প্রসঙ্গ : সূর্য দীঘল বাড়ী
সূর্য দীঘল বাড়ী আমাদের চলচ্চিত্রে একচ্ছত্র দাপটে প্রতিষ্ঠিত ন্যাকা, ছ্যাবলা ও নকলবাজে গিজগিজ করা বাড়িঘর কাঁপাবার জন্য প্রথম প্রকৃত আঘাত। এর আগে ভালো ছবি তৈরির চেষ্টা আরও কয়েকবার হয়েছে, কিন্তু এরকম একনিষ্ঠ ও সর্বাঙ্গীণ সৎ প্রয়াস লক্ষ করা যায়নি। এখানে দেখা গেল, ছবির নির্মাতাগণ দর্শকদের কেবল প্রথমরিপুতাড়িত মাংসপিণ্ড জ্ঞান করেন না। কিংবা তাঁদের নিচুমানের বুদ্ধিবৃত্তির লঘুস্বভাব মানুষ বলেও গণ্য করা হয়নি। তাই সংক্ষিপ্ত বেশবাস সত্ত্বেও গ্রামের দরিদ্র তরুণীর প্রতি দর্শকদের স্বাভাবিক সম্ভ্রমবোধ নষ্ট হয় না। অথবা এই ছবি দেখতে দেখতে সৃজনক্ষমতাশূন্য মহাপণ্ডিতের ইন্টেলেকচুয়াল জ্যাঠামো সহ্য করার দরকার নেই। আমাদের স্বাভাবিক মানববৃত্তির ওপর এরকম আস্থাবান কোনো ভদ্রলোক আমাদের দেশে এর আগে কখনো ছবি তৈরি করেননি। আমাদের ওপর এই আস্থাস্থাপনের জন্য দর্শকদের পক্ষ থেকে তাঁদের সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাই।
এই ছবি বাংলাদেশের গরিব ও শোষিত গ্রামবাসীর জীনযাপনের একটি অন্তরঙ্গ পরিচয়। সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে গরিব মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রায় বিস্ফোরণের পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। তাঁদের প্রতি সংশ্লিষ্ট মাধ্যমসমূহের উদার পক্ষপাতিত্বও খুব চোখে পড়ে। তাঁদের শোষণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছোটখাটো বিদ্রোহ পর্যন্ত ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু রাজনীতিতে এইসব লোক যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছেন, শিল্পক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম কমই দেখা যায়। গ্রামের গরিব লোকদের জন্য কপট ভালোবাসা দেখিয়ে রাজনীতিবিদদের মতো এইসব শিল্পমাধ্যমের মহারথীগণ নিজেদের শহরবাসকেই বিলাসময়, সুপ্রতিষ্ঠিত ও নিরাপদ করে তুলেছেন। এঁদের নিয়ে লেখা অধিকাংশ গল্প উপন্যাসের মতো চলচ্চিত্রও শেষ পর্যন্ত ইচ্ছাপূরণের কাহিনী দিয়ে পঙ্গু শিল্পপ্রয়াস ছাড়া আরকিছুই হয় না। মানুষের বেদনাকে নিজের অভিজ্ঞতা বা চেতনায় অনুভব করতে না-পারলে তাদের সমস্যা আসে কেবল থিওরির দৃষ্টান্ত হিসাবে। থিওরি দিয়ে মানুষকে দেখলে বানানো মানুষের বানোয়াট লফঝম্পই দেখানো যায়, মানুষের জীবনযাপন শিল্পে স্পন্দিত হয়ে ওঠে না। আবার কখনো কখনো তরল ও শিথিল বাষ্পীয় তুলতুলু ভালোবাসায় ফেঁপে উঠে কাঁদলে এবং কাঁদতে কাঁদতে মানুষের পিঠ চাপড়ালে তাতেও যথার্থ মানুষের লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া দায়। মানুষের বেদনাকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারলেই থিওরি ও বাষ্পীয় অসারতাকে ছাড়িয়ে ওঠা সম্ভব। মানুষের জন্য বেদনাবোধ, বেদনার জন্য বেদনাবোধ তখন শিল্পবোধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মেলে এবং এই দুটোকে তখন আর বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব হয় না, তার দরকারও পড়ে না। তখন আসে শিল্পীর বহুপ্রার্থিত সংযম। বেদনার গভীর উপলব্ধি তাকে পরিণত করে ঋজু ও মেরুদণ্ডবিশিষ্ট জীবে, বেদনায় তখন আর এলিয়ে পড়েন না। কাঁচা, তরল ও শিথিল আবেগ এবং লঘু সংস্কৃতিবোধের বিকার থেকে মুক্ত করে শক্ত হাতে ছেঁটে ফেলতে পারেন বানোয়াট অনুভবের মেদ ও ফেনা।
এই কঠিন হাতের সম্ভাবনা দেখা গেল সূর্য দীঘল বাড়ী চলচ্চিত্রে। মানুষের বেদনা, ক্ষোভ ও অপমানকে নিজেদের সমস্ত চেতনা দিয়ে অনুভব করার প্রবল ও গভীর ব্যর্থতা এই চলচ্চিত্রের নির্মাতাদের উদ্বুদ্ধ করেছে মানুষ সম্বন্ধে একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হতে। ফলে বানোয়াট ভাবনায় ফেঁপে ওঠেননি তাঁরা, তরল ও শিথিল আবেগে নুয়ে পড়েননি একেবারে। কাঁচা স্যাঁতসেঁতে মানুষ এই ছবির কোথাও ঠাঁই পায়নি। সত্যি তো, এইসব গরিব ও মার-খাওয়া মানুষের জীবনে ভিজে ভিজে, রংবেরঙের শখের আবেগ কি পোষায়? শখের ভালোবাসা দিয়ে ফাঁপা শিক্ষিত ভদ্রলোকরা তাদের নিয়ে ছবি করার সময় কী লেখার সময় নিজেদের ভিত্তিহীন চটচটে অনুভূতি তাদের মধ্যে নিঃশেষে দান করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন, এই ছবিতে দেখলাম কী অসাধারণ সংযমের সঙ্গে পরিচালক দুজন নিজেদের মধ্যবিত্ত আবেগ-বিতরণের লোভ জয় করেছেন।
সূর্য দীঘল বাড়ীর সাফল্যের একটি প্রধান কারণই হল পরিচালকদের মাত্রাবোধ। চরিত্রসমূহের যার যা ভূমিকা তাকে তার বেশি চাপ দেওয়া হয়নি, দুঃখকষ্ট তাদের যা থাকার কথা, পর্দায় তা-ই দেখতে পাই। গরিব গ্রামবাসীর ভালোবাসা কী কষ্ট কী অপমান দেখাবার সময় এরকম মাত্রা বজায় রাখা খুব দূঃসাধ্য ব্যাপার। গ্রামের গরিব লোকজন কিন্তু এভাবেই প্রেম করে। বাড়ির পেছনে নিকানো বাঁশঝাড় বা রেললাইনের ধারে জুতসই জায়গা খুঁজে নেওয়া তাদের জন্য খুব দুরূহ কাজ। কালোকিষ্ঠি গতর ও ফাটা হাত-পা ছড়িয়ে বসে কলেজ-ইউনির্ভার্সিটির ছেলেমেয়েদের মতো গদগদ হওয়া কি তাদের সাধ্যে কুলায়? না, নাটক নভেল পড়ে অত প্যানপ্যাননি তারা রপ্ত করেছে? ন্যাকা ও ছ্যাবলা চলচ্চিত্রের কথা ছেড়েই দিলাম, এখানকার গল্পে উপন্যাসেও চাষাভুষাদের প্রেমের দৃশ্যে ঝিরঝিরে ভালোমন্দ দুটো হাওয়া ছাড়ার লোভ সামলাতে পারেন কজন? এই লোভ জয় করেছেন এই দুজন—মসিহউদ্দিন শাকের ও নিয়ামত আলী। অনুতপ্ত স্বামী পরিত্যক্তা স্ত্রীর সঙ্গে ঘর করার জন্য উদ্গ্রীব, তার প্রেমে সে একেবারে অস্থির। কিন্তু তার মধ্যে ভদ্দরলোকের ছিঁচকাঁদুনে দশা কোথাও দেখা গেল না। কিন্তু যন্ত্রণাকাতর এই জেদি লোকটিকে চিনতে তো কোনো অসুবিধাও হয়নি। অসুস্থ ছেলের সেবায় ব্যস্ত স্ত্রীর কাছে তামাক সাজার অজুহাতে আগুন চাইতে গেলে জ্বলন্ত কয়লায় তার হাতে ছ্যাঁকা লাগে, তখন প্রেম ও অনুতাপ তাকে কতটা যন্ত্রণাকাতর করে তুলেছে দর্শক তা একেবারে মর্ম দিয়ে বোধ করতে পারেন। আবার প্রাক্তন স্বামী ছিনিয়ে নিয়েছে একটি ছেলেকে, সেই ছেলের জন্য মায়ের তীব্র ও প্রবল ব্যাকুলতা প্রকাশের জন্য তরুণী মাকে একবারও নেতিয়ে পড়তে হয়নি। ছেলেটি অসুস্থ হলে তাকে যেভাবে সে সেবাযত্ন করে তাতেই তার বাৎসল্যের চরম প্রকাশ দেখা গেল। এইভাবে সংযমের মধ্যে, মাত্রাবোধের সাহায্যে মানুষের বেদনা, ক্ষোভ -ও অপমান রূপায়িত হয়েছে সূর্যদীঘল বাড়ীতে।
এই ছবিতে ক্যামেরা কাজ করে জীবন্ত শিল্পীর মতো। মনে হতে পারে, ক্যামেরাকে অগাধ স্বাধীনতা দিয়ে পরিচালকগণ বসে ছিলেন অনেক পেছনে। একটির পর একটি দৃশ্য সাজানো হয়েছে, পরিচালকদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। পেছনে বসে খুব শক্ত ও পরিশ্রমী এবং সর্বোপরি সৃজনশীল হাতে নিয়ন্ত্রণ না-করলে ক্যামেরার এই স্বতঃস্ফূর্ততা এভাবে অনুভব করা যেত না।
এই সংযমবোধ থেকে পরিচালকদের মধ্যে এসেছে একধরনের অতিরিক্ত সতর্কতা, এই সতর্কতাটি প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। অভিনয়েও সবাই খুব সচেতন, সচেতনতার ফলে বাংলা চলচ্চিত্রের অবধারিত আতিশষ্য এড়ানো গেছে। কিন্তু এর ফলে মাঝে মাঝে এসে পড়েছে আড়ষ্টতা। ক্যামেরা কখনো কখনো কেবল দৃশ্যগুলো এনেই ক্ষান্ত হয়, ফলে বাস্তবতার পরাকাষ্ঠা হলেও এই ছবি কোথাও কোথাও ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে পারে না। এখানে চিত্রিত বাংলার গ্রামের মানুষের একটি প্রধান দিক হল কুসংস্কারের প্রতি তাদের অযৌক্তিক আনুগত্য। বিশেষরকম অবস্থান একটি বাড়িকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তোলে, সেই বাড়িটি হয়ে ওঠে অপয়া, সেখানে থাকলেই মানুষের অপঘাতে মৃত্যু, রোগ-ব্যাধি এবং অবশেষে ফের গৃহত্যাগ অবধারিত—এইরকম একটি সংস্কার গ্রামবাসীর রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। আবার ঘটনাপ্রবাহও এই সংস্কারকে মানুষের মনে শক্তভাবে গেঁথে দেয়। কিন্তু এই ছবিতে মানুষের অভিব্যক্তি, বিভিন্ন ভৌতিক কাণ্ডে তাদের প্রতিক্রিয়ার এই সংস্কার ও ভয়কে ঠিকমতো ঠাহর করা যায় না। গোটা গ্রামবাসী যে সংস্কার দিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন, যার সুযোগ নিয়ে গ্রামের অল্প কয়েকজন টাকাপয়সাওয়ালা শয়তান অবাধে হারামিপনা করে চলে এমনকী নরহত্যার মতো কাজ করতেও পেছপা হয় না—তা যেটুকু এসেছে তা কেবল বিবৃতির মধ্যে, অভিনয় বা অভিব্যক্তিতে তা অনুপস্থিত। পরিচালকগণ অন্যান্য অনেক চলচ্চিত্রকার কী লেখকের মতো গ্রামবাসীদের পিঠ চাপড়াতে আসেননি যে মনে করব গ্রামবাসীদের বিজ্ঞানমনঙ্কতার পরিচয় দেওয়ার জন্য তাঁরা তাঁদের অযৌক্তিক সংস্কারাচ্ছন্নতা দেখানোটা এড়িয়ে গেছেন। না, তা হতেই পারে না। মানুষের বেদনা ও অপমানকে যাঁরা নিজেদের বোধ দিয়ে অনুভব করেন তাঁদের মধ্যে এরকম পৃষ্ঠাপোষকসুলভ মনোভাব আসতেই পারে না। বরং মনে হয়, শিল্পী দুজন অতিরিক্ত সতর্ক ছিলেন এই ভেবে যে, সংস্কারটিকে বেশি নিয়ে এলে তা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যেতে পারে এবং তাতে ছবির শিল্পমান নেমে আসতে পারে। কিন্তু তা হবে কেন? গ্রামের নিরক্ষর দরিদ্র মানুষ অনাদিকাল থেকে বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষের দ্বারা, রাষ্ট্রের দ্বারা, সামাজিক কাঠামোর দ্বারা শোষিত ও অপমানিত হয়ে আসছেন, এই শোষণেরই একটি বড় হাতিয়ার হল তাঁদের ধর্মবোধ এবং ধর্মবোধের বাবা কুসংস্কার। এই দেখাতে গেলে ছবির গাঁথুনি শিথিল হবে কেন? শিথিল নয়, একটু বেপরোয়া হলে এই শতাব্দীতেও তাদের আদিম ধরনের জীবনযাপনের ছবি সম্পূর্ণ হতে পারত।
ছবির শেষভাগে দক্ষগৃহ পেছনে ফেলে বাস্তুহারা মানুষের গৃহত্যাগের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। নতুন বাড়ির খোঁজে তাঁদের এই যাত্রা বাঁচার জন্য মানুষের অব্যাহত জীবন-সংগ্রামের ইঙ্গিত দেয়। ছবিতে এই কথাটি বোঝা যায় বইকী। কিন্তু বোধটিকে দর্শকের চিত্তে ভালোভাবে গেঁথে দেওয়ার জন্য আরেকটু সময়, আরেকটু স্পেসের দরকার ছিল। এই দৃশ্য বড় সংক্ষিপ্ত, ফলে অস্পষ্ট। গোটা ছবিতে মানুষের ব্যক্তিগত ও সঙ্ঘবদ্ধ জীনবযাপনের যে-সংগ্রাম, অপমান, পরাজয় দেখি, আকস্মিকভাবে তার সমাপ্তি ঘটে যার বলে বিষয়টি দর্শকদের চেতনায় দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রাখতে পারে না। চিরকালের একটি মহৎ শিল্পকর্ম ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম ছবিতে দেখি নদীর বুক রুদ্ধ হওয়ায় একটি গোটা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেও মানুষের অব্যাহত জীবনযাত্রার সংগ্রামমুখরতার কথা ঘোষিত হয় একটি নারীর বাঁশি বাজানো শিশুকে স্বপ্নে দেখার মধ্যে। দৃশ্যটি দর্শকের চেতনাকে ব্যথায়, বেদনায়, ক্ষোভে এবং একই সঙ্গে আশায় পরিপূর্ণ করে তোলে, তাঁর সমস্ত অগোছালো উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে একটি সংহত আবেগে এবং দর্শক আগের চেয়ে পরিণত মানুষে রূপান্তরিত হন। কিন্তু সূর্য দীঘল বাড়ী ছবিটি দর্শকের মধ্যে এরকম আবেগসঞ্চার করতে পারে না কেন? মনে হয় পরিচালক দুজন বেশি সতর্ক ছিলেন। আর-একটু বললেই যদি বাড়াবাড়ি হয়—এই ভয়ে তাঁরা পা টিপে টিপে এগিয়েছেন। হতে পারে, আমাদের এখানকার ন্যাকা ন্যাকা ছবি দেখতে দেখতে এবং ছিঁচকাঁদুনে গল্প-উপন্যাস পড়তে পড়তে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই আড়ষ্ট হওয়ার মধ্যে। কিন্তু এটা তাদের দরকার ছিল না। যে-শক্তির বলে সচেতনতা ও সংযম শিল্পীস্বভাবের অন্তর্গত হয়, যার বলে শিল্পী বিনা দ্বিধায় নিজেকে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেন, গোটা ছবির মধ্যে তার পরিচয় নানাভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। তবে এই দ্বিধা কেন?
