Course Content
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
0/18
ভৌতিক অলৌকিক – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

কম্পিউটারের অদ্ভুত তিন ভবিষ্যদবাণী – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

কম্পিউটারের অদ্ভুত তিন ভবিষ্যদবাণী

প্রত্যেক শনিবারের মতো এই শনিবারেও আমরা সবাই জমায়েত হয়েছি। আমাদের শনিবারের আসরে আজ সবার আলোচনা শঙ্করের হাতকে ঘিরে। একটু খুলে বললে ওর হাত দেখাকে ঘিরে। এবারও শঙ্কর ক্লাস সিক্সে ফেল করেছে। এই নিয়ে পরপর দুবার। ওর বাবা প্রথমে শিক্ষক, তারপরে ডাক্তার, সবশেষে এখন গণৎকারের শরণাপন্ন হয়েছেন।

গণৎকার বলেছেন, আরও বছর তিনেক শঙ্করের এরকম শনির দশা চলবে। অথাৎ আগামী তিনবছর শঙ্করের পক্ষে ক্লাস সিক্সের ওপরে ওঠা মুশকিল। তাই বেশ মুষড়ে পড়েছে শঙ্কর। বিশ্বজিৎ, মিলন, সত্যেনদা, সবিতা সবাই মিলে ওকে ঘিরে বসে ওর হাত নিয়ে গবেষণা করছে।

মিনিট পাঁচেক বাদে বিশ্বজিৎদা বিজ্ঞের মতো মুখ করে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলে উঠল,—ঠিকই বলেছে। আরও বছর তিনেক।

আমরা শঙ্করের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে কীভাবে সান্ত্বনা দেব ভাবছি, ওদিকে দেখি এরকম শোকগম্ভীর পরিবেশে অনিলিখা এককোণে বসে মুচকি মুচকি হেসে যাচ্ছে।

কী ব্যাপার অনিলিখা? শঙ্করের এই অবস্থা আর তুই হাসছিস? তুই কি হাতদেখায় বিশ্বাস করিস না?—বিশ্বজিৎদা বলে ওঠে।

অনিলিখা হেসে বলল,—হাত দেখায় বিশ্বাস করি না মানে? আলবত করি। তবে হ্যাঁ, তোমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে আমার ফ্র্যাঙ্ক অ্যান্টনির কথা মনে পড়ে গেল।

—ফ্র্যাঙ্ক অ্যান্টনি! সে কে?

—ফ্র্যাঙ্ক অ্যান্টনি আমারই সঙ্গে হার্ভাডে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত। ওর স্ট্রিম অবশ্য আলাদা ছিল। আমি ছিলাম ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ আর ও ছিল কম্প্যুটার সায়েন্সে। হার্ভাড-এ কম্প্যুটার সায়েন্স মানে তো বুঝতেই পারছো। সারা পৃথিবীর সবথেকে কৃতি ছাত্ররা ওখানে পড়ার সুযোগ পায়। ফ্র্যাঙ্ক ছিল স্পেনের ছেলে। জীবনে কখনও কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়নি। স্পেনে স্কুলজীবন শেষ করে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় সারা দেশের মধ্যে প্রথম হয়ে হার্ভাডে পড়তে এসেছে। অবশ্য হার্ভাডে ও দ্বিতীয় বা তৃতীয় হত। কারণ এখানে ওর মতো আরও বেশ কয়েকজন এসেছে।

ওর আরেক পরিচয় ডেরিক অ্যান্টনির ছেলে হিসাবে। ডেরিক অ্যান্টনির নাম নিশ্চয়ই শুনে থাকবে। বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতিষী। স্পেনে ওর কাছে হাত দেখাতে বিশ্বের নানাপ্রান্ত থেকে লোক এসে হাজির হয়। অবশ্যই ওনাকে হাত দেখায় যারা, তাদের অধিকাংশই কোটিপতি।

আমাদের ফাইনাল ইয়ারে একটা প্রাোজেক্ট করতে হত। প্রাোজেক্টের জন্যে দুমাস ছিল। যে যার নিজের মতো প্রাোজেক্ট ঠিক করত। তার দুমাস পরেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শেষ পরীক্ষা। আমার প্রাোজেক্ট ছিল রোবোটিক্সের ওপর। মোটামুটি কার কী প্রাোজেক্ট আমরা সেটা আগেই জেনে গেছলাম। খালি ফ্র্যাঙ্কের প্রাোজেক্টটা কী, তা আমরা কেউ জানতাম না। আমরা বেশিরভাগই প্রাোজেক্টকে অপেক্ষাকৃত হালকাভাবে নিই।

কিন্তু ওর ক্ষেত্রে অন্যরকম শোনা গেল। ও নাকি দিনরাত ঘরের দরজা বন্ধ করে ওর প্রাোজেক্টের কাজ করে চলেছে। গিয়ে দু-একদিন দেখেছি ঘরে ওর পার্সোনাল কম্প্যুটারে সমানে কাজ করে চলেছে। পাশে রাশি রাশি কাগজ। তার ওপর হরেকরকম হাতের ছাপ। একমাস পরে ওর প্রাোজেক্টটা ঠিক কীসের ওপর, সেটা বুঝলাম। ও এমন একটা সফটওয়্যার তৈরির চেষ্টা করছে, যা নির্ভুলভাবে কারোর অতীত ও ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে।

আমরা অনেকেই প্রথমদিকে এরকম অদ্ভুত প্রাোজেক্ট নিয়ে হাসিঠাট্টা করতাম। কীই যে অহেতুক সময় নষ্ট করা! কিন্তু দেড়মাস পরে ও একদিন এসে আমাদের কাছে সদর্পে ঘোষণা করল, ওর প্রাোজেক্ট নাকি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেসফুল। এভাবে যে ও সফল হবে, নিজেও আগে আশা করতে পারেনি। ও প্রায় একশো জনের ওপর ওর সফটওয়্যার পরীক্ষা করেছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ওর কম্পিউটার নির্ভুলভাবে ওদের অতীত বলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কয়েকজনের ক্ষেত্রে যা ভবিষ্যদবাণী করেছিল, তাও পুরোপুরি মিলে গেছে।

কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম ও মিছিমিছি বড়াই করেনি। এর মধ্যেই প্রায় আরো জনা পাঁচশো ওর কম্পিউটারে হাত দেখিয়ে গেছে। তাদের সবারই একমত যে ওর কম্পিউটার হাত দেখায় বিশ্বের সেরা গণৎকারদেরও হার মানায়।

কিছুদিন বাদে আমিও হাত দেখাতে গেলাম। সঙ্গে ছিল আমার জনাছয়েক বন্ধু। তাদের মধ্যে ইকারি কুরোশাওয়াও ছিল। ইকারি কুরোশাওয়া সম্বন্ধে তোমাদের একটু বলে রাখা দরকার। কুরোশাওয়া জাপানের লোক। ম্যাথামেটিকাল জিনিয়াস। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ও অঙ্কের কিছু অজানা সূত্র আবিষ্কার করেছিল। ক্লাস টুয়েলভে ও কম্পিউটারে কৃত্রিম বুদ্ধির ওপর এমন কিছু কাজ করেছিল যাতে পুরো জাপানে সাড়া পড়ে যায়। হার্ভাডে এসে এই চারবছরেই নিয়মিত পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে কিছু অসাধারণ গবেষণার মাধ্যমে ও সবার নজর কেড়েছে। হার্ভাডে কম্পিউটার সায়েন্সে এ-পর্যন্ত প্রতিবারই ও প্রথম হয়ে এসেছে। অসাধারণ অধ্যবসায় ও প্রতিভার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ বললেও ওর সম্বন্ধে কম বলা হয়।

আমরা ফ্র্যাঙ্কের ঘরে গিয়ে দেখি, যথারীতি ওর ঘরে বিশাল জমায়েত। আজকেও এত লোক যে হাত দেখায় বিশ্বাস করে তা না দেখলে বিশ্বাস হত না। আমরাও তাদের দলে সামিল হলাম। ফ্র্যাঙ্ক সবাইকে একটা স্ক্যানারের ওপর হাত রাখতে বলছে। স্ক্যানার হাতের ছাপ তুলে নিয়ে কম্পিউটারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কম্পিউটার মিনিট তিনেক বাদে পাশে রাখা লেসার প্রিন্টারের মাধ্যমে তার অতীত ও ভবিষ্যৎ প্রিন্ট করে দিচ্ছে। একে একে আমরাও হাত দেখালাম।

আর সেখানেই ঘটনার শুরু। কম্পিউটার সম্ভবত এই প্রথম এমন তিনটে ভবিষ্যদবাণী করল যা বিশ্বাস করা এককথায় অসম্ভব।

প্রথমটা ছিল আমার সম্বন্ধে। আমার অতীত সম্বন্ধে বলতে যথারীতি কম্পিউটার কোনও ভুল করেনি। ভবিষ্যতে আমি যে নিজের দেশে ফিরব, ফিরে কোন কলেজে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকব এসবই কম্পিউটার তখনই বলে দিয়েছিল। আমার জীবনে আটটা ভীষণ বিপদ হবে, কবে কবে হবে তাও জানিয়েছিল। তারমধ্যে চারটে তো ইতিমধ্যেই মিলে গেছে।

কিন্তু কম্পিউটারের লেখাকে বিশ্বাস করতে পারলাম না, যখন দেখলাম ওতে পরিষ্কার লেখা আছে যে আমি কোটিপতি। এবং আমি নাকি আর মোটে দু-মাস কোটিপতি থাকব। এরপরে এ ব্যাপারে বিশ্বাস না করলেও খানিকটা মজার জন্যই খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম। আমার এক কাকা শিকাগোতে বহুদিন আছেন। প্রচুর রোজগার করলেও বিয়ে করেননি। মৃত্যুর পর ওনার সমস্ত সম্পত্তি আমারই পাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা নয়। খোঁজ নিয়ে দেখলাম যে আমি কোটিপতি হওয়া তো দূরের কথা, লাখপতিও নই।

এই পর্যন্ত বলে অনিলিখা মিনিট দুয়েক চুপ করে রইল।

তাহলে এ গণনাটা মেলেনি?—বিশ্বজিৎদা জিজ্ঞাসা করে উঠল।

—এ ব্যাপারে কী হয়েছিল সেটা আমি পরে বলব। আপাতত আমি কম্পিউটারের দ্বিতীয় অদ্ভুত ভবিষ্যদবাণী সম্বন্ধে বলি। দ্বিতীয়টা ছিল কুরোশাওয়া সম্বন্ধে। ও নাকি তিনমাসের মধ্যে কোনও একজনকে খুন করবে এবং সেই কারণে ওর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে। কুরোশাওয়ার মতো ঠান্ডা মাথার ছেলে কাউকে খুন করবে এটা নেহাত পাগল ছাড়া কেউ বলবে না। আমরা এটাও যথারীতি হেসে উড়িয়ে দিলাম। এক কুরোশাওয়া ছাড়া। কারণ ওর অতীত সম্পূর্ণ নিভুর্লভাবে কম্পিউটার বলে দিয়েছে। তা ছাড়া ও এ-ব্যাপারে সামান্য বিশ্বাসও করে।

এরপরে কুরোশাওয়াকে যেভাবে ভেঙে পড়তে দেখলাম, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। রোজ একবার করে ও আসে, আর ফ্র্যাঙ্কের কম্পিউটারে হাত দেখায়। প্রত্যেকবারই দেখা যায় কম্পিউটার সেই একই ভাগ্যগণনা করে বলছে। ওর ঘরে গেলে দেখি, হয় ও হাতের রেখার ওপর বই পড়ছে, নয়তো জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ও ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে কিসব আকাশপাতাল ভাবে, কে জানে! আমাদের অজস্র আশ্বাসও ওকে শান্ত করতে পারে না। ওর চেহারা ধসে পড়ল। আমরা ডাক্তারের কাছে ছুটলাম। উনি আরেকজন নামি সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে ওকে পাঠিয়ে দিলেন। এই ডাক্তারের চিকিৎসাতেও কুরোশাওয়ার মানসিক অবস্থার কোনও উন্নতি হল বলে মনে হয় না। উত্তরোত্তর ওর অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকল।

শেষ পর্যন্ত ওকে কিছুদিনের জন্য দেশে যেতে ডাক্তার পরামর্শ দিলেন। দেশ থেকে একমাস পরে যখন ও ঘুরে এল, তখনও আরও শুকিয়ে গেছে। চোখের তলায় অজস্র কালো আঁচড়। পরিষ্কার ঘুম না হওয়ার চিহ্ন। অথচ আর মাত্র দশদিন বাদে আমাদের শেষ ও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সেমিস্টার পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। কুরোশাওয়ার পড়াশোনার সঙ্গে কোনও যোগাযোগই নেই। খালি ওই এক চিন্তা। কথাবার্তাও কেমন যেন রুক্ষ হয়ে গেছে। আরও কয়েকদিন পর ওর শরীর এতটাই খারাপ হল যে ওকে হাসপাতালে ভরতি করতে হল। সেমিস্টারের দুটো পরীক্ষা ও দিতে পারল না। যে ছেলের প্রথম হবার কথা ছিল, সে কোনওরকমে পাস করে বেরোল। কী ভাগ্য!

অনিলিখা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কিন্তু ওর ক্ষেত্রেও তো ভাগ্যগণনা মিলল না। তাই না? এ জন্যই হাত দেখাতে নেই।—মিলন বলে ওঠে।

শঙ্করের মুখে একটু হাসির ভাব ফুটে উঠেছে দেখলাম।

অনিলিখা বলে ওঠে,—দাঁড়াও, আমাকে শেষ করতে দাও। এবার আমি প্রথমে আমার ভাগ্যগণনা নিয়ে বলি। আমি তো আগেই বলেছি যে অনেক খোঁজখবর নিয়েও কোনও হদিশ করতে পারিনি যে কীভাবে আমি কোটিপতি হলাম। তা, এর বছর চারেক বাদে আমি ভারতে ফিরে আসি। তাও প্রায় মাসছয়েক হতে চলল। দুমাস আগে আমি আমার বাবার ডায়েরি ঘাঁটতে গিয়ে দেখি, একটা লটারির টিকিট। ভুটান বাম্পার লটারি। পুরস্কার মূল্য দেড় কোটি টাকা। বাবাকে জিজ্ঞাসা করতে বাবা বললেন যে, উনি ওটা আমার জন্য জন্মদিন উপলক্ষ্যে কিনেছিলেন। যখন রেজাল্ট বেরোয়, তখন ওই টিকিটটাই খুঁজে পাননি।

আমি নেহাত কৌতূহলবশে ওই টিকিটের ব্যাপারে ওই লটারির সংগঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। জানতে পারি যে আমার অনুমান ঠিক। ওই টিকিটটাই দেড় কোটি টাকার প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল। কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য যে আজ আমি আর ওই অর্থমূল্য পাব না। লটারিতে পুরস্কার পাবার দু-মাস পর্যন্ত ওই অর্থমূল্য দাবি করা যায়। অর্থাৎ ওই ভবিষ্যদবাণীর ঠিক দু-মাস পরে অবধি ওই টিকিটের অর্থমূল্য আমি দাবি করতে পারতাম। অর্থাৎ ওই সময় আমি সত্যিই কোটিপতি ছিলাম। ভবিষ্যদবাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল।

অনিলিখা থামতেই বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বিশ্বজিৎদা। যেন ওটা পেলে কোটিপতি অনিলিখা নয়, বিশ্বজিৎদাই হত।

মিনিট দুয়েক নীরবতার পর অনিলিখা ফের বলে উঠল,—এবার দ্বিতীয় ভবিষ্যদবাণীর প্রসঙ্গে আসা যাক। কুরোশাওয়া কোনওরকমে পাস করল সে তো আগেই বলেছি। ফ্র্যাঙ্ক কম্পিউটার সায়েন্সে গোল্ডমেডেলিস্ট হল। সেই আনন্দে ও একটা পার্টি দিল। তাতে অবশ্য কুরোশাওয়া যেতে পারেনি। কারণ ওর তখন যাওয়ার মতো মন বা শরীরের অবস্থা ছিল না। তা সেদিন পার্টিতে রাত যত বাড়ে ফ্র্যাঙ্কের নেশাও তত বাড়ে।

রাত যখন বারোটা, ফ্র্যাঙ্ক তখন নেশার মধ্যেই বলে উঠল,—বুঝলে অনিলিখা প্রথম হতে গেলে খালি প্রতিভাবান হলেই চলে না; কূটবুদ্ধিও রাখতে হয়। বুঝলে, ফ্র্যাঙ্ক জীবনে কখনও দ্বিতীয় হতে শেখেনি। তা সেই আমাকে ওই কুরোশাওয়াটা তিন-তিনবার প্রথম না হতে দিয়ে ভেবেছিলটা কী? ইউনিভার্সিটির গোল্ড মেডেলিস্ট ও হবে? সে গুড়ে বালি। এবার আমি কীভাবে এটা ছকেছিলাম, সেটা বুঝিয়ে তোমাকে বলি। প্রথমেই আমার হাত দেখার সফটওয়্যার সম্বন্ধে বলতে হয়। আমি জানতাম, কুরোশাওয়া হাত দেখায় বিশ্বাস করে। তাই ওকে বিভ্রান্ত করার জন্যে সফটওয়্যারের পরিকল্পনা করি। আমি প্রায় হাজারদশেক হাতের ছাপ সংগ্রহ করেছিলাম। তাদের সারাজীবনের যাবতীয় দরকারি তথ্য বাবাই আমাকে দিয়েছিল। আমি সেই তথ্য কম্পিউটারের মেমারিতে ঢোকাই। আমি সফটওয়্যার লিখেছিলাম মূলত ‘প্যাটার্ন রেকগনিশন’-এর ওপর নির্ভর করে।

অর্থাৎ নতুন কারো হাতের ছাপ পেলে কম্পিউটার দেখত তার প্রত্যেকটা রেখা আগের দশ হাজার হাতের রেখার কোন কোনটার সঙ্গে একরকম বা কাছাকাছি। তারই ওপর নির্ভর করে পুরোনো তথ্যের সাহায্যে অতীত ও ভবিষ্যদবাণী করত। এতে অল্পবিস্তর ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। শুধু কুরোশাওয়ার ক্ষেত্রেই আমি সম্পূর্ণ অন্য উপায় ঠিক করেছিলাম। আমি কুরোশাওয়ার হাতের ছাপ আগেই জোগাড় করেছিলাম। ওর অতীত আমার জানাই ছিল। তার সঙ্গে ওর সম্পর্কে মনগড়া ভবিষ্যৎ লিখে কম্পিউটারের তথ্যশালায় রাখি। এবার কুরোশাওয়া যখনই হাত দেখাতে আমার কাছে আসত, কম্পিউটার হুবহু একইরকম হাতের ছাপ পেয়ে যেত এবং অন্য কোনও তথ্যের ওপর নির্ভর না করে আমার লেখা ভবিষ্যৎ প্রিন্ট করত।

আমি জানতাম, ও সরলমনে আমার ভবিষ্যদবাণীকেই ঠিক মেনে নেবে। বিশেষত ও যখন দেখবে ওর সম্বন্ধে কম্পিউটার নির্ভুলভাবে অতীত বলে দিয়েছে, তখন ভবিষ্যতের বেলাতেও নির্ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। আমি জানতাম ও এসব ভবিষ্যদবাণীর কথা ভেবে পড়াশোনাতে মনোযোগ হারাবে। আর আমি সহজেই আমার কাজ হাসিল করতে পারব। কী সহজ অঙ্ক!

বলে ফ্র্যাঙ্ক খলখল করে হাসতে থাকল।

আমার সারা শরীর ফ্র্যাঙ্কের প্রতি ঘেন্নায় শিরশির করে উঠেছিল। তখখুনি আমি পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। এর দিনদশেক পরে ওর দ্বিতীয় ভবিষ্যদবাণীও মিলে গেল। কুরোশাওয়া সত্যিই খুন করল। কাকে জানিস?

ফ্র্যাঙ্ক অ্যান্টনিকে?—আমি বলে উঠলাম।

—হ্যাঁ, ঠিকই ভেবেছিস। আমার মুখ থেকে সব কিছু শোনার পর কুরোশাওয়া যে এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, তা আমিও ভাবতে পারিনি। আমেরিকার দণ্ডবিধি অনুযায়ী কুরোশাওয়ার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। অবশ্য ওকে বেশিদিন কষ্ট পেতে হয়নি। একবছর আগে জেলেই মারা যায়। তবে মারা যাবার আগে ও আমাদের সবার জন্যে লিখে রেখে গেছে একটা অসাধারণ বই—ম্যাথামেটিক্স বিহাইন্ড পামিস্ট্রি।

বলে অনিলিখা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,—যাই এবার উঠি। অনেক রাত হল।

বিশ্বজিৎদা লাফিয়ে ওঠে,—তুমি তো তৃতীয় অদ্ভুত ভবিষ্যদবাণী সম্বন্ধে কিছুই বললে না?

অনিলিখা মুচকি হেসে বলে ওঠে,—তৃতীয় ভবিষ্যদবাণীটা ছিল ফ্র্যাঙ্ক অ্যান্টনির নিজের সম্বন্ধেই। কম্পিউটার বলেছিল যে ওর আয়ুরেখা আর মাত্র মাসতিনেক। ওর সফটওয়্যার এক্ষেত্রে কোনও ভুলই করেনি।