Course Content
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
0/22
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

সমাজের হাতে ও রাষ্ট্রের খাতে প্রাথমিক শিক্ষা

শিশু যে-বয়সে স্কুলে যায় সেটা তার শেখার বয়স। স্কুলে যেতে পারুক আর না-ই পারুক, মনুষ্যজীবন-যাপনের জন্য প্রাথমিক ও অপরিহার্য বিষয়গুলো শেখার সূত্রপাত তার ঘটে এই বয়সেই। ভদ্দরলোক, মজুর শ্রেণীনির্বিশেষে সব ছেলেমেয়ে এই বয়সে বাপের নাম জানে, বারের নাম, মাসের নাম শেখে, প্রতিদিন দেখা পশুপাখি, ফুল, ফল, গাছ ও লতাপাতার নাম শেখে, পরিচিত খাবার চেনে, নিজের গ্রাম বা শহরের নাম, পাড়া বা রাস্তার নাম ও দেশের নাম শেখে, দিনের বেলার মস্ত বাতির নাম ও রাত্রির ছোট বাতির নাম শিখতে বিকটদর্শন বিরাট আকারের দৈত্য ক্যালিবানকে মেলা বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলেও ছোটখাটো মানবশিশু শিখে ফেলে যে একটি সূর্য এবং আরেকটি হল চাঁদ। ঐ বয়সে ১, ২, ৩, ৪ গুনতে শেখে, আত্মীয়স্বজন এবং প্রভু ও চাকরদের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝে, বাপদাদার ধর্মবিশ্বাস সম্বন্ধেও একটুআধটু জানতে পারে; তার শব্দের ভাণ্ডার প্রতিদিনই একটু একটু বাড়ে। কোন শ্রেণীতে তার অবস্থান সে সম্বন্ধেও দেখতে দেখতে সে সচেতন হয়, কাকে সমীহ করা দরকার এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে হবে কাকে, তাও মোটামুটি রপ্ত হয় এই বয়সেই। তারপর পরিপূর্ণ বালকে পরিণত হতে হতে নিজ নিজ পেশা অনুসারে সে শিখে ফেলে কোন মাসে কী ফসল বুনতে হয়, ফসল পাকলে কীভাবে তা ঘরে তুলতে হয় বা আর কার ঘরে তুলে দিয়ে আসতে সে বাধ্য; কোন ঋতুতে কী মাছ ধরা পড়ে, জাল ফেলার কায়দা, নৌকা বাওয়া, কাস্তেকোদাল ধার দেওয়া, মাটি ছেনে হাঁড়িবাসনে রূপ দেওয়া, কাঠ চেরাই বা চুল কাটা —সব ব্যাপারেই প্রাথমিক ধারণা তার এই বয়সেই ঘটে। এজন্য স্কুলে না-গেলেও চলে। আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জীবনে স্কুলে পা না-দিয়েও ঐসব ধারণা রপ্ত করে, নিজ নিজ পেশায় দক্ষ হয়, বয়স বাড়ে আর তাদের দক্ষতাও বাড়ে এবং নানা ক্ষেত্রে উৎপাদনে নিয়োজিত হয়। যে-পয়সার জোরে আমরা প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ ইউনিভার্সিটি বানাই তার সিংহভাগের জোগান দেয় তারা যাদের হাতে কোনোদিন বই ওঠেনি।

এই অবস্থা তো নতুন নয়। তবু প্রাচীনকাল থেকে মানুষ নিজের ছেলেমেয়েকে পাঠশালা মক্তব টোল— যেরকম হোক একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠাবার এত আগ্রহ পায় কোত্থেকে? অথচ পড়াবার ক্ষমতা কিন্তু নেই, স্কুলে পাঠালেও বছর ঘুরতে না ঘুরতে লেখাপড়ায় ক্ষান্ত দিয়ে ছেলেকে নিজের পেশায় ঢুকিয়ে দেয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে হাউসটা প্রত্যেকেরই আছে, ছেলেকে একবার পাঠশালায় পাঠালে হত।

এ কি শুধু নিজের বংশধরকে ভদ্দরলোকের সিঁড়িতে তোলবার আকাঙ্ক্ষা? নাকি ভদ্দরলোকি কায়দায় পয়সা কামাবার শর্টকাট রাস্তাটা ধরিয়ে দেওয়া?

না। স্কুলে পাঠাবার সিদ্ধান্ত বাপ একা নেয় না। এই সিদ্ধান্ত লোকটি পায় সমাজের আর-পাঁচজনের কাছ থেকে। সমাজের গঠনই এমন যে ব্যক্তির সব কাজই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় সামাজিকভাবে। শিশুকে পাঠশালা কী টোল কী মক্তবে পাঠাবার প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হল তাকে সমাজের সঙ্গে পরিচিত করা এবং তাকে সমাজের অন্তর্ভুক্ত করা। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না ঢুকেও বড় হতে হতে জীবিকার চাপেই মানুষ তার পরিবারের বাইরে একটি সমাজের সঙ্গে পরিচিত হয় বটে, কিন্তু তা একেবারেই ছোট, পরিবারের ঈষৎ সম্প্রসারিত গোষ্ঠী ছাড়া তা আর কিছুই নয়। পাঠশালায় কিন্তু সে কেবল বাপের ছেলে নয়, কেবল অমুক বংশের সন্তান নয় কিংবা কেবল চাষি বা জেলেসম্প্রদায়ের মানুষ নয়। সেখানে সে একটি বৃহত্তর সমাজের অংশ এবং একটি দেশের নাগরিক। তার পাঠ্যসূচিতে যা-ই থাকুক, তাকে ঠিকঠাক পড়ানো হোক আর না-ই হোক স্কুলেই সে জানতে পারে যে তার গ্রাম কী শহরের বাইরে একটি সমাজের সে সদস্য এবং অবচেতনভাবে হলেও মনের গভীরে এই কথাটি তার গেঁথে যায় যে এই সমাজের কাছে তার কিছু প্রাপ্য রয়েছে, এর প্রতি কিছু দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়। রাষ্ট্র বলে একটি শক্তির দাপট সে টের পায় এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে তার অধিকার ও দায়িত্ব সম্বন্ধে অস্পষ্ট একটি অনুভূতি তার মধ্যে জন্মায়।

সমাজের সঙ্গে সন্তানকে সম্পৃক্ত করাই তাকে প্রাথমিক শিক্ষাদানে অভিভাবকের প্রধান উদ্দেশ্য, তাই রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধার তোয়াক্কা না করেই দেশে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

প্রাচীন গ্রিসে জিমনাশিয়ামগুলো কেবল শরীরচর্চার কেন্দ্র ছিল না, প্রাথমিক বিদ্যাচর্চাও হত ওখানেই। শিশুদের ওখানে ঢুকিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের গণ্ডি থেকে তাদের সমাজের অন্তর্ভুক্ত করা। মধ্যযুগে ইউরোপ জুড়ে জিমনাশিয়ামগুলো ব্যবহৃত হয়েছে শিশুদের শরীর ও মনের উৎকর্ষসাধন এবং মানবিক বৃদ্ধি ও শক্তিসমূহের বিকাশ ঘটিয়ে তাদের সামাজিক প্রাণীতে পরিণত করার জন্য। রাষ্ট্র ব্যাপারটি ইউরোপে বেশ আগেই সংগঠিত হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বা খবরদারি তখন থেকেই ছিল। তবে প্রধান দায়িত্ব পালন করেছে স্থানীয় সমাজ। এই ব্যাপারে উন্নত সভ্যতা কী পশ্চাৎপদ সমাজের কোনো পার্থক্য নেই। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন আফ্রিকান গোত্রসমাজেও ব্যায়ামাগার ছিল, শিশুদের নিজ নিজ গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করে তোলাই ছিল এইসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য।

আমাদের দেশেও প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা কোনো-না-কোনোভাবে ছিলই এবং এর পরিচালনার ভার ছিল স্থানীয় সমাজের হাতে। গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপগুলো ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের আড্ডা দেওয়ার জায়গা এবং এর এককোণে থাকত গুরুমশায়ের পাঠশালা। অনেক মুদির দোকানে একপাশে মাদুর পেতে পাঠশালা বসত, তেল নুন ডাল বেচার ফাঁকে ফাঁকে পণ্ডিতমশাই বেত ও বচন দিয়ে ছেলেদের বিদ্যাদান করতেন। নিম্নবর্ণের মানুষও ভিটে ও জমি দান করে ব্রাহ্মণপণ্ডিতকে নিজেদের গ্রামে নিয়ে আসত—নিজেদের ছেলেমেয়েদের বর্ণপরিচয় করানো, একটুখানি গুনতে শেখানো—এটুকু করতে পারলেই তাদের বিদ্যাস্পৃহা মিটত। মুসলমানরা মসজিদ কী জুম্মাধরের বারান্দায় একটু ব্যবস্থা রাখিত, ফজরের নামাজের পর ছেলেরা আমপারা সেপারা পড়ত। পণ্ডিতমশাই কী ওস্তাদরা যে মস্ত দিগগজ বিধান কী আলেম ছিলেন তা মনে করার কোনো কারণ নেই, সংস্কৃত কি আরবিফারসি উচ্চারণের সময় তাঁদের মাতৃভাষার প্রভাব ছিল বড় প্রকট। তবে মাতৃভাষা তাঁরা মোটামুটি জানতেন, গণিতের প্রাথমিক জ্ঞান তাঁরা রপ্ত করেছিলেন। অভিভাবকদের আশাও এর বেশি ছিল না, সম্পূর্ণ গ্রামনির্ভর জীবনযাপন করার জন্য এইটুকু বিদ্যাই যথেষ্ট। গুরুমশায়ের ভরণপোষণের ব্যাপারটিও গ্রামবাসীদের সামাজিক দায়িত্ব বলে বিবেচিত হয়েছে, নাপিত কী কামার কী কুমারের মতো গুরুমশাইও গ্রামের ঘরগুলো থেকে বরাদ্দ পেতেন, তাঁর বেলায় এই বরাদ্দের হয়তো সম্মানজনক কোনো নাম ছিল।

ইংরেজদের আগে রাজা মহারাজা বাদশা নবাবদের শোষণ স্পৃহা কী নির্যাতনের ক্ষমতা কম ছিল না। কিন্তু দেশের সম্পদ বাইরে পাচারের দরকার না-থাকায় নিভৃত গ্রামের মানুষকে নিংড়ে ফেলার জন্য রাষ্ট্রীয় শক্তিকে সাঁড়াশির মতো ব্যবহার করা একটি নিয়মিত রেওয়াজে পরিণত হয়নি। কৃষকের সীমাহীন দারিদ্র্য মোচনে এবং গ্রামীণ সমাজের কোনো রীতিতে হস্তক্ষেপ করার বিষয়ে সে সময়কার রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা প্রায় একইরকম। গুপ্ত, মৌর্য, পাল, সেন থেকে শুরু করে পাঠান মোগল শাসকদের সবাই ছিলেন নিরঙ্কুশভাবে ভারতীয়। এঁদের কেউ-কেউ ধর্মচর্চা, ধর্মপ্রচার, এমনকী নতুন ধর্মমত প্রবর্তনেও উৎসাহী ছিলেন, ধর্মপ্রচারে আত্মনিয়োগ করে কেউ-কেউ নির্যাতনও চালিয়েছেন। কিন্তু এইসব কর্মকাণ্ড ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো, একবার তোলপাড় তুলে ফের থিতিয়ে আসত। সমাজকাঠামোতে বড়রকমের অদলবদল তাতে ঘটত না, সেরকম ঘটাবার ইচ্ছাও রাষ্ট্রের ছিল না। প্রাথমিক শিক্ষা সর্বতোভাবে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এই পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে রাজা মহারাজা বাদশা নবাব সম্বন্ধে তথ্য এ রকম অনুপস্থিত ছিল। বর্ণবাদ কিংবা আশরাফ আতরাফ নিয়ে বিরূপ মনোভাব তৈরির কোনো সুযোগ কী সম্ভাবনাই সেখানে ছিল না। রাজবংশ বা অভিজাতদের ছেলেদের শিক্ষালাভ হত বাড়িতে, দেশের বা এলাকার জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিগণ তাদের বিদ্যাদান করতেন। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষাদানে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিতই ছিল।

রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য আংশিকভাবে লাভ করেছে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। বৌদ্ধ আমলে বাসুবিহার, শাবনবিহার, সোমপুরবিহার এবং অন্যান্য বিহার সরাসরি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। চাপাই নবাবগঞ্জে কানসাটের উত্তরে গৌর নগরীর শহরতলিতে যে-মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে তা নির্মিত হয় আলাউদ্দিন হোসেন শাহর আমলে এবং রাজকোষের টাকায়। ঐ সময়কার উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে উপমহাদেশীয় এবং বৌদ্ধ বিহারসমূহের দুই-একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করলেও চারপাশের গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না সন্দেহ। স্থানীয় প্রাথমিক শিক্ষায় এইসব প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে মনে হয় না। পরবর্তীকালেও নবদ্বীপের বিদ্যাপীঠসমূহ ন্যায়রত্ন, তর্করত্ন, তর্কবাগীশ, বিদ্যাবাচস্পতি, চতুর্বেদী প্রমুখের ন্যায়শাস্ত্র থেকে শুরু করে ‘তৈলাধার পাত্র না পাত্রাধার তৈল’ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তর্কে মুখরিত হয়ে উঠলে চরপাশের মানুষ আতঙ্কিত ভক্তিতে নুয়ে পড়ত ঠিকই, কিন্তু তাদের শিক্ষাদীক্ষায় এঁরা কোনো প্রভাব ফেলতে চেষ্টা করেননি। গ্রামের পাঠশালার নিস্তরঙ্গ চেহারা স্থবির সমাজের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে অপরিবর্তিত রয়ে যায়।

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ না থাকলেও ধর্মীয় সংস্কারকদের মতামত প্রচারের তাগিদ কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষায় রক্তসঞ্চার করতে পারে। মানুষের সহজবোধ্য ভাষায় ধর্মসংস্কারকদের প্রচারের প্রবণতা থাকা স্বাভাবিক। জার্মানিতে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ প্রচারের সময় মার্টিন লুথার বাইবেলের জর্মন অনুবাদ সম্পন্ন করেন। জর্মন গদ্যের গঠনপর্বে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ভক্তির মোহ থেকে মুক্তি দিয়ে প্রত্যয়ের বন্ধনে মানুষকে বন্দি করার যে-উদ্যম তিনি নিয়েছিলেন তা সামন্তসমাজের অন্ধ-আচ্ছন্নতা থেকে মানুষকে বার করে এনে পুঁজিবাদ বিকাশে সাহায্য করে। জর্মন কৃষকদের সঙ্গে জর্মন শাসকশ্রেণীর দ্বন্দ্বে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা পালন করলেও নতুন মত স্থাপনের জন্য মার্টিন লুথারকে কাজ করতে হয়েছে সমাজের সর্বস্তরে। স্বভাবতই প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁকে মনোযোগী হতে হয়েছে। তাঁর সমসাময়িক — জন্মও মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বাংলায় শ্রীচৈতন্যও আত্মনিয়োগ করেছিলেন ধর্মের সংস্কারসাধনে। সেই সময়ে ধর্মব্যবস্থা ও রাজ্যশাসনের কর্তাব্যক্তিরা তাঁর ওপর প্রসন্ন ছিলেন না। তাঁর ওপর আস্থা স্থাপন করেছিলেন নিম্নবর্ণের ও নিম্নবিত্তের মানুষ। এই আস্থাকে সংগঠিত করলে মানুষকে নতুন প্রত্যয়ে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হত। সেই অবস্থায় মানুষকে শিক্ষিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। তাই প্রাথমিক শিক্ষাবিস্তারে চৈতন্য বা তাঁর অনুসারীদের আত্মনিয়োগ করবার কথা। কিন্তু তা হয়নি। কারণ, চৈতন্য তো কোনো প্রত্যয় কী বিশ্বাস প্রচারের উদ্যোগ নেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের ভেতর ভক্তিসঞ্চার। ন্যায়রত্ন আর তর্কবাচস্পতি আর বিদ্যাবাচস্পতিদের তর্কের ধূম্রজাল থেকে টেনে এনে মানুষকে তিনি আবদ্ধ করতে চাইলেন ভক্তির মোহের ভেতর। বিদ্যাচর্চা মানুষের ভক্তিকে কখনো গাঢ় করে তোলে না, বিদ্যাচর্চায় মানুষ ভক্তিতে গদগদ হয়ে নুয়ে পড়ে না, বরং বিশ্বাস ও প্রত্যয়ে ঋজু হতে শেখে। তাই যে মানুষকে ভাই বলে, একই কৃষ্ণের জীব বলে বুকে টেনে নিলেন তার শিক্ষালাভের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে তিনি রইলেন উদাসীন। তাঁর তৎপরতা তাই ভক্তিগদগদ ভালোবাসায় বাংলা কবিতায় প্রাণসঞ্চার করলেও সাধারণ মানুষের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ। প্রাথমিক শিক্ষার স্থবির চেহারা আগের মতোই রয়ে গেল।

তবে কেন্দ্রীয় রাজধানীর আশেপাশে উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাদানের রেওয়াজ মোগলদের সময়ও অব্যাহত ছিল। কিন্তু দূরবর্তী প্রদেশে এ ধরনের আনুকূল্য মেলেনি। মোগোলদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর কেন্দ্র আমাদের এখান থেকে মেলা পশ্চিমে, পুবের মুলুকে উঁচুনিচু সব শিক্ষাই সম্রাটের নজর থেকে বঞ্চিত। প্রাথমিক শিক্ষাও চলেছে ঘুড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সাম্রাজ্যের পতন, সাম্রাজ্যের উত্থান, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, রাজপরিবারে হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক পরিবর্তন এসব প্রাথমিক শিক্ষায় ভূমিকা পালন করতে পারল না। পাঠ্যসূচি যা ছিল তা-ই রইল। কিন্তু এ সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কিন্তু থেমে ছিল না, গ্রামে-গ্রামে গুরুমশাইদের পাঠশালার সংখ্যা দিনে-দিনে বেড়েই চলছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সুবে বাংলার মক্তব-পাঠশালা ও টোলের সংখ্যা বেশ কয়েক হাজার। এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা সমাজের হাতে ছিল বলে এরকম বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। তা ছাড়া, পয়সা বা ক্ষমতার জোরে কিংবা বিদ্যা ও বুদ্ধির কল্যাণে যে-ব্যক্তি রাজদরবারে সম্মানিত হয়েছে রাজপ্রদত্ত সম্মান তার কাছে যথেষ্ট বিবেচিত হয়নি, তার গৌরববৃদ্ধির জন্য তার নিজের গ্রামসমাজের স্বীকৃতি ছিল অপরিহার্য। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু পাঠশালা বা মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়। আবার অনেক মসজিদ ছিল লাখেরাজ সম্পত্তির ওপর, মসজিদসংলগ্ন মক্তবের সংখ্যাও কম ছিল না। ঐ সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত মুনাফা সংশ্লিষ্ট মসজিদ ও মক্তবের বাবদ খরচ করার শর্তেই খাজনা মাফ করা হলেও সম্পত্তির সিংহভাগ ভোগ হত ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে। দেবোত্তর সম্পত্তির হালও অন্যরকম হওয়ার কারণ ছিল না। কিন্তু এর মধ্যেও মক্তব, পাঠশালা ও টোলগুলো টিকে তো ছিলই, এমনকী সংখ্যার দিক থেকেও বাড়ছিল। সমাজে শিশুদের সম্পৃক্ত করার প্রবণতাই প্রধানত এইসব প্রতিষ্ঠান চালাবার পেছনে প্রধান প্রেরণা। সমাজের বিবর্তন শুখ, বিকাশের গতি ধীর, তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও অপরিবর্তিত রয়ে যায়। সমাজের প্রতি রাষ্ট্র উদাসীন, সমাজও রাষ্ট্রীয় তৎপরতায় আগ্রহ বোধ করে না। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এই উদাসীনতা প্রতিফলিত।

এই অনড় অবস্থায় আঘাত আসে ইংরেজ শাসন প্রবর্তনের পর। তাদের উপনিবেশ-স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে শোষণকর্মটি একটি সুসংগঠিত কাঠামোর ভেতর বিন্যাসের আয়োজন চলল। নিজেদের দেশের আদলে ইংরেজ এখানে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার, রাজস্ব প্রভৃতি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তৎপর হয়। তবে এখানে তাদের নীতি ও আদর্শ সম্পূর্ণ আলাদা। নতুন রাষ্ট্র এখানে সম্পূর্ণ মনোযোগী হল নিজেদের দেশ গ্রেট ব্রিটেন ও নিজেদের বাণিজ্যের স্বার্থরক্ষার দিকে। যেসব ব্যবস্থা নিজেদের দেশে নিয়োজিত ছিল রাজতন্ত্রের আবরণে একটি সামজকল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের জন্য তা-ই এখানে ব্যবহৃত হতে লাগল শোষণকে সংগঠিত করার কাজে। নিজেদের দেশে সামন্তবাদের অবসানের পর গড়ে উঠছে নতুন বুর্জোয়াসমাজ, আর এখানে তখন চলল কৃত্রিম একটি সামন্তগোষ্ঠী তৈরির পাঁয়তারা। নতুন ব্যবস্থা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে ইংরেজ সরকারের নীট মুনাফা হল একটি জমিদারশ্রেণী যাঁদের হাতে শাসনক্ষমতা বা বিচারক্ষমতা কিছুই রইল না, জমিদার নামটি অর্জন করলেও সামন্তপ্রভুদের ক্ষমতা থেকে এঁরা বঞ্চিত। এঁদের কেউ-কেউ রাজা, মহারাজা, নবাব, খানবাহাদূর, রায়বাহাদুর প্রভৃতি অলঙ্কারে ঝলমল করে উঠলেন; কিন্তু এ সবই গিল্টি গয়না; নবাব কী মহারাজা তো দূর কা বাত, আমলাদের ক্ষমতাও এঁদের দেওয়া হয়নি। ক্ষমতা কী অধিকার না-পেয়ে এঁরা যা পেলেন তা হল লুণ্ঠনের সুযোগ। প্রকৃতপক্ষে এঁরা হলেন সরকারের খাজনা আদায়ের ঠিকাদার, বেতনের বদলে তাঁরা পান কমিশন, তবে কমিশনটা যে যেভাবে পারুক আদায় করুক তাতে সরকারের কিছু এসে যায় না। এই স্বাধীনতা, বরং বলা যায়, এই সুযোগ পেয়ে প্রজার রক্ত নিংড়ে নেওয়ার কাজে এঁরা সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। তবে বেতনভূক খাজনা আদায়কারীদের সঙ্গে এঁদের তফাত এই যে এঁরা এই কাজে বহাল হয়েছিলেন বংশপরম্পরায়। তাই শোষণের মাত্রা ক্রমাগত না-বাড়িয়ে এঁদের আর গত্যন্তর রইল না। কারণ, দিনে দিনে বংশবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এঁদের চাহিদা বাড়ে। ইংরেজ মনিবকে নকল করতে গিয়ে জীবনযাপন যেভাবে করতে হয় তাতে খরচ হয় মেলা। ছেলেমেয়েরা থাকতে চায় শহরে, তাদের জীবন বিলাসবহুল। এঁদের খরচ জোগাতে গিয়ে গ্রামের প্রজারা একেবারে সর্বস্বান্ত হতে লাগল। প্রথম বাঁড়াটা সরাসরি পড়ল চাষির ঘাড়ে। জমিদারদের নায়েব গোমস্তারা বলত ‘চাষি বিনা কোই দাতা নেহি, জুতা বিনা উও দেতা নেহি’। চাষির চেয়ে বড় দাতা কেউ নেই, আবার পাদুকা প্রহার ছাড়া তার কাছ থেকে আদায় করাও কঠিন। এই শেষ কম্মটি করতে জমিদারবাবুদের জুড়ি ছিল না। নিরন্ন কৃষক মহাজনের কাছে ঘটিবাটি বন্ধক রেখে গোরু বেচে জমিদারের চাহিদা মেটাত। আবার বিলাতি সামগ্রীর অবাধ আমদানির ফলে ধস নামল গ্রামের কুটিরশিল্পে : তাঁতি, কামার, কুমার, ছুতোর সবাই নানাভাবে আর্থিক মার খেতে লাগল। নতুন সমাজপতি জমিদাররা এই ধস ঠেকাতে আগ্রহী নন, তাঁরা বরং বিদেশি সামগ্রী ব্যবহারে নিজেরাও আগ্রহী। বিদেশি মনিবের পক্ষে খাজনা আদায়ের কাজটুকু করতে গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁদের রাখতে হল বইকী, কিন্তু একপুরুষ যেতে-না-যেতে তাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করলেন শহরে। বড়বাবু মেজবাবু পুজোপার্বনে বৌরানিদের নিয়ে গ্রামের চকমেলানো দালানে পদার্পণ করতেন তো তাঁদের খাই মেটাবার দায় বইতে হত এই অর্ধাহার-অনাহারে ক্লিষ্ট কালোকিষ্টি চাষাভূষোদেরই। নতুন সমাজপতিদের দায়িত্ব না থাকায় সমাজ ক্রমে অনাথ এবং তাঁদের শোষণে ক্রমে রিক্ত হতে লাগল। এইভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল সামাজিক প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে লাগল। অ্যাডামের রিপোর্ট অনুসারে বাংলার প্রতি গ্রামে একটি এবং কোথাও কোথাও একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব ছিল উনিশ শতকের শুরুতেও। বিভিন্ন সরকারি দলিল ও মিশনারিদের প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ম্যাক্সমুলার জানান যে, বাংলা প্রদেশে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮০,০০০। সামাজিক ভাঙনের সঙ্গে এই সংখ্যা দ্রুত কমে আসতে থাকে।

ওদিকে গ্রামে রাষ্ট্রের ভয়াবহ অস্তিত্ব হাড়ে হাড়ে অনুভব করা যাচ্ছে বলে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় তার নিয়ন্ত্রণ আশা করা স্বাভাবিক। কিন্তু তা হল না।

এর মানে এ নয় যে, নতুন সরকার শিক্ষাবিষয়ে একেবারে উদাসীন ছিল। শাসন, পুলিশ, রাজস্ব, বিচার প্রভৃতি ব্যবস্থার সঙ্গে একটি শিক্ষাব্যবস্থা গঠনের দিকেও তারা তৎপর হয়। এদেশে এই প্রথমবারের জন্য একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ চলে। হান্টার, ওয়ার্ড, অ্যাডাম প্রমুখ তাঁদের প্রতিবেদনে এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা সম্বন্ধে তথ্য, মতামত ও সুপারিশ রেখে গেছেন। ইংল্যান্ডের বিশিষ্ট হুইগ নেতা পার্লামেন্টারিয়ান, ঐতিহাসিক ও কবি টমাস ব্যাবিংটন মেকলের ওপর এখানকার শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

মেকলের আগেই ‘হিন্দু কলেজে’ পাশ্চাত্য শিক্ষাদান প্রচলিত হয়েছে, ‘মাদ্রাসা আলিয়া’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মেকলের প্রতিবেদনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জেলাশহরগুলোতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের কাজ শুরু হয় এবং গত শতাব্দীর প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই সবগুলো জেলা একটি করে এই ধরনের স্কুল লাভ করে। এরপর কয়েকটি সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে উচ্চশিক্ষা প্রচলনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৮৫৭ সালে সমগ্র দেশে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন এলাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, পরীক্ষাগ্রহণ, শিক্ষক নিয়োগের নিয়মবিধি নির্ধারণ প্রভৃতি দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করা হয়। দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ভার এভাবে রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত হল।

তাঁর প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির যথোচিত প্রয়োগের ফলে যে তাঁদের ঔপনেবিশিক স্বার্থ অর্জিত হবে এ সম্বন্ধে মেকলে নিশ্চিত ছিলেন। তিনি মনে করতেন এই শিক্ষাব্যবস্থা এখানে অনেক কালো সাহেবের জন্য দেবে। গায়ের রঙ পালটানো না-গেলেও নতুন শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকেরা ইংরেজ স্বার্থ উদ্ধারে আত্মনিয়োগ করবে বলে মেকলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এই শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে ইংরেজ স্বার্থ সাধনেই নিয়োজিত হয়েছে এ-কথা কিন্তু ঠিক নয়। পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের পর নতুন মধ্যবিত্তের একটি অংশ অন্তত সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন প্রভৃতি চর্চায় উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। এঁদের হাতে বাংলা গদ্যের বিকাশ ঘটল, বাংলা গদ্য হয়ে উঠল সৃজনশীল রচনা ও উচ্চচিন্তা প্রকাশের সফল বাহন। বাংলা কবিতা মুক্ত হল পয়ারের একঘেয়ে বন্ধন থেকে। চাকরিবাকরিতে বাঙালি ভদ্রলোকেরা একটু একটু করে আসন পেতে লাগলেন। পাশ্চাত্যের আধুনিক বিদ্যার প্রভাবে ভদ্রলোকদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মবিশ্বাসে চিড় ধরল। এমনকী পৌত্তলিকতাকে আঘাত করে যে-ব্রাহ্ম ধর্মমত প্রচারের আয়োজন চলে তার অবলম্বন উপনিষদ হলেও প্রেরণা এসেছে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও আরও পাশ্চাত্য রুচি থেকে। ফলে একটি এলিট-গোষ্ঠী তৈরি হল এবং মেকলে এইটিই চেয়েছিলেন। এই নতুন গোষ্ঠী দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ থেকে দূরে রইলেন তো বটেই, এমনকী নিজেদের ভিন্ন জাতের মানুষ বলে গণ্য করতে লাগলেন। বাঙালিদের সম্বন্ধে মেকলে যে কী নিচু ধারণা পোষণ করতেন তা মর্মে মর্মে বোঝা যায় ক্লাইভের ওপর লেখা তাঁর প্রবন্ধটি পড়লে। তাঁর শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে এই জঘন্য জাতের একটি ছোট ভাগের হিতসাধন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কি না জানি না, তবে এ দিয়ে তৈরি ছোট একটি অংশকে যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে এ-ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। এই দূরদর্শিতা নিঃসন্দেহে তাঁর বিজ্ঞ ঐতিহাসিক ও বুর্জোয়া রাজনৈতিক মেধার পরিচয় বহন করে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা সম্বন্ধে তাঁর সুপারিশ ও মন্তব্য থেকে মেকলের নিম্নমানের কবিসুলভ চালিয়াতি ধরা পড়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, নিম্নবিত্তের মানুষের শিক্ষাদানের ভারটা তাঁরা অনায়াসে এই নতুন এলিটশ্রেণীর হাতে ছেড়ে দিতে পারেন। এখানে শ্রেণী কথাটাই তিনি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু দেশবাসী থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত শিক্ষালাভ করে এই শ্রেণী তাদের জন্য মাথা ঘামাবে কেন? না, তাঁরা মাথা ঘামাননি। এঁরা কোনো জাতীয় বুর্জোয়ায় রূপান্তরিত হননি যে গোটা জাতের ন্যূনতম উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদের মস্ত উত্তরণকে সম্পর্কিত করে ভাবতে পারবেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষাব্যবস্থা এমন একটি শ্রেণীর জন্ম দিল যে কোনো-না-কোনোভাবে দেশবাসীর নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী অংশকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা তাঁদের স্বভাবে পরিণত হল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো সংবেদনশীল চিত্তের মনীষীর মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ করি। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তিনিই এসেছিলেন গরিব ঘর থেকে, আক্ষরিক অর্থে কষ্ট করে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং জীবনের শেষদিন অবধি কলকাতার এলিটদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে গেছেন। তো এহেন বিরল ব্যক্তিত্বও দেশবাসীর সবাইকে শিক্ষা দেওয়ার আয়োজনে আপত্তি করেন যে সর্বজনীন শিক্ষা কাম্য হলেও ব্যয়বহুল বলে তা প্রবর্তন করার প্রচেষ্টা বাস্তবোচিত নয়। পৌত্তলিকতার কুসংস্কার থেকে মানুষকে উদ্ধার করার লক্ষ্যে আত্মনিয়োজিত ব্রাহ্মদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ ছিল কেবল ভদ্রলোকদের মধ্যেই।

সমাজপতিদের উদাসীনতায় অনাথ এবং সমাজপতিদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শোষণে রিক্ত হয়ে গ্রামের সমাজ ভেঙে পড়ল, সঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়ল প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা ও শ্ৰেণী সম্পর্ক বইতে সৈয়দ শাহেদুল্লাহ্ লক্ষ করেন, ‘পাঠশালা যেখানে টিকে থাকল সে কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্বে থাকল— ক্ষীণতর ও দীনতর রূপে। দেশি বিদেশি শোষকদের নৃশংস লুঠতরাজ সত্ত্বেও কোথাও কোথাও গ্রামের পাঠাশালা টিকে থাকল এ শুধু শোষিত-লুণ্ঠিত কৃষকদের শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠার পরিচায়ক’।

মক্তব ও টোলের শিক্ষা তো নতুন এলিটদের স্বীকৃতিই পায়নি, আরবি-ফারসি কিংবা সংস্কৃত পণ্ডিতদের অশিক্ষিত বা বড়জোর অর্ধশিক্ষিত লোক বলে গণ্য করা শুরু হল। আর পাঠশালার শিক্ষকগণ হলেন ভদ্রলোকদের করুণা ও কৌতুকের পাত্র। ১৯১২/১৩ সালেও চাষির ছেলে সীতারামের পাঠশালার শিক্ষক হবার আকাঙ্ক্ষা তার বাপের সানন্দ অনুমোদন পায়নি। পাঠশালা করতে গিয়ে ভদ্রলোকদের হাতে সীতারামের হেনস্থাটা হল, শিক্ষাদান অব্যাহত রাখতে তার যে কী বৈরী অবস্থার মধ্যে পড়তে হল সন্দীপন পাঠশালা উপন্যাসে তার বর্ণনায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এতটুকু অত্যুক্তি করেননি।

তবু এর মধ্যেই চাষিদের শিক্ষাদানের কথা বলা হয়েছে বইকী। লর্ড কার্জন ভাইসরয় হিসাবে অনুভব করেছিলেন যে অধিক খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে হলে চাষিকে প্রাথমিক শিক্ষার জ্ঞান দেওয়া উচিত। কিন্তু এজন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হল না। চাষিকে লেখাপড়া শেখালেই তার চোখ খুলে যাবে, তাকে ঠকানো কঠিন—এই গভীর উপলব্ধি থেকে তাকে শিক্ষাদানে সবচেয়ে প্রবল বাধা আসে দেশি ভদ্রলোকদের কাছ থেকে।

এই শতাব্দীর প্রথম থেকে ক্ষীণভাবে হলেও প্রাথমিক শিক্ষাবিস্তারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব হতে থাকে। রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হলে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দানা বাঁধে এবং ক্ষুব্ধ মানুষ নিজের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার লক্ষ্যে আয়ের ওপর করধার্যের প্রস্তাব করেন গোপালকৃষ্ণ গোখলে। এই প্রস্তাবের সক্রিয় বিরোধিতা করা হয় বাংলা থেকে। ব্যাপারটা এমন বিশ্রী পর্যায়ে পৌঁছয় যে একটি সাম্প্রদায়িক চেহারা নেওয়ার উপক্রম ঘটে। সৈয়দ শাহেদুল্লাহ্ তাঁর বইতে এ নিয়ে আলোকপাত করেছেন। চাষিদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান অনুপাত প্রায় সমান সমান হলেও জমিদারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন হিন্দুসম্প্রদায়ভুক্ত। শিক্ষাপ্রদানে জমিদারদের অস্বীকৃতিকে মুসলমান নেতারা তাঁদের সম্প্রদায়ের শিক্ষার ক্ষেত্রে হিন্দুদের বিরোধিতা বলে প্রচার করলেন। ১৯০৮ সালে বগুড়ায় অনুষ্ঠিত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে এই কর আরোপের জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলা হয়, হিন্দুরা রাজি না হলে কেবল মুসলমানরাই এই কর দিতে প্রস্তুত। সাম্প্রদায়িক হিন্দু নেতারাও বলতে লাগলেন যে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য বর্ণভুক্ত অধিবাসীদের শতকরা একশো ভাগই শিক্ষিত, এই কর প্রবর্তন করলে লাভবান হবে নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমান। সুতরাং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ওপর এই করপ্রয়োগ অন্যায়। ব্যবস্থাপক পরিষদে এই নিয়ে যে তর্ক চলে তাতে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে আপত্তি জানিয়ে কয়েকজন সদস্য এমন আচরণ করেন যা কেবল গণবিরোধী নয়, বরং সামন্ত কী বুর্জোয়া দৃষ্টিতেও অত্যন্ত অমার্জিত ও অশোভন।

কিন্তু দেশ তো এইসব নেতাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল না। রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে, মানুষ সচেতন থেকে সচেতনতর হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের পর এখানে মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটে ব্যাপকভাবে। অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলন বাংলার নিভৃত গ্রামেও সাড়া তোলে। গান্ধি, মতিলাল নেহরু, চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখ নেতা ঘরে-ঘরে মানুষের প্রিয় ব্যক্তিত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হন। গ্রামের ভাঙাচোরা পাঠশালাগুলোতেও বিদেশিশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ রূপান্তরিত হতে থাকে রোষে। মানুষের শিক্ষালাভের স্পৃহা যেভাবে বাড়তে থাকে তাতে এলিটশ্রেণীভুক্ত নেতৃত্ব আর উদাসীন থাকতে পারলেন না। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি অনুকূল হস্তক্ষেপের দাবি উঠতে লাগল।

১৯২৯ সালে হার্গোট কমিশন প্রতিবেদনে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার করুণ চিত্র প্রকাশ করেন। সেখানে এ তথ্যও প্রকাশিত হয় যে, এর আগের দুই দশকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়েনি এবং সাক্ষরতার হার অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এর পরের বছর বঙ্গীয় পল্লী প্রাথমিক শিক্ষা আইন গৃহীত হয়, এই বছরেই প্রাথমিক শিক্ষা তত্ত্বাবধানের উদ্দেশ্যে জেলাগুলোতে জেলা স্কুল বোর্ড গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা বোর্ড ও মিউনিসিপ্যালিটির মতো এটি স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান ও মিউনিসিপ্যালিটি এলাকার বাইরে যাবতীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণের ভার পড়ে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর। জেলা স্কুল ইনসপেকটারের একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো নিয়মিত পরিদর্শন করতেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হত সরকারি ট্রেজারি থেকে, তবে স্কুল বোর্ডের মাধ্যমে। শিক্ষকদের বেতন ছিল খুব কম, সরকারি অফিসের পিওনদের বেতনও তার চেয়ে বেশি। শিক্ষকদের প্রায় সবাই অন্য কোনো পেশার সঙ্গেও জড়িত থাকতে বাধ্য হতেন, এঁদের বেশির ভাগই কৃষক পরিবারের লোক। মোটামুটিভাবে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে গেলেও প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি সরকারের উদাসীনতা অব্যাহত রইল। শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ প্রথম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে তারপর বাপের পেশায় নিয়োজিত হল। তবে পাঠ্যসূচি গোটা দেশ জুড়ে অভিন্ন রাখার আয়োজন চলল।

১৯৪৪ সালে সার্জেন্ট কমিশন দেশের প্রাথমিক শিক্ষা সম্বন্ধে যথারীতি হতাশ মন্তব্য করেন। তাঁরা সুপারিশ করেন যে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক। ৪০ বছর অর্থাৎ ১৯৮৪ সালের মধ্যে এই প্রস্তাব যাতে কার্যকর করা হয় সে ব্যাপারে তাঁরা বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।

১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের প্রথম শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং দেশভাগের পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ২০০০ হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে ১৯৫৭ সালে জেলা স্কুল বোর্ডগুলো বিলোপ করা হয়েছে এবং প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব সরকার প্রায় সবটাই নিজের হাতে গ্রহণ করেছে। কিন্তু স্কুলগুলো বেসরকারিই রয়ে গেছে, কেবল সেগুলোর তত্ত্বাবধান করার কাজ সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে করানো হচ্ছে। শিক্ষকদের অবস্থার উন্নয়ন বা শিক্ষার্থীদের সংখ্যাবৃদ্ধি অথবা পাঠদানের মান উন্নয়ন কোনো ব্যাপারেই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এর প্রমাণ এই যে, এত বাগাড়ম্বর, এত হৈচৈ-এর পর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৯৬৩৩ থেকে ১৯৭০ সালে নেমে আসে ২৯০২৯টিতে। রাষ্ট্র যেখানে জনসংখ্যাবৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণাম নিয়ে মানুষকে ভয় দেখাবার জন্য প্রতি ঘণ্টার জন্মহার বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে বেড়ায়, বিদ্যালয়ের সংখ্যার ব্যাপারে তারা চুপচাপ ছিল কেন তা ঐ পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়।

সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনেও প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি যথোচিত গুরুত্ব পায়নি। বিশের দশকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ইংরেজ-প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা বর্জনের লক্ষ্যে দলেদলে ছাত্র স্কুল-কলেজ ত্যাগ করেছিল। কংগ্রেস নেতাদের উদ্যোগে বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেশে কয়েকটি ন্যাশনাল কলেজ, এমনকী ন্যাশন্যাল মেডিক্যাল স্কুল পর্যন্ত স্থাপিত হয়। তো ঐ সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক অল্প ব্যয়বহুল প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের কথা ভাবেননি কেন? জমিদারের প্রতিষ্ঠিত অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ এখন পর্যন্ত তাঁদের নিজেদের বা পুণ্যাত্মা পিতামাতার নাম বহন করে চলেছে। নিজেদের এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে তাঁদের উদাসীনতার কারণ কী? পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, কলেজের সংখ্যা বেড়েছে বেশ কয়েক গুণ। সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমে গেছে। রাজনীতিবিদরা এই বিষয়টিকে সামনে আনেননি কেন? এখন বিভিন্ন জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা সাধারণ কলেজ করার দাবিতে আন্দোলন হয়, এইসব আন্দোলনে শরিক হন স্থানীয় নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ। ঐসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁদের ছেলেমেয়ে কি লেখাপড়ার সুযোগ পাবে? নিজ নিজ এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন বা এর উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হয় না। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা কর্মসূচির দ্বিতীয় দফায় প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই কথা তো ইংরেজ আমল থেকে এমনকী ইংরেজদের আমলারাও বলে এসেছেন। প্রতিশ্রুতিরক্ষায় ইংরেজ আমলাদের সঙ্গে আমাদের রাজনীতিবিদদের কোনো পার্থক্য দেখা গেল না। ১৯৬২ সালে ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলনে প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষ কোনো গুরুত্ব পায়নি। এরপর ১১ দফা আন্দোলনের প্রথম দফাতেই কলেজগুলোকে বেসরকারি করার দাবি জানানো হয়। ১১ দফার কোথাও প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নেই, অথচ তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে চলেছে। কেউ-কেউ হয়তো মনে করেছেন যে, স্বাত্তশাসনই সবকিছুর সমাধান। স্বায়ত্তশাসন তো স্বায়ত্তশাসন, ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র পর্যন্ত অর্জিত হল। এরপর প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক অবস্থাটি কী দাঁড়িয়েছে দেখা যাক।

১৯৭৩ সালে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। এর মানে যাবতীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি প্রতিষ্ঠান, তবে রাতারাতি সব স্কুলকে সরকারি করা সম্ভব নয় কিংবা একটি পদ্ধতির ভেতর দিয়ে কাজটি করতে হয় বলে সম্পূর্ণ সরকারিকরণ করতে কয়েক বছর সময় নেওয়া হয়। এইসঙ্গে প্রস্তাব করা হয় যে প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) দেশে ৫০০০ নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরি করা হবে। ১৯৭৪ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন সুপারিশ করেন যে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮ বছর করা হোক এবং ১৯৮৩ সালের মধ্যে এই ৮ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা হবে।

রাষ্ট্রীয়করণের পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার, এর মধ্যে প্রায় আটত্রিশ হাজার হল সরকারি এবং বাকিগুলো বেসরকারি। এইসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র প্রায় দেড় কোটি এবং শিক্ষক দুই লাখের কাছাকাছি। ১৯৮১ সালে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র পরিদপ্তর স্থাপিত হয়, ১৯৮৭ সাল থেকে এটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলে পরিচিত। প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক তত্ত্বাবধান এই অধিদপ্তর করে থাকে, পাঠ্যসূচি প্রণয়নের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই ও অন্যান্য শিক্ষা-উপকরণ সরবরাহ করার দায়িত্ব অধিদপ্তরই পালন করে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মতো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগবিধি, চাকুরিবিধি এবং বেতন নির্ধারিত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের তুলনায় এই বেতন অনেক কম হলেও স্বীকার করতেই হবে যে গ্রামের অন্যান্য পেশাজীবী মানুষের তুলনায় তাঁরা এখন সচ্ছল। গ্রাম থেকে সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের লোকজন শহরের দিকে ধাবমান বলে গ্রামের ডাঙাচোরা সমাজে বিত্ত ও বিদ্যার অধিকারী বলে গণ্য করা হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। প্রাথমিক শিক্ষকের পদ লাভজনক বিবেচিত হওয়ায় কেউ-কেউ সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও এই চাকুরির আশায় যথাস্থানে অর্থ বিনিয়োগ করেন। বহুকাল ধরে এঁদের অর্ধাহারে জীবনযাপন করতে হয়েছে, তাঁরা ছিলেন ভদ্রলোকদের করুণা ও কৌতুকের পাত্র। আজ তাঁদের এই ভাগ্যোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই সরবরাহ প্রভৃতি দেশের প্রাথমিক শিক্ষা সম্বন্ধে আমাদের আশান্বিত করে তোলে।

কিন্তু স্কুলে ভরতি হওয়ার পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে কতজন শিক্ষার্থী? তাদের ড্রপ আউট বা ঝরে পড়ার হার এখন আতঙ্কজনক। ১৯৮৮ সালের জুন মাসের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশের সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩২২৪৪১২, সেখানে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে ১১১২৫৪৫ জন। এটা হল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হিসাব। বেসরকারি স্কুলগুলোতে এই হার আরও মারাত্মক। ইউনিসেফের সহযোগিতায় প্রস্তুত ভূমণ্ডল ও বাংলাদেশের সুদৃশ্য মানচিত্র এবং অন্যান্য শিক্ষা-উপকরণ খুব কমই ব্যবহার করা হয়। আসবাবপত্রের পরিমাণ বাড়লেও গ্রামের স্কুলগুলোতে প্রায় অর্ধেক ছেলেমেয়েকে ক্লাস করতে হয় মাটিতে বসে। শিক্ষা অধিদপ্তরগুলোর গৃহনির্মাণ ও মেরামতের জন্য ফ্যাসিলিটিজ বিভাগ তৈরি করা হয়েছে, প্রতি বছর এরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে চলেছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ের ঘর ভাঙা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে এগুলো একবার নষ্ট হলে সহজে মেরামত হয় না বললেই চলে। একই কামরায় একাধিক ক্লাস হতে দেখা যায় প্রচুর স্কুলে। পুরনো জেলাসদরগুলোতে এবং নতুন জেলাগুলোর কোনো কোনোটিতে জিপগাড়ি রয়েছে, ফ্যাসিলিটিজ এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জেলা অফিসের কাজের জন্য সেগুলো বরাদ্দ করা হলেও ভেতরের গ্রামগুলোতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের আগ্রহ কম।

সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানের দ্রুত অবনতি। গোটা শিক্ষার মান অধঃপতনে যাচ্ছে বলে সবাই আক্ষেপ করে, কিন্তু এ নিয়ে তর্ক উঠতে পারে। এমনকী মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু পাঠ্যসূচি যা-ই হোক, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার সামগ্রিক মানের অবনতি ঘটছে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেগুলোকে প্রাইমারি স্কুল বলা হয়, যেসব স্কুলে দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা বিদ্যালাভ করে, ঐসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে।

উচ্চবিত্তদের কথা না-বললেও চলে, তাঁরা তো প্রায় বিদেশিদের পর্যায়েই পড়েন। উচ্চমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকী নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভরতি করতে চান না। এমনকী শহরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা শিক্ষয়িত্রী নিজের ছেলেমেয়েদের নিজের স্কুলে পড়ান না এরকম দৃষ্টান্তের অভাব নেই। এখন অভিভাবকদের লক্ষ্য কিন্ডারগার্টেন বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিচের ক্লাস। কেউ-কেউ মনে করেন যে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর প্রতি তীব্র আকর্ষণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি মানুষকে বিমুখ করে তুলছে। ধারণাটি ঠিক নয়। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয় এরকম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সম্প্রতি একটু বাড়লেও এদের সংখ্যা এখন পর্যন্ত বেশ কম এবং বৃদ্ধির হারও ধীরগতি। ঢাকা কি চট্টগ্রামে কয়েকটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল আছে, খুলনায় হয়তো থাকতে পারে। ক্যাডেট কলেজ বা কিন্ডারগার্টেনের মাধ্যম বাংলা। বিষয়গুলো বাংলাতেই পড়ানো হয়, তবে ইংরেজি একটি অবশ্যপাঠ্য বিষয় এবং ইংরেজির ওপর একটু জোরও দেওয়া হয়। অভিভাবকদের ধারণা এই যে ওখানে পড়লে ছেলেমেয়েদের ইংরেজির ভিত্তি পাকা হবে, পোশাক-পরিচ্ছদে তারা পরিপাটি এবং কথাবার্তায় স্মার্ট হয়ে উঠবে। এইসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া সম্বন্ধে সচেতন, এক প্রজা আগের শিক্ষিত অভিভাবকদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সতর্ক। এঁরা ছেলেমেয়েদের খাতপত্র সব দেখেন, কোথাও কোনো গোলমাল দেখলে পরদিন স্কুলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করেন, অনেকে মোটা বেতন দিয়ে গৃহশিক্ষক নিয়োগ করেন। এটা শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামে নয়, দেশের সব শহরেই, এমনকী উপজেলা সদরগুলোতে শিক্ষিত পরিবার সম্বন্ধে প্রযোজ্য। ঐসব নিম্নশহরেও আজকাল কিন্ডারগার্টেন স্কুল স্থাপনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দেখতে দেখতে হয়ে পড়ছে নিম্নবিত্ত অশিক্ষিত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ড্রপ আউটের হার দেখেই বোঝা যায় যে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে শেষ পর্যন্ত পড়ে না, আগেই ঝরে পড়ে। শেষ পর্যন্ত কায়ক্লেশে যারা টেকে তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মাধ্যমিক স্কুলের দিকে পা বাড়ায় না। মাধ্যমিক স্কুলে যে-কয়েকজন ঢোকে তাদের আবার অনেকে মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে না, আগেই কোনো-না-কোনো পেশায় ঢুকে পড়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের কেউ-কেউ কলেজেও ভরতি হয়, কিন্তু স্নাতক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় বা ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডাক্তারি পড়ছে এমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে তারা প্রায় নেই বললেই চলে। এখন কিছু আছে, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার যে-হাল তাতে আগামী এক দশকে প্রাথমিক বিদ্যালয় বা প্রাইমারি স্কুলে পড়া ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে কি না সন্দেহ।

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাইমারি স্কুলগুলোর এই অবস্থা কেন? নিজেদের ছেলেমেয়েরা পড়ে না বলে এইসব স্কুলের দিকে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মনোযোগ নেই। আবার শিক্ষিত পরিবেশ থেকে এখানকার শিক্ষার্থীরা আসে না বলে চৌকস ছেলেমেয়ে না-পেয়ে শিক্ষকরাও পাঠদানে উৎসাহ পান না। তাঁরা ঠিকমতো স্কুলে যান না, শিক্ষার উপকরণগুলো ব্যবহারে আগ্রহ বোধ করেন না। তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মতো শিক্ষাগত যোগ্যতা বা শ্রেণীগত অবস্থান অভিভাবকদের নেই। শিক্ষার্থীদের সাড়া এবং অভিভাবকদের চাপের অভাবে প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষণ পেয়েও শিক্ষকগণ পেশার গুরত্ বুঝতে পারেন না। যতই দিন যায়, অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ না হয়ে তাঁরা হতাশায় ক্লান্ত হতে থাকেন।

রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অধীনে আসার পর ব্যাপারটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। সমাজের তত্ত্বাবধানে যখন ছিল তখন ঐসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় সমাজের যে অধিকার ছিল এখন তা থাকার কথা নয়।

রাষ্ট্র এখন সমাজ তো বটেই ব্যক্তিরও অনেক ভেতরে ঢুকে পড়েছে। স্বামী-স্ত্রীর একান্ত কামরায় তার শাসন-প্রতিষ্ঠার আয়োজন চলছে, তাদের সন্তানের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ভার রাষ্ট্র নিজের হাতে নিয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতা বলে বিবেচিত। এজন্য ওষুধপত্র, সাজসরঞ্জাম এবং টাকাপয়সার জন্য সরকারকে খুব বেগ পেতে হয় না। পশ্চিমের দাতা দেশগুলো এই উদ্দেশ্যে দেদার টাকা ছাড়তে রাজি। তবু এখন পর্যন্ত উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ছাড়া ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা সাড়া তুলতে ব্যর্থ। হাজার বক্তৃতা দিয়ে, পোষ্টার বিলি করে এবং নগদ টাকা, লুঙ্গি ও শাড়ির লোভ দেখিয়ে নিম্নবিত্তের শ্রমজীবী মানুষকে পরিবার পরিকল্পনায় উদ্বুদ্ধ করা যাচ্ছে না। জীবনযাপনে যাদের কোনোরকম পরিকল্পনা নেই, ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নিরূপণে যাদের মাথাব্যথা নেই, সন্তান প্রজননে তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রত্যাশা করা অর্থহীন। পরিকল্পনার জন্য দরকার জীবনযাপনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাবার নিশ্চয়তা। আগামীকাল কাজ জুটবে কি না, পরশু কী খাবে, লুঙ্গিটা শাড়িটা ছিঁড়ে গেলে ফের কিনতে পারবে কি না এইসব তথ্য সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত থেকে পরিবার পরিকল্পনার মতো একটি ছক তৈরিতে মনোযোগী হওয়া কারও পক্ষে অসম্ভব। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাঁরা ছেলেমেয়ে পাঠান তাঁরা ঐ শ্ৰেণীভুক্ত মানুষ। তাঁদের বর্তমানকাল অসহায়, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে কী হবে সে সম্বন্ধে তাঁরা কিছুই জানেন না। এমন কোনো প্রস্তুতিও তাঁরা চারপাশে দেখতে পান না যাতে আজ না-হলেও একদিন না একদিন স্বাভাবিক জীবনযাপনের সম্ভাবনা আঁচ করা যায়। সুতরাং বইখাতা বিনা পয়সায় হাতে পেলে কিংবা এমনকী ছেলেমেয়েদের পড়তে দিলেই সরকারের লোক এসে হাতে দশটা করে টাকা গুঁজে দিলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখা তাঁদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দারিদ্র্যলাঞ্ছিত জীবন জিইয়ে রাখে যে-সমাজব্যবস্থা তাকে রাতারাতি ভেঙে ফেলা যায় না। কিন্তু দারিদ্র্য দূর করতে না পারলেও অন্তত সহনীয় করার আয়োজনের বদলে মানুষ কেবল লক্ষ করে যে অতি মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির পুরুষানুক্রমে ভোগের জন্য বিপুল বিশ্বসৃষ্টির উদ্যোগে রাষ্ট্র তাদের আরও দুর্বিষহ জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তখন কেবল প্রাণে বাঁচা ছাড়া তাদের আর কোনো আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা সম্ভব হয় না। চিকিৎসার মতো শিক্ষাও তাদের কাছে বিলাসিতা। রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণের দিকে দৃষ্টি না-দিয়ে তাকে কেবল নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় নানা ফন্দি আবিষ্কার করতেই নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করছে। এইসব ফন্দি খুঁজে বের করার জন্য মোটা বেতন দিয়ে আমদানি করা হয় বিদেশি বিশেষজ্ঞদের। পরিবার পরিকল্পনার মতোই প্রাথমিক শিক্ষাতেও বিদেশি টাকা আসছে। বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক, সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং ইউনেস্কো, ইউনিসেফ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় নানাভাবে অর্থ দিয়ে চলেছে। এসব সাহায্য কী ধরনের বিনিয়োগ তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে এইসব সাহায্যের সঙ্গে আসে শক্ত শক্ত সব শর্ত। বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে আমরা বাধ্য, সেইসব বিশেষজ্ঞ যে পরিমাণ টাকা নিয়ে যায় তা না হয় বাদই দিলাম, তাদের টাকা তারা নেবে এতে কার কী বলার আছে? এ নিয়ে কথা বলার মতো বুকের পাটা থাকলে ওদের ভিক্ষে ছাড়া চলার মতো শক্তি অর্জনের চেষ্টাই হয়তো করা হত। কিন্তু মুশকিল হল এইখানে যে এইসব বিশেষজ্ঞ আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের নামে কর্তৃত্ব করার ক্ষমতাটা হাতে তুলে নেন। রংবেরঙের নিরীক্ষায় ব্রতী হন তাঁরা, তাঁদের নিরীক্ষা স্পৃহার কঠিন দাম দিতে হয় দেশের লক্ষ লক্ষ নিরীহ শিশুকে। আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রাথমিক শিক্ষায় এক-একটি পদ্ধতি প্রচলনের উদ্যোগ নেন তাঁরা, প্রায় সবসময়েই এগুলো ব্যর্থ হয়, কিছুদিন পর এগুলো বাতিল করে নতুন প্রেরণায় নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য তাঁরা লিপ্ত হন নব পদ্ধতির উদ্ভাবনে। নিরীক্ষা স্পৃহায় উদ্বেল বিদেশি বিশেষজ্ঞরা দুনিয়া চষে নানারকম বাতিল শিক্ষাপদ্ধতি এনে হাজির করেন এবং সেগুলো এখানে প্রচলনের জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। প্রাথমিক শিক্ষায় নিরক্ষর দরিদ্র পরিবারের শিশুদের আকৃষ্ট করার জন্য স্থানীয় সমাজকে সম্পৃক্ত করা দরকার—এই কথাটি ঘোষণা করে তাঁরা একটি বিরল আবিষ্কারের গৌরব অর্জন করলেন এবং বিশেষ একটি পাঠদানপ্রথা প্রচলনের মাধ্যমে এই তত্ত্বপ্রয়োগের বিপুল আয়োজন চলল কয়েক বছর ধরে। না, নতুন কোনো স্কুল তৈরি হল না, দেশের কয়েকটি অঞ্চলে কিছু স্কুল বেছে নিয়ে মহা সমারোহে নতুন পদ্ধতির পাঠদান শুরু হল। অন্য একটি দেশে এই পদ্ধতি প্রচলনের চেষ্টা চলেছিল, সেখানে সুবিধা করতে না-পেরে বিশেষজ্ঞরা একটি ল্যাবরেটরি খুঁজছিলেন, বাংলাদেশে কিছু টাকা নিয়োগ করে শ’খানেক স্কুলে ল্যাবরেটরি বসালেন। কয়েক কোটি টাকা বেরিয়ে গেল জলের মতো, মোটা টাকা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নিরীক্ষা চালালেন, কয়েকজন নেটিভ শিক্ষাবিদ দিব্যি বিদেশ গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেন। আবার নিজেরাই মেলা টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করে দেখলেন যে ফলাফল শূন্য। একবার না পারিলে দেখ শতবার’ – সুতরাং ফের নতুন আর একটি পদ্ধতি খোঁজা। এবার ড্রপ আউটের গুপ্ত রহস্য আবিষ্কার করলেন আর-এক মনীষী। কী?—না, ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ফেল করে বলে স্কুল ছেড়ে গিয়ে বাপের সঙ্গে লাঙল চষে। প্রতিকার করতে গিয়ে প্রস্তাব করা হল বার্ষিক পরীক্ষা উঠিয়ে দাও, সবাইকে পাশ করিয়ে দিলেই ছেলেমেয়েরা আর স্কুল ছাড়বে না। তাতেও কিছু হয় না। ড্রপ আউট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত — এই সোজা কথাটি তাঁদের মহামূল্যবান ঝুনা করোটি ফুঁড়ে ঢোকাবে কে?

আমাদের দেশে দারিদ্র্য ও অশিক্ষা আকাশচুম্বী হলেও শিক্ষাদান ও শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি এখানে একেবারে কম নেই। আমাদের শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের অনেকেই নিজ নিজ পেশায় আন্তর্জাতিক মানের অধিকারী। বিদেশ থেকে আগত শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের তুলনায় এঁদের মান কম নয়। বরং, যতদূর জানি, কোনো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিদেশি বিশেষজ্ঞ এখানে আসেন না। পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু মনস্তত্ত্বের উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সেই যোগ্যতার বলে বিদেশি বিশেষজ্ঞ এখানে এসেছেন মানবশিশুদের লেখাপড়া নিয়ে নিরীক্ষা করতে। নিজের বোলচাল ও বাখোয়াজির জোরে এবং দাতা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছায় তিনি মাসে লক্ষ টাকা বেতন নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল তৎপরতা চালিয়ে গেছেন বেশ কয়েক বছর। প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে জড়িত এবং দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কখনোই গণনার মধ্যেই ধরা হয় না, প্রবীণ শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা প্রশাসকদের সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলা হয়, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ দাতাদের প্রভুত্ব সহ্য করবেন না বলেই এই ব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয় কাঠামোই এমনভাবে তৈরি হচ্ছে যে, যে-কোনো গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের সময় অযোগ্য ও আত্মসম্মানবোধশূন্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যাতে প্রভুদের যে-কোনো স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রশ্ন করার প্রবণতা না থাকে। একটি বুর্জোয়া সমাজকাঠামো গঠনের জন্যও দক্ষতা ও প্রজ্ঞা যে অপরিহার্য একবাটি এঁরা মানতে চান না দেখে সন্দেহ হয় যে এঁরা কি দেশে এখন ঔপনিবেশিক অবস্থা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর? দেশে সর্বশেষ শিক্ষা কমিশনের প্রধান মনোনীত হয়েছিলেন এমন একজন শিক্ষাবিদ যিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্বন্ধে নিজের অনভিজ্ঞতা ও অজ্ঞতার কথা প্রচার করতে গৌরব বোধ করতেন। আত্মমর্যাদার অভাবই ছিল তাঁর প্রধান যোগ্যতা এবং জীবনভর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পদলেহন করতে তাঁর আনন্দ ছিল সবচেয়ে তীব্র। কিছুদিন আগে সংস্কৃতি কমিশনের প্রধান নিয়োগের সময়ও এই যোগ্যতা প্রাধান্য লাভ করেছে।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিরীক্ষা স্পৃহা মেটাতে সাহায্য করার জন্য কিছু নেটিভ উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উচ্ছিষ্ট যে-পরিমাণ অর্থ দিয়ে এঁদের নিয়োগ করা হয় তাও আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের বেতনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এঁদের বেশির ভাগই অবসরপ্রাপ্ত আমলা, কয়েকজন মেরুদণ্ডহীন শিক্ষাবিদও মাঝে মাঝে সুযোগ পান। অবসর নেওয়ার পর মোটা মাসোহারা নিয়ে এঁরা গোটা প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে কখনো ঢেলে সাজান, কখনো ভাঙেন, ফের সাজান, ফের ভাঙেন। এঁদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ একই ভঙ্গিতে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দিব্যি লাঠি ঘুরিয়ে চলেছেন।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা কয়েকজন ধূরন্ধর বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও তাঁদের দেশি ধান্দাবাজ মিলে নষ্ট করে ফেলছে-এই কথাটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। দেশে প্রাথমিক শিক্ষক, বিদ্বান শিক্ষাবিদ ও দক্ষ শিক্ষা প্রশাসক কি অনেক বেশি শক্তি ধারণ করেন না? হ্যাঁ, করেন। এঁদের অনেকেই বর্তমান অবস্থায় সুখী নন, কেউ-কেউ বিরক্ত ও কেউ-কেউ অসহায়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পদপ্রান্তে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যখন লুটিয়ে পড়ে তখন শিক্ষাব্যবস্থাও তা থেকে রেহাই পায় না। দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক জড়িত রয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে। সাম্রাজ্যবাদ ঔপনিবেশিক শক্তি সংহত করার লক্ষ্যে একটি প্রধান আঘাত হানবে এখানেই। এখন তা-ই করছে। এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে গোটা প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে। রাষ্ট্রের স্বভাব, প্রকৃতি ও চরিত্রের সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষা যখন সমাজের হাতে ছিল তৎকালীন সামাজিক বৈশিষ্ট্য তার ওপর প্রতিফলিত হতে দেখা গেছে। আজ রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এই শিক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদ তোষণ-স্বভাব থেকে একে বিচ্ছিন্ন করা কি অসম্ভব নয়?

কঠিন, নিঃসন্দেহে দুরূহ কাজ, তবে অসম্ভব কিছুতেই নয়। এই শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই অনুভব করেন যে সমস্যাটি মূলত রাজনৈতিক। কিন্তু সমাজকাঠামোর পরিবর্তন যে-রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্পন্ন হয় তা সময়সাপেক্ষ। সকলের পক্ষে রাজনৈতিক সংগ্রামে সরাসরি অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে যে-কোনো ক্ষেত্রে কাজ করলে এই সংগ্রামকে সাহায্য করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষক ও এর নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত শিক্ষাবিদগণ সাম্রাজ্যবাদের সাহায্যের নামে নিয়ন্ত্রণের ফন্দি প্রতিহত করতে সচেষ্ট হবেন।

অনেকে অবচেতনভাবে এই প্রতিরোধ করে চলেছেন, সৎ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক এবং দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রশাসক হিসাবে তাঁরা এই উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ অবস্থাটি মেনে নিতে চাইছেন না। প্রাথমিক শিক্ষা সম্বন্ধে, এর উন্নয়ন ও ব্যাপক প্রচলন সম্বন্ধে সবচেয়ে ওয়াকিবহাল হলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রাথমিক শিক্ষকের পদটিকে লোভনীয় করা হয়েছে, কিন্তু আকর্ষণীয় করার চেষ্টা হয়নি। উপযুক্ত মর্যাদা না দিলে তাঁর ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ ঘটবে না। শিক্ষক নন—এমন ধড়িবাজ টাউট ধরনের নেতৃত্বে তাঁদের তথাকথিত ট্রেড ইউনিয়ন থেকে উদ্ধার করতে পারেন সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী এবং কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং রাজনৈতিক কর্মী।

কেবল প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষণ নিজ পেশা সম্বন্ধে তাঁদের সশ্রদ্ধ করতে পারে না। প্রাথমিক শিক্ষক হবেন আন্তন শেখবের কল্পনার সেই শিক্ষক যিনি গ্রামের মানুষের যে-কোনো সমস্যা নিয়ে ভাবতে পারেন, দৈনন্দিন জীবনে তাঁদের সংকটে তাঁদের মধ্যে আস্থা গড়ে তুলতে এগিয়ে আসেন।

প্রাথমিক শিক্ষায় যে-কোনো নতুন উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষকের মতামত সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সততা ও বিষয়ের গভীরে প্রবেশের ইচ্ছার প্রমাণ পাওয়া যাবে। তাঁকে সাহায্য করবেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসকগণ। নিজেদের নিষ্ঠা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যদি সচেতন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংকল্পের সাহায্যে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রয়োগ করা যায় তবে এদের প্রতিরোধ করা অবশ্যই সম্ভব। এই প্রতিরোধের সাহায্যে তাঁরা প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত গতি আনতে পারবেন, সমস্যার মূল উৎসের অনুসন্ধান করতে পারবেন। তাঁদের এই প্রতিরোধ ও অনুসন্ধান প্রাথমিক শিক্ষাকে গতি দেবে এবং এই কাজের সাহায্যে তাঁরা দেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রামে শামিল হতে পারবেন।