Course Content
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
0/18
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

নীলকুঠিতে কিছুক্ষণ – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

নীলকুঠিতে কিছুক্ষণ

পারমাদান দেখেই বাড়ি ফেরার ইচ্ছে ছিল সুজিতের। পারমাদান রিজার্ভ ফরেস্ট। শীতের আমুদে রোদে বেশ ভালোই লাগছিল ঘুরতে। নানান ধরনের গাছ। অনেক গাছই অজানা। নাম হয়তো শুনেছে। কিন্তু দেখার সুযোগ কখনও হয়নি। গাছের উপর নাম লেখা আছে বলে চিনতে পারছিল। এ ছাড়া হরিণও আছে বেশ কয়েকশো। খানিক আগে হরিণদের খাবার খাওয়ানো হচ্ছিল। তখন একসঙ্গে প্রায় সবকটাকে দেখাও গেল।

ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল সুজিতের। চারটে বাজে। এখান থেকে কলকাতা গাড়িতে প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ। এখনই না বেরোলে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। শীতের বেলা। এর মধ্যেই ঠান্ডা হাওয়ায় ভর করে গাছের ছায়াগুলো লম্বা লম্বা হাত বাড়িয়েছে। কোণঠাসা রোদ্দুর গাছের কয়েকটা পাতার উপরে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। ফেরার জন্য গাড়ির দিকে এগোচ্ছে হঠাৎ একটা রোগামতো বুড়ো লোক ওর দিকে এগিয়ে এল। লোকটার সঙ্গে আগেও দুবার চোখাচোখি হয়েছে, কিন্তু কোনও কথা হয়নি।

—নীল কুঠিতে যাবেন কত্তা?

—সে আবার কোথায়?

—এই মিনিট দশেক লাগবে। সামনেই ডিঙি আছে। নদী পেরিয়ে উলটোদিকে।

—আজ থাক। পরের বার এসে যাব। এখনই তো সন্ধে হয়ে এল। গিয়ে ফিরে আসতে আসতে অনেকক্ষণ লেগে যাবে।

বলে আবার গাড়ির দিকে এগোল সুজিত। যেতে যে একেবারে ইচ্ছে করছিল না, তা নয়। নীলকুঠি এখন আর কটাই বা আছে! বেশিরভাগই ভেঙে গেছে। দুশো বছর আগের যে ক’টা আছে—তা হাতে গোনা যায়। তা ছাড়া অনেক প্রজন্ম আগে সুজিতের পরিবার নাকি এসব দিকে থাকত। বড় জমিদারি ছিল এদিকে। তা সে অনেকদিনের কথা।

সুজিতের ইতস্তত ভাবটা বোধহয় টের পেয়েছিল লোকটা। বলে উঠল—চলেন কত্তা। আসা-যাওয়া আধঘণ্টা সময়। এখানে এসে ওটা না দেখলে বড় ফাঁক রয়ে যাবে। ক’দিনেরই বা জীবন—না দেখলে পরে—ওই কী যেন বলেন—মেস করে যাবেন!

—ঠিক আছে, চলো। তা তোমার নৌকো ঠিকঠাক আছে তো? জলে ডুবে-টুবে যাবে না তো?

—কী যে বলেন! এ নিয়ে কোনও চিন্তে করবেন না। এই তিরিশ বছর ধরে ইছামতীতে নাও চালাচ্ছি। কখনো মানবমাঝির নাওতে কিছু হয়নি।

লোকটা ঘাটের দিকে এগোল। সুজিতও ওর পিছু নিল। মিনিট দুয়েক হেঁটে ঘাট। ঘাটের সামনেই মানবমাঝির ডিঙিনৌকো ছিল। সরু ডিঙি, মাঝে একটা কাঠ ফেলা। তার ওপর বসতে হবে। সাবধানে উঠে তাতে বসে পড়ল সুজিত। ভালো সাঁতার জানে সুজিত। অবশ্য ইছামতীর জলের যা গভীরতা, তাতে সাঁতার না জানলেও ডোবা শক্ত। নদী বেয়ে মানবমাঝি নিপুণ হাতে নৌকো চালাতে লাগল। কিছু কিছু জায়গায় কচুরিপানায় প্রায় পুরো নদীটাই ঢেকে গেছে। তবু তারই ফাঁক দিয়ে দিয়ে ডিঙি এগিয়ে চলল।

মানবমাঝি অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। ওর ছেলে দুবাইতে কাজ করে। সেখানকার চওড়া ঝকঝকে রাস্তা—আকাশছোঁয়া বাড়িঘর। তারপর দুবাই ছেড়ে এখানকার গল্প। ট্যুরিস্ট আসে শনি-রবিবার। কিন্তু সপ্তাহের দিনে প্রায় কেউই আসে না। অফ সিজনেও লোকজন প্রায় আসে না, তখন ও মাঝরাতে উঠে নদীতে মাছ ধরে, সে মাছ বাজারে বিক্রি করে, চাষবাস করে সে ফসল বিক্রি করে চালায়। সবমিলিয়ে বেশ আছে।

—বোঝলেন কর্তা, সবই ভাগ্য। আমরা হলাম গিয়ে জলের পোকা, আর আমার মেয়ের ছোট খোকাটা এই জলে ডুবে মারা গেল গত আশ্বিনে। এই যে দ্যাখেন—আপনি এলেন—আমার নাও- তে চড়লেন—না-ও চড়তে পারতেন—আবার চরণ মিঞার ভাঙা নাওতেও চড়তে পারতেন—সবই ভাগ্য, তাই না?’

এসব পাগলের প্রলাপ শুনতে শুনতে সুজিত আশপাশের দিকে তাকাচ্ছিল। পাশের বনে হরিণের দেখা না পেলেও বেশ কয়েকটা মাছরাঙা-ফিঙে-সারস-বকের দেখা মিলল। আরো বেশ কয়েকটা নাম না জানা পাখি।

মিনিট দশেক পরে উলটোদিকের একটা ভাঙা ঘাটে ডিঙি ভিড়িয়ে মানবমাঝি বলে উঠল—উঠে যান কত্তা। ওই বনের মাঝ বরাবর রাস্তা আছে।

—কোথায়? তেমন কোন রাস্তা তো দেখছি না!

—এ কি কত্তা আপনার কলকেতার চওড়া রাস্তা পেয়েছেন! তাও যা ছিল গাছ-আগাছায় বুজে গেছে, আসলে এ কুঠির একটু দুর্নাম আছে তো। তাই লোকে আজকাল আসতে ভরসা পায় না। একটু এগোলেই আপনি টের পাবেন।

সুজিত এমনিতে যথেষ্টই ডাকাবুকো। তবু একথা শুনেই বলল—আগে বলোনি তো! তা কীসের উৎপাত—চোর, ডাকাত না ভূতের?

—কর্তা, লোকে তো কত কীই বলে! আমাকেও তো পাগল বলে! এখানে ভূতের উৎপাত আছে বলে। তা ভূত চেনা হল ভাগ্যির ব্যাপার। কে যে আসল ভূত, আর কে যে নকল ভূত—তা বোঝাই যায় না। কজনের আর ভূত দেখার সৌভাগ্য হয় বলেন! যান, যান —এগিয়ে যান। যাবেন আর চলে আসবেন।

সুজিত আর দাঁড়াল না। চড়াই পথ বেয়ে ঝোপঝাড় সরিয়ে সরিয়ে উপরের দিকে খানিকটা উঠতেই গাছের ফাঁক থেকে দূরে একটা বড় বাড়ি উঁকি দিল। বাড়ির সামনে বড় একটা চাতাল। চাতালটা পেরিয়ে কাছে যেতেই বাড়ির বার্ধক্যের চেহারাটা ধরা পড়ল।

মানবমাঝি যেরকম বলেছিল, জায়গাটা সেরকম কিছু নির্জন নয়। একটা ছাগলছানা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মায়ের খোঁজে মাঝেমধ্যে উদ্বিগ্ন হয়ে চেঁচাচ্ছে। দুটো নেড়ি কুকুর চোখ বুঁজে শুয়ে আছে—আর সবথেকে বড় ব্যাপার হল একটা লোক বাড়ীটার থেকে খানিকটা দূরে চাতালের উপর বসে চপ বিক্রি করছে। ক্রেতা অবশ্য নেই।

সুজিতকে দেখেই লোকটা বলে উঠল—কী চপ খাবেন কত্তা? আলু-বেগুন-লঙ্কার চপ? পেঁয়াজি?

তেলটা কীরকম হবে কে জানে? তবু একটু রিস্কই নিল সুজিত। —দুটো আলুর চপ দেখি।

ভালোই করেছে আলুর চপ। বেশ খেতে। প্রথমটা শেষ করে সবে মুখে দ্বিতীয়টা পুরেছে হঠাৎ লোকটা বলে উঠল—ভাগ্যে বিশ্বাস করেন কত্তা?

—না, তা হঠাৎ করে?

—এই যে আপনি আলুর চপ খেলেন। আপনি নাও খেতে পারতেন। খেলেও বেগুনি খেতে পারতেন—পেঁয়াজি খেতে পারতেন। কিন্তু আলুর চপই খেলেন। আমি না থাকলে কিছুই খেতেন না। তাই না?

একটু অবাক হয়ে সুজিত বলে উঠল—কেন? আলুর চপে কিছু ছিল না কি?

—আরে না, না। আলু আর ব্যাসন। আর লঙ্কা—একটু পেঁয়াজ।

—তা তুমি অমনভাবে বললে! মনে হল…

সুজিত একটু বিরক্ত হয়েই দ্বিতীয় চপটা তাড়াতাড়ি শেষ করে বাড়িটার দিকে এগোল।

সরু সরু লাল ইটের তৈরি বাড়ি। ঘরগুলোর সামনে দিয়ে টানা লম্বা বারান্দা। বেশ কিছু জায়গায় উপরের ছাদ থেকে বড় বড় চাঙড় খসে পড়েছে। কিছু ঘরের দেওয়াল আধভাঙা। থামগুলোর কিছু কিছু অংশ বেশ বিপজ্জনক ভাবে ভেঙে পড়েছে। কী করে যে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে সেটাই রহস্য। সরকার যদি এগুলো একটু সংস্কার করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করত। কত লোকের মৃত্যুর কারণ যে এই নীলকুঠি! বাড়িটার ভেতর হাঁটতে হাঁটতে এসব ভাবতে ভাবতে শিহরিত হচ্ছিল সুজিত।

—আপনি কি মানিক রায়চৌধুরীর কেউ হন? হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে চমকে উঠল সুজিত। মুখ ঘুরিয়ে দেখল একটা কালো মোটা লোক ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চওড়া মুখের অনুপাতে চোখদুটো ভারী ছোট—কুতকুতে। মোটা গোঁফ। মোটা নাক। ঠোঁট আর নাকের ফাঁক যৎসামান্য। লুঙ্গির উপরে ছিটের শার্ট। এখনও দিনের আলো আছে বলে বাঁচোয়া। সন্ধের পরে মুখোমুখি হলে সুজিত ঘাবড়ে যেত।

লোকটা ফের বলে উঠল—আপনি কি মানিক রায়চৌধুরীর কেউ হন?

—কেন?

—হুবহু তারই মুখ বসানো। তারই মতো সিড়িঙ্গে নাক। গোল গোল চোখ। কুকুরের মতো কান।

বেশ বিরক্ত হল সুজিত। সবকটা বাজে উদাহরণ। ওকে মোটেও তেমন খারাপ দেখতে নয়। তবু বলে উঠল—কে মানিক রায়চৌধুরী?

—আরে তা জানেন না? মানিক রায়চৌধুরী হলেন এখানকার জমিদার। এখানে যত রায়ত চাষি আছে—সবাই ওনার কথা শুনে চলে। উনি হলেন ওদের বাপ-মা।

—আশ্চর্য, কখনও তো ওনার নাম শুনিনি। আর আজকাল তো জমিদারি বলে কিছু হয় না।

—হা: হা: হা:—বলে লোকটা অট্টহাসি করে উঠল—আপনার পড়াশোনা কদ্দূর? ম্যাট্রিক পাস?

ভারী আস্পর্দা তো লোকটার! সুজিত রেগে বলে উঠল—ইঞ্জিনিয়ার। লোকটা কী বুঝল কে জানে—বেশ বিজ্ঞের মতো বলে উঠল—এ-বাড়িটা কিসের জানেন?

—নীলকুঠি।

—হ্যাঁ, ড্যানিয়েল সাহেবের কুঠি এটা। ড্যানিয়েল হলেন নীলকর সাহেব। কী চেহারা মশাই! আমার থেকেও লম্বা চওড়া। হাতের গুলিগুলো কী! চাবুক নিয়ে দাঁড়ালে আমারও ভয় লেগে যায়। আর তেমন গলার আওয়াজ।

—তা আপনার সঙ্গে ড্যানিয়েলের নিশ্চয়ই খুব আলাপ!

—একটু ইয়ার্কি করেই বলে উঠল সুজিত। দেশ-গাঁয়ে কত ধরনের যে লোক আজও আছে!

—নাহ, সেরকম আর হল কোথায়? সাহেবসুবো লোক। ওই একদিনেরই দেখা। সবই ভাগ্য বুঝলেন!

‘ভাগ্য’—কথাটা শেষ কয়েক ঘণ্টায় সুজিত বেশ কয়েকবার শুনেছে। এখানকার সব লোক দার্শনিক নাকি!

—কিসের আবার ভাগ্য!—বিরক্ত হয়ে সুজিত বলে ওঠে।

—হ:—লোকটা ছিটের জামাটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলে ওঠে—দেখলেই বুঝবেন। এই যে আপনি এ-বাড়িতে এলেন। আজকেই এলেন। তারপরে আবার মানিকবাবুর মতো মুখ চোখ—ভাঙা বেড়ার মতো দাঁত। নাহ, সবই ভাগ্য।

লোকটা যে একটু ছিটেল, তাতে সন্দেহ নেই। তবু শীতের এই পড়ন্ত বিকেলে এই বাড়িতে একজন সঙ্গী থাকলে নেহাত খারাপ হয় না।

—তা, কী হয়েছিল নীল সাহেবের?

—শুনেছিলাম ওনাকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। এমন অত্যাচার করতেন যে চাষিরা মিলে নীলকুঠিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। আর তাতেই নীলসাহেব অক্কা পান। তবে সে তো প্রথম বারের কথা। তারপর তো কত বছর গেছে। শেষে কী হয়েছে কে জানে! হেসে উঠল সুজিত—তা বলে তো আর মৃত্যুর কারণটা বদলে যাবে না।

—আজকের দিনটা মনে আছে? বাইশে ডিসেম্বর—গলা খাঁকরে একটু আস্তে আস্তে লোকটা বলে উঠল—আজকের দিনে নীল সাহেব মারা যান। সালটা কত ছিল জানি না, তবে প্রতিবছর ঠিক এই দিনে উনি আবার ফিরে আসেন। থাকুন, দেখতেই পাবেন।

—কী অ্যাবসার্ড।—হেসে উঠল সুজিত। মানে প্রতিবছর আজকের রাতে ড্যানিয়েল ফিরে আসেন! খুব পছন্দের জায়গা ছিল বুঝি? আর তাই দেখতে আমরা সব আসি! আর ওই দিনের মতোই নীলচাষিরা এসে বাড়িতে আগুন দিয়ে দেয়, তাই তো?

—তাহলে তো হয়েই ছিল। প্রতিবছর এখানে উনি আসেন বটে। তবে, প্রতিবছর…নাহ, সেসব কথা যাক, কাজ আছে, এগোই। আপনার মতো তো আর ট্যুরিস্ট নই। বলতে বলতে লোকটা ঘরের ভাঙা দেওয়ালটার দিকে এগিয়ে গেল। আর ফাঁক দিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকল।

—শুনছেন!—সুজিত সাড়া না পেয়ে এগিয়ে যায়—শুনছেন? লোকটা যেন হঠাৎ করে ভ্যানিশ হয়ে গেছে। সুজিত পাশের ঘরে সবে ঢুকেছে, হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আওয়াজ—আর একইসঙ্গে প্রচণ্ড জোরে কেউ যেন সুজিতের মাথায় বাড়ি মারল। জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্তে সুজিত বুঝতে পারল ঘরের সিলিং থেকে একটা বড় চাঙড় ভেঙে পড়েছে।

জ্ঞান ফিরতে সুজিত একটা জিনিস খেয়াল করল। মাথার উপরের ছাদের অনেকটা অংশ ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। যে ফাঁক দিয়ে দোতলার ছাদের কড়ি বরগা দেখা যাচ্ছে। ঘরটার ভাঙা দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো আসছে। মাথায় হাত বোলাল সুজিত। এখনও রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। তবে চাঙড়ের মূল বড় অংশটা হাতখানেক দূরে পড়ে আছে। ওটা মাথায় পড়লে আর দেখতে হত না। নির্ঘাত ওরই একটা ছোট টুকরো মাথায় পড়েছে। তাড়াতাড়ি বাইরে যেতে হবে।

কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল সুজিত। দেওয়ালে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে এল। রাত অনেক হয়েছে। কতক্ষণ অজ্ঞান হয়েছিল কে জানে! কাল পূর্ণিমা। চাঁদের বদান্যতায় চারদিক মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বেশ হাওয়া। দূরের গাছগুলো হাওয়াতে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

হঠাৎ সুজিতের মনে হল ও একা নেই। কাদের যেন অস্পষ্ট কথা শোনা যাচ্ছে। কাছাকাছি বাড়িঘর আছে হয়তো। কিন্তু না, সেরকম আওয়াজও নয়। কেউ যেন কানের পাশেই কথা বলছে—অথচ ভালো করে শোনা যাচ্ছে না। কথাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আর ওগুলো কী? সামনের চাতাল জুড়ে বেশ কয়েকটা ছায়া ছায়া অবয়ব দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কেঁপে উঠে সরে যাচ্ছে। বারান্দায় জোছনার আলো। কিন্তু ছায়াগুলো কাদের? সেরকম কিছু তো আশপাশে নেই—যার ছায়া ওভাবে নড়বে।

নাহ, এ হতে পারে না। মাথার চোটের জন্যই নিশ্চয়ই ভুল দেখছে—মনকে বোঝাল সুজিত। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বেরিয়ে ভালো কোনও ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। কিন্তু এত রাত! এদিকে জনবসতি না থাকলে নদী পেরোতে হবে। মানবমাঝি নিশ্চয়ই অপেক্ষা করে বসে নেই কিন্তু কাউকে জানিয়েছে কি? আর এই যে এতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল—কেউ কি দেখেনি? এরকম বিপদে সুজিত আগে কখনও পড়েনি। মাথার মধ্যে সব কিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ দুটো ছায়ামূর্তি ওর দিকে এগিয়ে এল। দু-হাত ধরে যেন কে হঠাৎ টান দিল। আটকানোর ক্ষমতা ছিল না সুজিতের। সামান্য চেষ্টা করে বুঝল যে যারা টানছে, তাদের গায়ের জোর বহুগুণ বেশি। সিঁড়ি দিয়ে ওকে হেঁচড়াতে-হেঁচড়াতে উপরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দোতলার লম্বা বারান্দা। মেঝের উপর দিয়ে টানতে টানতে সুজিতকে ওরা নিয়ে চলল। তারপর বারান্দার মাঝামাঝি এসে ওর হাতটা ছেড়ে দিল। ছিটকে গিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল সুজিত।

টুকরো টুকরো চাঁদের আলো বারান্দায় ছড়িয়ে। পাশের কাঁঠাল গাছটার পাতার ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছে। তবু এই ছায়াময় বারান্দায় স্পষ্ট ও টের পেল আরেকটা দীর্ঘ ছায়া ওর দিকে এগিয়ে আসছে। আর আশপাশ থেকে অস্পষ্ট কিছু কণ্ঠস্বর—নালায়েক, দেওয়ান… মানিক…

হঠাৎ বুকের উপর একটা ভারী বুটের আঘাত। আর্তনাদ করে উঠল সুজিত। যেন দমবন্ধ হয়ে গেল খানিকক্ষণ। কোনওমতে সামলে নিয়ে উঠে বসতে যাবে। হঠাৎ একটা চাবুকের আঘাত, ওর হাতের উপর। চামড়া কেটে যেন বসে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার চাবুক আছড়ে পড়ল। সুজিতের চিৎকারে চারদিকে নিস্তব্ধতা কেটে গেছে। তারই মাঝে আরও কার যেন উত্তেজিত কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কয়েকটা কথার পর হারিয়ে যাচ্ছে, আবার শুরু হচ্ছে। যেন টুকরো টুকরো শব্দ নিয়ে বাতাস খেলা করছে।

সাহেবি ভারী গলায় কে যেন বলে যাচ্ছে—আমার দাদন, সব মিছে, পাজি-নেমকহারাম-বেইমান! আমার নামে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ! রাসকেল—আজকের মধ্যে তুই ষাট বিঘা দাদন লিখিয়া দিবি—নচেৎ এই শ্যামচাঁদ তোর মাথায় ভাঙিব। গোস্তাকি! তোর দাদনের জন্য দশখানা গ্রামের দাদন বন্ধ রহিয়াছে। দস্তুর মোতাবেক না দিলে তোর চামড়া খুলিয়া নিব।

পাশ থেকে আরেকজনের গলা শোনা গেল—হুজুর, সব রায়তকে মানিকবাবু খেপিয়েছে, তারা কেউ নীলের দাদন নিচ্ছে না।

আবার সাহেবের গর্জন শোনা গেল।

হঠাৎ কথাগুলো থেমে গেল। মনে হল ছায়ামূর্তির উলটোদিক থেকে আরেকটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে। ভারী চটির আওয়াজ। কাঁপা গলায় সাহেব যেন বলে উঠল—দেওয়ান, এ ব্যাটা তাহা হইলে কে?

গম্ভীর গলা উলটোদিক থেকে ভেসে এল—আমি মানিক সাহেব। তুমি ভুল লোককে মানিক ভাবিয়াছ। অনেক সহিয়াছি, আর নয়। অন্য ছায়ামূর্তির হাতে ধরা একটা বন্দুক গর্জে উঠল। সাহেবের ছায়ামূর্তি মাটিতে বসে পড়েছে। আবার দু-দুটো বন্দুকের গুলির আওয়াজ। সাহেব মাটিতে শুয়ে পড়ল। স্বপ্ন যে দেখছে না সুজিত পাশের গাছের একটা পাখির ডানা ঝাপটানো তা প্রমাণ করে দিল।

সামনেই দু-ফুট দূরে সাহেবের ছায়ামূর্তি পড়ে আছে। চাবুকাঘাত বন্ধ হয়েছে, ভারী চটির শব্দ কাছে এগিয়ে আসছে। কিন্তু উঠে দাড়াবার ক্ষমতা নেই সুজিতের। চোখের সামনে হঠাৎই সব ফের অন্ধকার। জ্ঞান হারাল সুজিত।

—কেমন আছেন কত্তা?

ঘোলাটে দৃষ্টিটা স্পষ্ট হতে সুজিত লক্ষ করল যে ও একটা সাধারণ হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। পাশে একটা টুলের উপর মানবমাঝি। পরনে লুঙ্গি-হাফশার্ট। ওর নিজের হাতে-পায়ে-মাথায়-ব্যান্ডেজ। স্যালাইন চলছে।

মানবমাঝি বলতে থাকে—কী বলেছিলাম কত্তা! সবই ভাগ্য! তা না হলে আপনার মাথাতেই চাঙড় ভেঙে পড়ে আর নীলকর সাহেবও আপনাকে দেখে মানিকবাবু বলে অমন ভুল করে! তবে ভুল হবারই কথা। আমার খেয়াল হয়নি আগে। খালি ভাবছিলাম আপনাকে অমন চেনা চেনা লাগে কেন! ওই নীলকুঠিতে একটা ছবি ছিল—ঠিক তারই মতো আপনার মুখটা। তা কত্তা, এসব কথা পাঁচকান করবেন না। এই আমি দু-একটা কথা বলি বলে সবাই আমাকে পাগল বলে। আপনিই বলেন, আমি কি পাগল?

একটু থেমে আশপাশে দেখে নিয়ে মানবমাঝি মুখটা সুজিতের কানের কাছে নিয়ে এসে বলে উঠল—তা শুনলাম সবাই এবার ভারী খুশি। আপনার জন্যই একবছরের জন্য লালমুখো বদ সাহেবটাকে জব্দ করা গেছে। নীলচাষ সব বন্ধ হয়ে গেছে। মানিকবাবু নাকি আপনার দেখা পাবার জন্য বাচ্চার মতো ছটফট করছে। যাকগে, সে না হয় আপনার হাত-পাগুলো একটু জোড়া লেগে গেলে আমিই নিয়ে যাবখন, আমার নাও ছাড়া ওখানে যাবার তো জো নেই। ভাগ্য কত্তা—সব ভাগ্য!