বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

ঢলের জলে কামঠ আসে, কুমির ভাসে, সাপ গো!

একটা শান্ত দীঘির জলে ঢিল ফেলেছে কেউ। অনেকগুলো তরঙ্গ পুকুরের কেন্দ্রবিন্দু থেকে মন্থরগতিতে পাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। পাড়ে ঠেকতে এখনও বহু দেরী।

নবগ্রামের জগত্তারিণী দেশলাই কারখানার বাইরে দাঁড়িয়ে ঠিক সেরকমই মনে হচ্ছিল আমার। এই কারখানাটা থেকে একটা লিড পাওয়ার আশা নিয়ে সকাল সকাল এসেছিলাম এখানে। চাবিটা আফটার অল এখান থেকেই খোওয়া গেছে। কিন্তু দিল্লি কেন, দিল্লির দক্ষিণ দুয়ারও অনেক দূর এখনও!

জগত্তারিণীতে জাহাজ মার্কা দেশলাই তৈরী হয়। বিরাট সাইনবোর্ড। পুরো পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, গুজরাত, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র সহ একাধিক রাজ্যে যায় জাহাজ মার্কা দেশলাই। দুটো শিফটে কাজ হয় কারখানায়। ম্যানেজার কাম মালিক আমার সামনেই দাঁড়িয়েছিলেন। ভদ্রলোক দরদর করে ঘামছিলেন, সেটা প্রচণ্ড গরমে না নার্ভাসনেসে বোঝা যায় না। সিসিটিভি না থাকার জন্য জবরদস্ত ধমক খেয়েছেন একটু আগেই।

উনি মণিরঞ্জন হালদারের বাড়ির প্রত্যেককে চেনেন। মৌপিয়াকেও খুব ভালোভাবে চিনতেন। তার কারখানার কর্মচারীর পকেট থেকে চাবি চুরি করে মৌপিয়াকে খুন করা হয়েছে একথা মানতে পারছেন না।

জগত্তারিণীর চল্লিশজন কর্মচারীর প্রত্যেকের ফুটপ্রিন্ট আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হবে। অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারে সেদিনের সবার উপস্থিতির পাশে সইগুলো খুঁটিয়ে দেখছিলাম। জামাল সর্দারের সই রাত নটায়। সে যে সেইদিন সারা রাত এখানেই ছিল তার একাধিক সাক্ষী আছে কারখানায়। জগত্তারিনীর কম্পিউটার খারাপ হওয়ায় ম্যানেজারবাবু নিজে রাত জেগে ফাইলপত্রের কাজ করছিলেন। সামনেই অডিট রিপোর্টের সময়। কিন্তু কেউ জামাল সর্দারের পকেট থেকে কাউকে চাবি বার করে নিতে দেখেনি।

জামালকে সকালে থানায় ডেকে পাঠানো হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদটা লেখা হয়েছিল এইভাবে…

নাম?

—জামাল সর্দার

বাড়ি?

—চণ্ডীতলা, নবগ্রাম

বয়স

—৫২ বছর

পেশা?

—পাম্প অপারেটর, রাতে কারখেনার দারোয়ানগিরি করি দিদিমুণি।

ঘটনার দিন রাতে কী করছিলে?

—কারখেনার গেটে ছিলাম। চৌকিদারি করছিলাম আজ্ঞে।

কটা থেকে কটা অবধি?

—আজ্ঞে, আমার আগের লোকের শিফট শেষ হয় নটায়। আমি নটা থেকে ভোর পাঁচটা অবধি

প্রতিদিন ভোরবেলা কটায় পাম্প চালাও?

—সাড়ে পাঁচটায়, কারখেনা থেকে ফেরার পথে পাম্প চালাই। তারপর

সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরি।

শুক্রবার সকালে মানে ঘটনার দিন কটায় চালিয়েছিলে?

—চালালাম কই দিদিমণি? তার আগেই তো…

হুম। তোমার কারখানা থেকে পাম্পঘরে পৌঁছাতে কত সময় লাগে?

—তা ধরুন গে, টানা দেড় কিলোমিটার সাইকেল চালালে কারখেনা থেকে পাম্পঘর ২০ মিনিট মতো লাগে।

সেদিন টানাই চালিয়েছিলে?

—আইজ্ঞা হ্যাঁ।

তোমার পকেটে পাম্পঘরের চাবি নিয়ে বেরিয়েছিলে বৃহস্পতিবার রাতে? —আজ্ঞে। রোজই নিয়ে বেরোই। কোনো ভুল হয় না।

তোমার বাড়িতে কে কে আছে?

—বাড়ি তো নদীয়া দিদিমুণি। এহানে এহাই থাহি।

এখানে কতদিন আছ?

—-আজ্ঞে বিশ বছর। মণিকত্তা কাজটা জুটিয়ে দিয়েছিলেন।

তোমার বাড়িতে কারা কারা আসে এমনিতে?

—কেউ আসে না দিদিমুণি। আমি এহাই থাহি।

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন কেউ না? কাউকে চাবি দিয়েছিলে, মনে করে দেখ।

—আজ্ঞে কারুর সঙ্গে মিশি না, কারে চাবি দিমু?

তোমার নামে কিন্তু নালিশ আছে পুলিশের কাছে, তুমি পয়সা নিয়ে চাবি দিয়ে দাও পাম্পঘরের। ঠিক করে বলো, নাহলে বের করে নেওয়ার রাস্তা আছে আমার কাছে।

জামাল সর্দার দুহাত জিভ কাটল।

—ওসব গালগল্প দিদিমুণি। পাড়ার পোলারা রাতে পাহারা দেয়। শ্যালো পাম্প তো, চুরি হলে তো মণিকত্তা মাথা কাটবে।

মণিকতা জানে তুমি চাবি দাও?

—আজ্ঞে জানেন।

জানেন!

—জানেন।

এ কথা কোর্টে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে তো?

—আজ্ঞে না। পুলিশি জবানবন্দী আর কাছারির জবানবন্দী এক নয়, তাই কইতাসি। ওখানে বেবাক ভুইলা যাবো।

তুমি যা বলছ তা রেকর্ডেড হচ্ছে জানো তো?

—আজ্ঞে। কিন্তু ভেলু নাই। কাছারিতে এসবের ভেলু নাই।

জামাল সর্দার দাঁত বার করে হাসল।

সেদিন তোমার পকেট থেকে চাবি কীভাবে হাওয়া হয়ে গেল?

—বয়স হয়েছে তো দিদিমুণি। চোখ লেগে যায় মাঝে মাঝে। কেউ বেবাক

ইউনিফর্মের ভেতর থেকে তুলে নিলে টের পামু না।

কেউ মানে কে?

—যে কেউ। কারখেনার চল্লিশজন কর্মচারীর যে কেউ।

চাবিটা কি গোছায় থাকে?

—আজ্ঞে না। একটাই, লাল কারে বাঁধা থাকে।

ইউনিফর্মের পকেট থেকে চাবি তুললে তোমার ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা!

—খুব গরম তো দিদিমুণি। গেঞ্জির ওপর মোটা কাপড় পরে থাকতে পারি না। খুলে ঝুলিয়ে রাখি পেরেকে। জামাল সর্দার ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল।

কোন পেরেকে?

—ওই যেহানে বসি, ওর পিছনের দেওয়ালটায় লাগিয়ে নিয়েছি একখান।

বাহ! এক লাখ বিশ হাজার টাকা দিয়ে তুমি কী করেছ?

—কীসের এক লাখ বিশ দিদিমুণি। এ জেবনে বিশ হাজারই দেখতে পাইনি কোনোদিন। জামাল সর্দার চোখ পিটপিট করল।

মিথ্যে কথা বলছ! এক লাখ বিশ হাজার টাকা নিয়ে তুমিই লোক লাগিয়ে মৌপিয়াকে মেরেছ।

জামাল সর্দার হাসল।

কী হল বল! মণি হালদার তোমাকে বলেননি মেয়েকে খুন করতে?

—-মণিকত্তা যদি আমারে অর্ডার দেয়, আমি বিনি বাক্যে আমার ঘরের পোলাপানের গলা কাইটা ফালামু দিদিমুণি। মণিকত্তার সঙ্গে আমার ট্যাহার সম্পর্ক নয়।

তবে কীসের সম্পর্ক?

—দেশি কুকুর দেহেছেন তো? মনিব এক লাথি মারলেও কোণে গিয়ে কুই কুই করবে কিন্তু পরক্ষণেই আবার হাত চেটে দিবে। মণিকত্তা হলো গে আমার মনিব আর আমি তার কুকুর। নদীয়ার থেকে আসি যহন দোরে দোরে ভিক্ষা করতাম, মণিকত্তা আশ্রয় দিয়েছিল বলে বেঁচে গেসলাম।

তুমি বিধানকে চেন?

জামাল সর্দার অবাক হয়ে তাকাল। “চিনব না ক্যান? ওর বাপ নবগোপাল হুঁই চাষীদের মাথা ছিল, একজোট করেছিল। ফড়েরা মাথা কাটত চাষীদের, ন্যায্য পাওনা দিত না। সেই নিয়ে গাঁয়ে কত ক্যাঁচাল হয়েছিল। তারপর তো শ্যাষটায়…”

শেষে কী হল?

—জানেন তো আপনে। আপনে পুলিশ। পানাগড়ের কাছে লরি চাপা দিয়েছিল। কারুরে ধরতে পারেনি পুলিশ।

তোমার কি মনে হয় অস্বাভাবিক মৃত্যু? মানে খুন?

জামাল সর্দার একটু হাসল। খৈনি খাওয়া লাল দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছিল।

—খুন বললে খুন। মৃত্যু বললে মৃত্যু। সবই তো আপনাগো পুলিশের খাতায় লেহা থাহে দিদিমুণি।

তোমার কী মনে হয় কে মেরেছিল বিধানের বাবাকে?

—আমি আদার বেপারি দিদিমুণি। তবে গিয়া নবগ্রাম খুপ একটা সুবিধের জায়গা নয়, অনেকদিন আছি তো এহানে। একটু চোক কান খুলা রাহেন, পারলে মাথার পেছনে দুহান কান আর চোক লাগান।

তোমার কি মনে হয় নবগোপাল হুঁইকে মণিবাবু মেরেছিলেন?

জামাল সর্দার আবার জিভ কাটলো। এটা ওর মুদ্রাদোষ।

—ওসব লোকের কুপ্রচার। কানে নেবেন না।

লোকে মানে?

—বিধানের দলের পোলারা। ওই সব বলে বলে ওর মাথা খেয়েছে।

মণিবাবুর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন তোমার?

—আজ্ঞে, উনি আমার মা-বাপ। ওঁর বাড়ির সবাই ভগবান।

আর বিধানের সঙ্গে?

—ভালোই তো। আমার সঙ্গে আর সম্পর্কের কী… সে আছে, আমিও আছি। তবে কিনা, সে পোলা অগো বাপের মতো নয়। অগো বাপ অন্য পার্টি করত, কিন্তু মণিকত্তার সঙ্গে বুঝসুঝ রাখত। আর এ… সেদিনের চ্যাংড়া পোলা পার্টি কইরা ধরাকে সরা ভাবতাসে। কতায় কয়, পিপিলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে… এখন কেমন জব্দ হয়েছে! কিন্তুক একটা এমন দাগা দে গেল মণিকত্তাকে, আল্লাহ ওকে দোজখ নসিব করবেন।

জামালকে ছেড়ে দিয়ে কারখানায় এসেছিলাম। জামাল নামেই চৌকিদার 1 কারখানাটা সম্পূর্ণ অরক্ষিত। একটা প্যালপেলে গ্রিলের গেট মেইন এনট্রান্সে লাগানো। যে কেউ যে কোনো সময় এসে ঢুকতে পারে ভেতরে।

ফোনটা বাজছিল পকেটে। তোলার সঙ্গে সঙ্গে ওপার থেকে ডি.এস.পি.র গম্ভীর গলাটা ভেসে এল।

“কেস নম্বর ৩১৪/০১/২০১৭। তুমি হ্যান্ডল করছ?”

“হ্যাঁ স্যার। ওই খুনটার মামলায়।”

“ফাইলটা নিয়ে ইমিডিয়েটলি এডিজিকে রিপোর্ট করো। চার্জ কার এগেনস্টে? মহেন ভান তো?”

“হ্যাঁ!”

“ওকে। দিল্লী থেকে দুজন অফিসার্স এসেছেন হেড অফিসে। মহেন ভান ইজ বিয়িং সিকড বাই এ.টি.এস। লোকটাকে খুঁজে পাওয়ার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফাইলটা ওদের দরকার। মহেন ভান ইজ অফ এনি ইম্পর্ট্যান্স ইন ইওর কেস?”

“ইয়েস।”

“দেন ইউ মাস্ট গো! নাহলে বলতাম লোকাল পিএসকে দিয়ে ফাইলটা ফ্যাক্সিমিলি পাঠিয়ে দিতে। অ্যান্ড ট্রিট দিস অ্যাজ হাইলি কনফিডেনশিয়াল।”

ডি.এস.পি.র ফোন কাটতে না কাটতেই সুমন্তর ফোন। মেজাজ খিঁচিয়ে ছিল। এখন কলকাতা যাওয়া মানে সময় নষ্ট। বাকি এমপ্লয়িদের জেরা বাকি রয়ে গেল। চারটে গালি মেরে ওকে বললাম, “তোকে যে খবরগুলো নিতে বললাম, সেগুলোর কী হল?”

সুমন্ত হু হা হেসে বলল “কী হয়েছে, বোলতা কামড়েছে?”

“হ্যাঁ, বুনো হাঁসের পিছনে ছুটছিলাম। এখন দেখছি আমার পিছনে চাক ভেঙে বোলতা ছুটছে।”

“মানে?”

“কিছু না। তোর ওদিকে কদ্দুর এগোলো?”

সুমন্তর হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিল কেউ বুঝলাম। গণেশদা! উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, “ডাক্তার অরিন্দম বোস মেয়েটার মা মানে, মঞ্জু হালদারকে গত পাঁচ বছর ধরে প্রাইভেটে দেখছে। ভদ্রমহিলা ওঁর ছোট ভাই মরে যাওয়ার শকটা নিতে পারেননি। ভায়োলেন্ট হয়ে যান, মারধোর চিৎকার চেঁচামেচি করেন। নিজের পরিবারের কারুর ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন না।”

“আচ্ছা!”

“মৃত্যুটা কীভাবে?”

“ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে। ২০০৩ সালে, চন্দননগর স্টেশনে।”

“আচ্ছা!”

“সেসময় স্টেশন ম্যানেজার ছিল ওই মেয়েটার বাপ। অ্যাসিট্যান্ট স্টেশন ম্যানেজার মঞ্জু হালদারের বড় ভাই।”

“দুজনে একই স্টেশনে!”

“হ্যাঁ। আরও ঘাপলা আছে। প্রিয়াঙ্কা মানে মেয়েটার দিদি অরিন্দম বোসকে জানিয়েছে যে তার বাপ বাড়িতে তুমুল অশান্তি করে, কখনও কখনও মারধোরও।”

“হুম।”

তোকে বললাম না, “এই কেসটায় বিধান জড়িয়ে নেই। এটা অন্য কারুর কাজ। সেদিন আমার সঙ্গে বিধানের রাত দেড়টায় কথা হয়েছে। তখন ও বিলকুল নরমাল ছিল।”

“হ্যাঁ, কিন্তু এখন ও কথা বলছে না কেন? ওর কী প্রবলেম? তুমি তো দেখা করেছ?”

“কে জানে শালা! মেয়েটার শোকে কিনা কে জানে!” গণেশদার গলাটা শুকনো লাগছিল। গলা ঝেড়ে বলল, “কাজেই বুনো হাঁস কেউ নেই, পাতি হাঁস চড়ে বেড়াচ্ছে পুকুরে। শুধু গলায় ফাঁসটা ঠিকমত পরাতে হবে।”

“হুম।” গম্ভীরভাবে বললাম।

ফোনটা রাখার পর মনে হল, বুনো হাঁসের ব্যাপারটা সুমন্তকে বললাম, গণেশদার কানে কীভাবে গেল? সুমন্ত স্পিকারে রেখে ফোন করেছিল? আশ্চর্য তো!