জতুগৃহে দিনযাপন
মাস কয়েক পর রাবেয়া একটি সন্তান জন্ম দেবে। সে যেমন ছেলে বা মেয়ে—আমার পরিচয় নিয়ে ভূমিষ্ঠ হবে, বড়ো হবে, বেঁচে থাকবে, আমিও তেমনি ভূল পরিচয় নিয়ে হাজার মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবো, ভুল পরিচয় নিয়ে একদিন মরে যাবো।
.
নায়কের এই তেতো উপলব্ধি দিয়ে শেষ হয় কায়েস আহমেদের প্রথম উপন্যাস নির্বাসিত একজন।
কাহিনী নায়কের বাল্যকাল থেকে শুরু, সে একটি ব্যক্তিতে পরিণত হতে হতে নিজের সম্বন্ধে নিশ্চিত একটি ধারণায় পৌঁছলে উপন্যাস থামে। একটি লোকের বড় হওয়ার গল্প, তা ভদ্রলোকের আদুরে ছেলের নুটুপুটু করে গড়িয়ে চলার কেচ্ছা নয়, চারপাশের প্রায় কিছুই তার পক্ষে নেই, সময়টা তার ওপর চটা। হাতাহাতি করতে করতে তাকে চলতে হয়; কখনো খুঁড়িয়ে, কখনো দৌড়ে, কখনো লাফিয়ে চলার রক্তাক্ত পায়ের ছাপ বইটির পাতায়-পাতায়।
দাঙ্গার খবর নিয়ে গল্পের শুরু। এই অশুভ সংবাদটি উপন্যাসের বেশি জায়গা জুড়ে নেই, কিন্তু একজন অল্পবয়েসি তরুণের চোখে পাড়া-প্রতিবেশীর হাতে মায়ের নিহত হওয়া এবং ছোট বোনের সম্ভ্রমহানি সংক্ষেপে এতটাই উৎকট হয়ে উঠেছে যে দাঙ্গার উৎস স্বাধীনতা ও দেশভাগকে অর্থহীন করে তোলার জন্য তা-ই যথেষ্ট। স্বাধীনতার কল্যাণে খোকা নিজদেশে পরবাসী হয়ে যায়, তখন তার কাছে স্বাধীনতার চেয়ে অবাঞ্ছিত ঘটনা আর কী হতে পারে?
দাঙ্গা এই উপন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। দাঙ্গাই প্রধান চরিত্রকে প্রথমে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে, এই প্ররোচনা পরিণত হয় তারই পরিচিত অন্য সম্প্রদায়ের এক মানুষের হত্যাকাণ্ডে। দাঙ্গার ধাক্কা তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। মাতৃভূমি থেকে উৎখাত হয়ে সে চলে যেতে বাধ্য হয় পাশের নতুন দেশে, তার স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত জীবনযাপন করুণভাবে বিঘ্নিত হয়।
প্রধান চরিত্র নিজেই তার পদেপদে কাঁটাখচিত জীবনের কাহিনী বর্ণনা করে।
এসব ক্ষেত্রে যা হয়—-অতীত, বর্তমান, সেদিন ও এদিনকার সব ছবি ছেঁড়াখোঁড়া হয়ে দোলে। এক মুহূর্তে সে চলে যায় শৈশবে, বাল্যকালে, কৈশোরে; আবার দুলতে দুলতে চলে আসে নিকট-অতীত ও বর্তমানে।
না, সুখে সে কোনোদিনই কাটায়নি, কেবল বাল্যকালের একটি সংক্ষিপ্ত সময় ছাড়া। যখন তার বড়ভাই একটি মিলে কাজ পাওয়ার পর তাদের ঘরে একটুখানি সচ্ছলতা দেখা দিয়েছিল। ‘অক্ষম বাপের শুয়ে শুয়ে খিস্তি খেউর, মার কাটা কাটা জবাব নোংরা লাগতো’। কিন্তু তবু ‘বাপ শুয়ে শুয়েই ছোট নুরীকে পাশে বসিয়ে নরম গলায় কথা বলছে, নুরী এন্তার বকর বকর করছে, মালসায় কুড়ো ছেনে মা উঠোনে দাঁড়িয়ে মুরগিদের ডাকছে, আতি তি তি-ই, আমি রকে পার্টির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে হোমটাস্ক করছি, বড়োভাই ব্যাগ ঝুলিয়ে বাজার করে ফিরলো। নিম্নমধ্যবিত্তের সুখের খুব স্টিরিওটাইপ ছবি, একটু ক্লিশে মনে হতে পারে। কিন্তু গরিব লোকজনের সুখের বৈচিত্র্য পাওয়া যাবে কোথায়? এই সুখ যথারীতি হাওয়া হয়ে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই সুখের উৎস সেই বড়ভাই বাড়ির সঙ্গে যোগযোগ বন্ধ করে দেয়। তার বদলে তাকে ধরতে আসে পুলিশ। বড়ভাই যোগ দিয়েছিল শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে। ফলে কিছুদিনের মধ্যে চাকরি তো চাকরি, বড়ভাইকে প্রাণটি পর্যন্ত হারাতে হয় মিল মালিকের লেলিয়ে দেওয়া-গুন্ডার হাতে।
বড়ভাইয়ের এই মৃত্যুকে গৌরব দেওয়ার জন্য নায়ক বা লেখক কারও তেমন সক্রিয় উদ্যোগ নেই। তার আন্দোলনকে এরা সমর্থন করে কি না সে তথ্যটিও অলিখিত রয়েছে। কিন্তু তার হত্যাকাণ্ডের শাদামাটা মস্তব্যহীন বর্ণনাতেও তার গৌরব জ্বলে উঠেছে। তবে উপন্যাসের কাহিনী জুড়ে তা আলোকিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।
এর কারণ দুর্বলচিত্ত নায়কের অব্যাহত গ্লানিবোধ। সে কোনো কাপুরুষ চরিত্র নয়; তবে নিজের ইচ্ছা বা কামনাকে তৃপ্ত করার জন্য তার অনীহা। এই অনীহা কোনো সক্রিয় ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য নয়, তার ভয় থেকেও এটা আসেনি, এসেছে অহরহ মার খাওয়া-জীবনের ম্যাচিওরিটি থেকে। তার ধারণা, জীবনের যাবতীয় সুখ ও আনন্দ তার নাগালের বাইরে, সেসব ঠিক তার জন্য নয়। বিপিন নাহার মেয়ে তাপসীর সাঁওতালি ছাঁদের তাগড়া গতর তাকে যতই আকর্ষণ করুক, ছেলেটি ধরেই নিয়েছে যে এসব ঝামেলায় যাওয়া তার পোষাবে না।
এরকম একটি ছেলে হয়তো একদিন বিয়ে থা করে সংসার করত, মায়ের পছন্দ করা কোনো মামাতো বোন কী ফুপাতো বোনকে বিয়ে করে, মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে, বোনের বিয়ে দিয়ে দারিদ্র্য ও কষ্টে, সুখে দুঃখে জীবনযাপন করতে তাকে বারণ করত কে?
কিন্তু, স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার সঙ্গী দাঙ্গা তাকে ওলটপালট করে দেয়। গুণ্ডাদের প্রতিরোধ করার স্পৃহা তার ছিল না, মায়ের প্রাণ, বোনের ইজ্জতরক্ষার জন্য এগিয়ে আসার ক্ষমতার নিদারুণ অভাব তার স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মানসিক প্রতিক্রিয়া এড়ানোও তার পক্ষে সম্ভব হয় না। দাঙ্গার প্রবল প্রতিক্রিয়া মুছে ফেলতে সে ছুটে যায় রেললাইনের ধারে। সেখানকার প্রধান স্মৃতি, ওখানে নীলমণি ডাক্তারের ছেলে রেলে জান দিয়েছিলো। নীলমণি ডাক্তারের ছেলেই তখন তার নিরাময়ের ওষুধ, একমাত্র ঐ ওষুধই তাকে বাঁচাতে পারে মায়ের হত্যা ও বোনের অপহরণের ধাক্কা থেকে।
শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা তার আর করা হয় না। একটি নাটকীয় ঘটনায় সে অজিতকে খুন করে। ঘটনাটি নাটকীয়, কিন্তু উটকো নয়, বরং এই খুন করে সে নিজে যেমন বাঁচে, উপন্যাসটিও বাঁচে একটি ঘটনার ঘনঘটা থেকে। এটা একটা হত্যা, নিখাদ হত্যা, কিন্তু সাম্প্রদায়িক হত্যা নয়, বরং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধ বলে একে সমর্থন করা চলে। এখানে কায়েস আহমেদ প্রশংসনীয় সংযমের পরিচয় দিয়েছেন, হৈচৈ বা বাড়াবাড়ি না-করে ঘটনাটির তাৎপর্য নিয়ে পাঠককে ভাববার অবকাশ দিয়েছেন।
এই সংযম কিন্তু পরে আর রক্ষা করা যায়নি। নিজের জন্মভূমি, মাতৃভূমি, পিতৃভূমি থেকে তাকে চলে যেতে হয়। কিন্তু উদ্বাস্তু কথাটিতে তার আপত্তি। উদ্বাস্তু বলে পরিচিত হতে সে প্রত্যাখ্যান করে, তার স্বভাবের সঙ্গে তার প্রতিক্রিয়া মেলে না। তার মনে হয়, এর নামই কি স্বাধীনতা? রিফ্যুজি হবার স্বাধীনতা? এত বছর পরেও মানুষকে রিফ্যুজি বানাবার জন্য এপারে ওপারে কারা কলকাঠি নাড়ে? লোকটির এই মনেমনে বক্তৃতা ঝাড়া তার স্বভাব উপচে উঠেছে। যেভাবে তাকে গড়ে তোলা হয়েছে তাতে এই ধরনের সাজানো গোছানো বুদ্ধিজীবী-মার্কা বানোয়াট ডায়লগ তার স্বভাবের সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। মিল-মালিকের ভাড়াটে গুণ্ডার হাতে বড়ভাইয়ের হত্যা, দাঙ্গায় মায়ের মৃত্যু, বোনের অপহরণ, দগ্ধ বাড়িঘর —এসব কোনো জায়গাতেই তার প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ এরকম বেসামাল ও স্যাঁতসেঁতে হয়নি। ফলে তার স্বভাব যেমন স্পষ্ট হয়েছে তেমনি তাঁর বেদনা ও শোকও গভীর আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখানে এসে কায়েস আহমেদ চরিত্রটির বুকের বিট বড় বাড়িয়ে দিয়েছেন। এতটাই বাড়িয়েছেন যতটা বাড়লে মানুষ হার্টফেল না-করলেও পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হতে পারে।
এখানে এসে উপন্যাসটি পক্ষাঘাতের রোগীর মতো এলিয়ে পড়ে। যে ঋজু ও মেদহীন নির্বিকার ও স্বতঃস্ফূর্ত কাহিনী ছুটে ছুটে এগুচ্ছিল তা হাঁটতে থাকে পা টেনে টেনে। হঠাৎই লেখক তার চরিত্রের ওপর একগাদা বোঝা চাপিয়ে দেন, কিন্তু তা জাস্টিফাই করার চেষ্টা না-করে দুর্বল করে ফেলেন।
যুক্তি একটা দাঁড় করানো যায়, তা হল এই যে নতুন দেশে এসে লোকটি থিতু হয়ে নিশ্বাসই ফেলতে পারল না। কিন্তু তা মেনে নিই কীভাবে? তার যৌবন পরিণতি পায় এই নতুন দেশেই। নানারকম পেশা এবং বৈরী পরিবেশ কি তাকে আরও পরিণত মানুষে রূপান্তরিত করবে না?
কায়েস আহমেদ তাকে সেই অধিকারটি দেননি। অথচ আমরা তো তাঁর কাছ থেকে শুনেছি যে, বাঁচার তাগিদে মানুষের সংগ্রামে সে এক কাতারে চলে এসেছিল। না হলে ‘মিছিলে স্লোগানে ডগোমগো হয়ে রাস্তায় নামবে কেন? ‘কার্য্য, গুলি আর রক্তের ভেতর দিয়ে’ ‘হাজার মানুষের মধ্যে শেষ পর্যন্ত টিকে গেল। কিন্তু তার ঐ টিকে যাওয়াটি পাঠকের মধ্যে টিকিয়ে রাখার জন্য যে-যৌক্তিকতা দরকার তা এই উপন্যাসে অনুপস্থিত। ঘটনা না-বাড়ালেও চলত, কিন্তু বিশ্লেষণ এবং চরিত্রের বিকাশে লেখকের আরেকটু পর্যবেক্ষণের দরকার ছিল।
গল্পের শেষে প্রধান চরিত্র জানতে পারে যে তার নববিবাহিত স্ত্রী বিয়ের আগে থেকেই অন্তঃসত্ত্বা, তখন তার সঙ্গে এই মেয়েটিকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার সহকর্মীর উৎসাহের কারণও স্পষ্ট হয়। সহকর্মীর অভিভাবকসুলভ ভালোবাসার আড়ালে সহানুভূতিহীন ও কপট পরিচয় পেয়ে তার নিজের যথার্থ ও সঠিক অস্তিত্ব সম্বন্ধেও লোকটি গভীরভাবে সন্দিহান হয়ে ওঠে। এই সংকটের মধ্যে উপন্যাসের সমাপ্তি।
সংকট মানুষকে অসহায় করে ফেলে কিংবা নতুন করে জীবন শুরু করতে প্রেরণা জোগায়। এখানে তা হয়নি। সংকটটি নায়ককে একটি উপলব্ধি দান করে যা তার জীবনযাপনের পদ্ধতি বা স্বভাবের সঙ্গে বেমানান। লোকটি একটি পরম সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, ফলে তার পরবর্তী সম্ভাবনা সম্বন্ধে পাঠকের আগ্রহ ওখানেই শেষ হয়। পাঠকের আর কোনো জিজ্ঞাসা বা অস্বস্তি থাকে না, গল্প সম্বন্ধে সব জেনে সে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। একটি নিটোল কাহিনী রচনা করার দিকে কায়েস আহমেদের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে এবং এদিক থেকে তিনি গড়পড়তা উপন্যাসের রীতিই অনুসরণ করেছেন। এই ফর্মুলা অনুসারে কাহিনীর একটি চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে, বোঝাই যায় যে চরিত্র এখন থেকে এই নিয়ম অনুসারে চলবে। রূপকথার এই ফর্মুলাই বাঙলা উপন্যাসের একটি বিরাট অংশ জুড়ে দাপট চালাচ্ছে আজ একশো বছরেরও বেশি সময় জুড়ে। নির্বাসিত একজন পড়ে মনে হয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক মোটামুটি ছকে বাঁধা-কাহিনী বর্ণনার প্রবণতা কায়েস আহমেদের পরবর্তী লেখায় অব্যাহত থাকবে, এই ব্যাপারে তিনি চতুর দক্ষতা অর্জন করবেন এবং একজন জনপ্রিয় লেখক হিসাবে পাঠককে আঠার মতো ধরে রাখবেন এবং তাঁর উপন্যাস পাঠ শেষ করে পাঠক স্বস্তিতে তৃপ্তিতে পা এলিয়ে দেবেন। তাঁর পরিণতি তা হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় এবং এখন পর্যন্ত শেষ উপন্যাস দিনযাপন পড়তে গেলে কায়েস আহমেদের বিকাশ দেখে পাঠককে বেশ বিস্মিত হতে হয়। এখানে তাঁর প্রায় আয়ত্তাধীন গল্প বলার নিরাপদ রীতিটি তিনি বর্জন করেছেন। প্রকরণের নতুনত্ব এখানে বড় কথা নয়, প্রকরণের নতুনত্ব এসেছে মানুষের জীবন সম্বন্ধে অনুসন্ধানের তীব্র স্পৃহা থেকে।
দিনযাপন কিন্তু কায়েস আহমেদের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, দুই উপন্যাসের মাঝখানে লেখা একটি গল্প ‘জগদ্দল’ তার সাক্ষী। একই মলাটের ভেতর নির্বাসিত একজন ও ‘জগদ্দল’-এর সহ-অবস্থানের কারণ রোগা বইটির শরীরে মাংস যোগ করা ছাড়া আর কী হতে পারে? হ্যাঁ, একটি মিল গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পরে বইকী! উপন্যাসটিতে আমাদের দেশের ১ নম্বর স্বাধীনতা এবং তার সঙ্গী দাঙ্গার দক্ষযজ্ঞের বিবরণ দেওয়ার প্রচেষ্টা রয়েছে এবং ‘জগদ্দলে’ ২ নম্বর স্বাধীনতার তুমুল নৈরাজ্যের ছবি। কিন্তু কী গল্প বলার রীতি, কী দৃষ্টিভঙ্গি, কী চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক—সব ব্যাপারেই দুটি লেখায় লেখকের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র চেহারা পাওয়া যায়।
‘জগদ্দল’ গল্পে কায়েস আহমেদের স্যাঁতসেঁতে প্রকাশ অনেকটা ঝরে পড়েছে। কোনো চরিত্রের প্রতি তরল ভালোবাসা লেখাটিকে কোথাও এলিয়ে পড়তে দেয় না। গল্পের জায়গা হল শ্মশানঘাট, সময় কালীপূজার রাত্রি। পোস্তাগোলা শ্মশানটি ঐ রাত্রের মদে, মাংসে, পূজায়, নাচে, আরতিতে, পুলিশে, মাতালে, বাখোয়াজিতে, স্মৃতিচারণে এক বর্ণাঢ্য ও ভয়ংকর জায়গায় পরিণত হয়েছে। এখানে অল্প পরিসরেই বেশ কয়েকটি চরিত্র দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে, কিন্তু এর ফলে কারও শরীরের কোনো অংশের অনুচিত ছাঁটাই হয়নি। অনেকের হয়তো মনে আছে যে ধর্মনিরপেক্ষতার ডঙ্কা পেটানো স্বাধীনতার পর দূর্গাপূজার অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি শহরে প্রায় ঘড়ি ধরে একই সঙ্গে পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙা হয়। ‘জগদ্দল’ গল্পে দেখি, ঐ ঘটনার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে একজন বুড়োমানুষ উদ্ভট রাজনৈতিক তত্ত্ব ঝাড়ছে। এইসব রাজনীতিহীন রাজনৈতিক গালগল্পে সবচেয়ে উগ্র ছিল বায়বীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাব। সেই সময়কে শনাক্ত করার জন্য ঐ লোকটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে কায়েস আহমেদ সফল হয়েছেন। এই বাখোয়াজির পাশাপাশি আরেকটি দৃশ্য রয়েছে চিতায় এক বুড়োহাবড়ার মড়া পোড়ানো হচ্ছে, পাশে মদের গ্লাস হাতে জুত করে বসেছে মাঝবয়েসি একজন লোক। এদের সম্বন্ধে তথ্য যা দেওয়া হয়েছে তাতে বুঝতে পারি যে পরচর্চা করে, সন্ধেবেলা চপ কাটলেট ও একটু রাত হলে মদ খেয়ে এদের সময় কাটে। এদের এই নিয়মিত ও আপাত-নিস্তরঙ্গ জীবনযাপন আসলে এদের নিজেদের ও গল্পের অন্তঃশীল তরঙ্গকেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। ঢাকের প্রকট আওয়াজ, মাতালদের চাপাবাজি এবং সর্বোপরি শ্রী শ্রী কালীমাতা ও মায়ের দুলে দুলে ওঠা খাঁড়া পরিবেশটিকে বীভৎস করে তোলার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এই নিয়ে কায়েস আহমেদ কোনোকিছু সৃষ্টি করবার চেষ্টা করেননি। এই লোভ সামলানো কিন্তু শক্ত। কেবল শিল্পীর পক্ষেই এই কাজ করা সম্ভব। রহস্যময়তা না-থাকায় চরিত্রগুলোর চেহারা স্পষ্ট আকার পায় এবং বুঝতে পারি যে তাদের কেউই আমাদের অপরিচিত নয়। এদের দৌড় যে কতদূর তাও ধরতে বেগ পেতে হয় না। এরা শেষ পর্যন্ত আলাদা আলাদা কোনো ব্যক্তি থাকে না, তাদের সামাজিক আদলটিই ফুটে ওঠে।
যে-যুবসম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ নিজেদের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি নরখাদক সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেছে, স্বাধীনতার পর লুম্পেন চরিত্রের মানুষের হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ভার পড়লে সেই যুবকদের মধ্যে যে-প্রবলরকম অস্থিরতা, ক্ষোভ এবং এর পরিণামে চরম হতাশার সৃষ্টি হয় তাকে তেতো করে দেখানো হয়েছে এই গল্পে। ঐ সময়ের বাস্তবতা কিন্তু এখনও অব্যাহত রয়েছে। এর ওপরকার দৃশ্যটি হল লুটপাট ছিনতাই, একবার উগ্র জাতীয়তাবাদী হুঙ্কার, আরেকবার ধর্মান্ধদের ঘেউঘেউ। কিন্তু ভেতরকার সত্যটি হল এই, সমস্ত অনাচারের বিরুদ্ধে যাদের রুখে দাঁড়াবার কথা তারা নিদারুণভাবে পঙ্গু ও নপুংসক। তাদের মাতলামি, মস্তানি ছাপিয়ে উঠেছে এই অক্ষমতা কয়েকজন যুবকের সংলাপে :
আমরা গাড়ি হাইজ্যাক করুম।
— পারবি না।
—ব্যাংক লুট করুম।
— পারবি না।
–মাইয়া হাইজ্যাক করুম।
—পারবি না।
দীপকের গলা চড়ে যায় : চিতার আগুনে ঝাঁপ দিয়া পড়ুম।
—পারবি না।
ভূপেন ঢুলতে ঢুলতেই হাসে, বলে, হাত মারুম।
— পারবি, কিন্তু এইখানে না, লোকজনে দেখবে।
এখানে বলা দরকার যে, এরা যে ব্যাংক লুট কিংবা গাড়ি বা মেয়েমানুষ হাইজ্যাক করে না তা নয় কিন্তু। এরাই গাড়ি হাইজ্যাক করে, মেয়েমানুষ হাইজ্যাক করে, ব্যাংক লুট করে, পিস্তলের মুখে চাঁদা আদায় করে। কিন্তু বন্ধ ঘরে হস্তমৈথুন করার মতো ঐ কাজগুলোও কোনো সকর্মক ক্রিয়া নয়, ঐসবের মধ্যে পৌরুষ তো নেইই, কোনো উদ্যোগও নেই। কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তারা ঐসব কাজ করে না; স্বপ্নহীন, ভবিষ্যৎ-বঞ্চিত যুবকের শরীরের স্বাভাবিক তেজ আর কীভাবে প্রকাশিত হতে পারে?
নদীর ওপার থেকে ব্রাশ ফায়ারের শব্দে বোঝা যায়, কেউ-না-কেউ কারোর হাতে সাফ হয়ে গেল। কিন্তু এ নিয়ে উৎকণ্ঠিত হওয়ার মতো ন্যূনতম শক্তিও কারও নেই। তাদের একমাত্র পরিচয় এই যে তারা কিছুই করতে পারে না। এখানে এক সুযোগে লেখক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে বেশ একটু শ্লেষ করেন। ব্যাপারটা হঠাৎ বললেও গল্পের জন্য প্রাসঙ্গিক। কারণ, নপুংসক যুবকদের সঙ্গে তাদের অনেকের চরিত্র ও কার্যকলাপের চমৎকার সামঞ্জস্য রয়েছে।
গল্পের শেষ দৃশ্যে কালীমূর্তির সামনে পার্শ্ব নামে ছেলেটির নাচ গল্পটিকে একটি সংহত বিন্দুতে পৌঁছে দিয়েছে। পার্থর সামনে শ্রী শ্রী কালীমাতা প্রাণলাভ করে, তার হাতে বাবার ছিন্নমুক্ত দেখে পার্থ কিছু ভয় পায় না। বীভৎস, নৃশংস ও অবাঞ্ছিত এই রূপটিকে প্রতিহত করতে উদ্যত হয়ে এগিয়ে এসে হুমড়ি খেয়ে সে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমার সামনে পুরোহিতের সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনার দৃশ্যটি সামাজিক অক্ষমতা ও পরাজয়কে প্রকট করে তুলেছে। কিন্তু গল্পের শেষ কয়েকটি লাইন পুরোহিত মশায়ের জন্য বরাদ্দ করা হলেও কায়েস আহমেদের হাতে অনেক বেশি তাৎপর্য পেয়েছে পার্থর বিদ্রোহ। পার্থ শেষ পর্যন্ত পড়ে গেছে, তার ঠোটের কষে ফেনা জমেছে—তাতে কিছু এসে যায় না। বলা যায় না, সে হয়তো মরেও যেতে পারে, কিন্তু পুরোহিতের মতো পরাজিত হয়নি। মূমূর্খ ও অক্ষম সমাজের অনেক ভেতরকার, গভীর ভেতরকার শক্তি হয়তো তার নাচের মুদ্রায় একটুখানি ঝিলিক দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে জানান দিয়ে গেল।
এই ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত হল দিনযাপন উপন্যাসের নায়ক। ঢাকা শহরের পুরনো এলাকার একটি পুরনো নড়বড়ে বাড়িই আসলে এর প্রধান চরিত্র। বাড়িটিতে অনেকগুলো পরিবারের বাস। নিবারণ উত্তরাধিকারসূত্রে এই বাড়ির মালিক, তার ঠাকুরদাদা সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় সম্পদশালী হয়েছিল। পূর্বপুরুষের উপার্জিত বাড়ির ভাড়া থেকে নিবারণ সংসার চালায় এবং বেশ নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে ধর্মচর্চা করে। ঠাকুরকে পাওয়ার জন্য লোকটি একেবারে হন্যে হয়ে উঠেছে।
উপন্যাসের চরিত্র অনেকগুলো, তাদের সমস্যা ঠিক একই না-হলেও প্রায় একই রকমের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে সবাই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং এই কারণে একধরনের হীনম্মন্যতার শিকার। উপন্যাসের নায়ক হিসাবে কাউকেই শনাক্ত করা যায় না, কোনো একক মানুষ কাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করা তো দূরের কথা, আলাদাভাবে চোখে পড়ার মতো ক্ষমতাও অর্জন করে না। বাড়ির মালিক নিবারণ বড়লোকের নির্বিরোধ ও নির্বোধ সন্তান হিসাবে প্রধান চরিত্র হতে পারত, কিন্তু মধ্যবিত্তসমাজ তো নয়ই, মধ্যবিত্ত ব্যক্তিরও কোনো সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরা তার সাধ্যের বাইরে।
নিশিকান্ত নামে যে-লোকটি সাধনা ঔষধালয়ের একটি ব্রাঞ্চে কাজ করে রাজনীতির আলোচনায় উৎসাহী হয়েও রাজনীতির ওপর তার এতটুকু আস্থা নেই। এ-লোকটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর মধ্যবিত্তকেই প্রতিনিধিত্ব করে। রাজনীতি নিয়ে কথা বলা এবং বর্তমান রাজনীতি নিয়ে হতাশা ও বিরক্তি প্রকাশ করা এখনকার মধ্যবিত্তের একটি বড় প্রবণতা। কিন্তু এ-লোকটির তাৎপর্যপূর্ণ কোনো ভূমিকা নেই। কায়েস আহমেদ এর জন্য একটু বেশি জায়গা বরাদ্দ করেছেন, এমনকী অন্য আরও কয়েকটি চরিত্রের প্রাপ্য জায়গা হেঁটে অনাবশ্যকভাবে একে বেশি সময় দিয়েছেন। এতে কিন্তু তার গুরুত্ব বাড়েনি, বরং লোকটি একটি টাইপ-চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের একটি মানুষের সঙ্গে কায়েস আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ‘জগদ্দল’ গল্পে। তার নাম ছিল বিষ্ণুপদ। তাই যৌবনকালের ডাকসাইটে রাজনীতিবিদদের নিয়ে তার গর্বের আর শেষ ছিল না, একধরনের কাঁচা আঞ্চলিকতাবাদকে জাতীয়তাবাদের মর্যাদা দিয়ে সে উপমহাদেশের যাবতীয় ঘটনা বিশ্লেষণ করত। প্রায় সবসময় এইসব নিয়ে কথা বলার জন্য বিষ্ণুপদ ঐ গল্পের কয়েকটি যুবকের কাছে বিরক্তিকর চরিত্র হয়ে ওঠে। কিন্তু তখনকার মধ্যবিত্তের প্রবীণ অংশের বায়বীয় জাতীয়তাবাদটিকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে লোকটিকে কায়েস প্রয়োজনীয় পরিসর দিয়েছিলেন। কিন্তু দিনযাপন উপন্যাসে নিশিকান্ত নাম দিয়ে সে হাজির হল এবং কেবল একই রকম কথা বলতে বলতে তার কোনো সহ-চরিত্রের বিরক্তি উৎপাদন না করলেও পাঠক তার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ব্যর্থ হয়ে ওঠে।
চিন্তাহরণ মেডিক্যাল স্টোরের সেলসম্যান কালীনাথের স্বল্পকালীন উপস্থিতি এবং প্রায় অস্তিত্বহীনতা কিন্তু কাহিনীর গতিতে কোনো বাধা নয়। তার স্বভাব, তার প্রতি স্ত্রীপুত্রের নীরব ও সরব অবহেলা ও ঘৃণা মধ্যবিত্ত মানুষের একটি খণ্ডাংশকে তুলে ধরে—যা কিনা তার সামগ্রিক শরীরনির্মাণে অপরিহার্য।
দিনযাপন-এ আলাদা ধরনের মানুষ হল শামসু মিয়া। মদের দোকানের মালিক নরহরির স্কুলজীবনের বন্ধু সে, শুঁড়িখানায় ঢুকেই খিস্তি ঝাড়ে, সবাইকে নিয়ে জমিয়ে মদ খায়, হুল্লোড় করে, ছেলেবুড়োর বাছবিচার করে না—এই লোকটি দিনযাপন-এর দম-বন্ধ হওয়া ভ্যাপসা বাড়ির খোলা হাওয়া। না, নির্মল হাওয়া নয়, তবু নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ একটা পাওয়া যায়। লোকটি নিশ্চয়ই অসৎ— হয়তো কালোবাজারি, হয়তো মাল গুদামজাত করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়, হয়তো সরকারি দলে গুণ্ডা সাপ্লাই করে। কিন্তু বিত্তের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পোশাক, রুচি, কথাবার্তা থেকে তার যে-সাংস্কৃতিক স্তরের পরিচয় পাই তাতে তাকে মধ্যবিত্তের পর্যায়ে ফেলা যায় না। মধ্যবিত্ত, ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত ব্যক্তি এই বইয়ের নায়ক বলে অমধ্যবিত্ত শামসু মিয়াকে একটি জরুরি চরিত্র বলে বিবেচনা করি। লোকটির রুচিতে যে স্থূলতা ও অশ্লীলতা তা কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক। ফলে অন্যদের রক্তহীন পানসে ও অসহায় রুপূর্ণতা আরও বেশি করে চোখে পড়ে।
হ্যাঁ, আরও কয়েকজন আছে যাদের কেউ-কেউ ঐ নড়বড়ে বাড়ির বাসিন্দা নয় বা বাসিন্দা হলেও একটু আলাদা ধরনের। স্ত্রীর ভাষায় ‘মোচিবিলাই’ স্বল্পবাক কালীনাথের বাচাল ছেলে সুকুমার, তার বন্ধু শঙ্খ, শাজাহান এবং ওস্তাদ মস্তান নান্টু—এরা হল যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের বেতমিজ চেহারা। বেতমিজ কিন্তু বিদ্রোহী নয়। বিদ্রোহী কী, বেয়াদব বললেও এদের আস্কারা দেওয়া হয়। মেয়েদের নিয়ে খিস্তি আউড়ে, মদের দোকানে কারও সম্প্রদায়গত সংখ্যালঘুত্বের সুযোগ নিয়ে তার ওপর হাম্বিতাম্বি করে, অন্ধকার রাস্তায় নিরীহ লোকদের ছুরি দেখিয়ে সর্বস্ব লুট করে, নিরস্ত্র মানুষের সামনে কায়দা করে কোমরে-গোজা-পিস্তল দেখিয়ে এরা দিনযাপন উপন্যাসে যা করেছে এবং এখন আরও বেশি ডোজে করছে তা হিজড়েদের পাছাদোলানো যুদ্ধের নাচ দেখানোর থেকে আলাদা কিছু নয়। এদের উচ্চাভিলাষী ও সংগঠিত অংশের নাম সেনাবাহিনী।
দিনযাপন-এর যে-চরিত্রটি লেখকের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ অর্জন করে সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটি হল মনোতোষ। মনোতোষ স্কুলের শিক্ষক এবং রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তার আস্থা সমাজতান্ত্রিক আদর্শে এবং সে বিশ্বাস করে যে আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে ঐ আদর্শ অনুসারে। এই নরক-মার্কা বাড়ির অধিবাসী হয়েও তার জগৎ অনেকটা বড় ও প্রসারিত। মনোতোষের সমস্ত মন জুড়ে রয়েছে দেশের উপযুক্ত ও যথার্থ ভবিষ্যৎ। পার্টির জন্য সে অনেকটা সময় দেয়, সুযোগ পেলেই নিজের রাজনৈতিক আদর্শের কথা একে ওকে বোঝাতে চেষ্টা করে।
মনোতোষ কিন্তু তাই বলে সেইসব নাবালক উপন্যাসের আদর্শবাদী নায়ক নয়, তার ওপর স্যাঁতসেঁতে কথাবার্তা কী বীরত্বব্যঞ্জক কাজকর্ম চাপিয়ে লেখক তাকে মস্ত বড় একটা কাঠের পুতুল গড়েননি। মধ্যবিত্তমূলক দুর্বলতাকে সে কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে এবং স্ত্রীর মধ্যবিত্ত সাধ-আকাঙ্ক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করাও তার পক্ষে অসম্ভব। ঐ বাড়ির কালীনাথ, নৃপেন, হারাধন, বাসুদেব ও নিশিকান্তের মতো এক কামরাতেই তার বসবাস। তবু জয়ার রুচি এদের থেকে আলাদা। তার ঘরে অল্প কয়েকটি শৌখিন আসবাব, ছিমছাম গৃহিণী জয়ার চেয়ার-টেবিলে সূচিকর্ম করা শাদা কাপড়ের ঢাকনা। তো সমাজতন্ত্রের বিপ্লব তো ঠিক সূচিকর্ম নয়, মনোতোষের রাজনীতিও শেষ পর্যন্ত কোনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না। বৌয়ের সাধ-আহ্লাদ শুধু নয়, নিজেও আরেকটু জয়েস চায় বলেই মনোতোষ মেলা পরিশ্রম করে একটা ইনকাম করে। রাজনীতিতে নিজের অজ্ঞাতেই তাকে আপোস করতে হয়। রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজির নামে দলের নির্দেশে একসঙ্গে চলতে হয় তাদের সঙ্গে রাজনীতিতে যারা একেবারেই মধ্যবিত্ত, যাদের হাতিয়ারের নাম জাতীয়তাবাদ। ঘরে জয়ার আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর স্বভাব, আর বাইরে কী? যাদের সঙ্গে মনোতোষের দল গাঁটছড়া বাঁধার লোভে ছুটছে তারাও আলাদা-আলাদাভাবে, কেবলি নিজেদের পরিবার পরিজন নিয়ে ওপরে ওঠার দৌড়ে নেমেছে। এই দৌড়ে নামবার পর চক্ষুলজ্জা বলে কোনো বস্তু বাকি থাকে না, নিজে বা বড়জোর নিজের বৌস্বামীছেলেমেয়ে ছাড়া সবাই অবলুপ্ত হয়। তখন ছিমছাম রুচির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে লোভ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ফুঁড়ে মাথাচাড়া দেয় মালপানি কবজা করার দুর্দান্ত লালসা।
ঘরে ও বাইরে, সংসারে ও রাজনীতিতে আপোস করে চলতে চলতে মনোতোষ অস্বস্তির মধ্যে দিন কাটায়, গ্রামের অভিজ্ঞতা এই অস্বস্তিকে পরিণত করে রীতিমতো যন্ত্রণায়। এই ব্যাপারটি হঠাৎ হয়নি, হঠাৎ কোনো ঘটনা বা দৃশ্যে মনোতোষ রাতারাতি অবাঞ্ছিত অবস্থায় পড়ল না। ঘরে আপোস করা তাকে বরাবরই অস্বস্তির মধ্যে রেখেছিল, জয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঝে মাঝে মানসিক টানাপোড়েন তার ছিলই। রাজনীতিতে উদ্দীপনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও এটা চাপা থাকেনি।
এই ব্যাপারটি মনোতোষের জন্য একটুও সুখের নয়, কিন্তু তার অস্বস্তির খবর দিয়ে কায়েস আহমেদ একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিতে সক্ষম হয়েছেন। ঘরে-বাইরে, সংসারে ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হাজার আপোস করতে হলেও এটা মনোতোষের স্বভাবে পরিণত হয়নি, এ নিয়ে তার ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভ কি একদিন তাকে আপোসমূলক মনোভাব ঝেড়ে ফেলতে বাধ্য করতে পারবে না?
এতসব সত্ত্বেও মনোতোষ কিন্তু দিনযাপন উপন্যাসের নায়ক নয়। গোটা মধ্যবিত্তের একটি স্বভাব তার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। আলাদাভাবে সে কোনো তাৎপর্য সৃষ্টি করতে পারে না, লেখক তাকে সেরকম গুরুত্বও দিতে চাননি। বইয়ের সর্বশেষ দৃশ্য তার প্রমাণ।
শেষ দৃশ্যটি ভয়াবহ ও কুৎসিত। এটা হল স্ত্রী সর্বাণীর সঙ্গে মাতাল বাসুদেবের যৌনসঙ্গমের আয়োজন। শুধু বাসুদেব বা সর্বাণী নয়, ঐ বাড়ির সমস্ত মানুষ কায়েস আহমেদের হাতের হ্যাঁচকা টানে ইতরশ্রেণীর জীবে পরিণত হয়েছে, তাদের আর মানুষ বলে চেনাবার উপায় নেই। পড়তে পড়তে পাঠক গ্লানিবোধ করতে পারেন, কিন্তু এখানেই কায়েসের সাফল্য। ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত যে মানুষ নামধারণের যোগ্যত হারিয়ে ফেলে—এই পরম সত্যটিকে ঘোষণা করে কায়েস যে সততার পরিচয় দেন তাতেই তিনি শিল্পী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
তবে, এই সত্যটি কায়েস আহমেদ নিজেও উপভোগ করেন না, সত্যটি উপলব্ধি করে তিনি একেবারেই সুখ পান না। তাই গোটা উপন্যাসে তাঁর অস্থিরতা বড় প্রকট, মাঝে মাঝে আপত্তিকর। কোনো চরিত্রের প্রতি তিনি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেন না, যে-পরিমাণ রক্তমাংস তাদের দেহের জন্য দরকার তা সরবরাহ করতে লেখকের আপত্তি বা অনীহা উপন্যাসের সংহতিতে বিঘ্নিত করেছে। নিজের উপলব্ধিকে জানাবার জন্য তাঁর একটি তাড়াহুড়ো ভাব রয়েছে, ফলে একেকটি চরিত্রের স্কেচ এঁকেই তিনি ক্ষান্ত হন, তাদের স্বাভাবিক বিকাশ দেখাবার জন্য ধৈর্য ধরার মতো অবসর তিনি পান না।
অথচ, তাঁর সততা সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল। এই সততার বলেই কায়েস আহমেদ কাহিনীর নামে কেচ্ছা বয়ান করার লোভ থেকে বিরত থাকতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথম উপন্যাসের গল্প বলার যে-প্রবণতা তাঁর মধ্যে দেখা গেছে, কাঁচা হলেও তা অব্যাহত থাকলে এখানে এসে পরিণতি লাভ করতে পারত। এই বইতে যে-শক্তির পরিচয় পাই, তাতে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ঐ প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করলে মসৃণ ও গতানুগতিক কাহিনী কেঁদে তিনি বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতে সক্ষম হতেন। গড়পড়তা সাফল্যের ঐ নিরাপদ ও সুনিশ্চিত পথ পরিহার করতে পারাটা তাঁর সততা ও শক্তিরই পরিচয়। অনেক দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও কায়েস আহমেদ নায়ক-বর্জিত, ছিমছাম গল্পোমুক্ত একটি ভাষাচলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। সততা ও শক্তির অধিকারী বলেই জীবনের জয়গান করার জন্য ইচ্ছাপূরণের নাবালক বাণী ছাড়ার পথ তিনি অনায়াসে পরিহার করতে পেরেছেন। অথচ, বইয়ের সর্বশেষ অনুচ্ছেদে ক্ষয়িষ্ণু বাড়িটির আসন্ন মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছে খুব স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের সাহায্যে।
এই পরিচ্ছেদে বালিহাসের একট দল, একটি ছুঁচো, অসুস্থ নিশিকান্ত এবং একটি প্যাঁচার চার রকম কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই চার ধরনের জীবজন্তুর ভেতরে নিশিকান্ত ছাড়া আর সবাই এই বাড়িতে এবং এই উপন্যাসে কেবল নতুন আগন্তুক নয়, রীতিমতো অবাঞ্ছিত। অবাঞ্ছিত জীবজন্তুর কার্যকলাপ, যথাক্রমে মালার মতো উড়ে যাওয়া, উঠানের ওপর দিয়ে দৌড়ে যাওয়া এবং মাথা ঘুরিয়ে একটি শব্দের উৎস সন্ধান করা-সবগুলোই আপত্তিকর। এই ঘটনাগুলো উটকো, উপন্যাসের শরীরে মিশে যেতে পারেনি।
