Course Content
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
0/22
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

চাকমা উপন্যাস চাই

চাকমা ভাষায় সাহিত্যের সঙ্গে আমার যোগাযোগ মোটে এক বছরের, তাও বাংলা অনুবাদের হাত ধরে। ভাসাভাসা ধারণা নিয়ে এ নিয়ে একটি প্রবন্ধ ফেঁদে বসা বেয়াদবির শামিল, এ-ধরনের কম ঘটান মত্ত মত্ত পণ্ডিত-সমালোচকরা, তাঁদের কাছে বিদ্যাচর্চা মানে ছুরিকাঁচি নিয়ে শিল্পীদের ময়নাতদন্তে নামা। কিন্তু আমি আমার মাতৃভাষায় তোতলাতে তোতলাতে গল্প-উপন্যাস লেখার চেষ্টা করি; কানা হোক, খোঁড়া হোক, সেগুলো আমার অনেক কষ্ট, অনেক সুখ, অনেক পুলক ও অনেক উত্তেজনার প্রকাশ; তাই ঐসব অজর, অক্ষর ও চোখে পিচুটি জমা মহাপণ্ডিতদের অত কঠিন কঠিন দায়িত্ব নেওয়া কি আমার পোষায়।

তবে আমি কোন সাহসে চাকমা সাহিত্য নিয়ে লিখি আমার সাহস হল চাকমা বন্ধুদের সঙ্গে দিনের পর দিন চিঠি লেখা আর চিঠি পাওয়া: বাংলায় তাদের কবিতা, গল্প, রূপকথা পড়া এবং চাকমা ভাষায় সেগুলো শোনা; তাদের সঙ্গে গল্প করা, ঝগড়া করা এবং আবার ভাব করার অভিজ্ঞতা। আরও আছে। কী? —সবচেয়ে বেশি সাহস পেয়েছি তাদের সঙ্গে পাহাড়ে, জনপদে, নদীতে, পাঠশালায়, বিহারে, গানের জলসায় এবং কবিতার আসরে খুব কাছ থেকে তাদের দেখে। কয়েক মাস থেকে আমার কেবলই মনে হচ্ছে চাকমাদের উপন্যাস চাই। চাকমা শিল্পীর লেখা চাকমা ভাষার উপন্যাস চাই; সেই উপন্যাসের বেশির ভাগ লোক চাকমা, তাদের বাড়ি রাঙামাটি কী খাগড়াছড়ি কী সুন্দরবনের কোনো পাহাড়ি জনপদে, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে তাদের বঞ্চনা, অপমান ও প্রতিরোধ এমন মিলেমিশে থাকবে যে একটি থেকে আরেকটি আলাদা করা যাবে না।

চাকমাদের পুরনো কাব্য উপাখ্যান ‘রামাধন ধনপুদি’র বাংলা অনুবাদ হয়েছে কিনা জানি না, আমি এক তরুণ চাকমা বন্ধুকে দিয়ে এর ছিটেফোঁটা সামান্য অংশ অনুবাদ করিয়ে নিয়ে পড়েছি, আর গল্পটা শুনেছি অনেকের মুখে। গেংগুলি বা কথকরা পুরুষানুক্রমে চাকমা জনপদে জনপদে এই উপাখ্যান সুরে আবৃত্তি করে বেড়ান। এটি ছাড়াও সমিল ছন্দে রচিত আরও অনেক কাহিনী গেংগুলিরা এখন আবৃত্তি করে বেড়ান। অনুমান করতে পারি যে, তাঁদের সৃজনশীল আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে চাকমা গাথার নতুন নতুন প্রসঙ্গ যুক্ত হয়, পুরনো কিছু-কিছু অংশ হয়তো ঝরেও পড়ে। তবে বড় ধরনের যোগ-বিয়োগ বোধহয় ঘটে না, কারণ পুরনো চাকমা গাথা তাদের গভীর ভালোবাসা ও ভক্তির সম্পদ, এর গায়ে বড় ধরনের চিড় ধরানো চাকমা গেংগুলির পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং যতই জনপ্রিয় হোক, আধুনিক চাকমা কি এই উপাখ্যানগুলোতে সম্পূর্ণ সাড়া দিতে পারেন?

বাংলায় চাকমা কবিতা পড়েছি অনেক, বাংলা অনুবাদ পড়ে ও মূল চাকমায় শুনে এটুকু বুঝি যে চাকমা কবিরা আজ ক্ষুব্ধ। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার দুর্যোগ ও নিজ দেশে পরবাসী হওয়ার অপমান তাঁদের কবিতাকে দিনদিন উত্তেজিত করে তুলছে।

আগে চাকমারা এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে গেছে জীবিকার তাগিদে; সেটা গৃহচ্যুতি তো নয়ই, এমনকী গৃহত্যাগও তাকে বলা যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের, আরও আগে সমগ্র চট্টগ্রামের, সমস্ত পাহাড় জুড়েই ছিল তাদের বাড়ি, চাকমারা ছিল মস্ত বড়, বিশাল বাড়ির বাসিন্দা। সব পাহাড়ই তাদের কোল দেওয়ার জন্য উনুখ; নিজেদের শরীর তারা উর্বর করে রাখত, একেকটি পাহাড় নিজের সমস্ত রস উজাড় করে দিয়ে এইসব শান্ত ছেলেমেয়েদের মুখে অন্ন তুলে দিত। পাহাড়ি ছেলেমেয়েরা পাহাড়ের স্নেহ নিংড়ে নিয়ে ফের পাড়ি জমাত অন্য পাহাড়ের দিকে। আবার এই ‘অন্য’ পাহাড়টিও তার দুগ্ধভারাক্রান্ত স্তন নিয়ে নীরবে তাকিয়েই থাকত, ছেলেমেয়েরা পা বাড়ায় সামনের দিকে আর সুখী পাহাড় একটুখানি ঘুমিয়ে নিয়ে ফের নিজেকে উর্বর করে সাজাতে তৈরি হয়। পাহাড় এই ছেলেমেয়েদের কী না-দিয়েছে? জুম চাষ করে তারা পাহাড়ের বুক থেকে তুলে এনেছে ধান, যব, নানা সবজি : পাহাড়ের বন থেকে পেয়েছে পশু, পাখি, আর কত রকমের ফল। আবার, ছেলেমেয়েদের পরনের কাপড়ের সংস্থানও হয়েছে পাহাড় থেকেই, পাহাড়ের কার্পাসে তাদের কাপড় তো হয়েছেই, এই তুলা দিয়ে রাজার খাজনাও মেটানো গেছে।

তাই এক পাহাড় থেকে আর-এক পাহাড়ে যাওয়া পাহাড়িদের গৃহত্যাগ নয়, বরং মায়ের এক স্তন থেকে আরেক স্তনে মুখ গুঁজে মাকে নিবিড় করে অনুভব করা। এই মায়ের বুক থেকে শিশুর মুখ উপড়ে ফেলার চক্রান্ত কিন্তু আজকের নয়। দুশো বছর আগে গোটা উপমহাদেশকে উপনিবেশে পরিণত করার দক্ষযজ্ঞের শিকার হয়েছে এই পাহাড়ি জাতিরাও। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে উপনিবেশদাবীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে নিয়োজিত হয়েছিল চাকমারা। ঐ সময়টি তো পূর্ব ভারতের সবটা জুড়েই বিস্ফোরণ : সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, ওয়াহাবি, ফরায়েজি। একই সময়ে কার্পাস মহলের জুমিয়ারা যে অন্যায় খাজনা দিতে অস্বীকার করে কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তার মহিমা ঘোষণা করতে আমাদের এত দ্বিধা কেন? দেশের ইতিহাসে তারা ঠাঁই পায় না কেন? দেশের এক কোণে থাকার কারণে তারা ইতিহাসেরও আড়ালে পড়ে যাবে? নাকি তাদের আড়াল করে রাখার চক্রান্তের অংশ হল অন্য জাতের কাছে তাদের ইতিহাস গোপন করা আর তাদের নিজেদের ইতিহাস চাকমাদের ভুলিয়ে দেওয়া? ফরাসি বিপ্লবের পর বলা হয়েছে, বিপ্লব তার নেতাদের খেয়ে ফেলে। এখানে দেখি, বিপ্লবের নেতাদের বংশধররা লুকিয়ে রাখেন পূর্বপুরুষের শৌর্যের কাহিনী। সাম্রাজ্যবাদের তোষণে নিয়োজিত হয়ে জাতির ইতিহাস মুছে ফেলতে তাঁরা তৎপর হয়ে ওঠেন।

এতে ইতিহাসের ঘটনা হয়তো চাপা পড়ে, নায়কদের নাম ভুলে যায় মানুষ, ফন্দিবাজ পেশিশক্তির কাছে মাথা না-নুইয়ে নিজেদের তুলার স্তূপে আগুন জ্বালাবার কথাও কেউ মনে রাখে না। কিন্তু সেই আগুন নেভে না। ধিকিধিকি করে তা জ্বলতে থাকে চাকমা রক্তের ভেতরে। তাদের ওপর একেকটি বা এলে তাই লাফিয়ে ওঠে দীপ্ত শিখায়।

উপমহাদেশের রাজনীতি থেকে পাহাড়িদের আড়ালে রাখার যত চেষ্টাই করা হোক, এর ফল থেকে তারা রেহাই পাবে কেন? দেশ ভাগ হয়, দফায় দফায় দেশ স্বাধীন হয় আর চাকমাদের ঘরে লাগে নতুন নতুন ধাক্কা। গোটা দেশে আলো জ্বালাবার জন্য তাদের বাড়িঘর ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্ধকার পানির নিচে। বাঁচার জন্য তারা চলে যায় আরও ভেতরে আরও আড়ালে। বাঁচার লড়াই করতে করতে কষ্টে, দুর্যোগে ও অপমানে নিজেদের পরিচয় নিজেদের কাছে স্পষ্ট হয়। তারা উদ্যোগ নেয় সেই পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার আয়োজনে। তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন রাষ্ট্রের কাছে গণ্য হয় স্পর্ধা বলে। এই স্বপ্ন মুছে ফেলার আদেশ তারা প্রত্যাখ্যান করলে পেশিশক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ওপর। আবার নতুন করে গৃহচ্যুত হওয়ার পালা। তাদের রক্তে পাহাড়ের রঙ পালটায়, পেশিশক্তির কাছে তাদের মেয়েরা ভোগ্যবস্তুর বেশি মর্যাদা পায় না। আবার তাদের পালাবার পালা। তবে এবার শুধু পালানো নয়। আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এবার তারা ফুটিয়ে তোলে স্পৃহায়, সেই স্পৃহা বিস্ফোরিত হয় সংকল্পে। চাকমারা, পাহাড়িরা রুখে দাঁড়ায়।

চাকমা কবিতা আজ এই স্বপ্নপ্রতিষ্ঠার সংকল্পে উত্তেজিত। নরনারীর প্রেম সেখানে গৌণ। প্রকৃতি, কেবল প্রকৃতি বলে, কবিতায় ঠাঁই পায় না, প্রকৃতির হৃতসর্বস্ব চেহারা তাদের ক্রোধের কারণ। তাদের প্রকৃতি অন্য পেশিসর্বস্ব শক্তির দ্বারা লুণ্ঠিত ও বিধ্বস্ত। পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের জন্য সঞ্চিত পাহাড়ের বুকের অন্ন চলে যায় আজ অন্যের গ্রাসে, গাছপালা চেঁছে পাহাড়ের আব্রুহরণ চলছে অহরহ। পাহাড়ে চিবিদ গাছের জায়গায় আজ জলপাই রঙের ছাউনি। গোলাবারুদের গন্ধে পালিয়ে গেছে রংরাং পাখি। চাকমা কবিতা আজ গৃহচ্যুত, মৃত্যু ও হত্যায় নীল এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধের সংকল্পে রক্তাক্ত।

কবিতা হল মানুষের অনুভূতির সারাৎসার। চাকমা কবিতা থেকে তাদের বেদনা ও ক্রোধ বেশ আঁচ করা যায়। কিন্তু তাদের সামগ্রিক চেহারা দেখব কী করে? চাকমা সমাজে আধুনিক ব্যক্তির উত্থান ঘটেছে বলেই তো জাতিগত অপমান তাদের পায়ে এভাবে লাগে, প্রত্যেককে স্পর্শ করে ব্যক্তিগতভাবে। তো এই আধুনিক ব্যক্তিকে সমাজের ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে এবং প্রতিবাদ, অসন্তোষ ও প্রতিরোধের ভেতর জানতে হলে উপন্যাস ছাড়া আর কোনো উপযুক্ত মাধ্যম আছে কি?

আধুনিক ব্যক্তির অনুভূতিতে প্রকাশের প্রধান মাধ্যম উপন্যাস। শুধু একক অনুভূতি নয়, কোনো একক মহাপুরুষের আধ্যাত্মিক উপলব্ধি নয়, রাজনৈতিক আন্দোলনের কালপঞ্জি নয় কিংবা কেবল আত্মপ্রতিষ্ঠার সংকল্প ঘোষণাও নয়, বরং জীবনযাপনের মধ্যে মানুষের গোটা সত্তাটিকে বেদনায়, উদ্বেগে ও আকাঙ্ক্ষায় প্রকাশের দায়িত্ব নেয় উপন্যাস। এভাবে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যোগাযোগ ঘটে এবং ব্যক্তি তাগিদ পায় মানুষ হওয়ার জন্য। মানুষের সমগ্র সত্তাটির প্রতি এরকম মনোযোগ দেওয়া এখন আর কোনো মাধ্যম কী শাস্ত্রের পক্ষে সম্ভব নয়। দর্শনের আবেদন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির কাছে, কবিতা স্পর্শ করে আবেগকে। বিজ্ঞানের প্রধান বিবেচনাও মানুষ এবং মানুষই। সৃষ্টি, মহাশূন্য ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে আজ বিজ্ঞান যেভাবে নিয়োজিত তারও চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ। কিন্তু মানুষের কল্যাণসাধন যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, তার বেদনা ও কষ্টের দিকে মনোযোগ না-দিয়ে মানুষকেই ছাড়িয়ে যায় তখন তার সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ আর থাকে না। আধুনিক ব্যক্তি নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানেরই তৈরি। কিন্তু এই ব্যক্তির খোঁজখবর নেওয়া ও তার স্বপ্নকে লালন করার দায়িত্ব বিজ্ঞান নেয় না। ব্যক্তির নিঃসঙ্গতাকে শনাক্ত করে মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার স্পৃহাকে জাগিয়ে তোলার কাজটি নিয়েছে উপন্যাস। আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে স্পেনের সারভান্তেস একটি রুপূর্ণ ঘোড়ায় চড়িয়ে দিয়েছিলেন দন কিহোতোকে। কিহোতোর মৃত্যু তো তার যাত্রা রোধ করতে পারেনি; যেখানেই ব্যক্তির বিকাশ ঘটেছে উপন্যাস সেখানেই হাজির হয়েছে তার আয়না হয়ে। ব্যক্তির স্বপ্ন ও সংকটকে কেবল সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিফলিত করেই উপন্যাস কিন্তু ফুরিয়ে যায় না। তার ব্যক্তিগত সংকটকে শনাক্ত করে সামাজিক সমস্যা বলে এবং এইভাবে শিক্ষিত সম্প্রদায়কে সংগঠিত করতে সাহায্য করে। সংগঠিত শিক্ষিত সম্প্রদায় সচেতন হয় গোটা সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে

চাকমা ব্যক্তির উদ্বোধন টের পাই তার তীব্র অপমানবোধের ভেতর, তার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুসন্ধানে এবং তার পরিচয় প্রতিষ্ঠার সংকল্পে। এই অপমানবোধ ও প্রতিরোধের স্পৃহা গৌরবান্বিত হয় চাকমা কবিতায়। কিন্তু কেবল অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া আর সংকল্প দিয়ে চিহ্নিত হবে না, এর সবই আসবে জিজ্ঞাসা আর বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে। কেবল তখনই চাকমা আধুনিক ব্যক্তি তার জীবনযাপনে চাকমা ইতিহাস, সংগ্রাম ও ঐতিহ্যকে নতুনভাবে সন্ধান করার উদ্যোগ নেবে।

চাকমাদের সমৃদ্ধ কাব্য উপাখ্যান, অপূর্ব রূপকথা, লোকগীতি সবই নতুন মাত্রায় উদ্ভাসিত হবে চাকমা উপন্যাসে। লোকসাহিত্য শুধু মিউজিয়ামে রাখার বস্তু নয়। চাকমা শিল্পীর কণ্ঠে চাকমা লোকগীতির সুরের আধুনিক প্রয়োগ শুনে মুগ্ধ হয়েছি। আধুনিক সংকটে তার প্রয়োগ না করতে পারলে তার আবেদন তীব্র হবে কেন? গেংগুলিরা তাদের পূর্বপুরুষের গানের প্রতি ভক্তিতে গদগদ। তাঁদের গান যেমন চলছে, তেমনি চলবে। কিন্তু ঐ ভক্তির প্রতি সশ্রদ্ধ হয়েও বলি যে, ভক্তি ঐতিহ্যকে আটকে রাখে একটি সীমাবদ্ধ, ক্ষেত্রে—ঐতিহ্যের গতিতে তা বরং বিঘ্নের সৃষ্টি করে। ভক্তির জায়গায় জিজ্ঞাসা ও বিশ্লেষণ না-এলে আধুনিক চাকমাকে তা কতদিন আর উদ্বুদ্ধ করতে পারবে? গেংগুলিদের ঐতিহ্যকে জিজ্ঞাসা ও বিশ্লেষণের সাহায্যেই ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিকে মেলাতে পারেন চাকমা ঔপন্যাসিক। আবার বলি, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এই জিজ্ঞাসা ও বিশ্লেষণের মধ্যেই সংগঠিত করতে পারে গোটা সমাজকে। স্বপ্নের বিশ্লেষণ ছাড়া স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার আয়োজন নেওয়া যায় না, জিজ্ঞাসাবঞ্চিত স্বপ্ন একধরনের ইচ্ছাপূরণ মাত্র। উপন্যাসই সাধারণ মানুষের জীবনযাপনেও স্বপ্নকে শনাক্ত করে এবং তার বিশ্লেষণ করে তাকে সংকল্পে এবং সামাজিক সংকল্পে রূপান্তরিত করার আয়োজন ঘটায়।

উপন্যাস কোনো সমস্যার সমাধান দেয় না, কিন্তু মানুষের অন্তহীন সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত দেখায়। বঞ্চিত, অপমানিত ও নিগৃহীত চাকমার সংকটে ও সংগ্রামে উপন্যাস তাকে প্রতিফলন করার সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনবোধকে পরোক্ষভাবে হলেও সংগঠিত করতে সাহায্য করবে বলে বিশ্বাস করি।

চাকমা সমাজে ব্যক্তি-উদ্বোধনের এই ক্রান্তিলগ্নে চাকমা ভাষা ও চাকমা জাতি আজ উপন্যাসের প্রতীক্ষা করছে। অনুপ্রাণিত ও দায়িত্বশীল চাকমা শিল্পী কি মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির এই তৃষ্ণা মেটাবার উদ্যোগ নেবেন না?