দেহ খুঁড়ে খুঁড়ে যদি জাগে বিষ
নবগ্রামে একটা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছাড়া আর কিছু নেই। হোমিসাইড কেস তাই সোজা বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে যায়। ভাবলাম একবার ডিডিতে যাব, ফাইলগুলো রেখে আসার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তারপর ভাবলাম, যদি সার্জন কেটে পড়ে!
নবগ্রাম থেকে বর্ধমান মেডিকাল কলেজ মোটামুটি চল্লিশ মিনিটের রাস্তা। বশিষ্ঠপুর, পালসিট, গাংপুর হয়ে সোজা। চারিদিকে দারুণ সবুজ, মধ্যে মধ্যে পাকা ধান হলদে রঙের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। ধানগাছের মাথায় সোনালি রোদ ঝলমল করছে। আমার শহুরে চোখ খানিকক্ষণ গাড়ি থামিয়ে এই অদ্ভুত রঙটা মাথার মধ্যে গেঁথে নিতে চাইছিল, ঘড়ি বলল অবকাশ নেই।
গণেশদা এর মধ্যে বার চারেক ফোন করেছে। কেস দায়রাতে তাড়াতাড়ি তোলার জন্য চেষ্টা-চরিত্র করছে। বিধান গণেশদার ভাইয়ের ছেলে। ভাই মারা গেছে বেশ কিছুদিন। যতদূর শুনেছিলাম এই বর্ধমানেই, অ্যাক্সিডেন্টে। গণেশদাও বিয়ে থা করেনি, বিধানকে নিজের ছেলের মতো দেখে। স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন।
বর্ধমান ডিডি ইউনিটে আমার চাকরির বয়স চার মাস। এর আগে ছিলাম দুর্গাপুর-আসানসোল ডিডি ইউনিটে। দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি হওয়াতে রাজ্যের ক্রাইম ম্যাপে বর্ধমান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপুর আসানসোলে কোলমাফিয়া আর আয়রন স্ক্র্যাপ ডিলারদের রমরমা অবস্থা। খুনজখমে সরগরম এরিয়া। তুলনায় এই এরিয়া শান্ত। লাকিলি এখানে হোমিসাইড। ডি.এস.পি. স্যার নিজেও কেসটা নিয়ে চিন্তিত। ন্যাচার অফ মার্ডারটা ইউনিক। অনেকগুলো ডেলিবারেট অ্যাটেম্পট। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট খুঁটিয়ে পড়ার পর কতগুলো বিষয় পরিষ্কার হয়। প্রথমে মেয়েটির মাথার বাঁদিকে একবার আঘাত করা হয়েছে, সেই আঘাতে খুলির চামড়া ছড়ে গেছে, সামান্যই রক্তপাত হয়েছে। মেয়েটাকে তারপর ঘষটিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে গলা টিপে মারার চেষ্টা হয়েছে, গলায় গভীর লিগেচার মার্কস।
অক্সিজেন সাপ্লাই সাময়িক বন্ধ হয়ে হাইপক্সিয়া। তারপর অজ্ঞান অবস্থাতেই বাঁদিকেই কানের চার ইঞ্চি উঁচুতে করা দ্বিতীয় আঘাতটিই প্রাণঘাতী। ভোঁতা ভারী কোনো অস্ত্র দিয়ে মারার ফলে তিন ইঞ্চি লম্বা গভীর আঘাত। ডাক্তার আন্দাজ করেছেন যন্ত্রটি ভারী এবং গোলাকার, অনেকটা ছোট কোনো চাকা বা ডিস্কের মতো। আঘাতের ফলে খুলির হাড়ে ফাটল ধরেছে, যেখানে প্রাথমিক আঘাতটা লেগেছে, সেই ক্ষতের পরিধি বরাবর হাড় কিছুটা আর্চশেপে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়েছে, ঘটেছে অন্তর্লীন রক্তপাত। ডিপ্রেসড স্কাল ফ্র্যাকচার অ্যান্ড সাবডিউরাল হেমাটোমা।
মেয়েটির ঠোঁটের চারপাশে কাটা-ছড়ার দাগ, নিচের ঠোঁটে টুথ বাইটমার্ক মুখ অনেকক্ষণ চেপে রাখার ফলে যেটা হয়। আরও একটি বিষয় পয়েন্ট-আউট করেছেন সার্জন, যার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেই ওঁর সঙ্গে কথা বলার দরকার।
অটোপসি সার্জন দয়ালহরি মণ্ডল প্রবীণ মানুষ, আর বছর তিনেক বাকি রিটায়ারমেন্টের। আমার পরিচয় দিতেই ভদ্রলোক সাড়ম্বরে অভ্যর্থনা করলেন।
“হ্যাঁ, তো যেটা বলছিলাম দর্শনা।” ডক্টর মণ্ডল চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, “মেয়েটির অটোপসিতে দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, গুরুত্বপূর্ণ ইন দ্য সেন্স খুব ইউনিক পয়েন্ট…” একটু থামলেন তিনি, “এক, মেয়েটার লিভারটা বেশ ড্যামেজড ছিল। আমি নোট দিয়েছি রিপোর্টে।”
“হ্যাঁ, এটাই জিজ্ঞাস্য ছিল। আপনি ভিক্টিমের লিভার ডিফর্মড লিখেছেন এবং তলায় স্পেশাল নোট দিয়ে লিখেছেন অ্যাবনরমাল হেপাটিক অ্যাট্রফি। এটা কেন?”
“হ্যাঁ, আমি একটু খুলে বলি তোমাকে ব্যাপারটা। ডক্টর মণ্ডল চশমাটা নামিয়ে রাখলেন টেবিলে। মেয়েটির লিভারটা ড্যামেজড ছিল, লেমন-ইয়েলো টিন্ট, গ্রিজি, সফট, যেমনটা সাধারণ জন্ডিসে হয়ে থাকে। কিন্তু গল্পটা অন্যজায়গায়। বডি ওপেন করার সঙ্গে সঙ্গে একটা হালকা গন্ধ পেয়েছিলাম। সন্দেহ হওয়াতে, লিভারের একটা মাইক্রোস্কোপিক সেকশন করি, তাতে দেখলাম লিভারের সেলগুলোতে যে ফ্যাট ডিপোজিট থাকে সেগুলো কোনো কারণে ডি-জেনারেট হয়েছে।” ডাক্তার মণ্ডল একটু থেমে ভাবলেন।
“কীসের গন্ধ পেয়েছিলেন?”
“রসুনের। সাধারণতঃ ফসফরাস পয়জনিংয়ের কেসে আমরা এটা পেয়ে থাকি।”
“মানে বিষক্রিয়ায় লিভার ড্যামেজড?”
“হ্যাঁ। এবং আমার ধারণা, অনেকদিন ধরে ধীরে ধীরে এই ফসফরাস মেয়েটির শরীরে ঢুকেছে। কিন্তু মেয়েটির মৃত্যুর সাথে এই বিষক্রিয়ার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তাই রিপোর্টে অ্যাবনরমাল হেপাটোমেগালি লিখে রেখেছিলাম।”
আমার ফাইলে রাখা মৌপিয়া হালদারের ছবিটার কথা মনে পড়ছিল। রোগা, পাতলা, হাসি-খুশি একটা বাচ্চা মেয়ের ওপর কার এত রাগ হতে পারে? ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া, তারপর আক্রমণ এবং খুন, আর খুনের পর ধর্ষণ! বিষক্রিয়া যে করেছে সে এবং খুনি কি আলাদা, নাকি তারা কোনোভাবে সম্পর্কিত! সবথেকে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল খুনের পর ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে রেপ! নেক্রোফিলিয়া বিদেশে বেশ কমন ব্যাপার, হালফিলে আমাদের দেশেও এক আধটা কেস শোনা যাচ্ছে। কিন্তু খুনের পর শরীরে ইনস্ট্রুমেন্ট ইনসার্ট করা ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে আনকমন। একটা ডেড বডির সঙ্গে এই ধরণের অত্যাচার যে করে, তার মানসিক পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছিলাম।
“আপনি শিওর ধর্ষণটা পোস্টমর্টেম, স্যার?”
“হান্ড্রেড পারসেন্ট!” ডক্টর মণ্ডল চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন। “রেপটা পোস্টমর্টেম। ওটাই দু-নম্বর ইউনিক পয়েন্ট। মৃত্যুর আগে রেপ হলে, হাইমেন রাপচারের জন্য ব্লিডিং হতো, ইনফ্লেমেশান থাকত, বা সিমেন থাকত। আমি খুব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেই রিপোর্টে লিখেছি ব্যাপারটা। যে ইনস্ট্রুমেন্টটা ওর শরীরে ইনসার্ট করা হয়েছে, সেটা নতুন, কাঁচা কাঠ দিয়ে তৈরী, সামনের দিকটা সরু, গোল, পয়েন্টেড হলেও, পেছনের দিকটা ক্রমশঃ চওড়া হয়েছে। কাঁচা কাঠের আঁশ মেয়েটির প্রাইভেট পার্টসে আমি পেয়েছি। একবারই ইনসার্ট করা হয়েছে ইনস্ট্রুমেন্টটা। ধরে নাও, মিনিমাম ইঞ্চিপাঁচেক লম্বা।”
“সামনের দিকটা সরু, তারপর চওড়া হয়েছে?”
“হ্যাঁ। ভ্যাজাইনার ওয়ালে দু ইঞ্চি ব্যাস ধরে ছড়ে যাওয়ার দাগ আছে, লম্বালম্বিতে দেখলে সেই দাগ তিন ইঞ্চি। হাইমেন কিন্তু রাপচার হয়েছে পয়েন্টেড অংশটা দিয়ে।”
“আচ্ছা! কী হতে পারে ইনস্ট্রুমেন্টটা? আপনার এক্সপেরিয়েন্স কী বলে?”
“ইট কুড বি এনিথিং, মে বি এ স্টিক, মোস্ট প্রবেবলি এ পেইন্টব্রাশ।” আমার পাম্পঘরের খালি কৌটোটার কথা মনে পড়ে গেল।
“পেইন্টব্রাশ?”
“হ্যাঁ, মানে দৈর্ঘ্য প্রস্থে এরকম।” দয়ালহরি মণ্ডল একটা পেপার টেনে এঁকে বোঝাতে শুরু করলেন।
