Course Content
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
0/22
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

কৌতুকে ক্রোধের শক্তি

একটি চিঠিকে ধরে ১৪টি শিরোনামে ১৫টি লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে আসহাবউদ্দীন আহমদের দাম শাসন দেশ শাসন। মোট ৮০ পৃষ্ঠার বই, এর মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছে কত বিচিত্র ব্যাপার। অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক, রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঘোরতর অসঙ্গতি, আমাদের দেশে শিক্ষিত পেটি বুর্জোয়া ও বুর্জোয়া সমাজে সামস্ত মনোভাবের দাপট, বিত্ত ও ভোগের ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর ভেতরকার মস্ত ফারাক, বিদ্যাচর্চায় অনুরাগের ক্রমবর্ধমান অভাব, সমাজতান্ত্রিক দেশে গণতন্ত্রের নামে সাম্রাজ্যবাদের ফাঁদে পা দেওয়া, পুলিশের হাতের ভেতর থেকে রাজনৈতিক কর্মীর পালিয়ে যাওয়া, বড় রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয়তার আঁচল ধরে পাতি নেতাদের সিংহাসনে আরোহণ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দাঙ্গা রোখার সংকল্প—সবই ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে রোগা বইটার দুই মলাটের মধ্যে। এত সব ব্যাপার, পড়তে কিন্তু, হাঁসফাঁস লাগে না, সদালাপী লেখক গল্প করতে করতে সবাইকে ধরে রাখেন। এই কাজটি তিনি এমনভাবে করেন যে, পাঠকের মনে হয় সে শুধু কথা শুনছে না, বরং সমান মর্যাদার সঙ্গে আলাপে যোগ দিচ্ছে।

দ্রব্যমূল্য যতই মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে যেতে থাকে, দেশের সরকারের ব্যর্থতা ততই প্রকট হতে থাকে। দামের বাড়াবাড়ি হলে সরকার মুখ থুবড়ে পড়েও যায়। ব্যাপারটা জানে না কে? এরকম ঘটনা আমরা চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি। কিন্তু, বিষয়টি তাৎপর্য পায় যখন আসহাবউদ্দীন আহমদ একজন নিরক্ষর মুচির পর্যবেক্ষণকে তুলে ধরেন তাঁর নিজের ভাষায়। আসহাবউদ্দীন আহমদ বরাবরই শেকসপিয়রের ভক্ত, যে-কোনো প্রসঙ্গে শেকসপিয়রের যথাযথ ব্যবহারে তাঁর জুড়ি নেই। বইয়ের নাম-রচনাটিতে জুলিয়াস সিজারে মুচির সংলাপ এবং তাঁর নিজের পরিচিত বাঙালি মুচির প্যাঁচাল পাড়াকে একটি অভিন্ন মাত্রায় এনে তাঁর বক্তব্যকে এমন ভঙ্গিতে প্রকাশ করেন যে, পাঠক লেখকসুদ্ধ প্রত্যেকটি চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম অনুভব করেন। নিরক্ষর নিম্নবিত্ত মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে, বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম থেকে যে-উপলব্ধি অর্জন করেন তার অকপট ও সরল প্রকাশের ভেতর লেখক দার্শনিকের প্রজ্ঞা লক্ষ করেন। আসহাবউদ্দীন আহমদ একজন বিদ্বান লোক, দেশের বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তি। কিন্তু বিদ্যা তাঁর রচনায় কাঁটার মতো বেঁধে না, পাণ্ডিত্য তাঁর কাণ্ডজ্ঞানকে এতটুকু পণ্ড করতে পারেনি। বই-পড়া-চোখ দিয়ে তিনি মানুষকে দেখেন না, বরং চোখের সামনে যা ঘটে বইয়ের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখে তবে ঐ পড়া বইয়ের যথার্থতা বিবেচনা করেন। ভাই, তত্ত্ব তাঁর লেখায় তাঁর ব্যক্তিত্বকে উপচে ওঠে না, বরং প্রতিদিনকার জীবনযাপনের ভেতর যা দেখেন তা-ই এমন শাদাসিধাভাবে বলেন যে, পাঠক টেরই পায় না যে, তত্ত্বটি কীভাবে তাঁর ভেতরে একেবারে গেঁথে গিয়েছে। যেমন ‘ফুটপাত ইজ নট হেডপাত’ লেখাটিতে রাষ্ট্রব্যবস্থার ঘোরতর অসঙ্গতি এমন ঘটনার ভেতর দিয়ে দেখেন যে সারপ্রাইজের গল্পের মতো পাঠক চমকে ওঠে না; কিন্তু লেখকের সঙ্গে একই ভাবে অনুভব করে যে, এটা কেমন দেশ যেখানে কাউকে তার ভিটেমাটিসুদ্ধ উচ্ছেদ করাটা কোনো অন্যায় কাজ নয়, আর পথচারীদের জন্য তৈরি ফুটপাথে মাথা পেতে শোয়াটা হল ঘোরতর বেআইনি কাজ?

পুঁজিবাদের খোঁড়া বিকাশের সঙ্গে উদ্ভূত মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত, কিংবা বুর্জোয়াশ্রেণীর শিক্ষিত মানুষের স্বভাবে সামস্ত মনোভাব কী রকম দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করে আসহাবউদ্দীন আহমদ আমাদের তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ঐ শ্রেণীর লোকদের সময়জ্ঞানশূন্যতা সম্বন্ধে কয়েকটি ঘটনার কথা বলে। লেখাটি পড়তে পড়তে এর শিরোনামে ‘হাতঘড়ি খুলে ফেলুন’ বলে যে ধমক দেওয়া হয়েছে তা খুবই উপযুক্ত বলেই বিবেচিত হয়। এর পরের লেখাটি তওবা তওবা’। এখানে একজন পরহেজগার ও গোঁড়া বৃদ্ধ মুসলমানের কথা বলা হয়েছে যিনি অসুস্থ হয়ে শহরের একটি হাসপাতালে আসতে বাধ্য হয়েছেন। রক্ষণশীল ধর্মবিশ্বাস থেকে মহিলা-নার্সের সেবা তিনি ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করেন এবং এমনকী তাদের সঙ্গে —এইসব বেগানা আওরতের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকাটাও গুনার কাজ বিবেচনা করে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান। লেখক এখানে সামস্ত মানসিকতার সঙ্গে পুঁজিবাদের সংঘাতের কথা সরাসরিভাবে ব্যক্ত করেছেন। এই লেখাটির একটি ছোটগল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ছোটগল্পের কাঠামোর ভেতর থাকা তাঁর স্বভাবে নেই। তিনি ভালোবাসেন গল্প করতে। গল্প করার এই ভঙ্গিটিকে ছোটগল্পে কীভাবে ব্যবহার করা যায় সেদিকে গল্পকাররা একটু মনোযোগ দিতে পারেন।

এরকম আরেকটি লেখার নাম ‘জমিহীনের জমির ক্ষুধা’। এখানেও ছোটগল্পের ছায়া হঠাৎ ঠাহর করা যায়। নিজের জমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে ভিখারি বনে যাওয়া একজন সর্বহারাকে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অনেক চেষ্টা তদবির করে হয়তো সরকারি ব্যবস্থায় খানিকটা চিকিৎসার সুযোগ করে দিলেও দিতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় জমিহীনকে খাস জমি বরাদ্দ করা? কক্ষনো নয়। সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়। এমনকী, প্রাদেশিক পরিষদের মাননীয় সদস্য মনেপ্রাণে চাইলেও তা হওয়ার জো নেই। আসহাবউদ্দীন আহমদ স্পষ্ট কথায় জানিয়ে দেন, চলতি সমাজব্যবস্থায় সূর্য পূর্বদিকে না-উঠে পশ্চিম দিকে উঠতে পারে, শিলা জলে ভাসতে পারে, মাদার গাছে কাঁঠাল ধরতে পারে, কিন্তু ভূমিহীন কোনোদিন জমি পেতে পারে না। এর জন্য দরকার বিপ্লবী নেতৃত্ব। এই নেতৃত্ব বুর্জোয়াশ্রেণীর পার্টি থেকে আসবে না। আসবে শোষিত শ্রেণীর পার্টি থেকে। এই শেষ কয়েকটি বাক্য পাঠক না-পড়লেও লেখকের গল্প করার ভঙ্গিতেই কিন্তু তাঁর ক্ষোভ ও সংকল্প গভীরভাবে অনুভব করতে পারেন।

সমাজতন্ত্রের সাম্প্রতিক আপাত-বিপর্যয় সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফল—এই সত্যটিকে যথাযথ অনুভব করে আসহাবউদ্দীন আহমদ চীনের বর্তমান নেতাদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের গণতন্ত্রের নামে তথাকথিত জানালা খোলার নীতির ফল শুভ হতে পারে না। এই জানালা দিয়ে মুক্ত বাতাস আসবে না, যা আসবে তা হল পুঁজিবাদের ক্ষয়িষ্ণু সমাজের দূষিত নিশ্বাস। মৌলবাদের বিশ্বব্যাপী অভ্যুত্থান যে কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়, বরং সমাজতন্ত্রবিরোধী এই চক্রান্তেরই একটি অংশ এই বিষয়েও তাঁর সন্দেহ নেই তা জানিয়ে দিয়েছেন একটি চিঠিতে। সাম্প্রদায়িকতাকে তিনি ধিক্কার জানান ‘তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন’ নামে লেখাটিতে। প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী নিজেদের আসন ঠিক রাখার জন্য কীভাবে সাম্প্রদায়িকতার শরণাপন্ন হয় তার একটি সংক্ষিপ্ত ও তথ্যপূর্ণ বিশ্লেষণ এখানে পাওয়া যায়। কিন্তু শিরোনামটি বিভ্রান্তিকর। এই ‘অধম তুমি’টা কে? তাদের সঙ্গে তিনি উত্তম হবেন কেন? ধর্মের উন্মাদনায় যারা নরবলিযজ্ঞে মত্ত হয়, বানোয়াট দেবতার বানোয়াটতর জন্মস্থান আবিষ্কার করে যারা মধ্যযুগীয় বর্বরতায় উন্মাদ করতে চায় কোটি কোটি মানুষকে তাদের সঙ্গে সহমর্মিতা বোধ করে এদেশের কোন অপশক্তি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ঐসব তৎপরতায় এখানে উৎসাহিত হয় তারাই যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নরহত্যাযজ্ঞের সহায়ক চাকরবাকর, নারীধর্ষণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পিম্প এবং লক্ষ লক্ষ গৃহে অগ্নিসংযোগের মচ্ছবে ঐ সেনাবাহিনীর আগুনবরদার। ভারতীয় মৌলবাদী ও বর্ণবাদী চক্রান্ত এবং বাঙালি মৌলবাদী ও ধর্মাঙ্ক চক্রান্ত হল সাম্রাজ্যবাদের দুই জারজ সন্তান। ইতর এই জানোয়ারদের কারও সঙ্গেই উত্তম ব্যবহার করার কোনো কারণ নেই। নিজ নিজ দেশে এরা কেবল বিশেষ সম্প্রদায়ের বিপক্ষ শক্তি নয়, এরা গোটা দেশবাসীর এক নম্বর শত্রু। এদের যে-কাউকে ক্ষমা করা মানে সাম্রাজ্যবাদের হাতকে শক্ত করা। আসহাবউদ্দীন আহমদের আলোচ্য লেখায় দুই দেশের মৌলবাদী ধর্মান্ধ ইভরগোষ্ঠী সম্বন্ধে ব্যাখ্যা না-থাকার জন্যই বিষয়টি শেষ পর্যন্ত অস্পষ্ট রয়ে যায়।

বইটিতে সমাজব্যবস্থার অসঙ্গতি খুব প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়েছে ‘এঁটো” নামে লেখাটিতে। সমাজচেতনার সঙ্গে শিল্পক্ষমতার সামঞ্জস্য ঘটায় এখানে লেখকের অসাধারণ সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। “নিয়ম হল মানুষ খাবে গোশত। কুকুর খাবে হাড্ডি। প্রকৃতি কুকুরের দাঁতগুলোকে সেভাবে তৈরি করেছে। কিন্তু অবস্থা এমন হয়েছে যে, মানুষেরই একটি অংশ ‘ভোজ উৎসবে নিমন্ত্রিত অতিথিদের ফেলে দেয়া হাড় চিবিয়ে খাচ্ছে’। এই কুৎসিত দৃশ্য দেখে লেখকের বমি-বমি ভাব হয়। গড়ে প্রবল বিবমিষা হয় পাঠকেরও। যে-শক্তি কাউকে কাউকে গোশত খাওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং অনেককে সেই গোশতের এঁটোহাড্ডি চিবুতে বাধ্য করে সেই সমাজব্যবস্থাকে সজোরে উগরে দেওয়ার বিবমিষায় পাঠক দারুণ অস্বস্তি বোধ করে। ঠাট্টা ও বিদ্রূপের ভঙ্গিতে আসহাবউদ্দীন আহমদ একটু নিচু স্বরেই যে-ক্রোধ প্রকাশ করেছেন তার ধাক্কা কিন্তু প্রবল। বেশ শক্ত।