একুশে ফেব্রুয়ারির উত্তাপ ও গতি
বাংলাকে পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে পাকিস্তান হওয়ার আগেই এবং এই দাবি যারা তোলেন তাঁরা পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কিংবা সমর্থক ছিলেন। প্রতিষ্ঠার পরপরই দাবিটি একটি আন্দোলনের চেহারা পায়। ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে অব্যাহত রাখার কথা ঘোষণা করলে প্রতিক্রিয়া এরকম আস্ত ও তীব্র হত কি না সন্দেহ। কারণ, শিক্ষিত বাঙালিমাত্রই ঐ ভাষায় তখন কমবেশি স্বচ্ছন্দ। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্ৰামে ইংরেজির সাহায্য নিতে তাদের কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের বাঙালির কাছে তামিল বা পুশতুর মতো একেবারে গ্রীক না-হলেও উর্দু একটি প্রায়-অপরিচিত ভাষা। শহর এলাকায় এই ভাষার মৌখিক ব্যবহারে অনেকে একটুআধটু অভ্যস্ত হলেও এর মাধ্যমে লেখাপড়া করা বা চাকরির প্রতিযোগিতায় নামা ছিল তাদের সাধ্যের বাইরে। খানদানি মুসলমান হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় উর্দুকে যারা মাতৃভাষা বলে গণ্য করতে চাইত তাদের আভিজাত্যের মতো উর্দুতে তাদের দখলও ছিল একেবারেই ঠুনকো, দুটোরই কোনো ভিত্তি ছিল না। ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাবশালী প্রদেশ পাঞ্জাবে শিক্ষিত মুসলমান মাত্রই উর্দুর চর্চা করত এবং নিজেদের মাতৃভাষার তোয়াক্কা না-করে সাহিত্যচর্চা করত উর্দুতে। উর্দু ভাষার এবং উপমহাদেশের দুজন বিশিষ্ট কবি মোহাম্মদ ইকবাল ও ফয়েজ আহমদ ফয়েজের মাতৃভাষা পাঞ্জাবি। পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার পর পাঞ্জাবেই মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেছিল সবচেয়ে বেশি, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে আন্দোলনে পাঞ্জাবিরাও অংশ নিতে পারত। কিন্তু উর্দুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে পাঞ্জাবি মধ্যবিত্ত বরং পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রভাষানীতির সমর্থক হিসাবে সক্রিয় হয়। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় ভারতীয় মুসলমানদের একটি অবিচ্ছিন্ন সংস্কৃতির কথা জোরেসোরে বলা হত, সেই অদৃশ্য এবং অনুপস্থিত সংস্কৃতি বিকাশের জন্য উর্দুকে উপযুক্ত মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। ঐ উদ্ভট সংস্কৃতির কথা বলা হত ভারতের বিভিন্ন এলাকার মুসলমানের আত্মীয়তা-প্রকাশের জন্য যত-না, তার চেয়ে অনেক বেশি হিন্দুদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য প্রচার করার উদ্দেশ্যে। আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে এই প্রচারের প্রভাব লোপ পাওয়াই স্বাভাবিক। তা ছাড়া, সংস্কৃতিচর্চা মধ্যবিত্তের যথাযথ বিকাশের একটি শর্ত হলেও কেবল সেই ভিন্ন সংস্কৃতিচর্চার, আরও ঠিক করে বললে, সেই সংস্কৃতিসৃষ্টির তাগিদেই মুসলমান মধ্যবিত্ত পাকিস্তান আন্দোলনে নিয়োজিত হয়নি। মধ্যবিত্তের সামগ্রিক বিকাশই ছিল সেখানে প্রধান আকাঙ্ক্ষা। উর্দুকে মেনে নিলে এই বিকাশের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায় বলে পূর্ব বাংলায় মধ্যবিত্তের প্রায় সিংহভাগ মানুষ ভাষা আন্দোলনে অনুকূল সাড়া দিয়েছিল। অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল বলে পরিচিত রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ঠিকই, কিন্তু ধর্মান্ধ রাজনীতিতে বিশ্বাসী, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রচারক, এমনকী বাংলার মুসলমানের সংস্কৃতিতে ইসলাম ধর্মের প্রভাবকে যাঁরা প্রধান উপাদান বলে গণ্য করেন কিংবা / এবং প্রধান উপাদানে পরিণত করার জন্য নানারকম ফন্দিফিকিরে লিপ্ত তাঁদেরও প্রায় সবাই রাষ্ট্রভাষা হিসাবে কেবল উর্দুর দাবির বিরোধিতা করেছেন। বিশিষ্ট বাঙালিদের মধ্যে গোলাম মোস্তাফা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না যিনি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ব্যক্তিত্বহীন, অযোগ্য ও আত্মমর্যাদাবোধশূন্য খাজা নাজিমুদ্দিন, ফজলুর রহমান বা সৈয়দ সেলিমকে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পর্যায়ে রাখার মানে হয় না। পূর্ব বাংলায় যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন তাঁদের বেশিরভাগ নেতা মনেপ্রাণে বাংলাকেই চাইতেন। কিন্তু বদরুদ্দীন উমরকে অনুসরণ করে বলা যায় যে, গদিপ্রেমের কাছে তাঁরা ভাষাপ্রেম বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁদের দলের অনেক ঘোরতর প্রতিক্রিয়াশীল নেতা ও সংবাদপত্রকেও ঐ সময় বাংলা ভাষাকে সমর্থন করতে দেখি। এই পর্যায়ে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সমর্থক প্রায় গোটা মধ্যবিত্ত শ্রেণী, এর নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে মধ্যবিত্ত মানসিকতার রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীদের হাতে, এর কর্মী সবাই ছাত্র।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে ঢাকায় হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলনের মূল স্বভাবে খুব বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন ঘটল। এর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করে পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসত। নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের ঘোরতর অন্যায়কে প্রতিহত করার জন্য আইনমাফিক আন্দোলন কোনো কার্যকর পদ্ধতি নয়—২১ ফেব্রুয়ারি এই সত্যটিকে প্রতিষ্ঠা করল। ২১ ফেব্রুয়ারি হয়ে দাঁড়াল নির্যাতন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংঘাতের প্রতীক। এর আগে আমাদের দেশে এরকম হত্যাকাণ্ড আরও ঘটেছে। বাঙালির শোষিত ও নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাস এবং এর প্রতিরোধে রুখে দাঁড়াবার ঐতিহ্যও হাজার বছরের। কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে নানা কৃষক বিদ্রোহ, তাঁতিদের বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, চাকয়া বিদ্ৰোহ, হাজং বিদ্রোহ— শাসকরা এসব দমন করেছে অহিংসার পুণ্য বাণী ছেড়ে নয়, গানের সুরে নয়, ধর্মের অজুহাত দিয়েও নয়, সরাসরি তোপের মুখে। এসব আন্দোলন হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে, আর ২১ ফেব্রুয়ারি গোটা জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করল একটি অবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের দিকে, ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠী নিজেদের অনুভব করতে লাগল একটি জাতি হিসাবে কিংবা জাতি হিসাবে নিজেদের পরিচয়-অনুসন্ধানে নিয়োজিত হল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল প্রতিরোধ, হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আপোস করে সম্ভব নয়। ২১ ফেব্রুয়ারি যে প্রতিরোধের স্পৃহার জন্ম দিল, দিনে-দিনে ঐ দিনটি উদযাপনের সঙ্গে তাই তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল। ১৯৫৪ সালে ভাষা আন্দোলনের শত্রু বলে বিবেচিত রাজনৈতিক সংগঠন এই দেশ থেকে চিরকালের মতো উচ্ছেদ হয়ে গেল। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে বাংলা পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করল। তখন পরম তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারির সুখের মরণ বরণ করতে কোনো ব্যথা ছিল না। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলা ভাষা আদায়ের দাবি জানাবার দিন নয়, মানুষের প্রতিবাদকে প্রকাশ করার, প্রতিরোধকে ভাষা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার ঐ হত্যাকাণ্ডের মুহূর্ত থেকে মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ২১ ফেব্রুয়ারির একমাত্র লক্ষ্য নয়; দেশবাসীর আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের সঙ্গে সামাজিক বিপ্লব ঘোষণা এবং তা সংঘটিত করা হয়ে দাঁড়ায় এর অঙ্গীকার। তাই দেখি, ১৯৫২ সালের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাবি মানুষের কণ্ঠে ভাষা পেয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে, দাবি আদায়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এখানেই। সেই দাবি আদায় হবার আগেই কিংবা হতে-না-হতে পরের ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্যাপিত হয়েছে নতুন দাবি উত্থাপনের মধ্যে, ঘোষিত হয়েছে নতুন অঙ্গীকার।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে যারা ছিল শিশু ও বালক, যাদের জন্ম ২১ ফেব্রুয়ারির পর, যাদের জন্ম ২১ ফেব্রুয়ারির অনেক পরে, ২১ ফেব্রুয়ারি তাদের কাছেও কেবল ইতিহাস নয়। একুশে ফেব্রুয়ারির স্মৃতিচারণ তাদের যত আকর্ষণ করে তার চেয়ে তারা বেশি শিহরিত হয় এর শক্তি দেখে। এটা তাদের কাছে নিজেদের যৌবনের মতো, এখানে তারা নিজেদের শক্তি অনুভব করার শক্তি অর্জন করে। ২১ ফেব্রুয়ারি তাদের কাছে কেবল একটি দিনমাত্র নয়, এটা একটা ঋতু যার শুরু কখনো কেউ বুঝতেও পারে না এবং শেষ এ-পর্যন্ত দেখা যায়নি। তাই, বিভিন্ন সময়ে সামাজিক বিবর্তনের চাহিদা, রাজনৈতিক দাবি ও সাংস্কৃতিক জিজ্ঞাসা ঘোষণা করার শ্রেষ্ঠ সময় এবং শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হল একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারির বিবর্তন দেখলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়।
পাকিস্তানের প্রথম পর্যায়ে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে কেবল স্বৈরাচার ছিল তা নয়, স্বৈরাচার বাংলা-প্রেমিকদেরও কিছুমাত্র কম নয় তা আমরা গত বিশ বছর থেকে অহরহই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, উর্দু চাপানো ছিল একটি সামন্ত মনোভাবের প্রকাশ। উর্দু অবশ্যই সামন্তদের ভাষা বলে পরিচিত হতে পারে না, এই ভাষায় কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ কথা বলে। উর্দুতে প্রগতিশীল সাহিত্যের চর্চা এবং মেহনতি মজদুরের উপর জুলুম এবং তার প্রতিরোধ লড়াইয়ের বাণী বাংলার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেই। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশে বসবাসকারী উর্দুভাষীদের মধ্যে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর বেদনা ও বঞ্চনা বাঙালি শ্রমজীবীর বেদনা ও বঞ্চনার তুলনায় এতটুকু কম নয়। বাঙালি শ্রমজীবী বাঙালি সুবিধাভোগী মানুষের চেয়ে অনেক বেশি আত্মীয়তা বোধ করেন অন্যভাষী শ্রমজীবীর সঙ্গে। কিন্তু, পাকিস্তানের অধিবাসীদের প্রবল পরিচয় তাদের ধর্ম দিয়ে এবং ঐ পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করতে উর্দু ছাড়া আর গতি নেই—এই সামন্ত মনোভাবটিই ছিল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার প্রধান যুক্তি। উর্দুকে ঘৃণা করে নয়, বরং ঐ মানসিকতার শাসকদের উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার ইচ্ছাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে বাঙালিরা সামস্ত সংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসকে ঝেড়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে যা ছিল একটি ভাষাগোষ্ঠী মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশের আকাঙ্ক্ষা ২১ ফেব্রুয়ারিতে এসে তাই ব্যাপ্তি পেল সামন্ত ধারণাকে ছুড়ে ফেলার সংকরে। উর্দু ভাষার প্রতি আগ্রহ এবং এই ভাষার সাহিত্যে অনুরাগ হল মানবিক প্রবৃত্তি। আর উর্দুর প্রতি আনুগত্য হল সামন্ত-সংস্কার। ২১ ফেব্রুয়ারি এই সংস্কার ও দাসত্বকে প্রত্যাখ্যান করার প্রেরণা। ধর্মের দড়িতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ঐক্যবদ্ধ করার পশ্চাৎপদ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামন্ত তৎপরতাই হল পাকিস্তান রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি এই রাষ্ট্রের দর্শন আর ব্যবস্থার ওপর মানুষের আনুগত্যকে পরিণত করেছে সন্দেহে, সন্দেহ পরিণত হয়েছে অবিশ্বাসে, অবিশ্বাস পরিণত হয়েছে সম্পূর্ণ অনাস্থায় এবং এই অনাস্থাকে ২১ ফেব্রুয়ারি রূপ দিয়েছে ঘৃণায় ও ক্রোধে। তাই দেখা গেছে, ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত অনেকেই ২১ ফেব্রুয়ারির মূল স্রোতধারা থেকে ছিটকে পড়েছেন। ২১ ফেব্রুয়ারির গতির সঙ্গে পা ফেলে অনেকে চলতে পারেননি। এর তাপ সহ্য করতে না-পেরে অনেকেই আড়ালে পড়ে গেছেন। আজকাল কাউকে কাউকে আক্ষেপ করতে দেখা যায় যে কারাবরণ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলনে অনেক তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও এই আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁরা উপেক্ষিত। তাঁদের উল্লেখ অবশ্যই থাকবে, কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারির গতি ও তাপের সঙ্গে তাঁরা সামঞ্জস্য রাখতে পারেননি বলে ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁদের রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। ইতিহাস থেকে তাঁরা গড়িয়ে পড়েছেন ঘটনাপঞ্জির স্তূপে। কোনো এককালে আন্দোলনের মস্ত বড় নেতা হলেও এই অবস্থা থেকে তাঁরা উদ্ধার পেতে পারেন না।
২১ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় যতটা তার চেয়ে তার অনেক বড় গৌরব-ইতিহাস নির্মাণে। ১৯৫২ সালে এই ইতিহাস নির্মাণের সূত্রপাত এবং আজ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত তা ইতিহাস-নির্মাণ এবং সৃষ্টি করেই চলেছে।
ইতিহাসের সৃষ্টির এই গতিধারায় কোনো আপোসকে ২১ ফেব্রুয়ারি সহ্য করে না। বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ কখনোই এর চরম লক্ষ্য ছিল না। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাকিস্তান আমলেই পাওয়া গিয়েছিল.। পশ্চিম বাংলার অনেক লেখকের ধারণা পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে লুপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। এই ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে পাকিস্তান ছিল পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে রাষ্ট্রভাষা ছিল বাংলা। পশ্চিম বাংলায় হিন্দির যে দাপট এখন লক্ষ করা যায় পাকিস্তানে কোনো সময়েই’ পূর্ব বাংলায় উর্দু তার কাছাকাছি অবস্থান লাভ করতে পারেনি। এজন্য ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল অতন্ত্র প্রহরী। কিন্তু আবার বলি, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ২১ ফেব্রুয়ারি ফুরিয়ে যায়নি। পরে পাকিস্তান যখন একটি আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া অবলম্বন করছিল, এই পুঁজিবাদীকে রক্ষার জন্য সাম্রাজ্যবাদের লেলিয়ে দেওয়া ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী যখন রাষ্ট্র কর্তৃত্ব কবজা করেছিল তখন তার বিরুদ্ধে প্রধান প্রেরণা এসেছে ২১ ফেব্রুয়ারির কাছ থেকেই। ১৯৫৮ সালের পর রাজনীতি যখন বন্ধ, প্রতিরোধের সমস্ত পথ রুদ্ধ করার আয়োজন চলছে একটির পর একটি, তখনও প্রতিবাদী মানুষ নীরবে হাজির হয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারির জমায়েতে : ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের মধ্যেই প্রতিরোধের সংকল্প ঘোষিত হয়েছে। অনেকে মনে করেন যে, পাকিস্তানে সামরিক শাসন না-হলে এবং সংসদীয় রীতির শাসনব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশটা টিকে যেত। না, টিকত না। ১৯৫২ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি যতবার এসেছে দেশবাসী ততবার নিজেদের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে আরও গভীরভাবে নিয়োজিত হয়েছে, এই গভীর আত্মানুসন্ধান কোনোরকম রাষ্ট্রীয় গোঁজামিল সহ্য করতে পারে না। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা মেনে নেওয়া হলে একটি শিথিল কেন্দ্র পাকিস্তানের আয়ু হয়তো আরও কয়েক বছর বাড়লেও বাড়তে পারত। কিন্তু, কিছু বাঙালি রাজনীতিবিদদের ক্ষমতালাভ, বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের পদোন্নতি, কয়েকজন বাঙালি ব্যবসায়ীর বড় শিল্পপতিতে রূপান্তর, এমনকী কিছু বুদ্ধিজীবীর তৃপ্ত প্রতিষ্ঠার পরও ২১ ফেব্রুয়ারির অনুসন্ধানবৃত্তিকে ধ্বংস করা যেত না। বুর্জোয়া শোষণকে প্রতিরোধ করার জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি স্ফুলিঙ্গের চেহারা গ্রহণ করত। ১৯৬৯ সালকে তখন হয়তো দুই-এক বছর ঠেকিয়ে রাখাও সম্ভব হত, কিন্তু পাকিস্তানের নতুন প্রভুদের বিরুদ্ধে মানুষের রুখে দাঁড়ানো আটকাবার সাধ্যি কারও হত না।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও ২১ ফেব্রুয়ারির দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে দেখে। যে বিপুল সম্ভাবনা ও স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম, জন্মের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার নিদারুণ বিনাশে মানুষ যখন হতাশ ও বিচলিত, ২১ ফেব্রুয়ারির স্ফুলিঙ্গই তখন তাকে ফের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার শক্তি দেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বরাবরই ঘোরতরভাবে প্রতিষ্ঠানিকতা-বিরোধী। পাকিস্তান আমলেই দেখেছি যে, রাষ্ট্র কখনো কখনো ছোঁৎ ছোঁৎ করে এগিয়ে এসেছে তাকে নিজেদের গতরের অংশ করে নেওয়ায় লালসায়। একটি প্রাদেশিক সরকারের উদ্যোগে শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়, একটি সামরিক সরকারের আমলে তার খানিকটা সম্প্রসারণ ঘটে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এর সবটাই কবজা করে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে, আজও তারা সেই চেষ্টায় ক্ষান্ত দেয়নি। এতে একুশে ফেব্রুয়ারির তেজ ও শক্তি কিছুক্ষণের জন্য চাপা পড়লেও তার স্বভাবের প্রবণতা অনুসারেই সে আবার ঠিক স্বমূর্তিতে প্রকাশিত হয়। মানুষকে আবার নতুন সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করার ভার সে নিজেই হাতে তুলে নেয়।
একুশে ফেব্রুয়ারি আজ চল্লিশে পা দিল। প্রৌঢ়ত্বের ছাপ তাকে এতটুকু স্পর্শ করেনি। প্রথমদিকে তার সঙ্গে ছিল এমন অনেকে আজ আড়ালে চলে গেছে, একুশে ফেব্রুয়ারি এখন নতুন প্রজন্মের প্রেরণা। চল্লিশ বছর পরও ২১ ফেব্রুয়ারির দায়িত্ব এখনও কিছুমাত্র লাঘব হয়নি। শোষণ ও নির্যাতন, ভক্তি ও আনুগত্য এবং কুসংস্কার ও পশ্চাৎমুখীনতার বিরুদ্ধে যে-প্রতিরোধস্পৃহা একদিন সে জ্বালিয়ে তুলেছিল আজ আবার সেইসব কালো উপসর্গ একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষের সভ্যতাকে, মানুষের ইতিহাসকে এবং মানুষের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করে তাকে পেছনপানে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্ত আজ পৃথিবীতে সবচেয়ে তৎপর। মানুষের সামাজিক অগ্রগতির একটি পর্যায় সমাজতন্ত্রকে হেয় প্রতিপন্ন করার লক্ষ্য শুধু মানুষের গতিকে রুদ্ধ করা নয়, সভ্যতার প্রাণস্পন্দনকেও স্তব্ধ করে দেওয়া। ঘড়ির কাঁটার মতো সমাজবিবর্তনকে বিপরীত দিকে নেওয়ার পরিণতি ঘড়ির অবস্থার মতোই হতে বাধ্য, গতির মতো স্তব্ধ হবে তার স্পন্দন এবং মানবিক বৃত্তির বিকাশ চিরকালের জন্য ঘুরপাক খাবে একটি আলোহাওয়াহীন বৃত্তের ভেতর। এই অবস্থায় যারা উল্লাস বোধ করে তারা হয় মানববিরোধী সাম্রাজ্যবাদের অনুগত গোলাম, নয়তো মানুষের বিবর্তনের সংগ্রাম থেকে অবসর নিয়ে নিরাপদ সুখে বসবাসের জন্য লালায়িত পঙ্গু মানুষ। একই সঙ্গে পৃথিবী জুড়ে মৌলবাদের মচ্ছব কিন্তু কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। মৌলবাদ হল ইতিহাসের গতি রুদ্ধ করার এবং সভ্যতার স্পন্দন স্তব্ধ করার ঐ চক্রান্তের ফসল। আমাদের এই ২১ ফেব্রুয়ারির দেশেও এর ধাক্কা এসে লাগে বইকী! কুসংস্কার ও পশ্চাৎমুখীনতাকে রক্ষার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নামে সংগঠিত জানোয়ারদের দ্বারা সংঘটিত নরহত্যা, নারীধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের কীর্তির রেশ কাটাবার পর আমির-ওমরা সেজে ফের বাইরে আসার পাঁয়তারা কষছে। এদের প্রতিহত করার ডাক আমরা জানি ২১ ফেব্রুয়ারির কাছ থেকেই আসছে। দিন যায়, ২১ ফেব্রুয়ারির গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। দিন যায়, ২১ ফেব্রুয়ারির তাপ বাড়তেই থাকে। অনেকে অনেকদূর পর্যন্ত এসেও পেছনে চলে গেছে, অনেকে এই তাপ সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ঝরে পড়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি যৌবনের তেে উদ্দীপ্ত, তার গতিতে সাড়া দেয় নতুন প্রজন্মের মানুষ, তারা তার তাপকে শুধু সহ্যই করে না, বরং এই তাপে জ্বলে ওঠার জন্য উদ্গ্রীব।
