রাজাবাবু – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
রাজাবাবু
কিছুদিন হল মানিকবাবুর সময় বিশেষ ভালো যাচ্ছে না। এক মাস আগে মেয়েটা হঠাৎ পড়ল জন্ডিসে। বাড়াবাড়ি রকম। ডাক্তার-চিকিৎসা—এসব নিয়ে অনেক খরচ হয়ে গেল। গত পরশু ভিড় বাসে পকেটমার হল। পাঁচশোর মতো টাকা ছিল তাতে। তা ছাড়া বেশ কয়েকটা দরকারি কার্ড। সবমিলিয়ে ঝামেলার একশেষ। গতকাল খাটের ওপর রাখা শখের চশমার ওপর বসে পড়লেন ভুল করে। গেল সাধের চশমাটা। আগেই অবশ্য কাচদুটো ঘষা খেয়ে খেয়ে ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল। এমনিতেও বদলাতেই হত। তবুও। এগুলো তো তাও সব ছোটখাটো ক্ষতি, সামলে নেওয়া যায়।
মনটা খারাপ হয়ে গেল সকালের কাগজটা খুলে। দশ বছর ধরে আস্তে আস্তে কিস্তিতে একটা জমি কিনছিলেন, এত বছর দু-কামরার একটা ভাড়া বাড়িতে আছেন। ভেবেছিলেন বাড়ি করলে একটা নিজস্ব জায়গা হবে। ছেলেমেয়ের জন্য কিছু একটা রেখে যেতে পারবেন।
কিন্তু না, যাদের কাছ থেকে জমিটা কিনছিলেন তার মালিক নাকি নানান রকম জমি কেলেঙ্কারিতে যুক্ত। রাতারাতি উধাও। আর সে-খবরটা বেশ ফলাও করে কাগজে বেরিয়েছে।
অতগুলো টাকা! জীবনে আর বাড়ির শখটা পূর্ণ হবে না ওনার। আর এক বছর পরে অবসর। আর বাড়িতেই বা কী বলবেন!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন মানিকবাবু। শ্রাবণ মাস। রাতভর বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার, পাশের বাড়ির পাঁচিলের ওপর একটা সাদা বেড়াল ভারী নিশ্চিন্তে বসে আছে। পরশুদিনের ঝড়ে উলটোদিকের নিমগাছে কাকেদের বাসাটা ভেঙে গিয়েছিল। আবার খড়কুটো জোগাড় করে ওরা বানানোর চেষ্টা করে চলেছে। স্কুলের বাচ্চাদের একটা গাড়ি এসে ঢুকেছে। হইচই করতে করতে সার বেঁধে বাচ্চারা গাড়িতে উঠছে। এসব দেখে বেশ খানিকক্ষণ আচ্ছন্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, ঘোর কাটল গিন্নির ডাকে—বাজার করতে যেতে হবে।
এই বাজার করার কাজটা মানিকবাবুর কোনওদিনই পছন্দ নয়। গত সপ্তাহ থেকে কাজটা ওনার ঘাড়ের ওপর চেপেছে।
এক্ষেত্রে, মানিকবাবু সম্পর্কে দু-একটা কথা বলতে হয়। ওনার হাবে-ভাবে, চালচলনে একটা রাজা-রাজা ভাব আছে। আর তাই রিকশাওয়ালারা ওনাকে দেখলেই দশ টাকার জায়গায় পনেরো টাকা ভাড়া চায়। দোকানে কেউ চেঞ্জের টাকা ওনাকে ফেরত দেয় না। উনি দরদাম করে কিছু কেনেন না।
মাসের প্রথম চারটে দিন ট্যাক্সিতে করেই যাতায়াত করেন মানিকবাবু। তারপর আবার বাস-মেট্রো-ট্রাম। কোনও ভিখারিকে খালি হাতে ফেরান না উনি। জীবনে কম রোজগার করেননি। কিন্তু তার বেশিরভাগটাই গেছে অন্যদের সাহায্য করতে গিয়ে। এমনকী বাড়িতে চাঁদা চাইতে এসেও পাড়ার ছেলেরা যা আশা করে আসে, তার থেকে অনেক বেশি নিয়ে ফেরে। কোনও অতিথি এসে না খেয়ে ফিরে যায় না মানিকবাবুর বাড়ি থেকে। আর তা ছাড়া আপদে-বিপদে লোককে উপযাচক হয়ে সাহায্য করা তো আছেই। এ জন্যই বিশেষ অর্থ কখনওই সঞ্চয় হয়নি।
কিন্তু সময় তো চিরকাল একরকম যায় না। বহুদিনের পুরোনো চাকর গণেশ বয়সের জন্য অবসর নিয়ে দেশে চলে গেছে একসপ্তাহ আগে। তার পরেই বাজার করার গুরুদায়িত্বটা ওনার ঘাড়ে এসে পড়েছে।
বাজারের থলিদুটো হাতে নিয়ে ধীরেসুস্থে বেরিয়ে এলেন মানিকবাবু। বাজার অগ্নিমূল্য। খানিকক্ষণের মধ্যেই টের পেলেন বাজারের লিস্টে যা ছিল, তার অর্ধেক কিনতেই টাকা প্রায় শেষ।
কারণ অবশ্য আরেকটাও আছে। পাঁচশো বেগুনের জায়গায় পাঁচকেজি বেগুন নিয়েছেন। দুশো পেঁয়াজের জায়গায় এককেজি পেঁয়াজ নিয়েছেন।
আসলে ছোট ছোট বাজার করা মানিকবাবুর পোষায় না। তা ছাড়া কোনও কিছু দর করে কিনতে বা দরাদরি করতেও মানিকবাবুর গায়ে লাগে। কেনার শেষে দোকানি যা বলে সেই দাম দিয়ে দেন। গরিব লোক এরা—এদের সঙ্গে আবার দরাদরি কী!
বাজারে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল অতীনবাবুর সঙ্গে। অতীনবাবু একটা সংস্থা চালান যারা গরিব স্কুল পড়ুয়াদের অর্থসাহায্য করে। মানিকবাবু নিজে নিয়মিত এদের অনেক টাকা সাহায্য করেন।
অতীনবাবুর সঙ্গে দেখা হতেই মানিকবাবুর একটু আত্মগ্লানি হল। গত একমাস উনি টাকা দিতে পারেননি মেয়ের অসুস্থতার পর থেকেই। উনি ঠিক করে ফেললেন যে আর বাজার না করে সে-টাকাটা জমিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই এদের দিয়ে দেবেন।
ততক্ষণাৎ বাজার শেষ করে কোনওরকমে দুটো ভারী ব্যাগ দু-হাতে ব্যালান্স করে এগোচ্ছেন, হঠাৎ করে একটা রোগা ছোটখাটো লোক ওনার দিকে এগিয়ে এল। একটা সাধারণ হাফহাতা রংচটা জামা, খয়েরি রঙের প্যান্ট।
—রাজাবাবু, চলুন, ব্যাগটা আমাকে দিন। আপনাকে কষ্ট করে বইতে হবে না।
রাজাবাবু! কথাটা ভারী পছন্দ হল মানিকবাবুর। প্রতিবাদ করে উঠলেন, না, না কিছু ভাববেন না। আমি পারব। আপনি কষ্ট করবেন কেন? আর, আপনাকে তো চিনলাম না।
যদিও মুখটা একটু চেনা চেনাই লাগল মানিকবাবুর।
—আমি কি আর সেরকম কোনও কেউকেটা লোক নাকি রাজাবাবু, যে আপনি চিনবেন! ওই ওদিকে থাকি। তবে আপনাকে আমি বেশ চিনি। আপনার বড় দয়ার শরীর। দিন, দিন থলেদুটো দিন। আপনার কি আর ওসব নেওয়ার অভ্যাস আছে!
অগত্যা মানিকবাবু নাছোড়বান্দা লোকটার হাতে থলিদুটো দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগলেন। লোকটা মানিকবাবুর বাড়ির তলায় এসে থলেদুটো ফের মানিকবাবুর হাতে দিয়ে বলল,—খুব ভালো লাগল রাজাবাবু আপনার দেখা পেয়ে। আসি।
মানিকবাবু কী করবেন—লোকটাকে টাকা দেবেন কি দেবেন না—ভাবার আগেই লোকটা চলে গেল। নাহ, এখনও ভালো লোক আছে। এভাবে এগিয়ে এসে সাহায্য করা।
পরবর্তী কয়েকদিন একই ব্যাপার হল। মানিকবাবুর বাজার শেষ হতে-না-হতেই কোত্থেকে লোকটা এসে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগটা নিয়ে নেয়। বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে আবার চলে যায়। এমন ভদ্র ব্যবহার যে টাকা দিতেও খারাপ লাগে। তবে লোকটা যে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নয়, এ-ব্যাপারে মানিকবাবু নিশ্চিত। জিগ্যেস করলে বলে, রাজাবাবু, সামান্য প্রজা আমরা। আমাদের নাম-পরিচয় জেনে আপনার কী হবে বলুন!
এর পর পর বেশ কয়েকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। সোমবার। অফিস থেকে বেরিয়ে সেদিন বেশ খানিকক্ষণ কোনও বাস পাচ্ছিলেন না মানিকবাবু। শেষ পর্যন্ত এক বাদুড়-ঝোলা বাসের পাদানিতে একটা পা দিতে-না-দিতে বাসটা ছেড়ে দিচ্ছিল। পড়েই যাচ্ছিলেন মানিকবাবু। হঠাৎ করে কে যেন হাত ধরে টেনে বাসের মধ্যে তুলে নিল। তারপর মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বলে উঠল,—এ ভিড় বাসে ওঠা আপনাকে মানায় না রাজাবাবু।—বলে লোকটা বাসের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। মুখটা আর দেখা গেল না।
তার পরদিনের ঘটনা, অটো থেকে নামার ঠিক আগে মানিকবাবু খেয়াল করলেন মানিব্যাগে মোটে একটা একশো টাকার নোট পড়ে আছে। খুচরো নেই। আর সেটা দিলে অটোচালকের মুখে যে ধরনের গালাগাল শুনতে হবে তা ভেবে একটু ভয়ই পেয়েছিলেন। হঠাৎ পাশ থেকে চশমা পরা ভদ্রচেহারার এক যুবক বলে উঠল,—ভাববেন না রাজাবাবু, আমি আপনার ভাড়াটা দিয়ে দেব।
মানিকবাবু দ্বিধা করছিলেন, কিন্তু শেষে ছেলেটার পীড়াপীড়িতে মেনে নিতে বাধ্য হলেন। অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে মানিকবাবু অটো থেকে নেমে গেলেন। কী ব্যাপার! হঠাৎ যেন শহরটাই পালটে গেছে। সবাই যেন ভদ্র-বিনয়ী-উপকারী হয়ে গেছে। মনে মনে ভারী খুশি হলেন মানিকবাবু।
এর দুদিন পরের কথা। নেহাতই বউয়ের পীড়াপীড়িতে, যে সংস্থায় টাকা দিয়ে জমি কিনেছিলেন, সেখানে গেলেন মানিকবাবু। সংস্থার মালিক ফিরে এসেছে—এরকমই খবর। বাইরে বেশ ভিড়। পুলিশের পাহারা। টানা দু-ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর সংস্থার মালিক গুপ্তাজির চেম্বারে ডাক পেলেন।
গুপ্তাজি বেশ রাশভারী প্রকৃতির। গুন্ডা-ষণ্ডা চেহারা। চেম্বারের মধ্যে একটা বুলডগ ছাড়া আছে। সেটা মানিকবাবুর গা ঘেঁষে এসে বসল।
দরজার বাইরে দুজন গুন্ডাশ্রেণির লোক দাঁড়িয়ে আছে। গুপ্তাজির চেম্বারের পিছনের দেওয়ালে একটা বড়সড়ো ছবি। তাতে একজন মন্ত্রীর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে গুপ্তাজি দাঁড়িয়ে আছেন।
এসব দেখে একটু কাঁচুমাচু মুখেই বলে ফেললেন মানিকবাবু কথাটা—চার বছর আগে জমি পাওয়ার কথা ছিল গুপ্তাজি, এখনও তো কিছুই হল না। টাকাটা কি ফেরত পাওয়া যাবে?
কথাটার মধ্যে গুপ্তাজির একটা ফোন এসেছিল। ফোনটা ধরে বেশ কিছুক্ষণ গুপ্তাজি কার সঙ্গে কোন একটা পার্টিতে যাওয়া নিয়ে কথা বললেন। তারপর ফোনটা ছেড়ে পানের পিকটা পাশে রাখা একটা পাত্রে ফেলে ফোনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে উঠলেন, আপনাদের ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল মিনিস্টার। রাতে একসঙ্গে পার্টি আছে।
একটু থেমে ফের বলে উঠলেন, টাকা ফেরত লিবেন না, অবশ্যই লিবেন! বলে ডেকে উঠলেন,—বাবুয়া! এ বাবুয়া—
বাইরের গুন্ডা চেহারার লোকদুটোর মধ্যে একজন ঘরে প্রবেশ করল।
—বাবুয়া, এক লাখ ক্যাশ দে দো। তা মানিকবাবু চা-কফি কিছু লিবেন?
—এক লাখ! আমি তো প্রায় কুড়িলাখ টাকা দিয়েছি গুপ্তাজি।
—হা: হা:, উনিশ লাখ তো খরচখরচা হয়ে গেছে। বিজনেসে কত খরচ হয় জানেন তো? মাটি ফেলেছি, রাস্তা করেছি, গাছ লাগিয়েছি। কত প্রাোমোশন হয়েছে। আপনাদের কী এক নামকরা অ্যাকট্রেস আছেন না—ভেরি সুইট—উনি এত টাকা লিয়েছেন অ্যাড-এর জন্য। টাকা কি আর আমার কাছে পড়ে আছে! ওসব কি আপনার বোঝার বাত আছে। লিন—কফি খান।
—কিন্তু গুপ্তাজি, আমি তো কালও গিয়ে দেখলাম—পাঁচ বছর আগেও যা ছিল, এখনও তাই। কোথায় রাস্তা—কোথায় জমি—চারদিকে সেই একইরকম শস্যখেত—চারদিকে জংলা গাছ। কিছুই তো হয়নি।
তবে কি আমি ঝুটাবাত বলছি!—চেঁচিয়ে উঠলেন গুপ্তাজি।
সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটাও মানিকবাবুর দিকে মুখ ঘোরাল। সে-দৃষ্টি খুব একটা মোলায়েম না। নাহ, আর কথা বাড়িয়ে কাজ নেই। ক্ষমতা থাকলে মিথ্যে কথাও এভাবে জোর দিয়ে বলা যায়।
আরও দু-এক কথার পরে মানিকবাবু ওই সংস্থার অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন। শরীর অত্যন্ত খারাপ লাগছে। সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। এটুকু বুঝেছেন যে ওনার পক্ষে এধরনের খারাপ লোকের হাত থেকে টাকা বার করা সম্ভব নয়। এদের সঙ্গে গুন্ডা আছে, বড় নেতারা আছেন। এ-টাকার খানিকটা পেলেও ভারী সুবিধে হত। অতীনবাবুর ছাত্রবন্ধু সংস্থার দশটা ছেলের পড়ার খরচ চালান মানিকবাবু। তাদের সংখ্যাটা আরও বাড়ানো যেত। অনেকেরই পড়া বন্ধ হয়ে যায় টাকার অভাবে। আর একটা ছাত্রের পড়া বন্ধ মানে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা নষ্ট। ছেলেটাকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভরতি করেছেন লোন নিয়ে। তারও কিছুটা শোধ দেওয়া যেত।
এসব ভেবে শরীরটা বেশ খারাপ লাগল। একটু দূরে একটা চায়ের দোকান ছিল। এক কাপ চা নিয়ে বসলেন। চিন্তাভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ পাশ থেকে কার ‘রাজাবাবু’ ডাকে চমকে উঠলেন। পাশে একটি মাঝবয়েসি ভদ্রলোক এসে বসেছে। তার মুখেই এ সম্বোধন। অভাবি চেহারা, নাকটা বেশ বড়। টাকমাথা।
—রাজাবাবু, এই আপনার চেকটা নিয়ে এলাম।
—চেক! কীসের চেক?
লোকটা একটা চেক এগিয়ে দিল। মানিকবাবুর নামে—কুড়ি লক্ষ টাকা। গুপ্তাজির সংস্থার নামে। গুপ্তাজির সইসহ।
চমকে উঠে মানিকবাবু বলে উঠলেন, সে কী? দিচ্ছিল না যে, পরে মত পালটাল নাকি! নাহ, লোকটা এত ভালো তা বুঝিনি তো!
লোকটা বলল, মত কি আর এমনি এমনি পালটায়। একটু বোঝালাম, ভালো মন্দ—দু-একটা চড়-থাপ্পর। যান, চিন্তা করবেন না। এই চেক বাউন্স হবে না। আমি তো আছি।
খানিকক্ষণ মানিকবাবুর মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোল না। চোখ ছলছল করে উঠল—আপনি, আপনি—বড় উপকার করলেন। বড় দরকার ছিল টাকাটার। কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না। আপনি আমাকে চেনেন?
—আপনি হলেন আমাদের রাজাবাবু—আপনাকে চিনব না!
লোকটা উঠে দাঁড়াল। মানিকবাবুও উঠে দাঁড়িয়ে লোকটার হাতদুটো জড়িয়ে বলে উঠলেন, আপনার নামটা?
—আমরা হলাম সামান্য প্রজা। আমাদের নাম পরিচয়-জেনে কী হবে বলুন! কোনও দরকার হলেই আমি আবার চলে আসব।
সামনে দিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স প্রবল আওয়াজ করে যাচ্ছিল। ওর দিকে আঙুল তুলে লোকটা বলে উঠল, এই যে, গুপ্তাজিকে নিতে এসেছে। মারধরটা একটু বেশি হয়ে গেছে তো! ভারী দুষ্টু লোক। যাই—আমি উঠি।
—তা ভাই, হঠাৎ করে আপনি আমার এত বড় উপকার করলেন কেন বলুন তো? আজকাল মনে হচ্ছে চারদিকের সব লোকেরা যেন হঠাৎ করে ভালো হয়ে গিয়েছে। বাজার করতে গেলে লোকে সেধে এসে সাহায্য করে। বাসে-অটোতেও সাহায্য করে। বিপদে পড়লে এগিয়ে আসে। কী ব্যাপার বুঝি না!
লোকটা হেসে উঠল—ওসব ব্যাপার সব বোঝানো যাবে না। আপনি হলেন গিয়ে আমাদের রাজাবাবু।
লোকটা প্রায় চলেই যাচ্ছিল। কোনওরকমে তাকে থামিয়ে মানিকবাবু প্রশ্ন করে উঠলেন, আচ্ছা, ‘রাজাবাবু’ কথাটা আজকাল প্রায়শই শুনছি কেন বলুন তো! এমনি কথাটা শুনতে মন্দ লাগে না।
লোকটা এবার একটু গম্ভীর হয়ে গেল। বলে উঠল, আপনি তো বড় ভালোমানুষ রাজাবাবু। আপনার মনে পড়ে দমদম স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের কাছে একজন বুড়ো শুয়ে থাকত। তাকে মাঝেমধ্যেই আপনি খাবারদাবার কিনে দিতেন। শীতে শাল কিনে দিতেন, মনে পড়ে?
—হ্যাঁ, মনে পড়েছে বটে। কিন্তু তাকে তো আজকাল আর দেখি না।
—দেখবেন কী করে! সে তো ছ’মাস হল মারা গেছে।
—আহা রে! বড় ভালো লোক ছিল সে। তা সেরকম তো অনেক লোককেই আমি দিয়ে থাকি। এ আবার বড় ব্যাপার কী? ওরকম অভাবী লোক—দেওয়াটাই তো স্বাভাবিক।
—মনে পড়ে রাজাবাবু, বেশি টাকা খরচ হবে বলে আপনার নিজের ছেলেমেয়েকে কোনওদিন ভালো স্কুলে পড়াননি। অথচ আর দশটা ছেলের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিতেন। ছাত্রবন্ধু সংস্থার এরকম অনেক ছেলের পড়ার খরচ চালাতেন। বিপুলকে মনে পড়ে রাজাবাবু! আপনার সাহায্য না পেলে বিপুল কি আজ ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত? কেই বা ছিল ওর বলুন!
—ও, তাহলে আপনি বিপুলের কেউ হন, তাই তো?
—আমি হলাম বিপুলের বাবা।
একটু চমকে উঠলেন মানিকবাবু। ভাঁড়ের চা চলকে আঙুলে পড়ল। তিনি তো বহুদিন আগে মারা গেছেন!
লোকটা ফের বলে উঠল, আপনি কী ভাবছেন জানি। কথাটা ভুল শোনেননি। আট বছর আগে আমি গত হয়েছি। ও তখন ক্লাস নাইনে। কিন্তু, উপকার কি অত সহজে ভুলতে পারি!
লোকটা বলে কী! এই ভরদুপুরে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের মতো জায়গায় ভূতের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। তা আবার চায়ের দোকানে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে! তবে আজকাল যা হচ্ছে, তাতে ভূতেও অবিশ্বাস নেই মানিকবাবুর।
লোকটা বলতে থাকে—কিছুদিন আগে আমাদের ওখানে ভোট হল। আমাদেরও তো রাজার দরকার। তা দেখা গেল প্রায় সবাই আপনার নামে ভোট দিয়েছে। কারো মেয়ের বিয়েতে আপনি টাকা দিয়েছেন, তো কারো ছেলের পড়ার ব্যবস্থা করেছেন। কতজনের চিকিৎসার খরচ দিয়েছেন। মাথা গোঁজার জায়গা করে দিয়েছেন নিজের খরচে। তাই তো আজও আপনার টানাটানির সংসার। তা না হলে আপনার তো কবে বাড়ি-গাড়ি হত—তাই না? তাই আপনিই হলেন আমাদের রাজাবাবু। ভূতেদের তো আর নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলার দরকার নেই। আমরা সাচ্চা লোক খুঁজি।
আর ভবিষ্যতে যদি আবার হঠাৎ করে কোনও বিপদে পড়েন, ঘাবড়াবেন না। দেখবেন, আমাদেরই কেউ সঙ্গে সঙ্গে পাশে এসে দাঁড়াবে। লোকটা দাঁত বার করে হেসে উঠল, পান খাওয়া লাল ছোপ ধরা দাঁত। তারপর ফের বলে উঠল, তাহলে আসি রাজাবাবু, পরে আবার দেখা হবে।
