রক্তচিহ্ন লেগে থাকে অর্ধেক গোপনে
স্টেট ফরেনসিক সেলের ডেপুটি ডিরেক্টর মিস্টার শ্রীবাস্তব আমার পূর্বপরিচিত। ছিপছিপে নায়কমার্কা চেহারা, ফ্লাটেশিয়াস ক্যারেকটার। এমনি সময় ভালোই লাগে, এখন বিরক্ত লাগছিল। শ্রীবাস্তব সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। ফরেনসিক কিট বার করে টেবিলে সাজিয়ে আমাকে ডেকে বললেন, “একটু ইধারে আসবেন ম্যাডাম। আপনে যে ডিস্কটা স্যাম্পল বাতলিয়েছেন সেইটার ডায়ামিটার চার ইঞ্চি; এক একটার ওজন তিন কেজি। অ্যাম আই রাইট ম্যাডাম?”
টেবিলে রাখা ডিস্কগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে বললাম, “হ্যাঁ।”
শ্রীবাস্তব মাথা নাড়িয়ে বললেন, “ভেরি আরফরচুনেট ম্যাডাম! লুমিনল টেস্ট নেগেটিভ, ব্লাড ট্রেস নেই। কিন্তু সেটা পরের কথা।” আগে এটা দেখুন। শ্রীবাস্তব ল্যাপটপে একটা ফাইল এনলার্জড করে দেখালেন। “আপনার ভিকটিমের স্কাল ইনজুরি। এটায় ফ্র্যাকচার নেই, অ্যাব্রেশন আছে। খেয়াল করুন, দুটো প্যারালাল লাইন দেখছেন অন দ্য ফ্লেশ?”
“হ্যাঁ।”
“দুটো লাইনের বিচমে গ্যাপ কিতনা?”
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই, শ্রীবাস্তব সফটওয়ারে মেপে দেখালেন দু ইঞ্চি “প্লাস যেটা দিয়ে মারা হয়েছে, সেটায় একটা গ্রুভ আছে। লুক অ্যাট দিস পয়েন্ট। ব্লাড বেশি কোয়াগুলেট করেছে। হ্যায় না?”
“হ্যাঁ।”
“তার মানে গ্রুভটা গিয়ে হিট করেছিল ওখানে। অভি বোলেন, আপনি কী ইন্টারপ্রেট করলেন ম্যাডাম?”
“যে চাকাটা দিয়ে ওকে হিট করা হয়েছে তার রিমটা দুইঞ্চি চওড়া। তার গায়ে খাঁজ আছে। আর সেটা ওজনে এত ভারী নয়। নাহলে অ্যাব্রেশন হতো না।”
“মার্ভেলাস! আপনি তো আমার ভাত মারবেন ম্যাডামজি।” শ্রীবাস্তব উল্লসিত হতে গিয়েও আমার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে চেপে গেলেন। একটা মডেলিং ক্লের তাল রাখা ট্রে বার করলেন ড্রয়ার থেকে।
“ভাবুন, এটা স্কাল। অব আপ ইসমে মারো।”
বিধানের তিন কেজির ওয়েটটা তুলে কাদার তালটায় মারলাম। ডিস্কটা বসে গেল। শ্রীবাস্তব তোলার পর দেখা গেল, রিমটার দাগটা দেড় ইঞ্চি চওড়া।
বেলগাছিয়া থেকে বেরোনোর সময় শ্রীবাস্তব কফি খাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু মেজাজ এত তিতকুটে লাগছিল যে না করে দিলাম।
হতাশার একটা থ্রেশহোল্ড লিমিট আছে, অন্তত আমার ক্ষেত্রে। হতাশ হতে হতে সেটা ক্রস করলে, মনটা আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আপাতত অপেক্ষা করছি সেটায় পৌঁছানোর জন্য। বিধানের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য দুদিন গণেশদার ফোন ধরিনি। সুমন্তর ফোনটাও না জানি কেন সুইচড অফ।
ঘড়িতে বাজছে তিনটে। লাঞ্চ করে টালিগঞ্জ যেতে যেতে মিনিমাম পাঁচটা। বিজয়গড়ের দিকটায় প্রিয়াঙ্কার মেস। মেয়েটা কলকাতায় ফিরেছে। এর থেকে বেশি অফিস থেকে ছুটি ম্যানেজ করতে পারেনি বোঝাই যাচ্ছে। কাজেই একবার ঢুঁ মারাই যায়। প্রিয়াঙ্কা নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি ফিরবে না।
**********
বিজয়গড়ের মেসটা বেশি বড় নয়। একটা পুরোনো বাড়ির দোতলায় আটটা ঘর। আসলে চারটা, প্লাইয়ের পার্টিশন দিয়ে ডাবল করা হয়েছে।
প্রিয়াঙ্কা না থাকলেও ওর রুমমেট ছিল ঘরে। মোটাসোটা, একটু আধাভোলা টাইপ। নাম জিজ্ঞাসা করাতে বলল নবনীতা সরকার। আমার পরিচয় দিতেই মেয়েটা শিটিয়ে উঠল। সে এখনও ছাত্রী। এম.এস.সি ফাইনাল ইয়ার। যাদবপুরে পড়ে। বাড়িওয়ালি ওদের দুজনের ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে নিচে নেমে গেলেন। নবনীতার বেডের পাশের দেওয়ালে জন্মদিনের কার্ড, প্রিয়জনের ছবি ঝোলানো। বরং প্রিয়াঙ্কার খাটের পাশেরটা একেবারে শূন্য। নবনীতার দিকে দেওয়ালে এক বয়স্কা মহিলার গলা জড়িয়ে বেশ কটা ছবি আছে। নবনীতাকে জিজ্ঞাসা করাতে বলল ওর মা।
“ইনিই অসুস্থ ছিলেন তাই না?” প্রিয়াঙ্কার খাটের তলায় উঁকি মারতে মারতে জিজ্ঞাসা করলাম।
“হ্যাঁ। এখন ভালো আছেন।”
“কী হয়েছিল?”
“কার্ডিয়াক…কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট!”
“প্রিয়াঙ্কা কটায় ফেরে?”
“সাতটা, সাড়ে সাতটা।” মেয়েটা একটু ভেবে উত্তর দিলো।
“সেদিনও নিশ্চয়ই একই টাইমে ফিরেছিল, তারপর তোমরা ট্রেন ধরলে
একসাথে?”
“হ্যাঁ।”
“এত দেরী করে গেলে কেন?”
“খবরটা…খবরটা এল আটটার সময়। তারপর সব গুছিয়ে…”
“সব কী গুছিয়ে? জিনিসপত্র?”
“হ্যাঁ। ওই আর কী…” মেয়েটা আমার গতিবিধি দেখতে দেখতে বলল।
“কোন ট্রেনটায় গেলে যেন?”
“ওই তো বর্ধমান লোকাল।” খুব দ্রুত এল উত্তরটা।
“তারপর অত রাতে বাড়ি গেলে কীভাবে?”
“হ্যাঁ?” মেয়েটার শুনতে অসুবিধা হল।
“বাড়ি…গেলে কীভাবে?”
“টোটো…টোটো চলে তো অনেক রাতেও।”
“সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে গিয়েছিলে?”
“না। স্ট্যান্ডে ছিল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল।”
“তোমরা অতক্ষণ স্টেশনেই ছিলে?”
“হ্যাঁ। ফল কিনলাম এক নম্বর থেকে, পিঙ্কি বাড়িতে ফোন করল, তারপর টোটো এল।”
মেয়েটার বন্ধুভাগ্যের তারিফ করাতেও বিশেষ হেলদোল হল না। গুটিয়ে খাটের ওপর বসে থাকল। প্রিয়াঙ্কার বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা সে প্রশ্নেও এমন ফ্যালফেলিয়ে তাকাল যে মনে হল বয়ফ্রেন্ড শব্দটা প্রথম শুনছে। আরও নানা
এদিক সেদিকের গল্প করতে করতে দরজায় একটা আওয়াজ হল। প্রিয়াঙ্কা ঘরে ঢুকে আমাকে দেখে ততটাও চমকাল না, যতটা ভেবেছিলাম।
“নিচের কাকিমা বললেন আপনি এসেছেন। দাঁড়ান কফি বসাই।” মেয়েটা মুখ হাত পা ধুয়ে এসে বলল।
“আরে না, ঠিক আছে। সারাদিন এত খেটেখুটে এলে।”
“না, নিজের জন্য তো করবই। আপনি খাবেন না হয় একটু। ছাদে যাবেন? ছাদটা খুব সুন্দর।”
ছাদটা সত্যিই সুন্দর। প্রচুর গাছ, একটা দোলনা। পিছনদিকটায় নারকেলবাগান। প্রচুর হাওয়া দিচ্ছিল ছাদে। কাপে চুমুক দিয়ে প্রিয়াঙ্কা একটা নার্ভাস হাসি হাসল।
“সেদিন একটা প্রশ্ন করেছিলাম, উত্তরটা পাইনি।” প্রিয়াঙ্কা চমকে আমার দিকে তাকাল।
“বিধানের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে তোমার বাবা ঠিক কতটা ক্ষুব্ধ ছিলেন?”
“ক্ষুব্ধ ছিলেন। বাড়িতে গণ্ডগোল হতো।” মেয়েটা ভেবে উত্তর দিলো। “তোমার কি মনে হয় জামাল সর্দারের সাহায্য নিয়ে তোমার বাবা তোমার বোনকে মেরে ফেলতে পারেন? সর্ট অফ অনার কিলিং?”
প্রিয়াঙ্কার মুখে অনেকগুলো এক্সপ্রেশন খেলা করে গেল; বিস্ময়ের ভয়ের, আশঙ্কার। ঠোঁটটা কামড়ে ধরল, উত্তর দিলো না।
“বাড়িতে সব ঠিক আছে তো প্রিয়াঙ্কা?”
“হুঁ? হ্যাঁ…হ্যাঁ।” মেয়েটা ফ্যাঁকাসে হাসল।
“আর ইউ শিওর?”
কিছুক্ষণ ভেবে ও বলল, “আপনি খুব অন্যরকম। খুব সিমপ্যাথেটিক।” জোর করে একটা কান্না চাপার চেষ্টা করছিল প্রিয়াঙ্কা।
“আমি আমার ডিউটি করছি মাত্র।”
“আচ্ছা, মৌয়ের কি রেপ হয়েছিল?” প্রিয়াঙ্কা শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
“না, মানে… ঠিক রেপ নয়…”
“আপনি বলুন ম্যাডাম। আমি শুনতে চাই।” প্রিয়াঙ্কার ঠোঁটটা থরথর করে কাঁপছিল।
“না, ব্যথা লাগেনি ওর… শি ওয়াজ…” পুরোটা বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওরের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছি।
“আমার মাঝে মাঝে নিজেকেও মেরে ফেলতে ইচ্ছা করে জানেন দিদি? যদি সেদিন থাকতাম, এ ঘটনা কিছুতেই ঘটতে দিতাম না।” প্রিয়াঙ্কা নিঃশব্দে কাঁদছিল।
“তোমার এখানে একা একা চাকরি করতে আসায় তোমার বাবা রাগ করেননি?”
“করেছিলেন। জোর করে এসেছি। আমি তো বাচ্চা নই।” প্রিয়াঙ্কা চোখ তুলে সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কখনও কখনও সবকিছুর থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে খুব। কিন্তু কতদূরেই বা যাব?”
“ডাক্তার অরিন্দম বোস বলছিলেন তোমার বাবা নাকি বাড়িতে মারধোরও করতেন?”
প্রিয়াঙ্কার মুখের লাইনগুলো শক্ত হল। উত্তর দিলো না।
“তোমার মা, তোমার বোন, তুমি…”
“মৌ বাবার খুব ফেবারিট ছিল। পড়াশুনায় ভালো, শান্ত, ভীতু। বাবা ঠিক যেরকম পছন্দ করে। বিধানের সঙ্গে ওর প্রেমটাই ঠিক হজম করতে পারেনি।” খুব সূক্ষ্ম একটা ব্যাঙ্গের রেখা ঠোঁটের পাশ থেকে মিলিয়ে গেল।
“তোমার কারুর সঙ্গে সম্পর্ক? এনি বয়ফ্রেন্ড?”
“নাহ, আমি শাস্তির ভয় পাই।” প্রিয়াঙ্কা পূর্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল।
একটু হকচকিয়ে গেলাম। ও কি কোনো ইঙ্গিত দিতে চাইছে?
“তোমার মা বাবার সম্পর্কটা?”
“ঠিক নরমাল নয়। ব্যাস ও নিয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না।” প্রিয়াঙ্কা
হাত জোড় করে বলল।
“ওকে। জাস্ট একটা কথা। তোমাকে সেদিন একটা কথা বলা হয়নি, তোমাকে একদম তোমার ছোটমামার মতো দেখতে। ইউ আর ভেরি প্রিটি।”
আমার প্রশংসায় প্রিয়াঙ্কা কেন জানি না কাঠ কাঠ হয়ে গেল।
