সুবীর, কথা রাখবে তো! – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
সুবীর, কথা রাখবে তো!
বিপদ যখন হয়, তখন সব একসঙ্গেই হয়। সুবীর পুরী যাচ্ছিল কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে। সুবীর থাকে সুদূর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায়। কলকাতায় ছুটিতে এসে কয়েকজন বন্ধু মিলে দু-দিনের জন্য পুরীতে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করেছিল।
সবই ঠিকমতো এগিয়েছিল। ভুবনেশ্বরে পৌঁছোতে তখন মাত্র আধঘণ্টা, হঠাৎ ফোন এল, বড়মামা মারা গেছেন। বয়স হলেও শরীরস্বাস্থ্য ভালোই ছিল বড়মামার, তাই অনেকটাই অভাবিত খবর। এ অবস্থায় আর ফুর্তি করতে পুরী যাওয়া যায় না। সুতরাং, বন্ধুদের ছেড়ে ড্রাইভার কার্তিককে গাড়ি ঘোরাতে বলল সুবীর।
ফেরার পথে তখন ঘণ্টা দুয়েক এসেছে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটু চড়াই পথ, হঠাৎ গাড়িটা বেঁকে বসল। খাবি খাওয়ার মতো করে কয়েকবার ঝাঁকানি দিয়ে নাভিশ্বাস ছাড়ল। তেল আছে, ইঞ্জিনও গরম হয়নি। কী কারণ, কে জানে?
কার্তিক গাড়ি ভালো চালায় বটে, কিন্তু গাড়ির কলকবজার প্রায় কিছুই বোঝে না। যতবারই স্টার্ট করতে যায়, গাড়ি চেরা গলায় ক্র্যা-ক্র্যা আওয়াজ করে জবাব দেয়। গাড়ি থেকে নেমে সুবীর আর কার্তিক বনেটটা খুলল। খানিকক্ষণ রিসার্চ করে হাল ছাড়ল। না:, সমস্যাটা খুব ছোটখাটো কিছু নয়। প্রাণ ফেরানো ওদের কর্ম নয়। ঠিক হল, কার্তিক গাড়ি নিয়ে ওখানেই অপেক্ষা করবে। গাড়ির কোম্পানি থেকে লোক এসে পরে গাড়ি নিয়ে যাবে। কিন্তু সুবীর তার জন্য অপেক্ষা না করে ট্রেনেই ওইদিন কলকাতা ফিরে যাবে বলে ঠিক করল। পাঁচ কিলোমিটার দূরেই একটা স্টেশন আছে। চড়াইচণ্ডী। কিছু লোকাল ট্রেন ওই স্টেশন ছুঁয়ে যায়। ওখান থেকেই কলকাতার ট্রেন ধরবে সুবীর।
ভাগ্য ভালো, বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হল না। খানিকক্ষণের মধ্যেই একটা ভ্যানগাড়িও পাওয়া গেল। তাতে করেই সুবীর চড়াইচণ্ডী স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হল।
স্টেশনে যখন পৌঁছোল, তখন সন্ধে ছ’টা। শীতের সন্ধে। ঝুপ করে অন্ধকার নেমে গেছে। আর তার সঙ্গে ঘন কুয়াশা। একফালি চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলতে খেলতে কুয়াশায় ছাওয়া সন্ধের রহস্য যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চার হাত দূরের লোককেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। স্টেশনচত্বর ফাঁকা।
সুবীরের মনের মধ্যে যে আশঙ্কা ছিল, টিকিট কাটতে গিয়ে সেটাই সত্যি প্রমাণিত হল। কলকাতায় যাওয়ার এখন একটাই ট্রেন আছে—সেটা রাত সোয়া ন’টায়। অর্থাৎ, মাঝের প্রায় আড়াইঘণ্টা সময় এই জনশূন্য প্ল্যাটফর্মে মেঘ আর চাঁদ দেখে কাটানো ছাড়া কোনও উপায় নেই। ফোনেও নেটওয়ার্ক নেই যে কথা বলে সময় কাটাবে। সিমেন্টের বেদির ওপর বসে একটা সিগারেট ধরাল সুবীর। চারদিক থেকে ঘিরে ধরা কুয়াশার ওপরে সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছেড়ে চারপাশটা দেখতে থাকল। চোখটা একটু ধাতস্থ হতে ও খেয়াল করল, প্ল্যাটফর্ম একদম জনশূন্য নয়।
দূরে প্ল্যাটফর্মের শেষপ্রান্তে একটা ছোট দোকান আছে। তাতে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। তবে সেখানে কেউ আছে কিনা তা দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না। আর একই প্ল্যাটফর্মে কুড়ি হাত দূরে আরেকটা সিমেন্টের বেদিতে একজন মোটাসোটা টাকমাথা বৃদ্ধ লোক বসে আছেন। প্ল্যাটফর্মের অস্পষ্ট হলদেটে আলোয় মুখ না দেখা গেলেও, হঠাৎই সুবীরের মনে হল লোকটার বসার ধরন, পোশাক—তার অত্যন্ত চেনা। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধের ওপর ফেলা চাদর, ঋজু হয়ে বসার ধরন, পাশে দাঁড় করানো কালো ছাতা—এ সবই বড় চেনা।
—বরেনবাবু না! উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল সুবীর। এই বিখ্যাত অঙ্কের শিক্ষকের কাছে সুবীর একসময় পড়েছে। বরেনবাবু কলকাতার এক বিখ্যাত স্কুলে প্রায় কুড়ি বছর ধরে পড়িয়েছেন। তা প্রায় তিনদশক আগের কথা। সুবীরের আজ সায়েন্টিস্ট হিসেবে বিশ্বজোড়া নাম। তার অনেকটা কৃতিত্বই অবশ্য এই শিক্ষকের। এনার কাছে পড়ার সুযোগ না পেলে অঙ্কের প্রতি ভালোবাসাই হয়তো তৈরি হত না কোনওদিন।
কুয়াশার জালের মধ্যে দিয়ে সুবীর খেয়াল করার চেষ্টা করল—বরেনবাবুই তো? এখানে উনি কী করছেন? নিশ্চিত হওয়ার জন্য সঙ্গের ব্যাগটা নিয়ে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের দু-হাত দূরে গিয়ে বসল সুবীর। আড়চোখে খেয়াল করার চেষ্টা করল। ঠিক সেই মোটা গোলগাল, ছোটখাটো চেহারা। বয়সের ভারে গোলমুখে অজস্র বলিরেখা দেখা দিয়েছে। চওড়া কপাল। চোখের দৃষ্টিতে সেই রাগী রাগী ভাবটা যেন অনেকটাই কমে গিয়েছে। হ্যাঁ, বরেনবাবুই।
অসম্ভব রাশভারী এই শিক্ষকের সঙ্গে স্কুলে কখনোই কথা বলতে সাহস করত না সুবীর। ক্লাসে ঢুকলে মুহূর্তে পিনড্রপ সাইলেন্স নেমে আসত। ক্লাসের ভালো কয়েকজন ছাত্রকে বেছে নিয়ে টিউশন ফি ছাড়াই আলাদা ক্লাস নিতেন বরেনবাবু—যাতে তারা আরও ভালো রেজাল্ট করে। তাদের মধ্যে সুবীরও ছিল। তাই গৃহশিক্ষক হিসেবে বরেনবাবুকে পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
শুধু অঙ্ক নয়, সুবীর অনেক কিছুই শিখেছিল এই শিক্ষকের কাছে।—ডিসিপ্লিন, দায়িত্ববোধ, সততা। এমন একদিনও হয়নি, ওনার আসতে দেরি হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক না কেন, বরেনবাবু আসবেন—আর ঠিক সময়েই আসবেন।
তা সেই মানুষটাই আজ সুবীরের থেকে মাত্র দু-হাত দূরে একই সিমেন্টের বেদির ওপর বসে। অবশেষে সুবীর সাহস করে বলেই ফেলল, স্যার! বরেনবাবু! কেমন আছেন?
বৃদ্ধ ভদ্রলোক তবু নিশ্চুপ হয়ে রেললাইনের দিকেই তাকিয়ে বসে আছেন। শুনতে পেয়েছেন বলে মনে হল না।
—স্যার! আমি সুবীর—আপনার ছাত্র! জোরে বলে উঠল সুবীর।
এবার উনি ঘুরে তাকালেন। খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সুবীরের দিকে। ঠোঁটের কোণে আস্তে-আস্তে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই বলে উঠলেন,—১৯৯২, উচ্চমাধ্যমিক, অঙ্কে ১৯৫—তাই তো?
বলে একটু থেমে ফের বললেন,—তা এখানে বেড়াতে এসেছ?
সুবীরের মুখে কোনও কথা এল না কয়েক সেকেন্ড। এতদিন বাদেও সবকিছু মনে রেখেছেন!
—আপনার এখনও মনে আছে স্যার! অথচ রেজাল্ট বেরোবার পরে আমি যখন আপনাকে প্রণাম করতে গিয়েছিলাম, আপনি তেমন কিছুই বললেন না। আমার একটু অভিমানই হয়েছিল।
সামান্য মুচকি হেসে মোটা ভারী গলায় বরেনবাবু বলে উঠলেন, পাঁচ নম্বর কম পাওয়াটা তো খুব খুশির খবর নয়। আর আমার প্রিয় ছাত্রের অঙ্কের নাম্বার—আর আমি তা ভুলে যাব! ওই নাম্বারগুলোই তো রয়ে যেত তোমাদের পরিচয় হিসেবে। তা, এখন কোথায় আছ? অঙ্ক কষার অভ্যেস রেখেছ তো?
—আমেরিকায়। ওখানে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে রোবোটিক্স রিসার্চে যুক্ত আছি। এখানে ছুটিতে এসেছিলাম। গাড়ি বিভ্রাটে আটকে পড়েছি। ভাগ্যিস আটকে পড়েছিলাম! আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কিন্তু, আপনি—এদিকে? কোথায়?
—রিটায়ার করার পরে দেশের বাড়িতে চলে আসি। এখানেই আছি গত দশবছর।
—পুরোপুরি অবসর জীবন?
—না, না, তা কখনও হয়! খুঁজে-পেতে ভালো ছেলে পেলেই অঙ্ক করাই। জানোই তো, অঙ্কের দুর্বল ছাত্র হলে সে আমার পড়ানো বুঝবে না। তাই ভালো ছাত্র খুঁজে বেড়াই। এদিকে অবশ্য তা কমই জোটে।
—তা এখন কোথায় যাচ্ছেন?
—আমি যাচ্ছি না। কলকাতা থেকে ছেলে অরূপ আসবে। তার জন্য বসে আছি। সাড়ে আটটায় আসবে। ও ইংল্যান্ডে ছিল। ফিরে আসছে, বেশ কয়েকবছর বাদে।
—বাহ, দারুণ খবর। তা একেবারে ফিরে আসবে? পাকাপাকি।
—হ্যাঁ, বলেছিলাম—পড়তে যাচ্ছ যাও। ফিরে এসো দেশে। তোমার মতো ডাক্তার ওদেশে অনেক আছে। এদেশে—এসব গ্রামে-গঞ্জে নেই। তা একবার গেলে যা হয়। একবছর, দু-বছর করে অনেক বছর কাটিয়ে দিয়েছে। শেষে ফিরছে। আমাকে কথা দিয়েছিল তো! শেষ পর্যন্ত কথা রাখছে। আজই ফিরবে।
—বাহ, খুব ভালো। তবে ওখানকার সুযোগসুবিধে ছেড়ে পারবে এখানে মন বসাতে? এরকম গণ্ডগ্রামে!
—কেন পারবে না? আমরাও তো আছি। এখানে থাকলে বুঝতে পারতে ভালো ডাক্তারের, ভালো ওষুধের, ভালো চিকিৎসার বড় অভাব। একজনও যদি ভালো ডাক্তার থাকত!
শেষ কথাটা খুব আস্তে আস্তে শেষ করে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন বরেনবাবু। চাদরটা খুলে মাথার ওপর দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে বলে উঠলেন,—বয়স হয়েছে বুঝতে পারি। ঠান্ডাটা যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। আগে এই ঠান্ডাতেও কত দূর দূর পড়াতে চলে যেতাম। এখন—নাহ—এখন আর পারি না।
—এখানে স্যার কলকাতার তুলনায় অনেক বেশি ঠান্ডা। আমারও ঠান্ডা লাগছে।
বরেনবাবু যেন কথাটা শুনেও শুনলেন না। একটু অন্যমনস্কভাবে বলে উঠলেন, মনে আছে তোমার পরীক্ষার রেজাল্টের পর তুমি আর তোমার মা আমাকে একটা শাল দিতে এসেছিলে। আমি নিইনি।
—হ্যাঁ, স্যার—আপনার তো দেখছি সব ছোট ছোট কথাও মনে আছে।
—আমি তখন কী বলেছিলাম মনে আছে?
চুপ করে রইল সুবীর। কিছুই মনে পড়ল না। এত বছর আগের কথা।
হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা ছাতাটা আঁকড়ে ধরে বরেনবাবু বলে উঠলেন,—বলেছিলাম, আমার কাজই তো ওই। যে গাছে ভালো ফুল ফোটার সম্ভাবনা আছে, তার আরও যত্ন নেওয়া। যখন গাছগুলো বড় হবে, ওই ফুলের গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে—তাই না? কিন্তু—
দীর্ঘশ্বাস ফেলে খানিকক্ষণ থেমে রইলেন বরেনবাবু।
—বুঝলে সুবীর, তোমার মতো ছেলেরা যদি আমেরিকা-ইংল্যান্ড গিয়ে এ-সমাজটাকে ভুলে যায়, তবে আমরা এগোব কী করে বলো! গত বছর আন্ত্রিকে এখানে বহু বুড়ো-বুড়ি-বাচ্চা মারা গেল। ভাবো—এখনকার দিনেও! এই দু-বছর আগের কথা। সম্পায়ন বলে একটা ছেলে, ক্লাস এইটে পড়ত। সাংঘাতিক ব্রেন বুঝলে! চক্রবৃদ্ধি সুদের জটিল অঙ্কগুলো মুখে মুখে—তা সে হঠাৎ চলে গেল। দুদিনের জ্বরে। ভালো চিকিৎসা পেলে হয়তো…।
একটু থেমে বরেনবাবু ফের বলে উঠলেন,—এখানে একটা হাসপাতাল হওয়ার কথা ছিল। মঙ্গল পাণ্ডে হাসপাতাল। এখানকার এমপি ছিলেন। গত হয়েছেন। পাওয়ারে অন্য দল এসেছে। ব্যস, মুখ থুবড়ে পড়েছে হাসপাতালের কাজ। তিনতলা ইটের কঙ্কাল। আকাশের দিকে মুখ তুলে রয়েছে লোহার শিকগুলো। আমি রোজ হাসপাতালের সামনে গিয়ে বসি। ভাবি, এই বুঝি কাজ ফের শুরু হল। আমার কাছে যা টাকা ছিল, সব দিয়েছিলাম। কিন্তু তবু কাজ শেষ হয়নি। আর শেষ না হলে কী হবে বুঝতে পারছ?
—হ্যাঁ স্যার, গ্রামের লোকেদের ভালো চিকিৎসার বড় অভাব।
—কিছুই বোঝোনি। আরে, আমি কি আর নেতাদের মতো সারা গ্রামের কথা চিন্তা করছি, আমি ভাবছি—আমার কথা। আবার হয়তো ওই সম্পায়নের মতোই অঙ্কের ভালো কোনও ছাত্র চিকিৎসা পাবে না। অত ভালো অ্যালজেব্রা—নাহ…। তারাজ্বলা আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালেন বরেনবাবু। গলাটা যেন কান্নায় বুজে এল।
—আমি স্যার সাহায্য করব। দেখব যাতে হাসপাতালের কাজ শেষ হয়। আপনি চিন্তা করবেন না।
—বাহ, খুব ভালো, খুব ভালো। তোমার কথা শুনে ভারী নিশ্চিন্ত হলাম। যাই, এবার ওদিকটায় যাই। ওর আসার সময় হয়ে গেল। এখানকার প্ল্যাটফর্ম এত নীচু! ওর তো আর অভ্যেস নেই তেমন। তারপর যেরকম আলো-আঁধার। আমাদেরই ভুল হয়।
চঞ্চল হয়ে ওঠেন বরেনবাবু। উঠে দাঁড়ান। সুবীরও উঠতে যায়। বরেনবাবু বারণ করেন।
—না, না। বাক্স ছেড়ে যেও না। এখানেই বসো। আমি একটু হাঁটাহাঁটি করি আর কি! মাঝে এখন তিনটে স্টেশন। ছ’মিনিট করে…—বিড়বিড় করে কথা বলতে বলতে প্ল্যাটফর্মের অন্য দিকে এগিয়ে যান বরেনবাবু। বাধ্য ছাত্রের মতো সুবীর বসে থাকে। বরেনবাবু ছাতাটা ডান হাতে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করতে থাকেন। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। কখনও কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যান—তো কখনও কুয়াশা থেকে বেরিয়ে হারিয়ে যান নিজের মধ্যেই।
খানিকবাদে হঠাৎ সুবীরের দিকে ফের এগিয়ে আসেন।
—বুঝলে! আসছে। শুনতে পাচ্ছ?
—কী? ট্রেন? কই, আমি কোনও আওয়াজ পাচ্ছি না তো।
—তোমার তো শহুরে কান—সারাক্ষণ অত আওয়াজে নষ্ট হয়ে গেছে। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। বেশ ঝিমঝিম আওয়াজ করে আসছে, বুঝেছ! পরে কথা হবে। এলেই ওকে নিয়ে চলে যাব। ক্লান্ত থাকবে তো। বহু-বহু বছর বাদে ও এখানে ফিরছে।
—বলে বরেনবাবু প্ল্যাটফর্মের অন্য দিকে এগিয়ে যান। মাঝেমধ্যে রেল লাইনের ওপর গলা বাড়িয়ে উঁকি মেরে দেখতে থাকেন। খানিকটা বিপজ্জনকভাবেই।
মিনিট পাঁচেক বাদে ট্রেনের আওয়াজ শোনা যায়। নিস্তব্ধতা ভেঙে ট্রেন হুইসল দিতে দিতে এগিয়ে আসছে। মিনিট খানেক বাদে স্টেশনে এসে ঢোকে। দু-চারজন প্যাসেঞ্জার নামে। দূর থেকে সুবীর দেখতে পায় কেউ একজন ট্রেনের পিছনদিকের একটা কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে বরেনবাবুকে প্রণাম করছে। আর তারপরে দুজনেই হাঁটতে থাকে। খানিকবাদে কুয়াশায় মিলিয়ে যায়।
একবার উঠে দাঁড়িয়ে কাছে যাবে কি যাবে না ভেবে ফের বসে পড়ে সুবীর। এতদিন বাদে বাবা-ছেলের দেখা। ডিস্টার্ব করা উচিত নয়। সুবীরের ট্রেনেরও বেশি দেরি নেই। ও তাই প্ল্যাটফর্মের শেষের দিকে গিয়ে রেললাইন ক্রস করে উলটোদিকের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ায়। শেষ কয়েক ঘণ্টায় কেন জানে না, মনটা আবার বেশ খুশি খুশি লাগছে। বরেনবাবুর সঙ্গে এরকম হঠাৎ করে দেখা হয়ে যাবে, ও কোনওদিনই ভাবেনি।
রাত সোয়া দশটা নাগাদ ন’টার ট্রেনটার দেখা মিলল। হঠাৎ একটা আলো আর আওয়াজ যেন তেড়ে এল ফাঁকা প্ল্যাটফর্মটা লক্ষ্য করে। ট্রেনে উঠে স্বস্তি পেল সুবীর। যাক, কলকাতা ফেরা যাবে অবশেষে। সারারাত এই ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকলে যে কী হত! ট্রেনে কিছু লোক আছে। প্ল্যাটফর্মের মতো জনশূন্য নয়। যেখানে বসেছে তার উলটোদিকে প্যাসেজের অন্য পাশে দুজন বসে আছে। ট্রেনটা খানিকক্ষণ চলার পরেই সুবীর খেয়াল করল ফোনে নেটওয়ার্ক ফিরে এসেছে। যাক, সভ্যজগতের সঙ্গে আবার যোগাযোগ সম্ভব। টিং, টিং করে ফোনে বেশ কয়েকটা মেসেজ আর মেল আসা শুরু করল। সেসব থেমে যাওয়ার পর ও ফোন করল তন্ময়কে, স্কুলের বন্ধু।
যে ক’জন এখনও স্কুলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে, স্কুলের সব অনুষ্ঠানে থাকে, সেরকম একজন হল তন্ময়। আর তন্ময়ের স্মৃতিশক্তিও খুব তীক্ষ্ণ। সবকিছু মনে থাকে। বরেনবাবুর খবরটা ওকে ইমিডিয়েটলি দেওয়া দরকার। ফোনটা বেশ খানিকক্ষণ বেজে থেমে গেল।
দু-মিনিট বাদেই সুবীরের ফোনটা বাজতে শুরু করল। তন্ময়?
—হ্যাঁ, সুবীর বল—অনেকদিন বাদে!
—বলিস না, একদম সময় পাই না।
—তুই কি এখন এদেশে, না বিদেশে?
—এখানে। দুদিন হল এসেছি। তা, যে জন্য ফোন করলাম। একটা জায়গায় এসেছিলাম—ছোট গ্রাম। চড়াইচণ্ডী। স্টেশনে কার সঙ্গে দেখা হল বল তো?
—স্কুলের কেউ?
—হ্যাঁ, বরেনবাবু, দ্য গ্রেট বরেনবাবু!
—বলিস কী রে? অনেক বয়েস হয়েছে নিশ্চয়ই। বকাবকি করেননি তো আবার? দু-একটা অঙ্কও নির্ঘাত দিয়েছেন!
—হেসে উঠল সুবীর।
—না, সে সুযোগ পাননি। এখনও শক্তসমর্থই আছেন। তা দেখামাত্র চিনতে পারলেন। ওনার ছেলে আজ ফিরল ইংল্যান্ড থেকে—বহুবছর বাদে।
—মানে? অরূপ ভট্টাচার্য! আর ইউ সিওর?
—কেন? দেখলাম চোখের সামনে।
—ভুল দেখেছিস। মল্লির কথা মনে পড়ে?
—হ্যাঁ, তা মনে পড়বে না! ও তো ইংল্যান্ডে ছিল। ডাক্তার হিসেবে ওর তো বেশ নামডাক হয়েছে শুনেছি।
—ছিল মানে, এখনও আছে। ও-ই বলছিল যে বরেনবাবুর ছেলে নাকি একবছর আগে কার অ্যাক্সিডেন্টে ওখানে মারা যায়। বরেনবাবুর খুব ইচ্ছে ছিল ওনার ছেলে ভারতে ফিরে আসুক। এখানকার জন্য কিছু করুক। গ্রামে একটা হাসপাতাল করে দিক। তা, ছেলে কি আর সে কথা শোনে? ফ্যামিলি নিয়ে ওখানে ওয়েল সেটলড। ওখানে বহুবছর ছিল। তারপর হঠাৎ এই দুর্ঘটনা।…তা…ওয়েট এ সেকেন্ড! মল্লি যেন বলেছিল, বরেনবাবুও আর নেই। তাই ছেলের মৃত্যুর খবরের শক উনি আর পাননি। তুই সিওর বরেনবাবুকে দেখেছিস?
—সিওর মানে, হান্ড্রেড পার্সেন্ট। অতক্ষণ কথা হল পাশাপাশি বসে। আর আমি ভুল…
বলতে গিয়ে বাধা এল। পাশ থেকে কার যেন একটা চেনা ভারী গলা ভেসে এল, অস্পষ্ট, কিন্তু গভীর স্বরে—সুবীর, কথা রাখবে তো? এখানে একটা হাসপাতাল বড় দরকার।
শব্দের উৎসের দিকে মুখ ফেরাতে গিয়ে সুবীর দেখল যে প্যাসেজের উলটোদিকে যে দুজন বসেছিল, তারা আর নেই। ফাঁকা কামরাটা ছুটে চলেছে দুদিকের গাছগাছালিকে পিছনে ফেলে। শুধু শব্দগুলো যেন রয়ে গেছে। আর বারবার ফিরে আসছে—সুবীর, কথা রাখবে তো?
