চেনা মুখ-অচেনা ছদ্মবেশ
সামন্ত আজ আমাকে অবাক করেছেন। ভোর থেকেই বর্ধমান টু নবগ্রাম রুটের লাইলেন্সড এবং বিনা লাইসেন্সের সবকটা কালো রঙের রেক্সিন লাগানো টোটোচালকদের থানায় তুলে এনেছিলেন। তারপর ব্যোমকেশ বক্সীর সিনেমা ব্যোমকেশ গোত্র মনে পড়ায় বাকি সব ডার্ক কালারের রেক্সিন- লাগানো টোটোচালকদেরও বাদ দেননি। জিজ্ঞাসা করেছিলাম অমৃতের মৃত্যু গল্পটা কতদিন আগে পড়েছিলেন? তাতে মাথা চুলকে উত্তর দিলেন, ওই নামে গল্প আছে নাকি তা জানেন না, তবে সিনেমাটা দেখেছেন। অন্ধকারে যে কোনো ডার্ক রঙ কালোই দেখায়। উত্তরটা শুনে হাসব না কাঁদব বুঝে পেলাম না, তবে শরদিন্দুবাবু মারা গেছেন ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
এই পর্বের জেরাগুলো সাংঘাতিক রকমের দীর্ঘ আর রুটিন। প্রতিটা ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করে নাম ধাম, সাকিন ঠিকানা, ফোন নম্বর, অ্যালিবাই চেক করতে যে কতটা মানসিক পরিশ্রম লাগে তা পুলিশ অফিসার মাত্রই জানবেন। ইংরেজিতে একটা মেটাফোর পড়েছিলাম; সদ্য রঙ-করা দেওয়ালের সামনে বসে রঙ শুকাতে দেখতে যেমন লাগে এই বিশজনের দীর্ঘ তালিকা থেকে সেই একজনকে খুঁজে পাওয়া ঠিক একইরকম ধৈর্যের ব্যাপার। সামন্ত আজ আমাকে নিষ্কৃতি দিয়ে নিজেই অগস্ত্যকীর্তিতে নিয়োজিত হয়েছেন। বেলা চারটে বেজে গেছে, টোটোঅলারা অধৈর্য হয়ে থানার বাইরে ঘোরাঘুরি করছে, যে কজন ছাড়া পাচ্ছে তারা খিস্তি দিয়ে পুলিশের আঠাশ গুষ্ঠি উদ্ধার করে বেরোচ্ছে।
আমার মাথায় কাল রাতের ফোনকলটা ঘুরছিল। বিধান কেন ওরকম ফোনটা কেটে দিলো! নিজের কোন স্বার্থ প্রোটেক্ট করছে ও! প্রিয়াঙ্কা হালদারের সঙ্গে ও তো কোনোভাবে জড়িয়ে নেই। নাকি আছে! মাথাটা ঠান্ডা করার জন্য থানা থেকে বাইরে বেরিয়ে খোলা হাওয়ায় এলাম।
ট্রেনিংয়ের সময় পড়া রবার্ট হেয়ারের সেই বিখ্যাত ইন্টারভিউয়ের কথা মনে পড়ল, বিশ্বখ্যাত সাইকোপ্যাথি এক্সপার্ট সাইকোপ্যাথদের একটা বিশেষ টার্মে চিহ্নিত করেছেন ইন্ট্রা স্পেসিস প্রিডেটর, সাদা বাংলায় বললে এমন প্রাণী যারা স্বজন বা নিজগোষ্ঠীর প্রাণীদের রক্তমাংস শিকার করে খায়! এমন প্রাণী যারা বারবার, বিনা অনুশোচনায় মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এমন প্রাণী যারা ধরা পড়াকে ঘৃণা করে, আইন এবং আইনরক্ষককে প্যাঁচে ফেলে যারা দূর থেকে দাঁড়িয়ে মজা দেখে। এই স্যাডিস্টিক প্লেজার এদের খাদ্য, পাওয়ারপ্লের প্রতি প্রকাণ্ড অবদমিত খিদেই এদের ঠেলে দেয় একের পর এক ক্রাইমের প্রতি। কাজেই প্রিয়াঙ্কা হালদারের যদি এটা ফার্স্ট ক্রাইম হয়, এবং ওকে ধরা না যায় তবে এর পরেও অগুনতিবার ক্রাইম করে যাবে ও। মানসিকভাবে দেখতে গেলে জোসেফ স্ট্যালিন বা কাম্বোডিয়ার পল পট, এদের থেকে ও আলাদা নয়, তফাত শুধু সুযোগের আর স্বার্থের।
প্রিয়াঙ্কা হালদার। বয়েস বাইশ! সুন্দর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া পানি দেখে আমিও যে ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত হইনি, তা নয়! প্রিয়াঙ্কার সাইকোলজি বলছে একবার হলেও ও খুনের স্পটে আসবে, দর্শকাম থেকে ও কিছুতেই নিজেকে বিরত রাখতে পারবে না। অন্তত কাজটা প্ল্যানমত এগোচ্ছে সেই বিষয়ে ওকে শিওর হতেই হবে। টাকাটা ছিল কোনো একটা অজুহাত, আসল উদ্দেশ্য মৌপিয়াকে বার করে আনা। আর আনন্দর সামনে নিজের আর্ত ইমেজকে ধরে রাখার জন্য বিধানকে জড়িয়ে মিথ্যের অবতারণা! আমার অনুমান যদি সত্যি হয় তবে সেইরাতে টোটোর সওয়ারি আর কেউ নয়, প্রিয়াঙ্কা নিজেই।
“ম্যাডাম!” পিছন থেকে সামন্ত ডাকলেন। “পেয়ে গেছি। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা হালদার নয়, অন্য কেউ!”
“একটু মোটসোটা মেয়েটা ম্যাডাম, আপনি যার ছবি দেখালেন সে নয়, বর্ধমান স্টেশনের সামনে থেকে রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ টোটোতে উঠল, বলল নবগ্রাম থেকে একটা প্যাকেট নেবে, তারপর আবার বর্ধমান ফিরবে….”
টোটো ড্রাইভার বলল।
“সঙ্গে আর কেউ ছিল?”
ছেলেটা ভুরু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করে বলল, “না ম্যাডাম। আর কাউকে তো দেখিনি।”
সামন্ত হতাশ হয়ে জলের বোতল থেকে এক ঢোঁক জল খেলেন।
“বর্ধমান পৌঁছে কোনদিকে গেল?”
“খেয়াল করিনি ম্যাডাম। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি যাওয়ার তাড়া ছিল। তবে একটা ব্যাপার ম্যাডাম!”
“কী?”
“মেয়েটার কাছে কোনো ফোন ছিল না। কিন্তু ফেরার পথে আমার ফোনটা ইউজ করে মেয়েটা কাউকে একটা ফোন করেছিল।”
“সেই কলটা তোমার মোবাইলে আছে? নাকি ডিলিট করেছ?”
“না, না ডিলিট করিনি।”
“কল করুন সামন্তবাবু।” আমি মোবাইলটা ছিনিয়ে নিয়ে বললাম। মার্ডারের রাতের কল লগ দেখাচ্ছে রাত একটা পঁয়তাল্লিশে একটা কল হয়েছে।
“ফোনে কী কথা বলছিল?”
“টাকার জোগাড় হয়ে গেছে…চিন্তা করো না…এরকমই কিছু…”
“ফোন বাজছে ম্যাডাম।” সামন্ত পাশ থেকে বললেন।
আরও দু একবার রিং হতেই একটা বয়স্ক কণ্ঠ ফোনটা ধরল।
“কে বলছেন?”
“নবগ্রাম পুলিশ স্টেশন থেকে। এই নম্বরটা কার? কোথা থেকে বলছেন?”
লোকটা একটু ঘাবড়ে বলল, “মনোতোষ সরকার বলছি। কী ব্যাপার?”
“আপনার বাড়িতে রিসেন্টলি কোনো মিসহ্যাপ হয়েছিল?”
“আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। কেন বলুন তো?”
আমার মাথার মধ্যে সন্দেহের কাঁটাটা টিক টিক করে ঘুরে গেল, জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার মেয়ের নাম কি নবনীতা, যাদবপুরে এম.এস.সি পড়ে?”
ভদ্রলোক এবার সত্যিই ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। কেন কী হয়েছে?”
“এখন নবনীতা কোথায়?”
“ওর বন্ধু এসেছিল। বেরিয়েছে। কী হয়েছে?” ভদ্রলোক প্রায় চিৎকার করে বললেন।
“কোন বন্ধু?”
“প্রিয়াঙ্কা। নবগ্রামে থাকে। ফোন করেছিল একটা। নীতাও হুড়মুড় করে বেরোলো ওর সঙ্গে। বলল ফিরতে দেরী হলে চিন্তা না করতে।”
“কখন? কখন বেরিয়েছে?”
“অনেকক্ষণ। দেড়টা নাগাদ।”
মুখ দিয়ে একটা খিস্তি বেরিয়ে গেল। ফোনটা নামিয়ে সামন্তকে বললাম, “আপনার সেই কনস্টেবল কী করছে? যাকে নজরদারিতে থাকার কথা বলেছিলেন?”
“কনস্টেবল বিপুল দাম স্যার। দেখছি ফোন করে।”
“ছাড়ুন। ফোর্স রেডি করুন সামন্তবাবু। ডি.এস.পি. স্যারকে বলছি, আরও দুজন লোক লাগবে।”
“কী যে হচ্ছে স্যার বুঝতে পারছি না কিছু!”
“পরে বুঝাব, এখন শিগগিরি চলুন। দেরি হয়ে গেলে আরেকটা প্রাণও চলে যাবে। জানি না হয়ত…প্লিজ! তাড়াতাড়ি করুন।”
*****
দুজন কনস্টেবল, সামন্তবাবু আর আমাকে নিয়ে গাড়িটা যখন এন.এইচ নাইনে উঠল তখন ঘড়িতে বাজে ছটা। আজ সোমবার। অনেকক্ষণ থেকেই টেকনিক্যাল উইং থেকে সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন সামন্ত। নবনীতার আর প্রিয়াঙ্কার ফোনের লাস্ট লোকেশন ডানকুনি। আমাদের গাড়িটা ওদিকেই এগোচ্ছিল। দুটো ফোনই এখন সুইচড অফ। আইটি সেল বলছে সিমকার্ড খুলে রেখেছে সেট থেকে। ট্র্যাক করা যাচ্ছে না। সামন্ত ফোনটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “নবনীতা প্রিয়াঙ্কার পার্টনার ইন ক্রাইম নয় বলছেন? তাহলে পালালো কেন?”
“পালানোর কারণ একটাই সামন্তবাবু। প্রিয়াঙ্কাকে আমি যতটা চালাক ভাবতাম ও তার থেকেও বেশি ধূর্ত। বর্ধমান স্টেশনের সেই হকারের কথা চিন্তা করুন। যার কাছ থেকে ওরা দুজন ফল কিনেছিল। যে সাক্ষ্য দিয়েছে, সত্যিই রাত বারোটা বিশের লোকালে ওরা দুজন নেমেছিল। খটকাটা হল, যার মা অসুস্থ, তার বন্ধু তখনই কেন ফল কিনবে? আগে তো পড়িমরি করে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করবে। টোটো যদি নাও থাকে, অন্য কোনোভাবে।”
“অ্যালিবাই রাখার চেষ্টা?” সামন্ত বললেন।
“একদম। প্রিয়াঙ্কা জানত, আমরা বাড়ির প্রতিটা লোকের অ্যালিবাই চেক করব। রাতের ফাঁকা রাস্তায় বর্ধমান টু নবগ্রাম ফাঁকা টোটোতে ম্যাক্সিমাম পঞ্চাশ মিনিট লাগবে আসা-যাওয়া মিলিয়ে। ও নবনীতাকে বলল, ফোনদুটো আমার কাছেই রাখ। টাকা যখন পাওয়া যাবে না, তখন পুলিশ বাড়ির লোককেই আগে সন্দেহ করবে। লোকেশন ট্রেস করবে পরে। প্রিয়াঙ্কা নিজে কেন যাচ্ছে না সেটার কী যুক্তি দিয়েছিল আমি জানি না। সম্ভবতঃ বলেছিল চেনা কেউ দেখতে পেলে চিনতে পারবে। নবনীতা রাজি হয়ে টোটোয় চেপে নবগ্রামের দিকে রওনা হল। কিন্তু রাস্তায় টেনশন চাপতে না পেরে, ড্রাইভারের ফোন থেকে বাবাকে একটা ফোন করে বসল।”
“তাহলে বলছেন কেন পার্টনার নয়? টাকাটা যে সোজা পথে আসছে না সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি তো ছিল?” সামন্ত রাস্তার ঝাঁকুনি সামলাতে সামলাতে বললেন।
“প্রিয়াঙ্কার প্ল্যানটা পূর্বপরিকল্পিত হলেও ও একটা সুযোগ খুঁজছিল সামন্তবাবু। মৌপিয়াকে একান্তে পাওয়ার সুযোগ। কিছুতেই সেটা আসছিল না। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, নবনীতার মায়ের কেসটা জেনুইন। দুর্গাপুরের মিশন হাসপাতালে বিল হয়েছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। পুরো টাকাটা ওদের কাছে ছিল না। নবনীতার আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রিয়াঙ্কার জানতে বাকি ছিল না। নবনীতার তখন বিনি জলে মাছের মতন অবস্থা। হসপিটাল থেকে নিশ্চয়ই বলা হয়েছিল, আগে টাকা ডিপোজিট করুন, তারপর ট্রিটমেন্ট হবে। চারিদিকে তখন নবনীতা টাকার ব্যবস্থা করে বেড়াচ্ছে। প্রিয়াঙ্কা দেখল এটাই সুযোগ। বাড়িতে টাকা মজুত থাকে এসময়। বোনকে দুপুরে ফোনে বলল সমস্যাটা। মৌপিয়া রাজি হল। বাবার প্রতি তারও তখন বিরাট আক্রোশ। দিদিকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। আর একটা নোবেল কাজে টাকা দিতে অসুবিধা কী?”
“হুম।”
“এদিকে বন্ধুকে টাকাটা জোগাড় করে দেবে বলে প্রিয়াঙ্কা ওর সঙ্গ নিল। আনন্দকে একটা ফোন করল। আমি শিওর, প্রিয়াঙ্কার বাড়ির পরিস্থিতি, বাবার অত্যাচারী স্বভাব ইত্যাদি সম্পর্কে নবনীতা জানত। কাজেই, যখন প্রিয়াঙ্কা প্রস্তাব দিলো, বাবার অজান্তেই বোন টাকাটা তুলে এনে দেবে তখন ও আপত্তি করেনি। নবনীতা সরকারের যদি কোনো অপরাধ হয়ে থাকে তবে এটাই। এটা আমার গাট ফিলিং যদিও, মেয়েটাকে সামনাসামনি দেখে আমার এটাই মনে হয়েছে। আর এই অপরাধেই ও ফেঁসে গেল। খুনের ব্যাপারটা ও ঘূণাক্ষরেও জানত না বলেই আমার সন্দেহ।”
“মানে মৌপিয়ার খুন হওয়ার পর ও আসল ঘটনাটা বুঝতে পারল?” সামন্ত উত্তেজিত হয়ে বললেন।
“পুরোটা বুঝতে পারল কিনা বলতে পারি না। তবে প্রিয়াঙ্কা নিশ্চয়ই ওকে ভয় দেখিয়েছিল যে মুখ খুললে ফেঁসে যাবে। খুনের রাতে ভিকটিমের হাত থেকে টাকা নিয়েছে, নিশ্চয়ই পুলিশ ধরেই নেবে ও খুনের ব্যাপারে জড়িত।” আমি সামন্তর দিকে তাকিয়ে বললাম।
“মানে প্রিয়াঙ্কা হালদারের কুকীর্তির সাক্ষী একমাত্র নবনীতা? মানে চিড়িতনের টেক্কা, স্যার?”
“হ্যাঁ। আওয়ার মোস্ট প্রেশাস গেম। এই মুহূর্তে সবথেকে বেশি রিস্ক ওর প্রাণের। দুঃখের বিষয় হচ্ছে সেটা বোঝার মতো ক্ষমতা মেয়েটার নেই। ও এই মুহূর্তে প্রিয়াঙ্কাকে ওর রক্ষাকর্তা ভাবছে।” হতাশভাবে বললাম।
“কেলেঙ্কারি কাণ্ড স্যার!”
“নবনীতার সাক্ষ্য না হলে আনন্দর সাক্ষ্য কোর্টে টিকবে না। সেটা বুঝেছেন তো? গাড়িটা ট্রাফিক জ্যামে দাঁড়াতে জিজ্ঞাসা করলাম। ফোনে কথা বলা আর প্রেম করা ছাড়া কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই।”
“কিন্তু ম্যাডাম, এই প্রিয়াঙ্কার সাইকলজিটা বুঝতে আমার অসুবিধা হচ্ছে। নিজে না এসে বন্ধুকে পাঠাল!”
“খুব ক্যালকুলেটিভ স্টেপ সামন্তবাবু। খুনটা আনন্দ আদৌ সাকসেসফুলি করতে পারবে কিনা ওর সন্দেহ ছিল, যদি মৌপিয়া না মরে এবং আনন্দ ধরা পড়ে ওর নাম নেয়, তবে যাতে সেটা কিছুতেই ধোপে না টেকে, তাই সলিড অ্যালিবাই। বর্ধমান স্টেশনে ও সকলের চোখের সামনে থাকল, পাঠাল বন্ধুকে। টোটোর ব্যাপারটা বিধান দেখে না ফেললে, আমরা কিছুই জানতে পারতাম না।”
“সেটাই তো স্যার!” সামন্ত উরুতে একটা ঘুষি মেরে বললেন, “আমি তো বুঝতেই পারছি না শালা! নবনীতাকে সঠিক টাইমে বার করে নিয়ে কেটে পড়ল!”
“বার করে কেটে পড়াটা আমাদের অপদার্থতা। সারা শহরের টোটো ধরে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করলে খবর চাউর হতে কতক্ষণ লাগে? আপনার সেই কনস্টেবল কী বলল?”
“কে? ওই বিপুল! ও বোকাচোদাকে যদি না সাসপেন্ড করেছি স্যার তবে আমার বাবার নামে কুকুর পুষবেন। বলে কিনা একটা ফোন এসেছিল! খেয়াল করতে পারেনি কখন বেরিয়েছে।”
গাড়িটা ডানকুনি ঢুকতে আরও ঘন্টাখানেক। ঘড়িতে এখন সাড়ে সাতটা। ফোনটা বেজে উঠল। আইটি সেল। নবনীতার ফোনটা অন হয়েছিল। মিনিট তিনেকের জন্য। লোকেশন দুর্গাপুর! আবারও ট্র্যাক করা যাচ্ছে না।
ড্রাইভারকে গাড়িটা সাইডে দাঁড় করাতে বললাম। এভাবে হবে না। প্রিয়াঙ্কা হালদার নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে। বর্ধমান টু ডানকুনি এসে আবার গাড়িটা ঘুরিয়ে এন.এইচ.নাইন ধরে দুর্গাপুর। মন বলছে ও রাতের জন্য অপেক্ষা করবে। ততক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে সময় নষ্ট করবে। কিন্তু এন.এইচ.নাইন ধরে কতদূর! দুর্গাপুর, রানিগঞ্জ, আসানসোল, কুলটি তারপরেই তো ধানবাদ! ও কি অন্য রাজ্যে পালানোর স্কোপ নেবে? ঝাড়খণ্ড পুলিশকে অ্যালার্ট করার দরকার।
“কী করবেন স্যার?” সামন্ত জিপ থেকে নেমে জিজ্ঞাসা করলেন।
“বুঝতে পারছি না। আমাদের থেকে অন্তত তিনঘন্টা এগিয়ে আছে। মাথা নেড়ে বললাম। শেষটায় মাথা নিচু করে ফিরে যেতে হবে!”
“আপাততঃ নেক্সট লোকেশন ট্র্যাক না হওয়া অবধি ফলো করা ছাড়া উপায় কী! রাস্তার ধারের রেস্টুরেন্টগুলো খেয়াল করতে হবে সামন্তবাবু। এমনও হতে পারে কোনো হোটেলে কিছুক্ষণের জন্য উঠল।”
“খুন করে দেবে স্যার মেয়েটাকে? নিজের ধরা পড়ার ভয় নেই?”
“করবে…কিন্তু এমনভাবে করবে…”
“কীরকমভাবে স্যার?” সামন্ত জিজ্ঞাসা করলেন।
সামনের রাস্তাটার দিকে তাকালাম। রাতের গূঢ়তম আঁধারের সঙ্গে আবছা আলো এসে মিশেছে মাঝে মাঝে। ন্যাশানাল হাইওয়েটাকে ঠিক প্রিয়াঙ্কা হালদারের মতো লাগছে। সুন্দরী, সর্পিল এবং অশুভ!
***********
এখন বাজে ঠিক রাত এগারোটা। আকাশে একটাও তারা দেখা যায় না এমন গুমোট মেঘের আস্তরণ। দুর্গাপুর ছাড়িয়ে আসানসোলের পথে আমরা। পথে প্রতিটা ধাবায় ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, হোটেলগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা হয়েছে। শক্তিগড়ের কাছে একটা ল্যাংচার দোকান বলল, ছবির দুটো মেয়ে মিষ্টি খেয়েছে এবং টয়লেটে গেছে। তারপর ব্লু রঙের ওয়াগন-আরে চেপে বেরিয়ে গেছে। কোনদিকে গেছে খেয়াল নেই। পেট্রল পাম্পের সিসিটিভি ফুটেজ বলছে তেল নিতে ঢোকেনি। তার মানে এখনও ট্যাঙ্ক খালি হয়নি। এদিকে আমাদের প্রত্যেকের ফোনের ব্যাটারি প্রায় ডেড হয়ে গিয়েছিল। রাস্তার ধার থেকে দুটো পাওয়ার ব্যাংক কেনা হল।
দুপুরে কারুর কিছু খাওয়া হয়নি, সামন্ত অনেকক্ষণ ধরে উসখুশ করছিলেন। আমি কিছু বলছি না দেখে চুপ করে আছেন। তোমার খিদেতৃষ্ণা পাচ্ছে না মানে এই নয় যে কারুরই পাচ্ছে না, এমন একটা প্রবল স্যাডিস্টিক মনোগত ভাব নিয়ে আমাকে দেখছিলেন। কনস্টেবলগুলোও বিড়ি সিগারেট খেতে চাইছিল। অবশেষে গাড়িটাকে একটা ধাবাতে দাঁড় করানো হল।
পাঁচটা রুমালি রুটি, চিকেনের প্লেট নিয়ে সামন্ত চেয়ারটায় সবে বসেছেন, ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
ডি.এস.পি.র ফোন। লোকাল থানা অ্যালার্ট করেছে, ন্যাশানাল হাইওয়ে নাইনে পালসিটের কাছে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। দুজন মেয়ে ছিল। ন্যাশানাল হাইওয়ে অ্যাম্বুল্যান্স দুজনকেই উদ্ধার করে বর্ধমান সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছে। দুজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। গাড়ির রঙ নেভি ব্লু। মডেল ওয়াগন-আর।
ফোনটা রাখতেই সামন্ত খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে তাকালেন। লোকটার আমার ওপর যত রাগই থাক, এই মুহূর্তে লোকটাকে দেখে আমার কষ্টই হচ্ছিল।
দুজন কনস্টেবল সমেত সামন্তকে বর্ধমান হাসপাতালে যেতে বলে বললাম, আমাকে একটু দুর্ঘটনাস্থলে যেতে হবে। সামন্ত খুব অবাক হলেন।
দুজনের জেরাকালীন জবানবন্দী নেওয়ার আগেই আমি পৌঁছে যাব বলে আশ্বাস দিলাম।
***
বর্ধমান সদর হাসপাতাল বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। রাত কেটে ভোর হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। যদিও হাসপাতালে, পুলিশ স্টেশনের মতোই দিনরাত কিছু থাকে না, তবুও চায়ের দোকানের ধোঁয়া ওঠা উনুন, কেক খেতে খেতে চায়ে চুমুক দেওয়া রোগীর আত্মীয়পরিজন, বর্জ্যের গাড়ি বের করে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের দিকে ভাগ হয়ে যাওয়া ক্লিনিং স্টাফ, নাইট ডিউটি সেরে বাড়ি ফেরা স্টাফ, হাসপাতালের বাইরে এখনও ঝাপ ফেলা ওষুধের দোকান মনে করিয়ে দেয় যে সময়ের অনন্ত প্রবাহের মধ্য থেকে টুকরো টুকরো বিশ্রাম কুড়িয়ে নিয়েছে সদাব্যস্ত চিকিৎসাকেন্দ্র।
মহিলাদের জেনারেল ওয়ার্ডে বেড নাম্বার ষোল। পেশেন্ট ঘুমাচ্ছিল না। যদিও চোখ বন্ধ ছিল। একটু দূরে একজন লেডি কনস্টেবল টুলে বসেছিলেন। আমাকে দেখে ওঠে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন। পেশেন্টের গায়ে হাতে মুখে অজস্র চোট। বাঁ হাতে প্লাস্টার। মাথায় ব্যান্ডেজ জায়গায় জায়গায় রক্তে ভিজে। ভোরের নরম রোদ তার চোখে পড়েছিল, চোখ বেয়ে টিকালো নাকে, তারপর মুসুরডালের মতো রঙের ঠোঁটে, নরম চিবুকে….আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই সে চোখ মেলল। তাকিয়েই ফুঁপিয়ে উঠল।
“নবনীতা…ও…ও কেমন আছে? আমি সেই ভোর থেকে জিজ্ঞাসা করছি কেউ কোনো উত্তর দিচ্ছে না। দমবন্ধ লাগছিল, নীতাকে বললাম চল একটু বেরিয়ে আসি, কী থেকে কী হয়ে গেল!”
“তুমি কেমন আছ?” আমি প্রিয়াঙ্কার দিকে স্থির তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। “তোমার বাড়ির লোককে খবর দেওয়া হয়েছে?”
“হ্যাঁ। ফোন করেছিলাম।”
“কাল তোমাদের ফোনদুটো সুইচড অফ ছিল?”
প্রিয়াঙ্কা ফিকে হাসল। “হ্যাঁ, আসলে সব এত তাড়াতাড়ি ঠিক হল, যে চার্জ দেওয়ার কথা খেয়াল ছিল না। মাঝ রাস্তাতেই অফ হয়ে গেল।”
“তারপর তোমরা ন্যাশানাল হাইওয়ে ধরে বারবার টহল দিলে?”
পাশের টেবিলটায় রাখা জলের গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়ে প্রিয়াঙ্কা বলল, “টহল! কই না তো! প্রথমে ঠিক হয়েছিল সাঁতরাগাছির দিকটায় ঘুরে আসব, তারপর নীতা বলল চল দুর্গাপুর যাই। সিটি সেন্টারে একটা সিনেমা দেখব, মুড় ভালো হয়ে যাবে। গাড়ি ঘুরিয়ে দুর্গাপুরের দিকে আসার সময়ই গাড়িটা গণ্ডগোল করছিল, দু বার থেমেও গিয়েছিল…তখন…তখন আমরা ঠিক করলাম সেরকম হলে রাতটা দুর্গাপুরেই কোথাও কাটাব। চার্জ দিয়ে বাড়িতে ফোন করব।”
“হুম। গাড়ি চালাতে কবে শিখলে?”
পানির গ্লাসটা ওর হাতে দিয়ে বললাম।
“ওই শখে। কলকাতা থাকতেই।” জল খেতে খেতে প্রিয়াঙ্কা কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল।
“গাড়িটা তো রেন্টের। এতক্ষণ বাইরে, বাড়িতে কেউ চিন্তা করবে মনে হল না?”
ঠোঁটটা বেঁকিয়ে প্রিয়াঙ্কা হাসল। “আমার বাড়িতে? আমার বাড়িতে কেউ চিন্তা করার নেই ম্যাডাম। আর নীতা বাড়িতে ফোন করেছিল একবার। আবার ফোনটা বন্ধ হয়ে যায়।”
“তোমার জন্য চিন্তা করার একজন তো ছিল। নেই কেন বলছ?”
“কার? কার কথা বলছেন?” খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল প্রিয়াঙ্কা।
“কেন? আনন্দ? আনন্দ রক্ষিত?”
“আনন্দ? ও সেই মার ফিজিও? কী যা তা বলছেন আপনি! আপনার কোনো ভুল হচ্ছে। ও কেন চিন্তা করবে আমার জন্য? ইনফ্যাক্ট গত দেড় বছর ধরে ও আমাকে এত বিরক্ত করেছে যে আমি…আমি….”
“যে তুমি ঠিক করেছিলে যে ওর নামে কমপ্লেইন করবে?”
“একদম। কিন্তু ও যে আমার বোনকেও নোংরা দৃষ্টিতে দেখত…ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। প্রিয়াঙ্কার দুচোখ বেয়ে জল নেমে এল। ওকে ছাড়বেন না ম্যাডাম। আমার বোনটাকে যেরকম কষ্ট দিয়ে ও মেরেছে, ঠিক তেমনই যেন ও পায়। ফাঁসি হয় যেন ওর।” প্রিয়াঙ্কা আমার দিকে তাকিয়ে বলল।
“নিশ্চয়ই। আচ্ছা, কালকের অ্যাক্সিডেন্টটা কীভাবে হল?” আমি পকেট নোটবুকটা বার করে বললাম।
“গাড়িটা একটা গর্তে পড়ে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। আমি স্পিড কনট্রোল করতে পারিনি…নীতা সিট বেল্ট পরত না, কতবার বারণ করেছি, কথা শোনেনি। আপনি…আপনারা কিন্তু বলছেন না ও কেমন আছে? ওর কিছু হলে আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না।” প্রিয়াঙ্কা ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলল।
“গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা মারার সময় কী হল? নবনীতা সরকার তো তোমার পাশে বসেছিল?”
“হ্যাঁ। গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একবার বেঁকে গিয়ে আবার সোজা হয়ে এগিয়ে গেল রাস্তার ধারের দিকে…আমি দেখলাম ধারে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে, টেললাইটটা চোখে পড়েছিল। কিন্তু সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হল যে ব্রেক কষার টাইম পেলাম না। গাড়িটা ধাক্কা মারার সময় দেখলাম, নবনীতার শরীরটা উড়ে এসে কাচে গিয়ে মারল।
তারপর কী হল, আমার মনে নেই।”
“কত স্পিডে ছিলে?”
“৬০/৭০ হবে।”
“হুঁ। তোমার অনার্সের কী সাবজেক্ট ছিল প্রিয়াঙ্কা?”
“নিউট্রিশন।” মেয়েটা অবাক হয়ে বলল। “কেন?”
“ফিজিক্স হলে ভালো হতো।” পেন আর নোটবুক বন্ধ করতে করতে বললাম।
“কেন বলুন তো?”
“ওই নিউটন ভদ্রলোক একটা মুশকিল করে গেছেন। আজ থেকে প্রায় আড়াইশ বছর আগে জাড্যের সূত্র আবিষ্কার করে গেছেন।”
“কী বলছেন কিছু বুঝতে পারছি না!”
“আমি বোঝাচ্ছি। ধরো কাচের একটা জানালার ওপর ছিটকে রক্ত এসে লাগল, কিছুক্ষণ পর রক্তের ধারা কাচ বরাবর সোজা নামবে। একদম সোজা কিন্তু, মাইন্ড ইট। কিন্তু সেই মুহূর্তে কাচটা যদি গতিশীল অবস্থায় থাকে, তবে রক্তের ধারাগুলোর কী হবে? তারা কি একইরকমভাবে সোজা নামবে?”
“কিচ্ছু বুঝলাম না। কী বলতে চাইছেন? নিউটন কোথা থেকে এল?”
“কেন? খুব সহজ বোঝাটা। গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষলে, আমরা যেমন সামনের দিকে এগিয়ে যাই, রক্তের ধারাগুলো কিন্তু সোজা নামতে নামতে বেঁকে যাবে।”
“মানে!”
“মানে তোমার গাড়িটা যখন রাস্তার ধারের গাড়িটায় গিয়ে ধাক্কা মারে ততক্ষণ অলরেডি কাচ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছিল। নবনীতা সরকারের রক্ত। গাড়িটা যখন সামনের গাড়িটাকে ধাক্কা মারে তখন রক্তের ধারা সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। কাচে এল প্যাটার্নের স্পটগুলো যে রয়ে গেছে!”
“কীসব ভুলভাল!”
“তোমার গাড়িটা যখন সামনের গাড়িতে ধাক্কা মারে তখন অলরেডি নবনীতা সরকারের মাথা থেকে প্রচুর রক্ত বেরিয়ে কাচে লেগেছে। অ্যাক্সিডেন্টের পর রক্তক্ষরণ হলে কাচের গায়ে ব্লাডলাইনগুলো স্ট্রেট হতো প্রিয়াঙ্কা। অ্যাক্সিডেন্ট একটা আই-ওয়াশ! তুমি তোমার বন্ধুর মাথায় আগে থেকেই হিট করেছিলে। একটা খুনকে অ্যাক্সিডেন্টে রূপ দেওয়ার জন্য তারপর রাস্তার ধারের গাড়িতে গিয়ে ধাক্কা মেরেছ।”
“ভাগ্যিস, কোর্টে সবাই ফিজিক্স পড়েনি।” প্রিয়াঙ্কা মুখটা বেঁকিয়ে হাসল। ওর চোখদুটো আমার দিকে সোজা তাকিয়েছিল।
“গাড়ির ভেতরে যে পরিমাণ রক্ত ছিটিয়েছে সেই পরিমাণ রক্ত থাকতে হলে যে প্রচুর কাচ ভাঙতে হবে প্রিয়াঙ্কা। অত কাচ যে ভাঙেনি। ষাটের স্পিডে তুমি কখনই ছিলে না, ম্যাক্সিমাম হলে চল্লিশ! তোমার গাড়ির ধাক্কায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটা পিছিয়ে অন্ততঃ তিনশ মিটার যাওয়ার কথা, কিন্তু টায়ারের দাগ যে বলছে ম্যাক্সিমাম হলে দেড়শ মিটার গেছে গাড়ি!”
“ফালতু কথা!” প্রিয়াঙ্কার পেশীগুলো শক্ত হচ্ছিল। “বাজে কথা বলছেন আপনি।”
“গাড়িতে ধাক্কা মারার আগে তুমি নবনীতা সরকারকে মাথায় মেরেছো। কী দিয়ে মেরেছ? স্প্যানার না জ্যাক? মনে হয় জ্যাক! কাজটা সারলে কোথায়? হাইওয়ে থেকে ভেতরে ঢুকে কোনো অন্ধকার রাস্তায়?”
“শালি। মাগি!” প্রিয়াঙ্কা হিসহিস করে উঠল। “তুই শালি কিচ্ছু করতে পারবি না। বাঁতেলাবাজি ছাড়া।”
“ধাক্কা মারার আগে, ড্রাইভিং সিটের তলার লিভার অ্যাডজাস্ট করে তুমি সিটটাকে যথাসম্ভব পিছিয়ে নিয়েছিলে। তার ঠিক আগেই তুমি নবনীতাকে মেরেছ। তোমার হাতে ওর রক্ত লেগে। সেই রক্তমাখা হাত দিয়ে লিভার ধরেছ। অনেক প্রমাণ রয়ে গেছে প্রিয়াঙ্কা। অ্যাক্সিডেন্টের পরে রক্ত ওখানে কিছুতেই পৌঁছাতে পারে না যে!”
“চুপ কর মাগি!” প্রিয়াঙ্কা এবার সব ভুলে চেঁচিয়ে উঠল। “কিচ্ছু করতে পারবি না তুই আমার। একটা প্রমাণও তোর ধোপে টিকবে না শালি! তোর ফিজিক্সের গাঁড় মারা যাবে রেন্ডি।”
“আহ আস্তে! পেশেন্ট সব ঘুমাচ্ছে এখনও।” আমি শান্তভাবে বললাম। “ফিজিক্স লাগবে না, বায়োলজি যথেষ্ট।”
প্রিয়াঙ্কা ফুঁসতে ফুঁসতে আমার দিকে তাকাল। কিছু বুঝতে পারল না। “তোমার হাজার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নবনীতা সরকার বেঁচে আছে প্রিয়াঙ্কা। শি ইজ স্টেবল অ্যান্ড সারভাইভিং।”
প্রবল জোরে একটা শব্দ হল। প্রিয়াঙ্কা হালদার একটানে স্যালাইন স্ট্যান্ডটাকে হাতে তুলে নিয়েছে। অসম্ভব জেদে ওর চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। মনে হল স্ট্যান্ডটাকে এবার আমার দিকে ছুঁড়ে মারবে। পিছন থেকে শব্দ আসছিল, নার্স দৌড়ে আসছে, লেডি কনস্টেবল ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে এলেন। আমি সবকিছু অনুভব করতে পারছিলাম। জানতাম, ও আমাকে আঘাত করতে পারবে না। ওর চোখে চোখ রেখে আমার অদম্য আনন্দ হচ্ছিল। ন্যায় আর অন্যায়ের খেলায়, ন্যায়ের এই পাওয়ারপ্লেটাকে আমি অসম্ভব এনজয় করছিলাম। দুদিক থেকে লোকে ওকে চেপে ধরল। প্রিয়াঙ্কা হালদার একটা দীর্ঘ চিৎকার করে বলল, “শালিইইই…খানকিইইইইই…..শালিইইইইই।”
