Course Content
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
0/18
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

প্রতিশোধ – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

প্রতিশোধ

ঘুম ভাঙতেই রজত টের পেল ট্রেনটা স্টেশনে থেমেছে। বাইরে হকারদের চিৎকার, ব্যস্ত লোকজনের মালপত্র নিয়ে এদিক- ওদিক ছোটাছুটি। কিছু লোক কৌতূহলী চোখে ট্রেনের দিকে তাকাচ্ছে। এসি ফার্স্ট ক্লাসের জানালার কাচে নাক ঠেকিয়ে ভেতরে কে আছে দেখার চেষ্টা করছে।

মোটা কাচের জানালার ওপারে স্টেশনের নামটা পড়ার চেষ্টা করল রজত। বাইরে প্ল্যাটফর্মের হালকা আলোয় স্টেশনের নামের আধখানা দেখে আন্দাজ করল—টাটানগর। মাঝরাত্রি পেরিয়ে গেছে। খানিকক্ষণ দাঁড়াবে এখানে ট্রেনটা। বোধহয় খাবার তোলা হচ্ছে।

হাওড়া থেকে ট্রেনে ওঠার সময় ও একাই ছিল কেবিনে। কিন্তু এখন আর ও একা নয়। মাঝে কোনও স্টেশনে কেউ একজন উঠেছে। কোনও একজন বলাই ভালো, কারণ তার আর অন্য কোনও পরিচয় পাওয়ার উপায় নেই। উলটো দিকে মুখ করে শুয়ে আছে! পায়ের দিকে শুধু একটা পুরোনো দিনের ভারী সুটকেস। এসি ফার্স্ট ক্লাসের সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়। কাঁধ অবধি কম্বল টেনে দিব্যি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।

ট্রেনে ওঠার পরপরই খেতে দিয়েছিল। খাবার প্লেটটা এখনও পড়ে আছে। ওটাকে সিটের নীচে ভেতর দিকে ঠেলে দিয়ে লেখার খাতাটা বার করল রজত। মাথার কাছের আলোটা জ্বেলে দিল। বাকি কেবিনের অন্ধকার আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিয়ে সাদা আলো ওর সিটের ঠিক মাথার কাছে ছড়িয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ ঘুম হয়ে গেছে। এখন ঘুম একবার যখন ভেঙেছে, চট করে আর আসবে না। তাই দিব্যি খানিকক্ষণ নিশ্চিন্তে গল্প লেখা যাবে।

ইদানীং দু’একটা ম্যাগাজিনে লেখা বেরোচ্ছে রজতের। ওর প্রফেশনটা যদিও আলাদা। সিএ পাস করে একটা মাঝারি মানের কোম্পানিতে চাকরি করে ও। লেখাটা মূলত ওর নেশা। তাই সময় পেলেই কাগজ পেন নিয়ে বসে যায়। সবে লিখতে শুরু করবে এমন সময় বাধা এল।

কেবিনের দরজা খুলে এক প্রকাণ্ড চেহারার ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন। ছ’ফুটের ওপর হাইট। ডান গালে জড়ুল। ফরসা। ধ্যাবড়া নাকের উপর একটা রিমলেস চশমা। চোখের নীচের অংশ বসা। মাথা ভরতি পাকা চুল। বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। বেশিও হতে পারে। অ্যাথলেটিক মেদহীন চেহারা। জামাকাপড় দেখেই বোঝা যায় বেশ অবস্থাপন্ন। ভদ্রলোককে দেখেই খুব চেনা মনে হল রজতের। কেন ঠিক খেয়াল করতে পারল না।

দুটো ব্যাগ কুলিকে বাংকের নীচে ঢুকিয়ে রাখতে বলে রজতের উলটো দিকে এসে বসলেন। উপরের বাংকের ভদ্রলোকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘একসঙ্গে?’

—না, ওনাকে আমি চিনি না।

—গুড, এক কেবিনে তিনজন—কেউ কাউকে চিনি না। ভালো, আমার নাম আশিস মাইতি, তা তোমার নাম কী? কী করো?

—আমি রজত। সবে চার্টার্ড পাস করে চাকরিতে ঢুকেছি।

—তা, অফিসের কাজে?

—না, এমনিই বেরিয়ে পড়লাম। এখন সোজা পুনে। সেখান থেকে গোয়া। সাত দিনের ট্রিপ।

—বলো কী! একা! তোমার বয়সে একা একা ট্রিপ? তা বন্ধুবান্ধব কেউ নেই?

মাথা নেড়ে মুচকি হাসল রজত। জানে সবারই এটা খুব অদ্ভুত লাগবে। ওর মতো বয়সি একজনের একা একা ঘোরাটা। আসলে ছোটোবেলা থেকেই রজত খুব একা একা থাকত। এখন সেটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। বাবা খুব কম বয়সে মারা যান। তারপর থেকে মামাবাড়িতে মানুষ। বড়োমামার খুব শাসন ছিল। বাড়ির বাইরে কারও সঙ্গে মেলামেশা একদম পছন্দ করতেন না। মা’ও বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে এত আঘাত পেয়েছিলেন যে কখনওই বাড়ির বাইরে বেরোতেন না। সবরকম আনন্দ-উৎসব এড়িয়ে চলতেন। আর তারই ছায়া এসে পড়েছিল রজতের উপরেও।

আশিসবাবু মানিব্যাগ থেকে বিজনেস কার্ডটা বার করে রজতের দিকে এগিয়ে দিলেন, ‘পুরোনো বিজনেস কার্ড। তিন মাস হল রিটায়ার করেছি। বায়োমেডের নাম শুনেছ?’

—হ্যাঁ, তা শুনব না! ভারতের এক নম্বর ওষুধ তৈরির কোম্পানি। আর তা ছাড়া…

—’ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলাম’—রজতকে কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই আশিসবাবু বলে উঠলেন। বলে একটু গর্বের হাসি হাসলেন।

—চার-চারটে বছর। একসময় বায়োমেডকে কেউ চিনত না। আমার জন্যই—এই আশিস মাইতির জন্যই বায়োমেডকে এখন সারা পৃথিবী চেনে।—বলে কোটের পকেট থেকে একটা কাঠের বাক্স হাতে নিয়ে একটা চুরুট বার করলেন।

—লাইটার আছে?—একটু থেমে বলে উঠলেন আশিসবাবু।

—নাহ, আমি স্মোক করি না।

—আমার লাইটারটা ওই ডান দিকের লেদারের ব্যাগটার সাইড পকেটে আছে। বের করে দাও তো—বেশ অর্ডারের ভঙ্গিতে বললেন আশিসবাবু।

রজতের হাত থেকে লাইটারটা নিয়ে চুরুট জ্বালিয়ে একটা তৃপ্তির টান দিয়ে উপরের বাংকের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন—’লোকটা মরার মতো ঘুম লাগিয়েছে দেখছি। আর সঙ্গে আবার মান্ধাতা আমলের ব্যাগ। কোনও সেন্স নেই। আমার অফিসে ঠিক এইরকম একটা ব্যাগ নিয়ে কে একজন আসত—ঠিক খেয়াল হচ্ছে না। তা যাকগে, বায়োমেডের কোনও ওষুধের নাম জানো?

—অ্যাসিবিওন। মাথাব্যথার ওষুধ।

—বাহ, জানো তাহলে, খুব হিট প্রাোডাক্ট। আমার রিসার্চ টিমই করেছিল। সে প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা।

—আমার বাবাও বায়োমেডে কাজ করতেন। অনেকদিন আগে।

—’তাই!’—একটু অবাক হলেন—’কী নাম ওনার?’

—রঞ্জন চ্যাটার্জি। রিসার্চ সায়েন্টিস্ট ছিলেন।

কেবিনের আবছা আলোতে মনে হল আশিসবাবু যেন একটু চমকে উঠলেন—’রঞ্জন!’

—আপনি বাবাকে চিনতেন? উনি আপনাদের গুরগাঁও অফিসে কাজ করতেন।

একটু গলা খাঁকরে চুরুটের ছাইটা নীচের কার্পেটের উপর ফেলে টান হয়ে উঠে দাঁড়ালেন আশিসবাবু।

—নাহ বড় কোম্পানি তো। অনেক এমপ্লয়ি ছিল। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট হলে চিনতে পারতাম। আমার তো সব সিনিয়র লোকদের সঙ্গেই কাজ ছিল। যাই, চুরুটটা বাইরে গিয়ে শেষ করি। ভিতরে ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। আবার কখন স্মোক অ্যালার্ম বেজে উঠবে। অবশ্য সবই টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা যায়। বুঝলে ইয়ং ম্যান! কোনও নিয়মের তোয়াক্কা আশিস মাইতি করে না।

আশিসবাবু কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। সত্যি বলতে কী—এত সিনিয়র লোক, অথচ ভদ্রতার অভাব। কেবিনে যে আরও দুজন আছে, তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ না করে দিব্যি চুরুট খাচ্ছিলেন!

অবশ্য তাতে কেবিনের অন্যজনের কোনও অসুবিধা হয়েছে বলে মনে হয় না। অন্য দিকে মুখ করে এখনও দিব্যি ঘুমিয়ে যাচ্ছে। আশিসবাবুকে যে কেন এত চেনা লাগছিল মনে করার চেষ্টা করল রজত। এত চেনা মুখ। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল কেন এত চেনা লাগছে। হ্যাঁ, এগজ্যাক্টলি। পরিষ্কার মনে পড়ে গেছে। কয়েক মাস আগে ‘জয়ন্তী’ পত্রিকায় যে গল্পটা লিখেছিল, তার সঙ্গে ছবিটা রজতই এঁকেছিল। সেই ছবিতে গল্পের প্রধান অপরাধী আগরওয়ালের যে ছবি ছিল, তার সঙ্গে আশিসবাবুর প্রচণ্ড মিল। কিন্তু আশিসবাবুকে তো রজত আগে কখনও দেখেনি—তাহলে ওই ছবিটা আশিসবাবুর হল কী করে? এতটা মিল আপনা থেকে! রজত আরেকটু ভাবার চেষ্টা করল। ঠিক একইরকম—ডান গালে জড়ুল। ধ্যাবড়া নাক। চোখে রিমলেস চশমার মধ্যে দিয়ে একইরকম শ্যেনদৃষ্টি। ছবিতে লোকটার বয়স অবশ্য কম ছিল।

আচ্ছা, একেই কি ঘুরেফিরে সেই ভয়ের স্বপ্নটাতে দেখত রজত! ছোটোবেলা থেকে যে স্বপ্নটা বারবার ঘুরেফিরে আসত। এখনও যে দু:স্বপ্ন দেখে ভয়ে মাঝেমধ্যে জেগে ওঠে রজত! সেরকমই কি দেখতে এই লোকটাকে? ঠিক তাই। স্বপ্নে যার চেহারা দেখতে পায়, তারও ডান গালে জড়ুল। চোখের নীচটা ঠিক একইরকম বসা। ধ্যাবড়া নাক। কী অদ্ভুত কাণ্ড!

কেবিনের দরজাটা আবার খুলে গেল, আশিসবাবু ঢুকলেন। দরজা বন্ধ করে নিজের সিটে এসে বসলেন। মিনিটখানেক চুপচাপ। তারপর বলে উঠলেন,—হ্যাঁ, এখন মনে হচ্ছে রঞ্জনের নামটা শুনেছি। হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান, তাই না?

—হ্যাঁ, আমি তখন খুব ছোটো। বছর দুয়েক বয়স, বাবার সঙ্গে পার্কে গিয়েছিলাম। আমি খেলছিলাম। বাবা পার্কের বেঞ্চে বসেছিলেন। ওখানেই র্হাট অ্যাটাকে মারা যান। আমি নাকি বাবাকে বারবার করে ডাকছিলাম। বাবা সাড়া দিচ্ছিলেন না। তাই দেখে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসে। বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে জানানো হয় বাবা মারা গেছেন। আমার অবশ্য কিছুই মনে নেই।

—কিচ্ছু মনে নেই? কী হয়েছিল হঠাৎ করে? বাবা কি সাহায্য চেয়েছিলেন?

—না, আমার কিছুই মনে নেই। বাবার চেহারাটাও আমার মনে পড়ে না। বাবার সব স্মৃতি হল এখন বাবার ছবি। তাই তো সবসময় সঙ্গে বাবার ছবি রাখি। এই যে—বলে মানিব্যাগে রাখা ছবিটা তুলে ধরে রজত।

—দেখি—বলে মানিব্যাগটা হাতে ধরে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আশিসবাবু—নাহ, চেহারাটা ঠিক খেয়াল হচ্ছে না।

একটু দ্বিধা করে কথাটা বলেই ফেলল রজত—আপনাকে আমার শুরু থেকেই খুব চেনা মনে হচ্ছিল। আমার একটা গল্পে আমার আঁকা একটা ছবি ছিল সঙ্গে থাকলে দেখাতাম। ছবিটা হুবহু আপনার মতো।

—’সে কী!’ নড়েচড়ে বসলেন আশিসবাবু—’খবরের কাগজে আমার ছবি দেখেছ নাকি?’

—’না, আমিও তাই ভাবছিলাম। আপনাকে তো আগে কখনও দেখিনি। ছবিটা ঠিক আপনার মতো হল কী করে! পরে মনে হল আমি একটা স্বপ্ন ছোটোবেলায় খুব দেখতাম। এখনও মাঝেমধ্যে দেখি। স্বপ্নটা এরকম—একটা লোক বেঞ্চে বসে আছে। হঠাৎ দুজন লোক তার দিকে এগিয়ে এল। একজন—তাকে দেখতে ঠিক আপনার মতো, সে বেঞ্চে বসা লোকটার সঙ্গে কী সব কথা বলল। এর মধ্যে হঠাৎ করে সঙ্গের অন্য লোকটা পিছন থেকে বেঞ্চে বসা লোকটার মুখে রুমাল চেপে ধরল।

—তার—তারপর?

—বাকিটা একেকবার একেকরকম দেখি।

—আমার মতো দেখতে লোকটা কী করল?—আশিসবাবু উদগ্রীব হয়ে বলে উঠলেন।

—সেটা ঠিক বুঝতে পারি না। কী একটা জিনিস দিয়ে যেন বেঞ্চে বসা লোকটার হাতটা চেপে ধরল।

—হা: হা:, তাহলে তোমার স্বপ্নে আমি ভিলেন—কী বলো?

—এ স্বপ্নটা ছোটোবেলায় খুব দেখতাম, এখন কম দেখি। কিন্তু এত স্পষ্ট, মাঝেমধ্যে মনে হয় স্বপ্ন নয়—সত্যি।

—স্বপ্ন এত বিচিত্র হয়, তবে ওসবের কোনও মাথামুণ্ডু থাকে না। যে ভালো লোক, তাকে স্বপ্নে হয়তো খারাপ দেখি। যত হাবিজাবি। বকোয়াস।

একটু থেমে আশিসবাবু ফের বলে উঠলেন—এসব নিয়ে একদম ভাববে না। এমন ঘুমিয়ে নয়—জেগে স্বপ্ন দেখবে। আমার মতো। তা না হলে বড়ো হওয়া যায় না। উহ, আজকে এত মাথা ধরেছে না! কোনও ওষুধও আনিনি সঙ্গে। আছে তোমার কাছে কোনও ওষুধ?

—আপনার কোম্পানিরই ওষুধ আছে। অ্যাসিবিওন। নেবেন? ওটাতে তো আমার বেশ কাজ দেয়।

—না, না, অ্যাসিবিওন আমার সুট করে না—দরকার নেই। চুপ করে শুলে আপনা থেকেই মাথাব্যথা ছেড়ে যাবে।—বলে আশিসবাবু চাদর-কম্বল পেতে শোবার ব্যবস্থা করতে থাকেন।

হঠাৎ কে যেন ধমকে উঠল—মিথ্যে কথা আশিস! সত্যি কথাটা বলব? অ্যাসিবিওন খেলে কী হয় তা তুমি জানো।

চমকে উঠল রজত। উপরের বাংকের লোকটা উঠে বসেছে। আবছা আলোতে মুখ না দেখা গেলেও গলার আওয়াজ ওদিক থেকেই আসছে। রজতের উপরের বাংকে, তাই আশিসবাবুর মুখোমুখি।

ধমক খেয়ে আশিসবাবুর মুখটা ছাই-ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কোনওরকমে সিটে পাতা সাদা চাদরের প্রান্ত দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে বসে আছেন। কেমন যেন গুটিয়ে গেছেন ভয়ে।

—ফেজ ফোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, অ্যাসিবিওন ড্রাগ বাজারে ছাড়ার আগে তার উপর পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। আগের টেস্টগুলো পাস করে গেছে অ্যাসিবিওন। ফেজ ফোরটা পেরোলেই বাজারে ওই ওষুধ। আমার পথ প্রশস্ত হয়ে যাবে। ফেজ ফোরে দেখা হয় পেশেন্টদের উপর ওষুধের লং টার্ম এফেক্ট। অর্থাৎ ওষুধ খাওয়ার দু-তিন বছরের মধ্যে পেশেন্টের কী হয়! ঠিক এই সময় দেখা গেল পঞ্চাশ বছর বয়সের বেশি কেউ ওই ওষুধ খেলে তার ক্যানসার হচ্ছে। যে পাঁচজন টেস্ট সাবজেক্টের বয়স পঞ্চাশের বেশি, তাদের প্রত্যেকেরই ক্যানসার হয়েছে দু’বছরের মধ্যে। অর্থাৎ ওই ওষুধ বাজারে আনা যাবে না। ঠিক কি না আশিস! আর তাই ঠিক সে কারণেই তুমি নিজে ওই ওষুধ খাও না! ঠিক কিনা!

উপর থেকে গম্ভীর গলা ফের ধমকে বলে উঠল—আমি ছিলাম ওই ওষুধের রিসার্চ সায়েন্টিস্ট। তোমার টিমে। তোমরা ওই তথ্য লুকিয়ে ওষুধটা তবুও বার করতে চাইলে। কোটি টাকার উপরে ওষুধ তৈরিতে খরচ হয়ে গেছে। বাধা হয়েছিলাম আমি। কোনওরকম কম্প্রোমাইজ করতে চাইনি। তাই আমাকে সরিয়ে দিলে। ছেলেকে পার্কে বেড়াতে নিয়ে গেছি, তখন প্ল্যান করে খুন করলে। ইঞ্জেকশন দিয়ে। একবারও ভাবলে না ছোটো ছেলেটার কথা। নেহাত ও দূরে খেলছিল, টের পাওনি। তা না হলে হয়তো ওকেও মারতে—তাই না?

আশিসবাবু নড়ছেন না, পাথরের মতো বসে আছেন। অন্ধকারে ফের ওই একই গলায় শোনা গেল—’নাও, আমার ছেলের হাত থেকে অ্যাসিবিওন খেয়ে নাও—খেতে তোমাকে হবেই। কী? ক্যানসারের এত ভয়? এতদিনে যে লক্ষ লোক মারা গেছে এ ওষুধ খেয়ে। তারা জানেও না এর আসল কারণ। তোমাদের এত পপুলার প্রাোডাক্ট, নিজে খাবে না!’

আবার অট্টহাসি হেসে উঠল বাংকের উপরের যাত্রী—নাহ, আর দরকার নেই দেখছি। আমার হার্ট অ্যাটাক বলে কেস সাজিয়েছিলে তুমি, তোমার ক্ষেত্রে ওরকম কেস সাজানোর দরকার নেই দেখছি। সত্যিকারের হার্ট অ্যাটাক।

কথাটা থেমে গেল। বাইরে ট্রেনের ঝিকঝিক আওয়াজটা যেন বেড়ে গেছে। দূরে আলোগুলো দুরন্ত বেগে উলটো দিকে ছুটে যাচ্ছে গাছগাছালি সঙ্গে নিয়ে। মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে থাকা চাঁদের আলোছায়া হাত বাড়িয়েছে কামরাতেও। বাইরে সার দেওয়া গাছগুলোর ছায়া ছায়া অবয়ব যেন আড়চোখে এ কামরার দিকেই তাকিয়ে আছে।

যা হয় হবে! সমস্ত সাহসে ভর করে উঠে দাঁড়াল রজত। উপরের বাংকে আর কেউ নেই। শুধু সামনের নীচের বাংকে পড়ে আছে আশিসবাবুর নিথর দেহ। আর তার পাশে একটা পুরোনো ফাইল—’অ্যাসিবিওন প্রজেক্ট রিপোর্ট।’