বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

তীরন্দাজ, কোনটি তোমার পাখির চোখ!

স্বরাষ্ট্র-সচিব, এডিজি আর আসানসোল-দুর্গাপুর কমিশনারেটের কমিশনার সাহেবের ভিডিও কনফারেন্সটা শেষ হওয়া ইস্তক ঘরটায় একটা অদ্ভুত টেনশন নেমে এসেছে। অদ্ভুত লাগছিল। আমার কেসটার সঙ্গে এ.টি.এসের কী সম্পর্ক কে জানে? আমার কী আদৌ কোনো সুরাহা হবে না ঘোঁট পাকিয়ে ঘ হবে! এ.টি.এসের মালহোত্রা আর পি. শঙ্কর পাশেই বসে ছিল আমার। আমি বাইরে অপেক্ষা করছিলাম। কনফারেন্সের পর ঘরে ডেকেছেন এ.ডি.জি। উনি কম কথার মানুষ। কনফারেন্স শুরুর আগে মোটামুটি ব্রিফ করেছিলেন। এখন ডিটেলে বললেন।

“আসানসোলের বনবিষ্ণুপুর মৌজায় ২০১৪ সালে ইল্লিগাল মাইনিংয়ের জন্য কুখ্যাত ডন কালে সিংকে ধরেছিল পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বেআইনি অস্ত্র ব্যবহার, তোলাবাজি আর বেশ কটা খুনের অভিযোগ আছে। পরে কোর্টে নিয়ে যাওয়ার পথে কে বা কারা ওকে গুলি করে মারে, দুজন পুলিশ কর্মীও মারা যায় সেই ঘটনায়। বেআইনি কোল মাইনিং ছাড়াও ওর একটা ট্রান্সপোর্টের ব্যবসাও ছিল। ওর মাধ্যমে বেআইনি অস্ত্র চোরাচালান হতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আমরা তদন্তে জানতে পেরেছি, নবগোপাল হুঁইকে যে লরিটা পিষে দিয়েছিল, সেটা আগে কালে সিংয়ের ছিল। মহেন ভান কালে সিংয়ের লোক। কালে সিং খুন হওয়ার পরও দেখা গেল, বেআইনি অস্ত্রের কারবার এত সহজে থামার নয়। হয় এক বা একাধিক মাস্টারমাইন্ড রয়েছে এটার পিছনে।

কালে সিং একজন কাস্টমার ছিল মাত্র, এরকম আরও অনেক কালে সিং আছে এই বেল্টে। দুর্গাপুর আসানসোল কমিশনারেটের বিস্তীর্ণ এলাকায় মানে জামুড়িয়া, পাল্লাগ্রাম, মশাগ্রাম, চাঁচাই, নবগ্রাম…এর কোথাও একটা সেই চোরাই অস্ত্রের সরবরাহের র‍্যাকেট আছে। নেপাল, মায়ানমার, বাংলাদেশ থেকে অস্ত্রগুলো কলকাতা মারফত এখানে ঢুকছে। মূল হোতা মুম্বাইতে। ইমরান আহমেদ। ইউএপিএ-এর আন্ডারে লোকটার নামে একাধিক এফ.আই.আর। এখনও পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পশ্চিমবঙ্গের লিঙ্কটার ব্যাপারে কদিন আগে জানতে পেরেছে এটিএস। আপাততঃ রাজস্থান বা গুজরাট বর্ডারের বদলে পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে ৯০ ভাগ আর্মস আমদানি হচ্ছে। তারপর এখান থেকে ঝাড়খণ্ড, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশসহ একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ খুঁজছে সেই র‍্যাকেটটাকে। আমাদের ধারণা, নবগোপাল হুঁই সেই মাস্টারমাইন্ডকে চিনে ফেলেছিলেন। তাই, মহেন ভানের লরি ব্যবহার করে তাকে পিষে ফেলা হয়।”

“কে সেই মাস্টারমাইন্ড?” আমার মাথার ভেতরটা দপদপ করছিল।

“সেটা জানার জন্য মহেন ভানের ধরা পড়ার দরকার। আর র‍্যাকেটটা ঠিক

কোথা থেকে অপারেট করছে সেটা জানার দরকার। খুব চালাক আর ওয়েল ইনফর্মড র‍্যাকেট। মাল্টিপল সিম আর মাল্টিপল ফোন ইউজ করে। আমরা রেড অ্যালার্ট জারি করছি। লোকাল থানাগুলোকে অ্যালার্ট করা হয়েছে। তোমার কেসটার ব্রিফ দরকার আমার, দর্শনা। ইউ নেভার নো, কোনো কানেকশন থাকলেও থাকতে পারে। এ.ডি.জি কাঁধ ঝাঁকালেন।”

“সার্টেনলি স্যার।”

“আর কিছু বলবে?” এ.ডি.জি সপ্রশ্ন তাকালেন।

এ.টি.এসের লোকগুলোর সামনে আমি একটু ইতস্তত করছিলাম। স্যার ওদের বসতে বলে পাশের কেবিনটায় নিয়ে গেলেন। এই কেবিনটায় নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি। অন্তত যতটা আমার দরকার ছিল।

***

“একটা ক্রাইম যখন হয়, তখন সেই ক্রাইমের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারাটাই সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রিমিনালের নয়, ক্রাইমের মনস্তত্ত্ব। নতুন কথা নয়, যুগে যুগে স্টলওয়ার্টরা বলে গেছেন এ কথা। তবে আমার সবথেকে যেটা প্রাসঙ্গিক লাগে, সেটা নোয়াম চমস্কির বলা, ‘ফর দ্য পাওয়ারফুল, ক্রাইমস আর দোজ দ্যাট আদার্স কমিট।’

যুগে যুগে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আমরা যা দেখতে পাই, বুঝতে পারি, তার ভেতরে আরেকটা অবোধগম্য জগত আছে, যেটা ক্রাইমকে পরিচালিত করছে। তোমাকে সেটা অবধি পৌঁছাতে হবে দর্শনা।”

এডিজির বলা কথাগুলো কানে বাজছিল। এখন বাজে সকাল সাতটা। ফিরছি কলকাতা থেকে। ড্রাইভার আমার চেনা। এদিককারই ছেলে। আর পাঁচ কিমি গেলেই চন্দননগর। এই পথেই যখন, মৌপিয়ার মামাবাড়ি একবার ঢুঁ মারা যায়। মৌপিয়ার বড় মামার নাম কমল মিত্র। লোকটার বয়ান খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে।

গাড়িটা জোরে একবার টার্ন নিল। একটা বড় ট্রাক পিছন থেকে দ্রুতগতিতে ওভারটেক করেছিল। তাল সামলাতে পারেনি ড্রাইভার। গাড়িটা বাঁ দিক ঘেষে দাঁড়াতেই দেখলাম একটা পুকুর। মিলন ক্লাব। এরই আশেপাশে কোথাও একটা মিত্রবাড়ি।

6/112 মিত্রপাড়া রোড। হলুদ রঙের বাড়িটায় প্রাচীন গাম্ভীর্যের ছাপ। বেল বাজানোর প্রায় দশ মিনিট পর দরজা দিয়ে যিনি উঁকি মারলেন তার সঙ্গে অভিনেতা কমল মিত্রের চেহারার কোনো মিল নেই। বেটে খাঁটো চেহারা, চোখেমুখে বিরক্তি মাখানো, ঠোঁটের কোণে একটা অবজ্ঞা ঝুলে আছে। ঝুলপির কাছটা থেকে চুলের সাদা ছোপ মাথার দুদিকে ছড়ালেও সব চুল পাকেনি এখনও।

দোতলায় যাওয়ার সিঁড়িটা বেয়ে ভদ্রলোক ক্ষিপ্র বেবুনের মতো উঠতে লাগলেন। আমার পরিচয় পেয়ে যে খুব খুশি হয়েছেন তা নয়, একান্তই না করতে পারেননি বলে কথা বলতে রাজি হয়েছেন।

যে ঘরটায় বসলাম, তাতে পুরোনো দিনের ফার্নিচার, বেশ কিছু বইয়ের আলমারি, দেওয়ালে ঝোলানো অনেকগুলো প্রশংসাপত্র রয়েছে। কমল মিত্র ভেতর ঘরে গিয়ে একটা আদ্দির পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে এসেছেন। খেয়াল করলাম ডান কানে একটা হিয়ারিং এইড লাগানো। উনি বসেনও ডান দিক একটু হেলিয়ে।

“কী প্রশ্ন বলুন”, রুক্ষ গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।

“আপনি কি এখনও চন্দননগর স্টেশনে আছেন? শুনেছিলাম রেলে সার্ভিস করেন।”

“করতাম। রিটায়ার করেছি।”

“মণিরঞ্জনবাবু আর আপনি একই বয়েসী?”

“বাবু!” ভদ্রলোক অবজ্ঞার হাসি হাসলেন। “হাটুরে চাষী কবে থেকে বাবু হয়ে গেল? হ্যাঁ, মণি হালদার আর আমি একই বয়েসী।”

“মৌপিয়ার মৃত্যুটা…খবরটা কখন পেয়েছিলেন?”

“ওই দিনই। মণি ফোন করেছিল।”

“আপনার বোনের অসুস্থতাটা কত দিনের?”

“কেন পুলিশ খবর নেয়নি?” ভদ্রলোক আবার অবজ্ঞার হাসি হাসলেন।

“পুলিশ পুলিশের কাজ করছে। আপনি আপনার বক্তব্যটা বলুন।”

“পুলিশ পুলিশের কাজ কোনোদিনই করে না। রাজ্যসরকারের সবথেকে অপদার্থ ডিপার্টমেন্ট!”

“আমরা মনে হয় সময় নষ্ট করছি মিস্টার মিত্র।”

কমল মিত্র ডান পাটাকে বাঁ পায়ের ওপর তুলে একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর পিছনের দেওয়ালের একটি বাঁধানো সার্টিফিকেটের দিকে পয়েন্ট করে বললেন, “২০০২ এর ৮ই জানুয়ারি চন্দননগরের মোস্ট ব্রাইট স্টুডেন্টের মৃত্যুতে কী করেছিল আপনার ডিপার্টমেন্ট? ক্যাঁচকলা?”

ভদ্রলোক লিটারেলি বুড়ো আঙুল দেখালেন।

“আপনি মনে হয় আপনার ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বলছেন? ওটা আর.পি.এফের এক্তিয়ারভুক্ত। রাজ্য পুলিশের কিছু করার থাকে না।”

“রাবিশ! চন্দননগর থানায় মণি হালদারের নামে আমি নিজে এফ.আই.আর করেছিলাম। পুলিশ কোনো তদন্তই করেনি, চার্জশিট তো দূরের কথা।”

“কী নাম ছিল আপনার ছোট ভাইয়ের?”

কমল মিত্রের মুখটা একটু নরম হল। “শতদল, শতদল মিত্র।”

“অ্যাক্সিডেন্টটা কীভাবে হয়েছিল যদি বলেন?”

“অ্যাক্সিডেন্ট না, ওটা পূর্বপরিকল্পিত খুন ছিল। বুঝেছেন! বাকিটা আপনি বার করবেন। এবার আসুন। আমার কাজ আছে।”

“আর দুটো প্রশ্ন।” আমি নির্বিকারভাবে বললাম। “প্রথম, বৃহস্পতিবার রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?”

কমল মিত্রের চোখদুটো জ্বলে উঠল ধ্বক করে। “আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?”

“হ্যাঁ করছি।” স্পষ্ট জবাব দিলাম।

“যদিও আপনার কথার উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই, তবুও বলি বাড়িতেই ছিলাম। রাত বারোটা পর্যন্ত এঘরেই আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা চলেছে।” চিবিয়ে চিবিয়ে উত্তর দিলেন কমল মিত্র।

“তারপর?”

“তারপর ঘুমিয়ে পড়েছি। ওঠেছি মণির ফোনে।”

“আরেকটা প্রশ্ন। আপনার বোন মানসিকভাবে অসুস্থ। আপনার আর মণিরঞ্জনবাবুর শত্রুতা সেটায় কোনোভাবে ইন্ধন দিয়েছে?”

“মানে?”

“মানেটা খুব সিম্পল মিত্রবাবু। মৌপিয়ার শরীরে দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়ার প্রভাব দেখা গেছে। স্লো পয়জনিং। আপনার বোনের মানসিক অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে আপনি কি কখনও তাকে মৌপিয়ার খাবারে বিষ মেশাতে প্রভাবিত করেছিলেন?”

একটা আগ্নেয়গিরি ফাটল কিন্তু লাভা উদ্গীরণ হলো না। মিত্র কাটাকাটা স্বরে বললেন, “শুনুন ম্যাডাম, মিত্রবাড়ির লোকেরা নোংরা রক্তে হাত গন্ধ করে না। মারার হলে আমি সবার আগে ওই শুয়োরের বাচ্চাটাকেই মারতাম। আমার একমাত্র ইন্টারেস্ট আমার বোন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ওই জানোয়ারটার কবল থেকে ওকে বার করে আনার চেষ্টা করে যাব। বাকি ও নিজে আর ওর পাপের অওলাদের জন্য আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।” কমল মিত্র প্রায় কাঁপতে কাঁপতে বললেন।

“পাপের অওলাদ?”

“হ্যাঁ। খোঁজ নিয়ে দেখবেন।”

“খোঁজ আমি নিতেই পারি মিত্রবাবু। কিন্তু পুলিশের হয়রানি বাড়িয়ে আপনার কোন ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে সেটার খোঁজও নিতে হবে আমায়।” চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বললাম। “এত দিন ধরে ট্রিটমেন্ট করা সত্ত্বেও মিসেস হালদারের মানসিক অসুস্থতা সারেনি মানে আমরা ধরে নিচ্ছি তাকে পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিয়ে কেউ ইনস্টিগেট করত। এ ব্যাপারে কার স্বার্থ কাজ করছে সেটা খোঁজ করব বৈকী!”

দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে একটা ঘ্যাঁসঘেসে স্বরে আওয়াজ এল।

“দাঁড়ান।”

চেয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

“বসুন।”

বেশ অনেকক্ষণ সময় নিয়ে কমল মিত্র তার স্বভাবগত দাম্ভিক ভঙ্গিতে জানালার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন।