বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

“যতটা নিজের বলে ভাবি, মেঘ ঠিক ততখানি প্রিয়ভাষ নয় কোনোদিনই”

ডি.এস.পি.র ভার্চুয়াল পিঠচাপড়ানিতে মনটা খুশি হয়ে গিয়েছিল। আজ বহুদিন পর ছুটি। জুনের প্রথম, আকাশ মেঘলা। মাঝে মাঝেই রাতভোর বৃষ্টি হচ্ছে। কাদাগোলা আকাশে দু’একটা সাদা বক উড়ে গেল। কাল গভীর ঘুম হয়েছে….অনেক অনেকদিন পর! কোনো দুঃস্বপ্ন দেখিনি কাল রাতে। প্রতিটা সফল কেসের পর জীবন একটা এরকম নিশ্ছিদ্র রাত উপহার দেয়।

সামন্ত দুবার ফোন করেছিলেন। বাথরুমে ছিলাম। তারপর যে কলব্যাক করব ভুলে গেছি। এখন ফোন করতে আর তুললেন না। যাকগে! হয়ত সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। সাফল্য সত্ত্বেও কাঁটার মতো খচখচ করছিল আনন্দ আর প্রিয়াঙ্কার নামে দেওয়া চার্জশিটটা। সামন্ত খুব খুশি হয়েছিলেন। এত বড় একটা সাকসেস! কিন্তু অপরাধীদের নামের আড়ালে যে ঘৃণ্য চেহারাগুলো ঢাকা পড়ে গেল, পৃথিবীর কোন আইনেরই কি তাদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আছে? মণিরঞ্জন হালদারের করা পাপের কি কোনো এভিডেন্স আছে? আমার মৃত মায়ের বিরুদ্ধে যারা চক্রান্ত করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ সাজাতে পারে আইন?

হঠাৎ ফোনটা আবার বেজে উঠল। ভবানীভবনের ফোন! এ.ডি.জি সরাসরি ফোন করেছেন। গলাটা খুব রাফ শোনাচ্ছিল। “ডু ইউ হ্যাভ এ পার্সোনাল রিলেশন উইথ এ পুলিশ সোর্স নেমড গণেশ হুই?” ঘাবড়ে গিয়ে বললাম “হ্যাঁ স্যার, কেন?”

“আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন ‘কেন!” এডিজি ধমকালেন। “ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া উইথ হুম ইউ ওয়ের মিঙ্গলিং সোশ্যালি? আই অ্যাম স্যরি ইন্সপেক্টর, তোমাকে ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি ফেস করতে হবে। রিপোর্ট ইমিডিয়েটলি টু দি হেড কোয়ার্টার। আদারওয়াইজ তোমাকে অ্যারেস্ট করতে আমি টিম পাঠাব।” ফোনটা কেটে গেল।

মানেটা কী! গণেশদাকে ফোন করলাম। সুইচড অফ! মনে পড়ল সুমন্তকে কাল ফোনে পাইনি। এই অদ্ভুত ফোন কলটার মানে কী! বুকের ভেতর ধকধক করছিল।

গেটের কাছে একটা বাইক থামার শব্দ হল। দরজা ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে সামন্ত ঢুকলেন।

“আপনাকে অনেকবার ফোন করেছি, পাইনি। সর্বনাশ হয়ে গেছে ওদিকে। ওই বিধান ছেলেটা! কী সাংঘাতিক ব্যাপার!” সামন্ত হাঁপাচ্ছিলেন।

“কী হয়েছে!”

“রেইড হয়েছে স্যার কোয়ার্টারে। এ.টি.এস থেকে লোক এসেছে। রাতের আঁধারে ওরা নাকি তেলের জ্যারিকেনে করে আর্মস পাচার করত স্যার! আমার চাকরিটা মনে হয় গেল স্যার।”

“কারা আর্মস পাচার করত!”

“ওই বিধান স্যার! আপনাকে কিন্তু আমি বারবার সতর্ক করেছিলাম! আপনি শোনেননি।”

“বলছেন কী?” আমার গলা দিয়ে কতগুলো রুদ্ধ শব্দর মতো কথা বেরিয়ে এল। মাথাটা ঘুরছিল! বিধানের খাটের নিচে সারি সারি তেলের জার ছিল!

“বুঝেছেন স্যার! বিধানের জ্যাঠা নাকি এসবের পিছনে। এ.টি.এস অ্যারেস্ট করেছে মালটাকে। বিধানের বাবাকেও নাকি ওর জ্যাঠাই দুবছর আগে….আমি পুরো কেঁপে গেছি স্যার…নব হুঁই নাকি আর্মস স্মাগলিং ফাঁস করে দেবে বলেছিল।”

“বিধান…বিধান কোথায়?” কোনোমতে জিজ্ঞাসা করলাম। সে রাতে ও কার সঙ্গে দেখা করতে রাস্তায় এসেছিল, একটু একটু পরিষ্কার হচ্ছিল। আর্মস স্মাগলিংয়ের জন্য এই ছোট্ট নিরুপদ্রব শহরটাকে বেছে নিয়েছিল ওরা! আর সব কিছুর পিছনে গণেশদা! তাই বিধানকে ছাড়াতে এত অস্থির হয়েছিল, ভাইয়ের ছেলে বলে নয়, ব্যবসার অসুবিধা হবে বলে! হে ভগবান!

“খুব খারাপ খবর স্যার! বিধানকে কাল রাতে কারা যেন গলার নলি কেটে খুন করে রেখে গেছে। রেডের সময় দরজা ভেঙে ওর বডিটা পেয়েছে পুলিশ। স্যার…স্যার ঠিক আছেন তো আপনি….”

গ্রিলের গেটটা চেপে ধরে সিঁড়িটায় বসে পড়লাম। প্রচণ্ড শকের মধ্যেও মনে হল বিধান কি শেষ পর্যন্ত ওর বাবার খুনির আসল পরিচয় জেনে যেতে পেরেছে? কে সরাল ওকে? গণেশদার লোকেরা? কেন সরাল? আর সুমন্ত…সে কোথায়! মোবাইলটা বিচ্ছিরি শব্দে ভাইব্রেট করে উঠল। একটা মেসেজ ঢুকেছে ফোনে।

পরিচিত বাক্যগঠনের লেখাগুলো আমার ঝাপসা চোখের সামনে ফুটে উঠল।

“কাজটা খুব খারাপ হল। কিন্তু কিছু করার ছিল না, বিধান হাইড আউটগুলো জানত দাশু। মেয়েটাকে নিয়ে ভেঙে পড়েছিল খুব। এত দুর্বল ছেলেকে দলে রাখা সেফ হতো না। আমার জন্য ব্যাপারটা বিপজ্জনক হয়ে পড়ছিল। অনেকদিন থেকেই বলছিলাম, গুরু দোনামনা করছিল। আগে এই স্টেপটা নিলে জল এতদূর গড়াত না। এত বড় একটা দল, এতগুলো লোক, এরা এখন আমার মুখ তাকিয়েই বসে আছে। গুরুর তো জীবন শেষ, বাকি লাইফটা মস্তিতে জেলখানায় রাজার আদর খাবে। গুরু নিজেও এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে অনেক, সঙ্গে নিয়ে পালানো রিস্কি। আমিই তাই টুক করে গুরুর গোপন ঠিকানাটা পুলিশের কানে পৌঁছে দিয়েছি। যে সময়টা পুলিশ গুরুর ওপর কনসেনট্রেট করেছে, সেসময়টায় আমি সব গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পেরেছি। আশা করি আমার বাধ্যবাধকতাটা বুঝতে পারছিস। তুই তো বুঝদার মানুষ। এসব চাকরি তোর জন্য নয়। পুলিশ ফোর্স চিরকালই একটা বালের সিস্টেম, বাঘের ঘরে ঘোঁঘের বাসা চিনতে পারে না। আর চিনলেও, উঁচুতলার লোকগুলো ওদের হাত-পা এমনভাবে বেঁধে রাখে যে করার কিছু থাকে না। তোকে বারণ করেছিলাম, শুনলি না! এখন ঠেকে শিখবি হয়ত।

যাই হোক, এই সিমটা আর সঙ্গে মোবাইলটা এক্ষুণি গঙ্গার জলে ফেলে দেব। তোর চেনা নম্বরটা তো আগেই ভাসিয়ে দিয়েছি। তার আগে হিন্দি সিনেমার একটা ডায়লগ খুব দিতে ইচ্ছা করছে, যব হাম দোস্তি নিভাতে হ্যায়, তো অফসানে লিখে যাতে হ্যায়, অর্ডর যব দুশমনি করতে হ্যায়, তো তারিখ বন যাতি হ্যায়। আজকের তারিখটা হল সংক্রান্তি, বুঝলি কিনা! তোর আমার বন্ধুত্বের শেষ, শত্রুতার শুরু। তোকে কোনোদিন কোনো গিফট দিই না, আজ শেষবেলায় একটা গিফট দিয়ে যেতে চাই।

২০০৫ এর সেপ্টেম্বর মাসের কেসটা তুই নিজে কোনোদিন আমায় না বললেও আমি জানি। ঠিক ধরেছিস, গুরু বলেছে। তোর বাপের সাথে গণেশদার খাতির ছিল খুব। তোর মা গুরুকে আপন ভাই মানত। কিন্তু সাপের কোনো ভাই, বোন হয় না, বুঝেই গেছিস এতদিনে। গুরুর তখন কাঁচা বয়স, রক্ত গরম, কাঁচা বুদ্ধি। সবে বেলাইনে নাম করা শুরু করেছে। ভুল করে তোর মাকে একদিন একটু হিন্ট দিয়ে ফেলেছিল। সে মহিলা তোর মতোই ছিল, খুঁতখুঁতে, সন্দেহবাতিক, বলল তোর বাবাকে জানিয়ে দেবে। জানলে কেস খেয়ে যেত গুরু, ওকেই উড়িয়ে দিলো। কীভাবে কী ম্যানেজ করেছিল সব ডিটেল গুরু জানে। তোদের খোঁয়াড়ে আছে তো মালটা…উগড়িয়ে নে। কেমন গিফট দিলাম বল দিকি?

তোর নিশ্চয়ই এনকোয়ারি বসবে। চাপ নিস না। তুই ফাঁসবি না। সব প্রমাণ সযত্নে সরিয়ে দিয়েছি। কবীর সুমনের গানটা মনে রাখিস, তোমার আমার দেখা হবে অন্য গানের ভোরে…চলি। ভালো থাকিস দাশু।”

চেতনা হারাতে হারাতে আমি জানি না কেন, কোথা থেকে শিউলি ফুলের গন্ধ পেলাম!

** সমাপ্ত **

.

‘বৃশ্চিকচক্র’ – পিয়া সরকার

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার পাহাড়ি এলাকা বাঘমুণ্ডি। আপাতভাবে শান্ত এই অঞ্চলের অতীত কিন্তু রক্তাক্ত। দুহাজার দুই থেকে দশ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়জুড়ে, বাঘমুণ্ডির মানুষ এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের সাক্ষী ছিলেন। ভারতের মাটিতে যে বিপ্লবী সংগঠনের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ এবং বিতর্কিত, সেই মাওবাদী বিপ্লবের কেন্দ্রভূমিতে ছিল বাঘমুণ্ডি। দর্শনা বোসের পরবর্তী পোস্টিংয়ের অব্যবহিত পরেই, যেখানে খুন হয়ে যায় মাওবাদী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা নিশীথ মাহাতো। একইসঙ্গে বাণিজ্যিক নগরী মুম্বাইয়ের একটি জেলে ঘটে যায় একটি নৃশংস খুন। এই দুই খুনের সূত্র তল্লাশে নেমে দর্শনা সম্মুখীন হন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কিছু কেলেঙ্কারির। আসল ঘটনা কী? এই খুন দুটি কি জড়িত? কারা এই খুনের অন্তরালে? তাদের আস্তিনে লুকোনো অস্ত্রের সংহার কি আদৌ সমাপ্ত হয়েছে, নাকি বধ হতে চলেছে আরও একজন? বৃশ্চিক উপন্যাসের শেষবিন্দু ধরে এগিয়ে পাঠক প্রবেশ করুন বৃশ্চিকচক্রে। আরও গভীরতর এবং জটিলতর রহস্যের জগতে আপনাকে স্বাগত।