মারিবার হ’লো তার সাধ
কাল রাতে—ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’লে তার সাধ…
আটবছর আগে একদিন (।)
জীবনানন্দ দাশ
.
না, ফাল্গুনের এখন ঢের দেরি। বসন্তকালের রাত্রি অন্ধকার নয়, তখন ঘোরতর বিকাল। জ্যৈষ্ঠমাসের শেষ দিন যতক্ষণ পারে চড়া রোদ ঝেড়েছে আকাশ জুড়ে। পবিত্র ঈদের
একদিন পর কোরবানির পবিত্রতর গোরুখাসির রক্ত দীননাথ সেন রোডের এখানে ওখানে শুকিয়ে কালচে হয়ে এসেছে, নিহত জীবজন্তুর বর্জ্য ছড়ানো রয়েছে সতীশ সরকার রোডের আগাগোড়া, তার গন্ধে চারদিকে দম বন্ধ করা গরম বাতাস। এরই মধ্যে তিনতলা বাড়ির ছোট ফ্ল্যাটে লোহার দরজা ও কাচের জানলা আটকে দিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে নিজের গলাটা টাইট করে বেঁধে সটান ঝুলে পড়লেন কায়েস আহমেদ। বাইরে তখন অন্ধকারে শেষ নিশ্বাসটা টেনে নেওয়ার সুযোগ কায়েস নিলেন না।
কায়েস আহমেদের আত্মহত্যার খবর এতদিনে সারা দেশে প্রচারিত হয়ে গেছে। তবে কায়েস জনপ্রিয় লেখক ছিলেন না, তাঁর পরিচিতিও কম, তাঁকে নিয়ে চারদিকে খুব একটা উচ্ছ্বাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কায়েস আহমেদের আগ্রহী পাঠকদের বেশির ভাগই সব নতুন লেখক। নিজেরা লেখেন, কষ্টেসৃষ্টে পয়সা জোগাড় করে পত্রিকা বার করেন এবং প্রতিষ্ঠিত লেখকদের উপেক্ষা গ্রাহ্য না করে সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন, কায়েসের এই আকস্মিক মৃত্যুতে একটু শূন্যতা বোধ করবেন তাঁরা। তাঁর মতো উদ্বেগ ও অস্বস্তি নিয়ে, যন্ত্রণা ও সততা নিয়ে সাহিত্যচর্চা করেন কেবল নতুন লেখকরা। প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ লেখকের কাছে লেখাটা হল অভ্যাস মাত্র-চাকরিবাকরি আর ব্যবসাবাণিজ্য আর দেশপ্রেমের ঠেলা সামলাতে এনজিও বানিয়ে মালপানি কামাবার সঙ্গে তখন এর কোনো ফারাক থাকে না। তখন লেখায় নিজের সুখ আর বেদনা জানান দেওয়াটা হয়ে দাঁড়ায় তেল মারা আর পরচর্চার শামিল। লেখক হিসাবে সেই সামাজিক দাপট কায়েসের শেষ পর্যন্ত জোটেনি। তাই, কেবল মানুষের খুঁত ধরে আর দুর্বলতা চটকে সাহিত্যসৃষ্টির নামে পরচর্চা করার কাজটি তাঁর স্বভাবের বাইরেই রয়ে গেল। আবার ‘এই দুনিয়ার সকল ভালো/আসল ভালো নকল ভালো … এই ভেজাল সুখে গদগদ হয়ে ঘরবাড়ি, পাড়া, গ্রাম, সমাজ, দেশ, পৃথিবী, ইহকাল ও পরকাল সবকিছুতেই তৃপ্তির উদ্গার শুনিয়ে মধ্যবিত্ত পাঠকদের তেল মারার কাজেও তিনি নিয়োজিত হননি।
কায়েস আহমেদ সবসময় ছিলেন নতুন লেখক। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন নতুন লেখকের প্রেরণা ও কষ্ট এবং নতুন লেখকের আকাঙ্ক্ষা ও সংকল্প নিয়ে। যা দেখতেন তা-ই তাঁর কাছে নতুন। চারপাশের সবকিছুই তাঁর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা চাই। তাঁর দেখা তো স্রেফ অবলোকন নয়, এই দেখার প্রতিশব্দ হল পর্যবেক্ষণ। তাও হল না, অভিধান যা-ই বলুক, তাঁর দেখা মানে অনুসন্ধান। তাঁর জিজ্ঞাসার আর শেষ ছিল না, যতবার দেখেছেন ততবারই শুরু করেছেন ফের শুরু থেকে। তাই মেধা ও শক্তির অমিত সম্ভাবনা তিনি যা দেখিয়ে গেছেন তার বিকাশ ঘটিয়ে যাননি। অথচ কায়েস তো অল্পদিন লেখেননি, রোগা রোগা ৪টে বই বেরিয়েছে, কিন্তু হলে কী হবে সবগুলো বই থেকেও নিটোল একটি কায়েস আহমেদকে শনাক্ত করা কঠিন। তাঁর লেখা কেবলি কাঁপছে, কোথাও তাঁকে থামতে দেখি না। থিতু হয়ে নিজের অনুসন্ধানকে ধীরেসুস্থে বলবেন— সেই সময় তাঁর কই? প্রথম বইতেই দেখি, গল্প বলার, জমিয়ে গল্প বলার একটি রীতি তিনি প্রায় রপ্ত করে ফেলেছেন। আভাস পাওয়া যায় এই রীতিটিই দাঁড়িয়ে যাবে একটি পরিণত ভঙ্গিতে, পাঠককে সেঁটে রাখার জাদু তিনি ঠিক আয়ত্ত করে ফেলবেন। কিন্তু না, একটি রীতিতে মকশো করার লেখক তিনি নন। পরের বইতেই নিজের রীতিকে, রপ্ত কিংবা প্রায়-রপ্ত রীতিকে, অবলীলায় ঠেলে কায়েস পা বাড়িয়েছেন নতুন রাস্তার দিকে। তাঁর এইসব কাণ্ড কিন্তু আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে নয়, মানুষের গভীর ভেতরটাকে খুঁড়ে দেখার তাগিদেই একটির পর একটি রাস্তায় তাঁর ক্লান্তিহীন পদসঞ্চার। তাঁর পায়ের নিচে অবিরাম ভূমিকম্প, এই পথেই তাঁর ছুটে চলা। একটি পথ পাড়ি দিয়ে তিনি আর পেছনে ফিরে তাকান না। আবার শান্ত, সন্তুষ্ট ও নিস্তরঙ্গ সমতলও তাঁকে কখনো কাছে টানে না। যা সাধারণ, যা নিরাপদ, যা আয়ত্তের ভেতর তার দিকে কায়েসের ঝোঁক নেই। চারটি বই তাই তাঁর নতুন, একটির থেকে আরেকটি যত-না উত্তরণ তার চেয়ে অনেক বেশি আলাদা।
কোনো ব্যাপারেই নিশ্চিন্ত থাকা কায়েস আহমেদের ধাতে ছিল না, নিশ্চিত জীবনযাপনের সম্ভাবনাকে পর্যন্ত বিনাশ করতে তাঁর জুড়ি পাওয়া ভার। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ব্যাপার জানি – বাংলায় অনার্স নিয়ে ভরতি হবার পর খুব ভালো ফল করার সব লক্ষণই তিনি দেখিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও কিংবা বলা যায় ঐ কারণেই বছর ঘুরতে-না-ঘুরতে ইউনিভার্সিটি ছেড়ে দিলেন। দেশভাগের পর বাবামায়ের কোলে করে এখানে চলে আসেন, তিনি একটু বড় হতে বাবামাতাই গ্রামে ফিরে গেলেন। তিনি কিন্তু গেলেন না, জুবিলি স্কুলে পড়তেন, রয়ে গেলেন মামার সঙ্গে। ঐটুকু ছেলে, বাবামায়ের সঙ্গে থাকার নিরাপত্তা অনায়াসে প্রত্যাখ্যান করলেন। মামার সঙ্গে একটি পারিবারিক পরিবেশে বাস করার ছেলেও তিনি নন, স্কুলের দরজা পেরিয়েই থাকতে লাগলেন একা, সম্পূর্ণ একা, চললেন নিজের রোজগারে। সকাল সন্ধা প্রাইভেট টুইশনি করে নিজের খাওয়া-পরা ও লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন, কারও কাছে কখনো হাত পাতেননি। ইউনিভার্সিটি ছাড়ার পর থেকে কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছিলেন, স্বাধীনতার পরও একটি দৈনিকে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কাগজেই তাঁর ভালো লাগেনি। কোনো জায়গাতেই আপোস করার মানুষ তিনি নন। পেশা হিসাবে কায়েসের প্রিয় ছিল শিক্ষকতা। ১৯৮০ সালে ঢাকার একটি প্রথম শ্রেণীর স্কুল তাঁকে যেচে চাকরি দেয়। নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন, ছেলেমেয়েরাও তাঁকে খুব ভালবাসত, সহকর্মীদের সম্মানও পেয়েছিলেন। ডিগ্রির অভাবে সেখানে কর্মচ্যুত হওয়ার ভয় ছিল বইকী। বন্ধুদের অনুরোধেও ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে বসলেন না। অনিশ্চিত অবস্থাই তাঁর কাম্য, একটু উদ্বেগ না-থাকলে তিনি বাঁচবেন কী করে? শেষ কয়েক বছর আর্থিক অনটন ছিল নিদারুণ। কিন্তু স্কুলে কাজ নেওয়ার পর হাজার চাপ সত্ত্বেও প্রাইভেট টুইশানি করলেন না।
১৯৬৯ সালে কায়েসের বাবার মৃত্যু হল তাঁদের গ্রামে। ঐ সময় বাড়ি যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু পার্সপোর্ট করতে গিয়ে দেখা গেল তিনি যে পাকিস্তানের নাগরিক তার কোনো প্রমাণ নেই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবার দশা। যেতে পারলেন না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গেলেন, ঐ বছর বেশ অনেকটা সময় কাটিয়েছেন নিজের গ্রামে মায়ের সঙ্গে। মনে হয়, একটু বড় হওয়ার পর থেকে ঐ কয়েকটা দিন তিনি শীতল ছায়ায় কাটিয়েছেন। কিন্তু মায়ের ভালোবাসার ছায়ায় থাকা তাঁর কি পোষায়? যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই কায়েস ঢাকায় ফিরে এলেন, নিজের গ্রামে আর কোনোদিন যাননি। বড়তাজপুর গ্রামে তাঁদের পুরনো নোনাধরা বাড়ির খিড়কির দুয়ারে শেফালি গাছের নিচে মোড়া পেতে বসে ছেলের জন্য পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মায়ের চোখে ছানি পড়ে গেল। এই দৃশ্যটা মনে হলেই কায়েস বড্ড অস্থির হয়ে পড়তেন। কিন্তু এই অস্থিরতা ও উদ্বেগ তিনি বরং মেনে নেবেন, কিন্তু গ্রামে গিয়ে কটা দিন মায়ের আঁচলের নিচে থেকে চোখজোড়া ভরে ঘুমিয়ে আসার চিন্তাও তাঁর স্বভাবের বাইরে।
কায়েসের বাড়ি পশ্চিম বাংলার হুগলি জেলার বড়তাজপুর গ্রামে, তিনি ঐ গ্রামের বিখ্যাত শেখ পরিবারের ছেলে। বিশিষ্ট লেখক এস. ওয়াজেদ আলীর তিনি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আত্মীয়দের মধ্যে ঢাকায় যাঁরা সুপ্রতিষ্ঠিত, নানা ক্ষেত্রে যাঁরা বিশিষ্ট, তাঁদের সঙ্গে তাঁর কিছুমাত্র যোগাযোগ ছিল না। একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা কায়েসের একটি লেখায় কয়েকটি চরিত্রে নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের আভাস পেয়ে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, এর লেখক তাঁদের বড়তাজপুর গ্রামের এমনকী তাঁদের পরিবারেরই কেউ না-হয়ে যায় না। অভিভূত হয়ে তিনি লেখকের খোঁজ করেছিলেন। কী করে কী করে কায়েস তা জানতেও পারেন। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি। কেন? কাউকে এড়িয়ে চলার মানুষ তো তিনি নন! তবে? নিজের গ্রামে, পরিত্যক্ত গ্রামে, ছেলেবেলাকে নস্টালজিয়ার ভেতর সমীচীন মনে করেছেন। তাকে হাতের নাগালে এনে সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানেই তো সব বেদনার অবসান। সেইসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রক্তাক্ত হওয়ার শিহরন বরং তাঁকে নতুন নতুন অনুভূতির সন্ধান দিতে পারে। নিজের এখনকার সত্তার মতো নিজের একালে ও নিজের সেকালে খোঁড়াখুঁড়ি করা হল তাঁর অনুসন্ধানের পদ্ধতি। মানুষ নিয়ে যে-জিজ্ঞাসা তাঁকে এক লেখা থেকে আরেক লেখায়, এক রীতি থেকে আরেক রীতিতে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াল তার জবাব খোঁজার জন্য নিজেকে উলটেপালটে দেখলেও তিনি পেছপা হননি। কায়েসের বিয়ে করার সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজের। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ তো ছিলই না, সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধুদের কথাতেও কর্ণপাত করলেন না। এখানে জিজ্ঞাসা এসেছে বিশ্বাসের চেহারা নিয়ে, তা হল এই : প্রেম দিয়ে স্ত্রীর দুরারোগ্য মানসিক ব্যাধি নিরাময় করতে পারবে না কেন? প্রায় দশটি বছর ধরে স্ত্রীর সেবা করলেন, ভালোবেসে গেলেন কিশোর প্রেমিকের মতো, যত্ন করলেন মায়ের হাত দিয়ে, আগলে রাখলেন বাপের চোখ দিয়ে। কিন্তু স্ত্রীর ঝাপসা, অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য যন্ত্রণা ও সুখ তিনি শেষ পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারলেন না, হৃদয় ও বিজ্ঞানের শোচনীয় ব্যর্থতার একটু দমে গিয়েছিলেন বইকী! কিন্তু এই ভয়ংকর ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যেও কায়েস তাঁর জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজেই গেছেন।
কারও কাছে কায়েস কোনো অভিযোগ করেননি, করুণা নিতে তাঁর ঘৃণা হত, সহানুভূতি তাঁর কাছে করুণারই ছদ্মবেশমাত্র। জীবনকে বোঝার জন্য, মানুষের রহস্য জানার জন্য যে-অনুসন্ধান-প্রক্রিয়া চালান তার প্রধান মিডিয়াম ছিলেন তিনি নিজে। এজন্য চড়া দামও দিতে হয়েছে তাঁকে। আর্থিক অনটন, উত্তেজনা ও উদ্বেগ—সবই বহন করতে হয়েছে একা একা। শেষ মুহূর্তে যা করলেন তারও প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সম্পূর্ণ নিজে। আত্মহত্যার মধ্যে কায়েস কী জানতে চাইলেন? মানুষের জীবনের রহস্য খুঁজতে খুঁজতে নিজের জীবনভর অনুসন্ধানের চরম জবাবটি পাওয়ার জন্যই কি মরিবার হল তাঁর সাধ? মানুষের রহস্যময়তা ভেদ করতে না-পেরে, তিনি কি পরম জিজ্ঞাসাটি ছুড়ে দিলেন প্রকৃতির দিকে? কায়েসের কোনো সাধ আর সাধ থাকে না, তাঁর সব সাধই রূপ নেয় সংকল্পে। তাঁর সংকল্প আর জিজ্ঞাসা পরস্পরের সঙ্গে অচ্ছেদ্য। কায়েস আহমেদের আত্মহত্যা কি তাঁর অনন্ত জিজ্ঞাসা অব্যাহত রাখার শেষ সংকল্প?
