আসহাবউদ্দীন আহমদের ক্রোধ ও কৌতুক
সীমাহীন রাগ ও ক্ষোভ নিয়ে বাঁশ সমাচার লিখেছি। লেখাটি যদি তোমাদের কাছে হিউমারাস বলে মনে হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, আমাদের মনের ঘর থেকে বের হবার সময় আমার রাগ রঙীন শাড়ী পরে রাগিনী সেজে তোমাদের কাছে হাজির হয়েছে আর তোমাদের চিত্তবিনোদন করেছে।
শানে নজুল : বাঁশ সমাচার। আসহাবউদ্দীন আহমদ।
.
আসহাবউদ্দীন আহমদের যাবতীয় রচনার উদ্দেশ্য একটিই— তা হল আমাদের সমাজব্যবস্থার ওপর তাঁর সীমাহীন অনাস্থা ও ক্রোধের প্রকাশ ঘটানো। এই সমাজ-কাঠামো যে-রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, যে-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের অবাধে লুটপাট করার অধিকারকে গণতন্ত্র বলে ঘোষণা করে কেবল অস্ত্রের খেলা দেখিয়ে বিদেশি মুরুব্বিদের জোরে দেশবাসীকে পায়ের নিচে রাখার ইন্ধন জোগায়, এমন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে যা ছেলেমেয়েদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের রক্তের আত্মীয়তা অস্বীকার করতে শেখায়, সম্পদের ঘোরতর অন্যায় ও ঘৃণ্য বিভাজনব্যবস্থার তৈরি করে—কোনোকিছুই তাঁর রাগী চোখের লাল সংকেত এড়াতে পারে না। তাঁর লক্ষ্য সমাজব্যবস্থাকে আক্রমণ করা, এজন্য তিনি সমাজবাস্তবতা তুলে ধরার দায়িত্বে নিয়োজিত।
তাই মরিচ, পেঁয়াজ, তেল, নুন, শুঁটকি মাছ এবং কাঠ, খড়, বাঁশ থেকে কালি, কলম, কাগজের উত্তরোত্তর মূল্যবৃদ্ধি এবং এর পাশাপাশি উগ্র জাতীয়তাবাদের দংশন, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে লুটেরা বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি, ধর্মের নিশান উড়িয়ে ব্যাপক নরহত্যা ও নারীধর্ষণ — যা-কিছু মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে—সবই তাঁর লেখার উপাদান। উপাদান না বলে প্রসঙ্গ বলাই ঠিক, এর কোনোটি তাঁর রচনায় একাগ্র মনোযোগ পায় না, এর কোনোটিকেই বিস্তারিত হওয়ার সুযোগ তিনি দেন না বললেই চলে, বক্তব্যপ্রকাশের জন্য যখন যেটা দরকার তা-ই নিয়ে কথা বলতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে যান; একটি প্রসঙ্গের নিটোল পরিসমাপ্তি ঘটাবার আগেই নিজের বক্তব্যকে স্পষ্ট করার অস্থির তাগিদে যত তাড়াতাড়ি পারেন আরেকটি প্রসঙ্গের অবতারণা ঘটানো তাঁর রচনার প্রধান লক্ষণ বলে শনাক্ত করা যায়। সমাজব্যবস্থাকে আঘাত করার এই পদ্ধতি লেখক হিসাবে তাঁকে বৈশিষ্ট্য অর্পণ করেছে।
যে-কোনো শিল্পীর কাজেই কোনো-না-কোনোভাবে সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে। যে-কলাকৈবল্যবাদী কবি সমাজবিমুখ বলে পরিচিত হওয়ার উৎসাহে কেবল প্রকরণ নিয়েও কালোয়াতি করেন, তাঁর ছন্দোবদ্ধ চরণসমূহে একটু খোঁড়াখুঁড়ি করলেই সমকালীন মানুষের অস্থিরতা, হতাশা ও আকাঙ্ক্ষার স্পন্দন অনুভব করা যাবে। মানুষকে বাদ দিয়ে যিনি কেবল প্রকৃতির রূপ দেখতে মগ্ন, তিনিও মানুষের দীর্ঘদিনের যৌথ সৌন্দর্যচর্চার সামান্য একটুখানি প্রকাশ করে থাকেন। প্রকৃতি নিজে নিজে তেমন সুন্দর নয়, মানুষই তাকে তিলে তিলে সুন্দর করে গড়ে তুলেছে। সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে কাজটি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করা, নির্লিপ্ত প্রকৃতিতে নিজের সুবিধায় ব্যবহার করা এবং এর মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে বার করা কোনো বিচ্ছিন্ন কাও নয়। তবে আধুনিককালে শিল্পের মাধ্যমগুলোতে যাতায়াত অনেক প্রত্যক্ষ এবং স্পষ্ট, তাই মানুষের দৈনন্দিন জীবনাপন সেখানে ইচ্ছাপূরণের কোনো কেচ্ছা না হয়ে সমাজবাস্তবতার ছবি হয়ে প্রকাশিত হয়।
কথাসাহিত্য ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সমাজের ভেতরের অবস্থাটিকে, সামানে নিয়ে এসে পাঠককে বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। উপন্যাস কী গল্পে কী নাটকে এই বাস্তবতা প্রতিফলনের আধার হল চরিত্র, সংলাপ, ঘটনা, স্বপ্ন এবং সর্বোপরি কাহিনীর বিন্যাস। নিটোল কাহিনী নিশ্চয়ই খুব জরুরি নয় : ছিমছাম গল্প বরং জীবনের প্রকৃত চেহারাটি খুলে ধরার চেয়ে তাকে আড়াল করে রাখার কাজেই লিপ্ত থাকে বেশি। তবে কাহিনীর একটি ধারাবাহিক বিন্যাস ছাড়া কোনোরকম বাস্তবতাই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, মানে দাঁড়াবার কাঠামো পায় না। এই বিন্যাস যে কালানুক্রমিক হতে হবে কিংবা নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা থাকবে এর কোনো মানে নেই, কিন্তু যতই একান-ওকাল বা এদেশ-ওদেশ করুক, মোটা একটি দাগের ভেতর লেখককে থাকতেই হয়, ঘরের ভেতর হাঁসফাঁস করলে লেখক মাঠে আসতে পারেন, কিন্তু মাঠের মাটি শক্ত হওয়া চাই, চোরাবালিতে পা ডুবে গেলে পাঠক দাঁড়াবে কোথায়? চোখে দেখা না গেলেও বাস্তবতার হাজার উপাদান থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত হয় অদৃশ্য শূন্যতায় উড়াল দেয়, নইলে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে।
আসহাবউদ্দীন আহমদ তাঁর বক্তব্যপ্রকাশের জন্য কথাসাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত কোনো মাধ্যমের কাছে হাত পাতেননি। টুকরো টুকরো ঘটনাকে কাহিনীর বিন্যাসে তিনি গাঁথেন না, সিকোয়েন্সের আড়ালে থেকে কোনো ছবিকে সামনে ঠেলে দিতে তাঁর ঘোরতর আপত্তি, কোনো চরিত্রকে নিজের মুখপাত্র হিসাবে নিয়োগের অভ্যাসও তাঁর নেই, তিনি নিজেই নিজের কথা বলেন। বর্তমান সমাজকাঠামোর ওপর তিনি কেবল ক্রুব্ধ নন, এই কাঠামো ভেঙে ফেলার জন্য তিনি সংকল্পবদ্ধ—এই লক্ষ্যে দীর্ঘকাল ধরে তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর সংকল্প বাস্তবায়নের পথ হল সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা—এই সত্যটি বিশ্বাস করে একই সঙ্গে রাজনীতি ও সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত হয়েছেন, সাংগঠনিক কাজ করতে করতে এবং লিখতে লিখতে এই বিশ্বাস তাঁর গভীর উপলব্ধিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম তাঁকে ক্লান্ত করতে পারেনি, দলের ভাঙচুর তাঁর বিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারেনি। তাঁর অনেক সহকর্মীর মতো নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের দিকে তিনি আসক্ত হননি, স্ট্যাটেজির ছদ্মবেশে রংবেরঙের আপোসের তত্ত্ব তাঁকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখক হিসাবেও অনেকের মতো নিজের বিশ্বাসকে শিথিল করে পাঠকের তরল মনোরঞ্জনে লিপ্ত হবার পথ তিনি পরিহার করে এসেছেন। বরং, রাজনৈতিক তৎপরতা ও সাহিত্যচর্চার ফলে সমাজের প্রকৃত চিত্রটি তাঁর কাছে দিনদিন স্পষ্ট ও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। সমাজব্যবস্থার ভেতরের ফাঁকি ও শয়তানি, নৈরাজ্য ও অসামঞ্জস্য, শোষণ ও নির্যাতন এবং প্রতারণা ও বঞ্চনা তাঁর ক্রোধকে বরং আরও উসকে দিয়েছে, তিনি আরও তৎপর হয়ে উঠেছেন। ক্রোধ তাঁকে অস্থির করে তুলেছে, এতটাই অস্থির যে তা প্রকাশের লক্ষ্যে কাহিনীবিন্যাসের কোনো প্রক্রিয়া-অনুশীলন কিংবা নির্মাণের ধৈর্য তাঁর নেই। মনে হয়, এজন্যই কোনো প্রকরণের ভেতর খাপ খাওয়াবার চেষ্টা থেকে তিনি সবসময়েই বিরত ছিলেন।
আসহাবউদ্দীন আহমদ গল্প লেখেন না, বলা যায়, গল্প করেন। সাহিত্যচর্চার শুরু থেকেই তিনি পাঠককে শ্রোতা হিসাবে গণ্য করে আসছেন। শ্রোতাদের সবাই তাঁর চেনাজানা, বলতে গেলে, পাড়ার লোক, কোনো নির্ধারিত সাহিত্যিক মাধ্যমের আড়ালে না—গিয়ে তাদের সঙ্গে তিনি সরাসরি কথা বলেন। মূল লক্ষ্যটি ঠিক থাকে, যে-কোনো প্রসঙ্গ আসতে পারে, নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ঝামেলা, অসুবিধা, দুর্ঘটনা থেকে বিপদ, সমস্যা ও সংকট সবকিছু নিয়েই তিনি অবিরাম কথা বলে চলেন।
আসহাবউদ্দীন আহমদ রম্যরচনা লেখেন না। রম্যরচনা যাঁরা লেখেন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ভালো কথা বলা এবং কায়দা করে কথা বলা। সোজা ও সাদামাটা কথাও তাঁরা এমন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রঙ করে বলেন যে, তার যে-কোনো জায়গা কোনো আসরে জুত করে চালিয়ে দেওয়ার আশায় কেউ-কেউ মুখস্থ করে রাখে। আসহাবউদ্দীন চাল মারা কথা বলেন না, কিংবা মিষ্টি মিষ্টি করে বানোয়াটি কথা লিখে জনপ্রিয়তা কামাই করা তাঁর কাজ নয়। তাঁর স্পষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য রয়েছে, তাঁর যাবতীয় রচনাই এই বক্তব্য প্রকাশের জন্যই রচিত। কথার ভঙ্গিও তাঁর অনেকটা রাজনৈতিক কর্মীর মতো, উচ্চশিক্ষিত বিশিষ্ট ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও এবং লেখায় সাহিত্য, সমাজতন্ত্র ও দর্শনপাঠের গভীর অভিজ্ঞতার ছাপ থাকলেও তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বিদ্যা কোথাও কাঁটার মতো বেঁধে না। মনে হয়, তিনি লোকালয় থেকে লোকালয় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, মঞ্জুর কলোনির মাথার বেঞ্চে চায়ের পেয়ালা হাতে, কোর্টের পেছনে ঝুলকালিধোয়ায় অন্ধকার খাবার দোকানে, মাঠের পাশে আইলে হাঁটু ভেঙে বসে, বিকালবেলা ভাঙাচোরা প্রাইমারি স্কুলের সামনে একচিলতে মাঠে হা-ডু-ডু খেলা দেখতে দেখতে, রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে পানির দামে জমি বিক্রি করতে আসা বন্যা বা খরাপীড়িত চাষাভুষাদের জটলায়, যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন কথা বলে চলেছেন, মুখে যেভাবে আসে সেভাবেই বলে যান, প্রকরণের আশ্রয় নেওয়ার দিকে পরোয়া করেন না। শুধু একটি বিষয়ে তিনি স্থির ও অবিচল, একটিমাত্র লক্ষ্যের দিকে তিনি সচেতন, তা হল কথার মধ্য দিয়ে সমাজবাস্তবতাকে তুলে ধরা।
কোনো পরিচিত কাঠামোর ভেতর না গিয়েও আসহাবউদ্দীন পাঠককে যে আকৃষ্ট করতে পারেন তার প্রধান কারণ তাঁর কৌতুক ও ব্যঙ্গ এবং হাস্যরস। তাঁর রচনা আগাগোড়া কৌতুক ও ব্যঙ্গরসে পূর্ণ। তাঁর কথা বলার ভঙ্গির মধ্যেই হাস্যরস, প্রায় যাবতীয় কথাই তিনি হাসতে হাসতে বলতে পারেন, পাঠকও তাঁর সব কথা শোনে হাসতে হাসতে। যে-কোনো প্রসঙ্গই তাঁর ঠাট্টা এড়াতে পারে না, যা তাঁর অনুমোদন পায় না তা নিয়ে তিনি ঠাট্টা করেন, যা তাঁর কাছে বিরক্তিকর তাও ঠাট্টার বিষয়, আবার যে-ব্যবস্থা তাঁকে ক্রুদ্ধ করে তোলে সেই ক্রোধপ্রকাশের উপায়ও তাঁর হাস্যরস। খুব নামকরা জনপ্রিয় রাজনীতিবিদের আচরণ তিনি এমন কৌতুকের সঙ্গে তুলে ধরেন যে, নেতার সমস্ত মাহাত্ম্য মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাঁদের নাম বা উপাধি বা বংশগত পদবির সঙ্গে তাঁদের আচরণের সঙ্গতি বা অসঙ্গতি নিয়ে শব্দের পান তৈরি করে বা বিশেষ রাজ্যের বিন্যাস ঘটিয়ে এমনভাবে কথা বলেন যে, কেবল তাঁদের নিজেদের আচরণ এবং উক্তির অসারতা প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। ক্ষমতাহীন হোক আর ক্ষমতার বাইরে হোক—দেশের রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন—সেইসব নেতার উক্তি যেগুলো বাণী বলে প্রচারিত, আসহাবউদ্দীনের ঠাট্টার তোড়ে সেগুলো বাচালতা বলে প্রমাণিত হয়। এইসব নেতার ব্যক্তিগত দোষত্রুটি ও দুর্বলতাও তাঁর আক্রমণ থেকে রেহাই পায় না, এই আক্রমণের মাধ্যম কিন্তু কৌতুক। রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠান-ব্যবস্থা, পদ্ধতি এসব তো আছেই, এমনকী প্রসঙ্গ এলে, নিজেকে নিয়েও ঠাট্টা করতে তিনি এতটুকু দ্বিধা করেন না। এই ঠাট্টা কখনো কখনো উপহাসের ধার ঘেঁষে চলে। এটা কম কথা নয়, এটা বড় শিল্পীরই লক্ষণ, নিজেকে আর-একজন লোক হিসাবে দেখতে পারলেই নিজেকে এরকম উপহাস করা যায়। নিজেকে দেখার সময় লেখক পরিণত হন আর একটি মানুষে, তা হলেই নিজেকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার শক্তি জোটে। বিজ্ঞানমনস্ক নিরাসক্ত দৃষ্টি শিল্পীকে এই বিরল স্বভাব অর্জনে সাহায্য করতে পারে।
আসাহাবউদ্দীনের লেখায় কিন্তু এই নির্লিপ্ত স্বভাব ও নিরাসক্ত দৃষ্টি অনুপস্থিত। এই স্বভাব ও এই দৃষ্টি অর্জন করা তাঁর উদ্দেশ্যও ছিল না, নিজের আবেগ ও প্রবণতাকে সরাসরি সামনে নিয়ে আসার অভ্যাস তিনি কখনোই বর্জন করেননি। তাঁর লেখা পড়লে রাজনৈতিক জীবন তো বটেই, তাঁর দৈনন্দিন তৎপরতা, প্রতিদিনের খুঁটিনাটি, আত্মীয়স্বজন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সবই বেশ খোলাখুলি জানা যায়। স্থির ও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ থাকায় এইসব প্রত্যেকটি প্রসঙ্গই তাঁর তত্ত্ব বা পর্যবেক্ষণকে প্রমাণের অস্ত্র হিসাবে গণ্য হয়। কিন্তু যে বিন্যাসের বলে এগুলো একটি অভিন্ন পটভূমি ও প্রেক্ষিত তৈরি করতে পারে তার অভাবে পাঠকের মধ্যে সামগ্রিক কোনো আবেদন সৃষ্টি না-করে কেবল একটুখানি সাড়া তুলেই হারিয়ে যায়। এটা শিল্পসৃষ্টির জন্য অনুকূল নয়। সমাজবাস্তবতার টুকরো টুকরো ছবি পাঠককে যদি বাস্তবের বিপজ্জনক অবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে না পারে তো লেখকের পক্ষে লক্ষ্যভেদ করা অসম্ভব। আসহাবউদ্দীন আহমদের লেখায় এমনসব প্রসঙ্গ হঠাৎই এসে একটুখানি নাড়া দিয়ে উধাও হয়ে যায় যে, আফশোস হয় আরেকটু মনোযোগ এর প্রাপ্য ছিল, আরেকটু মনোযোগ গেলে তাঁর তত্ত্ব বা পর্যবেক্ষণের পক্ষে একটি দৃষ্টান্ত হয়েই এর অবসান ঘটত না, বরং পাঠকের অনেক গভীর ভেতরে আবেদন সৃষ্টি করে লেখকের বক্তব্য উপলব্ধি করতে তাঁকে সাহায্য করত। একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। লেখার অনেক জায়গায় আসহাবউদ্দীন আহমদ তাঁর আত্মগোপন করে থাকার কথা বলেছেন। যে-আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি রাজনীতি করেন তা কোনো সরকারের অনুমোদন পায়নি। এই বয়সে দেশত্যাগ না করেও তাঁকে তিন-তিনটি রাষ্ট্রের নাগরিক হতে হয়েছে, এই তিন রাষ্ট্রে মেলা সরকারের উত্থানপতন ঘটেছে, রাষ্ট্রবদল ও সরকার-পরিবর্তনে কখনো কখনো রক্তপাতও কম হয়নি, কিন্তু লেখক ও তাঁর দলের রাজনীতি, প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রতিটি সরকারের অবাধ শোষণ ও নির্যাতনের পথে অন্তরায় বিবেচিত হওয়ায় তা সমূলে বিনাশের লক্ষ্যে তাদের কার্যক্রম প্রায় অভিন্ন। তাই, যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, লেখকের নামে হুলিয়া থাকতই। আত্মগোপন করে থাকার কোনো একসময়ে এক-একটি বাড়িতে বসে তিনি সন্ধ্যা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সারাদিন তাঁকে লুকিয়ে থাকতে হয়, বেরুলে পুলিশ বা দালালজাতীয় কেউ শনাক্ত করে ফেলতে পারে। এদিকে বাইরে না বেরুলে কাজ করবেন কী করে? অন্ধকার গাঢ় না হলে বেরুতে পারেন না, ঘরে বসে অধীর আগ্রহে তিনি অন্ধকারের জন্য অপেক্ষা করেন। ‘অন্ধকারের জন্য এই প্রতীক্ষা’ একটি তাৎপর্যময় শিল্পকর্মের অংশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাকে তিনি আকস্মিকভাবে হেঁটে ফেলেন। মানুষের জীবনে অন্ধকার ঘোচবার দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়েছেন বলেই একজন রাজনৈতিক কর্মীকে একলা ঘরে বসে অন্ধকারের জন্য প্রতীক্ষা করতে হচ্ছে—’এই আঁধার আলোর অধিক’ পাঠককে এই উপলব্ধি পাইয়ে দেওয়ার কোনো তাগিদ তিনি অনুভব করেন না বলেই অন্য প্রসঙ্গে চলে যান।
আসহাবউদ্দীনের লেখায় প্রায়ই এই অস্থিরচিত্ত বিক্ষিপ্ত বিচরণ লক্ষ করা যায়। কোনো প্রসঙ্গই তাঁর লেখায় বেশি মনোযোগ পায় না। তাই শক্ত রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সংখ্যায়িত মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ প্রসঙ্গকে সংক্ষিপ্ত স্কেচের আকারে তিনি পরিবেশন করেন, যথোচিত রক্তমাংস পাওয়ার আগেই সেগুলোকে তিনি ত্যাগ করেন। ফলে তাঁর শিল্পচর্চার উৎস সমাজব্যবস্থার ওপর প্রবলরকম ক্রোধ শিখা হয়ে জ্বলে ওঠবার সুযোগ পায় না। তাঁর ক্রোধের প্রকাশ কৌতুক ও ঠাট্টায়, কিন্তু হাসির গল্প লেখা তো তাঁর লক্ষ্য নয়, পাঠককে হাসতে হাসতে তার জন্য অবাঞ্ছিত ও অনভিপ্রেত অবস্থানের দিকে আঙুল দেখিয়ে তাকে রুখে দাঁড়াতে সাহায্য করা আসহাবউদ্দীনের দার্শনিক ভাবনা ও রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করেন, শ্রেণীসংগ্রাম ছাড়া মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার আদায় করা কোনোদিন সম্ভব নয়। তিনি জানেন, বিপ্লব কোনো শৌখিন এমব্রয়ডারি করা নয় কিংবা এসো ভাই একটুখানি বিপ্লব করি এই গান ধরে স্ফীতকায় বুর্জোয়া দলের পায়াভারি করা মানে বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখার কারসাজি। তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে-রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে জড়িত তার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল বিপ্লবের পক্ষে মানুষের অসন্তোষ ও ক্ষোভকে ক্রোধে প্রজ্বলিত করা। লেখাতেও তিনি সবকিছু নিয়ে কৌতুক করেন নিজের ক্রোধ প্রকাশ করার জন্যই।
কিন্তু, এই কৌতুক আসহাবউদ্দীনের লেখায় প্রায় এতটা তরল হয়ে পড়ে যে ক্রোধের চেহারা চেনা প্রায় কঠিন। হাসতে হাসতে পাঠক যদি এলিয়ে পড়ে তো তাকে সোজা করে দাঁড় করানোটা কি সহজ কাজ? কিংবা কোনো রাজনীতির অসার বা প্রতিক্রিয়াশীল বা লুটপাটের পদ্ধতি প্রতিপন্ন করার কাজ যদি কয়েকজন অসৎ, কপট ও দালান নেতাদের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে ব্যঙ্গ কৌতুক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তো পাঠক ঐসব নেতাকে ধিক্কার দিয়েই ক্ষান্ত হবে, ঐ রাজনীতিকে প্রতিহত করতে রুদ্র হয়ে উঠবেন না। এই কারণে তাঁর ক্রোধ খুব দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও এবং ব্যঙ্গ কৌতুক তাঁর রচনাকে সমৃদ্ধ করলেও আসহাবউদ্দীনের শিল্পচর্চার লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে এ নিয়ে সন্দেহ থাকে বইকী।
আসহাবউদ্দীন আমাদের চিরতরুণ লেখকদের অন্যতম। সত্তর পেরিয়েও তিনি স্মৃতিচারণ করতে শুরু করেননি, এখনও তাঁর চোখ সামনের দিকে। সমকালীন সংকটে তিনি উদ্বিগ্ন, ভবিষ্যৎকে সংকটমুক্ত করার পথ অনুসন্ধানে তাঁর মনোযোগ নিরঙ্কুশ। ব্যঙ্গ কৌতুক তাঁর বক্তব্য প্রকাশের হাতিয়ার, তাঁর বল ও উদ্যম থেকে নিঃসন্দেহ হতে পারি : এই হাতিয়ারে কোনোদিন মরচে পড়বে না। তাই তাঁর কাছে সঙ্গতভাবেই এই দাবি করা যায় : কেবল হাস্যরসে আপ্লুত না-করে তাঁর এই হাতিয়ার মানুষের ক্ষোভকে ক্রোধে প্রজ্বলিত করে তুলুক।
