Course Content
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
0/18
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

ঠিক বিচার – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

ঠিক বিচার

‘একে চিনতে পারছ?’

 একটু ঝিমুনির ভাব এসেছিল অম্লানের। হঠাৎ প্রশ্ন শুনে ঝিমুনি কেটে গেল। হাত দেড়েক দূরেই একটা লোক দাঁড়িয়ে। গোঁফ-দাড়িহীন মুখ। কাটা কাটা নাক-চোখ। অম্লানকে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটা বলে উঠল, ‘শরীর কেমন লাগছে?’

 ‘ঠিক আছে।’ অম্লান চারদিকে একবার তাকিয়ে নেয়। ও শুয়ে আছে একটা খাটের উপরে। খাটের চারদিক কাচ দিয়ে ঘেরা। ঘরটা বেশ বড়ো, গোল মতো। কনকনে ঠান্ডা। ঘরের মধ্যে তিনটে লোক। যে লোকটা প্রশ্ন করছে তার গায়ে গাঢ় নীল রঙের পোশাক। পোশাকটা এত জ্বলজ্বল করছে যে চোখে লাগে। আগে কোনোদিন দেখেছে বলে মনে হয় না। অন্য দুজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে আস্তে আস্তে কথা বলছে।

‘আমার—আমার কী হয়েছে?

লোকগুলো চুপ করে থাকে। ওদের চোখের দৃষ্টিতে, মুখের ভাবে এতটাই কাঠিন্য যে দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করতে দ্বিধা করে অম্লান। মাথা উঁচু করে নিজের শরীরটা দেখার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। গলা থেকে পা অবধি সাদা কাপড়ে ঢাকা। পুরো শরীর অবশ। পা-টাকে একটু নড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পায়ে যেন কোনও সাড় নেই। একটা অদ্ভুত আতঙ্ক ওকে গ্রাস করে। ওর কি তাহলে সিরিয়াস কিছু হয়েছে? প্যারালিসিস? বাড়ির সবাই কোথায়? মিনু, বুবলু ওরা কি জানে? এরাই বা কারা? ওকে কি কিডন্যাপ করা হয়েছে?

‘কী একে চিনতে পারছ?’ লোকটা আবার প্রশ্ন করে গম্ভীর গলায়।

অম্লান চুপ করে থাকে। জিভটাও অসাড় লাগে।

পিছনের লোক দুটো সামনের লোকটার কাছে এগিয়ে আসে। ফিশফিশ করে নিজেদের মধ্যে কী একটা আলোচনা করে। সামনের লোকটা খানিকবাদে অম্লানকে বলে, ‘ঠিক আছে। একটু সময় নাও। আমরা পাঁচ মিনিট বাদে আসছি।’

লোকগুলোকে বেরিয়ে যেতে দেখে অম্লান ক্ষীণকণ্ঠে বলে ওঠে, ‘আচ্ছা, একটু বলবেন আমার কী হয়েছে? আমি এখানে এলাম কী করে?’

যে লোকটা প্রশ্ন করছিল, সে হাত তুলে একটু ধৈর্য ধরতে ইঙ্গিত করে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তা-ও ভালো। একটু একা থাকার সুযোগ, একটু চিন্তা করার সুযোগ পাওয়া গেছে। শুয়ে শুয়ে মাথা ঘুরিয়ে যতটা দেখা যায়, ঘরটা দেখার চেষ্টা করল অম্লান। অদ্ভুত ঘরটা। কিছু নেই ঘরটাতে। একদম ফাঁকা। এমনকী এয়ারকন্ডিশনারেরও কোনো আউটলেট পর্যন্ত দেখতে পেল না। ঘরে যথেষ্ট জোরালো আলো, অথচ কোথা থেকে যে আলো আসছে তা দেখতে পেল না। দেওয়ালগুলোর রং আস্তে আস্তে বদলাচ্ছে। হলদে থেকে সাদা, তারপর কমলা, ফের সাদা। শেষ কী হয়েছিল মাথা ঠান্ডা করে তা ভাবার চেষ্টা করে অম্লান। মন্টে কার্লো—মানে, যেখানে ফর্মুলা ওয়ান কার রেসিং হয়। সেই মন্টে কার্লো থেকেই ফিরছিল অম্লান। স্পষ্ট মনে পড়ছে। মন্টে কার্লোর বিখ্যাত ক্যাসিনো ‘লে ক্যাসিনো ডে মন্টে কার্লো’-তে বেশ খানিকক্ষণ কাটিয়েছিল। সামান্য টাকা বাজি করে পনেরো ইউরো মতো লাভই করেছিল। তারপর বাসে করে লার্গেটো বিচ। বিচটা ছোট, পাথুরে। বিচ থেকে নানান রকম নুড়ি কুড়িয়েছিল বুবলুর জন্য, সেটাও মনে পড়ল। সেখান থেকে বাসে চড়ে, সরু গলি দিয়ে সামান্য হেঁটে রাজার বাড়ি। সেখানে ক্যাফেতে চিকেন পানিনি আর ক্যাপুচিনো খেয়ে ফের সমুদ্রের ধার। এখানে বেশ খানিকক্ষণ কাটিয়েছিল। সমুদ্রের এখানটাতে বিচ নেই। শুধু সারি সারি ইয়ট রাখা। প্রচুর দামি দামি প্রাইভেট ইয়ট। মন্টে কার্লো বড়োলোকেদের জায়গা। এই নৌকো নিয়েই তাঁরা বেরিয়ে পড়েন মাঝেমধ্যে ভূমধ্যসাগরে। আরও খানিকক্ষণ এরকম সমুদ্রের ধারে কাটিয়ে সেখান থেকে হেঁটে মন্টে কার্লো স্টেশন। সেখানে কোনও টিকিট কাউন্টার দেখতে না পেয়ে একজনকে জিগ্যেস করেছিল। সে লোকটা ছিল ফ্রেঞ্চ। বিন্দুমাত্র ইংরেজি বোঝে না। তবে খুব হেল্পফুল। একটা মেশিনের সামনে অম্লানকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে টিকিট কাটতে হয়। কোথায় যাবে, কখন যাবে, কী ক্লাসে যাবে—ফার্স্ট ক্লাসে না সেকেন্ড ক্লাসে—এসব সিলেকশনগুলো পরপর করে নিজে নিজেই টিকিট কাটা যায় এখানে। এভাবেই মন্টে কার্লো থেকে ভেন্টিমিগলিয়া-র টিকিট কেটেছিল অম্লান। ভেন্টিমিগলিয়া হল ইটালি আর ফ্রান্সের বর্ডার।

অম্লানকে যেতে হত ইটালির জেনেভায়। তাই ট্রেন চেঞ্জ করে আবার ভেন্টিমিগলিয়া থেকে জেনেভার ট্রেন ধরতে হত।

এতটা পর্যন্ত ভেবে চিন্তায় বাধা এল। দরজা ফের খুলছে। লোকগুলো ঘরে ঢুকছে। নীল জামার হাতে সেই ছবি। পিছনে বাকি দুজন।

‘একে চিনতে পারছ?’—ফের একই প্রশ্ন। ছবিটা এবার অম্লানের মুখের সামনে তুলে ধরে লোকটা। কেয়ারফুলি লক্ষ করে অম্লান। দেখেছে বলে তো মনে হয় না। লম্বা মতো মুখ। মোটা ভুরু। ফরসার দিকে রং। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। চোখ ছোট। হিংস্র চাউনি। কানের পাশে লম্বা জুলপি। দু-গালে অজস্র দাগ। মুখটা দেখলেই মনে হয় অন্যদিকে তাকাই।

‘ভালো করে দেখো!’—লোকটা শাসানির সুরে বলে ওঠে।

‘নাহ, দেখিনি।’

‘শিয়োর?’

‘হ্যাঁ, শিয়োর।’

শিয়োর বলল বটে, তবে লোকের মুখ খুব একটা মনে থাকে না অম্লানের। প্রায়শই হয়, যখন কেউ এসে বলে, কেমন আছ অম্লানদা? কবে ফিরলে?’—অম্লান দিব্যি কথা চালিয়ে যায়। শেষে দেখা যায় যে ওর সঙ্গে যে আলাপ করছে সে অম্লানের নাড়িনক্ষত্র জানে, অথচ অম্লান কিছুই মনে করতে পারে না।

‘এ কে?’

লোকটার হাতে একই ডিজিটাল ফ্রেমে আরেকজনের ছবি! দেখে আফ্রিকান মনে হয়, রং যদিও ফরসার দিকে। চুলটা খোঁচা খোঁচা করে কাটা। এক চিলতে দাড়ি। মোটা নাক। কুতকুতে চোখ।

‘হ্যাঁ, একে চিনি।’

‘কোথায় দেখেছ?’

‘ট্রেনে। আমরা একই কেবিনে বসেছিলাম। এর সঙ্গে আরও দুজন ছিল।’

‘এরা?’

লোকটা চট করে পরের ছবিতে চলে যায়। একটা মেয়ে। সোনালি চুল। কাটা কাটা নাক-চোখ। চোখের মণি বাদামি। পাতলা গোলাপি ঠোঁট। বেশ ভালো দেখতে। এর রং বেশ ফরসা।

হ্যাঁ, এও ছিল একই কামরাতে। পরনে ছিল জিনস প্যান্ট, কালো টি-শার্ট, লেদারের জ্যাকেট। হিলওয়ালা লেদারের গামবুট ছিল পায়ে। আরেকটা ছেলে ছিল এদের সঙ্গে। ছোটখাটো চেহারার।’

‘এ কি?’ লোকটা আরেকটা ছবি দেখায়।

‘না, এ নয়।’

‘এ?’ পরের ছবিতে চলে যায় লোকটা। ফরসা মতো মুখ। চওড়া কপাল। ঠোঁটের পাশে কালো আঁচিল। ঘাড় অব্দি লম্বা চুল।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, এ-ই ছিল।’

‘তা তোমরা যাচ্ছিলে কোথায়?’

‘আমি যাচ্ছিলাম ভেন্টিমিগলিয়া থেকে জেনেভা-ব্রিগনোলে। এরা ভেন্টিমিগলিয়াতে একসঙ্গে উঠেছিল। তবে কোথায় যাচ্ছিল তা বলতে পারব না। ট্রেন তো মিলান অব্দি যাচ্ছিল। তা জেনেভা অব্দি…’

বলতে গিয়েও অম্লান থেমে যায়। আর যে কিছুই মনে পড়ছে না। জেনেভাতে ও নিজেই কি নেমেছিল? লেভান্টে, স্যাডোনা, এই স্টেশনগুলো পেরিয়ে গিয়েছিল মনে আছে। ইটালির রিভিয়েরা এলাকা। রেললাইনের একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে পাহাড়। সমুদ্রের পাশ দিয়ে ট্রেন চলছিল টানেলের মধ্যে দিয়ে লুকোচুরি খেলতে খেলতে। সমুদ্রের ধারের আলোর সারি মাঝেমধ্যে টানেলের অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছিল। অন্ধকারে বাইরের প্ল্যাটফর্মগুলো ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। তবু এ স্টেশনগুলো চোখে পড়ছিল। অ্যানাউন্সমেন্টও হয়েছিল। ওরা কেবিনের আলোটাও নিভিয়ে দিয়েছিল। সেলফোনে একটা অন্য ধরনের গান চলছিল। আফ্রিকার মনে হয়। কিন্তু তারপর? অ্যাবসলিউটলি ব্ল্যাঙ্ক!

‘ওরা কী ভাষায় কথা বলছিল?’

‘ইটলিয়ান নয়। বোধহয় আফ্রিকার কোনো ভাষায়। মরোক্কান কি অ্যারাবিক হবে হয়তো।’

‘কেন মরোক্কান ভাষা তুমি জানো বুঝি?’

‘না, মরোক্কান ভাষা জানি না। তবে ইটালিয়ান ভাষা খানিকটা জানি। অন্তত এটুকু বলতে পারি যে, ওরা ইটালিয়ান ভাষায় কথা বলছিল না। অ্যারাবিক ভাষা বলেই মনে হল।’

‘তা ইটালিয়ান ভাষা জানলে কী করে?’

‘আমি গত দেড় মাস তো ইটালিতেই ছিলাম। তাই অন্তত বেসিক কয়েকটা কথা শিখে গেছি। ‘চাও’, ‘পরন্তো’, ‘বেনে’, ‘অ্যারেবিদার্চি, বোঞ্জোরনো’—এসব কথা ঘুরে ফিরে ওরা বলে। এরকম কোনো শব্দ ওরা সেদিন ব্যবহার করেনি।’

‘ইটালিয়ান নয় তা বুঝলাম, কিন্তু ওরা যে মরোক্কান তা বুঝলে কী করে?’

অম্লান বুঝতে পারল যে পুলিশি জেরা চলছে। প্রত্যেকটা কথা খেয়াল করে বলতে হবে। মরোক্কান বলাটা ভুল হয়েছে। ওদের মরোক্কান ভাবার কোনো কারণই নেই। নেহাতই ও শুনেছিল যে, আফ্রিকার মরোক্কো এলাকার লোকেরা ফরসা হয়। আর এটুকুও জানে যে, ইটালির এই এলাকাতে অনেক মরোক্কান থাকে।

অম্লানকে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটা আবার প্রশ্ন করে ওঠে, ‘তুমি ওদের আগে চিনতে?’

‘না।’

‘ঠিক করে ভেবে দেখো। ওদেরকে আগে কোথাও দেখেছিলে কি?’

‘না।’

আমরা যদি বলি যে তুমি ওদেরকে আগে থেকেই চিনতে। যদি প্রমাণ দেখাই?’ একটু চুপ থেকে লোকটা ফের বলে ওঠে, ‘কয়েকদিন আগে ইটালির সিনকোয়াতেরার মরেস্যোতে ওদের সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিল। ট্রেন স্টেশনের পাশে একটা ক্যাফেতে তোমরা বসেছিলে।’

হ্যাঁ, আমি গিয়েছিলাম বটে, কিন্তু সত্যিই ওদের খেয়াল করিনি! ট্রেনে যখন দেখেছিলাম, তখন একই কেবিনে ওদের সঙ্গে থাকতে আমার একটু অস্বস্তিও হচ্ছিল।’ একটু থেমে ভেবে নিয়ে অম্লান বলে ওঠে, ‘আমি ওদের দেখে অন্য একটা কেবিনে গিয়ে বসি। পরে সে কেবিনে আগের থেকে রিজার্ভ করা লোক ওঠায় আবার আমার সিটে ফিরে আসি। ওদের কথাবার্তা-ব্যবহারে কেমন যেন উগ্রতা ছিল। যেমন, আমাকে না জিগ্যেস করে কেবিনের আলো নিভিয়ে দিল। জোরে জোরে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। ফোনে গান চালিয়ে দিল। কেবিনের ওপর দিকে একটা র‌্যাক ছিল। ওটা ধরে টানাটানি করছিল’…একটু থেমে অম্লান আবার বলে ওঠে, ‘তা ওরা কি কোনো গন্ডগোল করেছে?’

কোনো উত্তর না দিয়ে লোকটা ফের প্রশ্ন করে, ‘তারপর কী হয়েছিল মনে পড়ে?

অম্লান চুপ করে থাকে।

‘মনে পড়ছে না? নাকি বলবে না?’

‘নাহ, আমার আর কিছুই মনে পড়ছে না।’

পিছনের একটা লোক এগিয়ে আসে, ‘রোমে, ভ্যাটিকান সিটিতে যাওয়ার কথাও মনে পড়ছে না?’—বলে আঙুল দিয়ে সামনের দেওয়ালের দিকে নির্দেশ করে। দেওয়ালটাতেও একটা ছবি ফুটে ওঠে।

এ কী! এ তো অম্লান। ওর পাশে ট্রেনের সেই মেয়েটা।

অম্লানের মুখ থেকে বিস্ময়সূচক শব্দ বেরিয়ে আসে।

ওরা একটা বড়ো চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে-পিছনে অগুনতি মাথা। ছবিটা যে ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার স্কোয়ারের, তা বুঝতে সময় লাগল না অম্লানের। কিন্তু এখানে ও কী করে গেল, তাও ওই মেয়েটার সঙ্গে।

‘কী পুরো ভিডিয়োটা দেখাব? নাকি তার আগেই কিছু বলবে?’

‘না, এটার কথা তো কিছুই মনে পড়ছে না। এটা কবের ঘটনা? ওই ট্রেনে ওদের সঙ্গে দেখা হবার পরে?’

‘ডেভিড, ওর ব্রেন ম্যাপিং দেখো তো!’

সামনের নীল জামা লোকটা কার উদ্দেশে কথাটা বলল বোঝা গেল না। ঘরের দুজন লোকের রি-অ্যাকশন দেখে মনে হল, ডেভিড অন্য কেউ, ঘরের বাইরে কোথাও আছে।

লোকটা আবার অম্লানকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘তোমার প্রত্যেকটা কথা সত্যি না মিথ্যে আমরা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যাচ্ছি। তোমার ব্রেন ম্যাপিং চালু আছে, মিথ্যে বলার ফল যে ভালো হবে না, তা না বললেও চলবে।’ একটু থেমে ফের নীল জামা বলে ওঠে, ভ্যাটিকান সিটিতে যাওয়ার প্ল্যানটা কি তোমার ছিল?’

‘আমার কিছুই মনে পড়ছে না!’

‘প্রশ্নের ঠিক উত্তর দাও। সঙ্গের ওই মেয়েটার নাম কী ছিল?’

‘জানি না।’

‘তোমরা কি কোনো বিশেষ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলে?’

‘না। আচ্ছা, ঘটনাটা কী হয়েছিল তা একটুও না বললে আমি বলব কী করে? আমার সত্যিই কিছু মনে নেই।’

লোকটা দ্রুত হাতের তালুতে রাখা মনিটরে ব্রেন ম্যাপিং যন্ত্রের রেজাল্ট দেখে নিল। রেজাল্ট সব পজিটিভ। অম্লান মিথ্যে বলছে না। একটু অবাক হয়ে পাশের লোক দুটোর সঙ্গে কী কথা বলে নিল।

‘সেদিন তোমরা পোপের বক্তৃতার সময়ে পোপকে হত্যা করেছিলে। দিনটা ছিল ২৫ ডিসেম্বর। যথারীতি হাজার হাজার লোকের জমায়েত হয়েছিল সেন্ট পিটার স্কোয়ারে, চার্চের সামনে। দশটার সময় পোপ বলতে শুরু করেন, আর ঠিক পাঁচ মিনিট বাদে তোমরা ওঁকে হত্যা করো।’

হতবাক হয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে অম্লান। কোনোরকমে বলে ওঠে, ‘আ-আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি হঠাৎ পোপকে হত্যা করতে যাব কেন? আমি তো জেনিভা এসেছিলাম আমার ব্যবসার কাজে। আর পাঁচদিন বাদেই ফিরে যাওয়ার কথা। ইনফ্যাক্ট ২৫ ডিসেম্বরেই আমার ভারতে ফেরার কথা!’ একটু থেমে অম্লান বলে ওঠে, ‘এই ঘটনার কথা কি আমার বাড়িতে জানে?’

নীল জামা এতক্ষণে নিজের নাম বলে, ‘আমার নাম সাইমন। এ ঘটনার কথা তোমার বাড়ির লোক কেন, সারা পৃথিবীর লোক জানে।’

‘আমি আমার বাড়ির লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই। আমি সঠিক বিচার চাই! আমাকে অহেতুক ফাঁসানো হচ্ছে। আমি আমার লিগ্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ চাই!’

‘সেটা বোধহয় একটু দেরি হয়ে গেছে।’ সাইমন কুটিল হেসে বলে, ‘তবে তোমার বাড়ির লোকেদের অনুরোধেই এ কেস রি-ওপেন করা হয়েছে। ওদের ধারণা তোমাকে এ কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তুমি নিরপরাধ। সারা পৃথিবী আজ তোমাকে অপরাধী বলে জানলেও ওরা তা মানতে নারাজ।’

‘কিন্তু আমি যে কাজই করিনি, তার জন্য।…’

লোকটা অম্লানকে থামিয়ে দেয়। আবার দেওয়ালে ছবি ফুটে ওঠে আঙুলের নির্দেশে। ওই একই স্কোয়ার। অম্লানকে আর সঙ্গের মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে। ওরা এখন একদম সামনের সারিতে। পোপ খানিকটা দূরে সেন্ট পিটার চার্চের সামনে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু বলছেন। চারদিকের বড়ো বড়ো মনিটারে পোপকে দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ অম্লানকে দেখা গেল সামনের দিকে ছুটে এগিয়ে যেতে। কয়েকজন সিকিয়োরিটি গার্ড অম্লানকে ধরতে ছুটে এল। অম্লান তাদের এড়িয়ে দ্রুত পোপের জন্য ঘিরে রাখা জায়গায় চলে এল। দুজন সিকিয়োরিটি অম্লানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল। কিন্তু তার আগেই একটা বিশাল বিস্ফোরণ। অম্লানকে ঘিরে একটা ধোঁয়ার বলয়। সেন্ট পিটার চার্চের স্তম্ভগুলোসুদ্ধ কেঁপে উঠেছে। পোপের জন্য তৈরি ঘেরা জায়গাটা ভেঙে পড়েছে।

সাইমন বলে ওঠে, ‘বুঝতেই পারছ, তুমিই হলে সুইসাইড বম্বার। সন্দেহ নেই যে তুমিই পোপের হত্যাকারী। শুধু যে পোপকেই তুমি হত্যা করেছিলে তাই-ই নয়। সেদিন কয়েকশো সাধারণ লোক এ ঘটনায় মারা যায়। এই ঘটনার জন্য নানান দেশে অশান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল। ধর্মযুদ্ধ লেগে গিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ লোক তাতে মারা যায়। আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। অল থ্যাংকস টু ইউ।’

অম্লান অবাক হয়ে বলে ওঠে, ‘আমি তাহলে বেঁচে আছি কীভাবে?’

সাইমন মুচকি হেসে বলে ওঠে, ‘দেড়শো বছর কেটে গেছে। শুধু ঘটনাটা কী ঘটেছিল, তুমি সত্যিই যুক্ত ছিলে কিনা, তা জানতে তোমাকে খানিকক্ষণের জন্য বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে। এ প্রযুক্তি আগে আমাদের কাছে ছিল না। এখন শুধু তোমার ব্রেন চালু আছে। তোমার পরিবার কখনোই তোমাকে দোষী হিসেবে বিশ্বাস করতে চায়নি। এমনকি এই ছবি দেখার পরেও তাদের ধারণা ছিল তোমাকে বাধ্য করা হয়েছে।’

একটু থেমে সাইমন নরম গলায় ফের বলে, ‘এখন আমরাও বিশ্বাস করি যে তুমি আসলে দোষী নও। তোমাকে বাধ্য করা হয়েছিল।’

কান্নায় অম্লানের গলা বুজে আসে, ‘কিন্তু আমাকে ওরা এ কাজ করতে বাধ্য করল কীভাবে? আমার তো শুধু ওই ট্রেনের পথটাই মনে পড়ছে। তারপরে কী হয়েছে তা কিছুতেই মনে পড়ছে না। আর পুরো ব্যাপারটাই মনে হচ্ছে যেন কালকের ঘটনা।’—একটু থেমে ফের ধরা গলায় অম্লান বলে ওঠে, ‘বুবলুর জ্বর হয়েছিল। ইন্ডিয়াতে তখন রাত একটা। আমি ফোনে কথা বলছিলাম। তারপর—তারপর আর মনে নেই।’

‘তোমাকে ওরা ব্যবহার করেছিল। কারও ব্রেনে চিপ বসিয়ে দূর থেকে তাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা আমরা জানতে পারি এ ঘটনার বছর পাঁচেক বাদে। কিন্তু যখন এর বিচার হয় তখন আমরা তা ভাবতেও পারিনি। আসল দোষীরা ছাড়া পেয়ে যায়। এখন তো বিজ্ঞান আরও অনেক এগিয়ে গেছে। আমাদের ধারণা ওরকমই কিছু তোমার সঙ্গে করা হয়েছিল। তোমাকে ওরা দূর থেকে কন্ট্রোল করছিল। অপরাধ জগতের সঙ্গে তোমার কোনো যোগাযোগ ছিল না বলেই ওরা তোমাকে ব্যবহার করেছিল। যাতে আগে থেকে কেউ টের না পায়। যখন তোমার বিচার হয়, তখন এসব প্রযুক্তি সম্বন্ধে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। তাই সবার ধারণা হয় যে তুমিই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলে।’

আচ্ছা, মিনু, বুবলু—ওরা ভালো…?’ প্রশ্নটা করতে গিয়ে থেমে যায় অম্লান। দেড়শো বছর আগের কথা। কে আর ওদের খবর রেখেছে?

‘আমি তোমারই বংশধর। তোমার ছেলে আমার ঠাকুরদা ছিলেন। তাই তো আমি এ কেসটার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আশা করি, আমরা এভিডেন্স থেকে তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারব। সারা পৃথিবী আর তোমাকে দোষ দেবে না, ঘৃণার চোখে দেখবে না। তোমাকে আর কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রেখে আমরা কষ্ট দেব না। বিদায় দাদামশাই।’

অম্লানের চোখের সামনে বুবলুর হাসিভরা মুখটা ভেসে ওঠে। স্পষ্ট যেন ওর ডাক শুনতে পায়। এ যেন ঠিক কালকের ঘটনা। তারপর বুবলুর মুখটা মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। টানেলের থেকেও ঘন অন্ধকারে।