষ যারা তাদের ইচ্ছার পথে, তাদের ইগোর পথে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাদেরকে সরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র ভাবে না। দু একটা ক্রাইটেরিয়া হয়ত মিস হয়ে গেল সামন্তবাবু, কিন্তু মোটের ওপর ব্যাপারটা এরকমই।”
“মৌপিয়া প্রিয়াঙ্কা হালদারের ইগো হার্ট করেছিল?”
“কোয়ায়েট ন্যাচারালি সামন্তবাবু। মাধ্যমিকে প্রথম দশের মধ্যে থাকলে সেই স্টুডেন্টকে নিয়ে এই ছোট্ট মফস্বল শহরটায় ঠিক কতটা হইচই হতে পারে?”
“খুব হয়েছিল স্যার। পেপার টেপারে নাম বেরোনোর পর ক্লাবে ক্লাবে সম্বর্ধনা, মেডেল টেডেল সে সব বিরাট ব্যাপার। তারপর তো মেডিকেলে পেল…রত্ন মেয়ে ছিল।”
“ওর এই মেধাই ওর কাল হয়ে দাঁড়াল। আনন্দ রক্ষিত একটা কথা সত্যিই বলেছে, মণি হালদার প্রিয়াঙ্কাকে সহ্য করতে পারত না। তার একটা কারণ কী মনে হয় জানেন?”
“কী!”
“প্রথমদিন যেদিন ওদের বাড়িতে গেলাম শতদল মিত্রের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার মুখের মিল দেখে চমকে ওঠেছিলাম। ওর মুখটা দেখলেই মণি হালদারের রক্ত গরম হয়ে উঠত। মঞ্জু হালদার যে ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য স্বামীকে দায়ী করতেন, সে যেন মরে গিয়েও মরে গেল না! প্রতি মুহূর্তে প্রিয়াঙ্কা মঞ্জু হালদারকে শতদলের কথা মনে করিয়ে দিত, ক্ষয়ে যাওয়া সাংসারিক সম্পর্ক কোনোদিন আর জোড়া লাগতেই পারেনি। জন্মের পর থেকেই একটা ডিসটার্বড পরিবেশ পেয়েছিল প্রিয়াঙ্কা। বাবা আর মামার টাগ অফ ওয়ারের ফলে নিষ্পেশিত শৈশব; ছোটবেলা থেকে অবহেলা আর নিজের প্রতি ধিক্কার নিয়ে বড় হতে হতে প্রিয়াঙ্কা যখন জেনে গেল যে এটাই ওর ভবিতব্য, তখন মৌপিয়ার জন্ম হল। প্রিয়াঙ্কা মিসেস হালদারের যেটুকু আদর-স্নেহ পেত সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেল।”
“মানে, মিসেস হালদারের অসুস্থতার জন্য?”
“হ্যাঁ। ওইটুকু বয়সে বাবা, মার স্নেহহীন জীবন যাপন করা ভীষণ সাংঘাতিক একটা ইস্যু সামন্তবাবু। যখন বুদ্ধিবৃত্তি ঠিক করে গড়ে ওঠেনি, তখন থেকেই প্রিয়াঙ্কা বুঝতে শিখল যে একমাত্র স্নেহের জায়গাটা যদি কারুর জন্য চলে গিয়ে থাকে তবে সে মৌপিয়া। মৌপিয়া ছিল মেধাবী, আর মেধার জোরে ও নিজের একটা পরিচিতি তৈরী করতে পেরেছিল। সম্ভবত মণি হালদারও মনে মনে ছোট মেয়ের অ্যাচিভমেন্টে গর্বিত ছিলেন। প্লাস ছোট মেয়ের জন্য মনের কোনো কোনায় একটা গিল্ট ফিলিং ছিল, জন্মের পর থেকেই তো মেয়েটা একেবারেই মাতৃস্নেহ পায়নি। মুখে প্রকাশ না করলেও তিনি টাকাপয়সা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিয়ে যেতে লাগলেন। আপনি ওর আঁকা বা গানের সার্টিফিকেটগুলো দেখেছেন তো?”
“হুম!”
“ছোট থেকে যে মেয়েটা শুধুই অবহেলা পেয়েছে, হয়ত তার মধ্যমেধার জন্য পাড়া-প্রতিবেশী, স্কুলে অবজ্ঞা সহ্য করেছে সে তার এই পরিস্থিতির জন্য বোনকে দায়ী করতে শুরু করল। মনে মনে ভাবতে লাগল, মৌপিয়া না জন্মালে হয়ত প্রতিনিয়ত ওকে এই তুলনার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো না।
“কফিনের শেষ পেরেকটা গাঁথা হল যখন মৌপিয়ার মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলো। এই ছোট্ট শহরে লোকের কাছে ও একটা আইকন হয়ে উঠল। বাড়িতে তুমুল অশান্তির সময়ও নিশ্চয়ই এই নিয়ে প্রিয়াঙ্কাকে কথা শুনাতেন মণি হালদার।”
“তারপরই স্লো পয়জনিং?”
“হ্যাঁ। কিন্তু বিষের প্রভাবে যে জন্ডিস হতে পারে সেটা ওর ধারণায় ছিল না। মৌপিয়া ডাক্তারের কাছে গেল এবং সতর্ক হয়ে গেল।”
“তারপর?”
“ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটল। বিধানের সঙ্গে মৌপিয়ার একটা বাল্য প্ৰেম ছিল। যেটা মণি হালদারের ঘোরতর অপছন্দের কারণ ছিল। স্বভাবগতভাবে মণি হালদার অসম্ভব রাফ একজন মানুষ, নিশ্চয়ই মেয়েকে চড় থাপ্পড় মেরে শাসিয়েছিলেন। প্রিয়াঙ্কা একটা সুযোগ পেয়ে গেল, বোনের কাছাকাছি আসার, ওকে ভরসার পাত্রে পরিণত করার। আমার ধারণা, খাবার নিয়ে সন্দেহের ব্যাপারটা মৌ ওর দিদিকে জানিয়েছিল। প্রিয়াঙ্কা সন্দেহের তীরটা ওর বাবার দিকে ঘুরিয়ে দিলো। এর পর থেকেই মণি হালদারের সঙ্গে মৌপিয়ার মারাত্মক দূরত্ব তৈরী হয়। বন্ধ দরজার ওপর জুতো ছুঁড়ে মারা…মনে পড়ছে?”
“হুম!”
“নবগোপাল হুঁইয়ের মারা যাওয়ার পর বিধান একেবারেই মৌপিয়ার থেকে দূরে চলে গেল, এবং সেটার দায়ও প্রিয়াঙ্কা বাবার ওপর চাপাল। এটা করতে অবশ্য ওকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। নবগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ওর রাস্তা সোজা করে দিয়েছিল। আপনি মৌপিয়ার মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করুন একবার, দিদি বাদে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না, বিধানের সঙ্গে দূরত্ব কীভাবে দূর হবে দিদির কাছে পরামর্শ চাইছে। এদিকে যাকে এত ভালোবাসে সে ভুল বুঝে দূরে সরে যাচ্ছে।”
“আর আনন্দ?”
“আনন্দ!” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্মই হয় গলাটা হাঁড়িকাঠে দেওয়ার জন্য সামন্তবাবু। যমদূতের মতো বাবা, অত্যাচারিত রাজকন্যা, প্রেমের একটা সুদীর্ঘ নাটক, কিছু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না, শারীরিক ঘনিষ্ঠতা… টিপিক্যাল সিন্ডারেলা স্টোরি সামন্তবাবু! আসলে নতুন বৌয়ের জামাকাপড় খুললে তারা অমন কেঁপে কেঁপে ওঠে কেন জানেন?”
সামন্ত আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন।
“ছেলেরা মেয়েদের ওই অসহায়, শরণাগত, লজ্জাবনত, আর্ত রূপটি দেখতে ভালোবাসে। সমস্যাটা হয় যখন এই সাইকলজিটা ব্যাকফায়ার করে। প্রিয়াঙ্কা হালদারের মতো কিছু সাইকোপ্যাথ সেটার সুযোগ নেয়। প্রিয়াঙ্কা জানত, মৌপিয়া মেডিকেল দেবে এবং পাবে। হাতের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই ওকে সরাতে হবে। আনন্দর মতো পাঁঠা থাকতে সেই সুযোগ কীভাবে ছাড়ত প্রিয়াঙ্কা? সম্ভবতঃ আনন্দর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো এবং কলকাতায় যাওয়া দুটোই ক্যালকুলেটেড স্টেপ।”
“কিন্তু স্যার, এসবই তো থিয়োরি, মিস হালদারের বিরুদ্ধে কোনো এভিডেন্স নেই!”
“একদম ঠিক। ভালো উকিল হলে আনন্দও ইনস্যানিটির বাহানায় ছাড়া পেয়ে যাবে সামন্তবাবু! প্রিয়াঙ্কাকে তো বাদই দিলাম। আনন্দ যে কলকলিয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছে, কোর্টে সব অস্বীকার করবে।”
“তাহলে উপায়?”
“উপায় একটাই। বিধানকে এবার ডাকুন। আমি দুশো ভাগ শিওর, সেদিন রাতে এক্সাক্ট কী হয়েছিল ও জানে, এবং কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ও মুখ খুলছে না। আনন্দর স্টেটমেন্ট বলছে খুনের সময় প্রিয়াঙ্কা কলকাতায়, অথচ প্রিয়াঙ্কার নিজের স্টেটমেন্ট, আমাদের ইনভেস্টিগেশন, ওর মোবাইল টাওয়ার লোকেশন সব বলছে ও বর্ধমানে। আরেকটা বিরাট ধোঁকার জায়গা আছে, সেটাই এই রহস্যের মিসিং লিঙ্ক।”
“কী? টাকা?”
“এক্সাক্টলি। আর তার সন্ধান দিতে পারে একমাত্র বিধান। ওর কেস তো কাল দায়রায় উঠছে?”
“হ্যাঁ। পুলিশ জামিনের বিরোধিতা করবে না।”
“একদম। দায়রা থেকেই সোজা যাতে থানায় আনা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। আর প্রিয়াঙ্কার ওপর সাদা পোশাকে নজরদারি বসান।”
“সে তো এখানেই এখন।”
“কোথায়? বাড়িতে?”
“হ্যাঁ। উইকেন্ডে আসে তো।”
“ওকে। একজন কনস্টেবলকে লাগিয়ে রাখুন।”
********
সেশন কোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা দরদর করে ঘামছিলাম।
গণেশদা অসম্ভব বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আবার কী! এখন তো দেখছি বেকসুর খালাস হলেও পুলিশ টানাটানি করছে, এমনি এমনি পাবলিক তোদের ওপর খাপ্পা নয়।”
“সে কী! তুমি পুলিশের লোক হয়ে পুলিশের নিন্দা করছ?” আমি হালকা হেসে বললাম।
“খোঁচড়রা কখনও কারুর লোক হয় না দাশু। ওসব ঢং ছাড়। দেখ দাশু, তুই এর আগে বিধানের কোয়ার্টার রেইড করেছিস, আমি কিছু বলিনি। কিন্তু এখন? তুই এবার টর্চার করছিস।”
“তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেব।”
গণেশদা হাত তুলে আমাকে থামিয়ে বলল, “বিধান থানায় যাবে কিন্তু উকিল ছাড়া নয়। আমাকে আজ কলকাতা ফিরতেই হবে। তারপর দেখছি, সময় লাগবে একটু।”
“আরে সামান্য কটা প্রশ্ন!”
“না!” গণেশদা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। দূরের অশ্বত্থ গাছটার তলায় বসে বিধান কোল্ড ড্রিংকস খাচ্ছিল। বেশ কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলে ছোকরা ওকে ভিড় করে ছিল, মাঝে মাঝে চটুল কথাবার্তার ঝাঁজটা এদিকেও উড়ে আসছিল। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বিধান চোখ সরিয়ে নিল।
বিধানকে মন দিয়ে লক্ষ করলাম। এর আগে সামনাসামনি ওকে কোনোদিন দেখিনি। মৌপিয়ার মোবাইলে একাধিক ছবি সেভ করা ছিল; তার মধ্যে একটা স্কুল ইউনিফর্ম পরে, কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে। ছবিটায় মৌপিয়া নেই, কারণ সে-ই ছবি তুলেছে হয়ত। বিধানের চোখে অনাবিল খুশি, সূর্যের প্রথম আলোর মতো ঝিলিক মারছে। বিধানের এক হাত বাড়ানো মৌপিয়ার দিকে, যেন হঠাৎ ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ছবিটা অনবদ্য কারণ, যার ছবি তোলা হয়েছে এবং যে তুলেছে তাদের দুজনেরই আনন্দটুকু ওই একটুকু ছবিতে বন্দী হয়ে মোবাইলে রয়ে গেছে।
আর এখন! এখন সামনে যাকে দেখছি তার কাছে আনন্দের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে সেটা একঝলকেই বোঝা যায়। ঔদ্ধত্যের ঔজ্জ্বল্য চিনতে ভুল হয় না। বড় চকচক করে!
গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে থানার দিকে এগোতেই ফোনটা বেজে উঠল।
এডিজির ফোন। মহেন ভান কনফেশন দিয়েছে। মণিরঞ্জন হালদার নবগোপাল হুঁইয়ের খুনি নয়! আমার কেসের সঙ্গে অফিসিয়ালি মহেন ভানের সম্পর্ক শেষ। তবে কে মারল বিধানের বাবাকে? প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করার আগেই এ.ডি.জি ফোন কেটে দিলেন।
********
খাটো-গলা, মোটাসোটা, আঁইটাই গরমে গলা বন্ধ সাদা শার্ট পরিহিত যে লোকটার সঙ্গে বিধান থানায় ঢুকল তার নাম পরীক্ষিত সর্দার হলেও কেন জানি আমার মনে হল বিশ্বম্ভর নামটা খুব স্যুট করবে।
চেয়ারটা টেনে নিজেই বসে বিশ্বস্তর উকিল বললেন, “নিয়ম কানুন নিশ্চয়ই মেনে কাজ হবে এখানে। যা জিজ্ঞাসা করার তাড়াতাড়ি করুন।”
বিধান দাঁড়িয়েই ছিল। বসতে বলাতে ভাবলেশহীন মুখে চেয়ারে বসল।
“নবগোপাল হুঁইকে কিন্তু মণিরঞ্জন হালদার মারেননি বিধান। যে বা যারা তোমার মাথায় ওটা ঢুকিয়েছে, সে কিন্তু কোনো সুযোগের সদব্যবহার করেছে, হতে পারে তোমাকে ইউটিলাইজ করেছে।” আস্তে করে কথাটা ওর দিকে ছুঁড়ে দিলাম। আমি ঠিক করেছিলাম প্রথমেই শক-থেরাপি দেব।
ও চমকে আমার দিকে তাকাল। ওর তাকানো দেখেই বুঝলাম, তীর সঠিক নিশানায় লেগেছে।
“তোমার বাবাকে যে লরিটা মেরেছে তার সঙ্গে মণিরঞ্জন হালদারের কোনো কানেকশন নেই।” আমি শান্তভাবে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম।
বিধান অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকাল, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না আমার কথা।
“তবে কে?” বিধান হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
“সেটা বলা এই মুহূর্তে একটু চাপের। কিন্তু মৌপিয়ার বাবা কোনোভাবেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।”
“প্লিজ বলুন!” বিধান অস্থির হয়ে উঠল।
“অন্য কেউ। কিন্তু মণি হালদার নন।”
“অসম্ভব! ওই লোকটাই মেরেছে আমার বাবাকে। বাবার জনপ্রিয়তা ওর হজম হচ্ছিল না।”
“না, তোমার বাবাকে যে লরিটা মেরেছিল তার চালক অলরেডি পুলিশ কাস্টডিতে বিধান।”
“সে কী বলছে, কে মারতে বলেছিল আমার বাবাকে?”
“বলব, তার আগে তুমি বল সেদিন রাতে তুমি কী দেখেছিলে?” বিধান উত্তর দিলো না।
“মৌপিয়ার পরিণতিটা খুব প্যাথেটিক বিধান।” আমি কেটে কেটে বললাম। “তুমি যদি না বল, সেই রাতে তুমি কী দেখেছিলে, তবে হয়ত মৌপিয়ার প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পাবে না।”
বিধান ভুরু কুঁচকে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন কিছু একটা মেলানোর চেষ্টা করছিল।
“মৌপিয়ার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কি বলছে জান? ওকে এর আগেও বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। তোমরা তো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলে, কিছু জানো এ ব্যাপারে?”
বিধান হতবাক হয়ে মুখ উঠিয়ে তাকাল আমার দিকে।
“ওর পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আরও কী লেখা আছে জানো? ওকে অনেকক্ষণ ধরে যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। ও বাঁচার খুব চেষ্টা করেছিল…মে বি তুমি যদি ওর কাছে পৌঁছাতে পারতে ও হয়ত বেঁচেও যেত। তুমি সে রাতে ওকে দেখেছিলে? যদি কাছে যেতে হয়ত মৌপিয়া…”
“আমার ক্লায়েন্টের পক্ষে কোনোভাবেই মার্ডার ভিক্টিমের কাছে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আমার ক্লায়েন্ট খুন হতে দেখেনি।” নির্বাক বিধানের পাশ থেকে বিশ্বস্তর বলে উঠল।
বিশ্বম্ভরকে পাত্তা না দিয়ে, বিধানের মুখের থেকে একটুও চোখ না সরিয়ে বললাম, “মৌপিয়ার মাথায় পাথর মেরে, গলা টিপে, ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। ওর মাথায় যে পাথরটা দিয়ে মারা হয়েছিল সেটায় ওর খুলির হাড় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল। তারপর মৃত্যুর পর খুনি ওর আন্ডারওয়ার নামিয়ে একটা মোটা তুলি ঢুকিয়ে ওর…তুলিটা ওর প্রাইভেট পার্টসের অনেকটা গভীরে ঢুকেছিল বিধান…”
“আপনি কিন্তু ওর ওপর টর্চার করছেন।” বিশ্বস্তর বলে উঠল। “থামুন এবার!”
আমি বিধানের দিকে তাকালাম। ও আমার কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিল, শুধু মৃত মানুষের মতো ওর মুখটায় কোনো অভিব্যক্তি ফুটে উঠছিল না। ডান হাত দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা পেপার-ওয়েটটাকে ও শক্ত করে ধরে ছিল। আমার কথা শেষ হতেই পেপার-ওয়েটটাকে ও ছেড়ে দিলো। সামান্য রোল করে ওয়েটটা টেবিলের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়াল।
“আমার ক্লায়েন্ট কিছু জানে না। কিছু বলার থাকলে তো বলেই দিত। বিধান চলো।” বিশ্বস্তর পাশ থেকে খোঁচালেন।
একটা অস্থির নীরবতা নেমে এল। পাশের টেবিলে সামন্ত কাকে যেন বেশ বকা-ঝকা করছিলেন, থানার বাইরে বেশ কয়েকজনের লম্বা লাইন ছিল, তাদের সম্মিলিত কথাবার্তা ভেসে আসছিল। কিন্তু আমি একাগ্র হয়ে বিধানের দিকে তাকিয়েছিলাম। ও যত দেরী করছিল, তত মনে হচ্ছিল আর হয়ত বলবে না! এটাও একটা ইনকমপ্লিট জাস্টিসের কেস হবে!
“মৌকে কে মেরেছে? ওই আনন্দ?” বিধান হঠাৎ স্বপ্নোত্থিতের মতো জিজ্ঞাসা করল।
উত্তর দিলাম না।
“বলুন না?” শূন্যদৃষ্টিতে ও তাকাল। তারপর আমার উত্তর না শুনেই ও বলতে শুরু করল, “মৌ অনেকবার কথা বলতে চেয়েছিল, আমি কোনো উত্তর দিইনি। লাস্ট যেদিন স্কুলের সামনে ওকে দেখলাম, অনেকক্ষণ ধরে রিকোয়েস্ট করেছিল, একটিবার কথা বলার জন্য। আপনি ঠিক জানেন ওর বাবা আমার বাবাকে মারেনি?” বিধান আমার দিকে ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকাল।
“মৌপিয়ার সঙ্গে সম্পর্কটা ভেঙে গিয়েছিল কেন? তোমার বাবার মৃত্যুর কারণে?”
বিধান উত্তর দিলো না, কিন্তু অনুভব করলাম ওর মানসিক যন্ত্রণা হচ্ছে। ওর জন্য আলাদা কোনো সমবেদনা অবশ্য আমার হচ্ছিল না। যে আবেগ যুক্তির পথ বন্ধ করে দেয়, তার প্রতি আমি ছোট থেকেই বিতৃষ্ণ। শুধু হৃদয়ের এই অসীম অপচয়ে রাগ হচ্ছিল… প্রবল রাগ!
“কিন্তু আর কে…আর কে হতে পারে? বাবা তো কারুর কোনোদিন কোনো ক্ষতি করেননি।” বিধান বিড়বিড় করে বলল।
“হয়ত যারা ক্ষতি করত তাদের চিনতেন।”
বিধান চকিতে আমার দিকে তাকাল। “কাদের চিনতেন?” ও বলল।
“আর কদিন অপেক্ষা কর। সবই জানতে পারবে।” আমি শান্তভাবে বললাম। “কিন্তু তুমি তো বুঝতে পারছ, তোমার নামটা এই কেসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে কারণ তুমি সে রাতে অকুস্থলে ছিলে। আনন্দ রক্ষিত বলেছে সে রাতে মৌপিয়া তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।”
“সেকী! কই আপনি এসব তো আগে বলেননি।” বিশ্বস্তর পাশ থেকে বলল। “আমার সাথে? আমার সঙ্গে শেষ দুবছরে ওর কোনো কথা হয়নি!” বিধান অবাক হয়ে বলল।
“তাহলে সে রাতে তুমি কী এমন দেখলে যে এতদিন চুপ করে থাকলে? তুমি কি কাউকে বাঁচাতে চাইছ বিধান?”
“না…না… আমি কাকে…”
“তবে তোমার বলতে অসুবিধা কোথায়?”
“দেখুন অফিসার…আপনি কিন্তু ফোর্স করতে পারেন না…” বিশ্বস্তর ফাটা রেকর্ডের মতো বলে উঠল
আমার মাথাটা ফস করে গরম হয়ে গেল। মনে হল উকিলটার গলাটা টিপে ধরি, কিন্তু ইউনিফর্মের দায় অনেক। রাগটা চেপে বললাম, “আপনি কি চান না যে একটা বাচ্চা মেয়ের খুনি ধরা পড়ুক?”
“সেটা আপনার তদন্তের বিষয়। কোর্টে কেস উঠুক, সরকারি কৌশুলি কোর্টে ফর্মালি জিজ্ঞাসা করুন, আমার ক্লায়েন্ট উত্তর দেবে। সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবে। তার আগে ঘটনা পরিক্রম না বুঝে আমি আমার ক্লায়েন্টকে কিছুতেই মুখ খুলতে দেব না। এই যে আপনি বললেন, আনন্দ রক্ষিত জেরায় আমার ক্লায়েন্টের নাম নিয়েছে, এটা…এটা তো আনঅফিসিয়াল কথাবার্তা। আপনি কী করে ভাবছেন তার বেসিসে আমার ক্লায়েন্ট জবানবন্দী দেবে?”
“খুনিকে ধরাটা আমার না হয় ফর্মাল ডিউটি, অ্যাজ এ সিটিজেন আপনার কি কোনো নৈতিক দায় নেই?”
“আমাকে ডিউটি দেখাবেন না ম্যাডাম। আমার ফোরমোস্ট ডিউটি আমার ক্লায়েন্টের স্বার্থ দেখা; সেটা আপনার কাছ থেকে আমি শিখব না। আর নৈতিক দায়িত্ব! সাপের বাচ্চা সাপই হয় ম্যাডাম। পিছন থেকে ছোবল মারে। মরে গিয়েও আমার ক্লায়েন্টকে ফাঁসিয়ে গেছে।”
“কী সব বলছেন যা তা?”
বিশ্বস্তর হাত তুলে বললেন, “ব্যাস, যথেষ্ট হয়েছে। বিধানের যা বলার বলা হয়ে গেছে, এর পরে আর একটা কথারও উত্তর দিতে আমার ক্লায়েন্ট বাধ্য নয়। : চলো বিধান।” বিশ্বম্ভর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল।
বিশ্বম্ভর প্রায় হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে বিধানকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে বসে থাকলাম। ফাইলটা খুলে একবার মৌপিয়ার ছবিটা দেখলাম। অন্ধকারের মধ্যে আলোর একটুকু আভাস পেয়েও সেটা মিলিয়ে গেল; আমার ক্লান্ত অবসন্ন লাগছিল। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার মৌপিয়া হালদারকে কেউ সাপের বাচ্চা বলে দাগিয়ে দিলো। শরীরের রক্তটা কতটা ম্যাটার করে? আমার শরীরে কার রক্তের প্রভাব বেশি? বাবার না মার!
ফাইলটা থেকে মৌপিয়া আমার দিকে তাকিয়ে নিষ্পাপ হাসছিল!
বাড়িতে গেটটা খুলে ঢুকতেও ইচ্ছা করছিল না। বিধান কিছু বলল না, বলবেও না। ইমোশনালি ওকে আঘাত করার চেষ্টা করেও কিছু হল না। ও যদি না বলে, তবে আর কোনো আশা নেই। উকিলটা না থাকলে হয়ত বলত।
গভীর রাতে একটা ফোন এল আমার কাছে। ফোনটা তুলতেই ঘরঘর একটা শব্দ; তারপর হঠাৎ সব চুপ! আমার সবকটা ইন্দ্রিয় হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠল, তবে কী যা ভাবছি…খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কে?”
কোনো উত্তর এল না।
“কে বিধান?”
অনেকক্ষণ পর একটা পরিচিত গলা বলল, “হ্যাঁ।”
“কিছু বলবে?” আমি গলার উদ্বেগ যথাসম্ভব চাপার চেষ্টা করলাম।
“হ্যাঁ…” একটু ভেবে উত্তর এল।
“আমি কথা দিচ্ছি মৌপিয়ার মৃত্যুতে তুমি যদি জড়িয়ে না থাক, তবে আমার সর্বশক্তি দিয়ে তোমাকে প্রোটেক্ট করব। কিন্তু প্লিজ! সেইরাতে কী হয়েছিল বলো।”
আরও বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বিধান বলা শুরু করল-
“সেই রাতে আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম মেইনরোডের কালভার্টটার কাছে। হঠাৎ মৌপিয়াকে দূর থেকে আসতে দেখে আমি কালভার্টটার পিছনে গিয়ে লুকাই। ওকে দেখা দেওয়ার আমার ইচ্ছে ছিল না। মৌ মেইনরোডের কাছে এসে হ্যালোজেনটার তলায় কার জন্য যেন অপেক্ষা করছিল। একটু পরে একটা টোটো এসে দাঁড়ায়, আর মৌ টোটোটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। টোটোর মধ্যে কেউ একজন ছিল, মৌ একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে দু-তিন মিনিট কথা বলল। তারপর টোটোটা বেরিয়ে যায়।”
“টোটোর ভেতরে কে ছিল চোখে পড়েনি?”
“না! রেক্সিন দিয়ে ঘেরা টোটো। যে ছিল সে নামেনি।”
“কী রঙের রেক্সিন? টোটোর কী রঙ?”
বিধান কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করে বলল, “মনে হয় কালো। ঠিক মনে পড়ছে না। টোটোর রঙটা খেয়াল নেই।”
“আচ্ছা, তারপর?”
“মৌ আবার আমার সামনে দিয়েই হেঁটে ওর বাড়ির দিকে এগোয়। ও অনেকটা এগিয়ে গেলে আমি কালভার্টের পিছন থেকে বেরোই, আর দেখার চেষ্টা করি ও কোনদিকে যায়। হঠাৎ পাম্পঘরের কাছটা থেকে ও যেন ভ্যানিশ হয়ে যায়। রাস্তাঘাট অত রাতে একদম অন্ধকার থাকে, যেটুকু আলো মেইনরোডের হ্যালোজেন বাতি থেকেই আসে। আমি পরিষ্কার কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না, · কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি, তারপর মনে মনে ভাবি এগিয়ে দেখব। কিন্তু তখনই আমার ফোন আসে, আর জানতে পারি যার জন্য অপেক্ষা করছিলাম সে কোয়ার্টারের কাছে আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হতো, তাই তখন ফিরে যাই।
“পরের দিন ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর মনের ভেতরটা খচখচ করছিল, পাম্পঘরটায় অনেকরকম লোকজন আসে মাঝেমাঝে। সাইকেল নিয়ে আবার ওর বাড়ির দিকে এগোই। পথেই পাম্পঘরটা পড়ে, উঁকি মেরে দেখি দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ।
“সাইকেল থেকে নেমে দরজাটা ঠেলে দেখি, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। পিছন দিয়ে ঘুরে, জানালাটার কাছে গিয়ে উঁকি মারতে যাই, তখনই জামালদাকে আসতে দেখি। তাড়াহুড়ো করে সাইকেলটায় চেপে ওখান থেকে বেরিয়ে যাই।”
“তুমি মৌপিয়ার ডেডবডি দেখেছিলে?”
“শুধু একঝলক দেখেছিলাম। কিন্তু ভালো করে দেখার আগেই জামালদাকে দেখি।”
“টোটোটা কোনদিক থেকে এসেছিল?
“বর্ধমানের দিক থেকে।”
“আর গেল কোনদিকে?”
“আবার ওদিকেই ফিরে গেল।”
“নাম্বারপ্লেট দেখেছিলে?”
“নাহ। খেয়াল করিনি।”
“তুমি অত রাতে কার জন্য অপেক্ষা করছিলে?”
বিধান উত্তর দিলো না।
“মৌপিয়াকে তো ভালোবাসতে বিধান? নাহলে ভোরবেলা আবার খুঁজতে যেতে না!”
“না…না…আমি কাউকে ভালোবাসতে পারি না দিদি।” বিধান কাতরে ওঠে বলল, “আমি মৌকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছি, আমি কারুর ভালোবাসার যোগ্য নই।”
“অত রাতে কার জন্য অপেক্ষা করছিলে?”
বিধান চুপ করে থাকল। উত্তর দিলো না।
“বিধান!”
“আমাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না দিদি। এর বেশি আমি কিছু বলতে পারব না। ফোনটা কটাস করে কেটে গেল।”
