প্রাচীন মুদ্রা – মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর
প্রাচীন মুদ্রা
বামুন্দি বাসস্ট্যাণ্ডে যখন নামলাম, তখন বাজে রাত বারোটা চার। বাংলাদেশের পরিবহন মালিকেরা রোডে বাস নামায় জেলা হিসাবে। ঢাকা-সিলেট-চিটাগাং রুটে যাওয়া-আসা করবে নতুন মডেলের হিনো বাস, ঢাকা টু বামুন্দি রাস্তায় চলবে সব থেকে পুরনো ঝরঝরা টাটা মডেল। রেক্সিন ছেঁড়া, স্পঞ্জ বের হওয়া সিটের লিভার ভাঙা। হেলান দিতে গেলে শুয়ে পড়তে হয়। সিটের পেছনের অংশ গিয়ে ঠেকে ব্যাক প্যাসেঞ্জারের গলায়। যাতে বেলাবেলি পৌঁছানো যায়, সেজন্যে আর্লি রওনা হয়েছিলাম। কিন্তু তার পরেও সাত ঘণ্টা লেট। জটিলতা দেখা দিল খলিসাকুণ্ডির কাছে মাথাভাঙ্গা নদী পার হওয়ার পর। বাউট কলেজের দু’জন ছাত্রের সঙ্গে লোকাল বাস-কণ্ডাকটারের ভাড়া নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। বাসের ড্রাইভার কলেজের সামনে না থেমে ছাত্রদের নিয়ে গেছে বাসস্ট্যাণ্ডে। সেখানে তাদেরকে সবার সামনে কান ধরে উঠবস করিয়েছে। এরপর রোড ব্লক, ডিসি, এসপি, লোকাল এমপি, ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন-এসব করতে করতে দিন কাবার। তিন মাইল লম্বা গাড়ির লাইন। ক্ষুধার্ত শিশু, অসহায় নারী, বিষণ্ন পুরুষ, হতাশ বৃদ্ধ, জিম্মি জনগণ-বেকার স্বাধীনতা। বাথরুম জটিলতার কথা আর না-ই বা বললাম।
শত বছরের পুরনো এক রেনট্রিগাছের নিচে তিন-চারটে কালো টিনের দোকান দেখতে পেলাম। ঝাঁপটাপ ফেলে দোকানদাররা অনেক আগেই বাড়ি চলে গেছে। এখন ওগুলোর সামনে কুকুর শুয়ে আছে। গাছের একপাশে আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা। এখান থেকে আমার হাড়াভাঙ্গা যাওয়ার কথা। সম্ভবত ওই কাঁচা রাস্তাটাই হাইওয়ে টু হাড়াভাঙ্গা। বাসস্ট্যাণ্ডে দুই কুকুর আর আমি ছাড়া অন্য কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না। গরু, ঘোড়া, ইত্যাদি অনেক পরের ব্যাপার। হেঁটে যে রওনা হব সে উপায় নেই। এই এলাকায় আমি কোনদিন আসিনি, রাস্তা-ফাস্তা কিচ্ছু চিনি না।
বামুন্দিতে আসার কারণটা বলি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে এমফিল করছি। থিসিসের বিষয়: বাংলাদেশের মধ্য-পশ্চিম অঞ্চলে নীলকর সাহেবদের উত্থান। লাইব্রেরি কিংবা বাসায় ফ্যানের নিচে টেবিল পেতে বসে বিশ-তিরিশটা বই ঘেঁটে; অমুকের এই মত, তমুকের এই ধারণা এসব লিখে পাতার পর পাতা ভর্তি করা; এখানে-সেখানে নিজের মতামত (যদি থাকে), অন্যের তত্ত্ব সমর্থন কিংবা অসমর্থন, দশপাতা লম্বা শ’খানেক বইয়ের গ্রন্থপুঞ্জি দিয়ে ইতিহাস, সাহিত্য এসব বিষয়ে থিসিস লেখা হয়। ব্যস, দাঁড়িয়ে গেল থিসিস, হয়ে গেল ডিগ্রি। হাম কিসিসে কম নেহি।
আমার জীবনে সহজে কিছু হতে চায় না। খুব ছোটখাট কাজেও জী তোড় কোশিশ করতে হয়। একটা উদাহরণ দিই। সত্তর দশকে সরকার ভোজ্য দ্রব্যের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। চাল, গম, তেল রেশন দোকানে গিয়ে রেশন কার্ড দেখিয়ে আনতে হত। সকাল আটটা থেকে দুটো অব্দি স্কুল করে টিচারের মারধর খেয়ে বাসায় ফিরে খেয়ে দেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে বিকেলে মাঠে খেলতে যাব। ভল্ট একদিনের জন্যে তার মামার কাছ থেকে পাঁচ নম্বরী অটোমেটিক বল চেয়ে এনেছে। আজকেই মাঠে নামাবে। আমরা অটোমেটিক বল কোনদিনও খেলিনি সেকালে বলের ভেতর প্রথমে ব্লাডার পুরতে হত। তারপর বলের পেটে জুতোর মত ফিতে পরিয়ে কষে বাঁধতে হত। বল হত মাঝারি তরমুজ, গোলও না লম্বাও না, এক সাইডে টাল খাওয়া। সোজা কখনওই যাবে না। জোরে কিক দিলে এক শ’ আশি ডিগ্রি বাঁক নিয়ে কিকারের কাছেই ফিরে আসবে। বুমেরাঙের চরিত্র। কিন্তু না, এ স্বপ্ন পূরণ হওয়ার নয়। আমাকে কার্ড হাতে বগলে ছালা, মাথায় তেলের ঢপ নিয়ে যেতে হলো রেশন দোকানে। সেখানে আজদাহা সাপের মত লম্বা লাইন। আমি লেজের মাথায়। দু’ঘণ্টা পরে আমি যখন আজদাহার ঠোঁটে, কেরানীর হাতে কার্ড ধরিয়ে দেব, ঠিক তখনই মালিক বলল, ‘আজকের মত রেশন শেষ। ফুড অফিস থেকে ডিও বের করে নতুন মাল আনতে হবে। তিন দিন পরে আসো। এই, খগেন, দোকান বন্ধ কর।’ রেস্ট, খেলা, রেশন কোনটাই হয়নি। জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখো হিসাব-নিকাশ কিছুই রবে না।
মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমার কপালে যে সুপারভাইয়ার জুটল, তিনি গাম্ভীর্যে ঈশ্বর চন্দ্র, কঠোরতায় আওরঙ্গজেব। যা-ই লিখি, তাঁর পছন্দ হয় না, ‘সবই তো অন্যের কথা, তোমার নিজের বক্তব্য কোথায়?’
নিজের বক্তব্য আবার থাকবে কোত্থেকে, আমি কি ব্রিটিশ আমলে জন্মেছিরে, বাবা, যে সবকিছু দেখে বসে আছি? মনে ভাবলেও এ কথা তাঁকে বলা সম্ভব নয়। আমরা মনে যা ভাবি, মুখে তার এক কণাও প্রকাশ করি না। করলে এই দুনিয়া খতম হয়ে যাবে একদিনেই। হিপোক্রেসি ছাড়া পৃথিবী অচল। শেষ অব্দি অধ্যাপক বললেন, ‘এক কাজ কর, নীলকুঠি এখনও যে ক’টা অবশিষ্ট আছে, সেগুলো দেখে আসো। অনুপ্রেরণা পাবে, লিখতে সুবিধা হবে।’
নীলকুঠি তীর্থক্ষেত্র না যে অনন্তকাল ঠিকঠাক থাকবে। আড়াই শ’ বছর আগের সব বিল্ডিং। ভেঙেচুরে, চুরেভেঙে কবেই বিলীন হয়ে গেছে। এগুলো কুঠিয়াল সাহেবরা বানিয়েছিল নদীর ধার ঘেঁষে। বেশ কিছু নদীই খেয়ে ফেলেছে। যেগুলো বাকি ছিল, সেগুলোর কিছু জমিদাররা কিনে নিয়ে সংস্কার-টংস্কার করে বসতবাড়ি বানিয়েছিল, বাকিগুলো থেকে স্থানীয় লোকেরা ইট-কাঠ, জানালা-দরজা ইচ্ছেমত খুলে নিয়ে দফা শেষ করেছে। যশোর, নদীয়া ছিল নীলচাষের প্রধান এলাকা। নীলকর সাহেবদের নিষ্ঠুরতা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কুঠিয়ালদের অত্যাচারের কাহিনী লোকের মুখে-মুখে কিংবদন্তী হয়ে ফিরেছে যুগের পর যুগ।
অনেক খোঁজখবর করে শেষমেশ জানা গেল, মেহেরপুর জেলার গাংনী থানার হাড়াভাঙ্গা গ্রামে একটা নীলকুঠির প্রায় অর্ধেকটা এখনও অক্ষত আছে। আমার বাড়ি ভাটি এলাকায়, ধুন্দলনাড়া গ্রামে। এই এলাকায় বাবার জনমেও আসিনি পরিচিতও কেউ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ঠিকানা জোগাড় করে হাড়াভাঙ্গা হাইস্কুলের হেডমাস্টারকে চিঠি লিখলাম। এই হেডমাস্টারই আমাকে বলে দেন এখানে কীভাবে আসতে হবে। এই এলাকা আগে নদীয়ার অংশ ছিল। সিরাজউদ্দৌলার মুর্শিদাবাদ এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
মাঝরাতে বামুন্দি বাসস্ট্যাণ্ডে এভাবে আমার একাকী দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। খুব তাড়াহুড়ো করে চলে আসতে হয়েছে। কারণটা বলি। সন্ধেবেলা শুনতে পেলাম এরশাদ সরকার হঠানোর জন্যে বিএনপি ছিয়ানব্বই ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে। হরতাল শুরু হবে দু’দিন পর। টানা চারদিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে, বিচ্ছিন্ন হবে সারা দেশের যোগাযোগ। থিসিস জমা দেয়ার শেষ তারিখ কাছে ঘনিয়ে এসেছে। হাতে সময় কম। যা করার, করতে হবে এখনই। যাহা বায়ান্ন তাহা তেপান্ন। সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে শ্যামলী (বাস) ধরে আরিচা, দৌলতদিয়া, মাগুরা, ঝিনাইদা, কুষ্টিয়া হয়ে বামুন্দি। পথে ফেরি পড়ল দুটো। কুষ্টিয়াতে বাস ঘণ্টাখানেক থেমেছিল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ওখানকার হোটেলে ভাত খেয়ে নিয়েছিলাম। এরা তরকারিতে ঝাল একটু বেশি দেয়, তবে স্বাদ ভাল। হোটেলগুলোও ঝকঝকে তকতকে। তবে সবচেয়ে ভাল এদের চা। জ্বাল দিয়ে দিয়ে কড়া ঘন দুধ, কড়া লিকার, যৎসামান্য চিনি, ঝকঝকে গরম পানি দিয়ে ধোয়া কাপে পরিবেশন। এর স্বাদ ভোলার নয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। এরা চা বানানোতে ওই জিনিসটা ভালই মেনটেন করে।
দুই
দোকানের সামনে বাঁশের বাখারি দিয়ে বানানো বেঞ্চগুলো থেকে পানি চুইয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়েছে এদিকে। আকাশ মেঘলা, আবারও বৃষ্টি চলে আসবে যে-কোন সময়। হঠাৎ অসংখ্য খুরের খট খট আওয়াজ পেলাম। ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসতে লাগল শব্দটা। নিশুতি রাতে খুরের আওয়াজ মনে ভয় ধরিয়ে দিতে ওস্তাদ। শব্দটা আসছে বাঁ দিক থেকে। ডান দিকে তাকালাম। বাজারের শেষমাথায় প্রকাণ্ড অশ্বত্থ গাছ চোখে পড়ল। গাছটার নিচে মাটি থেকে আন্দাজ ফুট তিনেক ওপরে আগুনের ছোট্ট লাল একটা ফুলকির ওঠানামা লক্ষ করলাম। অগুনতি খুরের চটছট চটছট শব্দটা বাড়ছে তো বাড়ছেই। আগুন থাকলে তার পেছনে লোকও থাকবে। ফুলকির কাছে গিয়ে দেখি গাছের নিচে তালতাল অন্ধকারে চাকা লাগানো কাঠের বাক্সের ভেতর বসে বিড়ি টানছে লম্বা দাড়িঅলা বুড়ো একটা লোক। লোকটার কোমরের নিচ থেকে দুটো পা নেই। বাজারে বাজারে ভিক্ষে করে। যে তাকে বাজারে রেখে গিয়েছিল, সে এখনও ফিরিয়ে নিতে আসেনি। সম্ভবত তাড়ি-ফাড়ি খেয়ে পড়ে আছে কোথাও। লোকটা জানাল তার নাম রমজান রাজাকার। রাজাকার হিসেবে এভাবে নিজের পরিচয় দিতে কাউকে কখনও দেখিনি। পরে জেনেছি এই এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারে বিশেষ পার্থক্য নেই। যে রাম, সেই রাবণ। যারা মাথাভাঙ্গা নদী পার হয়ে ভারতে গিয়েছে, তারা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা। আর যারা এপারেই রয়ে গেল, পাকিস্তানি মিলিটারির দেয়া চাকরি নিয়ে তারা হলো রাজাকার। একই পরিবারে যে ভাই এপারে ছিল, সে হয়েছে রাজাকার, অন্য যে ভাই তেকালা বর্ডার পার হয়ে ভারতে গিয়েছিল, সে নাম লিখিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার খাতায়। স্বাধীনতার পর খোকাবাবুদের প্রত্যাবর্তন। যে যা ছিল, পুনরায় তাই।
রমজান রাজাকারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত খুরের শব্দ আসছে কোত্থেকে?’
‘গরুর দালালেরা গরু তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে খলিসাকুণ্ডি হাটে।’
‘এই রাত দুপুরে! দিনে গেলে কী অসুবিধা?’
‘বাপুরে, এরা গরু কিনেছে চার ক্রোশ দূরে জলঙ্গীর হাটে। ওপারের গরুই বেশি। কোথাও থামলেই গরু শুয়ে পড়বে। সাত-আট ঘণ্টার আগে এগুলোকে আর ওঠানো যাবে না। গরুর সঙ্গে রাস্তায় শুয়ে থাকতে হবে তাদের মালিককেও। থামলে একেবারে থামতে হবে খলিসাকুণ্ডির হাটে। গরু আর মালিক উভয়েই শুয়ে পড়বে ওখানে। তা আপনি এত রাতে কোত্থেকে?’
‘ঢাকা থেকে।’
‘ঢাকা তো অনেক দূরের পথরে, বাবা। তা যাওয়া হবে কোথায়?’
‘হাড়াভাঙ্গা গ্রামে। আজিজ হেডমাস্টারের বাড়ি।’
‘সে গ্রাম এখান থেকে অনেক পথ, বাবাজী। বাজারের ঘোড়ার গাড়ি বিকেলের আগেই বন্ধ হয়ে যায়।’
‘হেঁটে যাওয়া যায় না?’
‘তা যাওয়া যাবে। তবে আপনি কি রাস্তা চিনবেন? চিনলেও এত রাতে যাওয়া ঠিক হবে না। মোড়ে মোড়ে সর্বহারারা বসে আছে। পথিকের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলাই তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। মাঝে মধ্যে মেরেও ফেলে।’
‘এখানে থানা-পুলিশ নেই?’
‘থানা, পুলিশ সবই আছে। তবে রাতে পুলিশ বের হয় না। তারা বের হয় শুধু দিনে। এখানে দিনে এক সরকার, রাতে আর এক। স্বাধীনতার পর থেকেই এই অবস্থা। শালার স্বাধীনতা!’
মনে হলো পা-টা হারিয়েও রমজান রাজাকার এখনও স্বাধীনতা বিরোধীই রয়ে গেছে।
‘আপনি এত রাতেও এখানে বসে আছেন। বাড়ি যাবেন না?’
‘যেতে তো চাই। কিন্তু যাব কীভাবে? হাকিম হারামির সন্ধ্যায় আসার কথা। এখন পর্যন্ত খবর নেই। এই হারামির খুব মেয়েমানুষের নেশা। মাগি পাড়ায় গিয়ে বসে আছে। আমাকে আনা নেয়ার জন্যে প্রতি রোজ এক টাকা দেই। হারামি আমার কাছে আবার টাকা যেন চেতে আসে!’
‘সে যদি না-ই আসে, তো কী করবেন? সারারাত এখানে বসে থাকবেন?’
‘তা ছাড়া আর উপায় কী? লোক আর পাব কোথায়? একবার কোরবানি ঈদের আগে ভিক্ষে করতে গেলাম খলিসাকুণ্ডির হাটে। গরু-ছাগলের বিরাট হাট। হাকিম আমাকে নামিয়ে দিয়ে সেই যে উধাও হলো, তার আর ফেরার নাম নেই। টানা তিন দিন পড়ে ছিলাম ওখানে। পয়সা পেয়েছিলাম অনেক। তবে পেশাব- পায়খানার সে কী কষ্ট! পরে বাড়ি ফিরেছিলাম ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে। আমার কথা বাদ দেন। ভিখিরিদের কেউ মানুষ ভাবে না। আপনি এখন কী করবেন, সেইটা বলেন।’
আমি এখন কী করব সেটা আমিও যে ভাবছি না, তা নয়। রাস্তায় বেরিয়ে সর্বহারাদের হাতে পড়ার চেয়ে গাছতলায় রমজান রাজাকারের সঙ্গে রাত কাটানো ভাল। বললাম, ‘রাতটা তো মনে হয় আপনার সঙ্গে গাছতলায় বসেই কাটাতে হবে।
‘এত দূর থেকে এসে গাছতলায় সারারাত পড়ে থেকে কষ্ট করবেন?’
‘আর কোন পথ তো নেই, আছে?’
‘আমার বাড়িতে রাতটা কাটাতে পারেন। এখান থেকে মাইলটাক দূরে। বাড়িতে আমি একাই থাকি। আপনি তো রাস্তাঘাট চেনেন না। আমাকে টেনে নিয়ে যেতে হবে। আপনাকে বলতে লজ্জা লাগছে। কিন্তু, কোন উপায়ও তো নেই।’
শেষমেশ রাত দুপুরে গ্রামেগঞ্জে ভিখিরির গাড়ি টানতে হবে! টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গাছের পাতা চুইয়ে পানি পড়ে গা ভেজাচ্ছে। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর। এভাবে সারারাত রমজান রাজাকারের সঙ্গে গাছতলায় বসে ভিজলে নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গা। অসুস্থ হলে দেখবে কে?
‘ঠিক আছে, চলেন তা হলে। কোনদিকে যেতে হবে বলে দেন।’
রাস্তায় বেলে মাটি। কাদা থাকলে গাড়ি টানা অসম্ভব হত। আমি রমজানের গাড়ির দড়ি ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছি। রমজানের হাতে আমার সাইড ব্যাগ। গাড়ির চাকার ঘড়ঘড় শব্দ। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। অন্ধকার রাত। ক্লান্ত শরীর নিয়ে টেনেটেনে পা ফেলছি। মনে পড়ল হাজার এক আরব্য রজনীর সিন্দাবাদের টেকো জিনের কথা। টেকো বসে থাকত সিন্দাবাদের কাঁধে। রমজান বসে আছে চার চাকার কাঠের গাড়িতে। দড়ি আমার হাতে। এমফিল ডিগ্রি নিতে গিয়ে আরও কত কী যে করতে হবে ভগবান জানেন! কিছুক্ষণ পর সব বাস্তবতা ভুলে গেলাম। মাটির দিকে তাকিয়ে গাড়ি টানছি তো টানছিই। ব্যথায় টনটন করছে পিঠ। ঘামে ভিজে গেছে শরীর। মানব-সমাজে দীর্ঘতম যাত্রার ইতিহাস ইউলিসিসের। দশ বছর লম্বা ট্রয়ের যুদ্ধ, তারপর দশ বছর ধরে বাড়ি ফেরা। সেই ইউলিসিসের যাত্রাও একদিন শেষ হয়েছিল। শেষ হলো আমার যাত্রাও। পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মা’গো বল কবে শীতল হব! ভাগ্য ভাল। সর্বহারাদের সঙ্গে দেখা হয়নি। রমজানের বাড়ি মাটির, ছাদ খড়ের। তার পায়ের যেটুকু যা এখনও অবশিষ্ট আছে, সেগুলোতে ট্রাকের চাকার টিউব লাগানো। চার হাত-পায়ে হামা দিয়ে বাড়ির দাওয়ায় উঠল রমজান। এক রুমের বাড়ি। ঘরে যদি রমজান শোয়, তা হলে আমাকে রাত কাটাতে হবে দাওয়ায়। জরাজীর্ণ কাঠের দরজায় লাগানো মান্ধাতা আমলের তালা খুলে ঘরে ঢুকল রমজান। দুটো কুপি জ্বালল। ভিখিরিও ঘরে তালা ঝোলায়! রমজান আমাকে বলল বাড়ির উঠোনে পাত কুয়োতে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আসার জন্যে। আমি কুপি হাতে করে উঠোনে গেলাম, ফ্রেশ হওয়া দরকার। বৃষ্টি থেমে গেছে, সেই সঙ্গে বন্ধ হয়েছে এলোমেলো হাওয়া। কুপি নিভল না। কুয়োর চাড়ি মাটি থেকে মাত্র তিনফুট উঁচু। রমজান যাতে সহজেই পানি তুলতে পারে, সেজন্যে এই ব্যবস্থা। ঠাণ্ডা পানিতে গোসল সেরে দাওয়ায় ফিরে এসে দেখি একটি রঙচটা টিনের থালায় মোটা চালের ভাত আর লাল, ডাঁটা চড়চড়ি সাজিয়ে রমজান বসে আছে। আমাকে দেখে বলল, ‘দুপুরে রান্না করেছিলাম। খেয়ে নেন।
পত্রিকায় পড়েছি ঢাকা শহরের ভিখিরিরা দেশে গেলে সবচেয়ে বড় মাছটা কেনে। গ্রামগঞ্জের ভিখিরির জীবন করুণ। খুব সম্ভব রাতে খাবে বলে রমজান ভাত-তরকারি বাঁচিয়ে রেখেছিল, এখন ওটা দিয়েই আতিথেয়তা করছে। বললাম, ‘আপনি খাবেন না?’
‘আমি আর এত রাতে খাব না। যা আছে খেয়ে নেন। গরীব বলে ঘেন্না করবেন না।’
‘কিন্তু এত ভাত তো খেতে পারব না। আরেকটি থাল নিয়ে আসেন। দু’জনে ভাগ করে খাই।’
রমজান আর আমি ভাগ করে খেলাম। স্রেফ লবণ দিয়ে সেদ্ধ করা ডাঁটা। তেল, পেঁয়াজ, রশুনের কোন কারবার তরকারিতে নেই। কোন রকমে কিছুটা খেয়ে হাত ধোয়ার জন্যে উঠে পড়লাম। জিজ্ঞেস করলাম, কুয়োর জল খাওয়া যাবে কি না। রমজান বলল, জল পরিষ্কার, খেতে পারেন। হাত-মুখ ধুয়ে দ্বিতীয়বারের মত দাওয়ায় ফিরে দেখি রমজান আমার জন্যে বিছানা সাজাচ্ছে। মাটির মেঝেতে খেজুর পাতার পাটি, তার ওপর তেল চিটচিটে কাঁথা আর বালিশ। কাঁথা থেকে আঁশটে গন্ধ বেরুচ্ছে। এই কাঁথা-বালিশে শোয়া অসম্ভব। কাঁথা- বালিশ মাটিতে রেখে তার ওপর পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। ক্লান্তিতে বুজে এল চোখ। তলিয়ে গেলাম গভীর ঘুমে।
.
তিন
সকালে ঘুম ভেঙে দেখি রমজান আমার পায়ের কাছে বসে পয়সা গুনে গুনে একটা কাঠের বাক্সে রাখছে। বাক্সের ডালা খোলা। নানান রকমের পয়সায় বাক্স ভর্তি। ঘরে তালা দেয়ার কারণ তা হলে এই! দেখলাম বাক্সের এক কোনায় একটা তামার বড় পয়সা পড়ে আছে। অন্য সব কয়েন থেকে আলাদা ওটা। রমজানকে বললাম, কী পয়সা ওটা, দেখি? কয়েনটা হাতে নিয়ে ভাল করে দেখলাম। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কয়েন। কোলকাতা প্রেসিডেন্সি মিন্ট থেকে বানানো। ১৮১৮ সালের কয়েন ওটা। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির তিনটে প্রেসিডেন্সি ছিল। কোলকাতা, বোম্বে, আর মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি। এই তিন প্রেসিডেন্সির তিনটে মিন্ট থেকে আলাদা আলাদাভাবে কয়েন মিন্ট করা হত। ১৮৩৫ সালে কোম্পানি সব প্রেসিডেন্সি একসঙ্গে করে একটা সেন্ট্রাল মিন্ট তৈরি করে ভিন্ন ভিন্ন মিন্টের সব কয়েন বাজার থেকে তুলে ফেলে। যারা প্রাচীন মুদ্রা কালেক্ট করে, তাদের কাছে ১৮১৮ সালের কোলকাতা প্রেসিডেন্সির এই কয়েনের মূল্য অনেক। ভেজাল মালে বাজার ভর্তি। কয়েন আসল হলে আর ভাল সংগ্রাহক পেলে পাঁচ লাখ তো বটেই, দশ লাখেও বিক্রি হতে পারে সেটা। এই তথ্য রমজান রাজাকারের জানা নেই। তাকে জিজ্ঞেস করলাম কয়েনটা তার হাতে এল কীভাবে। রমজান বলল, ‘ওটা পেয়েছিলাম গণ্ডগোলের বছর সাহার বাটিতে পাকিস্তানি মিলিটারির বাঙ্কার খোঁড়ার সময় দু’হাত মাটির নিচে।’
‘সাহার বাটি কোথায়?’
‘বাবাজী, এই এলাকায় যে নীলকুঠি আছে, সেই কুঠির নাম সাহার বাটি।’
‘এতদিন ধরে এই পয়সাটা বয়ে বেড়াচ্ছেন, অন্য কেউ দেখেনি?’
‘কে আর দেখবে! পুরনো পয়সা, অচল মাল। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে পেয়েছিলাম। সোনা-রুপার টাকা হলে বেচে দিতাম। তামার পয়সা আর কী বেচব, তবে পয়সাটা দেখতে ভাল। এই জন্যেই কাছে রেখে দিয়েছি।’
‘ও, আচ্ছা। ঠিক আছে, এই ধরেন আপনার পয়সা।’
কয়েনটা জায়গা মত বেচতে পারলে রমজান রাজাকারকে আর কোনদিন ভিক্ষে করতে হবে না। তবে কথাটা বললাম না তাকে। এখনও ঢের সময় হাতে আছে। যে উদ্দেশ্যে এখানে আসা, সেটা আগে সফল হোক। তারপর দেখা যাবে।
রমজান রাজাকারের বাড়িতে নাস্তার কোন আয়োজন চোখে পড়ল না পড়লেও নাস্তা করার প্রশ্নই ওঠে না। ভিখিরির অন্ন ধ্বংস করার মত বিবেকহীন এখনও হইনি। বেলা চড়ার আগেই বেরুতে হবে। কুয়ো তলায় গিয়ে হাত-মুখ ধুলাম। মুখে না কামানো দাড়ি খচ খচ করছে, ধুলো ভর্তি চুল। ব্যথায় টন-টন করছে কাঁধ। জল ভর্তি বালতি কুয়ো থেকে তুলতে গিয়ে দম বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। যে ব্যাটা রমজানকে দু’বেলা টেনে নিয়ে যায়, তাকে নমস্কার। দাড়ি শেভ করে গোসল সেরে নতুন কাপড় পরতে পারলে ভাল হত। কিন্তু এতসব করার সময়, পরিবেশ কোনটাই নেই এখানে। ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে রমজানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। একবাটি মুড়ি দিয়েছিল রমজান। খাওয়ার জন্যে চাপাচাপি করল। দু’মুঠো মুখে দিয়ে এক গ্লাস জল খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হাইস্কুলে যাওয়ার রাস্তা তার কাছ থেকে ভালভাবে বুঝে নিয়েছি। তারপরও যদি সমস্যা হয়, যে-কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়া যাবে। খিদেয় পেট গুড়গুড় করছে। পথে কোন বাজার-টাজার পড়লে ভাল। না পড়লে, খালি পেটে উপোস দিয়ে হাঁটতে হবে।
.
চার
চড়চড়ে রোদ উঠেছে, গা কিটকিট করছে ঘামে। চিটচিটে কাদা-পথ। তার ভেতরেই শুকনো জায়গা দেখে পা ফেলে ফেলে হাঁটছি। রাস্তার দু’দিকে ফসলের খেত। মাঝে মধ্যে এখানে সেখানে দু’চারটে কলাগাছ, আতাগাছ ঘেরা মাটির বাড়ি চোখে পড়ছে। পিপাসায় মুখ শুকিয়ে সিনাই মরুভূমি। মনে হচ্ছে যে-কোন সময় মাথা ঘুরে পড়ে যাব। সামনেই বাঁক নিয়েছে রাস্তা। বাঁক পার করে চোখে পড়ল বিরাট এক বটগাছের নিচে কয়েকটা টং-দোকান। যাক, অবশেষে জিরোনোর একটা জায়গা পাওয়া গেল। প্রথম টং-দোকানটার সামনের বেঞ্চে ঝপ করে বসে পড়লাম। ঘুঁটের আগুনে কেতলিতে চায়ের জল ফুটছে। তার পাশে সসপ্যানে ঘন লাল দুধের ওপর ইয়া মোটা সর পড়েছে। ফুটখানেক উঁচু কাঠের শো-কেসের ওপাশে সাদা রঙের হাতাঅলা গেঞ্জি পরা দাড়িঅলা মাঝবয়েসী দোকানদার গামলা থেকে টিনের থালায় ভাত বাড়ছে। তার বাড়ি থেকে পাঠানো দুপুরের খাবার। আমাকে দেখে ভাত বাড়া বন্ধ করল দোকানদার। কোনমতে বললাম, এক গ্লাস জল হবে? কোন কথা না বলে, স্টেইনলেস স্টিলের গ্লাসে পানি ভরে আমার দিকে এগিয়ে দিতে গিয়েও হাতটা সরিয়ে নিল সে। তার দিকে বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম। এ আবার কী ধরনের আচরণ! খুব দ্রুত ছোট্ট একটা কাঁসার বাটিতে একমুঠ কাঁচা মসুরির ডাল ঢেলে তার সঙ্গে মাঝারি সাইজের একটা পেঁয়াজ দিয়ে দোকানদার বলল, ‘বাবাজী, পেঁয়াজটা ছিলে মসুরির ডাল দিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেন।’
পেঁয়াজ দিয়ে কাঁচা মসুরির ডাল কি কোন খাওয়ার জিনিস? স্টার হোটেলের কাচ্চি বিরিয়ানি হলেও সেটা এখন খাওয়া সম্ভব নয়। আমার দরকার জল। কিন্তু এই দাড়িঅলার সঙ্গে উটকো তর্ক করার অবস্থা আমার নেই। যে দেশে যেই রীতি। হোয়েন ইন রোম…পেঁয়াজটা ছিলে কাঁচা মসুরির ডাল দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। কচকচ কড়মড়। স্বাদ খারাপ নয়। কাঁচা মসুরির ডালে মিষ্টি ভাব আছে, সেই সঙ্গে পেঁয়াজের ঝাঁঝ। সবটুকু ডাল আর পেঁয়াজ খাওয়া হলে আমার হাতে জলের গ্লাসটা ধরিয়ে দিল দোকানদার। ঢকঢক করে পুরোটা খেয়ে ধাতস্থ হলাম। ইশারায় বললাম আরেক গ্লাস দিতে। দ্বিতীয় গ্লাস খাওয়া হলে দোকানদার রাস্তার উল্টোপাশে একটা টিউবওয়েল দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘ইচ্ছে হলে ওখান থেকে হাত-মুখ ধুয়ে আসতে পারেন।’
সে আবার ভাত বাড়ায় মন দিয়েছে। কলের জলে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ফের বেঞ্চে এসে বসলাম।
বেশ তৃপ্তি করে কাঁঠালের বিচি আর কাটোয়া ডাঁটার তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছে দোকানদার। তার কোন তাড়াহুড়ো নেই। কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছে খাওয়া একটা শিল্প। সে তরকারি যা-ই হোক না কেন। দোকানদার সেই গোত্রের। বেঞ্চে যে একজন মানুষ বসে আছে, সেদিকে কোন নজরই নেই। সে আর ভাতের গামলা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কিছু তার কাছে অস্তিত্বহীন। জাঁ পল সার্ত্রের এগজিসটেনশিয়ালিজম তত্ত্ব শিখতে হলে আসতে হবে এর কাছে। আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে তার খাওয়া দেখতে লাগলাম। যদি ঘ্রাণং অর্ধ ভোজনং হয়, তা হলে খাওয়া দেখলেও অর্ধ খানং হওয়ার কথা। মারীচ মুনীর যজ্ঞও এক সময় শেষ হয়েছিল। শেষ হলো দোকানদারের খাওয়াও। জল-টল খেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ঢেঁকুর মেকুর তুলে আমার দিকে তাকাল দোকানদার। জিজ্ঞেস করল, ‘কী খাবেন?’
বললাম, ‘যা হোক একটা কিছু দেন। আর দয়া করে তাড়াতাড়ি করেন।’
দোকানদার বলল, ‘গ্রামাঞ্চলের বিস্কুট-টিস্কুট ভাল না। তার চেয়ে মুড়ি আর খাগড়াই খান। গতকালকের বানানো, একদম ফ্রেশ মাল।’
খাগড়াইয়ের নাম কোনদিন শুনিনি। তার পরেও বললাম, ‘দেন, মুড়ি- খাগড়াই-ই দেন। তারপর চা দেবেন।
খেয়ে বুঝলাম খাগড়াই জিনিসটা ফেনানো গুড় দিয়ে তৈরি। ভাতের একটা খৈ থাকে। খেতে স্বাদ আছে। বাতাসা-ফাতাসা এর কাছে কিছুই নয়। তবে ঘন দুধ আর কড়া লিকারের যে চা খেলাম, তার তুলনা বিরল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘দুধ এত ঘন হলো কীভাবে?’
দোকানদার বলল, ‘জনাব, এটা মোষের দুধ। এদিকের সব চা, মিষ্টি মোষের দুধের। চরাঞ্চলে মোষের বড় বড় খাটাল আছে। প্রচুর দুধ হয় সেইসব খাটালে গরুর বাথানও আছে অনেক। তবে গরুর দুধের দাম বেশি। বাচ্চারা, বুড়ো-বুড়িরা গরুর দুধ খায়। মোষের দুধ বেশি ঘন, সহজে হজম হয় না।’
‘ভাইসাহেব, এখন বলেন, আপনি আমাকে জল না খাইয়ে মসুরির কাঁচা ডাল খাওয়ালেন কেন?’
‘প্রথমে ভেবেছি আপনি আশপাশের কোথাও থেকে এসেছেন। পরে ভাল করে তাকিয়ে দেখি আপনার মুখ লাল, চোখ জবা ফুল। সারা শরীর ঘামে ভেজা। বুঝতে পারলাম, রোদের ভেতর অনেক দূর হেঁটে এসেছেন। চড়া রোদে অনেক পথ হেঁটে এসে হঠাৎ পানি খেলে দম বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যায়। ডাক্তাররা বলে হিট স্ট্রোক। আমি যখন ছোট, তখন আমার এক আত্মীয়ও এভাবে মারা গিয়েছিল। ইয়া বড় জোয়ান, বিশাল বুকের ছাতি। মথুরাপুর থেকে ভর দুপুরে টানা চার ক্রোশ হেঁটে এসে এক জগ পানি খেয়ে সেই যে মাটিতে পড়ল, আর উঠল না। রোদে হেঁটে এসে পেঁয়াজ আর মসুরির কাঁচা ডাল খাওয়া এ এলাকার বহু দিনের রীতি। এতে হিট স্ট্রোকের ভয় থাকে না। তা, বাবাজী, কোত্থেকে আসা হচ্ছে, যাবেনই বা কোথায়?’
‘আসছি ঢাকা থেকে, যাব হাড়াভাঙ্গা হাইস্কুলের হেডমাস্টারের বাসায়।
‘হাড়াভাঙ্গা এখান থেকে খুব বেশি দূরে না। ওই দেখেন রাস্তাটা সামনে দু’ভাগ হয়ে গেছে। সোজা না গিয়ে ডানের রাস্তাটা ধরবেন। খুব বেশি হলে ঘণ্টাখানেক লাগতে পারে।
.
পাঁচ
আরেক কাপ চা খেয়ে দোকানদারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ডানে মোড় নিয়ে মিনিট পনেরো হাঁটার পর রাস্তার বামে বট, সুপুরি, আর নারকোল গাছে ঘেরা উঁচু ঢিবির মত একটা জায়গা চোখে পড়ল। আদ্যিকালের শিব মন্দির। খাড়া চুড়ো ভেঙে গেছে। আগে হয়তো মন্দিরটার মূল দালান অনেক উঁচু ছিল। এখন অর্ধেকটা বসে গেছে মাটির ভেতর। খসে পড়ছে ছোট ছোট ইট। জানালা-দরজার জায়গাগুলোতে বড় বড় খোঁদল। গাছ আর লতাপাতার ফাঁকে টেরাকোটার গায়ে খোদাই করা জটিল নকশার মূর্তি। জায়গাটা নীরব, গাছের পাতা পড়লেও মনে হয় শোনা যাবে। এই মন্দিরে পূজা হয় না কত শত বছর, কে জানে? জায়গাটা এখনও অক্ষত আছে দেবদেবীদের অভিশাপের ভয়ে। এসব প্রাচীন মন্দির যেখানেই আছে, সেখানেই দেখেছি একটা থম ধরা পরিবেশ। এর কাছাকাছি এলেই গায়ের ভেতর শিরশির করে। ধকধক করে বুক, ভারী হয়ে আসে পা। মনে হয় একছুটে পালিয়ে যাই। কিন্তু তার পরেও যেতে ইচ্ছে করে না। কী এক অমোঘ আকর্ষণে কাছে টানে এগুলো। গ্রামের লোকেরা মুসলমান হলেও প্রাচীন হিন্দু মন্দিরগুলো এড়িয়ে চলে। একান্ত বাধ্য না হলে মন্দিরগুলোর কাছে ঘেঁষতে চায় না তারা।
মন্দির পেছনে ফেলে হাঁটতে লাগলাম। রোদ কিছুটা পড়ে এসেছে। ডান দিকে চোখে পড়ল একটা মরা নদী। জল-টল কিছু নেই। বিরাট খাদের মত উপত্যকা। সম্ভবত মাথাভাঙ্গা নদীর প্রাচীন কোন শাখা। কে জানে কী নাম ছিল নদীটার। নীলকর সাহেবরা কোলকাতায় নীল চালান দিত মাথাভাঙ্গা নদী দিয়ে। তখন এখানে নীল বোঝাই বড়-বড় বজরা চলত। নীলচাষ বন্ধ হলে বজরায় ভরে নেয়া হত গাঁটকে গাঁট পাট। পদ্মার উজানে ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার পর মাথাভাঙ্গার মাথা যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, সেটুকুও ভেঙে শেষ।
শুকনো নদীর পাশ দিয়ে রওনা হয়ে গেলাম গাছের ছায়া ধরে। গন্তব্য এখনও অনেক দূরের সেই হাইস্কুল।
.
বড়-বড় আম ও নারকেল গাছে ঘেরা লাল রঙের দোতলা উল্টো এল (7) প্যাটার্নের ব্রিটিশ আমলের দালান। সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা প্রকাণ্ড খেলার মাঠ মাঠের একদিকে তেঁতুল, কদম, আর জামরুল গাছের সারি। এল-এর ছোট বাহুটা রাস্তার উল্টোদিকে খাদের মত মরা নদীটার পাশে। বড় বাহুটার মাথা শেষ হয়েছে রাস্তার কাছাকাছি এসে। দালানের মেঝে মাটি থেকে বেশ ওপরে। পুরো বারান্দা জুড়ে ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠে গেছে মেঝে বরাবর। একতলা খিলান দেয়া চওড়া বারান্দা। কাঠের খড়খড়ি লাগানো জানালা-দরজায় সবুজ রঙ করা। মোগল আমলে সব দালানের রঙ ছিল হালকা গোলাপী, কংক্রিটের জালি নেটে ঘেরা ছাই রঙা খুপরি জানালা। কোম্পানি আমলের বিল্ডিঙের রঙ হলো কলোনিয়াল রেড, ইয়া বড় সবুজ রঙা দরজা-জানালা। বাংলার আবহাওয়া গরম। সাহেবরা বুঝেছিল, এখানকার দালানের বারান্দা সাত ফুটের কম চওড়া হলে টেরচা হয়ে আসা রোদ লেগে গরম হয়ে যাবে ঘর। সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে ঘরের উচ্চতাও। তারা এক একটা ঘরের ছাদ তৈরি করল কমপক্ষে বিশফুট উঁচুতে। সাহেব-সুবা বলে কথা। গ্রাম-গঞ্জের স্কুলে কোন বাউণ্ডারি ওয়াল থাকে না। এটারও নেই। তার পরেও দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এটাই হাড়াভাঙ্গা হাইস্কুল। এত সুন্দর একটা স্কুলের নাম হাড়াভাঙ্গা! হরতালের কারণে বোধহয় স্কুল বন্ধ। সারি সারি দরজায় তালা ঝুলছে। টানা বারান্দায় বাতাসের শন-শন শব্দ। স্কুলের সামনে দিয়ে হেঁটে এল-এর ভাঁজের কাছে গেলাম। ধরেই নিয়েছিলাম হেডমাস্টারের অফিস এল-এর ছোট বাহুটার কাছে হবে। হরতালের সময় স্কুল বন্ধ থাকলেও অফিস খোলা থাকার কথা। কিন্তু না, হেডমাস্টারের কামরা, স্কুলের অফিস, টিচার্স কমনরুম সব তালামারা। কী আশায় বাঁধি খেলাঘর… দারোয়ান-টারোয়ানও চোখে পড়ল না।
সাইড ব্যাগটা পাশে রেখে সিঁড়ির সবচেয়ে উপরের ধাপটাতে বসে পড়লাম। এখন কী করব? মাঠের উল্টোপাশে জামরুল গাছের দিকে চেয়ে সেইটে ভাবছি। হঠাৎ থপ-থপ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালাম। খালি পায়ে লুঙ্গিপরা এক মাঝবয়েসী লোক এগিয়ে আসছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বাবরী চুল, হাতে পাকা বাঁশের লাঠি, গায়ে বড়-বড় পেতলের বোতামঅলা হাফ-হাতা খাকি জামা। প্রায় শূন্য থেকে উদয় হয়েছে স্কুলের দারোয়ান। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ‘আমার নাম শরৎ সান্যাল। ঢাকা থেকে আসছি, হেডমাস্টার আজিজ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘আজ স্কুল বন্ধ, স্যররা কেউ আসেননি।’
‘ও, আচ্ছা। হেড স্যরের সঙ্গে কীভাবে দেখা করা যায়, বলতে পারেন? আমি আসব তা তাঁকে জানানো হয়েছে।’
‘স্যরের বাড়িতে যান, বেশি দূর না।’
‘কিন্তু বাড়ি তো চিনি না। কাউকে সঙ্গে দিতে পারবেন?’
‘ডিউটির সময় স্কুলের বাইরে যাওয়া নিষেধ আছে। একটু সবুর করেন। ছেলেরা মাঠে বল খেলতে আসলে একজনকে সঙ্গে দিয়ে দিব।’
‘আচ্ছা, অপেক্ষা করি তা হলে।’
থপ-থপ করতে করতে চলে গেল দারোয়ান। আমি স্কুলের দেয়াল, বারান্দা দেখতে লাগলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো ডান দিকের সিঁড়ির মাঝামাঝি ফুট দুয়েক জায়গা কাটা। ওখানে কোন সিঁড়ি নেই। আবার সিঁড়ি শুরু হয়েছে দুই ফুট চওড়া গ্যাপটা বাদ দিয়ে। পুরনো সব দালানেই কর্নার স্টোন থাকে। যাকে সোজা বাংলায় বলে ভিত্তি প্রস্তর। দালানের ইতিহাস জানতে হলে এর জুড়ি নেই। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখলাম। সিমেন্টের ভেতরে গাঁথা দুই বাই দুই পাথরের ছাতাপড়া পাটায় ইংরেজিতে লেখা: ‘ইন মেমোরি অভ হিজ এক্সিলেন্সি জে. পি. গ্র্যান্ট, লিউটেন্যান্ট গভর্নর অভ ইণ্ডিয়া। ১৮৬০।’ এই গণ্ডগ্রামে ভারতের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছোটলাট গ্র্যান্ট সাহেব এলেন কীভাবে সে এক রহস্য। আর এলেই বা কী? এতবড় দালান এই অজ পাড়াগাঁয়ে তৈরি করাবেনই বা কেন?
‘শরৎ বাবু!’
নিজের নাম শুনে চমকে পেছন ফিরে তাকালাম। বছর দশেক বয়সের কালো লিকলিকে এক ছেলেকে নিয়ে দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। এই লোকের অভ্যেস হলো পেছন থেকে মানুষকে ডেকে চমকে দেয়া।
‘এই ছেলে আপনাকে হেড স্যরের বাসায় পৌঁছে দেবে…এই, কদমা, বাবুকে সঙ্গে করে নিয়ে যা। স্যরের বাসায় পৌঁছে দিয়ে তারপর কোথায় যেতে চাস, যারি।’
এ অঞ্চলে খাগড়াইয়ের মত কদমাও এক ধরনের মিষ্টি। এ ছেলের আসল নাম কদমা নয়, অন্য কিছু। ছেলেটার দিকে তাকালাম। কাদা মাখা খালি পা, সেকেণ্ড হ্যাণ্ড ফুলপ্যান্ট কেটে বানানো বোতাম ছেঁড়া নোংরা হাফ প্যান্ট, কাকের- বাসা মাথার চুল। চেহারা দেখলে মনে হয়, এ ছেলে কোনদিন পেট ভরে খেতে পায়নি। দারোয়ান সম্ভবত একে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছে। দারোয়ানের হাতে দশটা টাকা দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে কদমাকে নিয়ে রওনা হলাম। মনে হলো ছেলেটার সঙ্গে দু’চারটে কথা বলি। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার ভাল নামটা কী বল তো, বাবা?’
‘আমার ভাল নাম কদম রসুল।’
‘বাহ, সুন্দর নাম! তুমি কি পড়ালেখা কর?’
‘জী-না। আগে লেখাপড়া করতাম, দুই বছর হলো করি না।’
‘লেখাপড়া ছাড়লে কেন? পড়লে ভাল হত না?’
কদম চুপ করে থাকল। সে আর কথা বলতে চায় না। এ বোধ হয় মানুষের সঙ্গে খুব একটা মেশেটেশে না। একে দিয়ে কথা বলাতে হলে এর সঙ্গে ভাল আচরণ করতে হবে। কিছু দূর যাওয়ার পর সামনে হাট পড়ল। হাটের সঙ্গে চায়ের দোকান থাকবেই। কদমকে নিয়ে চায়ের দোকানে বসলাম। কদমের জন্যে জিলিপি-সিঙাড়া আর নিজের জন্যে চায়ের অর্ডার দিলাম। এখানকার চা অতি উত্তম। আমার নেশা ধরে গেছে। মনে হচ্ছে শুধু চা খেয়েই বেঁচে থাকতে পারব। কদম তিনটে জিলিপি দুটো সিঙাড়া খেয়ে ফেলল। দোকানদারকে বললাম, ‘ওকে আরও তিনটে জিলিপি দেন।’
খাওয়া শেষ করে দুই গ্লাস জল খেল কদম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চা খাবে?’
কদম মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘না-না।’
বললাম, ‘খাও না এক কাপ চা। ভাল লাগবে। এই যে, দোকানদার ভাই, দুধ চিনি বেশি দিয়ে কদমকে এক কাপ চা দেন তো।’
চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে চুপচাপ হাঁটলাম কিছুক্ষণ। তারপর কদমকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘লেখাপড়া বন্ধ করলে কেন, তা তো বললে না, কদম।’
নাস্তা-টাস্তা খেয়ে সে এখন অনেক সহজ হয়েছে। কদম যা বলল তার সারমর্ম হলো, দু’বছর আগে তার বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। সেই থেকে জেলে আছে বাবা। কদম আর তার মা একসঙ্গে ছিল কিছু দিন। তারপর শুরু হলো অভাব। খাওয়াই জোটে না। স্কুলের দারোয়ান একলা থাকে। কদমের মাকে সে নিয়ে গেল তার কাছে। কদম থেকে গেল পৈতৃক ভিটেয়। মাঝে মাঝে মায়ের কাছে গেলে খেতে পায়। তবে ঘন ঘন যাওয়া মানা। হাটে-বাজারে ঘোরাঘুরি করলে একবেলা দু’বেলা খাওয়া জোটে। বাবাকে পুলিশে ধরার আগে ক্লাস টুতে পড়ত। দু’বছর হলো পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই দু’বছরে বাবার সঙ্গে একবারও দেখা হয়নি? জেলে গেলেই তো দেখা হত।’
‘আব্বা আছে কুষ্টিয়া জেলে। বামুন্দি থেকে কুষ্টিয়ার বাস ভাড়া সাড়ে তিন টাকা। যেতে আসতে সাত টাকা। সাত টাকা কোথায় পাব?’
‘মাত্র সাত টাকার জন্যে দু’বছর হলো তোমার বাবাকে দেখতে পাওনি! বল কী তুমি!’
চুপ করে থাকল কদম। ছোট্ট একটা শিশু দু’বছর হলো তার বাবাকে দেখেনি শুধুমাত্র সাতটি টাকার জন্যে। হে, ভগবান, কোন্ রাষ্ট্রে বাস করি আমরা!
‘কদম?’
‘জী?’
‘একা একা বাড়িতে থাকতে তোমার ভয় করে না?’
‘প্রথম প্রথম ভয় করত। হাটে এসে দোকানের সামনে শুয়ে থাকতাম। যখন শীত এসে গেল, তখন ঠাণ্ডায় রাতের বেলা হাটে ঘুমাতে পারতাম না। বাড়িতে ঘরের ভেতর কাঁথা কম্বল গায়ে দিয়ে শুতে হত। শীত ভয় মানে না।’
‘গরমের সময় এলে তখন কী কর? আবার ভয় পাও?’
‘গরমের সময় একা থাকতে এখন আর ভয় করে না। তবে রাতে ঘর থেকে বেরোতে ভয় লাগে। আমাদের বাড়ির আশপাশে সাপের আনাগোনা বেশি।’
‘বর্ষাকালে খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধা হয় না?
‘খুবই অসুবিধা হয়। এই হাটের দোকানগুলো বৃষ্টির দিনে খোলে না। তখন যেতে হয় বামুন্দির বাজারে। ওখানে গেলে খাওয়া পাওয়া যায়।’
মনের চোখে দেখলাম সকাল থেকে ঝুম বৃষ্টি। ছোট্ট একটা ছেলে দরজা খুলে উঠোনের ওপারে বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সারাদিনে কোথায় একবেলা খাওয়া পাওয়া যাবে, সেই চিন্তায় বিভোর। হয়তো আগের দিনেও খেতে পেয়েছে শুধু একবার। খিদেয় চনচন করছে পেট। আঁধার হয়ে আসছে চোখ। তোমার ভুবনে, মাগো, এত পাপ, নাই প্রতিকার! দেখতে যেমনই হোক, এ ছেলের মাথা ভাল। গুছিয়ে কথা বলতে ওস্তাদ। আজিজ হেডমাস্টারের বাড়ির সামনে এসে গেলাম। গোল বারান্দাঅলা টিনের হাফ বিল্ডিং। প্রকাণ্ড ফুলের বাগানের ভেতর দিয়ে বারান্দা পর্যন্ত চারফুট চওড়া ইট বিছানো রাস্তা। আজিজ হেডমাস্টার অবস্থাপন্ন লোক। বাগান বিলাসে মোড়া ছোট্ট গেটের সামনে আমাকে রেখে উল্টো পথে হাঁটা ধরল কদম। বিদায় জানানোর সময়ই দিল না। এ ছেলে নিভৃতচারী। মানুষের সংসর্গ এড়িয়ে চলতে চায়।
.
ছয়
গোল বারান্দায় উঠে দেখি কোথাও কেউ নেই। সামনে একটা দরজা আছে ঠিকই, তবে কড়ায় ইণ্ডিয়ান মালিক তালা ঝুলছে। হাতলঅলা চওড়া কাঠের বেঞ্চ আর দুটো চেয়ার আছে বারান্দায়। সাইড ব্যাগটা পাশে রেখে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চে। দেখা যাক কেউ আসে কি না। সব অপেক্ষারই শেষ আছে। বারান্দার পাশেই গন্ধরাজ গাছে থোকা থোকা সাদা ফুল ফুটেছে। মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। ঘুমে জড়িয়ে এল চোখ। জোর করে জেগে থাকার চেষ্টা করেও ফেল মেরে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল কাঁধ ঝাঁকানিতে। মোর ঘুমো ঘোরে এলে, মনোহর…চোখ মেলে দেখলাম তালগাছের মত লম্বা ঢ্যাঙা এক মিশকালো পঞ্চাশোর্ধ্ব লোক শিঙের চশমার ভেতর দিয়ে আমাকে দেখছে। পরনে ফিনফিনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী, পায়ে পেছনে ফিতেঅলা চামড়ার স্যাণ্ডেল। ক্লিন শেভ, মাথায় ধবধবে সাদা চুল। বকের মত লম্বা গলায় কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে পড়েছে। যারা দীর্ঘদিন মাস্টারি করে, তাদের ভেতর এক ধরনের ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়। ছালা লুঙ্গি পরে থাকলেও তাদেরকে আলাদা করে চেনা যায়। এ যে আজিজ মাস্টার তা বুঝে ফেললাম এক মুহূর্তেই।
‘স্যর, আদাব।’
‘আদাব, কে আপনি?’
‘আমার নাম শরৎ সান্যাল। ঢাকা থেকে আসছি। রিসার্চের কাজে এখানে আসব বলে আপনাকে চিঠি দিয়েছিলাম।’
‘অ, মনে পড়েছে। আপনি একটু বসুন, আমি ভেতর থেকে আসছি।’
আজিজ সাহেব ডান হাতে দরজার তালা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। তার বাঁ হাতে ঝুলছে কানকোয় কলাগাছের সুতলিতে বাঁধা তিনপোয়া ওজনের ইলিশ মাছ। আবার অপেক্ষা! জীবনের অর্ধেক যদি ঘুম হয়, তা হলে বাকি অর্ধেকের বেশিরভাগটাই অপেক্ষা-চাকরির অপেক্ষা, বিয়ের অপেক্ষা, নয় মাস ধরে সন্তান জন্মের অপেক্ষা, সন্তানের বড় হওয়ার অপেক্ষা, তারপর মৃত্যুর অপেক্ষা। মৃত্যুর পর স্বর্গ কিংবা নরকে যাওয়ার অপেক্ষা।
‘সরি, আপনাকে বসিয়ে রাখলাম। অনেকক্ষণ হলো এসেছেন মনে হয়। আমি গিয়েছিলাম হাটে। আমার স্ত্রী ছেলেমেয়েদের নিয়ে গেছেন তাঁর ভাইয়ের ওখানে। বাড়ি একদম খালি। যা হোক, এই হরতালের ভেতর এলেন কীভাবে?’
‘আজ্ঞে রওনা দিয়েছি গতকাল। পৌঁছাতে দু’দিন লেগে গেল। তারপরেও বলতে হয়, পৌঁছানো তো গেছে।’
‘আপনি সাহার বাটি নীলকুঠি দেখতে চান, তাই তো? আজ বেলা পড়ে গেছে। কালকে সকালেই লোক দিয়ে আপনাকে কুঠিতে পাঠানোর ব্যবস্থা হবে। হাত-মুখ ধুয়ে রেস্ট নেন। চাইলে গোসলও করতে পারেন। সন্ধের পর কথা বলব। আমি মুক্তারকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, সে আপনার ঘর দেখিয়ে দেবে।’
খাটো লুঙ্গি, স্যাণ্ডো গেঞ্জি পরা টাকমাথা মুক্তারের পেছন পেছন বাড়ির ভেতর ঢুকলাম। প্রকাণ্ড উঠোনের এখানে সেখানে সাতটি গোলা। তিন দিক ঘিরে সারি সারি ঘর। ঘরগুলোর পেছনে আকাশছোঁয়া আম-কাঁঠালের গাছ। একপাশে চারদিক শান করা প্রকাণ্ড ইঁদারা। আমাকে থাকতে দেয়া হলো ইঁদারার কাছাকাছি একটা ঘরে। জানালা খুলতেই চোখে পড়ল বাইরের দিকে ফুলের বাগান, তারপর রাস্তা। মুক্তার সাবান-গামছা নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল চানের পানি তুলে দেবে কি না। বললাম, ‘ঠিক আছে, পানি রেডি করো, আমি আসছি।’
চানটান করে ঘরে এসে দেখি মুক্তার টেবিলের ওপর চা, মুড়ি-মুড়কি আর এক গ্লাস জল রেখে গেছে। চা আর জল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘণ্টা দুয়েক না ঘুমুলে আর চলছে না।
.
সাত
ঘুম ভাঙল মুক্তারের গলা শুনে। রাতের খাবার দেয়া হয়েছে, সাহেব অপেক্ষা করছেন। হাত-মুখ ধুয়ে মুক্তারের পেছন পেছন রান্না ঘরের দিকে রওনা হলাম। পাকা শানের ওপর পাটি পেতে খাবার দেয়া হয়েছে। পার্টির ওপর হেডমাস্টার সাহেব আসন পিঁড়ি হয়ে বসে আছেন। আমি তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। খাবারের আইটেম বেশি নয়। বেগুন আর মাসকলাই ডালের বড়ি দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল, চাল কুমড়ো ভাজি, মাসকলাইয়ের ডাল, আউশ ধানের মোটা লাল ভাত। মাছ খেতে গিয়ে মনে হলো মাছটা একটু পচা। আজিজ সাহেব বললেন, ‘এখানে ইলিশ মাছ পাওয়া যায় কালেভদ্রে। এই মাছ প্রথমে বরিশাল থেকে আসে খুলনায়, তারপর সেখান থেকে কুষ্টিয়ায়। ইলিশের মৌসুমে আমদানি বেশি হলে দাম পড়ে যায়। ফড়িয়ারা তখন কুষ্টিয়া শহর থেকে মাছ নিয়ে আসে গ্রামে-গঞ্জে। এখান থেকে কুষ্টিয়া প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে। আনতে আনতেই মাছ শেষ। যতবারই আনি, মাছ পচা। ফ্রেশ মাছ আর খাওয়া হলো না। খেতে না পারলে রেখে দেন।’
মাসকলাইয়ের ডালটা খেতে ভাল। ভাত যা খাওয়ার ওটা দিয়েই খেলাম। খাওয়া শেষ হলো জ্বাল দিয়ে ঘন করা গরুর দুধ, আখের গুড় আর চিনি চম্পা কলা দিয়ে। এরপর আজিজ সাহেব আমাকে নিয়ে এলেন গোল বারান্দায়। বাগানের দিকে মুখ করে বসলাম দু’জনে।
কথা শুরু করলেন মাস্টার সাহেব, ‘বারু, আপনি নীলকুঠি নিয়ে গবেষণা করছেন জেনে ভাল লেগেছে। আমি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে ইতিহাসে অনার্স করেছি, তারপর রাজশাহী ভার্সিটি থেকে এম. এ.। যখনই সময় পেয়েছি কুঠিয়ালদের সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছি। ভারতের ইতিহাস লিখেছে সাহেবরা। কুঠিয়ালদের ইতিহাস হলো জ্বালাও-পোড়াও আর নির্যাতনের ইতিহাস। সব নীলকুঠির মালিকই ছিল সাহেব। বেশিরভাগই ইংরেজ, কিছু কিছু ফরাসি। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা স্বজাতীয়দের এসব বর্বর কর্মকাণ্ডের ইতিহাস লিখে নিজেদের ছোট করতে চায়নি। খুব সাবধানে নীলকুঠির ইতিহাস এড়িয়ে গেছে তারা। যেটুকু বর্ণনা পাওয়া যায়, তার প্রায় সবটুকুই দেশি লেখক আর ঐতিহাসিকদের। যেমন, দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’। যা হোক, এদেশের নীলচাষ সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন, সেটুকু আগে শুনি, তারপর আমি বলব।
‘বাংলায় নীলচাষ হত পাঁচ হাজার বছরেরও আগে থেকে। এখান থেকে নীল চালান হত গুজরাটে। গুজরাট থেকে ভারতবর্ষের বাইরে অ্যালেক্যাণ্ডিয়া, ভেনিস আর কনস্টান্টিনোপলে। ইণ্ডিয়া নামটাই এসেছে প্রাচীন রোমান শব্দ ইণ্ডিকাম থেকে। ইউরোপের লোকেরা ভারতকে ইণ্ডিয়া বলত কারণ, সেই পুরাকালে এখান থেকে প্রচুর ইণ্ডিগো বা নীল রপ্তানী হত। ষোলো শত সতেরো শ’ সালে দাসদের দিয়ে আমেরিকায় ব্যাপকভাবে নীলচাষ শুরু হলে এই এলাকায় নীলচাষে ভাটা পড়ে। সতেরো শ’ সালের মাঝামাঝি আমেরিকা ঝুঁকে পড়ে গম, তুলা আর আখ চাষের দিকে। ওদিকে ইংল্যাণ্ডে তখন কাপড়ের কল গড়ে উঠেছে এদেশের গার্মেন্ট ইণ্ডাস্ট্রির মত। সাদা কাপড় আরও সাদা করার জন্যে তাদের দরকার শত শত টন নীল। কোথায় নীলচাষ হবে ইংরেজরা তখন হন্যে হয়ে সেই জায়গা খুঁজছে। তাদের ভাগ্যই বলতে হবে: ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তখন এদেশে জেঁকে বসেছে। বাংলার মাটি উর্বর, জলবায়ু উষ্ণ, পুরো দেশ জুড়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ। ঠিক এই সময়ই অযাচিত এক ধাক্কা খেল কোম্পানি। বাংলায় দেখা দিল স্মরণাতীতকালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর। দুর্ভিক্ষের কারণে দেদারসে লোকজন মরে জনপদের পর জনপদ খালি হয়ে গেল। চাষের জমি হলো বন- জঙ্গল। ধসে পড়ল কৃষি ব্যবস্থা। বাংলার শাসন হাতে নেয়ার পর কোম্পানি জমির খাজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল পাঁচগুণ। এখন দেখা গেল খাজনা আদায় হচ্ছে না একেবারেই। লোকজন নেই, খাজনা দেবে কে? খাজনা যা আদায় হয়, খাজনা আদায়ের খরচ তার থেকে ঢের বেশি। খাজনা আদায়ের জন্যে কোম্পানি জেলায় জেলায় সার্কিট হাউস মার্কিট হাউস বানিয়ে একাকার করেছে। তখন দেখা গেল খাজনার চেয়ে বাজনাই বেশি।
‘খাজনা কীভাবে বাড়বে এই চিন্তায় কোম্পানি যখন অস্থির, তখন লুই বোনার্ড নামের এক ফরাসি কোলকাতায় এসে হাজির হলো। চন্দননগরে প্রথম নীল-কারখানা এই বোনার্ডই তৈরি করে। তার দেখাদেখি ইংরেজ বণিক লুই ব্লুম হুগলিতে আরেকটি নীল কারখানা খুলে বসল। এসব নীলকররা ছিল মূলত ভাগ্যান্বেষী। তাদের হাতে টাকা-পয়সা বিশেষ ছিল না। এরা কোলকাতার এজেন্সি হাউস থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জমি কিনে শুরু করল নীলচাষ। একই সঙ্গে শুরু হলো কৃষকদের ওপর অভূতপূর্ব নিপীড়নের এক যুগান্তকারী ইতিহাস। বাংলায় নীলচাষ হত নদীয়া, যশোর, বগুড়া, রংপুর আর ঢাকাতে। নীলচাষীদের ওপর নীলকর সাহেবদের অত্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে ব্রিটিশ সরকার নীলচাষ নিয়ন্ত্রণ করে নতুন আইন পাশ করে। এরই ভেতর জার্মান বিজ্ঞানীরা কেমিকেল দিয়ে নীল তৈরির ফর্মুলা আবিষ্কার করে ফেলল। ঠিক সেই সময়ে একদল ইংরেজ বেনিয়া দেখল তুলোর থেকে পাটের কারবারে পয়সা বেশি। দেখতে দেখতে ইংল্যাণ্ডের ডাণ্ডিতে গড়ে উঠল শত শত পাটকল। নীলের চেয়ে তখন পাটের দাম, চাহিদা দুটোই অনেক বেশি। কৃষকদের আগ্রহ চলে গেল পাট চাষে। এদিকে আবার বাংলায় শুরু হলো শত শত মাইল রেল লাইন বসানোর কাজ। রেল কোম্পানিগুলোতে শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা, দুর্দান্ত মজুরী। কৃষকরা দেখল নীলচাষ করে ভাতে-লাঠিতে মরার চেয়ে রেল কোম্পানিতে কাজ করা অনেক ভাল। এখানেই শেষ নয়, নীল কৃষকদের কফিনে শেষ পেরেক পড়ল ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অভ ক্যালকাটা যখন ফেল মারল, তখন। ঋণ নিয়ে জমি কিনে নীলচাষ করার রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। নীলকর সাহেবরা বাংলা ছেড়ে বিহারমুখী হলো।’
‘এ হলো সব কেতাবী কথাবার্তা। কাহিনীর ভেতরেও কাহিনী আছে। আমাদের হাড়াভাঙ্গা হাইস্কুলের কথাই ধরেন। এই এলাকায় অত্যাচারী নীলকরদের কর্মকাণ্ডের ফসল ওটা। ব্যাপারটি খুলে বলি। ১৮৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছোটলাট জে. পি. গ্র্যান্ট কোলকাতা থেকে স্টিমারে সিরাজগঞ্জ যান। ঢাকায় তখন রেল লাইন বসছে। ঢাকা থেকে যমুনা নদীর ঘাট পর্যন্ত রেল বসানো যায় কি না, সেইটে দেখাই তাঁর উদ্দেশ্য। গঙ্গা-পদ্মা হয়ে যমুনা, তারপর সিরাজগঞ্জ। বিস্তর পথ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টিমারের ডেকে বসে থাকা। গ্র্যান্ট ধরলেন শর্টকাট রাস্তা। মাথাভাঙ্গা নদী দিয়ে পদ্মায় যেতে চাইলেন। মাথাভাঙ্গা দিয়ে যাওয়ার সময় ঘটল যত বিপত্তি। স্টিমার চলল একটানা চোদ্দ ঘণ্টা। এই চোদ্দ ঘণ্টার পুরো সময়টা ধরেই নদীর দু’পাড়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন গ্র্যান্ট। ভাবলেন বাংলার জনগণ তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছে। হকচকিয়ে গেলেন গ্র্যান্ট। এ ধরনের রিসেপশন ইংল্যাণ্ডের রাজাও কোনদিন পায়নি। কিছুক্ষণ পর তাঁর মন খুঁতখুঁত করতে লাগাল। হাত-নাড়া, পতাকা ওড়ানো এসব কিছু নেই কেন? এরা তো স্রেফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে! নিজের উৎফুল্ল ভাব চেপে রেখে একান্ত সহকারী সচিবকে জিজ্ঞেস করলেন, নদীর দু’পাড়ে সার ধরে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে কেন? সচিব বলল, স্যর, ওরা নেটিভ। অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের হাত থেকে যাতে আপনি তাদের বাঁচান, সেই বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। চুপসে গেলেন গ্র্যান্ট। বললেন, সামনে কোন ঘাট পাওয়া গেলে সেখানে স্টিমার ভেড়াও। এখন যেখানে স্কুল আদিকালে ওখানেই একটা ঘাট ছিল। ঘাটের কাছে পণ্ডিত মোহিনী মোহনের একটা টোলও ছিল। ছোটলাটের স্টিমার ঘাটে ভিড়ছে দেখে দলে-দলে লোক ছুটে গেল। মোহিনী মোহন তখন তার টোলে ছাত্র ঠ্যাঙাচ্ছে। হৈ-চৈ শুনে বাইরে এসে দেখল ছোটলাট স্টিমার থেকে নামছেন। এক ছাত্রের বাবা বড় বড় ডাব, মুড়ি আর খাগড়াই পাঠিয়েছিল পণ্ডিতের জন্যে। মোহিনী তৎক্ষণাৎ ওগুলো নিয়ে ঘাটে গিয়ে হাজির। সাহেব দেখলেন মাথার টিকি, পরনে ধুতি, ক্লিন শেভ পণ্ডিত খাবারের ডালা হাতে দেঁতো হাসিতে তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছে! ছোটলাট খুব খুশি হলেন। ভাবলেন, এই অজ পাড়াগাঁয়ের মূর্খ লোকগুলোও কিছুটা ম্যানার্স জানে দেখছি। মুখে বললেন, ‘হ্যালো, পাণ্ডিট, ইটার কিয়া প্রবলেম হায়?’
‘পণ্ডিত বলল, ‘মহারাজ, আগে টোলে চলেন, পরে সব বুঝিয়ে বলচি। আঁটি ভেঙে তালশাঁস যদি না বের করে দিতে পারি, তা হলে আমার নাম মোহিনী পণ্ডিতই না।’
‘মোহিনীর কথা শুনে সাহেব তাঁর সচিবের দিকে তাকালেন। সচিব তাঁকে পণ্ডিতের কথা ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনাল। টোলের ঝকঝকে তকতকে উঠোনে বিশাল নিমগাছের ছায়ায় চেয়ারে বসে কাঁসার গ্লাসে ডাবের পানি খেতে খেতে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী শুনলেন ছোটলাট। বললেন, ব্যবস্থা নেবেন। তবে সময় লাগবে। কিন্তু এরই ভেতর একটি উপহার গ্রামবাসীকে তিনি দেবেন। এই টোলের জায়গায় একটা হাইস্কুল হবে। এসব সাহেব-সুবোদের কথার দাম ছিল। আজকালকার রাজনীতিবিদদের মত না যে, সম্ভব অসম্ভব সব প্রতিশ্রুতি দেবে, কিন্তু রক্ষা করবে না কোনটাই। দু’বছরের ভেতর হাড়াভাঙ্গা হাইস্কুল হলো। তার কিছু দিন পর বন্ধ হলো নীলচাষ। কাহিনী আরও আছে। পরে শুনবেন। রাত হয়েছে, আজকের মত শুয়ে পড়ুন। এই, মুক্তার, বাবুকে ঘর দেখিয়ে দে।’
ঘরে ফিরে হারিকেন নিভিয়ে চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি, ঘুম আসছে না। মাথা আর পায়ের কাছে জানালা খোলা। হু-হু করে বাতাস আসছে মাথার দিকের জানালা দিয়ে। সেই সঙ্গে ঢুকছে হাসনাহেনার ম-ম গন্ধ। বাগানের কোথাও অজস্র হাসনাহেনা ফুটেছে। প্রকৃতির কিছু কিছু জিনিস সহজে চেঞ্জ হয় না। এই হাসনাহেনার গন্ধ, এই হু-হু বাতাস নীলকরদের সময়ও ছিল, ছিল তারও আগে নবাবী কিংবা সুলতানী আমলে। হয়তো সেন যুগেও ছিল অথবা তারও আগে পাল রাজত্বে। আরও পেছনে গেলে শশাঙ্কের শাসনামলে কিংবা মৌর্য যুগে। আগামীকাল কী করব, সেইটে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম।
.
আট
সকালে ঘুম ভেঙে উঠে দরজা খুলে কুয়ো তলায় গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে শেভ-টেভ করে ফ্রেশ হলাম। রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে মুক্তারের পরিবেশনায় মাসকলাইয়ের ডালের খিচুড়ি, ঘি আর আলুভাজি দিয়ে নাস্তা সারলাম। এরা মাসকলাইয়ের ডাল ছাড়া অন্য ডাল চেনে বলে মনে হচ্ছে না। আজিজ সাহেব কোথায় জিজ্ঞেস করলে মুক্তার জানাল, কী এক কাজে আজিজ সাহেবকে গাংনী থানায় শিক্ষা অফিসে যেতে হয়েছে। ফিরতে দেরি হবে। মুক্তার জানতে চাইল আমি সাহার বাটিতে যেতে চাই কি না। যেতে চাইলে সঙ্গে যাওয়ার লোক জোগাড় করে দেবে। বাড়ি খালি করে তার পক্ষে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। মুক্তারকে বললাম, কদমকে ডেকে দিলেই হবে। মুক্তার বলল, ‘আপনি জামা-কাপড় পরে রেডি হন। আমি কদমকে আনার ব্যবস্থা করছি। আর একটা কথা, আপনার নোংরা কাপড়গুলো কাচার জন্যে আমার কাছে দিয়ে যেতে পারেন। ওগুলো কেচে শুকানোর ব্যবস্থা করব।’
কাপড় কাচার আইডিয়া দারুণ। তবে এটা মুক্তারের, না তার সাহেবের, সেইটে জানা হলো না।
.
কদমকে সঙ্গে নিয়ে আধঘণ্টা হাঁটার পর জিজ্ঞেস করলাম, ‘কদম, সাহার বাটি আর কত দূরে? আর কত দূর প্রেমেরই সেই মধুপুর?’
এ প্রশ্নের উত্তরে কিছু বলল না কদম। সোজা হাঁটতে থাকল। হাড়াভাঙ্গা গ্রামের মানুষগুলো মনে হয় কিছুটা যান্ত্রিক। যে যার কর্তব্য করছে। আজিজ মাস্টার, মুক্তার, কদম, হাইস্কুলের গার্ড-এরা কেউই দিলখোলা নয়। এরা মনে হয় বাইরের মানুষদের খুব একটা পছন্দ করে না। আরও আধঘণ্টা হাঁটার পর সাহার বাটি পৌঁছলাম। বলতে গেলে, যেন হঠাৎ করেই সামনে উদয় হলো ওটা। আসলে রাস্তাটা ওখানে বাঁক নিয়েছে। বাঁকের আড়ালেই বিশ একর জায়গা জুড়ে সাহার বাটি। বাড়ির চৌহদ্দি বড়-বড় ঝাউ আর দেবদারু গাছ দিয়ে ঘেরা। পুরো কম্পাউণ্ডেই লিচু ও নারকেল গাছের ছড়াছড়ি। ঝাউ, দেবদারু আর লিচু গাছগুলো এত পুরনো যে বাকল ফেটে গাঁট বেরিয়ে গেছে। কম্পাউণ্ডের একদিকে ইয়া বড় দিঘি। দিঘির পাড় ঘেঁষে বিরাট বিরাট সব কংক্রিটের চাঁই পড়ে আছে। একসময় ওগুলো বাঁধানো ঘাটের অংশ ছিল। টলটলে কাকের চোখ দিঘির জল। হালকা বাতাসে তিরতির কাঁপছে। দিঘির পাশে আড়াআড়ি বানানো নীল-কারখানার ফাটল ধরা বিরাট মেঝের এখানে-ওখানে দেয়ালের মাত্র কয়েকটা অংশই দাঁড়িয়ে আছে। মেঝের একদিকে পাশাপাশি বানানো অতিকায় তিনটে চৌবাচ্চা। যদিও ওগুলোর দেয়ালও ভেঙে পড়েছে, তবুও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ওগুলো চৌবাচ্চাই। পাশেই স্টিম পাম্পের পেল্লায় প্ল্যাটফর্ম। প্রকাণ্ড বয়লারের কঙ্কাল। কংক্রিটে গাঁথা ভাঙাচোরা লোহা-লক্কড়ের জঞ্জাল।
নীল-কারখানার পাশেই বিরাট লম্বা-চওড়া এক উপত্যকা। সবুজ ফসল ফলেছে ওখানে। আগে ওটাই গভীর নদী ছিল। প্রচুর জলের সরবরাহ ছাড়া নীল- কারখানা অচল। নীল কোলকাতায় বয়ে নেয়ার জন্যেও নদীর বিকল্প ছিল না। যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরের সব নীলকুঠি নদীর ধারে। নীল জাগ দেয়ার জন্যে দরকার হত পরিষ্কার স্বচ্ছ জল। দিঘি থেকে স্টিম পাম্প দিয়ে অনবরত জল তোলা হত। নদীর পাশে হওয়ায় দিঘির জল শুকোেত না। কারখানা পেরিয়ে কম্পাউণ্ডের একদিক ঘেঁষে অসংখ্য ছোট ছোট ঘরের ধ্বংসাবশেষ। শ্রমিকদের কোয়ার্টার। আজকাল অটো রাইস মিল কিংবা ধানের খোলায় যেমনটা দেখতে পাওয়া যায়। কারখানা, দিঘি আর শ্রমিকদের কোয়ার্টার যদি ডান দিকে রাখি, তা হলে কুঠিয়াল সাহেবদের বাসভবন পড়বে বেশ কিছুটা দূরে হাতের বাঁ দিকে। মূল ভবনের দিকে পা বাড়ালাম। ঊনবিংশ শতকের ইংরেজ স্থাপত্যশৈলী। দোতলা বাড়ি। নিচের তলায় প্রকাণ্ড হলঘর, ফায়ারপ্লেস, চিমনি, ডাইনিংরুম, গেস্টরুম, কিচেন, সার্ভেন্ট্স কোয়ার্টার, টয়লেট। হলঘরের পেছনে ঘুপচি সিঁড়ি ঘর। সরু সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলে মাস্টার বেডরুম সহ আরও তিনটে বেডরুম ও বাথরুম। বাড়ির দু’পাশে আর পেছনে সাত ফিট চওড়া টানা বারান্দা। সূর্যের আলো যাতে কোনভাবেই রুমের দেয়াল স্পর্শ করতে না পারে। বাংলার উষ্ণতা সাহেবদের বিস্তর কষ্ট দিয়েছে। ঘর ঠাণ্ডা রাখার সব কৌশলই তারা আয়ত্ত করেছিল। জানালা-দরজা সব মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত লম্বা। যদিও জানালা- দরজার জায়গায় এখন শুধু ইয়া বড়-বড় গর্ত। পেছনদিকটা ভেঙে পড়েছে, বারান্দারও খুব অল্পই অবশিষ্ট আছে। তবে বাড়ির চারদিকে গাঁট বেরিয়ে পড়া ঝাউগাছগুলোর কয়েকটা কোনমতে টিকে গেছে। বাড়ির একেবারে সামনে চারটে পিলারের ওপর গ্রিক ধাঁচের তিনকোনা ছাদঅলা বিশফুট চওড়া গাড়ি বারান্দা। মেইন এন্ট্রান্স থেকে অন্তত ত্রিশ ফুট লম্বা হবে ওটা। গাড়ি বারান্দা দোতলার ছাদের সমান উঁচু। খাঁজকাটা পিলারগুলো নিচের দিকে চারকোনা পেডেস্টালের ওপর দাঁড়িয়ে। গাড়ি বারান্দার ছাদ ধসে পড়েছে আগেই। শুধু সামনের দুটো পিলারের ওপর তিনকোনা দেয়ালের মত অংশটা রয়ে গেছে। সোজা বাংলায় গাড়ি বারান্দার কপাল বা ঘরামিদের ভাষায় কপালিটা এখনও টিকে আছে। এই কপালির মাঝখানে বৃত্তের ভেতর লম্বাটে গ্লোবের মত নকশা কাটা। দেখতে অনেকটা লম্বাটে কনভেক্স লেন্সের মত। গাড়ি বারান্দার কপালির মাঝখানে এই নকশা পশ্চিমা দেশগুলোতে খুবই কমন জিনিস। আলমারির মাথায়, খাটের মাথার কাছে এই নকশা অহরহ দেখতে পাওয়া যায়। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল না করে পারলাম না। সেটা হলো, গাড়ি বারান্দা তৈরি হয়েছে মূল ভবন তৈরির আরও অন্তত দশ বছর পরে। বিষয়টা আরও নিশ্চিত হলাম গাড়ি বারান্দায় ঢুকতেই ডান দিকের পিলারের চৌকোনা অংশে গ্র্যানিট স্ল্যাব দেখে। স্ল্যাবের ওপর লেখা:
SHARROW BUTTE
FOUNDER OF
NEMESIS INDIGO PLANTATION
MDCCCLXI
গাড়ি বারান্দার পিলারগুলোর মাঝখান থেকে ফুট দশেক দূরে ইউক্যালিপটাস জাতীয় ফকফকে সাদা, লম্বা একটা গাছ দেখতে পেলাম। বহু পুরনো গাছ, নিচের দিকে ডালপালা ভেঙে গেছে অনেক আগেই। ভাঙা জায়গাগুলোতে কালো পিচের মত কীসব বেরিয়েছে। অনেক উঁচুতে তেজপাতার মত কিছু হলুদ বিবর্ণ পাতা। গাছের গোড়ায় উঁই পোকার বাসা। সারা গায়ে উঁই পোকা চলাচলের চিহ্ন। গাছটা সিডারও হতে পারে। বাংলার জল-হাওয়ায় ওটার চরিত্রই হয়তো বদলে গেছে আরও সামনে ঘাসে ঢাকা সমতল ধু-ধু মাঠ। মাঠের ডান পাশে সীমানা ঘেঁষে আস্তাবল আর গরুর ফার্মের ধ্বংসাবশেষ। খড়-বিচালি কাটার যন্ত্রপাতি আর জাবনার চাড়িগুলোর ভগ্নাংশ পড়ে আছে সেখানে। বাড়ির সামনের বড় মাঠে গরু- ঘোড়া চরত আর খুব সম্ভব পোলো খেলা হত। নীলকর সাহেবরা অনেকেই স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বও পালন করত। এজন্যেই যা খুশি করার স্বাধীনতা তাদের ছিল। ম্যাজিস্ট্রেসি টিকিয়ে রাখার জন্যে শহর থেকে আমলাদের এনে পোলো খেলা, শিকার, বজরা-ভ্রমণ, নাচগান, তাস খেলার পার্টি এসবের আয়োজন করা ছিল নিত্য দিনের ঘটনা।
দারুণ গুমট দিন, একটুও বাতাস নেই কোথাও। থম মেরে আছে চারদিক। সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। এবার বাড়ি ফেরার পালা। ঘেমে-নেয়ে ফিরতে ফিরতে ধোঁয়া ধোঁয়া লালচে মেঘে ঢেকে গেল আকাশ, সেই সঙ্গে বইতে লাগল কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। কদম বিদায় নিয়েছে আগেই। বাতাসের বেগ বাড়তেই থাকল। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে যখন আমার রুমে পৌঁছলাম, তখন মড়মড় করে ভেঙে পড়ছে মস্তবড় সব গাছ। শূন্যে উড়ছে ধুলো, বিচালি, বাঁশের বাখারি, ছেঁড়া কাপড়, বেতের ঝুড়ি, খড়ের চাল, দুমড়ানো টিন। বাঁশঝাড়ের কড়কড় আর টিনের চালের ধ-ধস্ শব্দ শুনে মনে হতে লাগল, আজকেই রোজকেয়ামত হবে। টিনের চালকে পাকা বিল্ডিঙের ওপর ধরে রাখার জন্যে মোটা তারের টানা দেয়া হয়। টিনের চালা সাধারণত নিজের ওজনেই চার দেয়ালের ওপর বসে থাকে। টানার কাজ শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টির সময়। লক্ষ করলাম, ঢিলেঢালা তারগুলো ধনুকের ছিলার মত টানটান। কতক্ষণ টেনশন ধরে রাখবে, কে জানে? ঘরের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। হারিকেন নিয়ে মুক্তার এখনও পৌঁছাতে পারেনি। প্রাগৈতিহাসিক ঝড়ে থরথর করে কাঁপছে দেয়াল। আদ্যিকালের গুহাবাসী মানুষের মত ভয়ে সিঁটিয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর মনে হলো ঝড়ের তাণ্ডব সামান্য কমেছে। হঠাৎ শুরু হলো তীব্র চড়-চড় শব্দ। শিলাবৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চালে ধপ-ধপ আওয়াজ দিচ্ছে যখন-তখন। বড়-বড় শিলার টুকরো পড়লে এমনটা হওয়ার কথা। এরও বেশ কিছুটা পরে শুরু হলো মুষল ধারায় বৃষ্টি। তারই ভেতর হারিকেন দিয়ে গেল মুক্তার। থমথম করছে মুখ। ভাবলাম, কোন কিছু জিজ্ঞেস না করাই উত্তম। হারিকেনের আলোয় দেখলাম ঘরে ধুলোর রাজত্ব-মেঝে, বিছানা-বালিশ, আলনা, টেবিল-চেয়ার সবখানে ধুলো আর ধুলো। ঘরের ধুলো ঝেড়েঝুড়ে পরিষ্কার না করলে বাস করা অসম্ভব। কোনা কাঞ্চিতে কোথাও ঝাড়ু-ফাড় আছে কি না, খুঁজে দেখলাম। বৃথা চেষ্টা, শুধু খাটের নিচে মাঝারি সাইজের জং-ধরা একটা ট্রাঙ্ক পড়ে আছে। মুক্তারের জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। হঠাৎ মনে হলো ট্রাঙ্কের ডালার ওপর কী যেন আছে। আমার দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে ওটা। ট্রাঙ্কটা টেনে বাইরে এনে হারিকেনের আলোয় ভাল করে দেখলাম। জং-ধরা জলপাই রঙের ট্রাঙ্কের ওপর সাদা রঙে লেখা। ডালার ওপরকার ইংরেজি অক্ষরের অনেকটাই জং খেয়ে ফেলেছে। তার পরেও পড়া যায়: Major Humaid Al Balushi, 19 Baloch Regiment, Pakistan Army। বালুচ রেজিমেন্ট বহু পুরনো রেজিমেন্ট। সেই ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি আমলের। এই একটি রেজিমেন্ট ভেঙে পরে আরও নয়টি রেজিমেন্ট হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে ১৯ বালুচ রেজিমেন্ট মোতায়েন করা হয়েছিল যুদ্ধের সময় পাক বাহিনির সৈন্যদের ভেতর বাঙালিদের প্রতি মায়া-দয়া ছিটে- ফোঁটা যা দেখিয়েছে, তা এই বালুচরাই। বালুচরা পাকিস্তানি হলেও পাঞ্জাবীদের অপছন্দ করে। এমন কী বালুচিস্থান প্রদেশ যেটা ইরানের সঙ্গে, সেখানে পাকিস্তানের অন্য প্রদেশের লোকেরা যাক, সেটাও তারা চায় না। বহুকাল আগে এই বালুচ গোত্র সিরিয়া এবং জর্ডানের দক্ষিণাঞ্চল থেকে পাকিস্তানে আসে। বালুচরা দেখতে পাঞ্জাবীদের থেকে আলাদা। এরা লম্বা, ফর্সা, সুদর্শন। সে যা-ই হোক, হামেদ বালুচির মিলিটারি ট্রাঙ্ক আজিজ মাস্টারের বাড়ির খাটের তলায় এল কীভাবে? ট্রাঙ্কের ভেতর কী আছে জানার খুব কৌতূহল হলো। মরচে পড়া মাঝারি সাইজের তালা ঝুলছে ওটা থেকে। তালাটা একটু টান দিতে এমনিই খুলে এল। ট্রাঙ্কের ডালা খুলতে যাব, ঠিক সেই সময় দরজার সামনে পায়ের আওয়াজ পেলাম। তাড়াহুড়ো করে ট্রাঙ্কটা খাটের তলায় ঠেলে ঢুকিয়ে বিছানায় বসলাম। দরজা খুলে টর্চ লাইট হাতে মুক্তার ঢুকল। জানাল রাতের খাবার দেয়া হয়েছে। আলু ভর্তা, ডাল আর ভাত খেয়ে ডিনার সারলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম, তখনও ফেরেননি আজিজ মাস্টার। মালিকের অবর্তমানে চাকর-বাকররা বাইরের লোকের সঙ্গে বেয়াদবির চূড়ান্ত করে। মুক্তারকে ঘর পরিষ্কারের কথা না বলে জিজ্ঞেস করলাম, একটা ঝাড়ু পাওয়া যাবে কি না। মুখ হাঁড়ি করে মুক্তার জানাল কাল সকালে দেখা যাবে।
.
নয়
ঘরে ফিরে দরজায় হুড়কো লাগিয়ে ট্রাঙ্ক খুললাম। ভেতরে পাকিস্তান আর্মির ছাপ মারা দুটো ফাইল, ছোট একটা কোরান শরীফ, খাপে ভরা শিঙের মত বাঁকা এক ইয়েমেনি ছুরি, ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র, আর টিপ বোতাম দিয়ে কাভার পেজ আটকানো একটা ডায়ারি পেলাম। ট্রাঙ্ক বন্ধ করে ডায়ারিটা নিয়ে বিছানায় উঠলাম। বালিশে হেলান দিয়ে খুললাম ওটা। ফাউন্টেন পেন দিয়ে কালো পেলিক্যান কালিতে ইংরেজিতে লেখা হয়েছে। কালো কালি রঙ বদলে কটা হতে শুরু করেছে। ডায়ারির সব এন্ট্রিই ১৯৭১ সালের। তবে লেখা হয়েছে অনিয়মিতভাবে। দিন-তারিখের কোন ঠিক-ঠিকানা নেই।
১৯ এপ্রিল, ১৯৭১। ১৭ এপ্রিল করাচি থেকে প্লেনে কুর্মিটোলা এয়ারপোর্টে পৌঁচেছি। নেমেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট অফিসার্স মেসে উঠব বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু ঘটল ঠিক তার উল্টো। আমাকে যেতে হলো ঢাকা মিড টাউনের একটা সাদা দালানে। জেনারেল রাও ফরমান তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড এখান থেকেই পরিচালনা করেন। সকাল থেকেই ব্যস্ত জেনারেল। আমার সঙ্গে দেখা করলেন না। জেনারেলের টু আই সি জানালেন আমাকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে রিপোর্ট করতে হবে। সরু হাইওয়ে, বিস্তর ছোট-বড় নদী, বড়-মাঝারি ফেরিতে পাঁচ-ছ’টা নদী পার হয়ে আমাদের কনভয়টা যখন যশোর পৌঁছল, তখন প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
করাচি থেকে রওনা হওয়ার পর দু’দিন পেরিয়ে গেছে। শেভ, গোসল, ঘুম কোনটাই হয়নি। সময় নিয়ে শেভ-গোসল সেরে সন্ধ্যায় কমাণ্ডিং অফিসার কর্নেল গুল মহম্মদ বারাকজাই-এর সঙ্গে ডিনার করলাম। ত্রিশ সের ওজনের খাসির মাংস ভুনা আর ছোলার ডাল। সঙ্গে রুমালি রুটি, প্রচুর কাঁচা পেঁয়াজ এবং কোকাকোলা। বারাকজাইও বেলুচ রেজিমেন্টের। তাকে কুষ্টিয়ায় পাঠানোই হয়েছে স্বজাতি হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে। তবে বাঙালির ওপর ঝাল ঝাড়ার বিষয়ে তার খুব বেশি আগ্রহ আছে বলে মনে হলো না। পরদিন সকালে কর্নেল আমাকে যশোর থেকে আনা প্লাটুন সহ হাড়াভাঙ্গা পাঠালেন। ব্রিফিঙে বললেন, লোকাল লোকদের সঙ্গে যতদূর সম্ভব ঝামেলা এড়িয়ে চলতে। আমাদের মূল যুদ্ধ বাঙালিদের সঙ্গে না, ভারতীয়দের সঙ্গে। কোন কারণে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সে বাঙালির সঙ্গেই হোক কিংবা ভারতীয়, চারঘণ্টার আগে রিইনফোর্সমেন্ট পৌঁছনোর আশা করা বৃথা হবে। রাতের বেলা কোন অবস্থাতেই রিইনফোর্সমেন্ট পাঠানো হবে না। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। যুদ্ধ মানেই ধর তক্তা, মার পেরেক না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে যুদ্ধ এড়াতে পারাই প্রকৃত যুদ্ধ। জেনারেল নিয়াজির মত উড়নচণ্ডী হামবাগ ইস্টার্ন হাইকমাণ্ড না হয়ে, বারাকজাই হলে ভাল হত। ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখ। রাতে বৃষ্টি হতে পারে, আশা করছি ভাল ঘুম হবে।
২০ এপ্রিল, ১৯৭১। সাহার বাটি নীলকুঠিতে ক্যাম্প করেছি। সাহার বাটিতে এসে দেখলাম এর চারপাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। গাছপালা যা আছে, সব কম্পাউণ্ডের ভেতর। দুশমন আক্রমণ করতে এলে দূর থেকে দেখা যাবে। গাছের আড়ালে চমৎকার অ্যামবুশ। হামলা করার পর চট্ করে সরে যাওয়ার উপায় নেই। আপাতত তাঁবু খাটানো হয়েছে। আজ রাতটা কোন রকমে পার করে কাল সকাল থেকে পার্মানেন্ট ব্যবস্থা করতে হবে। অর্ধেক জওয়ান জেগে পাহারা দেবে, বাকি অর্ধেক পুরো ব্যাটল ড্রেস পরে হাতিয়ার পাশে নিয়ে ঘুমাবে। ছ’জন দু’দলে ভাগ হয়ে আধঘণ্টা পর পর পুরো কম্পাউণ্ড রেকি করবে। সারারাত জেগে থাকা অর্থহীন। ঘুমিয়ে পড়ব।
২১ এপ্রিল, ১৯৭১। ওয়াচ টাওয়ার বসানো, বাঙ্কার খোঁড়া শেষ। সেনা ছাউনিও তৈরি হয়েছে। মূল ভবন সাফ সুতরো করে দোতলার একটা ঘর আমার জন্যে নিয়েছি। পাশের ঘরটা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সিগনাল কোরের সদস্যদেরকে। নিচের বড় হলঘরটাকে আপাতত আমারি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওখানে রাখা হয়েছে অস্ত্র-শস্ত্র, গোলা-বারুদ, আর সাপ্লাই। হলঘরের পাশে প্যান্ট্রি রুমটা রাখা হয়েছে লেফটেন্যান্ট এবং ক্যাপ্টেনের জন্যে। আরও একটা প্লাটুন কাল আসার কথা। জুনিয়র অফিসার দু’জন আসবে তাদের সঙ্গে। কুঠির নামফলকে শ্যারিয়ার বাটের নাম লেখা। সম্ভবত সাহার বাটি ওই নামেরই অপভ্রংশ। রোমান সংখ্যায় ১৮৬১ সাল লেখা থাকলেও, ওটা হয়তো গাড়ি বারান্দা যখন তৈরি হয়, তখনকার সাল। মূল ভবন খুব সম্ভব ১৭০০ সালের শেষে কিংবা ১৮০০ সালের শুরুতেই তৈরি হয়েছিল। শ্যারিয়ার বাটের ঠিকুজি-কুলজি জানতে পারলে অনেক কিছু বোঝা যেত। সেনাসদস্য হিসেবে রণাঙ্গনে বসে বাংলার অখ্যাত গ্রামের নীলকুঠির ইতিহাস পর্যালোচনা করা আমার কাজ নয়। তার পরেও এত কথা লিখছি শুধু একটা কারণে। কারণটার মূলে যিনি আছেন, তিনি আমার মামার কাছ থেকে শোনা তাঁর বাবা অর্থাৎ আমার নানার কাহিনী। এই কাহিনী অনেক দিন ধরে মামার কাছ থেকে অল্প অল্প করে শোনা। ভাবছি, এইবার সব লিখে রাখব। যুদ্ধের ডামাডোলে কে বাঁচে, কে মরে, কে জানে!
নানার নাম গাউস পিশানি। করাচি থেকে ক্যালকাটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এফ. এ. বা এ কালের আই. এ. পাশ করলেন। মহেঞ্জোদারো আর হরপ্পা নিয়ে তখন তুমুল মাতামাতি। খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে পুরোদমে। পাশটাশ করে ১৮৬০ সালে দোভাষী হিসেবে চাকরি নিলেন হরপ্পা সাইটে। সোজা কথায়, খোঁড়াখুঁড়ির লেবার সুপারভাইযারের দায়িত্ব পেলেন তিনি। সাইটের প্রধান গবেষক ব্রিটিশ আর্মির ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের মেজর জেনারেল অ্যালেক্যাণ্ডার কানিংহ্যাম। ইনি আসলে ইণ্ডিয়ান আর্কিওলজিকাল সার্ভের প্রধান। বিরাট দাপট অলা লোক। কানিংহ্যাম মহেঞ্জোদারোতেই বেশিরভাগ সময় থাকেন। নির্বাহী গবেষক আরেকজন ইংরেজ। তাঁর নাম ভ্যান হওসেন বাট। অল্প কিছুদিন যেতেই নানা বুঝতে পারলেন, প্রাচীর মুদ্রার ব্যাপারে ভ্যান হওসেনের আগ্রহ অসীম। ষাঁড়, হাতি, গণ্ডার আঁকা চারকোনা মুদ্রা পেলেই রাতের পর রাত ওগুলো নিয়ে মেতে থাকেন। এইসব মুদ্রায় জন্তু-জানোয়ারের ছবির ওপর এক লাইনে ত্রিভুজ, বরফি, চাকতি, আর রোমান বর্ণমালার এক্স, ইউ এবং ভি টাইপের অদ্ভুত সব প্রাচীন লিপি। কোন কোন লিপি আবার মাছের মত দেখতে। খুঁড়তে খুঁড়তে হয়তো প্রাচীন কোন কুয়ো পাওয়া গেল। কালের প্রবাহে কুয়োর গর্ত মাটিতে ভরে গেছে। শুধু পাথরে তৈরি গোল পরসীমা কিংবা পোড়া মাটির চাক দেখে প্রাগৈতিহাসিক কুয়ো বলে বোঝা যায়। ভ্যান হওসেন তৎক্ষণাৎ দশজন মজুর লাগিয়ে ওই কুয়ো খোঁড়াবেন। শ্রমিকেরা খুঁড়তে খুঁড়তে মাটির নিচে আশি ফুট পর্যন্ত চলে যাবে। চল্লিশ ফুট পর্যন্ত খোঁড়া মাটি ভ্যান হওসেন ফেলে দেবেন। এরপর ঝুড়ি ভরে যত মাটি উঠবে, সব পানিতে গুলে চালনায় চালতে বলবেন। তাঁর ধারণা, প্রাচীন মুদ্রা পাওয়ার সব থেকে সহজ উপায় কুয়োর তলা। মায়া, অ্যাযটেক, ইনকা অর্থাৎ মেসো আমেরিকান সভ্যতা থেকে শুরু করে প্রাচীন সব সভ্যতাতেই নাকি পবিত্র কুয়ো থাকত। এইসব কুয়োতে কুমারী নারী বিসর্জন সহ এন্তার টাকা-পয়সা, থালা-বাটি-গহনা ছুঁড়ে ফেলা হত। প্রাচীনকালের গুপ্ত ধন- ভাণ্ডার কিংবা সরকারি ট্রেজারি খুঁজে পাওয়া আর হ্যালির ধূমকেতু দেখা একই কথা। তা ছাড়া, একটা সভ্যতা রাতারাতি বিলুপ্ত হওয়ার উদাহরণ মানব ইতিহাসে মাত্র দুটো: পম্পেই আর হারকুলেনিয়াম। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সভ্যতা বিনাশের আগেই টাকা-পয়সা, গয়না-গাঁটি, দামি মূর্তি-ফূর্তি কোন গোপন জায়গায় সরিয়ে ফেলা হয়েছে, অথবা বাসিন্দারা সঙ্গে নিয়ে অন্য কোথাও সরে গেছে। অতএব কুয়োই ভরসা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভ্যান হওসেনের থিওরেম ঠিক ছিল এক শ’ ভাগ। কুয়োর তলা থেকে যেসব জিনিস বেরোতে লাগল, সেসব দেখে অন্য গবেষকদের চোখ ছানাবড়া। তবে মুদ্রার ব্যাপারে ভ্যান হওসেনের অদম্য আকর্ষণের কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নানা দাঁড় করাতে পারলেন না। যত দিন যায়, ভ্যান হওসেনকে নানার কাছে তত রহস্যময় মনে হয়। নানার মনে হলো, পাগলের মত কিছু একটা খুঁজছেন লোকটা। বিষয় কী জানার জন্যে জেদ চেপে গেল তাঁর। কিন্তু জেদ চাপলেই তো আর হবে না। ভ্যান হওসেন খুব নামকরা লোক। হাজার বছরের পুরনো এক প্রখ্যাত ইংরেজ পরিবারের সদস্য তিনি। টাকার কোন অভাব নেই এঁদের। ব্রিটিশ সরকারের অনুদানে খোঁড়াখুঁড়ি চললেও ভ্যান হওসেন দেদারসে পকেটের পয়সা খরচ করে যাচ্ছেন। অনুদান আসে কালেভদ্রে। আসলেও মেজর জেনারেলের আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করতেই ওটার সিংহভাগ খরচ হয়। সরকারি অনুদান কবে আসবে সেই আশায় বসে থাকার লোক ভ্যান হওসেন না। আই. এ. পাশ হলেও নানা ছিলেন প্রকৃত শিক্ষিত। তুখোড় বুদ্ধি ছিল তাঁর। হরপ্পা সাইটে কাজ করতে আসা লেবারদের সঙ্গে ভাব জমালেন নানা। তাদের সঙ্গে নিয়ে আশপাশের গ্রামগুলো চষে ফেললেন। বুড়ো-ধুড়ো লোকদের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিলেন, হরপ্পা সাইটটা প্রথমে কে খুঁজে বার করেছে। খুঁজে পাওয়ার পর সে গেলই বা কোথায়? মানুষের ভাগ্য মাঝে মধ্যে অপ্রত্যাশিত ফলাফল বয়ে আনে। একে কাকতালীয় বললেও কম বলা হয়। নানা এমন কিছু তথ্য পেলেন, যার বিনিময়ে ভ্যান হওসেনকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো যাবে।
মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা এই দুই সাইটেই পাবলিক বাথ হাউস বলে দুটো জায়গা ছিল। সাড়ে চার হাজার বছর আগে নগরীর অগুনতি নারী-পুরুষ এই বাথ হাউসে গোসল করত। বাথ হাউসগুলো সমতল জায়গা থেকে বেশ উঁচুতে। ওগুলোই নগরীর সর্বোচ্চ শিখর। প্রায়ই সূর্য ডোবার সময় হরপ্পা কয়েন হাতে ভ্যান হওসেন প্রাচীন বাথ হাউসের আদ্যিকালের চৌবাচ্চার দেয়ালের ওপর বসে থাকতেন। দৃষ্টি চলে যেত অনেক দূরে, ডুবে যেতেন গভীর চিন্তায়। বহুকাল হয় ধ্বংস হয়েছে এমন সুনসান নগরীতে উঁচু জায়গায় বসে সূর্যাস্ত দেখা এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এর গা শিরশিরে অনুভূতি ভুলবার নয়। একদিন ভ্যান হওসেন দেয়ালের ওপর বসে যখন সূর্য ডোবা দেখছেন, নানা গিয়ে হাজির হলেন। ধ্যান ভেঙে মহা বিরক্ত হয়ে সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, গাউস, কোন সমস্যা?’
নানা বললেন, ‘না, স্যর, কোন সমস্যা না। মানে, একটা বিষয় আপনাকে জানাব ভাবছিলাম, হয়তো আপনার আগ্রহ হত।’
‘বিষয় কী, এখনই বলতে হবে? পরে বললে হয় না?’
‘জী, তা-ও হবে। তবে ভাবছিলাম, সবার সামনে না বলে, আপনাকে গোপনে বলা ভাল।
‘গোপনে ফুসুর-ফাসুর আমার মোটেও পছন্দ না। আগে আমাকে জানতে হবে বিষয় কী।’
‘তেমন গোপনীয় কিছু না। এই পুরনো কয়েনের বিষয়ে আর কী। তবে এখন আপনার সময় না হলে পরেও বলা যাবে। সময় আদৌ না হলেও ক্ষতি নেই। জেনারেল অ্যালেক্যাণ্ডার কানিংহ্যাম হয়তো সময় দেবেন।’
‘প্রাচীন কয়েনের বিষয়ে! অ্যালেক্সের কয়েন সম্পর্কে কোন জ্ঞানই নেই। প্রতিটা শিক্ষিত ইংরেজ এ কথা জানে। ভাইসরয় লর্ড চার্লস জে. ক্যানিং ওর পেয়ারের লোক। সে না থাকলে এই পোস্ট অ্যালেক্স আদৌ কোনদিন পেত কি না সন্দেহ। যা বলার আমাকে বল। সময় নিয়ে ভাবতে হবে না। এনি টাইম ইজ গুড টাইম।’
‘আপনাকে এমন এক জায়গা চিনিয়ে দেব, যেখানে আপনি মৌর্য, গ্রিক, রোমান, কুশান, গুপ্ত, মামলুক, সুলতানী, মোগল সহ প্রায় সবগুলো যুগের কয়েনই পাবেন। মহেঞ্জোদারো আর হরপ্পার মত এত পুরনো কয়েন হয়তো পাওয়া যাবে না, তবুও ভেবে দেখেন, অশোক কিংবা তারও আগের সম্রাটদের কয়েন আপনি পেয়ে যেতে পারেন। পেতে পারেন প্রাচীন চীনের তামার ফুটো পয়সা।’
‘চীনের পয়সার ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই। সে যত পুরনোই হোক, আর তাতে ফুটো থাকুক বা না থাকুক। মামলুক পর্যন্ত ঠিক আছে। সুলতানী, মোগল এসবও বাদ। এখন বলো, জায়গাটা কোথায়?’
‘সবই বলব, স্যর। বলার জন্যেই আসা। তবে কাঁঠাল ভেঙে সার বের করে দেয়ার আগে আমার একটা শর্ত আছে।’
‘কী শর্ত?’
‘আমার ধারণা, আপনি বিশেষ এক ধরনের কয়েন খুঁজছেন। শর্ত হলো এই যে, আপনি কী ধরনের কয়েন খুঁজছেন আর কেন খুঁজছেন, সেইটে আমাকে জানাতে হবে।
‘মাই-মাই-মাই, ইউ ব্লাডি ইন্টেলিজেন্ট নেটিভ। ধরো আমি তোমাকে সব খুলে বললাম। কিন্তু তুমি যে আমাকে আসল জায়গা চিনিয়ে দেবে, সে নিশ্চয়তা কোথায়? আর যদি পুরনো কোন সাইটে নিয়েও যাও, তবুও তুমি যেসব কয়েনের কথা বললে, সেগুলো সেখানে পাওয়া যাবে এই গ্যারান্টিই বা কে দেবে, তুমি?’
‘আমি আপনাকে কিছু তথ্য দেব। শুনলেই বুঝবেন আমার ওপর ভরসা করা যায় কি না। এ ছাড়াও আপনাকে আমি এমন একটা সাইট দেখিয়ে আনব, যেখানে কোন ইংরেজের পা পড়েনি। আর পড়ে থাকলেও সে কথা কেউ জানে না।
‘ইন্টারেস্টিং। তথ্যটা বলো শুনি।’
‘আপনি চার্লস মেসনের কথা তো শুনেছেন। এই হরপ্পা সাইট মেসনই প্রথম খুঁজে বার করে। মেসন প্রাচীন গ্রিক আর কুশান কয়েন কোথায় খুঁজে পেয়েছিল, সেটা কি আপনি জানেন?’
‘জানি। কাবুলের পঁয়তাল্লিশ মাইল উত্তরে বাগ্রাম জেলায়।’
‘কিন্তু বাগ্রাম জেলার ঠিক কোন্ জায়গাটায়, বলতে পারবেন? পারলেও যেতে কি পারবেন?’
‘ধরে নিলাম একে তাকে জিজ্ঞেস করে তুমি আমাকে সঠিক জায়গায় নিতে পারবে। কিন্তু তার পরেও আমি যা খুঁজছি, সেইটে পাওয়া যাবে, এই নিশ্চয়তাই বা কে দিচ্ছে? তুমি? বাগ্রামে গেছ কখনও?’
‘স্যর, বাগ্রাম জেলায় আমার শ্বশুর বাড়ি। ওখানে যতবারই গেছি, জামাই আদর পেয়েছি। ওই হতচ্ছাড়া মেসন যা পেরেছে, তার থেকে শতগুণ বেশি আমার পারা উচিত।’
‘রিয়েলি! ঠিক আছে, আমি একটা চান্স নিয়ে দেখব। কী একটা আন- এক্সপ্লোর্ড সাইট দেখানোর কথা বলছিলে। ওটার কী হবে?’
‘স্যর, কথায় আছে ধীরে বহে হিঙ্গল। আমার প্রশ্নের উত্তরটা আগে শুনি।’
‘প্রশ্নের উত্তর আমি ফুটনোট-এগুনোট সহ দেব। তবে তার আগে তোমাকে একটু বাজিয়ে দেখতে চাই। সাইট দেখাও, বাগ্রামে নিয়ে যাও। সব বলব। ইউ হ্যাভ দ্য ওয়ার্ড অভ অনার অভ অ্যান ইংলিশ ম্যান।’
বাগ্রাম যাওয়ার পথে মেহেরগড় নামে বহু প্রাচীন এক জায়গা আছে। নানা সেখানে নিয়ে যেতে চাইলেন সাহেবকে। ইন্দাস ভ্যালির পশ্চিমে আফগানিস্তান বর্ডার থেকে বাহাত্তর মাইল দক্ষিণে কুখ্যাত বোলান পাস পেরিয়ে মেহেরগড়ের অবস্থান। সমতল ভূমি থেকে ছয় হাজার ফুট ওপরে সরু সুতোর মত এই বোলান গিরিপথ। দু’পাশে পাথরের দেয়াল খাড়া উঠে গেছে এক শ’ ফুট। শুকনোর সময় এমন খটখটে যে পানির তেষ্টায় উটেরও নাভিশ্বাস ওঠে। সেই সময় উট ছাড়া ঘোড়া-গাধা নিয়ে অথবা হেঁটে পার হতে গেলে নিশ্চিত আজরাইলের সঙ্গে দেখা হবে। ওদিকে বর্ষা হলে পথের ওপর ছড়িয়ে থাকা নুড়ি পাথর হয়ে যায় পিছলা হড়হড়ে। উটও চলে না, আবার হাঁটতে গেলে পা হড়কে হাঁটুর মালাই কিংবা হাতের কব্জি ভাঙার ষোলো আনা সম্ভাবনা। তবে এসব আপদ বাদ দিলেও সব থেকে বড় বিপদ হলো কাকুরদের আক্রমণ। শ’ফুট ওপরে পাহাড় চুড়োয় এই বর্বর জাতির বাস। ডাকাতি ছাড়া অন্য পেশা জানা নেই এদের। বোলান পাসে কাফেলা দেখলেই ওপর থেকে বড় বড় পাথরের চাঁই ছুঁড়ে মারে। নিঃশব্দে ছুটে আসে ঘাতক পাথর। চাঁইগুলো পথিকের মাথা ছাতু করার আগ পর্যন্ত বেচারা জানতেই পারে না কাকুরদের হাতে পড়েছে।
কাকুরদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে নানা আর ভ্যান হওসেন গভীর রাতে বোলান পাস পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন এপ্রিল মাসের শেষাশেষি। তাল ফাটা গরম পড়ছে। তিনটে উট নিয়ে রওনা হলেন তাঁরা। দুটো উটের পিঠে দু’জন, বাকিটার পিঠে সব মালপত্র। তবে ভ্যান হওসেন তাঁর ব্যক্তিগত ট্র্যাভেল ব্যাগ হাতছাড়া করতে রাজি হননি। কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছেন। বোলান পাসের মুখের কাছে এসে তাঁরা যখন হাজির হলেন, তখন মধ্যরাত। কাকুররা ঘুমে বিভোর। পাসের ভেতর কালিগোলা অন্ধকার। হঠাৎ করেই হিলহিলে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করল। বাড়তে বাড়তে বাতাসের বেগ এমন হলো যে, উটের গর্দান খামচে না ধরলে পিঠে বসে থাকাই দায়। এর পর পরই শুরু হলো ধুপধাপ শব্দ। প্রথমে নানারা ভাবলেন কাকুরদের আক্রমণ। তবে ভুল ভাঙতে দেরি হলো না। এ হচ্ছে মরু অঞ্চলের শিলাবৃষ্টি। ছোট-বড় বরফের টুকরো আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে। এক একটার ওজন আধ পোয়াও হতে পারে, পাঁচ সেরও হতে পারে। সের খানেক ওজনের একটা শিলা গায়ে-মাথায় পড়লে আর দেখতে হবে না। শিলাবৃষ্টির স্থায়িত্ব খুব বেশি হলে আধঘণ্টা। কিন্তু মাথার ওপর ছাদ না থাকলে এই আধ ঘণ্টাকেই মনে হবে অনন্তকাল। দু’দিকে দেয়ালের মত পাহাড়। লুকানোর জায়গা নেই। পাসের ভেতর বদ্ধ পরিসরে বাতাসের প্রচণ্ড গতিবেগ আর চাপ যে শব্দ তৈরি করল, সেটা ইস্রাফিলের শিঙার আওয়াজের থেকে কম নয়। শিলাবৃষ্টির ঘায়ে পাগলের মত দৌড়াতে লাগল উটগুলো। উটের পিঠ থেকে ছিটকে পড়লেন নানা আর ভ্যান হওসেন। শিলা-কাঁকর বিছানো মেঝেতে হামা দিয়ে দু’জন কাছাকাছি হলেন। মরিয়া হয়ে ফাঁক-ফোকর খুঁজতে লাগলেন পাসের দেয়ালে। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। দেয়াল তো না, যেন মশলা বাঁটা পাটা, ফাটলহীন, উর্বশীর মসৃণ উরু। ভাঁজ-খাঁজের কোন বালাই নেই। কিছু দূর হামা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের চোখে পড়ল মালবাহী উটটা পাষাণ-দেয়াল ঘেঁষে পড়ে আছে। পাঁচসেরি বরফের চাঁইয়ে থেঁতলে গেছে মাথা। দৌড়ালে যে মোমেন্টাম তৈরি হয়, সেটার কারণে উটটা আছড়ে পড়েছে দেয়ালে। তবে আশার কথা এই যে, উটের শরীরের প্রচণ্ড ধাক্কায় চিকন একটা গুহামুখ উন্মুক্ত হয়েছে। পরে নানারা বুঝতে পারেন, ওখানে অনেক আগে থেকে ছিল, ওটা। কাকুররা গুহামুখ ছোট-বড় পাথর দিয়ে নিখুঁতভাবে বন্ধ করে রেখেছিল। অসহায় পথিকরা যেন কিছুতেই নিজেদের বাঁচাতে না পারে। পাস থেকে সহজেই বেরিয়ে যাওয়া কিংবা পাসে ঢোকার জন্যে গুহাটা ব্যবহার করত কাকুররা। গুহার ভেতর আশ্রয় নিয়ে ধাতস্থ হওয়ার পর সবকিছু দেখেশুনে ভ্যান হওসেন নানাকে জানালেন, ভোর হওয়ার আগেই গুহা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। সকালে কাকুররা মরা উট দেখে ওগুলোর মালিকের খোঁজ করবে। গুহা, পাস কোন এলাকাই তাদের খোঁজাখুঁজির তালিকা থেকে বাদ পড়বে না। তবে গুহা থেকে বেরুনোর আগে দেখা দরকার এটা কোথায় শেষ হয়েছে। হাজার বছর ধরে লুঠপাট করছে কাকুররা। গুহার ভেতর কোথাও কোন ভল্ট থেকে থাকলে সেখানে মূল্যবান কোন আর্টিফ্যাক্ট পড়েও থাকতে পারে। কাকুররা হয়তো ফালতু জিনিস ভেবে ফেলে গেছে। ভ্যান হওসেনের চিন্তা সূত্র দেখে অবাক হলেন নানা। মরতে বসেও আর্টিফ্যাক্টের চিন্তা! হায়রে, ইংরেজ জাতি। শিলাবৃষ্টি শেষ হলে গুহা থেকে বেরিয়ে ভ্যান হওসেন মরা উটটার পিঠে চাপানো মালামালের ভেতর থেকে খাবার, পানি আর পেট্রোম্যাক্স বের করে আনলেন। হ্যাজাকের আলোয় শুরু হলো গুহার ভেতর পথ চলা। গুহা যেন আর শেষ হয় না। গুহার মেঝেতে এখানে-সেখানে নানান জিনিস পড়ে আছে। ছেঁড়া কাপড়, নরকঙ্কাল, চটি জুতো, ঘোড়ার নাল-কী নেই সেখানে। তবে ভ্যান হওসেন যা চাইছেন, তার ছিটেফোঁটাও কোথাও পাওয়া গেল না। কোন কিছু ফেলে যাওয়া কাকুরদের ধাতে নেই। এদিকে এত সময় পেরিয়ে গেছে যে বোলান পাসে ফিরে যেতে হলে সূর্য মাথার ওপর উঠবে। হতে হবে কাকুরদের সিটিং ডাক। হয় গুহায় সারাদিন থাকতে হবে, নয়তো ওটার উল্টো মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। অবশ্য উল্টো মুখ দিয়ে বেরুলেও যে কাকুররা দেখে ফেলবে না, সে নিশ্চয়তা নেই। তবুও গিয়ে দেখা যেতে পারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। অবশেষে গুহা-সুড়ঙ্গ চওড়া আর উঁচু হতে শুরু করল। গুহামুখ থেকে বেরিয়ে ভোরের প্রথম আলোয় তাঁরা দেখলেন, প্রায় পঞ্চাশ ফিট নিচে এক চিলতে সমতল জমিতে ছোট্ট একটা হ্রদের নীল পানি ঘিরে অসংখ্য কুঁড়েঘর, সবুজ বনভূমি। কাকুরদের আবাস। বস্তির উল্টোদিকে আবার শুরু হয়েছে পাহাড়। এখান থেকে যত দ্রুত সরে পড়া যায়, ততই মঙ্গল। কোনভাবে যদি উল্টোদিকের পাহাড়শ্রেণীতে পৌঁছানো যায়, তা হলে শেষরক্ষা হতে পারে। কাকুররা কেউ দেখে না ফেললেই হলো। যেভাবেই হোক এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। ভাগ্য দু’বার সাহায্য করবে না। এগিয়ে যেতে লাগলেন নানা আর ভ্যান হওসেন। কোনদিকে যাচ্ছেন কিছুই জানেন না।
.
দু’দিন ক্রমাগত পাহাড় ডিঙিয়ে ও উপত্যকা পেরিয়ে ক্লান্তিতে শরীর যখন ভেঙে পড়ছে, তখন অদ্ভুত এক পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছলেন তাঁরা। দু’দিকে পঞ্চাশ থেকে এক শ’ ফুট উঁচু হলুদ পাথরের মাঝ বরাবর সাদা নুড়ি বিছানো চওড়া সমতল রাস্তা, যেন মেটাল রোড। রাস্তার ধারে ঝোপ-ঝাড়, এখানে-সেখানে নাম না জানা ইয়া বড় মোটা মোটা গাছ। পিন-ড্রপ সাইলেন্স। পশু-পাখি দূরে থাক, পোকামাকড় পর্যন্ত চোখে পড়ল না। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় তাঁরা দেখতে পেলেন, পাহাড়ের হলুদ পাথর কেটে বানানো হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর। রাস্তার পাশ থেকে ওপরে উঠে গেছে একের পর এক পাঁচটি লেয়ার। প্রত্যেকটি লেয়ারে অগুনতি বাড়ি। সবগুলো থেকে চওড়া সিঁড়ি নেমে এসেছে রাস্তা পর্যন্ত। এক লেয়ার থেকে অন্য লেয়ারে ওঠা-নামার জন্যে বানানো হয়েছে আলাদা সিঁড়ি। এ এক এলাহি কাণ্ড! ভয়ে নানার মুখ চুন। দারুণ অশুভ জায়গা। তাঁর মনে হলো এখানে আসার চেয়ে কাকুরদের হাতে ধরা পড়াই ভাল ছিল। ভ্যান হওসেন ওদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছেন বহুকাল আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক অতিরহস্যময় সভ্যতার দিকে। বাড়িগুলোয় একসময় জানালা-দরজা ছিল। ওগুলোর জায়গায় এখন বড়-বড় গর্ত হা-হা করছে। রাস্তা-ঘাট বাড়ি-ঘর সব ঝকঝকে। এখানে ধুলো নেই, নেই বাতাসের মাতামাতি। আরামদায়ক ঠাণ্ডা আবহাওয়া। নানার চুনমুখ দেখে হাসলেন ভ্যান হওসেন। বললেন, এ জায়গার নাম জানো, গাউস?’
‘না, স্যর। বালুচস্তানে যে এরকম জায়গা আছে, তাই তো জানতাম না।’
এ জায়গাটাকে বলে: ‘দ্য কেভ অভ স্পিরিট’। তোমাদের ভাষায় যার নাম ‘মাই গন্দ্রানি’। চোর মেসন তার ট্র্যাভেল লগে এমনই এক জায়গার কথা উল্লেখ করেছে। বহু খোঁজাখুঁজি করে শেষে না পেয়ে বলেছে, দ্য কেভ অভ স্পিরিট নিছক উপকথা ছাড়া আর কিছু না। এখন তো মনে হচ্ছে হারামিটা এখানে এসেছিল, তবে ব্যাপারটা চেপে গেছে। যে-কোন কারণেই হোক সে চায়নি এখানে আর কেউ আসুক। অদ্ভুত তো!’
‘স্যর, কেভ অভ স্পিরিট কী?’
‘পিশাচের গুহা। ধারণা করা হয়, এখানে ছিল এক পিশাচী আর তার বশংবদ কিছু প্রেতাত্মার রাজত্ব। এই পাষাণ-শহরের কোন এক কন্দরে এই পিশাচীর মন্দির আছে, যাকে বলা হয়: ‘দ্য টেম্পল অভ দ্য প্রিন্সেস অভ ডার্কনেস’। এসব বাড়ি-ঘরে যারা থাকত, তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল পিশাচীকে সন্তুষ্ট করা। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যত অপকর্ম করা সম্ভব, সবই করেছে এখানকার লোকেরা। পিশাচী নর-মাংস আর রক্ত ছাড়া অন্য কিছুতে খুশি হত না। নিজেদের ভেতর টান পড়লে দূর-দূরান্ত থেকে নারী-পুরুষ ধরে আনতে লাগল এলাকার বাসিন্দারা। ঘটনা চলতে থাকল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। লোকজন হয়ে পড়ল দিশেহারা। তখন সুলায়মান পয়গম্বর বেঁচে। বিষয়টি তাঁকে বলা হলো। ভয়ানক শয়তান এই পিশাচী প্রচণ্ড শক্তিধর। তার বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে আগে থেকেই বুঝে ফেলে সে। তারপর শত্রুকে ঝাড়ে-বংশে নিকেশ করে। পরম করুণাময়ের আশীর্বাদ ছাড়া এই পিশাচীর নিধন সম্ভব নয়। সুলায়মান পয়গম্বর তাঁর প্রিয় শিষ্য সাঈফ-উল-মুল্ককে পাঠালেন। শিষ্যকে দিলেন নিজ আঙুলের আংটি। শেবা’র রানি বিলকিসের দেয়া এই আংটির অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। এই রাজ্যের রাজার ছিল এক পরমা সুন্দরী মেয়ে। নাম বদি-উল-জামাল। সাঈফ- উল-মুল্ক পিশাচীর হাত থেকে এই শহর উদ্ধার করে বদি-উল-জামালকে বিয়ে করে। তার পরেও এ শহর বহুদিন টিকে ছিল। তবে এসবই হলো গল্পকথা। এই শহরের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও আছে।’
‘ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাটা কী?’
‘ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা জানতে হলে তোমাদের ধর্মে যেতে হবে। আল কোরানে দুটো চ্যাপ্টার আছে: সুরা হুদ আর সুরা আল আরাফ। এই সুরাগুলোতে তোমাদের ঈশ্বর দুই জাতির কথা বলেছেন: আদ আর সামুদ জাতি। আদ জাতির পূর্বপুরুষ নূহ নবীর নৌকায় চড়ে প্রাণে বেঁচে যায়। পরে জর্ডানের উত্তরে বসতি স্থাপন করে বংশ বৃদ্ধি করে। তারপর এই গোষ্ঠীর সিংহভাগ মানুষ ওমান এবং ইয়েমেনের মাঝের এলাকাতে গিয়ে হাজির হয়। অল্প সময়ের ভেতর প্রচুর ধন- সম্পদের মালিক হয় তারা। চালাতে থাকে নিজ এলাকার গরিব-গুরবোদের উপর অত্যাচারের স্টিম রোলার। আদ জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিস্তর উন্নতি করেছিল বিশেষ করে শক্ত পাথরের পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা আর শহর নির্মাণের ক্ষেত্রে। এদের পাহাড় কেটে বানানো উন্নত সেচ ব্যবস্থা আর স্যুয়ারেজ সিস্টেম দেখলে হতবাক হতে হয়। চিরন্তন ঈশ্বরকে ভুলে সামুদ, মামুদ, আর হারা’র পুজো শুরু করে এরা। এগুলো সব ক’টাই অপদেবতা। ঈশ্বর আদ জাতির কাছে হুদ পয়গম্বরকে পাঠালেন। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। হুদকে আদ জাতি পাত্তাই দিল না। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, যে পাষাণপুরী তারা শত শত বছর ধরে বানিয়েছে, তা এতই মজবুত আর উঁচু যে, নূহ’র প্লাবন যদি ঘুরেও আসে তাতেও কিছুই হবে না। বহু কাল ধরে বোঝানোর পরেও হুদের কপালে হাসি-ঠাট্টা আর অপমান ছাড়া জুটল না কিছুই। হুদ ঈশ্বরকে বললেন, খোদা কী করবেন করেন। এই জাতি চিরস্থায়ীভাবে পথভ্রষ্ট। এদেরকে দীনের পথে আনা অসম্ভব। ঈশ্বর আদ জাতির ওপর তাঁর লানত পাঠালেন। প্রথমে তিন বছর ধরে খরা চলল। গাছের পাতা থেকে শুরু করে ঘাস পর্যন্ত বিলীন হয়ে গেল। গাধা-গরু, উট-ঘোড়া মারা পড়ল কাতারে কাতারে। আগে থেকেই প্রচুর শস্য জমা করা ছিল পাহাড় কেটে বানানো বিশাল আয়তনের সাইলোর ভেতর। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় উতরে গেল তারা। এক সন্ধ্যায় আদ জাতি দেখল আকাশে ছোট্ট একটা কালো মেঘ ভেসে আসছে। তিন বছর ধরে মেঘের দেখা নেই। খেয়ে পরে বাঁচলেও গরমে ভর্তা হয়ে গেছে সবাই। মেঘের দেখা পেয়ে আনন্দ আর ধরে না। মেঘটা তাদের শহরের ওপর এসে স্থির হলো। ক্রমেই বাড়তে লাগল ওটার আয়তন। হঠাৎ বইতে শুরু করল তীব্র ঠাণ্ডা বাতাস। পাহাড়ে পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে এমন শব্দ তৈরি করল ওই বাতাস যে কানের পর্দা ছিঁড়ে যাওয়ার অবস্থা হলো। কাপড়-চোপড়, তাঁবু-খাটিয়া, পাষাণপুরীর জানালা-দরজা উড়ে গেল এক ধাক্কায়। এরপর বাতাসের পাল্লায় পড়ল মানুষজন ও পশু-পাখি। তীব্র ঝঞ্ঝা এক একটি নারী- পুরুষকে ধরে পাথরের দেয়ালে আছড়াতে লাগল। আট রাত সাত দিন ধরে চলল এই তাণ্ডব। ফসলের খেত, সেচের নালা, শহর, গঞ্জ, বাজার-ঘাট সব শেষ। হুদ নবী আর তাঁর গুটিকয় অনুসারী ছাড়া জনমানবের চিহ্নও নেই কোথাও। লাশ দূরের কথা একটা সুতোও কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। শক্তিশালী বায়ু প্রবাহ ঝেঁটিয়ে বিদেয় করেছে সব কিছু। হাজার বছর ধরে লক্ষ কোটি লোকের হাড়ভাঙা শ্রমের বিনিময়ে গড়ে তোলা সভ্যতা আট দিনেই শেষ!
‘হুদ নবীর সঙ্গে যারা বেঁচে ছিল, তাদের ভেতর থেকে নয়টি পরিবার মদিনা এবং সিরিয়ার মাঝামাঝি অন্য এক সভ্যতা গড়ে তোলে। এই সভ্যতা আদ জাতির সভ্যতা থেকেও অনেক বেশি উন্নত ছিল। এই সভ্যতার মূল কেন্দ্র ছিল মাদাইন সালেহ বা সালেহ শহর নামের এক জায়গা। এখান থেকে এই সভ্যতা ছড়িয়ে পড়ে জর্ডানের উত্তরে। যা হোক, এই নয়টি পরিবার ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে তৈরি করল বিরাট শক্তিশালী এক জাতি। এদের নাম হলো সামুদ জাতি। ধন-সম্পদ আর নিষ্ঠুরতায় সামুদের দল পরদাদাদেরও ছাড়িয়ে গেল। সেই সঙ্গে ঈশ্বরকে ভুলে প্রাচীন তিন অপদেবতার পুজোও শুরু করল। মহান ঈশ্বর এরপর সালেহ নবীকে পাঠালেন। সালেহকে তারা পাত্তাও দিল না। সালেহ যে ঈশ্বরের প্রতিনিধি, সেইটে বোঝানোর জন্যে ঈশ্বর এক অতিকায় উটনী পাঠালেন। কেউ কেউ বলেন, পাহাড় ফেটে উটনী বের হয়েছিল। তবে কোরান বা সুন্নাহতে এর কোন উল্লেখ নেই। উটনীটার একটা বাচ্চা হলো। উটনীর দুধ এত বেশি যে বাচ্চা তো খায়ই, শহরের সব লোকও খায়। তবে একটা সমস্যা থেকেই গেল। মাদাইন সালেহতে সবেধন নীল মণি কুয়ো একটাই। উটনী আর তার বাচ্চা যেদিন পানি খায়, সেদিন অন্য কেউ আর পানি পায় না। কুয়োর সব পানি উটনী আর তার বাচ্চাই শেষ করে ফেলে। গরু, ঘোড়া, গাধা, দুম্বা, মানুষকে পানি না খেয়েই কাটাতে হয়। উটনীর এই পানি-খাওয়া স্বভাবের কারণে ঈশ্বর নির্দেশ দিয়েছিলেন, সপ্তাহে শুধু একদিনই উটনী পানি খাবে। বাকি ছয় দিন খাবে অন্যেরা। ওই একদিন পানি না পাওয়ার কারণে সামুদরা রাগে গরগর করতে লাগল। তারা ভাবল, সালেহর ঈশ্বর তাদের জন্যে যা পাঠিয়েছে, সেটা অভিশাপ ছাড়া আর কিছু না। তবে আদৌ ঈশ্বর ওটা পাঠিয়েছে কি না, সেটাও ভাবতে হবে। এ ছাড়াও, সালেহর ঈশ্বরের পাঠানো জানোয়ার তাদের ভেতর ঘোরাঘুরি করছে এইটে মেনে নেয়া যথেষ্ট কঠিন। তাদের তিনজন প্রাচীন দেবতা এইসব উটনী-টুটনীর আদিখ্যেতা দেখে মাইণ্ড করতে পারে! তা ছাড়া, অন্য সমস্যাও আছে। কিছু গর্দভ লোকজন এই উটনী দেখে সালেহর কথা শুনতে শুরু করেছে। এভাবে চলতে দেয়া যায় না। এর সন্ধ্যায় নয়জনের একটি দল উটনীটাকে মারার জন্যে বের হলো। উটনী তখন পানি-টানি খেয়ে বাচ্চাটাকে পাশে নিয়ে এক পাহাড়ের গোড়ায় শুয়ে আছে। উটনীটা মাথা উঁচু করে আততায়ীদের দিকে একবার তাকিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। মরার জন্যে রেডি। পাষণ্ড লোকগুলো প্রথমে উটনী, তারপর বাচ্চাটাকে কাটল। ঘটনা জানতে পেরে নবী সালেহ কওমের লোকদের ডেকে বললেন, ‘মহান ঈশ্বর তোমাদের পইপই করে নিষেধ করেছেন, উটনীর কোন ক্ষতি না করার জন্যে। কিন্তু তা তোমরা শোননি। ঈশ্বরের কথা না শোনার প্রতিফল তোমাদেরকে ভোগ করতে হবে। এখন থেকে তিন দিন সময় পাবে। ভাল-মন্দ যা খাওয়ার খেয়ে নাও। ঈশ্বরের অভিশাপ নাজিল হবে বাহাত্তর ঘণ্টা পর।’ সামুদরা সালেহর কথা তো শুনলই না, উল্টো রেগে অস্থির হলো। তিন দিন পর প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পেল সামুদ জাতি। এ এক তূর্য নিনাদ। থরথর করে কাঁপতে লাগল পাষাণ শহর। চোখের পলকে ধূলিসাৎ হলো পরাক্রান্ত সামুদ জাতি আর তাদের অপূর্ব সভ্যতা।
‘তবে এ বিষয়ে অ্যারিস্টোটল, টলেমি, প্লিনি এসব প্রাচীন যুগের ঐতিহাসিকেরা অনেক কিছুই লিখে গেছে। আদ এবং সামুদ জাতি মূলত ছিল নেবাতিয়ান জাতির অংশ। এই নেবাতিয়ানরা আদ্যিকালের ব্যাবিলন নগরী থেকে বেরিয়ে এসেছিল। জর্ডান থেকে শুরু করে সিরিয়া, পুরো আরব উপদ্বীপ সহ কৃষ্ণ সাগরের উপকূল পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এদের নগর-বন্দর। নেবাতিয়ানদের হাতে ছিল উঁচু দরের প্রযুক্তি। ব্যবসা-বাণিজ্য, খেত-খামার, রাস্তা-ঘাট, ভবন নির্মাণ সব কিছুতেই অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে এরা। নগরীগুলো লোক-চক্ষুর আড়ালে দুর্ভেদ্য সব জায়গাতে তৈরি করেছিল, যাতে দেখিয়ে না দিলে সহজেই কেউ খুঁজে না পায়। এরপর প্রথমে গ্রিক তারপর রোমানদের পাল্লায় পড়ে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় এদের সভ্যতা। নেবাতিয়ানরা এক অতিরহস্যময় মরুজাতি। মানব ইতিহাসে এদের নির্মাণ শৈলীর কোন তুলনাই পাওয়া যায় না। এককথায়, এরা যা করেছে, তা রিপিট করা অসম্ভব। এদের সভ্যতার যেটুকু পাওয়া গেছে, তা ছিটেফোঁটা মাত্র। ধারণা করা হয়, এদের ঘর-বাড়ি, শহর- বন্দরের মাত্র দশ শতাংশ আমরা খুঁজে পেয়েছি। বাকি নব্বই শতাংশ এখনও চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে। এই নেবাতিয়ানরা আল উজ্জা নামে এক দেবীর পুজো করত। এই দেবী ছিল জাগ্রত। তোমাদের নবী মুহম্মদ (সাঃ) এই উজ্জার ব্যাপারে অত্যধিক কঠোর ছিলেন। ওহুদ যুদ্ধে কাফেরদের সঙ্গে মুসলমানরা যখন হারে, তখন কাফেররা এই উজ্জাকেই বারবার স্মরণ করেছিল। উজ্জাকে কাফেররা সব থেকে বেশি ভক্তি করত এ জন্যে যে, দেবী তাদের ভবিষ্যৎ বলে দিত। এই উজ্জার ঠিকুজি আর কর্মকাণ্ড মাইলখানেক লম্বা। এই দেবীর সঙ্গে মেটাট্রনের একটা সম্পর্ক আছে। ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুসারে মেটাট্রন হলো এক পতিত দেবদূত। এর কাজ ছিল মহান ঈশ্বরের সব গোপন তথ্য আর মোজেজা ফাঁস করে দেয়া। পৃথিবীর সুন্দরী মেয়েদের ভজিয়ে ভাজিয়ে ভোগ করত এ। আর রাজি করাতে না পারলে তাদেরকে ধরে ধরে রেপ করা ছিল তার এক নেশা। এতে করে যেসব সন্তান জন্ম নিত, তারা হত এক একটা জলজ্যান্ত দানব। এদেরকে বলা হত নেফিলিম, শয়তানের দোসর। মনে করা হয়, এই দানব নেফিলিমদের হাত থেকে মানব-জাতিকে বাঁচাতেই ঈশ্বর নূহের প্লাবন পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। যা হোক, তোমাদের নবীর নির্দেশে যেখানে যত উজ্জার মূর্তি আর মন্দির ছিল, সব ধ্বংস করা হলো। হঠাৎ একদিন নবী খবর পেলেন, নাখলা নামে এক জায়গায় এখনও উজ্জার মন্দির রয়ে গেছে। কিছু কুরাইশ এবং কিনানাহ গোত্রের লোক সমানে উজ্জার পুজো করে যাচ্ছে।
‘৬৩০ সালের রমজান মাসে খালিদ-ইবন-আল ওয়ালিদকে ডেকে নবী নাখলা প্রদেশে গিয়ে উজ্জার মূর্তি ধ্বংস করে আসতে বললেন। ত্রিশজন ঘোড়সওয়ার নিয়ে রওনা হলেন খালিদ। উজ্জার মন্দিরে ঢুকে তার মূর্তিকে চুরমার করে মক্কায় ফিরে নবীকে জানালেন, উজ্জার বিনাশ সাধন করেছেন। নবী জিজ্ঞেস করলেন, ‘খালিদ, বিস্ময়কর কোন কিছু ঘটতে দেখেছ?’
‘খালিদ জানালেন, অদ্ভুত কোন কিছুই তিনি দেখেননি। নবী খালিদকে বললেন, ‘খালিদ, যেটা ধ্বংস করেছ সেটি মোটেও আসল উজ্জা নয়। এরকম কিছু ঘটবে বলে আসল উজ্জাকে রক্ষা করার জন্যে নকল উজ্জা আর তার মন্দির তৈরি করা হয়েছে।’
‘রোজা-রমজানের দিন। নাখলা তো আর বাড়ির কাছে না। এক কাজ দু’বার করতে হচ্ছে। তার থেকেও বড় কথা, খালিদকে বোকা বানানো হয়েছে। মেজাজ চরমে উঠল খালিদের। অনেক খোঁজাখুঁজি করে খালিদ এবার আসল উজ্জার মন্দির বের করলেন। মন্দিরের কুরাইশ পুরোহিত যখন দেখল খালিদকে আর আটকানো গেল না, তখন সে দেবীর মূর্তির গলায় বিশাল এক খড়্গগ ঝুলিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে সটকে পড়ল। পুরোহিতের ধারণা, খড়্গগ কাছে থাকলে দেবী নিজেকেই নিজে রক্ষা করতে পারবে। পেল্লায় মন্দিরের ভেতরটা প্রায় অন্ধকার। ছোট্ট একটা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। তলোয়ার হাতে ভেতরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালেন খালিদ। সম্পূর্ণ নগ্ন, অতুলনীয় দেহের অধিকারী এক যুবতী নারী তাঁর সামনে। নারী যে এত সুন্দর হতে পারে, খালিদ স্বপ্নেও কল্পনা করেননি যেন মন্দিরের পাথরের মেঝে ফুঁড়ে বের হয়েছে প্রেমের দেবী ভেনাস। যুবতী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ক্ষণিকের জন্যে খালিদ সব কিছু বিস্মৃত হলেন। পরক্ষণেই তাঁর মনে হলো, এই অসামান্য যুবতী তাঁকে প্রগাঢ় এক নিষিদ্ধ আনন্দ দিয়ে বশীভূত করতে চায়, যাতে দেবী-মূর্তি রক্ষা পায়। তরবারির এক ঘায়ে যুবতীকে দু’টুকরো করে ফেললেন খালিদ। এরপর এগিয়ে গেলেন উজ্জার মূর্তির দিকে। মূর্তি-ফূর্তি ভেঙেচুরে মক্কায় ফিরে নবীকে যা ঘটেছে, খুলে বললেন খালিদ।
‘নবী বললেন, ‘হ্যাঁ, ওটাই ছিল আল উজ্জা। আর কখনওই আমাদের দেশে তার পুজো হবে না।’ মাই গন্দ্ৰানি খুব সম্ভব নেবাতিয়ানদের কোন এক গোষ্ঠীর হবে। পিশাচীর মন্দির আসলে আল উজ্জার উপাসনালয়। ওই উপাসনালয়টা খুঁজে বার করতে পারলে দারুণ হত। সামনেই প্রচুর খালি বাড়ি পড়ে আছে। ওগুলোর কোন একটাতে থাকলেই হলো।’
এরপর নানা ও ব্রিটিশ আর্কিওলজিস্ট সামনের সিঁড়ি বেয়ে কাছেই একটা বাড়িতে উঠলেন। বসার ঘর, শোবার ঘর, বারান্দা, রান্না ঘর-সবই আছে। হালকা কিছু মুখে দিয়ে পেট্রোম্যাক্স নিভিয়ে বাড়িটার বসার ঘরে শুয়ে পড়লেন তাঁরা। ভ্যান হওসেন বললেন, ‘গাউস, যে জিনিস দেখালে, তাতে করে তোমার প্রশ্নের উত্তর দেয়া কর্তব্য হয়ে পড়েছে। আমি যা খুঁজছি, তাকে বলে জুডাস কয়েন। জুডাস কয়েন হলো সেই তিরিশটি রুপোর পয়সা, যার বিনিময়ে জুডাস ইসকারিয়াত যিশু খ্রীষ্টকে রোমানদের হাতে তুলে দিয়েছিল। ওই টাকা জুডাসকে দিয়েছিল ইহুদিদের ধর্মগুরু কায়াফাস। তিরিশটা পয়সা রুপোর হলেও জুডাসের হাতে পড়ার পর ওগুলোর রঙ লাল হয়ে যায়। নাম হয় ব্লাড কয়েন। ধরে নেয়া হয় যিশু খ্রীষ্টের রক্ত লেগে আছে ওতে। সেণ্ট জনের মতে, জুডাসের ওপর খোদ শয়তান ভর করেছিল। আগে থেকেই এই পয়সাগুলোর বিশেষ ক্ষমতা ছিল। জুডাসের হাতে পড়ে ওগুলো হয়ে ওঠে আরও অভিশপ্ত।
‘মুদ্রাগুলোকে বলা হত রোমান শেকেল। এর একদিকে অগাস্টাস সিজারের মাথার ছাপ, অন্য পিঠে ফিনিক্স পাখির চিত্র। এই অদ্ভুতুড়ে কয়েনগুলো বানানো হয়েছিল প্রাচীন টায়ার নগরীতে। রোমানরা তখন সারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রোমের টাকশাল থেকে মুদ্রা বানিয়ে সারা দুনিয়ায় সাপ্লাই দেয়া কঠিন। এই কারণে রোমের বাইরে আরও দু’জায়গায় তারা টাকশাল বানাল: সিরিয়ার দামেস্কে, জর্ডানের উত্তরে টায়ার নগরীতে। টাকশালগুলোকে বলা হত রোমান মিন্ট
‘টায়ারিয়ানরা মূলত ফিনিশিয়ান। এই ফিনিশিয়ানরাই মানব ইতিহাসে প্রথম সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে। তবে এরা বিশ্বাস করত, এদের সব উন্নতির মূলে আছে তাদের নিজস্ব দেবতা। দেবতার নাম মিলকাত। প্রাগৈতিহাসিক কালের এক উল্কাপিণ্ড গলিয়ে মিলকাতের মূর্তি বানানো হয়েছিল। তবে তার থেকেও বড় বিষয় হলো, মূর্তি গড়ার ধাতুর দ্রবণে হারকিউলিসের দেহাবশেষ ঢুকিয়ে দিয়েছিল কারিগরেরা। হারকিউলিস দেবতা জিউসের সন্তান। অতিলৌকিক শক্তির অধিকারী। টায়ারের বিখ্যাত রাজা হাইর্যামের গোপন নির্দেশে গ্রিস থেকে হারকিউলিসের দেহাবশেষ চুরি করে আনে টায়ারের ফিনিশিয়ানরা। এই হাইর্যামের কথা প্রায় সব ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে। এর টাকা আর দাপট ছিল সীমাহীন। সেই সঙ্গে কূটবুদ্ধি। সুলায়মান পয়গম্বর জেরুযালেমের বিখ্যাত ইহুদি মন্দির বানাতে গিয়ে দেউলিয়া হয়ে যান। অচল হয়ে পড়ে ইজরায়েল রাষ্ট্র। তখন হাইর্যামের কাছ থেকে বিস্তর টাকা ধার করেন সুলায়মান পয়গম্বর। হাইর্যামের কাছ থেকে ফেরাউনের মত লোকও টাকা ধার করেছে। মিলকাতের মূর্তি গড়া হলে দেদারসে টাকা খরচ করে জমকালো এক মন্দির বানিয়ে গোপন এক চেম্বারে রাখা হয় ওটা। মূল বেদীতে প্রতিষ্ঠা করা হয় মিলকাতের অন্য একটা ইয়া বড় ব্রোঞ্জ মূর্তি।
‘রোমান মিন্ট বসানো হয়েছিল মিলকাতের মন্দির চত্বরে। ধরা হয় ওই ত্রিশটি কয়েন কোন এক পূজারী মিলকাতের মূর্তিকে উৎসর্গ করেছিল। মূর্তির পায়ের কাছে কয়েনগুলো অনেকদিন পড়ে থাকার পর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ওগুলোকে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে ইহুদি ধর্মগুরু বা হাই প্রিস্ট কায়াফাসকে উপহার দেয়। এরপর কায়াফাসের হাত ঘুরে জুডাসের হাতে। তারপর ফের কায়াফাসের কাছে। রোমান গভর্নর পণ্টিয়াস পাইলেট যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করায় কায়াফাস খুশি হয়ে কয়েনগুলো ভেট দেয় তাকে। এই পণ্টিয়াস পাইলেটই প্রথম ব্যক্তি, যে কয়েনগুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ওগুলোর অস্বাভাবিক ক্ষমতা টের পায়। কয়েনগুলো হাতে নিলে চিন্তা-শক্তি কিংবা বিশেষ কোন শারীরিক ক্ষমতা এক শ’ গুণ বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে আসবে ভাগ্যের সমর্থন। পাইলেটের দ্রুত প্রমোশন হয়। তবে পাইলেটের বউ প্রকুলার কারণে সব তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে কয়েনগুলো চলে যায় রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াসের হাতে। এরপর সম্রাট হেড্রিয়ান। হাতে হাতে ফিরতে থাকে ওগুলো, সেই সঙ্গে কমতে শুরু করে কয়েনের সংখ্যাও। শেষমেশ রয়ে যায় মাত্র তিনটি পয়সা। এই তিনটি কয়েন জার্মানির শার্লেমেন থেকে শুরু করে নর্মাণ্ডির উইলিয়াম দ্য কনকরার, রাশার প্রথম জার পিটার দ্য গ্রেট, সম্রাট নেপোলিয়ান, এমন কী ফ্রান্সের জোয়ান অভ আর্কের কাছেও ছিল বলে ধারণা করা হয়। জোয়ান অভ আর্কের মত এক রাখাল বালিকা এরকম অসাধারণ জিনিস কীভাবে পেল, সেটা একটা বিরাট ধাঁধা। আসলে পণ্টিয়াস পাইলেটের জন্মভূমি জার্মানির হওসেন গ্রামে। ওখান থেকে জোয়ান অভ আর্কের গ্রাম ডর্মেমি খুব কাছে। পাইলেটের মৃত্যু কোথায় কীভাবে হয়েছে, আজও সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, যে গ্রামে জন্ম, সেখানেই মৃত্যু হয় তার। কয়েন-টয়েন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে সে। নিগৃহীত হয় পরবর্তী রোমান সম্রাট ক্যালিগেলার হাতে। ভাগ্য বিড়ম্বিত হয়ে নিজ গ্রামেই ফিরে যায় সে। হয়ে পড়ে ভীষণ অসুস্থ। আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি হারিয়ে যাওয়া সাতাশটি কয়েনের যে-কোন একটা। উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য সবখানেই বছরের পর বছর ঘোরাঘুরি করেছি। এখন খুঁজছি এই উপমহাদেশে।’
‘মুদ্রাগুলোর ব্যাপারে প্রথম আপনি জানতে পারলেন কবে, স্যর?’
‘আমার পুরো নাম তো জানো? ভ্যান হওসেন বাট। আমার বাবা ইংরেজ হলেও, মা জার্মান। ওখানকার হওসেন গ্রামে আমার নানাবাড়ি। আমার নাম রাখা হয়েছে ওই গ্রামের নামানুসারে। যিশু খ্রীষ্টকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার কারণে পাইলেটকে সবাই চেনে। দু’হাজার বছর আগেও চিনত, এখনও চেনে। অক্সফোর্ডে ভর্তি হওয়ার আগে নানাবাড়ি বেড়াতে গেলাম। তখনই বড় মামার কাছ থেকে এ বিষয়ে প্রথম জানতে পারি। পরে যা জেনেছি, সবই বছরের পর বছর ধরে গবেষণার ফসল।’.
‘ঘটনা যা ঘটেছে, তা সবই হয় মধ্যপ্রাচ্যে, না হয় ইউরোপে। এই উপমহাদেশে জুড়াস কয়েন পাবেন সে নিশ্চয়তা কোথায়?’
‘চমৎকার প্রশ্ন। তুমি ভারতীয় হলেও মাথা পরিষ্কার। ঠিকমত পড়াশুনো করলে ভাল প্রত্নতাত্ত্বিক হতে পারতে। ভারতের ইতিহাস পড়তে গিয়ে একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা জানতে পারি। খ্রীষ্টপূর্ব ২০ সাল থেকে ২৮০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত পুরো ভারতবর্ষ শাসন করেছে কুশান রাজবংশ। এরা মূলত চীনের গুইশাং প্রদেশের অধিবাসী। আফগানিস্তান থেকে শুরু করে সেই বারানসী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এদের শাসন। এই রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজার নাম কনিষ্ক। এর রাজধানী ছিল তোমার শ্বশুর বাড়ি বাগ্রামে। রোমান সম্রাট হেন্ড্রিয়ানের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে কনিষ্ক। গড়ে তোলে চীন থেকে শুরু করে রোম পর্যন্ত এক অতিকায় ব্যবসায়িক নেটওঅর্ক। সিল্ক, মসলিন, মশলাপতি থেকে শুরু করে হেন জিনিস নেই এই রুটে বহন করা হয়নি। ওটা ছিল প্রাচীনকালের অন্যতম প্রধান সিল্ক রুট। বাগ্ৰাম ছিল আন্তর্জাতিক বিজনেস রুটের প্রধান হাব। দোর্দণ্ডপ্রতাপ কনিষ্ক তার রাজ্যের নাম রাখে গান্ধারা। আফগানিস্তানের কান্দাহার শব্দ এরই অপভ্রংশ। এই কনিষ্ক একবার দক্ষিণ ভারতের কাঞ্চিপুরমের রাজাকে ঘিরে এক অতিরহস্যময় ঘটনার জন্ম দিয়েছিল।
‘কনিষ্কের এরকম আরও দু’চারটে ঘটনার কথা ইতিহাসবেত্তারা উল্লেখ করেছে। তার থেকে আমার ধারণা হয়েছে, ওই রাজ্যের সম্রাট কনিষ্কের কাছে জুডাস কয়েন থাকলেও থাকতে পারে। তবে এই ধারণার পেছনে অন্য একট যুক্তিও আছে। কনিষ্কের গোল্ড কয়েন সে যুগের তুলনায় খুবই নিখুঁত। কয়েনে দেখানো হয়েছে কনিষ্কের বাঁ হাতে বর্শা এবং ডান হাতে নকশা কাটা চুড়োঅলা সোনার ঘটি ধরে আছে। প্রাচীনকালের কোন মুদ্রাতেই রাজা কিংবা সম্রাট ঘটি হাতে করে দাঁড়িয়ে নেই। ঘটি থাকে সাধু-সন্ন্যাসী অথবা পুরোহিতের হাতে, সম্রাটের হাতে না। আমার ধারণা, ওই ঘটির ভেতর কনিষ্ক জুডাস কয়েন রাখত। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ঘটিটা সব সময় নিজ হাতে বহন করত সে।’
‘স্যর, আপনার উচিত ছিল প্রথমেই বাগ্রামে যাওয়া। আপনি হরপ্পায় সময় নষ্ট করছিলেন কেন?’
‘সময় নষ্ট করেছি, এটা কে বলল তোমাকে? রাগ্রামে যেতে চাইলেই তো হবে না। পথের মোড়ে মোড়ে বিপদ। সঙ্গে বিশ্বস্ত লোক না থাকলে প্রাণ হারানোর সম্ভাবনা ষোলো আনা। তা ছাড়া, বহুমূল্য আর্টিফ্যাক্ট এমন সব জায়গায় পাওয়া যায়, আপাত দৃষ্টিতে যা বিচার করলে মনে হবে অসম্ভব। অনবদ্য আর্টিফ্যাক্টগুলোর আবেদন কখনও শেষ হওয়ার নয়। প্রাচীনকালেও যেমন, এখনও তেমন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অতিপ্রাচীন এবং দুর্গম সাইটগুলোতেই এসব আর্টিফ্যাক্ট লুকিয়ে রাখা হয়। সব প্রাচীন ধ্বংসাবশেষকে ঘিরেই কিংবদন্তী গড়ে ওঠে। মানুষ এগুলোকে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। এই কেভ অভ স্পিরিট-এর কথাই ধরো। গত দেড়-দু’হাজার বছরে কেউ এখানে আসার সাহস পায়নি এলেও পালিয়ে বেঁচেছে। অথচ এখানে আগে বিশাল এক জনপদ ছিল। ঠিক না?’
সীমাহীন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেন নানা। অনেক রাতে হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে গেল তাঁর। কী কারণে এমন হলো বুঝতে পারলেন না। পাশ ফিরে চাঁদের আবছা আলোয় ভ্যান হওসেনকে খুঁজলেন। কিন্তু কোথাও দেখতে পেলেন না তাঁকে। হাঁচড়-পাঁচড় করে সিঁড়ি ভেঙে নেমে কাঁকর বিছানো রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন নানা। তাকালেন ডানে বাঁয়ে, ওপরে নিচে। কিন্তু না, চিহ্নও নেই ভ্যান হওসেনের। চারদিক এত নিস্তব্ধ যে নিজের হার্টবিট পর্যন্ত শুনতে পেলেন তিনি। রাতের নিজস্ব শব্দ থাকে। প্রকৃতির ওই নিয়ম এখানে কাজ করছে না একেবারেই। দিশেহারা হয়ে আগে যেখানে ছিলেন, সেখানে ফিরে গেলেন নানা। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকলেন। ভোর রাতের দিকে ফিরে এলেন ভ্যান হওসেন। ভূতে পাওয়া অবস্থা। আপনমনে কী যেন বিড়বিড় করে বলছেন। নানাকে দেখে চিনতে পেরেছেন বলে মনে হলো না। শুয়ে পড়লেন ভ্যান হওসেন এবং কিছুক্ষণের ভেতরই তলিয়ে গেলেন গভীর ঘুমে। নানাও বসা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়লেন একসময়। ঘুম ভাঙল দুপুরে। নানা দেখলেন ভ্যান হওসেন আগেই উঠেছেন। একমনে ডায়ারি লিখছেন তিনি। এরপর নানা আর ভ্যান হওসেন দ্য সিটি অভ কেভ থেকে বেরিয়ে আসেন। রওনা দেন বাগ্রামের উদ্দেশে। ভ্যান হওসেন রাতে কোথায় গিয়েছিলেন, এ কথা নানাকে কখনও বলেননি। তবে নানার ধারণা, আল উজ্জার মন্দির খুঁজতে বেরিয়েছিলেন তিনি। তবে আদৌ কিছু খুঁজে পেয়েছিলেন কি না, কে জানে! তবে কিছু একটা ঘটেছিল ওই রাতে। বাগ্রাম পৌঁছে ভ্যান হওসেন নানাকে জানান, বাগ্রাম থেকে এক শ’ তেরো মাইল পুবে বামিয়ানে যেতে চান তিনি। চোখ জুড়ানো সবুজ তৃণভূমির ধারে বামিয়ান, ওখানে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের ক্লিফ কেটে পঞ্চাশ থেকে প্রায় দু’ শ’ ফুট উঁচু অসংখ্য বৌদ্ধ মূর্তি বানানো হয়েছিল। শত শত বছর ধরে পাহাড়ের বুকে গড়ে তোলা হয় মন্দির। এ এক এলাহি কাণ্ড। কনিষ্ক ছিল বৌদ্ধ মন্দিরের বিরাট পৃষ্ঠপোষক। নিয়মিত মন্দিরে অর্ঘ্য দিতে যেত সে, এর পেছনে খরচ করত বেশুমার অর্থ। কুশান রাজবংশের পতন শুরু হলে বাগ্রাম থেকে বামিয়ানে মন্দির সরিয়ে নেয়ার কাজ চালু করা হয়। প্রায় পাঁচ শ’ বছর ধরে চলে এই প্রক্রিয়া।
বাগ্রামের থেকেও বামিয়ান বেশি দুর্ভেদ্য। যাত্রা পথে পদে পদে বিপদ। শ্বশুর বাড়ি থেকে বামিয়ানের পথে রওনা হওয়ার আগের দিন জামাই আদরে থেকেও অসুস্থ হয়ে পড়েন নানা। অগত্যা মামার শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করেন ভ্যান হওসেন। তাঁর সঙ্গে নানার আর কখনও দেখা হয়নি। ঘটনার মাসখানেক পর ভ্যান হওসেনের চিঠি নিয়ে ফিরে আসে নানার শ্যালক। চিঠিতে ভ্যান হওসেন নানাকে জানান, তিনি ইংল্যাণ্ডে ফিরে যাচ্ছেন। ক্যালকাটা থেকে ছোট জাহাজ ধরে প্রথমে মাদ্রাজ, তারপর সেখান থেকে বড় জাহাজে লিভারপুল। তবে ফেরার আগে পূর্ব বাংলায় তাঁর ভাস্তের সঙ্গে দেখা করে যাবেন। সে নাকি ওখানে এক বিরাট জমিদারি কিনে ইণ্ডিগো প্লান্ট বসিয়েছে। বামিয়ানে কী ঘটেছিল, সে ব্যাপারে নানার শ্যালক তেমন কিছু বলতে পারেনি। তৃণভূমি শেষ হওয়ার পর এক চিলতে মরুভূমি পেরিয়ে বামিয়ান পাহাড়। ওই তৃণভূমিতেই স্থানীয় অধিবাসীদের গাঁয়ে ক্যাম্প করেন ভ্যান হওসেন। নানার শ্যালককে সেখানে রেখে চলে যান পাহাড়ে। ফিরে আসেন একুশ দিন পর। শ্যালকের হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘গাউসকে দিয়ো।’ ট্র্যাভেল ব্যাগ আর সামান্য কিছু মালপত্র নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে একাই বেরিয়ে যান ভ্যান হওসেন। কখনও আর ফিরে আসেননি। বামিয়ান থেকে বামুন্দি পর্যন্ত হাজার হাজার মাইল অজানা বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দেয়ার সাহস ভ্যান হওসেন পেলেন কোত্থেকে? তিনি না জানেন এখানকার ভাষা, না চেনেন পথ! দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নানা ধরে নিলেন জ্ঞাত-অজ্ঞাত যে পদ্ধতিতেই হোক, ভ্যান হওসেন একটা হলেও জুডাস কয়েন সংগ্রহ করতে পেরেছেন। হয়তো দ্য কেভ অভ স্পিরিটে কোনভাবে উজ্জার মন্দির বের করে সেখান থেকে ওরাকল পেয়ে থাকবেন, কে জানে!
৩১ জুলাই, ১৯৭১। আজিজ মাস্টারের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়েছে। তাকে এই এলাকার পিস কমিটির সাধারণ সম্পাদকের পদ দিয়েছি। নীলকুঠির ইতিহাস নিয়ে আলোচনাও হয়েছে বিস্তর। ১৮৬০-এর গোড়ার দিকে হঠাৎ করেই কুঠিটা ধ্বংস হয়ে যায়। কুঠি থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা স্থানীয় বাজার আছে। বাজারের কাছেই রাস্তার ধারে আদ্যিকালের হিন্দু মন্দির। এই হিন্দু মন্দিরের পূজারী ব্রাহ্মণের এক পরমা সুন্দরী কন্যা ছিল। প্রায় সময় মন্দিরেই থাকত মেয়েটি। মন্দির ধোয়া-মোছা, পুজোর ফুল জোগাড় করা-এসব কাজ করত। সে যুগে প্রচুর সাধু-সন্ন্যাসী পথে পথে ঘুরত। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ভিক্ষে চাইত। সাধু-সন্ন্যাসীর বেশ ধরে নানা এলাকায় ঘোরাঘুরি করত ডাকাত সর্দারেরাও। কোন্ এলাকায় কার বাড়িতে কীভাবে ডাকাতি করবে, সেটা দেখা আর কী! এরকমই এক ডাকাত সর্দার সন্ন্যাসী সেজে ঘুরতে ঘুরতে কীভাবে একদিন মন্দিরে এসে হাজির। লাল-পেড়ে সাদা শাড়িতে ব্রাহ্মণের মেয়েকে মন্দিরের বারান্দায় ফুলের মালা গাঁথতে দেখে ভিরমি খেল ডাকাত সর্দার। এই যুবতীকে তার চাই-ই চাই। কিন্তু চাইলেই তো আর হবে না। প্রকৃত পরিচয় ফাঁস হলে ডাকাতের কালাপানি কেউ ঠেকাতে পারবে না। বিয়ে অনেক পরের কথা। মেয়েটির কাছে পানি খেতে চাইল সে। পানি-টানি খেয়ে ডাকাত সর্দার সিদ্ধান্ত নিল চুরি করবে মেয়েটিকে। কিন্তু কাজটা হবে কীভাবে? মন্দিরের উল্টোদিকে বটগাছের তলায় মাটিতে লোহার ইয়া বড় চিমটা গেঁথে, ঘটি-কমণ্ডলু সাজিয়ে, ধুনচি জ্বেলে তার আস্তানা গাড়ল ডাকাত সর্দার। ওম নমঃ শিবায়।
ব্রাহ্মণ কন্যার এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। পূর্ণিমার রাতে সন্ধে বেলা নদীতে যাওয়া। হাতে পূর্ণিমার চাঁদ পেল ডাকাত সর্দার। মেয়েটি নদীতে স্নান করার সময় নৌকোয় উঠিয়ে ভাগলপুর হবে। শিষ্যদের সেই মত নির্দেশ দিল সে। মেয়েটিকে যথারীতি উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মাথাভাঙ্গা নদীর দিকে না গিয়ে কুঠির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শাখা নদী ধরল তারা। উদ্দেশ্য অনসুরণকারীদের ধোঁকা দেয়া। ভুলটা হলো ওখানেই। কুঠির লাগোয়া নদীতে নীল ফ্যাক্টরির পাশেই জেটি বানানো হয়েছে। রাতদিন জেটিতে ভেড়ানো বজরায় মাল ওঠানো নামানো চলছে। রাতের বেলা তিনটে নৌকা ছপাছপ দাঁড় বেয়ে তীরের মত এগিয়ে যাচ্ছে দেখে ইংরেজ সাহেবের সেপাইদের সন্দেহ হয়। নৌকোগুলোতে ডাকাত নেই তো? নৌকা থামাতে বলল সেপাইরা। চেকিং হবে। ওদিকে নৌকো থামার কোন লক্ষণ নেই, উল্টো আরও জোরে দাঁড় পড়ছে। শ্যারো বাট একই সঙ্গে নীলকর জমিদার এবং এলাকার ম্যাজিস্ট্রেট। তার আইরিশ সার্জেন্ট তৎক্ষণাৎ সেপাইদের ফায়ার ওপেন করার অর্ডার দিল। বিশটা গাদা বন্দুক আর ছোট কামানের গুলি নদীকে বানিয়ে ফেলল নরক। পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতরে ওপারে উঠে প্রাণ বাঁচাল ডাকাতের দল। ব্রাহ্মণ-কন্যা সহ নৌকা ঘুরপাক খেতে লাগল নদীর বুকে। যা হোক, মেয়েটিকে উদ্ধার করে কুঠিতে নিয়ে আসা হয়। পরদিন ব্রাহ্মণকে ডেকে বলা হয়, তার মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু ব্রাহ্মণ অনড়। এই মেয়ে পতিত হয়েছে। একে আর ঘরে তোলা যাবে না। মেয়েটি থেকে গেল কুঠিতেই। নাচ-গান জানা মেয়ে, অপূর্ব রূপসী। সাহেবদের পার্টিতে তার কদরই আলাদা। মেয়েটি নিজে থেকেই গান-বাজনা করত। সাহেবরা তাকে দিয়ে জোর করে কিছু করায়নি। ওদিকে ব্রাহ্মণের কানে গেল, তার মেয়ে বাইজি হয়ে নেচেকুঁদে বেড়াচ্ছে। পূজারী ব্রাহ্মণের মেয়ে দেহপসারিণী! এতবড় অনাচার এ দেশে! হিন্দু কমিউনিটির কাছে বিচার দিল ব্রাহ্মণ। ক্রিসমাসের রাতে হাজার হাজার লোক একত্রিত হয়ে কুঠি আক্রমণ করল। ব্রাহ্মণের মেয়ে বড় কথা নয়, আসল কথা কুঠিয়ালদের অত্যাচার বন্ধ করা। এ মওকা দু’বার পাওয়া যাবে না। নীলকুঠি তখন প্রায় খালিই বলা চলে। সাহেব তার লোকজন নিয়ে ক্যালকাটায় ক্রিসমাস আর নিউ ইয়ার উদযাপন করতে গেছে। সঙ্গে ব্রাহ্মণের মেয়ে। এক রাতেই ধ্বংস হয়ে গেল নীলকুঠি। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হলো সব কিছু। সাহেব কিংবা ব্রাহ্মণের মেয়ে কেউই আর কখনও ফিরে আসেনি। তবে ব্রিটিশ আর্মির একটা ছোট ডিটাচমেন্ট এসেছিল। গ্রাম উজাড় করে ফেলে তারা। মারা পড়ে ব্রাহ্মণের পরিবারের প্রায় সব সদস্য। বেঁচে যায় আশি বছর বয়সের বুড়ি মা। এই বুড়ি সকাল-সন্ধ্যা মন্দিরের দাওয়ায় বসে ভগবানের কাছে বিচার চাইত, শাপ- শাপান্ত করত। বুড়ি মরে গেলে মন্দির হয়ে গেল এক অভিশপ্ত হানাবাড়ি। পারলে ও পথ কেউ মাড়াতে চায় না।
১ অক্টোবর, ১৯৭১। লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে মামার কাছে চিঠি লিখেছিলাম শ্যারো বাট আর ভ্যান হওসেন বাটের ঠিকুজি জানতে চেয়ে। আজকে আর্মি মেসেঞ্জার কুষ্টিয়া হেড কোয়ার্টার থেকে সেই চিঠির উত্তর এনেছে। মামা লাহোরের ব্রিটিশ কাউন্সিল, এশিয়াটিক সোসাইটি সবখানেই খোঁজ নিয়েছেন। ব্রিটিশ বনেদি পরিবারগুলোর বংশলতিকা খুব যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়। এই দু’জনের ব্যাপারে জানা গেছে অনেক কিছুই। এঁরা চাচা-ভাতিজা। ভ্যান হওসেন আফগানিস্তান থেকে সরাসরি ক্যালকাটায় চলে আসেন মাদ্রাজ হয়ে লিভারপুল যাওয়ার জন্যে। মাসের পর মাস দীর্ঘ পথশ্রমের কারণে কিছুদিন বিশ্রাম নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। হাজির হন শ্যারো বাটের নীলকুঠিতে। কুঠিতে দু’মাস কাটিয়ে ক্যালকাটা ফিরে এসে জাহাজে ওঠেন ভ্যান হওসেন। শ্যারোকে বলে যান ক্রিসমাসের পরে ফিরবেন। অতি জরুরি কাজে ফিরতে তাঁকে হবেই। এরপর মাদ্রাজ হয়ে এডেন বন্দরে পৌঁছেন ভ্যান হওসেন। সেখান থেকে রেড সি পার হয়ে প্রাচীন পূর্ব মিশরীয় সমুদ্র বন্দর মিওস হরমুজে নামেন। তারপর ঊষর মরুভূমি পার হয়ে আসেন জেরুযালেমে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল উত্তর জর্ডানে নেবাতিয়ানদের শ্রেষ্ঠ নগরী পেত্রায় আল উজ্জার মন্দিরে যাওয়া। উত্তর আফ্রিকার মরুভূমি এক ভয়াবহ জায়গা। অন্যান্য সমস্যা বাদ দিলেও ভ্যালি ফিভারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই সব থেকে বড় বিপদ। এ হলো মরুভূমির জ্বর। এক ধরনের ফাঙ্গাস শরীরের চামড়া, ফুসফুস আক্রমণ করে। প্রথমে মনে হয় ইনফ্লুয়েঞ্জা। আসল ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সময়মত চিকিৎসা না হলে নিশ্চিত নিউমোনিয়ার দিকে টার্ন নেবে। মৃত্যু তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। জেরুযালেমেই মারা যান ভ্যান হওসেন। মারা যাওয়ার দু’দিন আগে গার্ডেন অভ গেথসিমেনি দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। এই বাগানেই দু’হাজার বছর আগে যীশু খ্রীষ্টকে ধরিয়ে দিয়েছিল জুডাস। বিনিময়ে পেয়েছিল ত্রিশটি রুপোর শেকেল। জেরুযালেমের ব্রিটিশ কনসাল ভ্যান হওসেনের লাশ সহ তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সব জিনিসপত্র পৈতৃক বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। শ্যারো বাটের জীবন কেটেছে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তাঁর ভারতীয় স্ত্রীর সঙ্গে। ধারণা করা হয় পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে শ্যারো বাটের চিনির কারবার ছিল।
অমূল্য জুডাস কয়েন সঙ্গে নিয়ে ভ্যান হওসেন মিশর-ইজরায়েল ঘোরাঘুরি করবেন এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। যদি ধরে নিই ভ্যান হওসেন জুডাস কয়েন পেয়েছিলেন, তা হলে সেই কয়েন রয়ে গেছে আসলে এই নীলকুঠিতেই। কিন্তু কোথায়?
১৯ অক্টোবর, ১৯৭১। আজিজ মাস্টারকে সঙ্গে নিয়ে পুরো নীলকুঠি চষে ফেলেছি। কী খুঁজছি সেটা অবশ্য মাস্টারকে বলিনি। মাস্টারও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আসলে সাহসেই কুলোয়নি। শেষ চেষ্টা হিসেবে নীলকুঠির চুন-সুড়কি গাঁথা ইঁদারা খুঁড়িয়েছি। অর্ধেক দেয়াল ভাঙা ইঁদারাটা অনেক আগেই মাটিতে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। লেবার দিয়ে সেই মাটি উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে ভ্যান হওসেনের কুয়ো-খোঁড়ার বাতিক। মাটির বহু নিচে কুয়োতে পানি পাওয়া গেল। তবে ওই পানি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেল না। হতাশ হয়েছি খুব। মহামূল্য দ্রব্যটা এখানেই কোথাও আছে, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না।
৭ নভেম্বর, ১৯৭১। মুক্তিফৌজের উৎপাত যথেষ্ট বেড়ে গেছে। কুষ্টিয়া থেকে কনভয় আসার পথে স্যাবোটাজ হচ্ছে খুব। নিরাপদে সাপ্লাই নিয়ে আসা মুশকিল। হেড কোয়ার্টার থেকে নির্দেশ এসেছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়ার। ইণ্ডিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে।
আমার ক্যাম্প বর্ডারের খুব কাছে। ইণ্ডিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে এই এলাকায় প্রথমেই হিট হবে। ডায়ারিটা সহ টুকটাক যা কিছু আছে আজিজ মাস্টারের কাছে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রণাঙ্গনে কখন কোথায় থাকি, তার নেই ঠিক। ঠিক নেই মরা-বাঁচার। যুদ্ধ যদি শেষ হয়, আর বেঁচে যদি থাকি, তা হলে ট্রাঙ্কটা তার কাছ থেকে ফিরিয়ে নেয়া যাবে। মরে গেলে আজিজ মাস্টারকেই ট্রাঙ্কটা মামার কাছে পাঞ্জাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাঞ্জাবে পাঠাতে না পারলে দ্বিতীয় একটা রাস্তা আছে। ট্রাঙ্কটা ঢাকার আগা খান ট্রাস্টের অফিসে পৌঁছে দিয়ে মামাকে জানালেই হবে। মামা আহমেদিয়া সম্প্রদায়ের বড় লিডার। আগা খানের লোকজনই ওটা তাঁর কাছে পৌঁছে দেবে। মাস্টারের সঙ্গে এভাবেই কথা হয়েছে। ক্যাম্পের ভেতর প্রচুর বাঙ্কার খোঁড়া হচ্ছে। বাঙ্কার খোঁড়ার ঠিকাদারি দিয়েছি মাস্টারকে। ক্যাম্পের কাঁচা বাজারও সে-ই সাপ্লাই দেয়। মাস্টার ব্যাটা যুদ্ধের ডামাডোলে ভাল টাকা কামিয়ে নিয়েছে। আশা করছি কথা রাখবে সে। বাঙালিদের বিশ্বাস করা কঠিন হলেও আজিজ মাস্টারকে সাচ্চা পাকিস্তানি মনে হয়েছে।
হামেদের ডায়ারি এখানেই শেষ। আর কোন এন্ট্রি নেই। হারিকেনের আলো দপদপ করছে। তেল শেষ, পুড়ছে সলতে। ডায়ারি ট্রাঙ্কে ভরে, আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।
.
দশ
সকালবেলা উঠে নাস্তা সেরে নীলকুঠিতে যাওয়ার জন্যে বের হলাম। মুক্তার জানাল, আজিজ মাস্টার তখনও ফেরেননি। সম্ভবত ঝড়-বৃষ্টির কারণে গাংনীতে আটকা পড়েছিলেন। বাসা থেকে বের হয়ে দেখলাম রাস্তার ধারে কদম অপেক্ষা করছে। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে নীলকুঠিতে পৌঁছে বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম। কুঠির যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তার অর্ধেক নেই হয়ে গেছে। আকাশ ছোঁয়া ইউক্যালিপটাস গাছটা ভেঙে পড়েছে গাড়ি বারান্দার তিনকোনা ছাদঅলা গেটটার ওপর। শতখণ্ড হয়ে মাটিতে গড়াচ্ছে ওটা। ত্রিভুজাকৃতির কপালিটা ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। ত্রিভুজের মাঝখানে আয়তাকার বলের মত জিনিসটা কপালির ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে ফেটে চৌচির। কাছে গিয়ে লক্ষ করতেই উত্তল বলটার কংক্রিটের ফাটলের ভেতর দিয়ে লোহার একটা ছোট বাক্স নজরে পড়ল। বাক্সটা বের করে বুঝলাম খাঁটি বিলিতি জিনিস। এখনও যথেষ্ট মজবুত। ওটাতে কোন তালা লাগানো নেই। বাক্সের মালিক হয়তো ভেবেছিল, যে ব্যক্তি এই বাক্স খুঁজে বার করবে, তাকে ছোট তালা, বড় তালা দিয়ে আটকানো হাস্যকর প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। চারদিকে তাকিয়ে কেউ আছে কি না দেখে নিলাম। কেউ নেই। কিন্তু কদম কোথায়? পুকুর পাড়ে নারকেল গাছের নিচে একটা ঝুনো নারকেল পড়ে আছে। গতরাতের ঝড়ের ফল। কদম নারকেল কুড়োচ্ছে। সকালের নাস্তা হয়তো এখনও হয়নি। দু’ শ’ বছরের পুরনো এক লিচুগাছের আড়ালে বসে খুললাম বাক্সটা। ভেতরে সোনার সুতোর কাজকরা লাল সিল্কে পেঁচানো রুপোর নস্যির ডিবে। ডিবে খুলতেই তিনটে পয়সা গড়িয়ে মাটিতে পড়ল। দু’পায়ের ফাঁকে সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আছে মেরুন রঙের জুডাস কয়েন! কতক্ষণ মুদ্রাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম, জানি না। ফোঁস শব্দ শুনে চমকে সামনের দিকে তাকালাম। মাথা নিচু করে কয়েনগুলো দেখছে কদম। আস্তে করে হাতে নিলাম ওগুলো। ঝিমঝিম করে উঠল মাথার ভেতর। আঁধার হয়ে এল চারদিক। অল্প সময়ের ভেতর কেটে গেল আঁধার। বোধহয় জুডাস কয়েনের জোরেই শরীরের ভেতর হাজার হর্স পাওয়ার ইঞ্জিনের শক্তি অনুভব করলাম। মনে হলো, আমি যা চাই তাই হবে। হতেই হবে। মনে পড়ল দাঁড়ি- কমা সহ জীবনের সব ঘটনা। দু’বছর আগে পড়া পঁয়ত্রিশজন নীলকর সাহেবের বার্ষিক রেভেনিউ, মোট উৎপাদন, জমির পরিমাণ, নাম-ধাম, ঠিকুজি কুলজি চোখের সামনে ভাসতে লাগল, যেন খোলা বইয়ের পাতা। বাদ গেল না অতি তুচ্ছ ঘটনাও। ছোটবেলায় আমার বড় বোনের কঠিন অসুখ হয়েছিল। অনেক সাধ্য-সাধনা করে সেই অসুখ ভাল হলে একুশজন ফকির খাওয়ানো হয়। সেই একুশজন ফকিরের চেহারা সহ তাদের ছেঁড়া কাপড়ে কী রঙের তালি মারা ছিল, মনের চোখে ভেসে উঠল সেগুলোও। কদমের দিকে তাকিয়ে মনে হলো ওর মনের কথা স্পষ্ট পড়তে পারছি আমি। কদম যখন খুব ছোট, তখন তার বাবা তাকে এই লিচুগাছটা থেকে লিচু পেড়ে খাইয়েছিল। কদম ভাবছে সেই কথা। পয়সার ব্যাপারটি সে ধরতে পারেনি। বাক্সটা পাওয়ার সময় কদম নীলকুঠির পুকুর পাড়ে। পয়সাগুলো নস্যির ডিবেতে রেখে ডিবেটা আগের মতই কাপড়ে পেঁচিয়ে প্যান্টের পকেটে রাখলাম। বাক্সটা লুকিয়ে রাখলাম ফ্যাক্টরির জং-ধরা ভাঙা বয়লারটার নিচে। হাতে পুরনো লোহার বাক্স দেখলে লোকে সন্দেহ করবে। অন্য কেউ না করলেও আজিজ মাস্টারের মত লোক অবশ্যই করবে। এখনই বাসায় ফেরা যাবে না। এত দ্রুত ফিরলে হাজারটা প্রশ্ন করবে মুক্তার।
কদমকে সঙ্গে নিয়ে নীলকুঠির এখানে-সেখানে ঘুরে দুপুরের দিকে বাজারে গেলাম। চোখে পড়ল প্রথমদিন দেখা সেই পোড়ো মন্দিরটা। সেদিনের মতই থমথম করছে ওটা, যেন মৃত্যুপুরী। পেটপুরে জিলিপি, খাগড়াই, মুড়ি খাওয়ালাম কদমকে। নিজেও খেলাম। গড়িয়ে এল বেলা। এবার বাসায় ফেরার পালা। যেতে যেতে ছেঁকে ধরল বৃষ্টি। কাদাপানিতে মাখামাখি। ঘরে ফিরে কাদামাখা কাপড়- চোপড় ছেড়ে গা-মাথা মুছে শুকনো কাপড় পরছি, এমন সময় কদমের চিলচিৎকার শুনতে পেলাম। আজিজ মাস্টারের বাড়ির গেটের বাইরে থেকে আসছে ওটা। তাড়াহুড়ো করে বাইরে বের হলাম। যাওয়ার পথে দেখলাম আজিজ মাস্টার গম্ভীর মুখে বারান্দায় বসে আছেন। গেটের সামনে এসে দেখি স্কুলের দারোয়ান কদমকে লাঠি দিয়ে দমাদম পেটাচ্ছে। দারোয়ানকে থামিয়ে বিষয় কী জিজ্ঞেস করলাম। দারোয়ান যা বলল, তার সারমর্ম এই: গতরাতে ঝড়বৃষ্টির ভেতর কদম তার পৈতৃক ভিটেয় ফিরে যেতে পারেনি। রাতটা তার মা’র ওখানে, অর্থাৎ দারোয়ানের বাড়ির বারান্দায় শুয়ে কাটিয়ে দিয়েছে। রাতে খাওয়ার পর কিছু ভাত বেঁচে ছিল। কদমের মা ওই ভাতে পানি ঢেলে রাখে। দারোয়ান যাতে সকালে পান্তাভাত খেতে পারে। দারোয়ান সকালে পান্তাভাত খেতে গিয়ে দেখে হাঁড়ি খালি। কদম আগেই সব খেয়ে ফেলেছে। রাগের চোটে কিছু মুখে না দিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় দারোয়ান। কদমকে খুঁজছে তখন থেকেই। দুপুরবেলা আমার সঙ্গে কদম যখন বাজারে, দারোয়ান তখন বাড়িতে। এই বেলা কদমকে ধরেছে সে। ভাত খাওয়ার মজা বের করবে। দারোয়ানকে বললাম, ‘দু’সের চালের দাম দিয়ে দিচ্ছি। বাজার থেকে চাল কিনে গরম ভাত রেঁধে খাও।’
এদিকে কদমের কান্না আর থামেই না। অনেকক্ষণ ধরে বহু কষ্টে কদমকে শান্ত করে দারোয়ানকে টাকা দিতে গেলাম। পকেটে হাত দিয়ে দেখি মানিব্যাগ নেই। ওটা রয়ে গেছে কাদামাখা প্যান্টের পকেটে। দারোয়ানকে দাঁড় করিয়ে আবার বাসায় ঢুকলাম। বারান্দা খালি, আজিজ মাস্টার সম্ভবত ভেতরে গেছেন। ঘরে ফিরে মেঝের ওপর থেকে ভেজা প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে যাব, কিন্তু এ কী! মানিব্যাগ পড়ে আছে টেবিলের ওপর, কাদামাখা শার্ট-প্যান্ট উধাও! ঘরের বাইরে এসে দেখি কুয়ো তলায় বসে সাবান দিয়ে শার্ট-প্যান্ট কাচছে মুক্তার। মনে পড়ল, এর আগেও মুক্তার ওই একই কাণ্ড করেছে। কিন্তু সেবার তো পকেটে নস্যির ডিবেয় অমূল্য জুডাস কয়েন ছিল না! মুক্তারকে আসলে কী জিজ্ঞেস করব, সেটাই ভেবে পেলাম না। মুক্তার, জুডাস কয়েন কোথায় এ কথা জিজ্ঞেস করা অর্থহীন। আমি নিশ্চিত জুডাস কয়েন এখন আজিজ মাস্টারের হাতে। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুক্তার বলল, প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সে টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছে। টাকা-পয়সা সব ঠিক আছে কি না আমি যেন গুনে দেখি। ওদিকে দু’সের চালের টাকার জন্যে দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো কদমকেও আটকে রেখেছে। গেটের সামনে এসে দারোয়ানের হাতে পনেরো টাকা দিলাম। কদমকে বললাম, পরদিন সকালে আসার জন্যে। বাসায় ফিরে দেখি মুক্তার উঠোনে তারের ওপর কাপড় মেলে দিচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম মাস্টার সাহেব কোথায়? কদম জানাল মাস্টার সাহেবের শরীর খারাপ। সকাল সকাল শুয়ে পড়েছেন। মুক্তারকে বলে গেছেন আমার কামরাতেই যেন আমাকে রাতে খাবার দেয়া হয়। রাতে খেতে পারলাম না কিছুই। অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে দুই আর দুই চার মেলালাম। আমি যে হামেদের ডায়ারি পড়েছি, এটা মুক্তার বুঝতে পারে সকালে ঘর পরিষ্কার করতে এসে। পুরু ধুলোর ওপর হাত-পায়ের ছাপ স্পষ্ট ফুটে ওঠার কথা। আজিজ মাস্টার বাড়ি ফেরামাত্র মুক্তার তাঁকে আমার সব কর্মকাণ্ড বিস্তারিত বর্ণনা করেছে। তবে আমার প্যান্টের পকেটে মুদ্রাগুলো পাওয়া সম্পূর্ণ কাকতালীয়। শার্ট-প্যান্ট অভ্যেসবশত কাচার জন্যেই নিয়ে যায় মুক্তার। এবং তারপরই যা হবার তা-ই হয়েছে। এ হচ্ছে কোহিনূর হীরের অবস্থা। বাহাদুর শাহের পতনের পর প্রথম কোহিনূর হীরেটা পায় এক ইংরেজ ব্রিগেডিয়ার। হীরেটাকে প্যান্টের পকেটে নিয়ে ঘুরত সে। অফিসে এলে ওটাকে পকেট থেকে বের করে ব্যবহার করত পেপারওয়েট হিসেবে একদিন ব্রিগেডিয়ারের প্যান্ট ময়লা হয়েছে দেখে তার ব্যাটম্যান ওটাকে ধোপার কাছে পাঠিয়ে দেয়। ধোপা প্যান্ট কাচতে গিয়ে দেখে পকেটের ভেতর শক্ত কী যেন। কাপড়-কাচিয়ে কোহিনূর চিনতেই পারেনি। সে ব্রিগেডিয়ারকে কোহিনূর ফিরিয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনার পর ব্রিগেডিয়ার আর একদিনও দেরি না করে রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেয় ওই অমূল্য হীরে।
.
এগারো
সকালে উঠে বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে কদমকে নিয়ে বাজারে বসে দই-চিঁড়ে দিয়ে নাস্তা সারলাম। মুক্তার নাস্তা খাওয়ার কথা বলেছিল। আমি কানে তুলিনি। আজিজ মাস্টারের খাবার খাওয়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই। এরপর গেলাম নীলকুঠিতে। লুকানো বাক্সটা বের করে ফিরে এলাম মাস্টারের বাড়িতে। বারান্দায় মুক্তারের সঙ্গে দেখা। সে জানাল, আজিজ মাস্টার জরুরি চিকিৎসার জন্যে ঢাকা চলে গেছেন। আমার শার্ট-প্যান্ট ইস্ত্রি করে ঘরে রাখা হয়েছে। ব্যাগ- ট্যাগ গুছিয়ে বাড়ি থেকে বের হলাম। মুক্তারকে কোথাও দেখলাম না। দূর থেকে হয়তো নজর রাখছে। কদমকে নিয়ে রমজান রাজাকারের বাড়ি গেলাম। ভাগ্য ভাল, রমজানকে তার বাড়িতেই পাওয়া গেল। তার কাছ থেকে কোম্পানি কয়েনটা চেয়ে নিলাম। বললাম, ‘কয়েনটা আমাকে দিয়ে দেন। এক শ’ টাকা পাবেন।’
‘টাকা লাগবে না। আপনার পয়সাটা যখন এতই পছন্দ, নিয়ে যান ওটা। মনে করেন রমজান ভিখিরির উপহার।’
এ কথা বলে হে-হে করে হাসতে লাগল রমজান। রমজান রাজাকার দেখি রসের নাগর। রমজানকে জিজ্ঞেস করলাম, তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে সেটা কীভাবে সম্ভব। রমজান বলল, বামুন্দি পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টারের কাছে তার নামে চিঠি পাঠালেই হবে। বামুন্দি বাসস্ট্যাণ্ডে পৌঁছে কদমকে পঞ্চাশটা টাকা দিলাম। বললাম, সে যেন কুষ্টিয়া জেলে গিয়ে তার বাবার সঙ্গে দেখা করে।
.
বারো
ঢাকায় ফিরে দাঁতের যন্ত্রণায় কাহিল হয়ে পড়লাম। ডেন্টিস্টের সঙ্গে বেশ কয় দফা সিটিং দিতে হলো। রমজানের কয়েনটা বিক্রি করলাম এক রাজস্থানী মাড়োয়ারীর কাছে। দাম উঠল দশ লাখ টাকা। টাকাটা ব্যাঙ্কে রেখে রমজানকে চিঠি দিয়ে জানালাম ঢাকায় এসে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে। দশ দিন পর হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে রমজান এসে হাজির। দশ লাখ টাকা পেয়ে বিস্তর কান্নাকাটি করল। আমাকে বানাল ধর্মের ভাই। জানাল, হিন্দু হয়ে না জন্মালে আমি যে- ছদ্মবেশী ফেরেস্তা, সে বিষয়ে তার কোন সন্দেহই থাকত না। কদমের কথা জানতে চাইলে বলল, কদমের সঙ্গে তার বাবার দেখা হয়নি। কদম যেদিন কুষ্টিয়া জেলে যায়, তার দু’দিন আগে কদমের বাবাকে যশোর জেলে ট্র্যান্সফার করা হয়েছে। বিচারে কদমের বাবার ফাঁসি হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে ফাঁসি হয় না, যশোর জেলা কারাগারে হয়। এসব জানার পর কদম বামুন্দি ফিরে যায়। দু’দিন পৈতৃক ভিটেয় কাটিয়ে রমজানের সঙ্গে দেখা করে। আমি চিঠি লিখেছি কি না জানতে চেয়েছিল। তারপর থেকে ছেলেটার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি হারিয়ে গেছে কদম। তবে রমজানের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার আগে রমজান তাকে ডাঁটা-চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খাইয়েছিল, সঙ্গে ডালও নাকি ছিল। আজিজ মাস্টারও নাকি নিখোঁজ। হন্যে হয়ে মাস্টারকে খুঁজছে তাঁর পরিবারের লোকেরা।
রমজান বিদেয় হওয়ার পর একমাস কেটে গেছে। থিসিস লেখা হয়নি কিছুই। সীমাহীন ক্লান্তিবোধ করি সবসময়। খাওয়ায় রুচি নেই। জোর করে যদি খাই, তো বমি-বমি লাগে। ডাক্তার অনেক টেস্ট দিয়েছিল। রিপোর্টগুলো নিয়ে বিকেলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্যে বের হয়েছি, এমন সময় লক্ষ করলাম, মেঝের ওপর একটা চিঠি পড়ে আছে। বামুন্দি পোস্ট মাস্টারের লেখা চিঠি পোস্ট মাস্টার জানিয়েছে, দশ লাখ টাকা নিয়ে বামুন্দি হয়ে গ্রামে ফেরার পথে সর্বহারাদের পাল্লায় পড়ে রমজান। রাস্তার ধারে জবাই করা হয় তাকে। রমজানের কাছে এত টাকা আছে, কেউ জানত না। একমাত্র হাকিম ছাড়া। পোস্ট মাস্টারের ধারণা, ওই হাকিমই সর্বহারাদের সব বলে দিয়েছিল। সুযোগ পাওয়া কঠিন, কিন্তু সুযোগ কাজে লাগানো অনেক বেশি কঠিন।
ডাক্তার রিপোর্ট পড়ে জিজ্ঞেস করল, আজেবাজে মেয়েলোকের সঙ্গে মেলামেশা করি কি না, কিংবা কোন কারণে আমার শরীরে অন্য কারও রক্ত দেয়া হয়েছে কি না। ডাক্তারকে বললাম, দুটোর কোনটাই ঘটেনি। কিছুক্ষণ থম ধরে থেকে ডাক্তার জানাল, আমার দেহে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। প্রায় শেষ হয়ে গেছে লিভার। আয়ু আছে বড়জোর দু’মাস। মনে পড়ল, বামুন্দি থেকে ফিরে দাঁতের চিকিৎসা করিয়েছিলাম। ডেন্টিস্ট তার যন্ত্রপাতি স্টেরিলাই করতে ভুলে গেছে!
সেই ভ্যান হওসেন বা আর কাউকে নীলকুঠির NEMESIS ছাড়ে না!
.
মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর
