Course Content
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
0/22
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

স্মৃতির শহরে কবির জাগরণ

বাচ্চু তুমি, বাচ্চু তুই, চলে যাও, চলে যা সেখানে
ছেচল্লিশ মাহুতটুলীর খোলা ছাদে। আমি ব্যস্ত, বড়ো ব্যস্ত,
এখন তোমার সঙ্গে, তোর সঙ্গে বাক্যালাপ করার মতন
একটুও সময় নেই।

দুঃসময়ের মুখোমুখি : শামুসর রাহমান।

.

কিন্তু হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও বাচ্চুকে এড়ানো যায় না, শামসুর রাহমানের রচনায় সে নানাভাবে উঁকি দেয়। স্মৃতির শহর প্রধানত তারই কথা, শামসুর রাহমানের শৈশব ও বাল্যকালের স্মৃতিচারণ। নিজের ছেলেবেলার জন্য তাঁর তীব্র নস্টালজিয়া এবং তাঁর জন্ম ও বড় হয়ে ওঠার শহরের প্রতি অপ্রতিরোধ্য টান এই বই লিখতে তাঁকে একরকম বাধ্য করেছে। বইটির প্রায় শুরুতেই সেই সময়কার ঢাকার রাস্তা ও সরু অলিগলি, ঘোড়ার গাড়ি, ঘোড়া এবং ঘাসবিচালির গন্ধ ছড়ানো আস্তাবল আর রৌদ্রহাওয়ায় ঝিকিয়ে ওঠা-চাবুকের সানুরাগ উল্লেখ পাঠককে জানিয়ে দেয় যে আমাদের এই শহরের সঙ্গে কবির সম্পর্ক কেবল মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের নয়। অনেকদিনের গভীর সাহচর্য ও তীব্র ভালোবাসা প্রিয়জন সম্পর্কে স্নিগ্ধ ও ঝাঁঝালো কথাবার্তা বলতে তাঁকে নিঃসংকোচ করে তুলেছে।

শামসুর রাহমানের আবেগ খুব প্রবল ও টেকসই। মাহুতটুলির গলিতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় যে-লোকটি ল্যাম্পোস্টে আলো জ্বালাত আজ অর্ধ শতাব্দী পার করে দিয়েও তাঁর মনে সে একই দীপ্তিতে জ্বলছে। ‘সর্বাঙ্গে আঁধার মেখে’ যখন ‘চিবুক ঠেকিয়ে হাতে তিনি ‘প্রাত্যহিকের খাটি কতোটা তার হিসাব মেলান, ‘জীবনের পাঠশালা’ থেকে পালানো চিন্তায় তিনি যখন নিস্তেজ, তখন আলো দেখার স্পৃহার তিনি সেই বাতিওয়ালাকে কামনা করেন তাঁর কবিতায়। (‘শৈশবের বাতি জ্বলা আমাকে’ : বিধ্বস্ত নীলিমা)। আর স্মৃতির শহর বইতে বাতিওয়ালা উপস্থিত হয়েছে নিজের গৌরবে। একটি মইয়ের ধাপে দাঁড়িয়ে সে আলো জ্বালাচ্ছে, তার মুখমণ্ডল এখন একটি আলোর প্রদীপ। আস্তাবলের হাড়জিরজিরে ঘোড়া ও ঘোড়ার সহিস শামসুর রাহমানের কবিতায় আসে সময়বদলের কথা বলতে। (‘জনৈক সহিসের ছেলে বলছে’ : বিধ্বস্ত নীলিমা’)। আর স্মৃতির শহর-এ এসে দেখি যে সাত রওজার সেই ঘোড়াগুলো এবং তাদের সঙ্গী হাড্ডিসার লোকটি হয়ে উঠেছে হিরো। কবির কোনো বক্তব্য প্রকাশ করার জন্য তারা কেবল বাহনমাত্র নয়, এখানে আলোচ্য চরিত্র তারা, বিষয়বস্তুও তারাই। মাহুতটুলির পিঠেওয়ালি বুড়ি, আর্মানিটোলা স্কুলের মাঠ, বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে মেঘমালার রঙিন চলচ্চিত্র দেখা, গভীর রাত্রে নিস্তব্ধ গলিতে আলিজান ব্যাপারির খড়মের আওয়াজ, তারা মসজিদের গায়ে সূর্যের বিদায় নেওয়ার আয়োজন, মসজিদে এফতার খাওয়ার জন্য তীব্র ইচ্ছা—এসব তিনি আজও অনুভব করতে পারেন শৈশবকালের স্পন্দন দিয়ে। তাঁদের বাড়িতে কলের জলের ব্যবস্থা হওয়ায় ভিত্তির আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়-এ কি আজকের কথা? কিন্তু ভিত্তির জন্য বিরহকষ্ট তাঁর এখন পর্যন্ত টাটকাই রয়ে গেছে। তাঁর করোটি, তাঁর পাঁজর জুড়ে শৈশবকাল যেমন বাস্তু আসন পেতে বসেছে কার সাধ্য তাকে এতটুকু টলায়?

শামসুর রাহমানের কবিতার জায়গাজমির অনেকটা জুড়ে থাকে ঢাকা শহর। তিনি ঢাকার লোক, এখানেই বড় হয়েছেন, কিন্তু শহরকে তিনি দেখেন কখনো ‘প্রবাসী কিংবা প্রণয়ীর চোখে। এর কোনোকিছুই তাঁর চোখে একঘেয়ে হয় না, প্রবাসীর কৌতূহল এবং প্রেমিকের উৎকণ্ঠায় এই শহরকে নতুন নতুন পরতে উন্মোচন করেন তিনি। আমাদের এই বহুকালের শহরটি তার এঁদো বস্তি, জৈষ্ঠে পোড়া ও শ্রাবণে ভেজা ঠেলাগাড়ি, জনসভা, মিছিল, পার্ক, ল্যাম্পোষ্ট, ফুটপাথ—সব, সবই তাঁর কবিতায় ঘোরতরভাবে উপস্থিত। জীবনের স্তরে স্তরে প্রবেশ করতে, তার পাতালের কালি কুড়িয়ে আনতে, তার সকল রহস্যময়তা খুলে দেখার জন্য বারবার তিনি মাধ্যম করেছেন এই শহরকে। স্মৃতির শহর কিন্তু ঢাকাকে তাঁর বক্তব্যপ্রকাশের একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়নি, ঢাকা এখানে উত্তীর্ণ হয়েছে সম্পূর্ণ বিষয়বস্তুতে, ঢাকাই তাঁর বক্তব্য।

তবে ঢাকা এখানে সত্যি স্মৃতির শহর, এই শহরের শিরা-উপশিরায় বয়ে চলেছে তাঁর শৈশব। শামসুর রাহমানের কবিতায় রঙিন ও সুদূর শৈশবকাল এসে কঠিন বর্তমানকে করে তোলে কালো ও অবাঞ্ছিত। এই দ্রুতশ্বাস-সময়ে শৈশবের স্মৃতি বিব্রতকর। এগারো বছরের বাচ্চুকে দেখে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন। তাকে এড়াবার জন্য তাঁকে কত ফন্সিই-না করতে হয়। আর স্মৃতির শহর বইতে? গোটা বইয়ের প্রাসাদ জুড়ে গলি, উপগলি, রাস্তা, রাস্তার মোড়, পার্ক, স্কুলের মাঠ, মসজিদ, পুকুর, জনসভা, মিছিল—সব জায়গায় শ্রীমান বাচ্চুর একচ্ছত্র দাপট, এখানে সে রাজাধিরাজ। মাহুতটুলি লেন, পগোজ স্কুলের সিঁড়ি ও ক্লাসরুম, অরুণ, সুনীল, সূর্যকিশোর, আশরাফ, হোসেনি দালান, মহরম ও জন্মাষ্টমীর মিছিল—এরা হল এই মহারাজার সহচর সহচরী। এদের জন্য শামসুর রাহমানের মমতাবোধ অসাধারণ, এই ভালোবাসার কোনো তুলনা নেই। স্মৃতির শহর বইতে এই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে বেদনার মধ্যে। এদের সঙ্গে শৈশবকালের যোগাযোগটি তাঁর ছিঁড়ে গেছে। এই বিচ্ছেদ তাঁকে এমনভাবে আহত করে যে, দুঃখ ও বিষাদে তিনি একেবারে ভেঙে পড়েন।

সেইসঙ্গে ভেঙে পড়ে তাঁর লেখার গাঁথুনি, চিড় খায় রচনার ঋজু শরীরে। ছেলেবেলার জন্য এবং এই শহরের সেই সময়ের জন্য কাঁচা আবেগ শামসুর রাহমানকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে, বেদনা বা সুখের সঙ্গে যে ন্যূনতম দূরত্ব ব্যক্তিগত আবেগকে সর্বজনীনতা দান করে, যা না-হলে আর পাঁচজনের পক্ষে তা অনুভব করা যায় না, এই বইতে তার অভাব লক্ষ করি। বেদনা বা ভালোবাসা —যা-ই বলি না কেন—পাঠককে যদি স্পর্শ করতে হয় তো প্রকাশের জন্য আপাত-নির্লিপ্ততা অপরিহার্য। কোনো অভিজ্ঞতা বা কল্পনা-এই আপাত-নির্লিপ্ত বিবরণ থেকেই পাঠক সে সম্বন্ধে লেখকের আবেগকে ঠিক ঠাহর করতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা কী কল্পনা থেকে জাত বেদনা কী আনন্দপ্রকাশের সময় লেখক অশ্রু গোপন করতে না-পারলে তার আবেদন অনেকটাই নষ্ট হতে বাধ্য। দুঃখে ভারাক্রান্ত শামসুর রাহমান তাঁর বেদনার কথা বলতে কোথাও কোথাও একই কষ্টের পুনরুক্তি করেন। যেমন, আর্মানিটোলার পুরনো গির্জার ওখানে সূর্যকিশোরদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেশত্যাগী বন্ধুর জন্য তাঁর বেদনার কথা নানাভাবে বলতে বলতে বোধটাকে তিনি ভোঁতা করে ফেলেন। হোসেনি দালান তাঁর বুকে যে ভিজে ও ঠাণ্ডা হাহাকার জাগিয়ে তোলে তা বড় বেশি স্যাঁতসেঁতে। এখানে গেলে তাঁর কান্না কান্না লাগত এগিয়ে-পড়া বর্ণনার কল্যাণে এটা আমাদের কাছে একটি অপ্রয়োজনীয় তথ্যের বেশি কোনো মর্যাদা পায় না।

সরস্বতীর পায়ের কাছে রাজহাঁস দেখে তাঁর নিহত পরমপ্রিয় হাসছোড়ার কথা মনে পড়লে পাঠকমাত্রেই অভিভূত হয়ে পড়ে। কিন্তু হাঁসঘোড়ার কথা বলতে বলতে তাঁর রচনাও কান্নায় ভেঙে পড়বে কেন? গোশতের লাল সুরুয়াই তো তাঁর কষ্ট বোঝবার জন্য যথেষ্ট, সেখানে সেই কষ্টের সানুরাগ বিবরণ প্রায় বিলাপে পরিণত হয়েছে, ফলে অনুভূতির তীক্ষ্ণতা হারিয়ে গেছে। শামসুর রাহমানের একটি কবিতায় এই প্রসঙ্গটি এসেছে অনেক তীক্ষ্ণ হয়ে :

ক্ষুধার্ত প্রহরে
একদিন সহসা তার পালকবিহীন
কতিপয় লালচে ভগ্নাংশ
খাবার টেবিলে এলো ভয়ানক বিবমিষা জাগিয়ে আমার।

ছেলেবেলা থেকেই : এক ধরনের অহংকার।

.

কাচের দোকানে ঝুঁকে বসে ছবি আঁকত যে নঈম মিয়া তার সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার বিবরণ খুব আকর্ষণীয়। শ্যাওলা-পড়া-দেওয়ালের মতো তার খোঁচা-খোঁচা দাড়িওয়ালা-গালের কথা পড়ি, তার কাশির কথা পড়ি আর লোকটিকে মন দিয়ে দেখতে পাই। কিন্তু প্রসঙ্গটির শেষভাগে এসে লেখক যখন বারবার বলেন, তাকে তিনি ভুলতে পারেননি, কিছুতেই ভুলতে পারছেন না, তখন বিষয়টি নেতিয়ে পড়ে এবং পাঠক তাকে ভুলতে পারবে না এরকম নিশ্চয়তা দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। স্মৃতির শহর প্রায়ই এরকম তরল ভাবালুতায় গড়িয়ে পড়ে, ফলে লেখকের সুখ ও বেদনায় সাড়া দেওয়া পাঠকের পক্ষে কঠিন। আবার এই একই কারণে ঢাকা শহরের একটি বিশেষ সময়কে জানবার সুযোগও এই বইটি দিতে পারে না।

কিন্তু শামসুর রাহমানের এই লেখাটি যে অসংলগ্ন বা তাঁর স্মৃতিমালা এলোমেলো তা কিন্তু নয়। বরং এই বইতে একটি সতর্ক স্কিম পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সঙ্গে গল্প বলা থেকে এর শুরু, গল্প বলা সাঙ্গ হলে ব্যাঙ্গমা দম্পতির উড়ে যাওয়ার মধ্যে লেখার ইতি। বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনা, দৃশ্য, অভিজ্ঞতা সবই খুব স্পষ্ট, পরস্পরের এলাকা ডিঙিয়ে যাবার স্মৃতিচারণসুলভ প্রবণতা এদের কম। কিন্তু এই আঁটোসাঁটো কাঠামোর ভেতর বুনট বড় শিথিল। আবেগের ভাবালুতাময় প্রকাশ তো আছেই, এ ছাড়া শামসুর রাহমানের গদ্যও এই শিথিল বিন্যাসের একটি প্রধান কারণ।

শামসুর রাহমানের কবিতায় কথ্য গদ্যরীতির ব্যবহার যে সফল এ সম্বন্ধে প্রায় সবাই নিঃসন্দেহ। কথ্যভঙ্গি তাঁর কবিতাকে লাবণ্যময় ও স্বচ্ছন্দ করে। আবার পাশাপাশি তাঁর গদ্যে কাব্যের প্রভাবও বেশ স্পষ্ট। এই প্রভাব বেশির ভাগ সময়েই ভালো হয়নি। বাক্যগঠনে তিনি সাধারণ কথ্যরীতির কাঠামোটি ঠিক না রেখে প্রায়ই কবিতার ভঙ্গি নিয়ে আসেন। গদ্য তখন অস্বাভাবিক এবং কখনো কখনো অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। থিবসের কবি পিন্ডারের প্রসঙ্গে তিনি লেখেন ‘ঐ বাড়িতে বসে কত্ত কবিতা লিখেছেন তিনি, ঘুঙুরের মতো বাজিয়েছেন শব্দকে’। এই বাক্যে কবিতার প্রভাব খুব চোখে পড়ে, কিন্তু এতে কাব্যময়তার সৃষ্টি হয় না, বাক্য বরং এলিয়ে পড়েছে এবং পিভারের কাব্যচর্চার ব্যাপারটি গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে।

‘যেতাম নতুন কাপড় পরে আব্বার সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে। সারি সারি লোক দাঁড়িয়ে পড়তো খোদার দরবারে, সবাই একসঙ্গে ঝুঁকে সেজদা দিতো মসজিদের ঠাণ্ডা মেঝেতে। -নাক, কপাল, হাতের তালু আর পায়ের পাতা সেই ঠাণ্ডায় আদর খেতো কিছুক্ষণ। সুরা মুখস্থ করানো হয়েছিলো আমাকে। বেশ কয়েকটা সূরা জানা ছিলো আমার।’ উদ্ধৃত অংশের একটি বাক্যও কথ্য বাংলার রীতিতে লেখা হয়নি। রচনার একঘেয়েমি এড়াতে কিংবা বিশেষ কোনো কথার ওপর জোর দিতে মাঝে মাঝে এরকম বাক্য লেখা দরকার হয় বইকী। কিন্তু অনুচ্ছেদ জুড়ে বাক্যের এরকম বিন্যাস একটানা করে গেলে গদ্যের গঠন কি দুর্বল হয়ে পড়ে না?

কয়েক জায়গায় শিশু-পাঠকদের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপনের জন্য শামসুর রাহমান বিশেষ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছেন। এই প্রচেষ্টা কিন্তু সব জায়গায় সফল হয়নি। যেমন, ‘মজাদার শব্দ করে ঘোড়া ছুটতো দিগ্বিদিক’—এখানে ‘মজাদার’ কথাটি ঘোড়া ও বাক্য উভয়ের গতি শ্লথ করে দিয়েছে। কিংবা ‘তখন আমাদের এই চমৎকার দুনিয়ায় বেঁচে ছিলেন আলেকজান্ডার’—এই বাক্যে ‘চমৎকার দুনিয়া’ শুনতে বেশ স্মার্ট, কিন্তু এখানে এর প্রয়োগ কি সমর্থনযোগ্য? ওয়াল্ট ডিজনির জগৎকে চমৎকার দুনিয়া বলতে পারি, কিন্তু আমাদের জীবনযাপনের একমাত্র এবং প্রথম ও শেষ অবলম্বন পৃথিবীর প্রতি গভীর ভালোবাসা বোঝাবার জন্য এখানে ‘চমৎকার’ কথাটি কি একটু. জিল নয়?

‘শিউরে উঠেছিলাম। শিউরে উঠেছিলাম আমি, আমরা’। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ দেখে বিচলিত হওয়ার কথা বোঝাবার জন্য এই বাক্য লিখিত হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি যেমন নাটকীয়, তেমনি বড় সাজানো মনে হয়। একটি বালক যেন কথা না-বলে ডায়ালগ ছাড়ছে। একটি ক্ষুব্ধ ও শিহরিত বালকের যন্ত্রণা প্রকাশ করা এই বাক্যের সাধ্যের বাইরে।

‘বেড়ালের মত পা ফেলে আসতো সন্ধেগুলো। এই বাক্য দিয়ে শুরু হয়েছে মাহুতটুলির গলিতে সন্ধ্যাগমের দৃশ্যের বর্ণনা। অনুচ্ছেদের শুরুতেই এরকম একটি ব্যতিক্রমি বাক্য ও উপমায় পাঠকের খটকা লাগে। এই বাক্যের জন্য একটু প্রস্তুতি দরকার, নইলে এতে সায় দেওয়া কঠিন। গদ্যরচনায় ব্যবহৃত হয় বিষয়কে পাঠকের কাছে স্পষ্ট করার লক্ষ্যে। গদ্যের স্বচ্ছন্দ গতিতে উপমা কখনো বিঘ্নের সৃষ্টি করে না। কিন্তু স্মৃতির শহর-এ উপমার একমাত্র ভূমিকা হল বাক্যের সৌন্দর্যবৃদ্ধি। এই অলংকার যেন ভার হয়ে বসেছে বাক্যের শরীরে, বাক্য তাই কখনো কখনো ভারে নুয়ে পড়ে, এগুতে পারে না। এক এক জায়গায় এমন হয়েছে যে স্মৃতিচারণা করতে করতে স্বপ্নাচ্ছন্ন একটি পরিবেশ হয়েছে, এমন সময় উপমা এসে পাথরের মতো চেপে বসেছে পাঠকের ওপর। যেমন, স্কুলের বন্ধুদের সম্বন্ধে বলতে বলতে একটি মেজাজ তৈরি হয়ে আসছিল, সেই মুহূর্তে ‘নামগুলো যেমন মাণিকের আলো দিয়ে গড়া’ এই বাক্য মেজাজটিকে ছিঁড়ে ফেলে। ছেলেবেলার বন্ধুদের জন্য কষ্টবোধের প্রকাশ কিন্তু তাঁর কবিতায় অনেক স্বচ্ছন্দ, এখানে উপমা স্বাভাবিক, উপমা ব্যবহারের জন্য জায়গাটি যেন তৈরি করাই ছিল।

অরুন, সুনীল, সুবিমল, সূর্যকিশোর, তাহের,
শিশির, আশরাফ আজ কয়েকটি নাম, শুধু নাম,
মাঝে মধ্যে জোনাকির মতো জ্বলে আর নেভে।

ছেলেবেলা থেকেই : এক ধরনের অহংকার।

.

এখানে উপমাটি অর্থবহ, প্রয়োজনীয় ও তাৎপর্যময়। চিত্তে এইসব বন্ধুরা এখন উজ্জ্বলভাবে অবস্থান করে, কিন্তু তাঁর বর্তমানকালের জীবনযাপনে এদের কোনো ভূমিকা নেই—এই কথাটি কিন্তু অনুভব করা যায় উপমাটির জন্যই। সর্বোপরি এই উপমা কবিতার শরীরের সুসঙ্গত ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু স্মৃতির শহর-এর ঐ অংশে উপমাটি অপরিহার্যতা অর্জন করতে পারেনি। স্মৃতির শহর রচনার সচেতন পরিকল্পনার পরিচয় আরও পাই ঢাকা শহরের রাজনৈতিক ও সামাজিক তৎপরতা সম্বন্ধে একটু আভাস দেওয়ার প্রয়াসে। শায়েস্তা বার আমলে টাকায় আট মন চালের কথার পরেই ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের বিবরণ পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করে। মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রধান খাদ্যের তালিকায় আটার রুটির অন্তর্ভুক্তির কথা, দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের শহরে আসা এবং মানুষের দুর্বিষহ ক্ষুধার কথা সফলভাবে বলা হয়েছে।

লোকপরম্পরায় শুনে বা ইতিহাস পড়ে আমাদের জন্মের বহুকাল আগেকার ঘটনা আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতির অন্তরঙ্গতা অর্জন করে। শামসুর রাহমানের স্পর্শকাতর বুকে ঐতিহাসিক ঘটনা, ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব, ঐতিহাসিক বস্তু প্রভৃতি স্থায়ী চিহ্ন রেখে যায়। লালবাগ কেল্লার প্রসঙ্গ এমন স্বচ্ছন্দ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে যে, এই ঐতিহাসিক প্রাসাদটির জন্য পাঠকও হৃদয়ে উত্তাপ অনুভব করে। বড় কাটরার কথাও উল্লেখযোগ্য। নির্মাণের কালে এই অট্টালিকাকে কেন্দ্র করে মুঘল যুবরাজের স্বপ্ন ও সাধ এবং এর এখনকার হতশ্রী চেহারার কথা পাশাপাশি থাকায় দালানটি জড় পদার্থের অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা লাভ করেছে।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঢাকায় প্রায় বাৎসরিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। দাঙ্গা এই বইতে যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে লেখকের ক্ষোভও বেশ সোচ্চার। ধর্মান্ধ মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিহত করার জন্য শামসুর রাহমান বরাবরই উচ্চকণ্ঠ, স্মৃতির শহর থেকে জানতে পারি, শৈশব থেকেই তিনি এই অমানবিক ও পাশবিক শক্তিকে একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। তবে একটি কিন্তু আছে। এখানে বিষয়টি এসেছে বিবৃতির ভেতর। তা না-হয়ে এটা যদি তাঁর অভিজ্ঞতার মধ্যে আসে তো তাঁর স্মৃতিচারণের সঙ্গে যেমন খাপ খায় তেমনই পাঠককে আর একটু স্পর্শ করতে পারে।

স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা এই বইতে লেখা হয়েছে একটু পাঠ্যপুস্তকীয় রীতিতে। হয়তো এই কারণেই প্রসঙ্গটিকে মূল প্রবাহের বাইরের ব্যাপার বলে মনে হয়। আবার এর উপসংহারে ‘একবার বিদায় দে মা’ গানটির উল্লেখ আকস্মিক এবং অতিনাটকীয় বলে বেমানান। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন শামসুর রাহমানের কবিতার একটি অত্যন্ত পরিচিত প্রসঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা তাঁর কয়েকটি কবিতা মানুষের মুখে-মুখে ফেরে। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কবিস্বভাবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে কিন্তু সেই স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব লক্ষ করি।

এই বইতে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বরং উপস্থিত হয়েছে অনেক তীব্রতা নিয়ে। ঐ সময় দেশবাসীর রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে খাজা আবদুল গনির নবাব খেতাব লাভ করার ছোট ইতিহাসটি বইটির মূল্যবান অংশ। ঢাকা শহরের আদি অধিবাসীদের ওপর ঢাকার কাগজি নবাবদের দাপট ও শোষণ নিয়ে তিনি এখানে একটু আলোকপাত করতে পারতেন। এঁদের সম্বন্ধে এই বইয়ে তেমন কিছুই বলা হয়নি। ঢাকার আদি বাসিন্দাদের অসাধারণ কৌতুকবোধ, তাঁদের সহৃদয় আতিথেয়তা এবং গল্প বলার অপূর্ব আকর্ষণীয় ভঙ্গি—এসব কি লেখকের স্মৃতিচারণে থাকবার কথা নয়?

শেষ অধ্যায়টিতে শামসুর রাহমানের কাব্যচর্চার প্রস্তুতির কথা পাই, এইজন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছেলেবেলার তাঁর প্রিয় বই সম্বন্ধে কিছু তথ্য এখানেই প্রথমে পাওয়া গেল। তাঁর প্রিয় পাঠাগার, পাঠাগার গড়ে ওঠার গল্প, পাঠাগারে তাঁর আসা-যাওয়া প্রভৃতি বিবরণ শামসুর রাহমান এবং ঢাকা শহর সম্বন্ধে উৎসাহী সবাইকে আকর্ষণ করবে। দুবছরের বোন নেহারের মৃত্যুতে লেখা গদ্যরচনাটি — তা যতই কাঁচা হোক সংযোজিত হলে কবি হিসেবে তাঁর গড়ে ওঠার একটি স্তরের পরিচয় পাওয়া যেত। বইটি এখানে শেষ হলেই ভালো হত। অন্তত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর আশৈশব ভালোবাসা ঘোষণা করা কি আদৌ প্রয়োজনীয় বলে তিনি বিবেচনা করেন? বিশেষ করে তাঁর কবিতা লেখার সঙ্গে এই ঘোষণা প্রাসঙ্গিক হয় কী করে? মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগই কি মানুষের কবিতা লেখার প্রধান উৎস? যাঁরা সাহিত্যচর্চা করেন না মাতৃভাষার প্রতি তাঁদের ভালোবাসা কি কোনো অংশে কম? এই তিন লাইনের স্তবকটি একটি তরল নাটকের তৈরি করেছে এবং এতে পেশাদার রাজনীতিবিদদের জেল থেকে বেরিয়ে কিংবা মন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণ করে শহীদ মিনার পরিদর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

স্মৃতির শহর বইয়ের প্রধান আকর্ষণ শামসুর রাহমান নিজে। ১০৮ পৃষ্ঠার বইতে তাঁর কাব্যচর্চার কথা কোথাও উচ্চকণ্ঠে ঘোষিত হয়নি, কয়েকটি জায়গায় কেবল বিনীত উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁর ছেলেবেলার স্বভাবে ফুটনোনুখ একজন কবিকে অনুভব করি। বইটির সব জায়গায় লাজুক ছেলেকে দেখি, সে যা দেখে তাতেই তার অগাধ কৌতূহল। আবার নতুন কিছু ঘটলেই খুশিতে সে হৈচৈ করে ওঠে তা নয়; বরং লুপ্ত জিনিসের জন্য, প্রবাহিত সময়ের জন্য, পরিত্যক্ত কোনো কোনো প্রথার জন্য মনটা তার ভার হয়ে থাকে। সবই সে অনুভব করে মমতা ও বেদনা নিয়ে। মানুষের সুখে সে যতটা চাঙা হয়ে ওঠে তার চেয়ে অনেক বেশি ভেঙে পড়ে মানুষের দুঃখ-দুর্দশায়। এখানে রাস্তায়, গলিতে, ফুটপাথে, পার্কে, মসজিদে, স্কুলে, মিছিলে, মিটিঙে একটি বালককে আমরা কবি হয়ে উঠতে দেখি। এ-বই একটি বালকের কবি হয়ে ওঠার চালচিত্র, একজন কবির উন্মোচনের গল্প।

তাঁর স্মৃতির শহর ঢাকার কাছে তাঁর ঋণ অপরিশোধ্য, সেই কারণে আমরাও এই শহরের কাছে ঋণী। তাঁর কবিস্বভাবের অনেকটাই তৈরি করেছে এই শহর, এই শহরের স্বভাব তাঁকে প্রতিনিয়ত নাড়া দিয়ে চলেছে। ঘটনার আবেগে উদ্বেলিত আবার একই সঙ্গে ঘটনাসমূহের প্রতি উদাসীনতা তাঁকে কখনো আকৃষ্ট করে, কখনো আঘাত দেয়। কাব্যচর্চার অপেক্ষাকৃত পরবর্তী পর্যায়ে শামসুর রাহমানের একটি প্রধান প্রবণতা হল নানারকম স্বৈরাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধকে রূপ দেওয়া। এখানেও কিন্তু ঢাকা শহরের ভূমিকা মোটেও গৌণ নয়, দেশ যখন জ্বলে ওঠে লেলিহান শিখায় তার উত্তাপ প্রবলভাবে অনুভব করা যায় ঢাকা শহরেই। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংকল্প ঘোষণা করে রাজপথে, মিছিলে ছুটতে ছুটতে যে-কিশোর ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর বন্দুকের সামনে বুক পেতে শুষে নেয় বন্দুকের শক্তিকে তার শক্তির ওজন মেলে শামসুর রাহমানের কবিতায়। আসাদের রক্তমাখা শার্ট তাঁর কবিতায় ওড়ে বিদ্রোহের লাল পতাকা হয়ে। মৌলানা ভাসানীর সফেদ পাঞ্জাবি শান্তির নিশান নয়, বরং তাঁর বল্লমের মতো হাত বারবার ঝলসে ওঠে, পল্টনের মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি বিচূর্ণিত দক্ষিণ বাঙলার শবাকীর্ণ উপকূলের বার্তা দেন ক্রুদ্ধ কণ্ঠে। ১৯৭১ সালের ঢাকা কেবল একটি অবরুদ্ধ নগরী নয়, শামসুর রাহমানের কবিতায় তা শত্রুনিধনের সংকল্পে দৃঢ়চিত্ত সাহসী মানুষের জনপদ। স্বাধীনতার পর থেকেই স্বৈরাচারের নতুন চেহারাও তাঁর চোখ এড়িয়ে থাকতে পারেনি। সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত স্বৈরাচার প্রতিরোধে ঢাকা শহরে মানুষের আন্দোলন ও উত্থান তাঁকে উত্তেজিত করে আসছে, অনুপ্রাণিত করে আসছে স্বৈরাচারী সরকারের নির্যাতন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের নানারকম হিসাবনিকাশে। আন্দোলন স্তিমিত হলে এই ঢাকা শহরই হয়ে পড়ে সবচেয়ে নিস্তেজ। শামসুর রাহমানের কবিতায় ঢাকা নগরীর উত্তেজনা, সংকল্প, উত্থান এবং পাশাপাশি এর ক্লান্তি ও হতাশা ধরা পড়ে সবচেয়ে স্পষ্ট চেহারা নিয়ে। ঢাকা শহরের নিশ্বাসপ্রশ্বাস তাঁর কবিতায় অনুসৃত হয় নির্ভুল গতিতে। এই শহরের সঙ্গে তিনি হেঁটে চলেছেন ছায়ার মতো। স্মৃতির শহর-এ প্রকাশিত তাঁর শৈশবকালেও এর আভাস মেলে, মাঝে মাঝে আভাও দেখা যায়।