Course Content
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
0/18
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

পিছনে হাঁটা – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

পিছনে হাঁটা

শুনুন আপনারা—আমি আজকে এমন একটা জিনিস দেখাতে চলেছি, যা আমার আগে কেউ কোনওদিন দেখায়নি, আর কেউ দেখাবেও না। আমিও এই শো আর দ্বিতীয়বার করব না। আজকেই প্রথম, আজকেই শেষ। ঠিক যেমন বলেছিলাম—

বিখ্যাত ম্যাজিশিয়ান স্টিভ সদর্পে বলে উঠলেন।

মুহূর্তে লন্ডনের বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহে কানাঘুষো শুরু হয়ে গেল। এবারই কি শুরু হতে চলেছে স্টিভের সেই বহু প্রতীক্ষিত ম্যাজিক—’পিছনে হাঁটা’!

এরই প্রত্যাশায় লন্ডনের মানুষ আজ এই প্রেক্ষাগৃহে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। চড়া দামে একমাস আগে সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। ম্যাজিশিয়ান স্টিভ-এর সব ম্যাজিকই প্রায় অসাধারণ। আর যেখানে স্বয়ং স্টিভই যখন বলেন তিনি যা দেখাতে চলেছেন, তা উনি আর দ্বিতীয়বার দেখাবেন না—তা প্রত্যাশার পারদকে কোথায় নিয়ে যায়, তা বলার দরকার পড়ে না।

আস্তে আস্তে গুঞ্জন থেমে গেল। স্টিভ একটা ঘড়ি টেবিলের উপর এনে রাখলেন। ছোট ঘড়ি। দূর থেকে স্পষ্ট দেখা না গেলেও ঘড়িটা যে একটু অন্যরকম তা বোঝা যাচ্ছে।

স্টিভ ঘড়িটা হাতে তুলে নিয়ে বলে উঠলেন, আমার এ ঘড়িটা সামান্য ডিফেক্টিভ। ডিফেক্টটা কিরকম তা একটু পরে আপনারা বুঝবেন। আমি এতে এখন থেকে পনেরো মিনিট বাদে একটা অ্যালার্ম দিলাম। এই পনেরো মিনিট আমরা অন্য একটা ম্যাজিক দেখব। শুধু সময়টা দেখে নিন। এখন সন্ধে ছ’টা। কি, সন্ধে ছ’টা তো?

হল জুড়ে প্রবল সাড়া এল, হ্যাঁ ছ’টা।

ওকে, লেট দ্য ম্যাজিক বিগিন নাউ। স্টিভের পরনে সাদা প্যান্ট। কালো বো টাই। স্টিভ টাইটা খুলে উপরের দিকে ছুড়ে দিলেন। সেটা একটা পায়রা হয়ে হলের মধ্যে দু-তিন মিনিট ধরে উড়ে কোথায় উধাও হয়ে গেল। হাততালিতে হলঘরে এখন কান পাতা দায়। তবে স্টিভের পক্ষে সবই সম্ভব। এ ধরনের ম্যাজিক তো অন্যান্য ম্যাজিশিয়ানরাও করে দেখাতে পারে। কিন্তু যে স্টিভ ম্যাজিক করে জাহাজ ভ্যানিশ করে দিতে পারেন, কাগজের প্রথম পাতায় তিনদিন পর কী কী থাকবে বলে দিতে পারেন আগে থেকে, তাঁর কাছে এটা কিছুই নয়। স্টিভ এবার একের পর এক তাসের ম্যাজিক দেখাতে থাকেন। বিভোর দর্শকের আর হুঁশ থাকে না। তার মাঝেই হঠাৎ পাশের টেবিলে রাখা ঘড়িটাতে তীব্র আওয়াজ করে অ্যালার্ম বেজে ওঠে। হাতের তাসটাকে টেবিলে রেখে স্টিভ এগিয়ে যান ঘড়িটার দিকে।

ডানহাতে ঘড়িটা ওপরের দিকে তুলে বলে ওঠেন, ঘড়িতে অ্যালার্ম যখন দিয়েছিলাম তখন বেজেছিল ছ’টা। অ্যালার্ম দিয়েছিলাম ছ’টা পনেরোয়। অথচ এখন এ ঘড়িতে সময়টা দেখুন, ক’টা বলুন তো? ফের নিজেই বলেন, পাঁচটা। আর আপনাদের ঘড়িতে?

পরীক্ষার রেজাল্টের অ্যানাউন্সমেন্টের সময় যেমন সব নিয়ম অনেক সময় ভেঙে যায়, ঠিক তেমনই হলের মধ্যে মুহূর্তে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গেল। হলের অভিজাত দর্শকরা বিস্ময়ে শিশুর মতো চিৎকার করে উঠল। প্রত্যেকের ঘড়িতে পাঁচটা। বিকেল পাঁচটা।

মাথা থেকে টুপিটা খুলে হাতে নিলেন স্টিভ। মাথা ঝুঁকিয়ে বলে উঠলেন, আমরা অ্যালার্ম দেওয়ার সময় থেকে একঘণ্টা পিছনে চলে গেছি। এখন সময় হল পাঁচটা। আপনারা কত সহজে বাড়তি কিছু সময় পেয়ে গেলেন, তাই না?

দর্শকরা এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরে পেল। হাততালি চলতেই থাকে—বহুক্ষণ। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে স্টিভকে অভিবাদন জানাতে থাকে। অ্যালার্মটা তখনও বেজে চলেছে।

হ্যাঁ, অ্যালার্মটা এখনও বেজে যাচ্ছে। ধড়মড়িয়ে বিছানার উপর উঠে বসে অতীন। বেডসাইড টেবিলে ঘড়িটা। কী ভয়ানক স্বপ্ন! মনে হচ্ছে সব যেন সত্যি। ঘুমন্ত চোখে হাত বাড়িয়ে অ্যালার্ম বন্ধ করতে গিয়ে চমকে উঠল অতীন। এ ঘড়িতেও পাঁচটাই বাজে।

অ্যালার্ম বন্ধ করে বেশ খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে বসে থাকে অতীন। এ কি সম্ভব! ওর স্পষ্ট মনে আছে। ছ’টায় শুয়েছিল সাতটায় অ্যালার্ম দিয়ে।

নাহ, গত কয়েকদিনের পরিশ্রমের জন্যই বোধহয় মাথার ঠিক নেই। তারপরে অসময়ে দিবানিদ্রা। উঠে জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল অতীন। বাইরে এখনও দিনের আলো। রবিবার বিকেল, তাই লোকের দেখা নেই।

হঠাৎ একটা লাল টয়োটা গাড়ি সামনের রাস্তা দিয়ে গিয়ে বাঁদিকে বাঁক নিয়েই উলটোদিক থেকে আসা অন্য একটা গাড়িকে জায়গা দিতে গিয়ে জোরে ব্রেক কষল। চমকে উঠল অতীন। ঠিক, হ্যাঁ ঠিক এই ঘটনাটাই অতীন দেখেছিল ঘুমোতে যাওয়ার আগে। আর ঠিক এর পর পরই দুটো স্কুলের ছেলে সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট পরে ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট হাতে সামনের ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল। হলও তাই। ছেলে দুটো সামনের রাস্তা দিয়ে এসে ডানদিকে বাঁক নিয়ে অতীনের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে গেল।

এটা কি স্বপ্ন! এই ২০১৪ সালে ওয়েলস-এর বুকেও এরকম সম্ভব? অতীন ফিরে এসে ঘড়িটা হাতে তুলে নিল। ৬ ইঞ্চি বাই ৪ ইঞ্চি চৌকো আকৃতির কাঠের ঘড়ি। উপরে চারটে সুইচ। তার মধ্যে একটা অ্যালার্মের জন্য। কাঠের উপর নানা কারুকার্য করা। বেশ বড় সাদা ডায়াল। এখন এরকম ঘড়ি দেখতে পাওয়া যায় না। তিনমাস হল ওয়েলস-এর এই ছোট শহর কার্লিয়নে এসেছে অতীন। একটা পাঁচ ঘরের বড় বাড়ি ভাড়া নিয়ে এখানেই একা থাকে। গতকাল বাড়ির স্টোররুম পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা দেরাজের মধ্যে ঘড়িটাকে দেখতে পায়। দেখেই আগ্রহ হয়। এই প্রথমবার ওটাতে অ্যালার্ম দিয়েছিল আজ।

ছুটির দিন। তাহলেও নানান কাজ আছে। এখানে রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার, বাগানের দেখাশোনা—এ সব কিছুই অতীনকেই সামলাতে হয়। তাই ঘড়ির পিছনে আর সময় নষ্ট না করে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অতীন। নিশ্চয়ই এসব মনের ভুল। হয়তো গাড়িটাও স্বপ্নের মধ্যেই দেখেছিল। কে বলতে পারে!

সব কাজ শেষ করতে ন’টা বাজল। বাইরে লোক চলাচল নেই বললেই চলে। ডিনার শেষ করে পড়ার টেবিলে একটা বই নিয়ে পড়তে বসেছিল অতীন। হঠাৎ কী খেয়াল হতে উঠে দাঁড়ায়। ঘড়ির কাছে গিয়ে অ্যালার্ম দিলে সাড়ে ন’টায়। একবার টেস্ট করে দেখা দরকার সন্দেহটা নেহাত অমূলক কিনা। ফের টেবিলে এসে বসল অতীন। বই পড়তে পড়তে মাঝে-মধ্যেই আড়চোখে তাকাতে থাকে ঘড়িটার দিকে। ন’টা পাঁচ-দশ-পনেরো, তারপর হাতের বইটায় এতটাই নিমগ্ন হয়ে পড়ল যে বাকি সময়টা আর খেয়াল রাখতে পারেনি। হঠাৎ অ্যালার্মের শব্দে হুঁশ ফেরে। ঘড়িটা হাতে নিয়েই শিহরণ হল অতীনের। রাত আটটা। অর্থাৎ ঘড়িটা ফের ফিরে গেছে অ্যালার্ম দেওয়ার একঘণ্টা আগে।

নিশ্চিত হওয়ার জন্য টেবিল ল্যাম্পের আলোর তলায় ঘড়িটাকে ধরল অতীন। হ্যাঁ আটটাই। পাশে দামি হাতঘড়িটাও রাখা ছিল। সেটাতেও একই সময়। তাহলে কি ঠিক পাঁচ মিনিট বাদে ও স্বাতীর ফোনটা পাবে, ঠিক যেরকম এসেছিল! মোবাইলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে রইল অতীন। সব যেন কীরকম গুলিয়ে যাচ্ছে। ওর বুদ্ধি-বিবেচনা বোধ সব যেন হেরে যাচ্ছে একটা ভূতুড়ে ঘড়ির কাছে।

ঠিক আটটা পাঁচেই ফোনটা এল স্বাতীর। সেই এক কথা। শোনো, বুবু ফের বায়না করছে। তোমাকে অনেকদিন দেখেনি। সমানে ‘কবে আসবে’ ‘কবে আসবে’ করছে। নাও, ওকে বোঝাও।

সেকী! অনেক রাত হয়ে গেছে তো ওখানে! এখনও জেগে আছে? দাও ওকে দাও…বুবু সোনা, কেমন আছ?

বাবা তুমি কবে আসবে? তুমি বলেছিলে আমার সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ খেলবে, পাহাড়ে বেড়াতে নিয়ে যাবে।

সোনা, আর তো কয়েক মাসের ব্যাপার। দেখতে দেখতে ছ-সাত মাস কেটে যাবে। তারপর যাব। তুমিও ততদিনে আর একটু বড় হয়ে যাবে।

না বাবা, তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি আসতে হবে।

না সোনা, তা হয় না। এখানে অফিসের কাজে এসেছি। বললেই কি আর যাওয়া যায়? দাও, মাকে দাও ফোনটা।

স্বাতীর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে অতীন।

ফোনটা ছাড়ার পর উত্তেজনায় এক গ্লাস জল ঢকঢক করে শেষ করল অতীন। তাহলে কি সত্যিই যখন ইচ্ছে একঘণ্টা পিছিয়ে যাওয়া যায় এ ঘড়ির বদান্যতায়? এরকম কি বাস্তবে সম্ভব?

একটা নামী স্টিল কোম্পানির হয়ে ওয়েলেসে বহুদিনের জন্য এসেছে অতীন। দেশের বাড়িতে মা, বউ ও ছেলে আছে। কিছু অসুবিধে থাকায় ওদের এখানে আনা সম্ভব হয়নি।

কলকাতায় থাকলে এ-ঘড়িটা নিয়ে এক্ষুনি অনেকের সঙ্গে আলোচনা করা যেত। এখানে কার সঙ্গেই বা কথা বলা যায়? কিন্তু এ উত্তেজনা নিয়ে বাড়িতে একা বসে থাকাও অসম্ভব। বাড়ির দরজাটা লক করে ঘড়িটা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল অতীন। এ জায়গাটা এখন একদম শুনশান। রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া। তাই আশপাশের বাড়িগুলোর আলো নিভে গেছে। টিমটিম করছে রাস্তার হলুদ আলো। আকাশে এখনও সদ্য ডোবা সূর্যের আলোর স্পর্শ। গ্রীষ্মকাল, তাই বেলা অনেক বড়। বাইরের আবহাওয়া বেশ মনোরম। ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে।

খানিক দূরে একটা পার্ক আছে। বেশ বড় পার্ক। পার্কের চারধারে ঘোরানো হাঁটার রাস্তা। প্রচুর গাছ। মাঝখানে একটা ছোট পুকুরকে ঘিরে অনেক বেঞ্চি পাতা আছে বসার জন্য। একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসল অতীন।

ঘড়িটাকে অনেক খারাপভাবে ব্যবহার করা যায়। একঘণ্টার মধ্যেই এত কিছু পালটে যায় যে সেটা জানা থাকলে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে উঠতে পারে অতীন। আবার এটাকে ভালো কাজেও লাগানো যেতে পারে। এই যেমন কয়েকদিন আগে একটা বড় ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেল। হয়তো সময়মতো একঘণ্টা পিছিয়ে গেলে ওই অ্যাক্সিডেন্টটা থামানো যেত। অনেক লোকের জীবন বাঁচানো যেত। একঘণ্টা পিছিয়ে গেলে একটা ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচের রেজাল্টও বদলে দেওয়া যায়। অনেক বড় বড় বিপর্যয় থামিয়ে দেওয়া যায়। উত্তেজনায় ঘামতে শুরু করল অতীন।

কিন্তু নিজের জীবন পালটে দেওয়া যায় না। কথাটায় চমকে উঠে ঘাড় ঘোরাল অতীন। পাশেই বেঞ্চিতে কখন জানি আরেকজন ইংরেজ ভদ্রলোক এসে বসেছেন। মাঝবয়সি, সৌম্য সুন্দর চেহারা। চোখ-নাক-মুখ তীক্ষ্ণ। পুরোনো দিনের ভারী ফ্রেমের চশমা। কাঁচা-পাকা চুল। সাদা দাড়ি। কালো প্যান্ট, সাদা শার্ট। আশ্চর্য একেই তো স্বপ্নে দেখেছিল অতীন।

হ্যাঁ, অনেক কিছুই করা যায়। কিন্তু নিজের জীবনে পালটে দেওয়া যায় না।

কথাটা বলে লোকটা ডানহাতটা অতীনের দিকে বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য।

আমার নাম স্টিভ। একটা সময় ম্যাজিক দেখাতাম। ম্যাজিকই ছিল আমার দিনরাতের স্বপ্ন—সাধনা। বুঝলে যেটাই মনে হত অসম্ভব—সেটাই সম্ভব করার চেষ্টা করতাম। উপায়ও বার করে ফেলতাম। লোকে আমাকে হুডিনির সঙ্গে তুলনা করত। আমার ম্যাজিক শোগুলোর টিকিট একমাস আগে সব বিক্রি হয়ে যেত।

তা আপনাকেই তো আমি খানিক আগে—বলতে গিয়ে থেমে গেল অতীন। স্বপ্নে দেখেছে বললে নির্ঘাত পাগল ভাববে।

হ্যাঁ, স্বপ্নে দেখেছিলে, তাই তো? অনেক স্বপ্ন সত্যি হয়, বুঝলে! তা, যা বলছিলাম—আমার ছোট্ট একটা ছেলে ছিল, পিটার। ওর সেদিন প্রবল জ্বর। আর আমার আবার একটা ম্যাজিক শো-এর ট্যুরে ইউরোপ যাওয়ার কথা ছিল। ম্যাজিক শো শেষ করে যখন তিনদিন বাদে ফিরলাম—তখন সব শেষ। পিটার আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এখনকার মতো এত সহজে তখন যোগাযোগ করা যেত না। তাই আমাকে বাড়ি থেকে ওরা খবর পাঠাতে পারেনি।

আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম। তখনই মনে হল যদি কোনওভাবে অতীতে ফেরা সম্ভব হত। হ্যাঁ, সময়ের পিছন দিকে, যেখানে গেলে পিটারকে ফিরে পাব। আমার ছোট ছোট অনেক ভুল শুধরে নিতে পারব। ওকে আরেকটু সময় দিতে পারব। কিন্তু না, মজাটা দেখো, পারলাম—কিন্তু শুধু একঘণ্টা পিছিয়ে যেতে পারলাম। প্রতি মুহূর্ত যেখানে ছুটে এগিয়ে চলেছে, দুরন্ত গতিতে সব হিসেব উলটেপালটে, সেখানে একঘণ্টা পিছিয়ে কী লাভ! ওই ম্যাজিক ঘড়িটা আমারই তৈরি করা। একবার, শুধু একবারই একটা ম্যাজিক শো করেছিলাম ওই ঘড়িটা দিয়ে। তারপর আর কোনও শো হয়নি, দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্টিভ।

কেন?

হ্যাঁ, সেকথাই বলছি। তুমি তো শো-এর খানিকটা স্বপ্নেই দেখেছ তাই না? শো-এর পর সে এক হুলস্থুল কাণ্ড। খবর মুহূর্তে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, কারণ এই প্রথম একটা একঘণ্টার শো হয়েছিল যা ছ’টায় শুরু হয়ে ছ’টাতেই শেষ হয়। অর্থাৎ সময়ের কোনও হিসেবই মিলছিল না। আর একটা কারণও অবশ্য ছিল।

কী সেটা? শুকনো গলায় অতীন বলে ওঠে।

একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিল স্টিভ। তারপর ফের বলতে শুরু করল, সেদিনের লাস্ট ইভেন্টটা ছিল সাপের সঙ্গে কিছুক্ষণ। আমাকে একটা কাচের বাক্সের মধ্যে শিকল দিয়ে বেঁধে তিনটে বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দেওয়া হবে। আমি পাঁচ মিনিট পর বাক্স থেকে বেরিয়ে আসব।

দর্শকদের সে কী উৎসাহ, কী বলব। তবে তখনও তারা সবাই বিভোর হয়েছিল ওই ঘড়ির ম্যাজিকটাতেই। তাই বাক্সের মধ্যে প্রত্যেকটা বিষাক্ত ছোবলে আমি যখন কেঁপে কেঁপে উঠেছি, চিৎকার করে উঠেছি, তখন তারা বাইরে থেকে দেখে ভেবেছে—ম্যাজিশিয়ান স্টিভের কাছে এ আর কী? নির্ঘাত অভিনয়। বুঝতে পারেনি যে আমি আমার মৃত্যুর অপেক্ষা করছিলাম। তাই আমার নিথর দেহ যখন দশ মিনিট বাদে বাক্স থেকে বের করে আনা হয়েছিল, তখন সবাই, এমনকী আমার সঙ্গী কলাকুশলীরাও ভাবছিল আমি অভিনয় করছি, এই বুঝি ফের উঠে দাঁড়াব। এই বুঝি টুপিটা হাতে নিয়ে সদম্ভে কুর্নিশ করে বলে উঠব, ‘দ্য ওয়ান অ্যান্ড ওনলি ওয়ান—দ্য গ্রেটেস্ট ম্যাজিশিয়ান অফ অল টাইম—স্টিভ।’

উত্তেজিত হয়ে অতীন উঠে দাঁড়াল এবার।

মা-মানে—আপনি—তখন মারা গিয়েছিলেন!

অতীনের কথা গ্রাহ্য না করেই স্টিভ বলতে থাকল, বুঝলে, পিটারের সঙ্গে আগে কখনও পাঁচ মিনিট সময়ও কাটাইনি। পিটারের মার সঙ্গেও না। কথা বলারই সময় পেতাম না। শুধু নিজের নামের মোহে—নিজের ম্যাজিকে মত্ত ছিলাম। আমার নাম যখন ইংল্যান্ড ছেড়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল—তখনও বুঝিনি যে পিটার পাঁচ বছরের হয়ে গেছে। আর সবার ভিড়ের মধ্যে আমি কত একা। যখন বুঝলাম, তখন পিটার চলে গেছে। পিটারের মা সেও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। শুধু রয়ে গেছে সময় আর একাকিত্ব।

শেষ দু-বছর আমি শুধু চেষ্টা করে গেছি কীভাবে আবার সেই দিনগুলোতে ফেরা যায়। সেই দিনগুলোতে যখন পিটার সবে হামাগুড়ি দিতে শিখছিল। আধো আধো কথা বলতে শিখছিল। পারিনি। একঘণ্টা অতীতে গিয়ে আর যাই হোক হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে ফিরে পাওয়া যায় না। তাই আমি যা বলছিলাম—ও ঘড়ির মোহে পোড়ো না। আমি বন্ধু, শুধু ঘড়িটা নিয়ে গেলাম। আর দিয়ে গেলাম কিছুটা বাড়তি সময়। ভুল কোরো না।

বলে ঘড়িটা নিয়ে স্টিভ উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরে-সুস্থে এগিয়ে গেল পার্কের গেটের দিকে। আর তারপরই কীভাবে যেন হঠাৎ করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

স্টি-স্টিভ-ডাকতে গিয়ে গলা থেকে আওয়াজ বেরোল না অতীনের। আর তার মধ্যেই বেজে উঠল পকেটে রাখা ফোনটা। চমকে উঠে ফোনটা ধরল অতীন। স্বাতীর ফোন। হাতঘড়িতে আবার সময় আটটা পাঁচ।

শোনো, বুবু ফের বায়না করছে, তোমাকে অনেকদিন দেখেনি। সামনে ‘কবে আসবে’ ‘কবে আসবে’ করছে। নাও ওকে বোঝাও।

সেকী! অনেক রাত হয়ে গেছে তো ওখানে! এখনও জেগে আছে? দাও ওকে দাও…বুবু সোনা, কেমন আছ?

বাবা তুমি কবে আসবে? তুমি বলেছিলে আমার সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ খেলবে, পাহাড়ে বেড়াতে নিয়ে যাবে।

হ্যাঁ সোনা—পরের সপ্তাহেই যাব।

পরের সপ্তাহে!

বুবু ফোনটা ছেড়ে মাকে বলে ওঠে, মা, বাবা বলেছে পরের সপ্তাহেই এখানে আসবে।

ফের স্বাতীর গলা, কী সব বলছ বলো তো! তুমি বলছিলে আসতে দেরি হবে। তোমার কন্ট্রাক্ট তো দু-বছরের, সে ও এখন তো কয়েকমাস বাকি।

নাহ, আর দেরি নেই। পরের সপ্তাহেই ফিরব। না হলে ও আমায় পাগল করে দেবে। এখানকার কাজ শেষ, কাল ডিটেলে বলব।

ফোনটা ছেড়ে অতীন বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। প্লেনের ফেরার টিকিটটা খুব তাড়াতাড়ি বুক করে দিতে হবে।