ভূত মানেই চান্স – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ভূত মানেই চান্স
‘ভুত মানেই চান্স। প্রাোবাবিলিটি।’
‘হ্যাঁ, তা ঠিক। ভূত দেখা চান্সই বটে। চেনাজানার মধ্যে কেউ দেখেছে বলে তো শুনিনি।’
‘শুধু দেখা নয়, ভূত হওয়াটাও চান্সেরই ব্যাপার।’
‘মানে?’ প্রশ্নটা করে অবাক হয়ে তাকালাম। কখন যে উটকো একটা লোক আমাদের আড্ডায় এসে যোগ দিয়েছে তা খেয়ালই করিনি। আর দিব্যি কনফিডেন্সের সঙ্গে ভূত নিয়ে পাণ্ডিত্যও ফলাতে শুরু করেছে। কিংশুকের পাশের চেয়ারে বসে একটা পায়ের উপর পা তুলে অন্ধকার জানালার দিয়ে তাকিয়ে লোকটা গম্ভীর স্বরে ফের বলে ওঠে, ‘মানুষ মরে কখন ভূত হয় বলতে পারো?’
সোমনাথ আমার দিকে নির্দেশ করে বলে উঠল, ‘তুমিই বলো। ভূত নিয়ে তুমি তো ভালোই ব্যবসা চালাচ্ছ।’ আমি যে মাঝে মাঝে ভূতের গল্প লিখি তারই দিকে ইঙ্গিত। কথাটা খানিকটা ঠিক তো বটেই।
বলে উঠি, ‘অপঘাতে মৃত্যু—অ্যাক্সিডেন্ট—তাতেই ভূত হওয়ার চান্স বেশি। তাই না!’
‘ঠিকই বলেছ,’ বলে লোকটা আমার দিকে ফিরে ফের বলে উঠল, ‘তা ভূত দেখেছ নাকি কখনও?’
‘না, সে সৌভাগ্য আর হল কোথায়? ভূত নিয়ে গল্পই লিখে চলেছি। অথচ সামনাসামনি ভূত দেখার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি আজ পর্যন্ত। তা আপনি কোথা থেকে?’
‘এই আমিও তোমাদের মতোই বেড়াতে এসেছি। রেগুলার এখানে আসি, আসতেই হয়।’ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোকটা।
এতক্ষণে ভালো করে তাকালাম লোকটার দিকে। মাঝারি বয়স। মুখটা পুরো গোল। ওজন বেশ খানিকটা বেশির দিকে। গলা আর মুখের নীচের অংশ আলাদা করা যায় না, প্রায় জুড়ে গেছে। চওড়া গোঁফ, চোখে চশমা। ভুঁড়িটা সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে বেশ আয়েস করে চেয়ারে বসেছে। দেখলেই বোঝা যায় দু-একটা কথা বলে উঠে যেতে লোকটা আসেনি।
গায়ে পড়ে আলাপ করতে আসা লোকজনদের আমার কেন জানি না একদম সহ্য হয় না। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ আমাদের আড্ডায় এসে যোগ দিয়েছে। চিনি না, শুনি না—কোত্থেকে এসে হাজির।
অফিসের ন’জন মিলে গতকাল আমরা উড়িষ্যার কুলডিহা ফরেস্টে এসেছি। এটা শিমলিপালের লাগোয়া জঙ্গল। বালাসোর থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ। এসে উঠেছি কুলডিহা ফরেস্ট বাংলোয়। বেশ রিমোট এই জায়গাটা। বেশি ট্যুরিস্টের উপদ্রবও নেই। সারাদিন ঘুরে বেড়াবার পরে সন্ধেবেলা আমরা সবাই মিলে মোমবাতির আলোয় আড্ডা মারছিলাম। বাইরে তারাখচিত আকাশের নীচে ঘুমন্ত জঙ্গল। অন্ধকারে মিশে যাওয়া শাল-সেগুন-জাম গাছের আবছা অবয়ব। আড্ডার বিষয় ভূত—সন্ধের পর জঙ্গলে বেরোনো বারণ। তাই ঘরেই আড্ডা। এরকম পরিবেশে ভূতের গল্পই বেশি জমে। সকলের অনুরোধে আমারই লেখা একটা ভূতের গল্প বলব বলব করছি, এমন সময় কোত্থেকে যে এই ভদ্রলোক এসে উদয় হলেন কে জানে!
টেবিলে রাখা চৌকো করে কাটা আলুভাজা একমুঠো তুলে নিয়ে লোকটা বলল, ‘তা তোমরা সব এলে কোত্থেকে?’
বললাম, ‘কলকাতা’।
‘জঙ্গল কেমন লাগছে?’
পৌলোমী বলল, ‘বেশ ভালো, আজ সকালে এখানেই হাতির পাল দেখেছিলাম। অবশ্য তারপর সারাদিন জঙ্গল চষে বেড়িয়েও একটা ঈগল ছাড়া কিছু চোখে পড়েনি। আর এই বিকেলে এখানে ঢোকার ঠিক আগে একদল বাইসন দেখলাম।’
কিংশুক বাধা দিল, ‘কেন? কাল তো আমরা হরিণও দেখলাম। বিকেলে বাংলোর চারদিকের পরিখার বাইরে একটা ময়ূরও দেখেছি, মনে নেই?’ কিংশুক বলতে থাকে ‘এখন শুধু বাকি রয়েছে ভালুকটাই। আজ জঙ্গলে অনেকটা পথ হাঁটলাম। শুকনো পাতার উপর দিয়ে মসমস করে হাঁটতে বেশ লাগছিল। আর এদিকটা বেশ পাহাড়ি, চড়াই—উতরাই পথ। ভালোই পরিশ্রম হয়েছে। বেশ কয়েকটা উই-এর ঢিবি আর ভালুকের পায়ের ছাপও দেখতে পেলাম। কিন্তু ব্যস, ওই পর্যন্তই। শীতের এই সময়টাতে তো ওরা বেশি বেরোয় না!’
‘তাহলে ভালুক আর ভূত এই দুটো হলেই লিস্ট কমপ্টি। ঠিক কি না?’ লোকটা আবার ফোড়ন কাটল।
গোঁফের ফাঁকে একটু চোরা হেসে ফের বলল, ‘তোমাদের একটা গল্প শোনাই। চার বছর আগের কথা। আজকেরই দিনে আমরা চারজন এখানে বসে আড্ডা মারছিলাম—সেই রাতের কথা বলি।’
একটু থেমে আবার লোকটা বলল, ‘ভদ্র-চৌধুরী-ইকুয়েশনের নাম শুনেছ?’
আমরা চুপ করে রইলাম। ওরকম কিছু কস্মিনকালেও শুনিনি। নিতান্ত অবজ্ঞাভরে আমাদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে টেবিলের ওপরে রাখা সিগারেটের প্যাকেটটা থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরিয়ে লোকটা আবার বলল, ‘শেয়ার মার্কেটে কোন শেয়ার পরের একসপ্তাহে কতটা উঠতে বা নামতে পারে সেটা এই ইকুয়েশনটা বলে দিতে পারত। স্ট্যাটিস্টিক্যাল মডেল। একেবারে নির্ভুল। তা সে যাকগে। মোদ্দা কথা, ফরমুলাটা জানলে যে-কেউ রাতারাতি কোটিপতি হয়ে যেতে পারে। কারণ ওটা খুব সহজে কম্পিউটারে ক্যালকুলেট করে নেওয়া যেত। আর সেই অনুযায়ী শেয়ারে ফাটকা খেলা যেত।’
‘আপনি জানেন ফরমুলা?’ তমাল আগ্রহে লোকটার দিকে সরে এসে বলল।
‘নাহ, আগেও শুনিনি, পরেও শুনিনি। প্রয়োজনও হয়নি। শুধু ওইদিনই শুনলাম। কারণ ওই মনীশ ভদ্র আর অসীম চৌধুরী দুজনই ছিল ওইদিনে। আরেকটা লোকও ছিল ওদের সঙ্গে, তার নাম জানি না। দেখেও মনে হচ্ছিল গুন্ডা টাইপের।’
‘তা, আপনি ওদের আগে চিনতেন?’
‘না, এখানেই আলাপ। তার কয়েকঘণ্টা আগে। খাওয়ার সময়। ভাবলাম একা এসেছি—এদের সঙ্গে একটু আড্ডা মারা যাবে। সেদিনও এরকম মোমবাতির আলোয় বসে গল্প করছিলাম। মনীশ আর অসীম নিজেদের মধ্যে শেয়ার মার্কেট নিয়ে আলোচনা করছিল। কীভাবে লাস্ট কয়েকমাসে শুধু ওই ফরমুলা দিয়ে কোটি কোটি টাকা ওদের লাভ হয়েছে—তারই আলোচনা। ওদেরই আবিষ্কার, এমনিতে হয়তো খোলাখুলি এসব বলত না। কিন্তু পানীয় একটু বেশি পড়েছিল পেটে—তারই সুবাদে ওরা বাইরের লোকের সামনেও সব বলে যাচ্ছিল আর খানিকটা জোর করে হাসছিল মাঝে মধ্যে।
‘আমার মনে হচ্ছিল মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেও মনীশ আর অসীমের সম্পর্ক অতটা ভালো নয়। যত রাত হচ্ছিল পানীয়ের মাত্রার সঙ্গে সঙ্গে ওদের সম্পর্কের আসল দিকটা ফুটে উঠছিল। বুঝলাম ওরা একে অপরকে একদম বিশ্বাস করে না। আবিষ্কারটা করেছে দুজনে মিলে, কিন্তু লাভটা দুজনেই একা একশোভাগ চায়।
‘অন্য লোকটা কিন্তু সজাগ হয়ে বসে ছিল। কথা বলছিল না। মনে হল অসীমের পার্সোনাল সেক্রেটারি জাতীয় কেউ হবে। গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল। শেয়ার থেকে রাজনীতি, রাজনীতি থেকে জঙ্গল, জঙ্গল থেকে আমেরিকা-ইরান এরকম বেশ কয়েকটা টপিক হয়ে ঘড়ির কাঁটা তখন ন’টা পেরিয়েছে। আর আমরা রাতের খাবারের কথা ভাবছি—ঠিক তখনই হঠাৎ বাইরে থেকে এক দমকা হাওয়া এল। মোমবাতির আলোটাকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল হাওয়াটা। এক মুহূর্তেই ঘরের মধ্যে নিকষ কালো অন্ধকার। জানালার বাইরের অন্ধকারটা যেন ঘরেও হানা দিয়েছে। হঠাৎ খেয়াল হল আমার হাতঘড়িটা পাশের ঘরে রেখে এসেছি। দামি ঘড়ি—ও ঘরের লাগোয়া বারান্দার দিকের দরজাটাও খোলা রয়েছে। কেউ চুরি করবে না তো অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে? ওটা এখনই সরানো দরকার। ভেবে যেই উঠে দাঁড়িয়েছি—হঠাৎ জঙ্গলের নিস্তব্ধতা চিরে খুব জোরে গুলির আওয়াজ। পরে বুঝেছিলাম যে অন্য গুন্ডাটাইপের লোকটা গুলি করেছিল মনীশবাবুকে।’
‘সে কী!’ আমরা একসঙ্গে বলে উঠলাম।
ভদ্রলোক পাশে কিংশুকের চেয়ারটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে উঠল, ‘এখানে বসেছিল মনীশ।’ তারপর আমার দিকে লক্ষ্য করে একটু থেমে আবার বলে উঠল, ‘আর তুমি যেখানে বসে আছো, সেখানে ছিল ওই খুনি লোকটা। বুঝতেই পারছ, মাঝে মোটে তিন হাত দূরত্ব। আমি ছিলাম মনীশের ঠিক পাশে, এই চেয়ারে। ভুল হওয়ার চান্স নেই, অন্ধকার হলেও।’
‘তা ওখানেই স্পট ডেড?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
লোকটা শালটা গায়ে আরেকটু জড়িয়ে নিয়ে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, স্পট ডেড, তবে ও নয়।’
‘মানে? ওইটুকু ডিসট্যান্স। অন্ধকারে মিস হয়ে গেল?’
‘আরে না না। ও ছিল পাকা খুনি। ওর আলোর দরকার হয় না। সবই ভাগ্য বুঝলে? জন্মমৃত্যু সবই ভাগ্য। আমরা ভাবি এক হয় আরেক।’ একটু থেমে লোকটা সিগারেটের শেষ অংশটা টেবিলের ওপরে রাখা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল।
বাইরে ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। দূরে একটা পাখির ডানা ঝটপটানির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সবাই পাথর হয়ে বসে আছি। মোমবাতির আলোটাই যা একটু ভরসা।
ভাবা যায়, ঠিক এখানেই চারবছর আগে আজকের দিনে একটা খুন হয়েছিল? লোকটা আবার বলে উঠল, ‘গল্প কিন্তু এখানে শেষ হয়নি। যা বলছিলাম, গুলিটা মনীশের গায়ে লাগেনি। লেগেছিল আমার বুকে। কারণ, মোমবাতির আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি উঠে ঘড়িটা আনতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বুকে এসে লাগল গুলিটা। বেঁচে গেল মনীশ।’
‘মাই গড। তারপরেও আপনি বেঁচে?’ শাশ্বত বলে ওঠে।
কথাটা যেন না শুনেই লোকটা বলে চলল, ‘ভাবো তো! কুলডিহাতে আমার আসার কথাই ছিল না। আমি ওদেরকে চিনতাম না, জানতাম না। ওদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দেওয়ারও কোনও কথা ছিল না। নেহাতই পকোড়ার গন্ধে গন্ধে এসে বসেছিলাম। দমকা হাওয়ায় মোমবাতিটা যে হঠাৎ তখনই নিভে যাবে, তা-ই বা কে জানত? আমারও সেই মুহূর্তে না উঠলেই হত। ঘড়িটার আর কত দাম! না উঠলে ওই গুলিটা মনীশের গায়েই লাগত। আমার গায়ে লাগত না। আরও হয়তো চল্লিশ বছর দিব্যি হেসে খেলে কাটিয়ে দিতে পারতাম। পুরোটাই হল চান্স। এজন্যই তো বলছিলাম যে ভূত হওয়াটাই চান্সের ব্যাপার।’
লোকটা একটু থামল। মুচকি হেসে আমার দিকে তাকাল। আমরা সবাই কাঠ হয়ে বসে আছি।
সেদিন তখন রাত ক’টা বেজেছিল জানো? রাত ন’টা দশ। আর এখন? এখনও তাই।’
অট্টহাসি হেসে লোকটা বলে উঠল, ‘কী, মুখ শুকিয়ে গেল?’
কথা শেষ হতে না হতেই বাইরে থেকে দমকা হাওয়া এল। মোমবাতির শিখা একবার জোরে কেঁপে উঠে নিভে গেল। আর তখনই কান-ফাটানো বন্দুকের আওয়াজ পেলাম। চমকে উঠলাম। লোকটার হাতে একটা রিভলভার। আর তার থেকেই বেরিয়েছে গুলিটা। যা ভয় করছিলাম, লোকটা ভূত না মাথা! নির্ঘাত একটা বড় ক্রিমিনাল।
তখন হঠাৎই খেয়াল হল—ঘর তো অন্ধকার। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি কী করে। ঘরের মধ্যে স্পষ্ট লালচে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। সবার ভয়ে আতঙ্কে জড়সড় হয়ে যাওয়া চেহারা দেখতে পাচ্ছি। সবাই যে-যার জায়গায় আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে, একজন বাদে। সে কাত হয়ে চেয়ারে এলিয়ে পড়েছে। বুকের কাছে জামাটায় রক্তের ছোপ। আরে! ওখানে তো আমিই বসেছিলাম। ওটা তো আমি!
লোকটা হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘চলো, যাওয়া যাক। প্রতিবছর এই দিন এইসময় আমি আসি। সেদিনের সেই গুণ্ডা লোকটার চেয়ারে যে বসে তার ওপর প্রতিশোধ নিই। রাগটা একটু কমে। তা আজ তুমিই বসেছিলে। তাও আবার দেখো, ঠিক কুড়ি মিনিট আগে অন্য চেয়ার ছেড়ে এখানে এসে বসলে। কী ভাগ্য! তা, বুঝলে তো? ভূত মানেই চান্স, হি: হি:…’ লোকটা আবার বিশ্রীভাবে হেসে ওঠে।
‘চলো, লোকজনের চিৎকার শুরু হওয়ার আগে নিভৃতে যাওয়া যাক। অত চিৎকার কানে লাগে। তোমারও লাগবে আজ থেকে।’ লোকটা উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল দরজার দিকে। আমিও ওর পিছু নিলাম।
