নিশিডাকিনী – সুষুপ্ত পাঠক
নিশিডাকিনী
স্কুল মাস্টারের চাকরি নিয়ে গ্রামে এসেছি। জয়েনের দিন পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। হেডস্যর আমাকে দেখেই বললেন, ‘আসবেন ভাবিনি। শহর থেকে এই অজ পাড়াগাঁয়ে কে আর আসতে চায়, বলেন? যা হোক, তবু এসেছেন। আসতেও নিশ্চয়ই অনেক ঝামেলা হয়েছে? এখানকার রাস্তাঘাট খুবই খারাপ! বর্ষাকাল আসতে দেন, তখন দেখবেন অবস্থা। চোখের পানি নাকের পানি এক করে ছাড়বে-হা-হা-হা!’
স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। শুধু হেডস্যর ও একজন দপ্তরি ছাড়া কেউ নেই অফিসঘরে। ওখানে বসেই কথা হচ্ছিল ভদ্রলোকের সঙ্গে। স্কুল নিয়ে, স্থানীয় বাজারদর, রাজনীতি, নিজ ঘর-সংসার প্রায় সব কিছুই হড়বড় করে বলে গেলেন। ভদ্রলোক কথা বলতে ভালবাসেন। হঠাৎ তাঁর খেয়াল হলো আমি জার্নি করে এসেছি, টায়ার্ড। ব্যতিব্যস্ত হয়ে দপ্তরিকে ডেকে বললেন, আমাকে থাকার নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যেতে। কাল সকালে বিস্তারিত আলাপ হবে। থাকা-খাওয়া নিয়ে কোন সমস্যা হবে না।
স্কুল থেকে গন্তব্যে হেঁটে পৌঁছুতে দশ মিনিট লাগল। ছোট্ট এক টিনের ঘর। মেঝেটা পাকা। একপাশে খাট পাতা, টেবিল-চেয়ার, একপাশে কাপড়-চোপড় রাখার আলনা, ব্যস এটাই আপাতত আমার বাসস্থান। বাইরে থেকে কোন শিক্ষক এলে তাকে এখানে এনে তোলা হয়। আশপাশে কোন বাড়ি-ঘর নেই পুরো উঠোনসহ আশপাশ ছেয়ে ফেলেছে বুনো ঝোপে। গৃহস্থবাড়ির কোন শ্ৰী-ছাঁদ নেই। বাড়ির পেছনে ডোবা। বেতঝাড়-বাঁশঝাড়ে সে জায়গাও অন্ধকার। চারপাশটা ঘুরে-ঘুরে দেখলাম। এমন সময় দপ্তরি ছেলেটা এসে বলল, চা দেয়া হয়েছে।
ঘরে গিয়ে বসলাম। চা খেতে-খেতে এবার ছেলেটার সঙ্গে আলাপ করতে লাগলাম।
‘নামটাই তো এখনও জানা হলো না, ভাই। কী নাম তোমার?’
‘আমার নাম, স্যর, শরিফুল।’
‘তুমি কি এখানেও কাজ করো নাকি?’
‘জী, স্যর, বাইরে থিকা যেসব স্যর আসেন, তাঁরা সবাই এইখানেই ওঠেন। আমিই তাদের দেখাশোনা করি। আমার রান্না, স্যর, খারাপ না। আশা করি খাইতে খারাপ লাগব না।’
‘আমার কোন সমস্যা হবে না, শরিফুল। অনেক খারাপ রান্না খেয়ে অভ্যাস আছে। হোস্টেলে মেসে থেকে মানুষ হয়েছি। সবরকম অভ্যাস আছে, কোন সমস্যা হবে না।’
শরিফুল মনে হলো এই কথায় খুবই সন্তুষ্ট হলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমার সঙ্গে সে সহজ হয়ে গেল। বোঝা গেল আমাকে পছন্দ করেছে। বললাম, ‘তুমি থাকো কোথায়, শরিফুল? রাতে কি আমি এখানে একা থাকব?’
যেন ন্যায্য কথা বলেছি, আবেগ দিয়ে শরিফুল বলল, ‘আপনি একা থাকবেন কেন, স্যর? আমি আছি না! ওই তো আমার ঘর!’ উঠোনের অন্যপাশে আমার ঘরটার প্রায় বরাবর ঝোপঝাড়ের কাছে নুয়ে পড়া এক বেড়ার ঘর আঙুল দিয়ে দেখাল শরিফুল। ‘আমি রাতে ওইখানেই শুই। নিশি রাতেও, স্যর, শুধু একটু শরিফুল কইয়া ডাক দিয়েন। আমি ফাল দিয়া চইলা আসব। কোন চিন্তা করবেন না, স্যর।’
‘খুব ভাল, শরিফুল। তোমাকে পেয়ে আমার ভরসা হচ্ছে।’
নাস্তা খাওয়া শেষে শরিফুল কাপ-প্লেট ধুতে গেলে আমিও নিজের বিছানা- বালিশ গোছগাছ করতে লাগলাম। ব্যাগ খুলে ধোয়া চাদর বের করে খাটে বিছালাম। জামা-কাপড় বের করে আলনাটায় রাখলাম। টুথপেস্ট-ব্রাশ-রেযর সব গুছিয়ে রাখলাম টেবিলে। এরই মধ্যে কখন পুরোপুরি রাত নেমে গেছে, টেরও পাইনি। ঝিঁঝি ডাকছে বিরামহীন। আরও কী সব অচেনা শব্দ। শহুরে শব্দের বদলে এই অচেনা প্রাকৃতিক শব্দ অদ্ভুত এক নৈরাশ্য তৈরি করল মনে। মনে হলো, কী স্থবির আমার জীবন! সময় যেন এখানে এসে থেমে গেছে…
রাতে হেডস্যরের বাসায় নিমন্ত্রণ। আগেই বলেছেন রাতে তাঁর বাসায় আজ খেতে। সে মত শরিফুলকে নিয়ে হেডস্যরের বাসায় গেলাম। শরিফুল এরই মধ্যে অজ্ঞাত কোন কারণে আমাকে অন্ধের মত ভালবেসে ফেলেছে। সবসময় আমাকে আগলে রাখতে চাইছে। আমার সামান্য অসুবিধা যাতে না হয়, সেদিকে তার কড়া নজর।
হেডস্যরও বললেন শরিফুলের কথা। ‘খুবই ভাল ছেলে। ও থাকতে আপনার কোন সমস্যা হবে না। নিজ ভাইয়ের মত দেখবে। তা ছাড়া, আমি তো আছিই। আপনার কোন অসুবিধা হলে সোজা আমাকে বলবেন। সাধ্য মত চেষ্টা করব।’
‘আমার জন্যে চিন্তা করবেন না,’ তাঁকে বললাম। ‘কোন সমস্যাও হবে না। তা ছাড়া, শরিফুল যা কেয়ারফুল ছেলে!’
তিনি হা-হা করে হেসে বললেন, ‘সেটা ঠিক। তবে হারামজাদার একটা বদনেশা আছে। গাঁজা খেলে সব ভুলে বসে থাকে। দেখবেন, যদি গাঁজা-টাজা কিছু খেতে দেখেন, লাথি মেরে হারামীর মাজা ভেঙে দেবেন।’
শরিফুল মাথা নিচু করে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, ‘ওইসব ছাইড়া দিছি, স্যর। এখন আর খাই না।’
ফেরার পথে শরিফুলকে বললাম, ‘ওইসব খাও নাকি? ছি-ছি, ছেড়ে দাও, শরিফুল!’
সে লজ্জায় যেন একদম মাটিতে মিশে গেল। ‘আর শরম দিয়েন না, স্যর। এখন আর খাই না।’
‘খুব ভাল তা হলে। আমি খুশি হলাম।’
গ্রামের পথ, দু’পাশে বিশাল সব গাছ। গৃহস্থবাড়িগুলোয় ঘুমিয়ে এরই মধ্যে কাদা হয়ে গেছে সবাই। রাত বোধহয় ন’টার বেশি হবে না। দুধের মত জোছনা ভাসিয়ে দিচ্ছে গ্রাম। শরিফুলের হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ। সেটা না জ্বেলে চাঁদের আলোতেই পথ চলছি। সে এক অপরূপ দৃশ্য! চাঁদের আলো গাছের পাতার ফাঁক গলে অদ্ভুত রহস্যময় ছায়া ফেলছে চলার পথে। বাতাসে নড়ে সেই সব ছায়া ধারণ করছে নানা বিচিত্র রূপ। একটা বাঁধানো ঘাট দেখে একটু থামলাম। পুকুরটার টলটলে জলে ভাসছে গোল চাঁদ। একটা গাছ ডালসহ অনেকখানি ঝুঁকে আছে পুকুরের জলে। বসন্তের ফুরফুরে হাওয়া বইছে।
শরিফুলকে বললাম, ‘এসো, এখানে একটু বসি। খুব ভাল লাগছে জায়গাটা।’
শরিফুলকে হঠাৎ দেখলাম কেমন মনমরা হয়ে গেছে। তখন থেকে কী যেন ভেবে যাচ্ছে। আমি তার দিকে মনোযোগ দিতে সে-ও আমার দিকে চাইল।
জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে রইলাম তার দিকে।
শরিফুল বিব্রত সুরে বলল, ‘স্যর, একটা কথা… আপনি আসার আগে আরও তিনজন এইখানে আসছিল চাকরি করতে। তারা প্রত্যেকেই পানিতে ডুইবা মারা গেছে। …জায়গাটা, স্যর, ভাল না!’
জোছনা যত জোরালো, ততই যেন কালো হয়েছে পুকুরের জলের পটভূমি। অদ্ভুত ভুতুড়ে লাগছে সব। দু’পাশের বড়-বড় গাছ ও তার ছায়াকে এখন এক- একটা দৈত্যের মত মনে হচ্ছে। শরিফুলের মুখটাকেও এখন বড় অদ্ভুত লাগল- ওখানে নাচছে বিচিত্র এক নকশা। ওর কথা শুনে বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইলাম ওর দিকে।
শরিফুল আস্থা জোগানোর সুরে বলল, ‘আপনে, স্যর, মানুষটা বড় ভাল। আমারে সত্যিকারের ভাইয়ের মত দেখছেন। ঘিন্নাপিত করেন নাই। ছোট বইলা অপমান করেন নাই। এইজন্য আপনারে সব বললাম। তবে, স্যর, ডরায়েন না। আমি থাকতে আপনার কোন ডর নাই। কেউ আপনারে কিছু করতে পারব না।’
রহস্যের গন্ধ পেয়ে গেছি, জানতে চাইলাম, ‘সব কিছু খুলে বলো তো, শরিফুল? আমার কাছে কিছু লুকিয়ো না। নির্ভয়ে বলো সব।’
শরিফুল বলল, ‘স্যর, এইখানে একটা খারাপ জিনিস আছে। ওইটারে আমি নিজের চোখে দেখছি!’
‘আমরা যেখানে বসে আছি, সেখানে?’
‘তা কইতে পারুম না। তয় সবখানেই আছে। এইখানেও থাকতে পারে।’
‘তুমি নিজের চোখে দেখেছ জিনিসটাকে? কী দেখেছিলে, বলো তো?’
শরিফুল এবার একটু চাপা অভিমান নিয়ে বলল, ‘স্যর, আমরা গ্রামের মুখ্যু- সুখ্যু মানুষ, আমরা যা দেখি সেইসব আপনাদের বিশ্বাস হইব না। হেডস্যারই আমার কথা বিশ্বাস করে নাই, বলছে গাঁজা খাইয়া আমি নাকি এইসব চোখে দেখছি।’
‘কী দেখেছিলে তুমি?’
শরিফুলের চোখদুটোয় হঠাৎ ঘোর এল। যেন দেখছে সামনের ওই জিনিসটাকে, সেভাবেই বিড়বিড় করে বলল, ‘পেছন থেকে দেখছি তারে। হাত- পায়ে বড়-বড় নখ। চোখের পলকে হাওয়া হইয়া গেল।’
‘কী করে বুঝলে বড়-বড় নখ আছে ওটার?’
‘রাইত-বিরাইতে ঘরের চালে, বেড়ায় নখ দিয়া, স্যর, আঁচড়ায়!’
‘জিনিসটা আসলে কী, শরিফুল? ‘
‘জানি না, স্যর।’
‘ভূত-টুত জাতের কিছু?’
শরিফুল সন্দিগ্ধ চোখে আমাকে দেখল ঠাট্টা করছি কি না বুঝতে, তারপর বলল, ‘ঠিক কইতে পারি না, স্যর। তয়, এইটা খারাপ, মানুষও না, জানোয়ারও না। মানুষরে ক্ষতি করে। ধন্দে ফ্যালে, চোখের সামনে মিলাইয়া যায়, মানুষেরে ঘুমের ঘোরে ডাক দিয়া লইয়া যায়….
‘তোমাকে কখনও এরকম করেছে ওটা?’
‘জী, স্যর। একবার। ঘুমাইয়া আছি, রাইত তখন কত জানি না, তয় শেষ রাইত হইব মনে হয়। হঠাৎ কী হইছে, ঘুমের মধ্যে কে জানি আমারে কইল, ‘ওই, উঠ-উঠ জলদি উঠ! দৌড় দে! এইখান থিকা পালা!’ আমার কী হইল, স্যর, জানি না, বেহুঁশ হইয়া দৌড়াইতে লাগলাম দরজা খুইলা। কানে শুনতাছিলাম হাজার-হাজার মানুষের চিল্লা-চিল্লি, কান্দন, আহাজারি! ঘোরের মইধ্যে বন-বাদাড়, ঝোপঝাড় ভাইঙ্গা হাত-পা কাইট্টা খালি দৌড়াইতে লাগলাম। কেন যাইতাছি, কী জইন্য যাইতাছি, সেই প্রশ্ন মনে আইল না। কী জানি হইয়া গেছিল আমার। যাইতে-যাইতে কোন্ সময় যে খালপাড় আইয়া পড়ছি, বুঝি নাই। পানিতে দৌড়ায়া নামলেই হইতো, আমার আর বাঁচন লাগত না। ওই দিনই ডুইবা মরতাম!’
‘তুমি পানিতে নামলে না কেন? তোমার জ্ঞান ফিরে এসেছিল?’
‘ফর্সা হইয়া গেছে তখন পুব আকাশ। ঘোর কাইট্টা গেলে বুঝলাম, খালি মাঠটায় একা দাঁড়াইয়া আছি। কোন শব্দ নাই, কেউ নাই। দিনের আলোতে খারাপ জিনিসগুলি, স্যর, থাকতে পারে না। সূর্যর আলোরে ওরা ডরায়।’
‘এরপর আর তোমাকে ডাকেনি?’
‘জী, না, স্যর। উল্টা এখন আমিই ওইটারে সন্ধান করি। আর আমারে বশ করতে পারব না। আপনে, স্যর, নতুন মানুষ, কিছু বুঝবেন না। আপনেরে বিপদে ফেলব! এর আগে আপনার মত তিনজনরে… খবরদার, স্যর, আমারে না জিগাইয়া ঘরের দরজা খুলবেন না! কথাটা মনে রাইখেন!’
কথা শেষ করে শরিফুল এমন করে তাকাল, যেন পরখ করে দেখবে আমি কতটা বিশ্বাস করেছি ওর কথা। সত্যি বলতে কী, বিশ্বাস আমি একটুও করিনি গাঁজা খেয়ে ও এসব নিজেই তৈরি করেছে। ছোকরা গাঁজাটা একটু বেশিই খায় মনে হচ্ছে। কিন্তু ওকে খুশি করতে এমন ভান করলাম, যেন খুব বিশ্বাস করেছি। গম্ভীর হয়ে রইলাম। শরিফুল তখন বলল, ‘চলেন, স্যর, এইবার উঠি। অনেক রাত হইল।’
সে রাতে ঘরে ফিরে আর দেরি করিনি, সারাদিনের জার্নির ধকল ছিল, তাড়াতাড়ি বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। ক্লান্তিজনিত কারণে ভাল ঘুমও হলো। এক ঘুমে সকাল।
সেদিন আমার প্রথম শিক্ষকতা শুরু। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে খাওয়াদাওয়া করে স্কুলে চলে গেলাম। হেডস্যর অন্য স্যরদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন এঁরা স্থানীয়, প্রায় সবাই গেরস্থালি করেন। অনেকেই সকালে স্কুলে আসার আগে খেতে একবার নিড়ানি দিয়ে এসেছেন। আশপাশের গ্রামে তাঁরা থাকেন। আমিই একমাত্র শহুরে মানুষ এখানে। সবাই এজন্যই বেশি খাতির করলেন, আবার কেউ-কেউ সরু চোখেও তাকালেন। তবে সবার একই প্রশ্ন শুনলাম, আমি শেষ পর্যন্ত এখানে থাকব তো? যাই হোক, পরিচয় পর্ব শেষে জীবনে প্রথম ফাইভের বাংলা ক্লাস নিলাম। আমার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ওরাও জানে শহুরে স্যর এসেছেন ওদের পড়াতে। ওরা তাই সবাই তটস্থ। আমি অবশ্য অল্প সময়ের মধ্যে ওদের জড়তা কাটিয়ে ক্লাসরুমে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনলাম। তারপর নিয়মিত বিরতিতে প্রত্যেকটা ক্লাস শেষ করলাম।
আমার শিক্ষকতার প্রথম দিনটি মন্দ গেল না। খুব আনন্দিত মন নিয়ে শরিফুলকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
স্কুল ছুটির পর স্যরদের মিটিং ছিল, সেটায় যোগ দিয়ে ফিরতে অবশ্য সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
শরিফুল আমার জন্য চা করতে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল। ওই ঘরের পাশেই শরিফুলের ছোট্ট ছনের ঘর।
আমি কলপাড় থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে বসলাম বিছানায়। মুড়ি আর চা নিয়ে ঘরে ঢুকল শরিফুল। দু’জনেই খেতে-খেতে গল্প করতে লাগলাম। শরিফুল একটু পরে উঠে চলে গেল রাতের খাবার তৈরি করতে। আমি বসে-বসে বই পড়তে লাগলাম। ঝিঁঝি ডাকা রাত। মনে হচ্ছে রাত যেন কত! আমার মনে পড়ছিল বাড়ির কথা, বন্ধুদের কথা, আড্ডা, হৈ-হুল্লোড়
রাতের খাবার খাওয়া শেষ হলে শরিফুল থালা-বাটি নিয়ে চলে গেল ধুতে। মশারি টাঙিয়ে শোবার বন্দোবস্ত করতে লাগলাম। শুতে যাবার আগে ঘণ্টাখানেক বই পড়ি। বহুদিনের অভ্যেস। চোখটা একটু লেগে এসেছে, এমন সময় শরিফুল এসে জানতে চাইল আমার আর কিছু লাগবে কি না। বললাম, কিছু লাগবে না। তা-ও শরিফুল দাঁড়িয়ে রইল। যেন আরও কিছু বলতে চায়। জিজ্ঞাসু চোখে চাইতেই সে বলল, ‘স্যর, দরজাটা ভাল করে দিয়ে শুয়েন। আর বাথরুমে যাইতে চাইলে একবার আমার নাম ধইরা ডাকবেন, আমার ঘুম একদম পাতলা, বিলাই হাঁটলেও জাইগা যাই। একলা-একলা ঘর থেকে বাইর হইয়েন না।’
একটু মুচকি হেসে ঘাড় কাত করে আশ্বস্ত করলাম, তার কথাই রাখব। একলা ঘর থেকে বেরোব না।
শরিফুলের এসব শুনে আর নিজে কথা বলে চটে গেছে ঘুমটা।
শরিফুল চলে যেতে দরজা আটকে মশারির ভিতর ঢুকে ফের বইটা নিয়ে চোখের সামনে ধরলাম। পড়লাম একটানা আধঘণ্টা। বইয়ের গল্পে মজে গেছি, খুবই ইন্টারেস্টিং মুহূর্ত এখন… হঠাৎ মনে হলো ঘরের দরজায় নখের আঁচড় কাটছে কেউ। কুকুর-বিড়াল যেমন করে আঁচড় কাটে, ঠিক সেরকম করে।
কান সজাগ করে শব্দটা আবার শোনার চেষ্টা করলাম। স্পষ্ট শুনলাম নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে কেউ। এরপর দশ-পনেরো মিনিট পেরিয়ে গেলে হঠাৎ শুনলাম নারী কণ্ঠের রিনরিনে হাসির মৃদু শব্দ। হাসির ঝঙ্কারটা এমনই, যেন একসঙ্গে মেঝেতে ভেঙে পড়ছে অনেক কাঁচের চুড়ি। মৃদু থেকে স্পষ্ট হলো শব্দটা।
মনে হলো গুনগুনিয়ে গানও গাইছে কেউ। আমি সিধে হয়ে বসলাম। না, একটুও ভুল হয়নি, কেউ সত্যিই হাসছে! উঠে টেবিলের ওপর থেকে টর্চ নিলাম, তারপর কোন শব্দ না তুলে আস্তে করে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম।
আজও ধবধবে জোছনা বাইরে।
উঠোনে এসে দাঁড়ালাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। অন্ধকার জায়গাগুলোতে টর্চের আলো ফেললাম। অপরূপ জোছনায় চারদিক লাগছে বড় মায়াবী। ইচ্ছে হলো এখানেই বসে রাতটা কাটিয়ে দিই। শরিফুলের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর ঘরের দরজাটা খোলা। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দরজা না দিয়েই হয়তো ঘুমায়। শরিফুলকে একবার ডাকব ভেবেও মত পরিবর্তন করলাম। বেচারা সারাদিন খেটেখুটে ঘুমায়, মিছিমিছি কেন তাকে জাগাই।
ঘুরে উঠোনের মাঝে ফিরেছি, তখনই অন্ধকারে বিদ্যুদ্গাতিতে না হলেও বেশ দ্রুত, আমার ঘরের খোলা দরজা পেরিয়ে ছুটে ঝোপে গিয়ে মিশে গেল যেটা- ওটা মানুষ না জানোয়ার, ঠিক বুঝলাম না! সমস্ত শরীর জমে গেল ভয়ে ও আকস্মিকতায়। চোখ বুজে ফেললাম, যা দেখেছি, তা কি সত্যি? আমার ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল নগ্ন নারীমূর্তি! মাথায় লম্বা-লম্বা একরাশ চুল!
হাত দশেক দূরে আমার ঘরের দরজাটা। মনে হচ্ছে এটুকু পেরোনোর ক্ষমতাও যেন এখন নেই। চারপাশের অন্ধকার ঝোপঝাড় যেন চেপে আসছে এদিকে। যেন পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কেউ! কোনমতে দু’বার উচ্চারণ করলাম, ‘শরিফুল! শরিফুল!’
কোন সাড়া-শব্দ নেই। শরিফুলের ‘পাতলা ঘুম ভাঙল না আমার ডাকে।
টর্চ জ্বেলে ঘরের দরজার দিকে তাক করলাম। ঘরের ভেতরটা উঁকি মেরে দেখলাম। দরজাটা দেবার আগে টর্চ জ্বেলে একবার দেখে নিলাম খাটের তলাটা। নিশ্চিন্ত হয়ে তারপর দরজাটা আটকে দিলাম। মশারির ভেতর এসে অনেকক্ষণ কিছু ভাবতে পারলাম না। যা দেখলাম, তা অবিশ্বাস্য লাগছে। শরিফুল কি এটার কথাই বলেছিল? এটাই তখন আমার ঘরের দরজায় নখ দিয়ে আঁচড় কাটছিল? দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরলাম। কী ব্যাখ্যা দেব এ ঘটনার? ভেবে কোন কূল- কিনারা পাচ্ছি না। নিজ চোখে দেখেছি দৃশ্যটা। …আমার হয়তো হ্যালুসিনেশন হয়েছিল। শরিফুলের কাছ থেকে গল্পটা শুনে অবচেতন মনে এমন কিছুকে কল্পনা করে নিয়েছি, বাস্তবে আসলে যার কোন অস্তিত্ব নেই?
যা দেখেছি, তা আসলে আমার কল্পনা…
এমন সময় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো দরজায়। রাত দেড়টা।
কে এল এত রাতে?
বুকে আবার হাতুড়ি পিটতে লাগল। ওই জিনিসটাই আবার ফিরে এসেছে!
আমার ঘরে ঢুকতে চায়!
মৃদু কড়া নাড়ছে থেমে থেমে!
একবার ভাবলাম কোন সাড়া-শব্দ করব না।
কিন্তু মানুষের কৌতূহল তার ভয়ের চেয়েও সাংঘাতিক!
যতটা সম্ভব গলায় জোর রেখে বললাম, ‘কে? কে ওখানে?’
‘আমি, শরিফুল, স্যর।’
‘এত রাতে কী চাও?’
‘স্যর, ঘুমাইছেন কি না জানতে আইলাম।’
‘হ্যাঁ, আমি ঘুমিয়েছি, তুমি যাও।’
‘স্যর, আপনে নিশ্চিন্তে ঘুমান। আমি পাহারায় আছি। কেউ আপনেরে ক্ষতি করতে পারব না। আমি আপনার আশপাশে আছি।’
‘কার কথা বলছ তুমি?’
‘আপনে, স্যর, কোন কিছু টের পাইছেন? কিছু একটা বাইর হইছে আইজ রাইতে। আমি, স্যর, আইজ রাইতে আর ঘুমামু না!’
দরজা খুলে টর্চের আলোয় শরিফুলের মুখ একবার দেখলাম।
আমাকে দেখে মধুর হাসি হাসল শরিফুল। ওর চোখদুটো জবা ফুলের মত টকটকে লাল! অর্থাৎ খুব গাঁজা খেয়েছে। শরিফুলের হাতে বাঁশ। ওটা মাটিতে জোরে ঠুকে দিয়ে বলল, ‘আইজ ওইটারে বাঁশের ডলা খাওয়ামু, স্যর! আপনে কিছু চিন্তা কইরেন না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন।’
এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে? ঘরে ছিলে না?’
‘জী, না, স্যর। ওইটার পিছন-পিছন দৌড়াইছি এতক্ষণ। পুবপাড়া পর্যন্ত ঘুরাইয়া আনছে আমারে হারামজাদী! এখন হারায়া ফালাইছি…’
একটু কড়া গলায় বললাম, ‘যাও, এবার ঘুমাতে যাও। বাঁশটা ফেলে শুয়ে পড়ো।’ বলেই আর কথা না বলে দরজাটা দিয়ে বিছানায় মশারির ভেতর ঢুকলাম।
বাঁশের ঠুক্ ঠুক্ শব্দটা আস্তে-আস্তে দূরে মিলিয়ে গেল।
পুরো ব্যাপারটা এখন আমার কাছে অবাস্তব মনে হচ্ছে। একটা গাঁজাখুরি উদ্ভট গল্পে প্রভাবিত হয়েছি। নিজের ওপর রাগ হলো। স্রেফ চোখের ভুল। অবচেতন মনে আসলে শরিফুলের গল্পে ভয় পেয়েছি। তারপর দরজা খুলে একা যখন বেরিয়ে আসি, সেই ভয়টা অজান্তে রূপ দেয় অতিপ্রাকৃত এক চেহারা…
ঘুম আর এল না। হাজারো ভাবনা এল। মাথাটা গরম হয়ে উঠল। খুব ভাল হত উঠে মাথায় একটু জল দিতে পারলে। সব কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে একটু ঘুমুতে চেষ্টা করলাম। চোখ বুজে পড়ে রইলাম। কাল সকালে স্কুল আছে। তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।
ঘুমিয়ে পড়েছি, রাত তখন কত বলতে পারব না। হয়তো শেষ রাত। হঠাৎ কী তুমুল শোরগোল শুরু হলো আমার চারপাশে। অনেক ক্রুদ্ধ মানুষের চিৎকার, জাগরণে কিংবা আধজাগরণে মনে হলো, কারা যেন আমাকে শেষ করতে একসঙ্গে ছুটে আসছে। মুখে কোন শব্দ করতে পারলাম না, কেমন গোঙাতে লাগলাম। আতঙ্কে লাফ দিতে লাগল হৃৎপিণ্ড। তবুও নড়তে পারছি না। কিন্তু হঠাৎ কেউ এসে সজোরে গায়ে ঝটকা দিয়ে ডেকে তুলল। কণ্ঠে তীব্র আকুতি, জোরাল আহ্বান। ওই অদ্ভুত কণ্ঠ আমাকে ডেকে তুলে বলতে লাগল, ‘ওঠো, ওঠো, পালাও এখান থেকে! বাঁচতে চাইলে পালাও! ভাগো এখান থেকে! দেরি কোরো না! চলে যাও এখান থেকে…’
বিহ্বল হয়ে পড়লাম। ঘোর লাগা অবস্থা আমার। ঘুমের ভেতর দরজাটা খুলে বেরিয়ে এলাম। তারপর কেউ যেন আমার একটা হাত চেপে ধরে দৌড়াতে লাগল প্রচণ্ড গতি তুলে। আমিও পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। তখন কোন বাহ্যজ্ঞান নেই!
চোখে কী দেখছি জানি না। বন-বাদাড় ভেঙে, হাত-পা কেটে-ছিঁড়ে রক্ত বেরুচ্ছে। কতবার আছাড় খেয়েছি, পড়ে গেছি গ্রামের রাস্তার বিপজ্জনক সব খাদে!
কিন্তু আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে কেউ, যেন খেলনাকে আছড়ে-পিছড়ে দৌড়ে নিয়ে যাচ্ছে খেলাচ্ছলে। প্রচণ্ড এক শোরগোল হলো এ সময়। কিছু একটার সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষ হলো। ছিটকে পড়ে গেলাম। মনে হলো অন্ধকার সুড়ঙ্গে তলিয়ে যেতে লাগলাম কোথায়। তারপর আর কিছু মনে নেই।
যখন চোখ মেললাম, দেখি বিস্তীর্ণ এক মাঠে আছি। বড়-বড় ঘাস মাথার চারপাশে। আকাশে ঝিকঝিক করছে কয়েকটা তারা। চাঁদ কি ডুবে গেছে? কালচে অন্ধকার মনে হচ্ছে চারপাশটাকে। প্রচণ্ড ব্যথা সমস্ত শরীরে, যেন ভেঙে গেছে সব হাড়-গোড়। প্রথমটায় কিছুই মনে করতে পারলাম না। মাথাটা একটু তুলে চেয়ে দেখলাম, অদূরে একটা জলাশয়। একজন জলের দিকে ফিরে কী যেন করছে। একটু পরে দেখলাম কিছু একটা নিয়ে আমারই দিকে আসছে। উঁচু থেকে কিছু ছেড়ে দিতেই জল এসে পড়তে লাগল আমার মুখে। লোকটা মুখ নিচু করে খুবই গম্ভীর গলায় বলল, ‘স্যর, জিনিসটা আপনারে তাড়া করছিল! কপাল ভাল, তখন খালপাড়েই ঘুরতাছিলাম। অহন থাক, একটা কথা, স্যর, আপনে, স্যর, এইখান থিকা চইলা যান। এইটা যখন আপনেরে একবার ধরছে, তখন শেষ না কইরা ছাড়ব না। আমারেও হয়তো একদিন শেষ করব। আপনেরে না বলছিলাম, একলা ঘরের দরজা খুইলা বাইর হইয়েন না। আপনে, স্যর, চইলা যান। জায়গাটা খারাপ, আমি আগেই কইছিলাম আপনেরে
শরিফুলের পিছনে পুবাকাশ ততক্ষণে ফর্সা হয়েছে।
অন্ধকারের বাসিন্দারা এখন অনেক দূরে।
আর বেশি দেরি করিনি। চাকরির মায়া ছেড়ে সেদিনের গাড়িতেই চড়ে বসেছি। শরিফুলই আমাকে এগিয়ে দিয়ে এসেছিল স্টেশন পর্যন্ত। এখনও স্পষ্ট মনে আছে, গাড়ি ছেড়ে দিতে শরিফুল ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে ছিল আমার দিকে। আর কখনও ওর সঙ্গে আমার দেখা হবে না। আমি হয়তো পালিয়ে বাঁচলাম, কিন্তু ওই মানুষটি এমন এক ঘোর রহস্যময় অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে লড়বে, যার সম্বন্ধে সে নিজেও পুরোপুরি জানে না!
.
সুষুপ্ত পাঠক
