নিশিডাকিনী – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

ছায়াশ্বাপদ – আবুল ফাতাহ

ছায়াশ্বাপদ

এক

এই নিয়ে তিনবার।

ব্যাচেলর মানুষ আমি। ছোটখাট একটা চাকরি করি। থাকি দু’রুমের একটা বাসা নামের ‘কলঙ্ক’-তে। আমার সঙ্গে আরেকজন থাকে। আব্দুল মতিন। ছেলেটাকে পুরো নামে ডাকতে হয়, নইলে রীতিমত খেপে যায়। আমার মতই ছা- পোষা মানুষ আব্দুল মতিন। কোন রকমে টিকে আছি আমরা এই নগরে।

মতিনের চাকরিটা ঠিক কী, আমি বিস্তারিত জানি না। খুব সকালে বেরিয়ে যেতে দেখি, ফেরে গভীর রাতে। সামান্য মাইনের বেশির ভাগটাই বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। আমি একা মানুষ বলে আর রান্নার ঝামেলায় যাইনি। বাসার পাশের সস্তার হোটেলে মাসকাবারি বন্দোবস্ত আছে। দুই বেলা খাবার দিয়ে যায়। দুপুরের খাবার সারি অফিসের ক্যান্টিনে। বাইরের খাবার খেতে-খেতে আজকাল জিভটা আড়ষ্ট হয়ে গেছে।

সকালবেলাটায় হোটেলের বিক্রি বেড়ে যায়। প্রায় দিনই আমাকে গিয়েই খেতে হয়, যদি না অফিসে লেট করতে চাই। নাস্তা সেরে ওখান থেকেই অফিসে দৌড়।

আজ সকালে নাস্তা খেতে বের হতেই আফজাল সাহেবের সঙ্গে দেখা। পাশের বাসাতেই ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন। আলাপী লোক। আমাকে দেখেই হই- হই করে ছুটে এলেন।

‘কী, তাহের ভাই, আছেন কেমন?’ একগাল হাসলেন ভদ্রলোক।

আমি আসলে খুব বেশি ভাল নেই। বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই সামান্য চাকরিটাকে সম্বল করে আরেকজন মানুষের ভার কাঁধে নেবার মত সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারছি না। এসব কথা বলার মত ঘনিষ্ঠতা নেই আমার আফজাল সাহেবের সঙ্গে। তাই কাষ্ঠ হাসি হেসে বললাম, ‘আছি, ভাই, ভালই আছি।’

‘হে-হে, ভাল তো থাকবেনই। তা, ভাই কি গুপ্তধন পাইছেন নাকি?’ ষড়যন্ত্রীর মত গলা নামিয়ে বললেন আফজাল সাহেব।

আমি হেসে ফেললাম। আমাকে দেখে কি মনে হয়, আমি গুপ্তধন পেয়েছি?’

‘আপনাকে দেখলে মনে হয় না, কিন্তু আপনার কুকুরগুলো দেখলে তো ঠিকই মনে হয়। গুপ্তধন না পাইলে কি আর এই বাজারে কেউ তিনটা কুকুর পালে?’

আমার বুকের মধ্যে কী যেন একটা ধাক্কা দিয়ে গেল।

‘কুকুর পালি মানে? কবে দেখলেন?’ আমি সতর্ক হয়ে জানতে চাইলাম। বুকটা ধকধক করছে।

‘এই তো, কালকে রাত্রেই তো। আপনে মনে হয় অফিস থেইকা ফিরতাছিলেন। আমি বারান্দায় দাঁড়ায়ে দেখলাম তিনটা বিশাল কুকুর আপনের পিছে-পিছে আসতেছে। তিনটাই কালো রঙের।’

এই নিয়ে তিনবার শুনতে হলো কথাটা।

তিন দিন আগে প্রথমবার। সেদিন অফিস থেকে ফিরতে রাত হয়েছিল খানিকটা। মাঝে মধ্যেই হয়। বসেরা কাজ ধরিয়ে দেয়। না করার জো নেই।

পরদিন অফিসে যেতেই বুড়ো দারোয়ান কী কথায় যেন বলল, আগের রাতে আমি নাকি অফিস থেকে বেরুতেই কোত্থেকে এসে আমার পিছু নেয় তিনটা- ভীমদর্শন কুকুর। কালো রঙের।

গতকাল শুনলাম আনিসের মুখে। ছোকরা হোটেলের বয়। আমার বাড়িতে ও-ই খাবার নিয়ে আসে। কাল রাতে খাবার দিয়ে যাবার আগে জানাল, আমার বাসার সামনে নাকি তিনটা কুকুর বসে আছে। শুনে কী মনে করে ওর সঙ্গে বাইরে এলাম। কুকুরের লেজের দেখাও পাইনি।

কী হচ্ছে এসব? আমার আশপাশে তিনটা কুকুর দেখতে পাচ্ছে কেন মানুষজন? আমি কেন পাচ্ছি না তবে? আচ্ছা, এমন কি হতে পারে, কুকুরগুলো কোন কারণে আমার আশপাশে ঘুরঘুর করছে ঠিকই, কিন্তু দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকা আমার মস্তিষ্ক তাদের শনাক্ত করতে পারছে না। আনমনা চোখ দুটো ব্যর্থ হচ্ছে তাদের দেখতে।

উঁহু, ‘হতে পারে’ না, এটাই হয়েছে। লক্ষণ খুবই খারাপ। আমি আমার চারপাশটাকে অস্বীকার করতে পারি না। আমাকে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে প্রকৃতির প্রতিটা পরিবর্তন লক্ষ করতে হবে। অথচ আমার আশপাশে তিনটা জলজ্যান্ত কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমার সে খবর পর্যন্ত নেই। মানুষের মুখ থেকে শুনতে হয়। এখন থেকে পূর্ণ মনোযোগে লক্ষ্য করব আমার চারপাশের খুঁটিনাটি।

সিদ্ধান্তটা নেয়া হতেই হালকা লাগল নিজেকে।

.

দুই

গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল। মাথা তুলতে পারছি না। ভারী হয়ে আছে, যার ফলে আন্দাজ করতে পারলাম, বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারিনি। রাতের অনেকটা এখনও বাকি। তবে ঘুম ভাঙল কেন? কারণ ছাড়া আমার গভীর ঘুম ভাঙার কথা না। মনে হচ্ছে ঘুমের ঘোরে কোন শব্দ পেয়েছি।

কোন রকম আগাম আভাস ছাড়াই অচেনা এক ভয় আমাকে গিলে ফেলল অপার্থিব একটা অনুভূতি হচ্ছে। কেবলই মনে হতে লাগল, রুমে আমি একা নই। কেউ একজন আমার খুব কাছেই রয়েছে, এবং সে আর যে-ই হোক, আমার রুমমেট নয়। কারণ, আব্দুল মতিন আজ সন্ধ্যায় বাড়ি গেছে। বাসায় আমি একা, সম্পূর্ণ একা!

শব্দটা শুনতে পেলাম ঠিক তখনই। এবার ঘুমের ঘোরে নয়। পূর্ণ সচেতনতায়।

ঘেউ ঘেউ!

কুকুরের ডাক!

আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম বিছানায়। আমার রুমে কোন ডিমলাইট নেই। স্ট্রীট লাইটের চিকন একটা রেখা প্রতি রাতে এসে পড়ে আমার রুমে। কাজ চলে যায় তাতেই। এইমাত্র লক্ষ করলাম, আজ সেটাও নেই। ডেপো ছোকরার দল ভেঙে ফেলেছে ঢিল ছুঁড়ে। মশারি টানানো রয়েছে। গোলাপী রঙের জালের ফাঁক দিয়ে তিন জোড়া অঙ্গার চোখে পড়ল আমার। ঠিক পায়ের কাছেই। কয়লার আগুন যেমন ধিকি ধিকি জ্বলে, ঠিক সেভাবেই জ্বলছে। আরও অনেক বেশি ভীতিকর উজ্জ্বলতায়। যেন তীব্র আক্রোশ ওগুলোর জ্বালানি।

আমার সারা শরীর আচমকাই কাঁপতে লাগল থরথর করে। কাঁপুনি শুরু হয়েছে বিশ্রী পচা গন্ধটা নাকে আসা মাত্রই। এইমাত্র কেউ কবর খুঁড়ে পচা মাংস খেয়ে সামনে দাঁড়ালেই শুধু এমন নারকীয় গন্ধ পাওয়া সম্ভব। গা গোলাচ্ছে আমার। তীব্র ভয় পেট উল্টে বমি করা থেকে বাঁচিয়ে দিল।

গড়ড়ড়…আওয়াজ পাচ্ছি অন্ধকারের বুকে। শ্বাপদেরা ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে এভাবেই আওয়াজ করে। অজান্তেই আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।

এভাবে কতক্ষণ ছিলাম বলতে পারব না। নাকে লেগে থাকা সেই গন্ধটা একসময় বিলীন হতেই ভয়টা কমতে লাগল। চোখ মেললাম ধীরে-ধীরে। তাকালাম সামনে। কোন অঙ্গার জ্বলতে দেখলাম না। নেই কোন পাশবিক আওয়াজও। খাঁ-খাঁ করছে গোটা রুম। নিস্তব্ধতা ভীতির উৎকৃষ্ট উৎস। কিন্তু এই নিস্তব্ধতা আমার ভাল লাগল। যেভাবে এসেছিল, ভয়টা ঠিক সেভাবেই মিলিয়ে গেল। মাথা তেমন একটা না ঘামিয়েও আমি পুরো ব্যাপারটা বুঝে ফেললাম।

দরজাটা রাতে ঘুমাবার আগে প্রতিদিন মতিনই লাগিয়ে দেয়। আজ ও না থাকায় দরজাটা নিশ্চয়ই খোলা রয়ে গেছে। আমি লাগিয়েছি কি না মনে করতে পারছি না। আর সেই সুযোগেই আমার পেছনে ঘুরঘুর করতে থাকা কুকুরগুলো বাসায় ঢুকে পড়েছে। আসার আগে ডাস্টবিন ঘেঁটেছে শয়তানগুলো। পচা গন্ধটা তাতেই ছড়িয়েছে। আর আমি ভেবেছি…হা-হা-হা!

আসলে গভীর রাতে চোখ খুলে তিনটা কুকুর দেখতে পেলে যতটা ভয় পাওয়া উচিত, আমি তার থেকে মোটেও বেশি পাইনি। অনেকে যে হার্টফেল-টেল করে বসত সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

আমি বিছানা ছাড়লাম। দরজা বন্ধ করতে হবে। কুকুর তিনটেকে বারকয়েক ‘কুত্তার বাচ্চা’ বলে গালি দিয়ে অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে এগোলাম দরজার দিকে। দরজার কাছে পৌঁছে আন্দাজে হাত রাখলাম ছিটকিনিতে। সঙ্গে-সঙ্গে শিরদাঁড়া বেয়ে বরফ নামল। বুকের খাঁচায় প্রবল ছটফটানি হৃৎপিণ্ডের। পুরানো ভয়টা ফিরে এল আগের চাইতেও তীব্র মাত্রা নিয়ে।

দরজাটা লাগানোই ছিল…

.

তিন

‘আচ্ছা, আপনি কি খালি কুত্তার কথাই বোঝেন, নাকি অন্য পশু-পাখিরগুলাও বোঝেন?’ হাসি-হাসি মুখ করে প্রশ্ন করলেন সালাম সাহেব। আমার কলিগ।

কাল রাতের ঘটনার পর মনটা কুঁকড়ে আছে আমার। সালাম সাহেবের ধূর্ত চোখ এড়ায়নি সে ভীতির ছাপ। কাজের ফাঁকে-ফাঁকে সুযোগ পেলেই ‘ঘটনা’ জানতে চাইছেন। শেষ পর্যন্ত কিছুটা বিরক্ত হয়ে আর বাকিটা মনকে হালকা করার উদ্দেশ্যে ক্যান্টিনে বসে ঘটনা খুলে বললাম। এরপর থেকেই মনে হচ্ছে, ভুল করে ফেলেছি। এই ‘কাহিনী’ পছন্দ হয়নি সালাম সাহেবের। তিনি সম্ভবত নারীঘটিত রগরগে কোন কাহিনী আশা করেছিলেন। গম্ভীর মুখে পুরোটা শুনে আচমকাই প্রশ্নটা করে বসলেন।

আমার ভ্রু কুঁচকে গেল। ‘মানে?’

সালাম সাহেব হাতের আঙুলের দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে ওগুলো কুৎসিত ভঙ্গিতে চাটতে চাটতে বললেন, ‘না মাইনে, আপনি কি খালি কুত্তার ভাষাই বোঝেন? মশা-মাছির ভাষা বোঝেন না? এই যে দেখেন আপনার প্লেটের পাশে একখান মাছি ঘোরাফিরা করতেছে। ও কি কইতে চায় আপনি বুঝতে পারবেন?’

আমার গা জ্বলে গেল। ‘সালাম সাহেব, আমি কি বলেছি আমি কুকুরের ভাষা বুঝতে পারি?’

‘কইলেন না আপনার মহল্লার সব কুত্তা রাইতে আপনার ঘরে আসে। গল্পগুজব করে।

আমি কয়েক মুহূর্ত কিছুই বলতে পারলাম না। মানুষ তিলকে তাল বানায়, এই লোক তো আস্ত তালগাছ বানিয়ে ফেলেছেন। আমি কিছু না বলেই উঠে পড়লাম।

বেসিনে হাত ধুতে ধুতে ফিরে তাকিয়ে দেখি সালাম সাহেব আমার আরেক কলিগকে হাসি-হাসি মুখে কী যেন বলছেন। বলতে-বলতেই আড়চোখে বারকয়েক তাকালেন আমার দিকে।

ভুল করে ফেলেছি-আবারও ভাবলাম আমি।

অফিস ছুটি হতে-না-হতেই আমি উপলব্ধি করলাম গোটা অফিস আমার ‘মস্তিষ্কবিকৃতি’-র খবর জেনে গেছে। কেউ সরাসরি চোখে-চোখে তাকাচ্ছে না। সকালেও যে হেসে কুশল বিনিময় করছিল তার দৃষ্টি সন্ধ্যায় এসে বাঁকা হয়ে গেছে।

আমি প্রবল হতাশা নিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম।

.

পরদিন কলম পিষছি অফিসে বসে। একগাদা ফাইল গন্ধমাদনের মত উঁচু হয়ে রয়েছে আমার সামনে। আজকের মধ্যে এগুলো ক্লিয়ার করতে হবে। আরও দু’জনের কাজ আমার ঘাড়ে চেপেছে। চাপানো হয়েছে বলা যায়।

দাঁত-মুখ খিঁচে কাজ করে যাচ্ছি, এমন সময় বুঝতে পারলাম আমার কার্ডবোর্ড ঘেরা কিউবিকলে কেউ একজন প্রবেশ করেছে। চোখ তুলে তাকাতেই একরাশ বিরক্তি ছেঁকে ধরতে চাইল। সালাম সাহেব হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকছেন। চেহারা গম্ভীর।

‘তাহের সাহেব, একখানা উপকার চাই,’ ধপাস করে বসে পড়ে বললেন সালাম সাহেব।

আমি ভাল করে লক্ষ্য করলাম তাঁকে। নাহ, রসিকতার চিহ্ন নেই চেহারায়। দেখে মনে হচ্ছে কোন বিপদে পড়েছেন।

‘কী উপকার, সালাম সাহেব?’ আমি কাজ বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমার ছোট মাইয়াটা কাইল থেইকা খায় না। আপনেই পারবেন ওরে ঠিক করতে।’

‘আমি? কীভাবে?’ রীতিমত বিস্ময় বোধ করছি।

‘ওর একটা বিলাই আছে। সেইটা কী কারণে জানি কাইল থেইকা খাওয়া বন্ধ কইরা দিছে। আপনে ইকটু বিলাইডার সাথে আলাপ কইরা দেখবেন কী সমস্যা?’

আমার চোখে পানি চলে এল। আমি জানি না কুকুরগুলো কেন আমার আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। কিংবা হতে পারে এটা আমারই কোন মানসিক সমস্যা। কিন্তু মানুষের দুর্বলতা নিয়ে এ কেমন নিষ্ঠুর রসিকতা?

আমি মাথা নিচু করে ফেললাম দুঃখে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আবার ঝট করে মুখ তুলতে হলো। সালাম সাহেব ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার পেছন দিকে তাকিয়ে আছেন। ওদিকে ফাইল ক্যাবিনেট। কী এমন সাক্ষাৎ যমদূত ওখানে সেঁধিয়েছে যে এমন গোল্লা চোখে তাকাতে হবে? দুঃখের উপর বিরক্তি চাপল। আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই সালাম সাহেব ফিসফিস করে বললেন, ‘কুত্তা!’

ইলেক্ট্রিক শক খেলাম যেন। প্রায় লাফিয়ে উঠে পেছনে ঘুরে তাকালাম। আরেকটু হলেই চেয়ারটা উল্টে যেত।

পেছনে কিছুই নেই। অসংখ্য ধুলো জমা ফাইল নির্বাক বিদ্রূপ করছে আমাকে। তার চাইতেও রূঢ় রসিকতার হাসি ভেসে এল পেছন থেকে।

সালাম সাহেব খ্যাক খ্যাক করে হাসতে-হাসতে বেরিয়ে গেলেন রুম ছেড়ে।

.

চার

আজকাল এমনটাই ঘটছে।

প্রতিদিন রাতের একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। কোন কারণ ছাড়াই। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে, এই ব্যাপারটা আমি আন্দাজ করেছি। প্রতিবার ভাবি আজ ঘড়ি দেখব। কিন্তু ঘড়ি দেখার আগেই আমি আবার সম্মোহিতের মত ঘুমিয়ে পড়ছি। যেন পুরো ব্যাপারটার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে অদৃশ্য কোন শক্তির হাতে। আমাকে কিছু একটা দেখাতে চাইছে। অপার্থিব জগতের দৃশ্য। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলছে, কিন্তু কোন কারণে দৃশ্যটা না দেখিয়েই আবার, ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রথম সে-রাতের পর আর কিছু দেখিনি আমি। মাঝে চার দিন পেরিয়ে গেছে। মতিন এখনও দেশ থেকে আসেনি। বাড়িতে কী এক ঝামেলা হয়েছে। আসতে-আসতে আরও কয়েক দিন। এ ক’দিনে আর কেউ কুকুর দেখতে পায়নি আমার আশপাশে। আমি নিজেও না। কিন্তু যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। পুরো অফিসে রটে গেছে আমার কুকুর দর্শনের খবর। নির্লজ্জ রসিকতা চলছে আমাকে নিয়ে। নেতৃত্বে রয়েছেন সালাম সাহেব। খুব শীঘ্রিই হয় আমাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হবে, নয়তো আমি নিজেই ছেড়েছুড়ে চলে আসব।

কুকুরগুলো যে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম ছিলাম, এখন আর নই। ঘুম ভাঙার পর থেকেই নই। আজ সেই অদৃশ্য শক্তি মনস্থির করে ফেলেছে। আমাকে দেখাবে কিছু একটা। এই মুহূর্তে আমি শুধু তিন জোড়া জ্বলন্ত অঙ্গার দেখতে পাচ্ছি পায়ের কাছের মেঝেতে। হ্যা-হ্যা জাতীয় আওয়াজ আসছে। পরক্ষণেই বদলে যাচ্ছে চাপা গুড়গুড় শব্দে।

আমি শব্দের উৎসের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে উঠে বসলাম সন্তর্পণে। সেদিনের পর থেকে শিথানের কাছে একটা লাঠি রাখা হয়। আন্দাজে হাতড়ে সেটার নাগাল পেতে চাইছি। জ্বলন্ত তিন জোড়া চোখ যেন নীরব বিদ্রূপে আমার ছেলেমানুষি দেখে যাচ্ছে।

লাঠিটা পেয়ে গেলাম আমি। শক্ত মুঠোয় চেপে ধরলাম। মনোবল জাগাল কাঠের দণ্ডটা। আমি এখন তৈরি। আয়, কুত্তার বাচ্চারা!

আমার নিভৃত আবাহন শুনতে পেয়েই কি না, লাফ দিল তিন শ্বাপদ। একযোগে। শূন্যে ভেসে ধেয়ে আসছে।

আমি নির্ভীক বসে রইলাম। টানানো মশারিতে ওরা বাধা পাবে, জানি আমি। কিন্তু একটা কথা জানা ছিল না আমার, রাতের এ সময়টা বড়ই অদ্ভুত। এমন অনেক কিছুই এ সময় ঘটে যায়, যাকে কোন ব্যাখ্যার ছাঁচে ফেলা যায় না। যেমন এই এখন। তিনটে শ্বাপদের ভীষণ জ্বলতে থাকা ছয়টা চোখ উন্মাদ ট্রাকের হেডলাইটের মত মশারি ভেদ করে গেল। ভয় কিংবা অবিশ্বাসের অনুভূতি জাগ্রত হবার আগেই আমার দেহ সক্রিয় হয়ে পড়ল। বিদ্যুৎ বেগে এলোপাথাড়ি লাঠি চালালাম। কারও-না-কারও গায়ে লেগেই যাবে। কিন্তু আমি আবার ভুলে গিয়েছিলাম মধ্যরাতের পাগলা আইনের ধারাগুলো। বাতাস কেটে সাঁই করে বেরিয়ে গেল লাঠিটা। এরা নিছকই শ্বাপদ নয়, ছায়াশ্বাপদ।

ছায়াশ্বাপদের কায়া না থাকলেও নখরের ধার ঠিকই টের পেলাম। প্রথম সুযোগেই আমার গালে আঁচড়ে দিয়েছে এক শয়তান। বিচ্ছিরি গভীর ক্ষতটা থেকে দরদর করে রক্ত ঝরছে। বাঁ পাশের গাল পেরিয়ে কানের খাঁজে গিয়ে জমা হচ্ছে গরম রক্ত। কুকুরটা পচা গন্ধ মাখা জিভ বের করে সে রক্ত ছুঁতে চাইছে। আরেকটা তীক্ষ্ণ নখরের লক্ষ্য আমার ভয়ার্ত চোখ। আমি প্রাণপণে যুঝে চলেছি। আরেকটা কুকুর আমার গোড়ালি কামড়ে ধরেছে। প্রবলবেগে মাথা ঝাঁকিয়ে ছিঁড়ে নিতে চাইছে পোয়াটাক মাংস।

চোখ বাঁচাতে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে, তিন নাম্বারটা কখন চড়ে বসেছে আমার বুকে-খেয়ালই ছিল না। ইতোমধ্যেই পাতলা গেঞ্জিটা ছিঁড়ে ফেলেছে। এবার ছিঁড়তে চাইছে আমার উন্মুক্ত বুক।

আমি আর পারছি না। তিন দানব সারমেয়র সঙ্গে লড়াই করবার মত দৈহিক ও মানসিক-কোন শক্তিই আমার নেই। শুধু ওদের নখের স্পর্শ পাচ্ছি আমার দেহে। আমি ছুঁতে গেলেই বাতাসে খামচি পড়ছে। আর পাচ্ছি পচা সেই নাড়ি উল্টানো গন্ধটা। মাত্র ইঞ্চি কয়েকের ব্যবধানে। এই গন্ধটাই আমার সমস্ত জীবনী শক্তি টেনে নিল। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। সেই মুহূর্তেই চোখের পাতা ভেদ করে একটা তীক্ষ্ণ নখ ঢুকে গেল। সমস্ত দুনিয়া আঁধার হয়ে গেল।

অতলে তলিয়ে যাবার আগ মুহূর্তের উপলব্ধি-বুক চিরে হৃৎপিণ্ডে পৌঁছে যাচ্ছে নখরযুক্ত হিংস্র এক থাবা….

.

পরিশিষ্ট

সালাম সাহেবের মন-মেজাজ খুব একটা ভাল নেই। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে তিনি ভয় পাচ্ছেন। তিন দিন আগে তাঁর অফিসের কলিগ আবু তাহেরের লাশ দেখে আসার পর এই অবস্থা। পুরো অফিসটাই থমথমে হয়ে আছে। তিনি অবশ্য লাশ দেখার পর সেই যে ঘরে সেঁধিয়েছেন, আর অফিসে যাবার মত মানসিক জোর অর্জন করে উঠতে পারেননি।

আবু তাহেরকে বীভৎসভাবে খুন করেছে কেউ। চোখ খুবলে নিয়েছে। হৃৎপিণ্ডের কোন হদিস পাওয়া যায়নি। গায়ের আঁচড়ের চিহ্ন দেখে কারও মনেই আততায়ীর পরিচয় নিয়ে দ্বিধা ছিল না।

সালাম সাহেব আবু তাহেরকে নিয়ে মস্করা করায় এখন যতটা না লজ্জিত, তার চাইতেও অনেক বেশি ভীত। তবুও তিনি ঠিক করেছেন আজ বাইরে গিয়ে খানিক হাঁটাহাঁটি করে আসবেন। ভয়টা কাটানো দরকার। ঘরে বসে থাকলে আরও বেশি করে জেঁকে বসবে।

সালাম সাহেব গায়ে পাঞ্জাবী চড়িয়ে বের হলেন। মোড়ের চায়ের দোকান থেকে চা খাবেন। বাসার কিছু টুকটাক বাজার করার কথাও কাল থেকে বলছে স্ত্রী আয়েশা বেগম।

সালাম সাহেব বাসা থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক চাইলেন। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আলো-আঁধারির মাঝে কোন কুকুর-টুকুর নজরে এল না তাঁর। পা চালালেন বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের দিকে। কয়েক পা এগিয়েছেন, ঠিক তখনই কে যেন ডেকে উঠল পেছন থেকে।

‘সালাম ভাই!’

থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকালেন সালাম সাহেব। পেছন থেকে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসছেন প্রতিবেশী নজরুল সাহেব। দেখে মনে হতে পারে ভদ্রলোক রাজ্য ওল্টানোর খবর নিয়ে আসছেন। কিন্তু সালাম সাহেব জানেন ভদ্রলোক ডায়বেটিসের রোগী। প্রতি সন্ধ্যায় এভাবেই পাড়া কাঁপিয়ে হেঁটে বেড়ান।

‘কী বিষয়, নজরুল ভাই?’

‘ভাই, একটা জিনিস চাইতাম আপনার কাছে।’

‘কী জিনিস?’

‘আমাকে একটা কুকুর দিতে হবে।’

‘কুত্তা!’ সালাম সাহেবের বুক ঢিবঢিব করতে লাগল।

‘জী, আপনি তো অনেকগুলো কুকুর পালছেন ইদানীং। আপনার বাসার সামনে দেখি। আমাকে একটা দিয়ে দেন। যা দিনকাল এল! কুকুরের উপরে কোন দারোয়ান নাই!

সালাম সাহেবের হাঁটু জোড়া থেকে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখবার শক্তি চলে গিয়েছে। কুলকুল করে ঘামছেন তিনি। অনেক কষ্টে নিজেকে খাড়া রাখলেন।

ওই তো, এখনও আপনার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।’ হাত তুললেন নজরুল সাহেব।

সালাম সাহেব তাকালেন নজরুল সাহেবের ইশারা লক্ষ্য করে।

একটু আগেও ছিল না, এখন ভোজবাজির মত আবির্ভূত হয়েছে কুকুরগুলো। অন্ধকারে দেহের আকৃতি স্পষ্ট নয়। স্পষ্ট শুধু চোখগুলো। জ্বলছে গনগনে ভাঁটার উত্তাপ নিয়ে।

সালাম সাহেব গুনলেন, এক, দুই, তিন, চার… চারটা কুকুর!

.

আবুল ফাতাহ