Course Content
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
0/22
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

ক্ষুব্ধ শহীদ ক্লান্ত শহীদ

‘ষাট দশকের লেখা গল্পগুলো’।

জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র বই বিড়াল-এর সূচিপত্রের আগেই শহীদুর রহমান তাঁর লেখার রচনাকাল জানিয়ে দেন। শিরোনামহীন ভূমিকা পড়তে পড়তে শুনতে পাই, বত্তিচেল্লি ধরনের লম্বাটে মুখে শহীদ বিড়বিড় করে যেন কৈফিয়ত দিচ্ছেন, ঘরের কোনে পড়েই ছিল, উই, ইঁদুর তেলাপোকার খোরাক হচ্ছিল, তা আমার বৌ আবার এসব নিয়ে আস্ত একটা বই করে ফেলল।

নিজেই বই বার করতে লেখকের এত দ্বিধা। ষাট দশকের লেখকদের প্রথম সংগঠন স্বাক্ষর কবিতাপত্রে শহীদুর রহমান নামে একজন লেখকের বিড়াল নামে একটি বই প্রকাশের ঘোষণা বেরয় ১৯৬৩ সালে, সেই বই প্রকাশিত হল ১৯৮৮-তে। মাঝখানে কেটে গেছে একটি শতাব্দীর সিকিভাগ কাল। শহীদুর রহমানের সঙ্গে যারা ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত নয়, সাল দুটো জানলে তারাও বুঝতে পারে নিজেকে গুটিয়ে রাখার জন্য রীতিমতো সক্রিয় না-হলে সময়ের ব্যবধানটা এত দীর্ঘ হতে পারে না। নিজেকে আড়ালে রাখার প্রবণতা তাঁর এতটাই প্রবল যে মাঝে মাঝে মনে হয়, তা হলে লেখার দরকারটা ছিল কেন? বইটি তিনি উৎসর্গ করে গেছেন ‘যন্ত্রণাকাতরদের উদ্দেশে’। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়লে নিজের কষ্ট জানাবার দম পাওয়াই কঠিন, কিন্তু শহীদুর রহমানের প্রকাশের ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত ক্ষয় হয়নি; লেখার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শহীদ নিজের অনেক ভেতরে কুরে কুরে দেখতে দেখতে এক-একটি প্রতিবেদন পেশ করে গেছেন। এইসব প্রতিবেদনে অনুকূল কথা নেই, সব ব্যাপারেই তিনি অসন্তুষ্ট, মানুষের ভেতরটা যতই হাতড়ে দেখেন, তিনি ততই ক্ষুব্ধ হন। ক্ষোভ তাঁর কমে না, বরং দিনদিন আরও তীব্র হয়েছে। কিন্তু প্রকাশের স্বর উচ্চকণ্ঠ নয়, শেষ পর্যন্ত তা চড়া হয়নি। তাঁর ক্ষোভ ক্রোধের চেহারা পায় না।

শহীদ যখন লিখতে শুরু করেন সময়টা তাঁর যৌবনের প্রথম ও প্রবল কাল। যৌবনের তীব্ৰ ধাক্কায় মানুষ যখন নিজেকে ডিঙোতে চায়, শরীর ও মনে উপচে ওঠে যৌবনের বেগ, সেটা হল তাঁর ঐ সময়।

আমরা একসঙ্গে কলেজে ভরতি হই, আর আমাদের মধ্যে তখন তৈরি হয়েছে চারিদিকের যাবতীয় বস্তুকে বাঁকা চোখে দেখার প্রবণতা। একটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এগিয়ে এই প্রবণতা থেকেই মানুষ সবকিছুকে খতিয়ে দেখতে চায়, এর পরিণতি ঘটে যৌবনের বিস্ফোরণে। কিন্তু শুরু করতে-না-করতেই আমাদের ওপর চেপে বসল আইয়ুব খান। মিলিটারি এসে গোটা দেশের মুখে লাগাম পরিয়ে অ্যায়সা টাইট করে টেনে ধরল যে, দেশবাসী দেখল কী সামাজিক, কী রাষ্ট্রীয় কোনো ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই। মিলিটারির কাছে রাজনীতি নিছক উপদ্রব। রাজনীতিবিদদের ‘ডিসগ্রান্টলড পলিটিশিয়ানস’ বলে খিস্তি করে শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, বরং রাজনীতিকে, প্রতিবাদকে ও সামাজিক গতিশীলতাকে নিরর্থক উত্তেজনা বলে প্রমাণ করার জন্য আইয়ুব খানের ঘেউঘেউ মানুষকে কিছুদিনের জন্য হলেও ভোঁতা করে রেখেছিল। রাজনীতিবিদদের কামড়াকামড়ির দায় যে রাজনীতির নয়, বরং বুর্জোয়া কাঠামোর নড়বড়ে গড়নই রাষ্ট্রের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছিল এবং রাজনীতি ও আন্দোলন দিয়েই এর প্রতিকার সম্ভব—এটা ব্যাপকভাবে অনুভূত হতে কয়েকটা দিন সময় নেয়। সাম্রাজ্যবাদের ফিট করা -মাইক্রোফোনটা অফ করে দিলেই মিলিটারির ঘেউঘেউকে নেড়িকুত্তার কুঁইকুঁই বলে শনাক্ত করা যায়-এটা বুঝতে যে-সময়টা কাটে তা ছিল সদ্য কৈশোর পেরনো ও নতুন যৌবনে জ্বলে ওঠা ছেলেমেয়েদের জন্য চরম দুঃসময়। প্রতিরোধের স্পৃহাকে প্রকাশ করা নিষেধ, ঘেউঘেউয়ের হর্ষধ্বনির ভেতরকার কুঁইকুঁই শুনতে পেলেও তা জানাবার উপায় নেই। মানুষের সঙ্গে কথা বলো, আপত্তি নেই। কিন্তু যোগাযোগ করতে পারবে না। নবাবপুরের রেস্টুরেন্টগুলোতে লেখা ‘রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ’। তার মানে অন্য আলাপও করতে হবে ওদের মর্জিমাফিক। তখন নতুন তরুণদের অবস্থা কী? আগুন ভেতরে থাকায় নিজে নিজেই পোড়ে, ছাইয়ের তলায় তা চাপা পড়ে, না-পারে দাউদাউ করে জ্বলে উঠতে, না পারে তা আলো হয়ে চারপাশকে ফুটিয়ে তুলতে। তখন ঐ তরুণদের নিজেদের গ্লানি ও অপমানকে, ছাইচাপা আগুনকে ছুঁয়ে দেখার মাধ্যম হিসাবে প্রকাশিত হয় স্বাক্ষর। এসব তরুণ নিজেদের নাড়ির স্পন্দন গুণে দেখার উদ্যোগ নিয়েছিল কবিতার গ্রাফে। উদ্যোগটি যতটা না ছন্দ মেলাবার তাগাদায় তার চেয়ে অনেক বেশি রাষ্ট্রব্যবস্থার লোমশ হাত জোর করে পেছনে টানার, মানুষের পায়ের পাতা পেছনদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার কসরতের শিকার তরুণদের অস্বস্তি জানাবার এবং নিজে জানবার তাগিদে। তাদের প্রধান লক্ষ্য তখনও পাঠক নয়, বরং নিজেরা নিজেদের ভালো করে বোঝাই তখন তাদের বড় প্রয়োজন। স্বাক্ষর-এর প্রথম সংখ্যায় অশোক সৈয়দ, রফিক আজাদ, আসাদুল ইসলাম চৌধুরী, প্রশান্ত ঘোষাল এবং শহীদুর রহমানের প্রায় স্বগতোক্তিতে নিজেদের অন্তর্লোকের পানে দৃষ্টিনিক্ষেপ ছিল সৎ ও তীক্ষ্ণ তাই তা প্রলাপ না-হয়ে ফুটে উঠেছিল কবিতা হয়ে। অশোক সৈয়দ কিছুদিনের মধ্যে নামের বৈচিত্র্য মোহ ত্যাগ করে আবদুল মান্নান সৈয়দ হয়ে ওঠেন, সাহিত্যের সবগুলো মাধ্যমে আঙ্গিকের নানারকম পরীক্ষা করতে করতে ভাষার পরতে পরতে তাঁর অনুসন্ধান ব্যাপক হতে থাকে। আসাদুল ইসলাম চৌধুরী নাম থেকে মেদ ঝেড়ে স্রেফ আসাদ চৌধুরী হয়ে রাজ্যের যাবতীয় জিনিসকে কবিতার বিষয় করে দুই চোখ ভরে দুনিয়া দেখার কর্মে নিয়োজিত হন। রফিক আজাদের নাম রফিক আজাদই রয়ে যায়, কিন্তু তাঁর কবিতায় নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হতে থাকে; ব্যক্তি ও সমাজের মানুষের ও রাষ্ট্রের, ধর্মের ও বিশ্বাসের, ভাষার ও ভাবনার ভেতরকার অসঙ্গতি চোখে হাত দিয়ে দেখবার জন্য তিনি হন্যে হয়ে ওঠেন। আর শহীদুর রহমান কিন্তু ষাট দশকের প্রথম দিকের ক্ষোভটিকেই ঘুরেফিরে দেখতে থাকেন। তাঁর শিল্পকর্ম নতুন আবিষ্কারের, নতুন সমবেত উল্লাসের কিংবা সমবেত বেদনার কিংবা স্রেফ শব্দের অন্তর্গত বিস্ফোরণ-সম্ভাবনার খোঁজ করে না, নিজের ভেতরটাকেই আরও তন্নতন্ন করে দেখার কাজে একনিষ্ঠ হয়। দিনবদলের সঙ্গে লক্ষ্যবস্তু আরও ভেতরে লুকোয়, তাঁর নাছোরবান্দা চোখও আরও ভেতরে ঢোকে।

ষাটের দশকে গুণে গুণে বছর ঐ দশটিই, কিন্তু বছরগুলো চলেছে লাফিয়ে লাফিয়ে, এক এক বছরে এগিয়ে গেছে কয়েক দশক করে। ১৯৬২ সালেই পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা মিলিটারির গতর থেকে অ্যালসেশিয়ানের চামড়াটা ফেলে দেয়। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েদের নসিহত খয়রাত করতে এলে আক্ষরিক অর্থে থুতু দেওয়া হয় আইয়ুব খানের এক মন্ত্রী মনজুর কাদেরের মুখে। এবং এয়ারপোর্টে গিয়ে গালে থাপ্পড় খায় আইয়ুব খানের উঠতি চাকর মোনেম খান। কিন্তু এগুলো সবই অসন্তোষের প্রকাশ, প্রতিবাদ খুব স্পষ্ট, কিন্তু প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা তখনও রয়ে গেছে ভেতরে, সমস্ত দেশবাসীর সংকল্পে পরিণত হয়ে জ্বলে উঠতে আরও কয়েকটা দিন প্রতীক্ষা করতে হয়েছে। তবে ভেতরের তাপ বেশ বোঝা যাচ্ছিল। শহীদুর রহমানের কবিতায় তার ক্ষুব্ধ চেহারার ভেতরের আঁচটাও গায়ে লাগে।

স্বাক্ষর কবিতাপত্রের প্রথম সংখ্যায় শহীদুর রহমানে ‘একটি শিয়ালের দুটি অধ্যায়’ কবিতা পড়তে শুরু করলে এটির কবিতা হওয়া নিয়ে সন্দেহ জাগে, কিন্তু পড়তে পড়তে শিয়ালের লোভ, জিভ নেড়ে ঠোঁট দিয়ে দেখা, স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি করে জিভ বাড়িয়ে রক্তের স্বাদ চাখা— পড়তে পড়তে গা শিরশির করে ওঠে। শিরশির করে; আবার ঘিনঘিনও করে। এই অস্বস্তি তৈরি করতে পারে কবিতা ছাড়া আর কী? পরের সংখ্যা স্বাক্ষর-এ ‘ক্ষণ আত্মার ভাষণ’ কবিতার নাকরণের মধ্যেই রণতাকে কবির বিলাস নয়, উদ্বেগ বলে টের পাওয়া যায়। নিজের ভেতরে থেকেও তিনি এখানে আরও অনেককে দেখতে পান, এখানে ‘আমি’ হয়ে ওঠে ‘আমরা’। ১৯৬৫ সালে তৃতীয় সংখ্যা স্বাক্ষর-এ তাঁর একটি কবিতার নাম ‘নৈঃসঙ্গ’। শহীদ এখানে ব্যক্তির ভয়াবহ নিঃসঙ্গতাকে দেখতে চাইছেন ‘খানিক আলো জ্বেলে’। এখানে ‘ধু-ধূ-ধূ মাঠ দিগন্তের এ ধারে তপ্ত মাটি মরীচিকাও যে নেই’। এই দেখায় নিরঙ্কুশ সততা নিঃসঙ্গতা তাঁর পুঁজি নয় এবং এখান থেকে মুক্তিলাভের স্বপ্ন অস্পষ্টভাবে ছায়া ফেলে।

স্বাক্ষর-এর সংখ্যা মাত্র কয়েকটি, এর প্রতিটিতে কেউ-কেউ ঝরে যান, নতুন আসেন কয়েকজন। শেষ সংখ্যা স্বাক্ষরে শহীদুর রহমান অনুপস্থিত। মৃত্যুর পর প্রকাশিত একমাত্র কাব্যগ্রন্থ শিল্পের ফলকে যন্ত্রণায় বেশির ভাগ কবিতাই আমাদের কাছে নতুন। ষাটের দশকে লেখা কবিতা প্রায় সবকটাতেই স্বাক্ষর-এর চরিত্র স্পষ্ট। এর পরের দিকে লেখা কবিতার শহীদ বাইরে তাকাবার উদ্যোগ নিয়েছেন, এতে তাঁর সততা ও নিষ্ঠার তিলমাত্র অভাব নেই; আবেগের নানা স্তরের কম্পন শোনা যায়, বিষয়ের বৈচিত্র্যও তাঁকে আকৃষ্ট করছিল। কিন্তু তাঁর প্রথম পর্বের কবিতায় যে অস্থিরতা ও উদ্বেগ, ক্ষোভ ও বিরক্তি এবং গ্লানিবোধ পরিণত একটি রূপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যাতে ক্রোধ ও সংকল্পের ভ্রূণ লুকিয়ে ছিল, পরের লেখাগুলোতে তা হারিয়ে গেল। সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামে কোটি কোটি মানুষের মতো শহীদুর রহমানও বিক্ষুব্ধ; শুধু ক্ষুব্ধ নয়, বিক্ষুব্ধও। কবিতায় তার চেহারাটি দেখার জন্য তিনি ব্যাকুল হবেন, এ তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু শহীদুর রহমান এই সময় বড় বেশি অস্থির, বড় উত্তেজিত। এখানে তিনি যতটা উদ্বুদ্ধ তার চেয়ে বেশি উত্তেজিত; কাম, প্রেম, জাতীয়তাবোধ, রাজনীতি—সব জায়গায় পদচারণ কোনো কবির জন্য অনধিকারচর্চা নিশ্চয়ই নয়। প্রথম দিকের শিল্পীস্বভাবের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে যে স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে নতুন ভাবনা কবিতার উপলব্ধি হয়ে উঠত তার অভাব কাঁটার মতো বেঁধে। কবিতায় যে বিপুল সম্ভাবনা শহীদ দেখিয়েছিলেন, পরে তার সফল পরিণতি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই প্রেম বা কাম বা দেশবোধ বা রাজনীতি এই পর্বের কবিতায় তাঁর ধাপগুলো টলোমলো। তিনি বেশিরকম উত্তেজিত, এই উত্তেজনা প্রেরণায় রূপান্তরিত হওয়ার জন্য যে-মনোযোগ ও সময় দরকার তা দেওয়ার মতো অবস্থা তাঁর ছিল না।

শহীদুর রহমানের গল্পে এবং একজন সফল শিল্পীর ক্রমপরিণতিকে স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারি। তাঁর প্রথম দিককার কবিতা ও সবগুলো গল্পের মধ্যে শিল্পীর স্বভাব অভিন্ন। কবিতায় নতুন অনুভূতিকে স্পর্শ করার চেষ্টাটি মনে হয় আকস্মিক, কোথাও কোথাও এমনকী উটকো। গল্পের প্রকাশ তাঁর খুবই ধারাবাহিক। কবিতায় যা ছিল কেবল সম্ভাবনা, গল্পে তা-ই পেয়েছে পরিণতি। প্রধান গল্পগুলোতে তিনি মানুষের সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরার ব্যাপারটিকে তুলে ধরেন, এই চিড় কোথাও কোথাও ফাটলে পরিণত হয়েছে। তাঁর কবিতার শেয়াল গল্পে ঢোকে বিড়াল হয়ে, ঢুকে পড়ে মানুষের সংসারে এবং একটি পরিবার ভাঙার উপসংহার তৈরি করে ক্ষান্ত হয়। কবিতার নিঃসঙ্গ ব্যক্তির অসহায় দীর্ঘশ্বাস গল্পে এসে আর্তনাদের আওয়াজ পায়। গল্পের ব্যক্তি সাংসারিক ও সামাজিক গ্রন্থিতে বাঁধা পড়ে কিংবা বন্ধনের অভাবে তার মাথার রগ দপদপ করে জ্বলে ওঠে। শহীদুর রহমানের গল্পে আর্তনাদ হল এই রোগ থেকে রেহাই পাওয়ার পথ, এর থেকে আরোগ্যের কোনো লক্ষণ নয়।

তাঁর সবগুলো গল্পের চরিত্র বলতে গেলে একটিই, এই লোকটি প্রায় সবসময় অসন্তুষ্ট, অস্বস্তির মধ্যে তার দিন কাটে, কিংবা দিন তার কাটেই না। তার সময় স্থির হয়ে থাকে একটি মুহূর্তে, সেটি ঘোরতর অন্ধকার; এই মুহূর্তটিকেই নানারকম আলো দিয়ে দেখার চেষ্টা করে গেছেন শহীদ। যন্ত্রণার প্রত্যেকটি ধরনকে তিনি আলাদা করে দেখতে চান। একটি গল্পে আবার কেরল একটিমাত্র ধরনকে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। এইভাবে দেখাটি কবিতার প্রকৃতিতে যতটা স্বচ্ছন্দ, গল্পের কাঠামোতে কিন্তু ততটা নয়। গত শতাব্দীতে ছোটগল্পের সূচনাপর্বে কিন্তু গল্পের জন্য এরকম শর্তই বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তখন এরকম কথা বলা হত যে ঘটনার মধ্যে দিয়ে টার্গেট করতে হবে একটিমাত্র ভাবনাকে। কিন্তু মনে রাখা চাই, ছোটগল্পের ঐ পর্বে ঘটনা ছিল একটি জরুরি ব্যাপার, সেটাও ঘুরেফিরে কিন্তু একটিই ঘটনা এবং তার রোগা ও ধারালো তনুর ভেতর দিয়ে লেখকের ভাবনা পৌঁছে যাবে গল্পের শেষ বাক্যে। বড়জোর একটি ছোট অনুচ্ছেদ তার জন্য বরাদ্দ করা যায়, সেখানে পা দিয়েই তা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেটে পড়বে পাঠকের মাথায়। কিন্তু শহীদের গল্পে ঘটনা কোনো জরুরি মনোযোগ পায় না, যে-স্পষ্ট বা আবছা ঘটনা তাঁর বাহন তাকে তিনি প্রথমেই খুলে ধরেন পাঠকের সামনে, চরিত্রটির অবসেশন বরং সমস্ত ঘটনাকে নিজের ঘোরের মধ্যে দেখে। তো একদিকে ছোটগল্পের সনাতন আইন অনুসারে একমাত্র অনুভূতির তীরটিকে গল্পে বিধে ফেলার কর্তা এবং অন্যদিকে চরিত্রের অনেক ভেতরকার অস্বস্তি ও নিঃসঙ্গতাকে বোঝার জন্য নানা মাত্রার অনুসন্ধান ও অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশের জন্য বিস্তারিত প্রেক্ষাপট; প্রথমটিতে লেখকের নিয়মপালনের আনুগত্য এবং দ্বিতীয়টিতে শিল্পীর দায়িত্ববোধ, এই দুটিকে সামাল দিতে চেষ্টা করে শহীদ বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, গল্পের লাইনে লাইনে সেই রক্তক্ষরণের ছাপ।

‘দূরে কাছে অনেকগুলো গল্প ঘুরছিল। কথা ঘুরছিল। এবং কথা উড়ছিল। তাদের পাখার ঝাপটানি আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। পাহাড়ী শুনতে পাচ্ছিলো’। (মেহড়ার উত্তর)। ঐ কথাগুলোকে উড়ন্ত অবস্থাতেই দেখার জন্য তিনি ‘করুণতম’ শব্দের ‘অর্থের কুঁড়ি’ ফুটিয়ে তুলতে চান পাহাড়ীর অনুভবের ভেতর দিয়ে। এই পর্যন্ত কেবল কবিতাই থেকে যায়, মিলি হাজির হলে দুজনের একরোখা সিনিসিজমে চিড় ধরে, গল্পে বহুবচনের আমদানি ঘটে। ফলে পাহাড়ী এবং ওর বন্ধুর ঐ একমাত্রিক সিনিক উড়াল ডানা গোটায়, গল্পটি ডাঙায় নামে এবং পা রাখার জন্য একটি সামাজিক ভিত্তি পায়। প্রথম থেকে এটি ডাঙার গল্প হলে ঝামেলা হত না, সনাতন রীতিকে একটি আধুনিক গল্পে রূপ পেতে এর বেগ পেতে হত না। কিন্তু ভেতরের রহস্যকে হাওয়ায় নিয়ে তাকে নানা রঙে দেখা এবং তারপর তাকে ডাঙায় নামানোর দুরূহ কাজটি তিনি করেন বড় শিল্পীর সাহস নিয়ে।

‘আমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়’ গল্পটিকে তিনটি উপশিরোনামে ভাগ করা হয়েছে। এতে হয়েছে কী ধাপে ধাপে গল্পটি বেগ লাভ করেছে এবং এই বেগ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে দারুণরকম চাপ তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত ছেলেটি আত্মহত্যা করে রেহাই পায়, কিন্তু পাঠককে রেহাই দেয় না। মনে হয়, মনোবিকারের একটি রোগী যেন হঠাৎই থেমে গেল। এই পর্যন্ত আসতে শহীদকে যে-অজস্র গলিঘুপচির ভেতর উকি দিতে হয়েছে সনাতন গল্পের আয়ত্তের তা বাইরে। ষাটের দশকের অনেক লেখকই নতুন রীতির খোঁজে বেরিয়ে, ঐসব কানাগলির এক-একটিতে হারিয়ে গেছেন, তাঁদের অনেক গল্পই পর্যবসিত হয়েছে বিলাপে। শহীদের এই গল্পটিরও ঐ পরিণতি হওয়ার ভয় তো ছিলই। কিন্তু ছেলেটির আত্মহত্যার পর কবরগাহে গর্ভবতী নারীর পায়ের ছাপ এবং তাদের চোখ থেকে ঝরে-পড়া-অশ্রুবিন্দুগুলোর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে শহীদ এমনকী স্বেচ্ছামৃত্যুর ভেতরেও মানুষের অন্তহীন সম্ভাবনার ইশারা দেন।

তাঁর লেখায় মানুষের এই সম্ভাবনা এসেছে এতটাই ভেতর থেকে, এতটাই স্বাভাবিকভাবে যে তিনি এ নিয়ে স্পষ্টভাবে কিছু ভেবেছিলেন কি না সন্দেহ। এই সম্ভাবনার প্রতি আস্থা তাঁর ইচ্ছানিরপেক্ষ। মানুষের ভেতরের গলিঘুপচিতে ঘুরে তার শব্দ ধ্বনি গন্ধকে গল্পের সনাতন নিয়মের রাজপথে টেনে আনাটা কম শক্তির, কম শ্রমের কিংবা কম রক্তক্ষরণের কাজ নয়।

তাই গল্পের নিয়মকে নেমে চলার শর্তে অনুগত থাকলে চাইলেও তাঁকে নতুন প্রকরণের খোঁজ করতে হয়। এটা ভঙ্গি জগৎজয়ের অভিযান নয়, নিজের অনুসন্ধান ও তদন্তকে নিয়মমাফিক তুলে ধরার স্বার্থেই তাঁকে নতুন প্রকরণের খোঁজ করতে হয়। এই সম্বন্ধে শহীদ সচেতন একেবারে শুরু থেকে। তাঁর লেখাতেই এটা স্পষ্ট। তবে এই ব্যাপারে তাঁর উদ্যোগগ্রহণের খবর আমি কিছু-কিছু জানি ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সূত্রে।

সেই ১৬ বছর বয়সেই শহীদ চিঠি লিখেছে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দীপেন্দ্রনাথ তখন আমাদের প্রিয় লেখক। নতুন সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর তৃতীয় ভূবন পড়ে আমরা দুজনেই মুগ্ধ। তা শহীদের ঐ চিঠিতে তৃতীয় ভুবন নিয়ে উচ্ছ্বাসের চেয়ে অনেক জরুরি ছিল শহীদের কয়েকটি প্রশ্ন। একটি প্রশ্নের কথা বলি। শহীদ জানতে চেয়েছিল যে, গল্পে উপমা ব্যবহার করতে হলে চরিত্রের অপরিচিত কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে আসা ঠিক কি না। এই প্রশ্ন আমারও নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু শহীদের ছিল সচেতন ও পরিশ্রমী প্রস্তুতি। বলতে কী এখন মনে হয় যে তখন ওর জীবনযাপনই লেখক হিসাবে তৈরি হওয়ার আয়োজন, শিল্পী হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলার অনুশীলন। কলেজে তিনটে ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সমাজতন্ত্রের পক্ষের দলটির প্রতি ওর সমর্থন ছিল সক্রিয়। যদ্দূর মনে পড়ে, কলেজ সংসদের নির্বাচনে ঐ দলের মনোনয়ন পেয়েছিল। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে চেপে বসল আইয়ুব খান। নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হল; কলেজের দলগুলো ভেঙে গেল। রাজনীতি বন্ধ হল, মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশ, বিদ্যাচর্চা, মননশীলতা — এসবকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য মিলিটারির ডাঙা ঘুরতে শুরু করল বোবোঁ করে। এই অবস্থাকে মেনে নেওয়া শিল্পীর পক্ষে সম্ভব নয়। অবরুদ্ধ ঘরে বসে ভেতরের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে তখন কারও আর উপায় থাকে না। ভেতরের রহস্যময় অন্ধকার বাইরের প্রেক্ষাপটে না দেখলে সেখানকার আগুন জ্বলে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, অবধারিত বিস্ফোরণটি ঘটে না। স্ফুলিঙ্গটি প্রতিভাবান শিল্পীর ভেতর নানা রঙে ঝিকমিক করে, কিন্তু দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে না। শহীদের ক্ষোভ তাই শেষ পর্যন্ত ক্রোধের মহিমা পায় না। অথচ, সেই সম্ভাবনা তো শহীদ প্রথম থেকেই দেখিয়েছে। গল্পের খুঁটিনাটি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা, তা-ই নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজেকে জড়ানো, এসবই তো শিল্পী হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলার উদ্যোগ। পরিবর্তিত, আরও ঠিক করে বললে, রুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই উদ্যোগ চাপা পড়ল। কোনো কোনো শিল্পীর জন্য এই রুদ্ধতাই বিস্ফোরণের আয়োজন তৈরি করে। শহীদের বেলায় তা হয়নি। তার জন্য দায়ী কবর কাকে? নিজেকে প্রস্তুত করার পাশাপাশি সক্রিয় ছিল এর অন্তর্গত অগোছালো স্বভাব।

ম্যাট্রিকে খুব ভাল ফল করে ভরতি হয়েছিল আই.এস-সি. ক্লাসে। বিজ্ঞানের বিষয়গুলো ও বাংলায় অসাধারণ দখল ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা দিতে দিতে ড্রপ করল। এরকম পরীক্ষায় ড্রপ-করা কয়েকজন মেধাবী ছেলের সঙ্গে কলেজের হোস্টেল ছেড়ে গিয়ে উঠল ঢাকা কলেজের উলটোদিকে, বাঁশের বেড়ার একটি ঘরে, নিজেই ঐ ঘরের নাম দিল ‘নষ্টনীড়’। ঐ বয়সের ছেলেরা নীড় পছন্দ করে না, কিন্তু শহীদ শুধু ঐটুকুতেই ক্ষান্ত নয়, তার মেজাজ নীড় নষ্ট করার দিকে। বিজ্ঞান নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ইউনির্ভাসিটিতে ভরতি হল বাংলা নিয়ে; পড়তে-পড়তেই চাকরি করতে হয়েছে ওকে। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে পেশা হিসাবে বেছে নিতে হয় সাংবাদিকতাকে, কিন্তু সদাক যুবকের পক্ষে ঐ পেশায় খাপ খাওয়ানো কঠিন, তাও আবার সংবাদপত্রটি সরকারের। ওখান থেকে বেরিয়ে শিক্ষকতার পেশায় এসে মর্যাদা ও স্বস্তি দুটোই পেয়েছিল। গবেষণার দিকে ঝুঁকল, পি.এইচ-ডি করতে গেল কলকাতায়। অ্যাকাডেমিক গবেষণার শৃঙ্খলায় বিরক্ত হয়ে অসমাপ্ত থিসিস ফেলে রেখে চলে এল ঢাকায়। কী শিল্পচর্চা, কী পেশা, সবক্ষেত্রেই একটি জায়গায় পৌঁছে অবধারিত সাফল্যের কাছাকাছি এসে ছেড়ে দেওয়া, একদিকে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে প্রত্যাহার করা—শহীদের স্বভাব ও কর্ম বুঝতে হলে ওর এই প্রকৃতিটা মনে রাখা দরকার।

কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে বদলি হতে হল ঝিনেদায়। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, বন্ধুবান্ধব ও নিজের তৈরি পরিবেশ ছেড়ে ঝিনেদা যাওয়া। ঝিনেদা ওর জন্মের শহর, শৈশব বাল্য কৈশোর কেটেছে ঝিনেদায়। ও কবি হয়ে উঠেছে এই শহরেই, ওর সাধ ও স্বপ্ন গড়ে ওঠে এই শহরে। কলেজে এসে আমাদের সঙ্গে ঝিনেদার কথা যে খুব বলত তা নয়। আমাদের কলেজে ওর ঝিনেদার বন্ধু আরও কেউ-কেউ ছিল। এদের একজনকে তো ওর গল্পেই পেয়েছি। আর একজন লতাফত হোসেন জোয়ারদার হাসিতে, উচ্ছ্বাসে, দুষ্টুমিতে চঞ্চল লতাফত পরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়। শহীদের ভাবনায় নিশ্চয়ই ওর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ছিল, ওর অলিখিত উপন্যাসে নিশ্চয়ই সে বেড়ে উঠেছিল নানাভাবে, উপন্যাসটি লেখা হলে লতাফত হয়তো ফের প্রাণ পেত।

তো একদিকে ঝিনেদা, ঝিনেদায় শহীদ তৈরি হয়েছে, শহরটি তাকে তৈরি করে তুলেছে। আর ঢাকায় এসে সে তৈরি করে নিয়েছে নিজেকে। তার শিল্পভাবনা পরিণত হয়েছে ঢাকায়, শিল্পস্বভাব বিকশিত হয়েছে নতুন মাত্রায়। ঢাকায় এসে শহীদ অর্জন করেছে শিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই শহর তাকে দিয়েছে প্রেম, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, নতুন বন্ধু, খ্যাতি, আরও খ্যাতির সম্ভাবনা, সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু শৈশবের আদুরে হাতছানি আর স্বনির্মিত, স্বোপার্জিত জীবনকে ধরে রাখার দায়িত্ব এই দুটো তাকে ফেলে দেয় এক দোদুল্যমানতার ভেতর। পরিণত বয়সে ঝিনেদায় গিয়ে শহীদ নিশ্চয়ই ওর শৈবের কোলে মুখ লুকোবার একটি সাধ গোপনে পোষণ করত। কিন্তু কোথায় সেই ঝিনেদা? নবগঙ্গা নদীর ওপর কচুরিপানা জমে শুধু নদীর পানি নয়, ওর শৈশবকেও ঢেকে ফেলেছে। সেই শহর এখন অন্য শহর, শহীদও এখন অন্য শহীদ। মানুষের মনোজগতের অন্ধকার কোণগুলোকে তদন্ত করে পাঠকের সামনে তাই আলোকিত করে তুলতে গিয়ে আলোর আগুনে নিজেই দগ্ধ হয়েছে। পরিণত বয়সে ঝিনেদা সেই ক্ষতস্থানে প্রলেপ বুলিয়ে দিতে অক্ষম। মানুষ বড় হয়, প্রকৃতির সঙ্গে মায়ের সঙ্গে তার বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। ঝিনেদা শহীদকে কোল দেবে কী করে? এদিকে স্ত্রীপুত্রকন্যার শীতল ছায়াটিও নেই। এই অবস্থায় শহীদের স্থিতি নেই, কোথাও মন বসাতে পারে না। কবিতায় নানারকম বিষয় আসতে থাকে, কিন্তু সবই বড় অস্থির। এদিকে কর্মস্থলে মেলা ঝামেলা, ছোটবড় ক্লিক, ছোট শহরের নোংরা ঘোঁট—এসবের ভেতরে যাওয়া তার স্বভাবের বাইরে, কিন্তু ঝিনেদার অধিবাসী বলে এবং শহরটিকে তার সমস্ত সমাজ নিয়ে অনুভব করতে চায় বলে এসবকে এড়িয়ে চলাও তার পক্ষে অসম্ভব।

তার শিশুচরিত্র আঁকার মধ্যেও নিজের শৈশবকে উলটেপালটে দেখার ইচ্ছাটি স্পষ্ট। আবার মানুষের ভেতরকার ক্ষতবিক্ষত চেহারার ছাপও শিশুচরিত্রেও ফেলে যার লেখকের নিজের অগোচরেই। একদিকে শিল্পচর্চার জন্য আশৈশব প্রস্তুতি নেওয়া, অন্যদিকে নিজের শিল্পকর্ম প্রকাশে শোচনীয় অনীহা, একদিকে জীবনে সুখ ও মহিমা অর্পণের তাগিদে প্রেম, স্ত্রীপুত্রকন্যার জন্য গভীর ও তীব্র ভালোবাসা, অন্যদিকে প্রথম যৌবনের নষ্টনীড়-প্রবণতার গোপন ও প্রবল টান : একদিকে মরীচিকাহীন মরুভূমিতে নিঃসঙ্গ মানুষের নিশ্বাসে ঝলসানো বুক, অন্যদিকে গোরযাত্রীদের কাঁধে পুত্রবন্ধুর লাশ দেখে ছেলেকে টেনে নেওয়া মানুষের অনুসন্ধান—এইসব টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত শহীদ, চারদিকের ক্ষয়ে ক্ষুব্ধ শহীদ। ওর সারাজীবনের জীবনযাপন ও শিল্পচর্চা নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ের দাগ। এই লড়াই শহীদকে ক্লান্ত করে তোলে। ক্ষোভকে ক্রোধে জ্বালিয়ে তুলতে পারলে এই শহীদই টাটকা প্রাণে নতুন সৃষ্টিতে মগ্ন হতে পরত। তা তো হয়নি। তাই ক্ষুব্ধ ছেলেটি শেষ পর্যন্ত ক্লান্তপ্রাণ যুবক হয়ে কবিতার মধ্যে এলোমেলোভাবে নানা পথ খুঁজে বেড়ায়।

ক্লাস্তিতে ঢুলে পড়লেও তাই পেছন হটে যায় না শহীদুর রহমান। ক্লান্ত শিল্পী যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে জেগে ওঠেন নতুন শক্তিতে। তাঁর যন্ত্রণা কোনোদিন দুঃখবিলাস ছিল না, তাকে তিনি পরিণত করতে চান কষ্ট পাওয়া মানুষের ঐক্যের সূত্রে। তাঁর একমাত্র বই তিনি উৎসর্গ করেন ‘যন্ত্রণাকাতরদের উদ্দেশে’। এইভাবে তাঁর লেখায় তিনি অনেক মানুষের জন্য একটি ঠাঁই করে দেন।

শহীদুর রহমানের এই যে একবার প্রকাশ, আরেকবার প্রত্যাহার –এর মধ্যেও বেজে ওঠে তার পরম সাধ। সেটা হল সবার সঙ্গে যোগযোগ স্থাপনের ইচ্ছা।

এসো আমরা কথোপকথন করি
এসো আমরা সোনার মতোন সন্ধ্যায় কথা বলি
আদিগন্ত মাঠকে সাক্ষী রেখে কথা বলি
খঞ্জনার প্রাস্তর উজাড় ফসলী ক্ষেতকে সাক্ষী রেখে
কথা বলি—

‘কথা বলি’।

.

কথা বলার সময় শহীদ সাক্ষী রাখেন নদীকে, রাখাল বালককে, গর্ভবতী গাভীকে, পাখিকে, মাছকে, ফুলকে। প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষকে এক জায়গায় এনে, সবার সঙ্গে সবার যোগযোগ-সাধনের ইচ্ছা জানিয়ে শহীদ বিদায় নেন। ‘নক্ষত্রলোকে কথা বলি – এই বাক্যটি বলে শহীদ চুপ করল। এখন তাঁর সঙ্গে আমরা যোগযোগ করি কী করে? তাঁর ডাকে সাড়া পায়নি বলে কি সবাইকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে শহীদ একবারে চুপ হয়ে গেল?