নিধিরামে অপদস্থ – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
নিধিরামে অপদস্থ
নিধিরাম। গ্রামের নাম নিধিরাম। গ্রামের এক কৃতী সন্তানের নামে গ্রামের নাম। প্রশ্ন উঠতে পারে নিধিরামবাবু করতেন কী? বিজ্ঞানী? সাহিত্যিক? সমাজসেবী? দেশপ্রেমী? না, এসবের কোনওটাই নয়। শোনা যায়, নিধিরাম দিনেদুপুরে লোক খুন করে বেড়াত। চোরাকারবারের সাইড বিজনেস করত। লোক শাসিয়ে টাকা আদায় করত। এমনকী মৃত্যুর পরে গ্রামের নাম যাতে নিধিরাম হয়, তার ব্যবস্থাও করে গেছল। এরকম একজন লোকের নামে গ্রামের নাম, তা আবার গ্রামের লোক আজও গর্বের সঙ্গে বলে! আক্ষেপ করে—’আর কি আগের দিন আছে মশাই? নিধিরাম থাকলে কি আর এই অবস্থা হত? কী সুন্দর তাসের আসর বসত হাসপাতালের ভেতরে। পুলিশের পর্যন্ত পা কাঁপত এ গ্রামে আসতে গেলে। রাস্তায় রাস্তায় নুড়ি পাথরের মতো বোমা পড়ে থাকত। আর বাচ্চারা তা নিয়ে স্কুলের উঠোনে লোফালুফি করত।’
তা এরকম এক গ্রামের স্কুলে চাকরি। কী দরকার ছিল ছেলেটার কানমলার? আর কানমলার আগে অন্তত পিতৃপরিচয় নেওয়াটা জরুরি ছিল। হাতে পরা সোনার বালা ও সোনার চেনটাও যদি লক্ষ করতেন। বাবা স্কুল বোর্ডের মেম্বার জানলে কি আর কানটায় এমনভাবে টান দিতেন অপদস্থবাবু। সাইকেল ভ্যানে যেতে যেতে এসব কথাই ভাবছিলেন উনি। কলকাতা থেকে নিশিকান্তপুর দু-ঘন্টা ট্রেনের রাস্তা। অন্তত টাইম টেবিল অনুযায়ী। নিশিকান্তপুর থেকে পদ্মপুকুর দিনে একটাই বাস যায়। ছাগল মুরগি নিয়ে বাসে ওঠে লোকজন। তিলধারণের জায়গা নেই। এ-ওর জামা কাঁধ খামচে ধরে যাচ্ছে। অপদস্থবাবুর তাও সইত। কিন্তু ছাগলটা এসে প্যান্টটা চিবোবে এতটা অপদস্থবাবু সহ্য করতে পারেননি। ‘অ্যাই হ্যাট’-বলতেই ছাগলের মালিকের গলা পেলেন। লুঙ্গি পরা একটা দাড়িওয়ালা লোক ভিড় ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে বলল, ‘ফের যদি আমার বুবুন সোনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিস তো…!’ পাশ থেকে আরো দু-একজনের গলা শোনা গেল। তারা সবাই বুবুনসোনার পক্ষে। ‘আহা বেচারা হাওয়া পাচ্ছে না। কী করবে?’ সামনে যে বৃদ্ধ বসে নাকে নস্যি নিচ্ছিল সে বেশ খানিকটা নস্যি টেনে নিয়ে বলে উঠল, ‘শহুরে বাবুর দামি প্যান্ট না! এ তো আর আমাদের মতো পুরোনো ধুতি নয়।’ উস্কে দেওয়ার মতো কমেন্ট। এরপর যা হয়। অপদস্থবাবু শত্রু শিবিরে অভিমন্যুর মতো আরও ঘণ্টা তিনেক কাটিয়ে অবশেষে ছাড়া পেলেন। মাঝে টিকিট করতে গিয়ে আর একবার অপদস্থ হয়েছিলেন অপদস্থবাবু। কন্ডাকটার বেশ রাগ করে বলে উঠেছিল, ‘টাকা দেখাচ্ছেন কাকে? রাখুন রাখুন, ও সব শহুরে কায়দা আমাদের এখানে দেখাবেন না, বিনা টিকিটেই সরকারি বাস চলে এখানে।’ কথাটাও সত্যি। কেউ টিকিট করে না। আম, কাঁঠাল, সবজি, কন্ডাকটরের থলেতে ফেলে নেমে যায়।
অপদস্থবাবু পদ্মপুকুর যখন পৌঁছোলেন তখন বিকেল পাঁচটা। পদ্মপুকুর থেকে সাইকেল ভ্যানে চেপে নিধিরাম যেতে হয়। ভ্যানের খোঁজে বেশিদূর যেতে হল না। একটা দস্যু চেহারার মোটা গোঁফওয়ালা লোক এগিয়ে এল তার ভ্যান নিয়ে।
—কোথায় যাবেন?
—নিধিরাম।
—কার বাড়ি? হাতকাটা বাবলুর নাকি কানা বুলাই-এর—ভ্যানওয়ালার জিজ্ঞাসা।
—অতশত বলতে পারি না। নিধিরাম নিয়ে গেলেই হবে। তা ভাড়া কত বলো। অপদস্থবাবু একটু বিরক্তই হলেন।—দেড়শো।
ভ্যানওয়ালার উত্তর শুনে অপদস্থবাবু ভ্যানের ওপরেই বসে পড়েছিলেন। সামলে নিয়ে বলে উঠলেন এত কেন? শুনেছি আধঘণ্টার রাস্তা।
দশ টাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য আর একশো চল্লিশ আমার প্রাণের জন্য। যাবেন তো চেপে বসুন। একমাত্র এই কেঁদো ছাড়া আর কোনও ভ্যানওয়ালার হিম্মত নেই ওই নিধিরাম যাওয়ার।
বাধ্য হয়ে অপদস্থবাবু ভ্যানে চেপে বসলেন। পড়ন্ত বেলা। দরাদরি করার সাহস পেলেন না।—তা কবে ফিরছেন? অবশ্য যদি ফিরতে পারেন!
শেষের কথাটা আস্তেই বলল কেঁদো।—কেন গ্রামের লোকেরা ছাড়তে চায় না বুঝি? খুব অতিথিবৎসল?
—হ্যাঁ, সে আর বলতে! গিয়েই দেখবেন। তা মশাই-এর করা কী হয়? আলুর ব্যবসা?
অপদস্থবাবুর গায়ে খুব লাগল। দেখতে ভালো না হতে পারেন। কিন্তু শিক্ষার ছাপ তো একটা আছে চেহারায়। সম্প্রতি একটা রিমলেস চশমাও কিনেছেন। আলুর ব্যবসা করতে যাবেন কেন?
—অঙ্কের টিচার, নিধিরাম জ্ঞানবিকাশ হাই স্কুলের। শুনে কেঁদো থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভ্যান থামিয়ে বলে উঠল, ‘আস্তে বলুন। আগে জানলে ভ্যানেই উঠতে দিতাম না। শুধু শুধু প্রাণী হত্যার পাপ।’ বলে চোখ মুছতে মুছতে ফের ভ্যান চালাতে শুরু করল।
—কী হে, কাঁদতে শুরু করলে কেন?
—এই আপনার ছেলেমেয়েদের কথা মনে পড়ল।
—নাহ, আমার ছেলেমেয়ে নেই।
—তা বাড়িতে আর কে আছেন? আপনার আগে আমি তিন ট্যাচার নিয়ে গেছি, আর নিয়ে এসেছি সাদা কাপড়ে ঢেকে।
—বল কী হে! মার্ডার!
—মার্ডার না হার্টফেল তা কী করে বলি! সবার তো আর নিধিরামের জলবায়ু সহ্য হয় না।
উঁচু-নিচু ভাঙাচোরা পথ ভেঙে ভ্যানে লাফাতে লাফাতে চলতে চলতে অপদস্থবাবুর সাহস বেড়ে গেছে খালি একবার ‘হুঁ’ বলে উঠলেন।
ঘুমের ঘোর এসে গিয়েছিল। হঠাৎ সাঁই করে কী একটা নাক ঘেঁষে চলে গেল। তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন অপদস্থবাবু। ‘কী ব্যাপার?’
—কিছু না, থান ইট। দূরে কোন ছেলে-ছোকরা ছুড়ে মেরেছে। নিধিরামের কাছাকাছি এসে গেছি তো।
ওই ঠান্ডাতেও ঘামতে থাকলেন অপদস্থবাবু, বেশিক্ষণ না। খানিকবাদেই কেঁদো বলে উঠল,—এসে গেছি। আমি আর যাব না। হেঁটে দশ মিনিটের পথ।’
—কেন হে, যাবে না কেন? অতগুলো টাকা দেব।
—বড় ভূতের উৎপাত। প্রাণ অথবা ভ্যান—দুটোর একটা ঠিক খোয়াতে হবে। ফিরতে চান তো চলুন। ফেরার সময় দশটাকা।
—না হে বাবু, এতদূর যখন এসেছি, একবার দেখেই যাই।
অপদস্থবাবু নামতেই কেঁদো উলটোদিকে ভ্যান চালিয়ে দিল।
২
ভারী ব্যাগদুটোকে দুহাতে ধরে বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললেন অপদস্থবাবু। ভাগ্যিস পূর্ণিমা ছিল। তা না হলে এই রাতে এতটা পথ যে কীভাবে যেতেন কে জানে? পাশে আঁশশ্যাওড়া আর করমচার ঝোপ, এই পথে একজন সঙ্গী পেলেও হত। ভাবতে না ভাবতেই একজনের দেখা পেলেন। কাঁঠাল গাছে হেলান দিয়ে একটা লোক হাতে খাতা নিয়ে কীসব লিখছে। অপদস্থবাবু যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। লোকটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। লোকটার পরনে খাটো ধুতি। চোখে আগেকার দিনের ভারী ফ্রেমের চশমা। সামনের দিকে চুল না থাকায় চওড়া কপালটা আরো চওড়া লাগছে। চাঁদের আলো হাতে ধরা খাতাটার ওপর পড়েছে। আর লোকটা তাতে যেন কীসব লিখে যাচ্ছে। ভারী অদ্ভুত লোক। অপদস্থবাবু যে মোটে একহাত দূরে দাঁড়িয়ে আছেন তা যেন লক্ষই করল না। একটু কেশে নিয়ে অপদস্থবাবু বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা নিধিরামে যেতে আর কতক্ষণ লাগবে?’
প্রশ্ন শুনে লোকটা খুব খুশি হয়ে বলে উঠল, দাঁড়ান, একটু কষে নিয়ে বলছি। আপনার গতিবেগ কত?’
—-গতিবেগ?—অপদস্থবাবু অবাক।
—হ্যাঁ, মানে কীরকম গতিতে হাঁটছেন এই আর কি?
—তা ছয় থেকে দশ কিমি ঘন্টা প্রতি হবে।
—উহুঁ, অঙ্কটা আরও জটিল হয়ে গেল দেখছি। এখান থেকে উপেনের দোকান ১২০০ মিটার। মানে—লোকটা খাতার ওপরে গুণভাগ করতে শুরু করল।
অপদস্থবাবু আর না দাঁড়িয়ে একটা মৃদু ধন্যবাদ জানিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। এখানে এমন পাগলের উৎপাতও সহ্য করতে হবে! কিন্তু উনি ছেড়ে এলেই বা কী হবে! লোকটা কি এত সহজে ছাড়বে? ‘দাঁড়ান, উত্তর না শুনেই যে হাঁটা শুরু করলেন দেখছি। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঠিক উত্তর পেয়ে যাবেন।’
—উত্তর আমি এমনিতেই পেয়ে গেছি। এর মানে হল আমার সাত থেকে বারো মিনিটের মতো সময় লাগবে।
লোকটা সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে অপদস্থবাবুর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল, ‘আপনি তো বেশ তাড়াতাড়ি অঙ্ক কষতে পারেন দেখছি, তা মশাই-এর করা হয় কী? আলুর ব্যবসা? হিসেবটাতো ভালোই বোঝেন।’
অপদস্থবাবু ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠলেন, ‘কেন নিধিরামে কি সবাই আলুর ব্যবসাই করতে আসে? আমি অঙ্ক শেখাতে এসেছি। নিধিরাম জ্ঞানবিকাশ স্কুলের নতুন অঙ্কের টিচার।’
—বা: বা:, যাক অবশেষে নিধিরামে একজন ভালো অঙ্ক জানা লোক আসছে। তা এই অধমকে মনে রাখবেন। মাঝে মাঝে দু-একটা অঙ্ক নিয়ে যাব। আমার তো দিনরাত অঙ্ক নিয়েই কাটে।
—তাই নাকি! সে তো খুব ভালো কথা। যাক, শুরুতেই আলাপ হয়ে গেল। মাঝে মাঝেই চলে এসো।
লোকটা অপদস্থবাবুর হাত দুটো জাপটে ধরে গদগদ স্বরে বলে উঠল, সে আমার ভাগ্য।’
লোকটার বয়স পঞ্চাশের ওপরে। অঙ্কের ওপর এতটা আগ্রহ অদ্ভুত ঠেকলেও অপদস্থবাবুর ব্যাপারটা সব মিলিয়ে বেশ ভালোই লাগল। আরও ভালো লাগল যখন লোকটা অপদস্থবাবুর ভারী ব্যাগদুটো নিয়ে এগিয়ে দিতে চলল।
—তা আমায় যদি এখন একটা ভালো অঙ্ক দিতেন। এই আজকের জন্য। অঙ্ক ছাড়া আমার মোটেই সময় কাটতে চায় না।
আচ্ছা লোকের পাল্লায় পড়া গেল তো। মনের ভাব গোপন করে অপদস্থবাবু বলে উঠলেন, ‘কীসের ওপর দেব? পাটিগণিত না বীজগণিত?’
—হে: হে:, সে আপনার ইচ্ছে।
—দু-মিটার অন্তর একটা গাছ হলে এখান থেকে উপেনের দোকানের মধ্যে ক’টা গাছ আছে?
বাকি পথ লোকটা কী সব বিড়বিড় করতে করতে আর মনে মনে অঙ্ক কষতে কষতে চলল। মাঝে মাঝে বলতে শোনা যাচ্ছিল, —যাহ, গুলিয়ে গেল। খানিকবাদে বনের পথটা শেষ হল। দূরে একটাই দোকান দেখা যাচ্ছে। হ্যারিকেন জ্বলছে। লোকটা ব্যাগদুটো কাঁধ থেকে নামিয়ে অপদস্থবাবুকে বেমক্কা একটা প্রণাম ঠুকে বলে উঠল,—
—ওই যে উপেনের দোকান, আর আমি যাব না, ওকে গিয়ে জিগ্যেস করলেই পথ বলে দেবে। কাল আমি অঙ্কটা কষে নিয়ে আসব।
‘কিন্ত আমার ঠিকানা কোথায় পাবে?’
‘সে সমস্যা হবে না। আমি ঠিক খুজে বের করে নেব। ও হ্যাঁ, এই অধমের নাম হল নবীন। নবীন ভূত বলেই লোকে আমাকে চেনে। দরকার হলেই স্মরণ করবেন।’
‘তা ভূত কারও পদবি হয় না কি?’
‘আজ্ঞে না, ওটা মরণোত্তর উপাধি।’ বলেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল লোকটা। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপলেন অপদস্থবাবু। তারপর উপেনের দোকানের দিকে এগিয়ে চললেন। মুদির দোকান। টাকমাথা, ঝোলা গোঁফ একটা লোক গালে হাত দিয়ে বসে আছে। এ-ই তাহলে উপেন।
অপদস্থবাবু বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা জ্ঞানবিকাশ স্কুলটা কোনদিকে?’
উপেন হ্যারিকেনের আলোয় ঝিমোচ্ছিল। প্রায় ছ-ঘণ্টা হল কোন খদ্দেরের দেখা নেই। হঠাৎ করে সে তাকিয়ে দেখল শার্টপ্যান্ট সোয়েটার পরা একজন মোটাসোটা চেহারার লোক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে বেশ খুশি-ই হল। অনেকক্ষণ কারো সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। তর্কও করা যায়নি। সবেতে তর্ক করতে পারে বলে উপেনের গ্রামে বেশ নামডাক আছে। কেউ যদি বলে আকাশ নীল, গাছের পাতা সবুজ তাকেও ভুল প্রমাণ করে ছাড়বে উপেন।
—কী দরকার?
—না, আমি জ্ঞানবিকাশ স্কুলের নতুন টিচার, টিচার্স হোস্টেলটা কোনদিকে?
—তা মরতে এই গ্রামে এলেন কেন?
—সরকারি চাকরি। যেখানে পাঠাবে সেখানেই তো যেতে হবে। তা কোনদিকে একটু বলবেন?
‘এই পথ দিয়ে মিনিট খানেক এগিয়ে গেলে একটা অশ্বত্থ গাছ পড়বে। সেখান থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে গেলে একটা পুকুর পাবেন। তার বাঁদিক দিয়ে যে রাস্তাটা গেছে সেটা দিয়ে দু-মিনিট গেলেই হোস্টেল, বুঝেছেন?’ অপদস্থবাবু মাথা নেড়ে সায় দিতেই উপেন চেঁচিয়ে উঠল, ‘ঘোড়ার ডিম বুঝেছেন। এই পথে কত অশ্বত্থ গাছ পড়বে। আর গ্রামের রাস্তায় জায়গায় জায়গায় পুকুর থাকে। কোন পুকুর বুঝবেন কী করে? বুঝেছেন বললেই হল! দাঁড়ান দোকান বন্ধ করে আমি সঙ্গে যাচ্ছি।’
‘না, মানে সে দরকার ছিল না।’
‘দরকার ছিল না মানে? ফের তর্ক করছেন?’
খানিকবাদে উপেনের সঙ্গে অপদস্থবাবু হোস্টেলের দিকে রওনা হলেন। এপর্যন্ত যাত্রার অভিজ্ঞতা যেমনই হোক না কেন গ্রামবাংলার এই মাটির রাস্তা, মাঝে মাঝে ঝোপের আড়াল থেকে আসা টিমটিমে বাড়ির আলো, দু-ধারে আম-জাম-কাঁঠাল-গাছের সারি, লেবু আর নিমফুলের মিষ্টি গন্ধ ওঁর বেশ ভালো লাগছে। কিছুক্ষর হাঁটার পর একটা সাদা চারতলা একটু পুরোনো গোছের বাড়ি দেখিয়ে উপেন বলে উঠল, ‘এটাই আপনার স্কুল। এর পেছন দিকটায় আপনাদের হোস্টেল। উঠোনের মধ্যে দিয়ে চলে যান, কী বুঝেছেন?’
‘হুঁ! মনে হয়।’
‘ওরকম মনে হয় মনে হয় বলবেন না। হয় বলুন বুঝেছেন, না হয় বলুন বোঝেননি। উপেন গজগজ করতে করতে উলটোদিকের পথ ধরল। স্কুলের গেটটা আলতো ঠেলতেই খুলে গেল। অপদস্থবাবু স্কুলের উঠোনে পা দিতে না দিতেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হল। কোথা থেকে দুটো কুকুর ছুটে এসে প্রচণ্ড জোরে চেঁচাতে শুরু করল। শুধু চেঁচানোই নয়, যেভাবে দাঁত দেখাতে শুরু করল, তাতে তাদের আদৌ গান্ধীপন্থী বলে মনে হল না।
দূর থেকে উপেনের গলা শোনা গেল, ‘ও:, আপনাকে ওই ডাকাতে কুকুর দুটোর কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলাম। লালু আর ভুলু।’
অপদস্থবাবু কুকুর দুটোর আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য ব্যাগদুটোকেই বাঁই বাঁই করে ঘোরাতে ঘোরাতে আর্তস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘বাঁচান, উপেনবাবু!’
‘নাহ, মশাই, আমার কিছু করার নেই, এরা একবার যখন ধরেছে তখন ভালো করে না কামড়ে ছাড়বে না। তবে ভয়ের কিছু নেই হোস্টেলের দারোয়ানের কাছে সব ওষুধ আছে।’ উপেনের গলার স্বর আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে গেল।
উপায় না দেখে অপদস্থবাবু ছুটতে শুরু করলেন। এত জোরে যে ছুটতে পারেন তা উনি আগে জানতেন না। কিন্তু তাও যথেষ্ট নয়। পায়ের দু-একটা জায়গায় কুকুর দুটো দাঁত বসিয়েছে। স্কুলের পাশ দিয়ে ইটে বাঁধানো এক চিলতে রাস্তা চলে গেছে। মিনিট দশেক গেলে (অপদস্থবাবুর মিনিট তিনেক লাগল।) পথটা গিয়ে একটা তিনতলা বাড়িতে শেষ হয়েছে। অপদস্থবাবু উদভ্রান্তের মতো সিঁড়িগুলো টপকে বাড়িটার মধ্যে গিয়ে ঢুকলেন। একটা বড় বারান্দা। বারান্দার ডান দিক দিয়ে একটা সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। সিঁড়ির তলায় টেবিল টেনে বিশাল গোঁফওয়ালা একটা লোক ঝিমোচ্ছে। মনে হয় নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।
‘বাঁচাও, বাঁচাও!’ লাফাতে লাফাতে কুকুরদুটোকে ব্যাগ দিয়ে মারতে মারতে অপদস্থবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন।
লোকটা অবশেষে জেগে উঠল। তা সেটা কুকুরের চিৎকারে না অপদস্থবাবুর চিৎকারে তা বলা মুশকিল। আর জেগে উঠেই অপদস্থবাবুকে ধমকে বলে উঠল, ‘আহ, কুকুর নিয়ে ভেতরে এসেছেন কেন? কুকুর নট অ্যালাউড।’
অপদস্থবাবু ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে বলে উঠলেন, ‘কে ওদের নিয়ে আসবে? দেখছ না আমাকে কামড়াচ্ছে! কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না।’
এতক্ষণে লোকটার হুঁশ ফিরল। ‘আরে লালু ভুলু যে! থাম-থাম!’ বলতে-বলতে ও উঠে দাঁড়াল। কুকুরদুটোও বেশ পোষা মনে হল। ওর একডাকে অপদস্থবাবুকে ছেড়ে সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল। অপদস্থবাবুর হাত পায়ের বেশ কয়েকটা জায়গা থেকে রক্ত পড়ছে। সেটা দেখে কোনও ভ্রূক্ষেপ না করেই লোকটা বলে উঠল, লালু, ভুলু খুব ভালো। নতুন লোক পেলে আর ছাড়তে চায় না, আপনার পিছনেও প্রথম কয়েকদিন একরকম ঘুরঘুর করবে। পাত্তা দেবেন না। তারপরে আর কামড়াবে না।’
‘অ্যা! সে তো…’ অপদস্থবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন লোকটা ফের ধমকে উঠল। কুকুর তাড়া করলে কখনো ছুটতে নেই আপনি যদি স্থির হয়ে থাকতেন দু-তিনটের বেশি কামড় বসাত না। আর এখন দেখুন! সারা গায়ে কামড়।’
‘তা ওষুধ আছে কোনও?’
‘না, এ পোড়া জায়গায় ওষুধ আর পাবেন কোথায়? তবে দু-একটা শেকড় বাকড় থাকলেও থাকতে পারে। দেখি।’
‘কুকুরগুলো পাগল নয় তো?’
‘না, না, কুকুর পাগল হবে কেন? তবে যাদের কামড়ায় তাদের মধ্যে দু-একজন পাগল হয়েছে বটে। ওই তো আমাদের গবা পাগলা। সেও তো এই স্কুলে পড়াতে এসেছিল। তা একই ব্যাপার। আপনার মতো বোকার মতো ছুটেছিল। এখন দেখুন। পুকুরপাড়ে বসে হাঁসেদের কেমিস্ট্রি পড়ায়।’
ভয়ে অপদস্থবাবু যন্ত্রণাটা ভুলে গেলেন। লোকটার নাম হরু। হরুর কাছে থেকে কাপড় আর ডেটল জোগাড় করে তা দিয়েই ক্ষতস্থানগুলো বাঁধলেন। সিঁড়ি দিয়ে হরুর সঙ্গে দোতালায় উঠলেন। দু-ধারে সারি দিয়ে ঘর, তবে কেউই তাতে থাকে বলে মনে হল না। কোনওরকম সাড়াশব্দ নেই। হরু একদম রাস্তার দিকের একটা ঘর খুলে দিল।
অপস্থবাবু বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা আর কোনও টিচার থাকেন এ হোস্টেলে?’
কেউ না। সবাই স্থানীয়। কার দায় পড়েছে এই ভূতুড়ে বাড়িতে থাকবার?’
‘ভূতুড়ে মানে?’
‘আরে, তেঁনাদের কথা রাতে না বলাই ভালো, আর খুন-জখম এসব তো কম হয়নি এ-বাড়িতে!’
অপদস্থবাবু লাইটের সুইচগুলো সব টকাস টকাস করে অন করলেন, কিন্তু তাতে ঘরের অন্ধকারের কোনও পরিবর্তন হল না।
‘কী ব্যাপার, লাইটগুলো সব কাটা নাকি?’
‘কয়েকবছর আগে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট হয়। বেশ কয়েকজন টিচার এঘর-ওঘরে মারা যায়। তারপর থেকে স্কুলের বড়বাবুরা বলেন এ-বাড়িতে ইলেকট্রিক লাইন আর রাখা যাবে না। ওই এক আমার মাথার ওপরেই একটা আলো জ্বলে। তাও বাইরে থেকে লাইন নিয়ে জ্বালাই। তা আপনার অসুবিধে হবে না, ওই হ্যারিকেন রইল। আর মোমবাতিও আছে গুটি কয়েক।’
খানিকবাদে হরু এসে খানিকটা চিঁড়ে-গুড় দিয়ে গেল। অপদস্থবাবু প্রথমে খানিকক্ষণ গাঁইগুঁই করে বুঝলেন যে এর বেশি এখন আর আশা করা যাবে না। এখানে নাকি আগের দিন থেকে খাবারের অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। তবে খিদের মুখে চিঁড়ে-গুড় খারাপ কিছু লাগল না।
স্কুল বিল্ডিংটা খারাপ নয়। অন্তত এ গ্রামের আর পাঁচটা জিনিসের তুলনায় অনেক ভালো। হেডমাস্টার অশোকবাবু বাকি সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। তবে কেউ-ই অপদস্থবাবুর সঙ্গে বিশেষ কথা বলল না। দূর থেকে ফিসফাস শুনে বুঝতে পারলেন আড়ালে আবডালে ওঁর সম্বন্ধেই আলোচনা হচ্ছে। উনি ছাড়া এ স্কুলে আর একজন অঙ্কের স্যার আছেন। নাম বেণীমাধববাবু। চোখে কীরকম উদভ্রান্ত দৃষ্টি। বেণীমাধববাবু শুধু একবার এগিয়ে এসে অপদস্থবাবুর পা থেকে মাথা অবদি চোখ বুলিয়ে বলে উঠলেন, ‘নাহ, কলকাতা থেকে আর লোক পেলে না। এরকম আলুভাতে গোবর গণেশ চেহারা। এখানকার স্কুলে পড়াতে গেলে পুরো ব্যায়াম করা শরীর চাই।’ তা সেটা অবশ্য অপদস্থবাবুর নজর এড়ায়নি। সবক’জন টিচারের বেজায় মুশকো মুশকো চেহারা। প্রথম নজরে দেখে মনে হয় কুস্তির আখড়া।
অপদস্থবাবুর উপর ক্লাস সেভেন আর এইট পড়ানোর দায়িত্ব পড়ল। ক্লাস নিতে যাবার সময় যা যা খারাপ হতে পারে সবই আশা করেছিলেন। চোখের সামনে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন কেঁদোর ভ্যানে সাদা চাদরের তলায় শুয়ে আছেন। কেঁদো কাঁদতে কাঁদতে ভ্যান চালাচ্ছে। টিচার্স রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ক্লাসে যাবেন কি যাবেন না ইতস্তত করছিলেন। ভূগোলের শিক্ষক দিগ্বিজয়বাবু বোধহয় অপদস্থবাবুর মনের অবস্থা আঁচ করতে পেরেছিলেন। এগিয়ে এসে বললেন, ‘আসুন ক্লাস অব্দি পৌঁছে দিয়ে আসি।’
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে বাঁ-দিকে করিডোরটা দিয়ে এগিয়ে গেলেন দিগ্বিজয়বাবু। শেষ ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন এটাই ক্লাস সেভেন। ঢুকে যান। তারপর কী ভেবে আবার বলে উঠলেন ‘দাঁড়ান, ছেলেগুলোর সঙ্গে আপনার একটু পরিচয় করে দিই।’
ক্লাসে ঢোকা মাত্রই ছেলেগুলো বেশ সুশৃঙ্খলভাবে উঠে দাঁড়াল। অবশ্য ছেলে বলতে মোটে পাঁচজন। দিগ্বিজয়বাবু অপদস্থবাবুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন, ‘বাঁ-দিকের ছেলেটা হল পঞ্চু। কানা হাবলুর ছেলে। এমনিতে ভালো। তবে বদমেজাজি। একদম চটাবেন না। আর পাশের জন হল করিম। মোটে কাছে যাবেন না, বদ্ধপাগল। কখন কী করে বসে কে জানে! রাগলে চিমটি দেয়, খুশি হলে কামড়ে দেয়।’
‘তা এরা বাকিদের সঙ্গে ক্লাস করে অন্যদের অসুবিধে হয় না?’ একটু হেসে দিগ্বিজয়বাবু আবার ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন, ‘তা বাকিরাই বা কম যায় কীসে? করিমের পাশের জন হল বাবলু। এমন বিচ্ছু ছেলে খুব কমই দেখা যায়। আপনাকে একা পেলেই গাছের আড়াল থেকে মাথা লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়বে, গায়ে বিছে ছেড়ে দেবে। বাবলুর পাশে নন্দ। নন্দর কথা অবিনাশবাবুর কাছ থেকেই শুনে নেবেন। ভুলের মধ্যে অবিনাশবাবু ওকে ইংরেজিতে ফেল করিয়েছিলেন। ব্যস! একলা পেয়ে ভাড়াটে গুন্ডা লাগিয়ে অবিনাশের দুটো পা-ই ভেঙে দিল। এখন বেচারা…। তার পাশের জন হল…ব্যস,—আর দরকার নেই,—মাথা এমনিতেই ভোঁ ভোঁ করছিল অপদস্থবাবুর।—’তা মশাই এ ক্লাসে কি ভালো ছেলে একটাও নেই?’
‘আস্তে বলুন, আস্তে বলুন। ওরা শুনলে আপনাকে আর আস্ত রাখবে না। এরাই তো ভালো ছেলে। বাকি তিরিশজনের কথা না বলাই ভালো। তবে তারা বিশেষ ক্লাসে আসে না। পথেঘাটেই যা দেখা পাবেন।’
দিগ্বিজয়বাবু বেরিয়ে যাবার পর অপদস্থবাবু কাঁপা গলায় পড়াতে শুরু করলেন। একটা সোজা অঙ্ক দিয়েছিলেন। কেউ না পারলেও অপদস্থবাবু ‘শাবাশ, শাবাশ’ বলে প্রত্যেকেরই বেশ প্রশংসা করলেন, খালি করিম বাদে। ছেলেটা না আবার খুশি হয়ে কামড়ে দেয়।
স্কুল ছুটির পরে অপদস্থবাবু ভাবলেন গ্রামটা একটু ঘুরে দেখা যাক। মন খারাপ, গাছটাছ দেখে একটু যদি মনটা ভালো হয়। গ্রামের রাস্তাঘাট বেশ ভালো, দু-ধারে অর্জুন, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া। পথের দুপাশ থেকে ডালপালা বাড়িয়ে মাথার ওপরের আকাশটাকে খণ্ড খণ্ড করে দিয়েছে। একজায়গায় বেশ খানিকটা জমিতে ওলকপির চাষ হচ্ছে। গাছের পাতাগুলো ছাতার মতো ওপর দিকে, গোড়াটা পরিষ্কার দেখা যায়। অপদস্থবাবুর দারুণ লাগছিল চারদিকের এই পরিবেশ। হঠাৎ উনি খেয়াল করলেন উনি একা এই সৌন্দর্য উপভোগ করছেন না। ভ্যানের ওপরে বসা নীল-হলুদ-চেক লুঙ্গি পরা একটা লোক খালি গায়ে কাঁধে গামছা ফেলে হাঁ করে পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁচা-পাকা চুল, গাল ভরতি খোঁচা দাড়ি। মুখে একটা প্রশান্তির ছাপ। অপদস্থবাবুর সঙ্গে লোকটার চোখচোখি হতেই হাতজোড় করে প্রণাম জানাল লোকটা। অপদস্থবাবুও প্রতিনমস্কার করলেন। লোকটা ভ্যান থেকে নেমে এসে বলে উঠল, ‘আপনিই কি নতুন মাস্টারমশাই?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে লোকটা বলে উঠল, ‘কিন্তু লোকে যে বলছিল আপনার নাকি মাথাখারাপ। আপনাকে দেখতে নাকি মহিষাসুরের মতো, হাতির মতো মোটা, আলকাতরার মতো গায়ের রং, ছুঁচোর মতো মুখ। কিন্তু ততটা খারাপ তো দেখছি না!’
এতক্ষণ বাদে তার প্রতি সহানুভূতিসম্পন একজনকে পেয়ে অপদস্থবাবু গদগদভাবে বলে উঠলেন, ‘তা হলেই বুঝুন! কীরকম অপপ্রচার চলছে। তা আপনার কী করা হয়?’
‘হস্তশিল্পের কাজ।’
‘বা: বা:, গ্রামের কুটির শিল্পীদের কাজ আমার খুব ভালো লাগে।’
‘আজ্ঞে আমার কাজটা ঠিক সেরকম নয়। আমার কাজটার পরিচিত নাম হল চুরি।’
‘তার মানে তুমি চোর?’
‘বা:, চোর বলতেই আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলেন? তা চুরির কাজটা খারাপ কী? যেমন বুদ্ধি লাগে তেমন কৌশল। আপনার পড়ানোর কাজ আমিও করতে পারি। আপনি করুন দেখি আমার মতো কাজ।’
‘না কাজটা যে শক্ত তা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু কাজে সম্মান নেই, তুমি ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে ‘আমি চোর’?
‘আর আপনি বলতে পারবেন, ”আমি নিধিরাম জ্ঞানবিকাশ স্কুলের শিক্ষক!” আমি তবু কিলচড় খাব বড়জোর। আপনি তো বেঁচেই ফিরতে পারবেন না। তবে আমি আর বেশিদিন এ লাইনে থাকব না। এ জায়গাটা চোর ডাকাতে ছেয়ে গেছে। এত কম্পিটিশনে টিঁকে থাকা মুশকিল, এই তো কাল অনাথবাবুর বাড়িতে চুরি করতে গেছি। ফিরে এসে দেখি আমার বাড়ি থেকেই অষ্টধাতুর কৃষ্ণমূর্তিটা উধাও। কালে কালে কী হল বলুন? চোরের বাড়িতেও চুরি!’
‘তা এখানে বসে এখন কী করছ। চুরির প্ল্যান?’
‘এই যে মেঘগুলো সরে সরে যাচ্ছে, শাল-শিশুগাছগুলো হাওয়ায় দুলছে এসব দেখতে বেশ লাগে। রোজ চুরির আগে আর পরে এসব খানিকক্ষণ দেখি। মাথাটা একদম খোলতাই হয়ে যায়।’
—তা বাপু-তোমাদের এখানে যে এত চোর-ডাকাত, কোনও থানা পুলিশ নেই?’
‘বছর দশেক আগে রামভক্ত বলে একজন খুব শক্ত দারোগাকে পাঠানো হয়েছিল এখানে। আসার পরদিন থানার সামনে দাঁড়িয়ে টানা একঘণ্টা বক্তৃতা দিয়ে গেল—এই করব, ওই করব, চোর ডাকাত আর এখানে টিকতে পারবে না, ধরা পড়লে চরম শাস্তি—ইত্যাদি। তারপর কী হল জানেন?’
‘কী হল?’
‘পরদিন ভোরে উঠে দাঁত মাজাতে গিয়ে রামভক্ত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল।’
‘কেন দাঁতে ব্যথা ছিল বুঝি?’
দূর, তা কেন? আয়নার সামনে গিয়ে ও দেখল শখের পাকানো গোঁফ-দাড়ি, আর কাঁধ অবদি বাবরি চুল সব রাতারাতি উধাও। রাতে কে বা কারা এসে ওকে অজ্ঞান করে মাথা, গোঁফ-দাড়ি সব কামিয়ে দিয়ে গেছে, রাগে অন্ধ হয়ে রামভক্ত চলল থানায়। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি না দিয়ে বাড়ি ফিরবে না। কিন্তু ঘণ্টা দেড়েক সারা গ্রাম খোঁজাখুঁজি করেও থানাই খুঁজে পেলেন না। শেষে হাটে গিয়ে দেখল যে দোকানে থানার নানান জিনিস বিক্রি হচ্ছে। কোথাও পুলিশের লাঠি, পোশাক তো কোথাও রামভক্তর বসার চেয়ার।’
‘তা রামভক্ত তাদের ধরল না?’
‘বলুন রামভক্তকে তারা ধরল না! রামভক্ত তো তখন বিলকুল একা। কুড়িজনের পুলিশবাহিনি রাতারাতি উধাও।’
‘তা তারপরে রামভক্তর কী হল?’
‘আর কী হবে? সে দারোগাগিরি ছেড়ে কানা হাবলুদের পাড়ায় ছোট একটা শাড়ির দোকান খুলেছে। তাঁতের শাড়ি বিক্রি করে। বিশ্বাস না হয় যান দেখে আসুন গিয়ে।’
একটু থেমে লোকটা আবার বলে উঠল, ‘যাই, চাঁদটা তালগাছের সঙ্গে ১৫০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে এসে গেছে। কাজ শুরু করতে হবে,—বলেই ভ্যান চালাতে শুরু করল। যেতে যেতে বলে উঠল, ‘মশাই আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন এত ভালো জ্যামিতিক আইডিয়া কী করে হলো আমার? আসলে আপনার এক যুগ আগে অঙ্ক পড়াতে আমিও এখানে এসেছিলাম কি না! তারপর এই গতি হয়েছে।’ কণ্ঠস্বর আর ভ্যান দুই-ই বাঁশবনের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
৪
রাতে খুট করে একটা শব্দে অপদস্থবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। তারপরে বুঝলেন যে ঘরে উনি একা নন। দু-দুটো দশাসই চেহারার লোক ঘরে ঢুকেছে, তাদের একজনের গলা স্পষ্ট শুনতে পেলেন, ‘নে নে ট্যাংরা—লোকটাকে গলা টিপে মেরে ফ্যাল।’ একটু থেমে ফের বলে উঠল—
‘সাহস কম নয়, নিধিরামে এসে অঙ্ক শেখানো!’ অন্যজনের গলা শোনা গেল, ‘না:, একে মেরে হাত গন্ধ করব না। শক্তিশালী লোক হত। দু-এক মিনিট ঠেকানোর চেষ্টা করত। তবে না মেরে মজা! এ তো আগে থেকেই মরে আছে। চল, বাড়ি গিয়ে আমার ছেলে ঘোতনকে পাঠিয়ে দিই। এসব লোককে নিজের হাতে মারলে মান-সম্মান লাটে উঠবে।’
লোকদুটো আবার জানলা দিয়ে সড়াৎ করে উধাও হয়ে গেল।
অপদস্থবাবু আধমরা হয়ে পড়ে রইলেন। বিছানা থেকে উঠে যে জানলাটা বন্ধ করবেন সে শক্তিও রইল না। পালিয়েও বাঁচবেন না। তার থেকে মরার আগে খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নেওয়া ভালো। খানিকক্ষণের মধ্যে বেশ একটা স্বপ্নও এসে গেল। ক্লাস নিচ্ছেন, দুটো বেশ শক্ত শক্ত অঙ্ক দিয়ে অসহায় ছাত্রদের মুখ দেখে মুচকি মুচকি হাসছেন, এমন সময় বেশ গোলগাল চেহারার একটা ফরসা ছেলে থলে হাতে এসে ঢুকল।
‘কে হে তুমি!’
‘আমি ঘোতন। বাবা পাঠিয়েছে।’ বলে ছেলেটা থলে থেকে একটা রামদা বের করল।
অপদস্থবাবু ঘুমের মধ্যেই গোঙাতে শুরু করলেন, ‘না ঘোতন, আমায় মেরো না। একবার কলকাতা থেকে ঘুরে আসি। ডিমের ডেভিল, রাবড়ি খেয়ে আসি, তারপরে যত খুশি মেরো, দু-বার তিনবার মেরো।’
‘স্যার, আমি ঘোতন নই, আমি আপনার অনুগত ছাত্র নবীন ভূত।’ ইতিমধ্যে কখন নবীন জানলা দিয়ে হাওয়ায় ভেসে এসে ঢুকেছে। গোঙানি শুনে অপদস্থবাবুকে ধাক্কা দিতে লাগল।
খানিকবাদে অপদস্থবাবু ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন, আর পাশেই নবীন ভূতের হাসিমুখ দেখে ‘অ্যাঁ’ বলে এমন চিৎকার করলেন যে নবীন খাতা ফেলে এক লাফে পাশের পাকুড় গাছটাতে উঠে বসল। আবার সাহস পেয়ে খানিকবাদে ফিরে এসে অপদস্থবাবুর পাশে জড়সড় হয়ে বসল। বলে উঠল, আজ্ঞে, ‘আমি ঘোতন নই, আমি আপনার শ্রীচরণকমলের দাস নবীনভূত।’
‘ভূত!’ বলে চমকে উঠেছিলেন অপদস্থবাবু, কিন্তু তারপরেই আবার স্থিরভাবে বলে উঠলেন,’ নাহ, তোমাকে আর ভয় নেই।’ আমিও তো এখন তোমার অবস্থায়। তা কতক্ষণ আগে আমি মারা গেলাম? অপঘাতে মৃত্যু, ভূত তো হবই’।
‘আজ্ঞে আপনি যা ভাবছেন তা নয়। আপনি মারাই যাননি। এই দেখুন, আপনি মাথা দিয়ে শুয়েছেন বলে বালিশটা কীরকম ভেতর দিকে ঢুকে গেছে। ভূত হলে এইরকম হত না।’
একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বালিশটা দেখে নিয়ে অপদস্থবাবু বলে উঠলেন ‘না হে, সান্ত্বনা দিও না। আমি বেশ বুঝতে পারছি যে আমি মরে গেছি। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ঘোতন এসে রামদা বের করল। তবে—কাটো তো একটা চিমটি, পরীক্ষা করে দেখি।’
নবীনভূত বেশ উৎসাহের সঙ্গে চিমটি কাটতে আসছিল। তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে অপদস্থবাবু বলে উঠলেন, ‘না বাপু থাক, ভূতের চিমটি আবার কীরকম হবে কে জানে? চিমটি তো নিজেকে কেটে দেখা যায়।’ বলে আস্তে করে চিমটি কেটে ‘উ:’ করে উঠলেন। লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠলেন, ‘বেঁচে আছি, বেঁচে আছি!’ বলেই আবার ধপ করে খাটের উপর বসে বলে উঠলেন—’তবে আর কতদিনই বা, আজ না হলে কাল তো মারা যাবই। এখানকার যা লোকজন!’
নবীনভূত এর মাঝে বলে উঠল, ‘আপনি যে অঙ্কটা দিয়েছিলেন সেটা ঠিক হচ্ছে না। একটু দেখে দেবেন। আরো যদি দু’একটা দেন—বেশ মাথাটা পরিষ্কার হয়ে যায়।’
‘থামো তো বাপু, কোথায় আমি কয়েকঘণ্টার মধ্যে মরতে বসেছি, না তুমি অঙ্ক অঙ্ক করছ।’
নবীনভূত মাথা চুলকে বলে উঠল, ‘তা আপনাকে কে মারবে?’
‘কে আবার? তোমাদের গ্রামটাই তো খুনে ডাকাতে ভরতি। তারাই হুমকি দিয়ে গেছে।’
‘হে: হে: বুঝেছি। আপনাকে ভয় দেখাচ্ছে তো? ও সব কিস্যু না। এখানে বাইরের কেউ এলেই ওরকম ভয় দেখানো হয়। আসল কথা বলব? এখান থেকে তাড়ানোর জন্য।’
‘তা বাপু আমি কার কী ক্ষতি করেছি যে আমাকে তাড়ানোর চেষ্টা করছে?’
‘সে অনেক কথা। এখানকার লোকেরা সবাই বেশ ভালো। আসলে কয়েকবছর আগে এখানে বিদেশিরা আসে। তারা খুব ভালো লোক। তারা চায় না এখানে আর কেউ আসুক। তাদের কথা আর কেউ জানুক। ওরা নিধিরামেরও অনেক উপকার করেছে। বন্যার সময় আশেপাশের কত গ্রামের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ওদের জন্য এখানে কিছুই হয়নি। ওরা এখানকার লোকদের জন্য কত ভালো কাজ করেছে। স্কুল করেছে, হাসপাতাল করেছে। ভালো চাষবাসের ব্যবস্থা করেছে। কত নাম না জানা যন্ত্র বসিয়েছে। তাই আমরাও ওদের কথা বাইরের কাউকে জানাইনি। ওরা বলেছিল অন্য কেউ জানতে পারলেই ওরা গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে। এসবের জন্য এখানকার কেউই চায় না বাইরের থেকে কেউ আসুক। ওদের কথা সব ফাঁস করে দিক। কারুর আসার কথা শুনলেই তাকে ভয় পাইয়ে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।’
‘তা ওরা কারা?’
‘কে জানে? লোকে বলে মঙ্গল থেকে এসেছে। সেটা নিশ্চয়ই আশপাশের কোনও গ্রাম হবে। তবে দেখতে ওদের ভারী অদ্ভুত। অনেকটা ফার্ন গাছের মতো।’
‘তুমি ভূত হয়েও গাঁজা টাজা খাও নাকি হে?’
‘চলুন, নিজের চোখে দেখলেই সব প্রমাণ পাবেন। তারা বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত সব বলতে পারে, আর লোকও ভারী অমায়িক, তবে একটাই মুশকিল, সুযোগ পেলেই পি, পি, করে কানের পাতা দুলিয়ে দুলিয়ে গান করে।’
‘তুমি যে কী বলো মাথায় কিছুই ঢোকে না, যত সব আজগুবি কথা, তা চলো, আমাকে ওদের কাছে নিয়ে চলো।’
নবীন এসে অপদস্থবাবুর হাতে ধরে একটা টান দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা ঝোড়ো হাওয়া অপদস্থবাবুকে তুলে এনে একটা মাঠের মধ্যে হাজির করল।
‘উহ, আমার হাত ব্যথা হয়ে গেল, কী ওজন। ওই যে ওদের ছাউনি।’ আঙুল তুলে দেখাতে গিয়ে নবীন আঁতকে উঠল। চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে শুনশান মাঠ, দূরের সার দেওয়া অর্জুন গাছগুলোর ওপর জোছনা দোল খাচ্ছে, কিছুই নেই।
‘ভালো দেখালে বটে।’
‘না, কিন্তু ওখানেই ছিল ওদের তাঁবুগুলো। গেল কোথায়?’
‘চলে গেছে’, উত্তরটা এল পিছন দিক থেকে। ওরা তাকিয়ে দেখে পিছনে হরিদাসবাবু। নিধিরাম জ্ঞানবিকাশ স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক।
ফের বলে উঠলেন, এবার অপদস্থবাবুকে লক্ষ্য করে—আপনাকে আর লুকিয়ে কীই বা হবে? ওরা এসেছিল মঙ্গল গ্রহ থেকে, ওদের ওখানেও একসময় মানুষ নামক জীবটা ছিল। কিন্ত অজানা কারণে তারা মঙ্গল থেকে হারিয়ে যায়। ওরা এসেছিল এখানকার মানুষের ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করতে, যাতে গ্রহে ফিরে ওরা মানুষ নামক জীবটাকে আবার ল্যাবরেটরিতে তৈরি করতে পারে। শুনেছিলাম কাজ শেষের দিকে। বছর খানেকের মধ্যে ফিরে যাবে। কিন্তু আজ হঠাৎ ওদের ওখান থেকে বার্তা এসেছে যাতে ওরা গবেষণা বন্ধ করে অবিলম্বে ফিরে যায়। মানুষ নামক বিপজ্জনক জীব তৈরি করে কোনও লাভ নেই। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে গ্রহটাই ধ্বংস করে দেবে। তা যাওয়ার আগে অবশ্য ওরা আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করে ধন্যবাদ জানিয়ে গেছে।’ একটু থেমে হরিদাসবাবু আবার বলে উঠলেন, ‘আহা দারুণ লোক ওরা। আমাকে কী সুন্দর একটা পাকাচুল তোলার যন্ত্র দিয়ে গেছে। তা অপদস্থবাবু, আপনার সঙ্গে অভদ্রতার জন্য আমরা সবাই দু:খিত। আপনি এখন নিশ্চিন্তে এখানে থাকতে পারেন, আস্তে আস্তে দেখবেন, এখানকার লোকেদের মতো লোক হয় না।’
৫
ক্লাস নিয়ে হোস্টেলে ফিরছেন অপদস্থবাবু। মনটা ভারী খুশি খুশি, হাতের থলেতে খেজুরগুড়ের পাটালি, আমসত্ব আর পেয়ারা। ছাত্রেরা, গ্রামের লোকেরা দিয়েছে, সত্যিই এখানকার লোকেদের তুলনা হয় না। এত অমায়িক, কী অভিনয়ই না করছিল এ ক’দিন! গ্রামের সম্বন্ধে আজেবাজে কথা ইচ্ছে করে রটানো হয়েছিল। স্কুল বিল্ডিংটা পেরিয়ে হোস্টেলে যাওয়ার সরু রাস্তাটা ধরলেন। হঠাৎ পথ আটকে দাঁড়াল লালু-ভুলু।
‘হে: হে:, তোদেরও ভালো শেখানো হয়েছিল। নে, এখন আমি এখানকারই লোক, আয় বিস্কুট দেব।’ কি বুঝল কে জানে! লালু দাঁত দেখিয়ে গরর করে উঠল, সঙ্গে ভুলুও।
আর তারপরেই অপদস্থবাবু ছুটতে শুরু করলেন, পিছনে লালু আর ভুলু। নিধিরামের সব কিছুই অত ভালো নয়!
