আধঘণ্টার অভিনয় – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
আধঘণ্টার অভিনয়
শীতের রাত। পুরোনো গাড়ি। ইস্টারস্টেটের রাস্তায় গাড়ি খারাপ হলে হয়রানির একশেষ। যতক্ষণ দিনের আলো থাকে একে অন্যের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু সূর্য গাছের আড়ালে মুখ লুকোলেই রাস্তার চেহারা অন্যরকম হয়ে যায়। তখন রাস্তার ধারে বিপদসঙ্কেত জ্বালানো অকেজো গাড়ির যাত্রীদের দিকে আর কেউ ভুলেও তাকায় না। কে জানে গাড়ির মধ্যে বন্দুক হাতে হয়তো কোন আততায়ী বসে আছে!
তা এসব ভেবেই স্টেট হাইওয়ে ফরটি সিক্স দিয়ে সিনসিনাটি রওনা হয়েছিলাম।
গা ছমছম রাস্তা। মাঝে মাঝে উলটোদিক থেকে গাড়িগুলো ঝড়ের বেগে এসে হেড লাইটের আলো ছড়িয়ে কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে। দুধারে পাতা হারানো ম্যাপল, হথহর্ন আর অ্যাশ গাছের মিছিল।
এসব দেখতে দেখতে যাচ্ছি, এমন সময় যে জিনিসটা নিয়ে সবথেকে ভয় ছিল সেটাই হল। টায়ার বার্স্ট। অন্য কোনও বাড়তি টায়ারও গাড়িতে নেই।
বাইরে এসে দেখি রাস্তায় শিশিভাঙা কাচের টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে মিনিট দশেক অপেক্ষা করলাম। ঠান্ডাটা ক্রমে ক্রমে আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে। খানকয়েক গাড়িও গেল সামনে দিয়ে। কিন্তু হাত দেখাতেও কেউই দাঁড়াল না।
না:, অন্য কোনও উপায় দেখতে হবে। দূরে অবশ্য একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। ঘরে আলো জ্বলছে। হাঁটা পথে মিনিট দশেক হবে। ওখানে গিয়ে ফোন করে অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনে সাহায্য চাওয়া যায়।
এখানকার লোকেরা এরকম দূরে নিরালায় থাকতে ভালোবাসে। ওখান থেকে যতদূর দেখা যায় তাতে দ্বিতীয় কোনও বাড়ি চোখে পড়ল না। কাছাকাছি বড় শহর কমপক্ষে তিরিশ মাইল দূরে। কীভাবে যে এরা একা একা শহর থেকে এতদূরে থাকে—সেটাই মাঝে মাঝে ভাবি।
গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে এক চিলতে পথ চলে গেছে। তা ধরে হাঁটতে থাকলাম। বাড়ির দরজার সামনে যেতেই বাইরের আলোগুলো জ্বলে উঠল। সেনসর লাগানো আছে। বেশিরভাগ বাড়িতেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। এটা তারই একটা অংশ। কী ধরনের অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছে কে জানে!
বেল বাজিয়ে সতর্ক হয়ে দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকলাম। কতধরনের লোকই তো আছে! ঘরের ভেতর থেকে একবার খসখস আওয়াজ পেলাম।
মিনিট পাঁচেক বাদে দরজা খুললো। দরজা খুললেন এক বৃদ্ধা। দেখে ষাটের বেশি বয়স বলে মনে হয়। নীল ড্রেসিংগাউন পরা। আমার দিকে কীরকম অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। কী ব্যাপার পাগল নাকি? বেশভূষাতে অন্তত সেরকম মনে হয় না। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরলেন।
—বঁসোয়া ম্যাদমোজায়েল।
ফ্রেঞ্চে অভ্যর্থনা। পরের কথাগুলো অবশ্য ইংরেজিতেই বললেন। আমি আমার গাড়ি খারাপ হওয়ার কথা জানালাম। বললাম ফোন করে অ্যামেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনে জানানোর জন্য এসেছি।
বৃদ্ধা আমাকে চেয়ারে বসতে বলে মৃদুস্বরে বলে উঠলেন,—ফোন করার আগে আমি সামান্য কিছু কথা আপনাকে জানাতে চাই। আমার কথা হয়তো আপনার খানিকটা অদ্ভুত লাগবে। বিশ্বাস হবে না। সত্যি কথা বলতে কি, আমি আপনাকে দেখে আমার চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আপনাকে দেখতে অবিকল আমার মেয়ে ক্লদিয়ার মতো। ক্লদিয়া মারা গেছে—তা প্রায় কুড়ি বছর হলো। বাইশ বছরে মারা যায়। ক্যান্সারে। আজ যখন দরজা খুলে আপনাকে দেখলাম, মনে হল ঠিক সেই ক্লদিয়াই চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
বৃদ্ধার চোখ কথা বলতে বলতে ছলছল করে উঠল।
আমাকে ফোনটা দেখিয়ে দিয়ে উনি ফের বলে উঠলেন,—আমার একটা একান্ত অনুরোধ আছে। ফোন করার পর কিছুটা সময় যদি আমাদের এখানে কাটিয়ে যান, তাহলে খুব ভালো হয়। আমি জানি এটা নিতান্তই অন্যায় অনুরোধ। কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই আজকের এই বিশেষ দিনে আপনি আমাদের কাছে এসেছেন।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম যে আমার কাল সকালেই একটা বিশেষ কাজ আছে, গাড়ির সমস্যা মিটে গেলেই আমাকে ফিরতে হবে। কিন্তু তার আগেই উনি দ্রুত পায়ে লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে গেলেন।
একটু পরে একটা ছবির ফ্রেম হাতে নিয়ে ঘরে ফিরলেন। ক্লদিয়ার ছবি। আমার হাতে ছবিটা দিলেন। ছবিটার দিকে তাকিয়ে আমার কথা বন্ধ হয়ে গেল। এ তো আমারই ছবি। পুরোনো মরচে পড়া ফ্রেমে বাঁধানো। এরকমও হতে পারে? অবিকল আমার মতো দেখতে।
আমাকে চেয়ারে বসতে বলে ভদ্রমহিলা ভেতরের ঘরের দিকে ফের এগিয়ে গেলেন। ভেতরের ঘর থেকে ওনার কান্না শুনতে পেলাম। কারও সঙ্গে কথা বলছেন। অন্যজনের কথা আরো মৃদুস্বরে। ফ্রেঞ্চে কথা চলছে।
মিনিট পাঁচেক বাদে উনি ফিরে এলেন। চোখের জলকে লুকোনোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে বলে উঠলেন,—ও-ঘরে আমার অসুস্থ স্বামী। বেশ কিছুদিন ধরে শয্যাশায়ী। তবে গত দশ দিন উনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ডাক্তার হসপিটালে পাঠাতে বলেছিল। পাঠাইনি। যা হবে এ বাড়িতেই হোক। আজকে ওঁর অবস্থা আমার মোটেই সুবিধের মনে হচ্ছে না।
—তা আমি কি কোনওভাবে সাহায্য করতে পারি?
—হ্যাঁ, ঈশ্বর বোধহয় ওনার শেষ ইচ্ছেটা পূর্ণ করতেই আপনাকে এখানে পাঠিয়েছেন। তাই তো আপনাকে আটকে রেখেছি। আপনি কি ফ্রেঞ্চ জানেন?
—হ্যাঁ, ভালোই জানি।
—অপূর্ব। আপনাকে আমার মেয়ের অভিনয় করতে হবে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্যে।
অভিনয়? কেন?
—তাহলে একটু গোড়া থেকেই বলি। আজ থেকে কুড়ি বছর আগের কথা। আমার স্বামী ড: দানিয়েল ছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী। ক্যান্সারের ওপর ওঁর গবেষণা সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানমহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু কী ভাগ্য! আমাদেরই একমাত্র মেয়ে ক্লদিয়ার ক্যান্সার হল। লাংস ক্যান্সার। কী করে হল কে জানে—অমন ফুটফুটে মেয়েটার। তবে শুরুতেই ধরা পড়েছিল। চিকিৎসা চলছিল। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যেত না।
সে রাতটার কথা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। দানিয়েল রাত ন’টা নাগাদ ল্যাবরেটরি থেকে বাড়ি ফিরল। বেশ উত্তেজিত। এসেই ক্লদিয়া কোথায় জিগ্যেস করল। ক্লদিয়া তখন গরমের ছুটিতে বাড়িতেই ছিল। দানিয়েল বলল আমাদের সঙ্গে কিছু জরুরি কথা বলতে চায়। তিনজনে একসঙ্গে বসলাম। দু-চারটে মামুলি কথার পর দানিয়েল হঠাৎ বললো ক্লদিয়ার ওপর ওর সদ্য আবিষ্কৃত ক্যান্সারের ওষুধ প্রয়োগ করতে চায়। এতে নাকি ক্লদিয়ার ক্যান্সার চিরদিনের মতো সেরে যাবে।
আমি জিগ্যেস করলাম, এতে কোনও খারাপ প্রতিক্রিয়া হবে না তো?
দানিয়েল হেসে উড়িয়ে দিল। ও বরাবরই এরকম চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী। ক্লদিয়ারও বাবার ওপর অগাধ বিশ্বাস। অবশ্য ওর বাবাকে আমি কখনও মিথ্যে বড়াই করতে দেখিনি।
খাবার পরে রাত দশটা নাগাদ দানিয়েল কতকগুলো ইনজেকশান দিল ক্লদিয়ার হাতে। বলল আপতত জ্ঞান হারালেও দু-ঘণ্টা পরে ক্লদিয়ার জ্ঞান ফিরে আসবে। কিন্তু জ্ঞান আর ফেরেনি। ওর আজও বদ্ধমূল ধারণা ক্লদিয়ার জ্ঞান ফিরবে।
মেয়ের মৃত্যুর পর থেকে ও কীরকম যেন হয়ে যায়। গবেষণা, ইউনিভার্সিটির চাকরি সব ছেড়ে দেয়। ওই ঘটনার পর ক্লদিয়ার মৃতদেহের পাশে পাগলের মতো বসে ছিল কয়েকদিন। কফিনেও দিতে দেয়নি। কয়েকদিন বাদে ক্লদিয়াকে সমাধিস্থ করা হয়। যদ্দিন দানিয়েল চলতে ফিরতে পারত ততদিন রোজ ও সমাধির পাশে বসে থাকত। বলতো ক্লদিয়া ঘুমিয়ে আছে, যে-কোনও সময় জেগে উঠবে।
এখন দানিয়েল চলতে পারে না। ডাক্তারেরা বলে দারুণ মানসিক আঘাতে ও এক দুরারোগ্য রোগের শিকার হয়েছে। ওর ব্রেনসেলগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। আমাকে আজকাল খাইয়ে দিতে হয়। কথা বলতেও ওর খুব কষ্ট হয়। তারই মধ্যে ও বলে যায়, ‘ও আসবে, ও আসবে।’ খানিক আগে কলিং বেল শুনে গিয়ে দেখি ওই অবস্থাতেও বলছে ‘ক্লদিয়া কিনা দেখো তো’?…পারবেন—কয়েক ঘণ্টার জন্যে আমাদের মেয়ের অভিনয় করতে? আমি চাই শান্তিতে ওর মৃত্যু হোক।…হাতে আর বেশি সময় নেই—পারবেন?
হ্যাঁ, চেষ্টা করব। তবে এটা কি সম্ভব হবে?
—আপনার কোন অসুবিধে হবে না। আমি আপনাকে সাহায্য করব। মিনিট পাঁচেক পরে আসবেন ওই ঘরে।
ভদ্রমহিলার কথামতো মিনিট পাঁচেক বাদে ভেতরের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকলাম। ঘরে হালকা একটা নাইটল্যাম্প জ্বলছে। ভদ্রমহিলা সোফায় বসে আছেন। দানিয়েল খাটে শুয়ে আছেন মনে হল। পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকতেই দানিয়েল ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলেন,—বারবারা দেখো তো কে? ক্লদিয়া না?
—না, না, ক্লদিয়া কী করে আসবে? তুমি শুধু শুধু ফের ওরকম বলে চলেছ। জানোই তো ক্লদিয়া কোনওদিন ফিরে আসবে না।
কে বলল আসবে না? এতদিন ও ঘুমিয়ে ছিল। ঘুম ভাঙতেই ও এসেছে। ক্লদিয়া, কাছে আয় মা। কতদিন দেখিনি—দানিয়েল বলে ওঠে।
ভদ্রমহিলা ভালোই অভিনয় করতে জানেন। এবার উঠে কিরকম অবাক হবার ভান করে দরজার দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর আমার থুতনির নিচে হাত দিয়ে মুখটা ওপরের দিকে তুললেন। দু-তিন মিনিট নিষ্পলকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন,—ক্লদিয়া। আরে এ তো ক্লদিয়াই। আমি কি স্বপ্ন দেখছি?
বৃদ্ধা কাঁদতে শুরু করলেন। আমার গালে দু-হাত বোলাতে থাকলেন। আর চোখের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। চোখের দু’কোণ বেয়ে নামা জলের ধারা দেখে আমিও বোধহয় ভুলে গেলাম যে এটা অভিনয়। মনে হল আমিই ক্লদিয়া। ওই চোখের জলেই লুকিয়ে আছে আমার আসল পরিচয়। ‘মা’ বলে জড়িয়ে ধরলাম। বৃদ্ধা তখন আমার সারা গালে চুমু খেতে খেতে বলে চলেছেন,—কতদিন, কতদিন তোকে দেখিনি। দ্যাখ, তোর জন্য অপেক্ষা করে করে তোর বাবার কী অবস্থা।
আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ভদ্রমহিলা একটা চেয়ারে বসালেন। দানিয়েল যে খাটে শুয়ে আছেন তার সঙ্গেই লাগানো। ভদ্রমহিলা দানিয়েলের হাত দুটো ধরে আমার মাথায় ঠেকালেন।
বলো, ক্লদিয়াকে কিছু বলো। সারাক্ষণ তো ক্লদিয়া, ক্লদিয়া করো। —ভদ্রমহিলা দানিয়েলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন।
দানিয়েলকে বলতে শুনলাম,—বলেছিলাম না ও আসবে। ও আমাদের ছেড়ে থাকতেই পারে না। আয়, কাছে আয়। আর তো তোমার কোনও দু:খ নেই বারবারা। আমারও নেই। তোমার মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় তোমার কাছে ফের নিয়ে এসেছি।
দানিয়েলের কাছে এগিয়ে যেতেই ওঁর হাতদুটো শিথিল হয়ে খাটের উপর পড়ে গেল। ভদ্রমহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন,—দানিয়েল। দানিয়েল।
দানিয়েলের কোনও সাড়া নেই। হয়তো শেষ নিশ্বাসটুকু আটকে রেখেছিলেন মেয়েকে দেখার জন্য।
বারবারার কান্না আর থামে না। বেশ খানিকবাদে শান্ত হলে ওনাকে বোঝালাম যে উনি শান্তিতে মারা গেছেন। ওনার আর কোনও আক্ষেপ নেই। বুঝতেই পারেননি যে আমি ওনার মেয়ে নই।
ভদ্রমহিলার জলে ভেজা চোখদুটো দেখলাম আনন্দে কেমন জ্বলে উঠল। মুখে একটা পরিতৃপ্তির হাসির রেখাও ফুটে উঠল।
সে রাতটা ওখানেই থেকে সকালের দিকে বিদায় নিলাম। ভদ্রমহিলা যাওয়ার সময় কপালে চুমু খেয়ে বললেন,—তুমি আমার মেয়ের মতো। তোমার ঋণ আমি কোনওদিন শোধ করতে পারব না। যখনই সময় পাবে চলে আসবে।
অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন থেকে সাহায্যও এসে গিয়েছিল। সিনসিনাটি পৌঁছে গেলাম সকাল দশটা নাগাদ। এখনও একা থাকলে ওই রাতের অভিজ্ঞতা মনে উঁকি মারে।
এতটা একটানা বলে অনিলিখা জলের গেলাসে চুমুক মারল। প্রায় আধঘণ্টা বলে যাওয়ার পর।
তা এটুকু বিরতিও সাগ্নিকের পছন্দ হয়নি। ও বলে ওঠে,—তা ওই বৃদ্ধার সঙ্গে আর কোনওদিন যোগযোগ হয়নি তোমার?
—এখনও ঘটনাই তো শেষ হয়নি। আসল কথাটা তো আমি এখনও বলিনি।
আমরা নড়ে-চড়ে বসলাম,—আসল কথা মানে?
—ঘর থেকে বেরোনোর সময় ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটার দিকে চোখ পড়েছিল। ক্লদিয়ার গায়ে লাল শার্ট। অর্থাৎ ছবিতে ক্লদিয়ার পরা জামাটা আর আমার পরা জামাটা হুবহু এক। এরকম হতে পারে যে চেহারা অবিকল এক, কিন্তু জামা এক হয় কী করে?
—তাই তো?
—এক হতে পারে যদি ওটা ক্লদিয়ার ছবি না হয়ে আমারই ছবি হয়। নিশ্চয়ই দরজার বাইরে কোনও ক্যামেরা রাখা ছিল যাতে তোলা ছবি সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্ট হয়ে যায়। আর সে ছবিই সঙ্গে সঙ্গে রাখা হয়েছিল পুরোনো ওই ফ্রেমটাতে। কিন্তু এসব কী জন্যে? আরেকটু ভাবতে খেয়াল হল। দানিয়েলের হাতটা অত ঠান্ডা লেগেছিল কেন? মৃত্যু তৎক্ষণাৎ হলে তো শরীর গরম থাকার কথা। আর তাছাড়া রাস্তাতে কাচের টুকরো এল কী করে? পুরো ঘটনাটার জটিলতা আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।
কীরকম? কিছুই তো বোঝা গেল না। বৃদ্ধ কথা বলতে বলতে মারা গেলেন তোমার সামনে, আর তুমি বলছ উনি আগেই মারা গেছলেন।—বিশ্বজিৎদা বলে ওঠে।
—ঠিক তাই। দানিয়েল মারা গেছিলেন আমি যাওয়ার অন্তত দশঘণ্টা আগে। আত্মগ্লানি থেকে মৃত্যুর সময়ও উনি রেহাই পাননি। ওঁর একমাত্র মেয়ের মৃত্যুর কারণ যে উনি নিজে। ভাবতে পারো কী অসহনীয় সে বেদনা! ওঁর ধারণা ছিল মেয়ে মরেনি, ঘুমিয়ে আছে। কোনও বুদ্ধিমান লোকের পক্ষে এরকম ধারণা থাকা উচিত নয় জানি, কিন্তু মনকে শান্ত করতেই হয়তো দানিয়েল ওই ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাই দিনের পর দিন ক্লদিয়ার পথ চেয়ে বসে থাকতেন।
বারবারা জানতেন যে তাঁর মেয়ে কখনোই ফিরবে না। কিন্তু মেয়ের বেঁচে থাকার ধারণাটাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন দানিয়েল যে তাঁর এই ভুল ধারণা ভাঙা বারবারার পক্ষে সম্ভব হয়নি, বা ভাঙতে চানওনি।
শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর অন্ধকার একদিন ঘনিয়ে এল দানিয়েলের ওপর। সেটাই ছিল মানসিক দিক দিয়ে বিপর্যস্ত বারবারার ওপর সবথেকে বড় আঘাত। বারবারার মনে হল কোনওভাবে কি তাঁর স্বামীর শেষ বিশ্বাসটাকে ঠিক প্রমাণ করতে পারেন না! সেটাই হয়তো ওঁর স্বামীর আত্মাকে শান্তি দেবে। গ্লানিমুক্ত করবে। আর তাই এই অভিনয়।
দানিয়েলের গলায় কথা বলেছিলেন বারবারা নিজেই। রাস্তায় কাচ ছড়িয়ে গাড়ি খারাপ করে বাইরের লোককে ঘরে ডেকে এনেছিলেন উনিই। জানতেন ওই এলাকায় গাড়ি খারাপ হলে ফোন করতে ওঁর বাড়িতেই আসতে হবে। বাইরের আগন্তুকের ছবি দরজায় লাগানো ক্যামেরার মাধ্যমে তুলে ফ্রেমে রাখার পরিকল্পনাও বারবারার মস্তিষ্কপ্রসূত। ঠিক নিজের সন্তানের মতো দেখতে বললে যে কারুর মনে ওঁর প্রতি সহানুভূতি জাগবে, আর ওঁর পরিকল্পনা মতো অভিনয় করতেও রাজি হবে।
কিন্তু তবু প্রশ্ন থেকে যায় এত কিছু কীসের জন্যে? এক মৃত আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে? নাকি ক্রমাগত দু:খের আঘাতে ভেঙে পড়া এক বৃদ্ধার মস্তিষ্কবিকৃতিরই এ এক লক্ষণ? (বছর খানেক বাদে ওই রাস্তা দিয়ে একবার যেতে হয়েছিল। রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ওই বৃদ্ধার খোঁজ করেছিলাম। সেই বাড়িটা তখনও ছিল। গাছ-আগাছায় বাড়ির চারদিক ঢেকে গিয়েছিল। আর কোনও আলো জ্বলছিল না।)
