Course Content
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
0/22
সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

শওকত ওসমানের প্রভাব ও প্রস্তুতি

গল্পটা যখন পড়ি বয়স তখন ১২/১৩ বছর। এরপর সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেল, কিন্তু আজও কোনো গ্রামের রাস্তা ধরে যখন হাঁটি তো একটি বালকের কথা খুব মনে পড়ে। বিধবার একমাত্র ছেলে, কারখানায় কাজ খুঁজতে শহরে যাচ্ছে, ভরদুপুরে গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটি হয়রান হয়ে পড়ে। পাশে তরমুজের খেত দেখে পিপাসায় তার গলা একেবারে কাঠ হয়ে এসেছে। বেলা পড়ে যায়, আর কেবলি তার মার কথা মনে হয়। মা বুঝি মুরগিগুলোকে আধার দিচ্ছে, আর কেবলি তার খেলার সাথিরা এলে তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেনা, তার ছেলে ঘরে নেই, শহরে গেছে চাকরি খুঁজতে। ঐটুকু ছেলে, মায়ের কোল খালি করে দূরে চলে যায় শরীর খাটাতে। না, তাদের তো শরীর নয়, তাদের হল গতর। মুখে দুখের গন্ধ যেতে-না-যেতে গতর না-খাটালে তাদের টিকে থাকাই দায়। এই শেষ কথাগুলো কিন্তু গল্পটিতে এমন ঝাঁঝালো করে বলা হয়নি, কিন্তু মায়ের গভীর দীর্ঘশ্বাস পাঠকের বুকে প্রবল বেগে ঝাপটা মারে।

আরেকটি গল্পে জুনু আপা নামে একটি মেয়ে আছে। দুর্গা যেমন বহুকাল হল দিদির কায়েমি স্বত্ব নিয়ে আসন পেতে বসেছে, এই মেয়েটিও একটু ঝাপসা হলেও আরেকটি জায়গা দখল করে রয়েছে। এই বয়সেও পথের পাঁচালী পড়ি আর ভাবি, দিদিটা আর কটা দিন বাঁচলেও তো পারত! দুর্গা সোনার সিঁদুরকৌটা চুরি করেছিল বলে দারুণ খারাপ লাগে। কিন্তু জুনু আপার জন্য কষ্টটা কেবল বেদনা আর শোকে মসৃণ হয়ে থাকে না, এই কষ্ট একটু জটিল। ব্যক্তিত্ব না-হলেও ব্যক্তি তাকে বলতেই হয়। দূর্গা নিজের পাড়ায় কী বাড়িতে প্রভাব ফেলতে না-পেরেও জন্মের পর থেকে লক্ষ লক্ষ পাঠকের চিত্তে বেদনা সৃষ্টি করে চলেছে। কিন্তু জুনু আপা কী একটা কাণ্ড করে বাড়ির মুরুব্বিদের বিব্রত করে তোলে, মুরুব্বিদের মনে কী আছে কে জানে, তবে এটুকু বুঝি যে চাইলেও তারা তাকে সেই আসন জার ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু জুনু আপার জন্য দুঃখ তো আমার এই জীবনে আর কাটবে বলে মনে হয় না। এর সঙ্গে যোগ হয় তার অস্পষ্ট অপরাধের জন্য অস্বস্তিকর গ্লানিবোধ। পরম প্রিয়জনের ভুলের জন্য কী পাপের জন্য এই গ্লানি কিন্তু দুর্গার জন্য বোধ করতে হয়নি। দুর্গা সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, গরিব ঘরের দিদি আমার, ছোটখাটো লোভ ছিল, দুষ্টুমি করত। পরম পবিত্র দুর্গার স্মৃতিতে কাঁটা নেই। কিন্তু জুনু আপার ভুল কোনো দুষ্টুমি নয়, বাড়ির মুরুব্বিদের কাছে তা হল অপরাধ। তার ভুলের কাজটা ভুল কেন, এই ভুল অপরাধ কেন, অপরাধটিকে পাপ বলে গণ্য করব কেন—এসব না জেনেও তাকে নিষ্পাপ ভাবতে পারি না, আবার তাকে পর করে ঝেড়ে ফেলে দেওয়াও আমার সাধ্যের বাইরে।

বাংলাদেশের বিহারি সম্প্রদায়ের সীমাহীন দুর্দশার কথা মনে হলে আমার চোখে কিন্তু জেনেভা ক্যাম্পের ছবি ভাসে না। বরং, যখনই জেনেভা ক্যাম্পের ওদিকটায় যাই, গোটা এলাকার ওপর ক্রেন ছাড়াই আকাশ থেকে ঝুলতে থাকে একটা মালগাড়ির অন্ধকার ওয়াগন। সেখানে ঘরকন্না করে একটি বিহারি পরিবার। অন্য দেশে তাদের দেশ ছিল, সেখানে বাপদাদার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে তারা এখানে এসেছে। এখানে তাদের ঘর জোটেনি, পায়ের নিচে মাটিও পায় না তারা। মালগাড়ির পরিত্যক্ত ওয়াগনে তাদের বসবাস, দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটে না। এক প্রজন্মে দুবার বাস্তচ্যুত এই সম্প্রদায় নিয়ে আরও গল্প এখানে লেখা হয়েছে। কিন্তু নিজের মাটি থেকে ওপড়ানো মানুষের শেকরছেঁড়া চেহারা ‘গেছ’ গল্পে যেমন প্রকট, অন্য কোথাও তার ছায়াও দেখেছি বলে মনে হয় না।

একটির পর একটি ছবি, ধারাবাহিক সব ছবি যিনি ৩০/৩৫ বছর ধরে পাঠকের চোখে সেঁটে রাখতে পারেন, পাঠকের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবিগুলো ঝাপসা না-হয়ে দিনদিন বরং টাটকা হতে থাকে, তিনি তো বড় কম লোক নন। আশ্বাস, জুনু আপা, গেছ, ইমারত এইসব গল্প যখন পড়ি তখন লেখক নিয়ে কৌতূহল ছিল না, গল্পের লোকজন নিয়েই বুঁদ হয়েছিলাম। এর পরপরই স্কুলে থাকতেই জননী পড়ি, অতটা সাড়া পাইনি। পরে বুঝেছি, বইটা পড়ার জন্য একটু প্রস্তুতি দরকার। বাংলারই প্রধান একটি সম্প্রদায়—তাদের সমস্যা ও সংকটের যেটুকু মোকাবেলাও করে তারাই, তা যেমন এসেছে, তেমনি বেদনা ও বিশ্বাসের যা তারা ভোগ করে গোটা দেশবাসীর সঙ্গে তাকেও ঠিক স্পর্শ করা যায় এই বইতে। দ্বিতীয়বার জননী পড়ে লেখক সম্বন্ধেও জানবার আগ্রহ হল। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর সঙ্গে দেখাও হল ঐ সময়েই।

১৯৫৯ সাল, আই. এ. পড়ি, আমাদের কলেজে বদলি হয়ে এলেন শওকত ওসমান। বইয়ের লোকেরা যাকে বলে রোমাঞ্চ, তিনি আমাদের পড়াবেন শুনে আমরা রীতিমতো তা-ই বোধ করতে লাগলাম। তখন পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত সব বই পড়ে ফেলেছি। সমকাল তখন এখানকার সবচেয়ে উঁচুমানের সাহিত্য পত্রিকা বলে বিবেচিত, শওকত ওসমান সেখানে নিয়মিত লেখেন বলে পত্রিকাটির মান আরও বেড়েছে। সমকালে তাঁর সবচেয়ে সাম্প্রতিক লেখাটিও খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলাম যাতে স্যারের সঙ্গে প্রথম আলাপেই সব গড়গড় করে শোনাতে পারি।

কিন্তু তিনি আমাদের ক্লাসে জোহরা উপন্যাস পড়াবেন জেনে মনটা দমে গেল। মোসলেম ভারত পত্রিকা প্রকাশ করে মোজাম্মেল হক যে সামাজিক ও সাহিত্যিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছিলেন সেজন্য আজও তিনি বিশিষ্ট সাহিত্যকর্মী হিসেবে সবার পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু উপন্যাস তিনি না-লিখলেই পারতেন। জোহরার ভাষা বেশ দুর্বল, শিথিল, কাহিনী কোনো আকর্ষণ তৈরি করতে পারে না। পাত্রপাত্রী বেশির ভাগই মুসলমান, কিন্তু বাংলার মুসলমান সমাজচিত্রও এই বইতে পাওয়া যায় না। এই বইটি যে কেন পাঠ্য করা হয়েছিল তা বোঝা খুব মুশকিল। আমাদের পরের বছর থেকেই ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে জোহরার বদলে অন্য উপন্যাস পাঠ্য করা হয়েছিল। আবার এই এতকাল পর জানতে পারলাম এবার থেকে নবম ও দশম শ্রেণীর জন্য ঐ জোহরা ফের পাঠ্য করা হয়েছে। স্কুলে বইটি পড়তে যারা বাধ্য সেই ছেলেমেয়েদের জন্য খুব খারাপ লাগছে : উপন্যাসের খুব দুর্বল একটি দৃষ্টান্ত তাদের সামনে রাখা হচ্ছে। এই বই যারা পাঠ্য করেন তাঁদের সাহিত্যবোধ তো একেবারেই নেই, মনে হয় বিদ্যাচর্চার সঙ্গে তাঁরা সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন। কয়েকজন আকাটমূর্খের হাতে দেশের পাঠ্যসূচি প্রণয়নের ভার দেওয়া হলে শিক্ষার মান কোথায় পড়াবে ভাবতে ভয় হয়। তা শওকত ওসমান আমাদের প্রথম যে-উপকার করলেন তা হল এই যে, ক্লাসে তিনি বইটি একবার ছুঁয়েও দেখলেন না। এর বদলে তিনি শুরু করলেন উপন্যাস সম্বন্ধে সাধারণ আলোচনা। একটি সমাজ কোন অবস্থায় এলে সেখানে উপন্যাস-রচনা হতে পারে, মহাকাব্যের যুগে উপন্যাস লেখা হয়নি কেন, ব্যক্তির বিকাশের সঙ্গে উপন্যাস রচনার সম্পর্ক কী—এই নিয়ে দিনের পর দিন, ক্লাসের পর ক্লাস বলতে লাগলেন। ইউরোপের রেনেসাঁস তাঁর বড় প্রিয় প্রসঙ্গ, উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রেনেসাঁস সম্বন্ধে বিস্তারিত বললেন। যে-কোনো বিষয়ে কথা বলার সময় তিনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে অজস্র দৃষ্টান্ত দিতেন। উনিশ শতকের বাংলায় সংস্কারমূলক আন্দোলন ও বিদ্যাচর্চার আগ্রহকে তিনি তুলনা করতেন ইউরোপের রেনেশাঁসের সঙ্গে। সামস্তসমাজের অবসান, রেনেসাঁস, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, উপন্যাসের উদ্ভব, বুর্জোয়সমাজের বিকাশ, পুঁজির দাপট, সমাজতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্যতা—এসব বিষয়ে আমার আগ্রহ সৃষ্টি করেন তিনিই। তাঁর মতামতে আমার নিরঙ্কুশ আস্থা যে সব ব্যাপারে এখন অবিচল রয়েছে তা নয়। তাঁর কোনো কোনো মন্তব্য এখন মানি না। আবার শওকত ওসমানের মতামতও কোনো কোনো বিষয়ে এক জায়গায় থেমে নেই, অনেক বদলেছে। এই বদলানোকে সবসময় বিবর্তন বলে মেনে নেওয়া মুশকিল। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারকে সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত বলে ধিক্কার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গান্ধিকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করাকে সঙ্গতিপূর্ণ বলে স্বীকার করি কীভাবে? এককালে শ্রেণীসংগ্রামে তাঁর বিশ্বাস ছিল অবিচল। সেখানে মধ্যবিত্তসুলভ জাতীয়তাবাদ পাকাপোক্ত আসন পেতে বসলে তাকে ব্যাখ্যা করি কীভাবে? যাঁর ‘থুথু’ গল্পে শোষণের প্রতি নিপীড়িত মানুষের ঘৃণা পরিণত হয় প্রতিরোধের সংকল্পে, তাঁরই ভাবনায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে অস্বীকার করাকে স্বতঃস্ফূর্ত বিবর্তন বলে কি মেনে নেওয়া যায়?

তিনিই একদিন ক্লাসে এবং সাহিত্যকর্মে আমাদের সমাজতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্যতার কথা বলেছেন খুব বিশ্বাসের সঙ্গে। আবার নিজের মত ও রুচি তৈরি করা যে সাহিত্যপাঠের জন্য জরুরি কাজ এ-কথাটিও শওকত ওসমান জোর দিয়ে বলতেন। যা-ই বলো না কেন, তা যেন তোমার ভাবনাচিন্তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, নতুন একটা কথা পড়েই কেবল নতুন বলেই কিংবা অভিনব বলেই সেটাকে গ্রহণ করলে উটকো ঠেকবে, স্বভাবের সঙ্গে মিশবে না। তবে তিনি যা-ই বলুন না কেন, জোর করে ছাত্রদের ওপর কোনোকিছু চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তাঁর একেবারেই ছিল না। ছাত্রদের সঙ্গে যাকে বলে অবাধ মেলামেশা তা তিনি করতেন না, ঠিক হিট টিচার তিনি কোনোদিনই নন। অন্তত আমরা কলেজে তাঁকে একটু ভয়ই পেতাম। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে তিনি পাবলিক লাইব্রেরিতে খুব যেতেন, এখন সেটা ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির একটি অংশ। ঐ সময় আমরাও ওখানে নিয়মিত গিয়েছি, তবে স্যার যেতেন পড়তে। বিদ্যাচর্চা আমাদের লক্ষ্য ছিল না, আমাদের প্রধান আকর্ষণ ছিল শরিফ মিয়ার চায়ের দোকানের আড্ডা। তা মাঝে মাঝে পড়ার হলেও ঢুকেছি বইকী। এমনও হয়েছে, পড়ার টেবিলে বসে আমরা কয়েকজন গল্প করে চলেছি, কথাকে আর ফিসফিসানির পর্যায়ে রাখা যায়নি, হঠাৎ একই টেবিলের ওপার থেকে ধমক শুনলাম, ‘কথা বোলো না’। শওকত ওসমান সাহেব বিরক্ত হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। এরপর ভয়ে না-পারি কথা বলতে, না পারি পড়তে। শরিফ মিয়ার দোকানেও দেখা হয়ে যেত, অনেক গল্প করতেন, তবু ছাত্রদের সঙ্গে একটু দূরত্ব তাঁর বরাবরই ছিল। মনে পড়ে, কোনো কোনো দিন রমনা রেসকোর্সের পাশে তখনকার অপেক্ষাকৃত জনবিরল রাস্তা ধরে তিনি একা একা হেঁটে গেছেন মৈমনসিংহ গেটের দিকে, কিংবা ডানদিকে ঘুরে চলে গেছেন নীলখেতের রাস্তায়। চুপচাপ তাঁকে অনুসরণ করেছি, পাশাপাশি হাঁটতে সাহস হয়নি। কলেজে ও ক্লাসের বাইরে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে কম। কিন্তু ক্লাসে নানা প্রসঙ্গের অবতারণা করে ছাত্রদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করবার ক্ষমতা তাঁর অসাধারণ। তাঁর ব্যক্তিত্বে এমন শক্তি ছিল যে তা-ই দিয়ে ছাত্রদের ওপর প্রবল প্রভাব ফেলতে পারতেন। শওকত ওসমানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে তখন আমি আর কলেজের ছাত্র নই। কিন্তু পুরনো ছাত্রদের প্রতি তাঁর ভালোবাসায় কখনোই এতটুকু চিড় ধরে না, তাদের প্রশ্রয়ও তিনি দেন, নিজের লেখা সম্বন্ধে তাদের মতামত চান। তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্রদের অনেকেই এখন লেখালিখির কাজে নিয়োজিত, তাদের কারও কোনো লেখা যদি তাঁর এতটুকু ভালো লাগে তো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে তা জানিয়ে দেন। কারও লেখার অকপট প্রশংসা করতে তাঁর জুড়ি নেই। যে-কেউ ভালো লিখলে তিনি যে কী খুশি হন তাঁকে ঐ সময়ে না-দেখলে তা বিশ্বাস করা মুশকিল। ছাত্রের কৃতিত্বে তিনি সবসময়েই আনন্দিত, তাঁর ছাত্রদের কেউ যদি কোনোদিন তাঁর চেয়ে বেশি কৃতিত্বের পরিচয় দিতে পারে তো, আমি নিশ্চিত, তিনি সবচেয়ে খুশি হবেন। কৃতী ছাত্রদের নিয়ে এরকম গর্ববোধ করতে, এরকম উচ্ছ্বসিত হতে পারেন কজন শিক্ষক?

শওকত ওসমানকে নিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে একটু ভয়ই হয়। পুরনো, দিনের কথা বলতে তাঁর তেমন আগ্রহ নেই। লক্ষ করেছি, তাঁর প্রথম দিকের গল্প কিংবা উপন্যাস জননী নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তিনি প্রসঙ্গ পালটাতে চান, এসব লেখায় কি তাঁর উৎসাহ নেই? অথচ ঐসব তো আমার প্রিয় লেখা। তিনি শুনতে চান তাঁর সাম্প্রতিক লেখা সম্বন্ধে মতামত। এমনকী খবরের কাগজে তাঁর কোনো চিঠি বেরলেও সে সম্বন্ধে প্রতিক্রিয়া জানতে চান। তবে হ্যাঁ, তাঁর পক্ষে এটাই তো স্বাভাবিক। তিনি তো থেমে নেই যে কেবল আগের শিল্পকর্ম নিয়েই বেঁচে থাকবেন। কাজ তিনি করে যাচ্ছেন অবিরাম। অবসর নেওয়া তাঁর ধাতে নেই, বিশ্রাম নেওয়ার অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকী কলেজের চাকরি থেকে অবসর নিলেও শিক্ষকতার কাজ থেকে কিন্তু তিনি অব্যাহতি নেননি। তাঁর সঙ্গে অল্প একটু সময়ের জন্যও দেখা হওয়া মানেই কিছু-না-কিছু শিক্ষা অর্জন করা। অনেক বিষয়ে তাঁর সঙ্গে মতের মিল না-ও হতে পারে, কিন্তু যে-কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে তিনি তাঁর মত প্রকাশ করবেনই। আমার কোনো লেখা কী মন্তব্য যদি তিনি অনুমোদন করতে না পারেন তো স্পষ্ট ভাষায় সেটাও জানিয়ে দেবেন।

তিনি ঘোরতরভাবে সমকালসচেতন। সমসাময়িক কালের মানুষ, রাজনীতি, নানা ঘটনা ও দুর্ঘটনা, আন্দোলন, সংগ্রাম, সংঘাত, যুদ্ধ, আপোস প্রভৃতি নিয়ে তাঁর ক্রমবর্ধমান সচেতনতা তাঁকে ক্রয়ে স্পর্শকাতর করে তুলছে। তাঁর প্রতিক্রিয়া দিনদিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। বয়স তাঁকে ভোঁতা করে না, বরং বয়সের সঙ্গে তাঁর অনুভূতি আরও ধারালো, আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে।

এই অবিরাম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া শওকত ওসমানের রচনায় অস্থির ছায়া ফেলে। তাঁর বাক্য হয়ে আসছে ছোট ও তীক্ষ্ণ। ব্যঙ্গ করে ও শ্লেষ মিশিয়ে কথা বলার প্রবণতা তাঁর এখন অনেক বেশি। যখন-তখন তিনি বিদেশি শব্দ প্রয়োগ করেন-এ কেবল ভাষাকে গয়না পরাবার শখ মেটানো নয়, তীব্র প্রতিক্রিয়াকে শাণিত করে বলাই এ-ধরনের শব্দ-ব্যবহারের একমাত্র লক্ষ্য।

শওকত ওসমানের লেখা তাই ক্রমে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এখানে ক্ষোভ ও বিরক্তিই প্রধান। অস্থিরতার কারণে এই ক্ষোভকে তিনি ঘৃণায় এবং বিরক্তিকে ক্রোধে পরিণত হওয়ার সুযোগ দেন না। পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেয়ে নিজের অসন্তোষ ও বিরক্তি ঘোষণা করার স্পৃহা তাঁর অনেক বেশি তীব্র। তাঁর ব্যঙ্গ প্রায়ই ছাপিয়ে ওঠে তাঁর বক্তব্যকে, গল্পের চরিত্রের স্বভাব ও আকার উপচে ওঠে তাঁর প্রতিক্রিয়া। প্রথম দিকের রচনায় তাঁর ঝাঁঝ কম, কথা বলার স্বর একটু নিচু, কিন্তু তাতে পাঠককে স্পর্শ করতে, এমনকী ধাক্কা দিতেও কোনো অসুবিধা হয়নি। হয়তো জোরে কথা বলা তাঁর শিল্পীস্বভাবের বাইরে, তাই এখনকার উচ্চকণ্ঠ অনেক সময় তাঁর গলা চিরে ফেলে, কথা বুঝতে তাই একটু বেগ পেতে হয়।

কিন্তু এ নিয়ে পরোয়া করার মতো লেখক তিনি নন। নিজের প্রতিক্রিয়াকে ঘোষণা করাটা এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে জরুরি, নিজের উত্তেজনাকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য তিনি অস্থির। তাই শওকত ওসমানের সাম্প্রতিক লেখায় তাপ যতটা অনুভব করি, আলো সে পরিমাণে কম। অন্তত তাঁরই প্রথম দিকের গল্প-উপন্যাসের তুলনায় তো বটেই। কিন্তু এইসব লেখায় তাঁর মেধা, তাঁর দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টি এবং তাঁর শিল্পবোধ ও শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় কিন্তু চাপা থাকে না। তবে নিজের প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনাকে খুঁটিয়ে দেখার সময় তিনি দিতে চান না। মনে হয়, তাঁর দেখা ও শোনা যাবতীয় বিষয় ও ঘটনার প্রতিক্রিয়া তিনি দ্রুত নোট করে রাখছেন, এগুলো নিয়ে বড় কোনো কাজ করার জন্য তৈরি হচ্ছেন। আমরা বহুকাল ধরে যে মহৎ উপন্যাসের প্রতীক্ষা করছি শওকত ওসমানের সাম্প্রতিক লেখায় তারই মহাপ্রস্তুতি চলছে। এই প্রস্তুতিপর্বে তিনি যা লিখছেন তা আমাদের যে-কোনো সফল বা নিটোল গল্প কী উপন্যাসের চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রস্তুতিপর্বে তিনি যা লেখেন তা কেবল নির্মাণ নয়, সৃষ্টি

আমাদের এই প্রাচীন মাতৃভূমির সংগ্রামী জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের স্বপ্ন ও সংকট, উদ্যম ও ক্লান্তি এবং আশা ও বেদনার বিশাল ও গভীর কাহিনীসৃষ্টির যে প্রস্তুতি তিনি নিয়ে চলেছেন, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সমকালীন ও আগামী কর্মীদের শিল্পী হিসাবে গড়ে উঠতে তা শক্ত ভিত্তির জোগান দেবে।