Course Content
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
0/18
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

দিনটা খুব ইন্টারেস্টিং – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

দিনটা খুব ইন্টারেস্টিং

জ্যোতিষ জিনিসটাতে কোনোদিনই বিশ্বাস নেই সৌম্যর। জ্যোতিষ মানেই যে বুজরুকি এ ব্যাপারে ও পুরোপুরি নিশ্চিত। তাই পঞ্চগনি শহরের টেবলটপের মতো সুন্দর একটা জায়গাতে গাড়ি থেকে নামতেই যখন এক জ্যোতিষী গোছের লোক এগিয়ে এল—তার ওপর সৌম্য যে প্রচণ্ড বিরক্ত হবে তাতে আর আশ্চর্য কী! লোকটাকে পাশ কাটিয়ে যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেল সৌম্য।

‘আপকা ভবিষ্যৎ বহোতি ইন্টারেস্টিং হ্যায়। মেরে সে শুন লিজিয়ে,’ পিছন থেকে কথাটা কানে এল সৌম্যর। স্ত্রী আর দুই ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে এসেছে—তা এখানেও এদের হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই। বিরক্ত করে ছাড়ছে। সামনের দিকে তাকাতেই বিরক্তিটা উধাও হয়ে গেল। পাহাড়ের উপরে বিশাল বড় মাঠের মতো সমতল এলাকা। টেবলটপের মতো। এর ওপরেই ওরা দাঁড়িয়ে আছে। দূরে আরও কয়েকটা পাহাড়ের ওপরে এরকমই ন্যাড়া সমতল দেখা যাচ্ছে। দুদিকে গভীর খাঁজ সটান নেমে গেছে। অন্যদিকে পাহাড়ের ঢাল গিয়ে মিশেছে পঞ্চগনি শহরে। এত দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে চার্চ, একটা ভারী সুন্দর স্কুল— স্কুলবাড়িটার লাগোয়া বিশাল মাঠ, একটা মন্দিরও। খানিক আগে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে। তাই আকাশ বেশ পরিষ্কার। গরমটা কমে গেছে। গাছের পাতায় রোদের অলঙ্কার। সবুজে ঝলমল করছে দূরের পাহাড়।

‘স্যার, আপকে বারেমে সবকুছ পতা হ্যায়। শুন লিজিয়ে,’ সৌম্যকে রীতিমতো ধাওয়া করেছে লোকটা। ফের অগ্রাহ্য করে সৌম্য এগোতে থাকে।

অনেক লোক, তবে দার্জিলিং-কালিম্পং-এর মতো ভিড় নেই। বাচ্চাদের ঘোড়া চড়ানোর জন্য বারবার অনুরোধ আসছে। ছেলেদেরকে ঘোড়ায় তুলে দিয়ে বেশ কায়দা করে নিজেও ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে বেশ কিছু ছবি তুলল সৌম্য। পুরো জায়গাটার ধার দিয়ে গোল করে একবার ঘুরে এল ঘোড়া। পাত্তা না পেয়ে ওই জ্যোতিষী গোছের লোকটা ইতিমধ্যে উধাও হয়েছে।

আরো মিনিট পনেরো ঘোরাঘুরির পর গাড়িতে উঠতে যাবে—আবার সেই জ্যোতিষী। ‘বহোৎ কুছ বোলনা বাকি হ্যায় স্যার। কালকা দিন আপকে লিয়ে বহোৎ-হি ইন্টারেস্টিং হোগা।’

‘যাও তো ভাই, ওসব বুজরুকিতে আমি বিশ্বাস করি না।’ বিরক্ত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠল সৌম্য। লোকটা বাংলা বুঝল কি বুঝল না কে জানে! কিন্তু সৌম্য যে প্রচণ্ড বিরক্ত এটা অন্তত বোঝাতে পেরেছে আর কি! পঞ্চগনি, মহাবালেশ্বর হয়ে ওরা যখন পুণেতে পৌঁছল তখন অনেক রাত হয়ে গেছে।

পরদিন বিকেলে পুণে থেকে কলকাতায় ফেরার ট্রেন। দশদিন বেড়ানোর পর কলকাতায় ফেরা। পরদিন প্রায় একঘন্টা আগে স্টেশনে পৌঁছে গেল সৌম্য। আধঘণ্টা আগে ট্রেনও এসে গেল প্ল্যাটফর্মে। ওরা উঠে পড়ল ট্রেনে। এসি টু-টায়ার। সিটগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। স্ত্রী আর ছেলেদের সিট এক জায়গায় হলেও সৌম্যর সিট বেশ খানিকটা দূরে, তবে একই কোচে।

ওদেরকে বসিয়ে মালপত্র গুছিয়ে রেখে খানিকবাদে নিজের সিটে এসে বসল সৌম্য। সাইডের সিট। একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক সিটের অন্যপ্রান্তে বসে আছে। দেখে ইউরোপীয়ান বলে মনে হয়। মাথায় ঝাঁকড়া সোনালি চুল, লম্বা জুলফি, বাদামি চোখ, গোঁফ নেই। রোগা-পাতলা চেহারা। একবার সৌম্যর দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে হাসল বলে মনে হল। সেটা যখন খেয়াল হল সৌম্যর একটু দেরিই হয়ে গেছে। ফিরতি অভিবাদনটা করা হল না। উলটোদিকে বসে আছে একটা বড় মাড়োয়ারি ফ্যামিলি। তাদের সঙ্গে একবার কথা বলার চেষ্টা করল সৌম্য। যদি বউ আর ছেলেদের সিটগুলো এদের সঙ্গে পালটানো যায়। বৃথা চেষ্টা। এরা বেশ গুছিয়ে-গাছিয়ে, চারদিকে নানান রকম খাবার-দাবার ছড়িয়ে, ল্যাপটপে হিন্দি ফিল্মি গান চালিয়ে বসে আছে। সৌম্য ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল।

সিটে ফিরে এসে হিন্দুস্থান টাইমসের পুণে এডিশনটা নিয়ে পড়তে শুরু করল সৌম্য। বাইরে এখনো ভালোই আলো আছে। এদিকের প্রকৃতি বেশ রুক্ষ। ছোট ছোট টিলা-পাহাড়, ছোট ছোট গাছ-আগাছা। বাংলার মাঠ-প্রান্তরের মতো সবুজের সমারোহ নেই। পাশে বসা লোকটা মাথার কাছের আলো জ্বেলে একটা লাল ডায়েরি হাতে নিয়ে পড়ছে, বেশ গোপনীয়তার সঙ্গে। ওটা কি বই? নাহ, ওপরে কিছু লেখা নেই। তাহলে ডায়েরিই হবে। কিন্তু তাতে সাল-টাল কিছুই লেখা নেই। লোকটার সঙ্গে একবার চোখাচোখি হল। টের পেয়ে লোকটা ডায়েরিটা যেন আরেকটু সাবধানে আঁকড়ে ধরল। একটু লজ্জা পেয়ে আবার খবরের কাগজের দিকে চোখ ফেরাল সৌম্য। বাইরের দেশের লোক কী ভাবল কে জানে? নিশ্চয়ই একটু সতর্ক হয়েই থাকে ওরা—ভারত সম্বন্ধে নানান ধরনের খবর তো রটেই।

এই ক’দিন পুণে, বম্বে, গোয়া, পঞ্চগনি-মহাবালেশ্বর-মাথেরন এসব নানান জায়গায় ঘুরতে গিয়ে কোনো কিছুই খোঁজখবর রাখা হয়নি। গোগ্রাসে তাই খবরগুলো পড়ছিল। হঠাৎ টিকিট চেকার এসে হাজির হওয়ায় বাধ্য হয়ে কাগজটা নামিয়ে টিকিটটা বের করল সৌম্য। ভদ্রলোক বাঙালি।

কোনওভাবে কি আমার ফ্যামিলির সিটগুলোর কাছাকাছি একটা সিট পাওয়া যেতে পারে? ওরা একেবারে অন্যপ্রান্তে।’

‘সে আপনাকে প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে কথা বলে দেখতে হবে। আমি বলতে পারব না। এই একটা সিটেই শুধু লোক নেই। বাকি সবই তো ভরতি।’ বলে ভদ্রলোক সৌম্যর ওপরের বাঙ্কের দিকে নির্দেশ করলেন।

‘আরে! এখানে তো এই খানিক আগেও একজন লোক ছিল। এখানে বসেছিল। আমি ভাবলাম ওপরের সিটটা ওরই। বিদেশি—এই এক্ষুনি ছিল।’

চেকার একটু অবাক হয়ে সৌম্যর দিকে তাকাল। নাহ, কেউ তো নেই। কোনো লাগেজও নেই।

সত্যিই, ওর নিজের ছোট ল্যাপটপের ব্যাগটা ছাড়া আর কোনো ব্যাগই নেই এখানে। চোখের ভুল? না না, তা নিশ্চয়ই নয়। নির্ঘাত কেউ ভুল কোচে উঠেছিল। পরে ঠিক জায়গায় চলে গেছে। তাও ভালো। আর কেউ না উঠলে বড়ো ছেলে শান্তনুকে এখানে ডেকে নেওয়া যাবে। একটু চেসও খেলা যাবে। সিটের ওপর পা তুলে বেশ আরাম করে কাগজটা খুলে বসল সৌম্য।

পাটা ছড়িয়ে বসতে গিয়েই মনে হল কোনো একটা বই-এর ওপর পা দিয়ে বসেছে। কাগজটা সরিয়ে তাকাল সৌম্য। ডান পায়ের তলায় একটা লাল ডায়েরি—যেটা ওই লোকটা পড়ছিল। ফেলে গেল নাকি? নিছক কৌতূহলে ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল সৌম্য। ডায়েরি ঠিক নয়—নোটবুক। কিন্তু মজার কথা হল কোনো পাতাতে কিছু লেখা নেই। দুই মলাটের মাঝে শুধু লাইনটানা ফাঁকা পাতা—এক বিন্দু পেনের দাগও পড়েনি কোথাও। আশ্চর্য! তাহলে লোকটা পড়ছিলটা কী?

ডায়েরিটা পায়ের কাছে নামিয়ে রাখতে গিয়ে আবার থমকে গেল সৌম্য। পায়ের কাছের আলোটা জ্বলছে। তার তলায় ডায়েরিটা ধরতেই ডায়েরির ওপরে একটা সংখ্যা দেখা যাচ্ছে। রোমান হরফে ১৮০৪, আরে কী কো-ইন্সিডেন্স! ওটাই তো সৌম্যর জন্মদিন, ১৮ এপ্রিল। একবার এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে নিল সৌম্য। নাহ, কেউ লক্ষ করছে না। উলটোদিকের যাত্রীরা পর্দা টেনে দিয়েছে, আর বেশ একটা লারেলাপ্পা হিন্দি গান শোনা যাচ্ছে ওদিক থেকে। তার সঙ্গে তারস্বরে গান জুড়েছে একটি মেয়ে।

অর্থাৎ নিশ্চিন্তে আবার ডায়েরিটা দেখা যায়। টুক করে নিজের দিকের পরদা টেনে নিয়ে আলোর নীচে ডায়েরিটা ধরল সৌম্য। স্পষ্ট ১৮০৪ লেখা ওপরে। ডায়েরির প্রথম পাতা আর ফাঁকা নেই।

তাতে ইংরেজিতে বড় বড় করে শুধু একটা লাইন লেখা, ‘তুমি কি নিজেকে ভুলে গেছ?’ অবাক হয়ে পাতা ওলটাল সৌম্য—পরের পাতা। আবার একটা লাইন—’তুমি আমাদেরই একজন সৌম্য।’

এসির ঠান্ডা যেন আরো বেশি টের পাচ্ছে সৌম্য। একী, ওর নাম কেন ডায়েরিতে! পরের পাতা—আবার এক লাইন—’ওরা মানুষ, তুমি মানুষ নও।’ তার পরের পাতায় অনেক ছোট অক্ষরে অনেকগুলো লাইন—’তুমি আমাদের এক্সপেরিমেন্টের অংশ। আমরা জানতে চেয়েছিলাম যে এ-গ্রহ আমাদের বাসযোগ্য কিনা। এমনিতে অবশ্যই নয়। তাই আমরা আমাদের জিনে সামান্য পরিবর্তন এনে তোমাকে তৈরি করেছিলাম। তারপর নিয়ে এসেছিলাম এখানে। তা এক্সপেরিমেন্ট সফল। আমাদের জিনে সামান্য চেঞ্জ। ব্যস, আমরা এখানে বহাল তবিয়তে থাকতে পারব তোমার মতো। এখানে এত অক্সিজেনে দমবন্ধ হয়ে যাবে না।’

পরের পাতায় আর কিছু না দেখে ডায়েরিটা আবার উলটে-পালটে দেখল সৌম্য। নাহ, আর কিছু নেই।

ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এসব ভূতুড়ে কথার মানে কী? লেখাটা কি ঠিক? ও কি সত্যিই পৃথিবীর লোক না? সৌম্য কোনওকালেই পা মুড়ে বাবু হয়ে বসতে পারে না। অথচ একপায়ে দিব্যি আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এটা কি সাধারণ মানুষ কোনওদিন করতে পারে?

‘তোমার ভাবনা ঠিক। তুমি অনেকদিক দিয়েই অন্যরকম,’ চমকে ওঠে সৌম্য। এত মন দিয়ে ডায়েরির পাতা ওলটাচ্ছিল যে খেয়ালই করেনি, কখন আবার সেই লোকটা পায়ের কাছে এসে বসেছে।

‘এই যে তুমি জিভ দিয়ে নাকের ডগা ছুঁতে পারো, ডানহাতের আঙুল দিয়ে পিঠের যে-কোনও অংশ ছুঁতে পারো, কিংবা লোকে আয়নায় কোনও লেখা যেরকম উলটোভাবে দেখে ঠিক সেরকমভাবে যে-কোনও কিছু লিখে ফেলতে পারো—সেগুলো কি সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব? কখনোই নয়। এই যে ভয় পেলে তোমার মাথার চুল খাড়া হয়ে যায়, শরীরের চামড়া হলদেটে হয়ে যায়, এই যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়া, এগুলোও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।’

সবই সত্যি। লোকটা স্পষ্ট বাংলায় মৃদু স্বরে বলে যাচ্ছে। নেহাৎ লাজুক বলে এ কথাগুলো কখনও কাউকে বলতে পারেনি সৌম্য। এ লোকটার তো কোনোভাবেই জানার কথা নয়। তাহলে কি ওকে পৃথিবী ছেড়ে নিজের গ্রহে ফেরাতেই এসেছে লোকটা?

লোকটা বোধহয় থটরিডার। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—’না, তোমাকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে না, তুমি এখানেই থাকবে, আমাদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে। আমাদের গ্রহ আর বাসযোগ্য নেই।’

সেকী! তাহলে তোমরা!’

‘আমরাও আর নেই। একটা সময়ে আমাদের গ্রহ মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির সব থেকে উন্নত গ্রহ ছিল। তোমরা এখন যেমন, তার থেকেও কয়েক হাজার গুণ এগিয়ে ছিল, কিন্তু আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেললাম।’

‘কী করে?’

‘জলের অভাবে। বেহিসাবী হয়ে আমাদের গ্রহের সব জল আমরা শেষ করে ফেলেছিলাম। যে সামান্য জলটুকু পড়েছিল তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ শুরু হল। সে ভীষণ নিউক্লিয়ার ওয়ার। পরমাণু যুদ্ধ যখন থামল, তখন জলও নেই—প্রাণও নেই,’ লোকটা চুপ করে রইল মিনিট দুয়েক। তারপর বলে উঠল—’আর তাই তো তোমাকে সাবধান করতে এসেছি। তোমরাও যদি জলের ব্যাপারে সচেতন না হও, তোমাদেরও অবস্থা একই হতে চলেছে। আজ থেকে কুড়ি বছরের মধ্যে তোমাদের সব পানীয় জল শেষ হয়ে আসবে। জলের স্তর অনেক নেমে যাবে। চাষবাসের জন্যও কোনও জল অবশিষ্ট থাকবে না। আজ যেখানে ধানজমি দেখছ, সেখানে কাল থাকবে মরুভূমি। সামান্য যেটুকু জল থাকবে তা নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে ঝগড়া হবে। রাজ্যে রাজ্যে নদীর জল ভাগাভাগি নিয়ে মারামারি হবে। দেশে দেশে যুদ্ধ হবে। যেসব দেশ খুব ধনী—তারাই কোনওমতে চালাতে পারবে। তা সেও বা কদ্দিন!’

‘তা আমি কী করব?’

‘সবাইকে বলো জল বাঁচাতে। যারা জল নষ্ট করবে তাদেরকে বোঝাবে। তুমি নিজেই তো প্রচুর জল নষ্ট করো।’ দেড়ঘণ্টা ধরে গান গেয়ে স্নান করো। গানটাও ভালো করো না। কলটাও ঠিকমতো বন্ধ করো না।’

একটু লজ্জা পেল সৌম্য—’কিন্তু আমি, আমার কথা লোকে শুনবে কেন?’

‘হয়তো একদিনে শুনবে না, কিন্তু যখন দেখবে যে তুমি জল নষ্ট করো না, তোমার কথার মধ্যে যুক্তি আছে—তখন আস্তে আস্তে শুনবে। একজন-দুজন থেকে হাজার। হাজার থেকে লক্ষ লোক। তুমিই পারবে সে পরিবর্তন আনতে। তোমার হাত ধরেই পৃথিবী বাঁচবে।’

‘তা এটা বলতেই তুমি এসেছ এখানে?’

‘উ:হুঁ, আরেকটা কথা ছিল—অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। পৃথিবীকে নিয়ে নয়, তোমাকে নিয়ে। তুমি উঠে গিয়ে উলটোদিকের চেনটা টেনে ট্রেন থামাও। সামনে রেলের লাইনে মাইন পোঁতা আছে। ব্লাস্টে ট্রেন উড়ে যাবে। আমরা চাই না আমাদের শেষ প্রতিনিধি আর তার পরিবার শেষে এক অ্যাক্সিডেন্টে হারিয়ে যাক।’

সৌম্য অবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড বসে রইল। লোকটা ফের বলে উঠল—’কী বিশ্বাস হচ্ছে না? আর কিন্তু ঠিক এক মিনিট বাকি।’

নাহ, লোকটার কথা অবিশ্বাস করার মতো নয়। এত কিছু যখন ঠিকঠাক বলেছে। লাফিয়ে উঠে পরদা সরিয়ে সৌম্য উলটোদিকে চলে গেল। বাঁ-দিকের উপরের বাঙ্কের একটু ওপরে চেনটা। চারদিকের সবাইকে হতবাক করে দিয়ে লাল হ্যান্ডেল ধরে মারল এক টান।

‘আরে ক্যা হুয়া—ক্যা হুয়া’ কাকের মতো চিৎকার করে উঠল বিশাল ভুঁড়িওয়ালা মাড়োয়ারি ভদ্রলোক।

কোনও উত্তর না দিয়ে সৌম্য গট গট করে এসি কোচের বাইরের প্যাসেজে বেরিয়ে এল। সাধারণত এখানে সবসময় ট্রেনের একজন অ্যাটেন্ড্যান্ট থাকে, এখন নেই। খানিকক্ষণের মধ্যেই নিশ্চয়ই ট্রেনের লোকজন চলে আসবে। জিগ্যেস করবে কেন চেন টানা হয়েছে। কেন ট্রেন থামানো হয়েছে। তখনই কারণটা বলা যাবে। আপাতত এখানেই অপেক্ষা করা যাক।

বেসিনে একটা বিশাল চেহারার মাস্তান টাইপের লোক হাত ধুচ্ছে। ধোয়ার পর দিব্যি কলটা খুলে রেখেই চলে যাচ্ছিল। সৌম্য তাকে আটকাল—’ভাই জল নষ্ট করতে নেই,’ বলে কলটা বন্ধ করে দিল। লোকটা ঠিক সহজে বোঝার মতো লোক নয়। জোর দেখানোর জন্যেই আবার ফিরে এল। কলটা জোর করে খুলতে গেল। কিন্তু এবার মজাটা হল। কলের জলটা নীচের দিকে না নেমে সোজা ওর জামার দিকে ছুটে এল। লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কোনওরকমে কল বন্ধ করল। কী ভাবল কে জানে! জোরে ঘুঁষি পাকিয়ে সৌম্যকে মারতে এল।

ওই একটা ঘুঁষি সৌম্যর রোগাপাতলা চেহারায় পড়লে আর দেখতে হত না। কিন্তু পড়ল না, কারণ ঘুঁষিটা সৌম্যর মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে আর গিয়ে পড়েছে ট্রেনের বাথরুমের দরজায়। সৌম্য হঠাৎ উচ্চতায় প্রায় একফুট ছোট হয়ে গেছে।

‘উহু’, বলে লোকটা ওখানেই বসে পড়ে বাঁহাত দিয়ে ডানহাতটা চেপে ধরে কাতরাতে লাগল।

ব্যাপারটাতে সৌম্য যতটুকু অবাক হয়েছিল, তার থেকেও অবাক হল, যখন দেখল যে ও আবার আস্তে আস্তে লম্বা হতে শুরু করেছে। এক মিনিটের মধ্যেই আবার আগের উচ্চতায় ফিরে এল সৌম্য।

ট্রেনের ওই বিদেশি সহযাত্রী এতক্ষণে আবার সশরীরে এসে উপস্থিত। সৌম্যর পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে। বলল—’এক্ষুনি লোকজন এসে পড়বে। বলে দিও ঠিক কুড়ি মিটার দূরে রেললাইনে মাইন পোঁতা। ওরা ঠিক খুঁজে পাবে। কী করে জানলে জিগ্যেস করলে আমার কথা বলো।’

‘আপনার কী পরিচয় দেব? কে বিশ্বাস করবে আমার কথা?’

‘হু, তা ঠিক, বলো ভূত। অ্যালিয়েন বললে—অন্য গ্রহ থেকে এসেছি বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। ভূত বললে বিশ্বাস করবে। আর তা ছাড়া’, বলে বসে থাকা মাস্তান লোকটার কাঁদো কাঁদো মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অ্যাই, আমি যে ভূত সে ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে পারবি?’

কোনও সাড়া না পেয়ে ফের বলে উঠল, ‘তোর গোঁফটা ভারী বিচ্ছিরি। কীরকম গা ঘিনঘিন করছে,’ বলে মুখের সামনে হাত নাড়তেই গোঁফ ভ্যানিশ হয়ে গেল।

সাধের গোঁফ হারিয়ে আর এসব ভূতের কীর্তি দেখে লোকটা ইতিমধ্যে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করেছে।

‘নাহ, গোঁফ সরানোটা ঠিক হয়নি। তোর মাথায় এত ঝাঁকড়া চুল এর সঙ্গে মানাচ্ছে না। চুলটা না থাকলে মানাতেও পারে,’ বলে মাথার দু-ইঞ্চি ওপর দিয়ে আরেকবার হাত বোলাল। মুহূর্তে লোকটার কায়দা করা চুল উধাও। চকচকে ন্যাড়া মাথা।

‘বাহ, এবার বেশ লাগছে। ভুরু না থাকলে আরও ভালো লাগবে।’ বলে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আরেকবার মুখের সামনে হাত নাড়াল। এবার ভুরুও উধাও।

লোকটা এবার জ্ঞান হারিয়ে ট্রেনের মেঝেতে পড়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অ্যালিয়েনটা বলল, ‘দেখলে এখন কেমন ফুটফুটে লাগছে একে। ওখানে আমার একটা সেলুন ছিল।’ অ্যালিয়েনটা এবার সৌম্যর দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘ওই সে সাক্ষীও পেয়ে গেলে! বলবে যে ভূত এসে তোমাকে ট্রেন থামাতে বলেছে। পৃথিবীর লোকেরা অ্যালিয়েন না মানলেও ভূতকে বেশ মান্যিগণ্যি করে। আর তা ছাড়া অ্যালিয়েন বললে প্রচুর হইচই শুরু হয়ে যাবে। তুমিও ধরা পড়ে যেতে পারো।’

‘কিন্তু আপনি তো অ্যালিয়েন—ভূত নন!’

‘অ্যালিয়েনও বটে, ভূতও বটে। অ্যালিয়েনরা মরলে কি আর ভূত হয় না, শুধু মানুষ মরলেই ভূত হয়? কত কমন সেন্সের অভাব দেখো। ভূত হলে তবেই তো এ গ্রহ থেকে ও গ্রহে যাওয়া এত সোজা—জলভাত হয়ে যায়, তাই না!’

‘কিন্তু—’

‘বললাম না? আমাদের গ্রহ আর নেই। গ্রহের সবাই মারা গেছে। আমিই বা বেঁচে থাকব কী করে? আমি হলাম অ্যালিয়েন মরে ভূত, বুঝলে?’

একটু থেমে ফের বলে উঠল, ‘আর জলের কথাটা জলে ফেলো না।’ বলে লোকটা সৌম্যর হাঁ-করা মুখের হাঁ-টা আরেকটু বাড়িয়ে দরজার মধ্যে মিলিয়ে গেল।

নাহ, এবার থেকে জ্যোতিষে বিশ্বাস করবে সৌম্য। আজকের দিনটা অন্য কোনও দিনের মতোই না। খুবই ইন্টারেস্টিং।