বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

চুম্বনে মিলায় দোঁহে, অচুম্বনে?

মিনিট বিশেক আগে মেয়েটা রেস্টোরেন্টে ঢুকেছে; মিক্সড নুডলস, চিলি চিকেন আর দু গ্লাস কোক অর্ডার করেছিলাম। মেয়েটা মৌপিয়ার মতো অ্যাকাডেমিক নয়। লাস্ট বেঞ্চার। স্কুল-গেজেট। খুব কাজের মেয়ে। মৌপিয়া হিসেবমত এক্স স্টুডেন্ট। ওর ক্লাসটিচারের কাছ থেকে এই মেয়েটার নাম রেফারেন্স পেয়েছি। ঝিমলি দে।

অলরেডি বিধান আর মৌপিয়ার প্রেমপর্বের ভার্চুয়াল ডেসক্রিপশন পেয়ে গেছি। চুমু-টুমু তারা কোনোদিন খায়নি। বিস্তর চিঠি চালাচালি হয়েছে, তার কটা ঝিমলির হাত দিয়েই। তখন মৌপিয়ার কাছে মোবাইল ছিল না। গাছতলায় বসে টিফিন ভাগ করে খেত অবশ্য। মৌপিয়ার মাধ্যমিক অবধি এই গাছতলা পর্ব চলেছে। বিধান তখন ড্রপ-আউট। ঝিমলির কথা অনুযায়ী স্কুলের বাইরে থেকে তেঁতুলের আচার নিয়ে আসত বিধান। তারপর স্টপ! কেন সেটা ঝিমলি জানে না।

রেস্টুরেন্টের টিভিতে বিদ্যুত জামালের অ্যাকশন শট চলছিল। কমোন্ডো ২। মেয়েটা হাঁ করে গিলছিল। বিদ্যুত, বিদ্যুতের ফলার মতো উড়ে গিয়ে গাড়ির জানালার কাচ ফুঁড়ে গাড়িতে ঢুকে গেল। আমি ধৈর্য ধরে কোল্ড ড্রিঙ্কের গ্লাসে ভাসমান বরফটার সাঁতার দেখছিলাম। গলতে শুরু করেছে, এবার দু তিনবার বাটারফ্লাই স্ট্রোক মেরেই গ্লাসের তলায় ডাইভ মারবে। স্ট্র দিয়ে বরফের কুচিটাকে একটু নেড়েটেড়ে ঝিমলির মনোযোগ আকর্ষণের বিস্তর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না।

“ইয়ে মানে চুমু খেত না তুমি শিওর?”

ঝিমলি বিদ্যুত থেকে মুখ না সরিয়েই বলল, “না একদম খেত না। আমি দেখার জন্য ফলো করেছি অনেকবার। খুব বোরিং ছিল ওরা।”

“কোনো ঘনিষ্ঠ ছবিটবির কথা জানতে?”

“ঘনিষ্ঠ! ওই যেরকম ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করে?” ঝিমলির চোখে বুদ্ধি ঝিলিক দিচ্ছিল।

একটু অবাক হয়েই বললাম, “হ্যাঁ।”

ঝিমলি হেসে ফেলল। “যতদূর জানি ওদের মধ্যে একবার ঝগড়া হয়েছিল ছবি তোলা নিয়ে। মাধ্যমিকের রেজাল্টের পর মোবাইল কিনেছিল মৌপিয়া। বিধানদা ছবি তুলতে চাইত না। আর ও জোর করত। বেশি ছবি নেই ওদের, আমি দেখেছি।”

“মৌপিয়া চিঠিতে কী লিখত?”

ঝিমলি ডান দিকের ভুরুটা অদ্ভুত কায়দায় ওপরের দিকে তুলে স্ট্রতে সুডুক করে একটা চুমুক দিলো।

“ওই কবিতা!”

“দুজনেই?”

“না, না মৌপিয়াই।”

“আর বিধান?”

“ও খালি লিখত নেক্সট কোথায় দেখা হবে।”

“তুমি তো সবই খুলে পড়তে?”

ঝিমলি দাঁত বার করে কাঁধ ঝাঁকালো।

“ফেসবুক অ্যাকাউন্ট? টুইটার, ইন্সটাগ্রাম? ছিল কিছু?”

“নাহ। কাকাবাবু খুব স্ট্রিক্ট ছিলেন। জানলে ব্যাপক ক্যালাতেন।”

“মৌপিয়া মারধোর খাওয়ার কথা বলেছে কোনোদিন?”

“না। কিন্তু ঝাড় খেত বোঝাই যেত। পিঙ্কিদিকে মানে মৌয়ের দিদিকে তো মেরে একবার ঠোঁট ফুলিয়ে দিয়েছিলেন। টেস্ট পরীক্ষার আগে।”

“একই স্কুলের নাকি তোমরা?”

“হ্যাঁ। পিঙ্কিদি চার বছরের সিনিয়র।”

“তোমাদের বলেছিল বাবা মেরেছে?”

“না, কিন্তু সবাই জানতাম।”

“আচ্ছা ঝিমলি, তুমি কোনোদিন মৌপিয়াকে বাড়ির কোনো সমস্যায় মুষড়ে থাকতে দেখেছ?”

ঝিমলি মনে করার চেষ্টা করল। “না, মৌ খুব চাপা মেয়ে ছিল। কথা কম বলত। শুধু বিধানদার ব্যাপারে খুব অধৈর্য হয়ে যেত। তবে শেষের দিকে ওর মধ্যে একটা চেঞ্জ এসেছিল।”

“কীরকম?”

“এমনিতে ও একটু ঘরকুনো টাইপ ছিল। কিন্তু টুয়েলভে পড়ার সময় একদিন বলল, আমাকে এখান থেকে বেরোতেই হবে। নাহলে কিছুতেই সব ঠিক হবে না।”

“জিজ্ঞাসা করোনি কী ঠিক হওয়ার কথা বলছিল?”

ঝিমলি ঠোঁট উল্টে বলল, “করেছিলাম। কিন্তু কিছু বলল না।”

“ওর যে জন্ডিস হয়েছিল জানতে?”

“হ্যাঁ। তারপর তো সেরেও গিয়েছিল।”

“বিধানের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল?”

ঝিমলি চোখ কপালে তুলল। “কার, মৌপিয়ার?”

“হ্যাঁ।”

“না, না। ও তো বিশ্বাসই করত না যে ওর কাছে বিধানদা আর ফিরবে না। দিল্লি যেতে হবে দেখে একটু মুষড়ে পড়েছিল।”

“তোমার সঙ্গে লাস্ট কবে দেখা হয়েছিল?”

“মঙ্গলবার বিকেলে। ফিজিক্স স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, আমিও গিয়েছিলাম।”

“সেদিন কিছু অন্যরকম দেখেছিলে? কোনো দুশ্চিন্তা বা অন্যরকম কোনো কথা?”

“নাহ! বিধানদার সঙ্গে দেখা হল না, এটা নিয়ে দুঃখ করছিল।” ঝিমলি কোকাকোলার শেষ ড্রপটুকু টেনে নিতে নিতে বলল।

বিল মিটিয়ে টেবিল থেকে ওঠে আসার সময়ে ঝিমলি উসখুশ করছিল। শেষে বলল, “একটা কথা মনে পড়ে গেল। যদি কোনো কাজে লাগে।”

“বলো।”

“অনেকদিন আগের কথা যদিও, ইলেভেনের অ্যানুয়াল পরীক্ষা শুরু হবে। আমার প্র্যাক্টিকাল খাতা কমপ্লিট ছিল না। এমনিতে মৌ বাড়িতে ডাকতে চাইত না। মনে হয় কাকিমা চিৎকার করবে সেই ভয় পেত।

আমি সেদিন না বলেই চলে গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি। পরেরদিন স্কুলে খাতা জমা দেওয়ার জন্য ওয়ার্নিং খেয়েছিলাম। গেটের কাছ থেকে শুনি দুজন লোক চিৎকার করছে ঘরের মধ্যে। মনে হল, মৌয়েরও একবার গলা পেলাম। আমি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ভাবছি ঢুকব কী, ঢুকব না! ঠিক তখনই দরজা ধাম করে খুলে মৌয়ের মামা বেরিয়ে এলেন। আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে মেইনরোডের দিকে হাঁটা লাগালেন। ঘরের ভেতর থেকে কাকু তখনও চিৎকার করে যাচ্ছেন।”

“তুমি ওর মামাকে চিনতে?”

“হ্যাঁ। দেখেছি তো আগে।”

“আচ্ছা। তারপর?”

“সাহস করে ঢুকেই পড়লাম। খাতাটা লাগতই। দেখি বসার ঘরে সোফায় প্রিয়াঙ্কাদি বসে আছে, চোখমুখ লাল। মৌ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। কাকু একটা খিস্তি দিচ্ছিলেন, আমাকে দেখে থেমে গেলেন।”

“কী খিস্তি?”

“হারামির বাচ্চা! বেশ করেছি। আবার করব শালা!”

“কাকে বলছিলেন?”

“ঠিক বুঝিনি।”