অতিথি – রতন চক্রবর্তী
অতিথি
এক
জমশেদপুর থেকে হারুন মিয়া ফিরল আশি বছরেরও বেশি বয়সের এক বৃদ্ধকে নিয়ে। হারুন মিয়ার পেছন পেছন যখন লাঠি ঠুক-ঠুক করে বাড়ির উঠানে ঢুকল বুড়োটা, মোমেনা ভেবেছিল কোন ভিক্ষুক। হারুন মিয়াকে দেখে নিশ্চয়ই ভিক্ষা চাইতে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু হারুন মিয়ার কথা শুনে তার ভুল ভাঙল, ‘কই গো, শুনছ, দেখ, মেমান নিয়া আসছি।’
আকাশ থেকে পড়ল মোমেনা। এ কেমন তর মেমান?
বুড়ো হাবড়া ভিক্ষুক শ্রেণীর এক লোক।
খ্যাক্-খ্যাক্ করে উঠে বলল মোমেনা, ‘বলি, তোমার আক্কেল জ্ঞান নাই? কোথাকার কে, জানা নেই, শোনা নেই, ধরে এনেছ!’
হারুন মিয়া বলল, ‘সবটা শুনলে আর তুমি এমন কইরা কথা বলবা না।’
হারুন মিয়া সবকিছু খুলে বলল তার স্ত্রীকে।
ব্যবসার কাজে জমশেদপুর গিয়েছিল হারুন মিয়া। ওখানে তার একটা রাইস মিল আছে। সেখানেই অসুখে পড়েছিল সে। মোবাইলে সে-কথা স্ত্রীকে জানিয়েওছে। যেটা জানায়নি, তা হলো এই বুড়ো মিয়ার দেয়া চিকিৎসার কথা। ডায়রিয়া আর বমিতে এমন অবস্থা যে ঠিক যেন কলেরা। সব ওষুধ যখন ফেল, ঠিক তখনই এই বুড়োর এক পুরিয়া ওষুধ তাকে দিল নতুন জীবন। বুড়ো ক’দিন ধরেই নাকি থাকছিল তার রাইস মিলের এক কোনায় পড়ে। তিনকুলে নাকি কেউ নেই। তাই তাকে নিয়ে এসেছে হারুন। ওর টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ-কিছুরই অভাব নেই। শুধু অভাব একটা সন্তানের। বাড়িতে কামলা শ্রেণীর লোক থাকে, থাকে কাজের মহিলা। এমনিতে বাড়ি ভর্তি মানুষ।
দক্ষিণ দিকের এক ঘরে থাকে হারুন মিয়ার বৃদ্ধা মা। তার দেখভালের জন্য আছে একজন চাকরানী
হারুন মিয়া বাড়িতে কমই থাকে। রাইস মিল, কাপড়ের দোকান, স-মিল, জমি-জিরাত দেখাশুনো করতে-করতেই তার সময় কাটে। তবু এত ব্যস্ততার মধ্যেও হঠাৎ-হঠাৎ মনে ঘাই মারে সন্তানহীনতার তীব্র ব্যথা।
বুড়ো লোকটা তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে মোমেনার দিকে। কী জ্বল-জ্বলে চোখ! কী কামুক দৃষ্টি!
শিরশির করে ওঠে মোমেনার বুকের ভেতর। সে জানে, ভরাট তার যৌবন। ছেলে, ছোকরা আর কামলারা সুযোগ পেলেই চোখের দৃষ্টিতে লেহন করে তাকে। এ তার গা সয়ে গেছে। কিন্তু বুড়োর চাহনি তাকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে।
.
মাঝরাত। ঘুম ভেঙে গেল মোমেনার। স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে ওঠাল
তার শাশুড়ি চিৎকার করছে: ‘কে যায়…কে হাঁটে-ধুপ-ধাপ শব্দ কীসের!’
হারুন ঘুম থেকে উঠে টর্চ নিয়ে বেরোল ঘর থেকে।
বাইরে নিঝুম রাত। ঘরের কোনায় জ্বলছে নগ্ন বার্। মায়ের ঘরের কাছে এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হইছে, মা?’
দরজা খুলে দিল কাজের মেয়েটা
হারুনের মা বলল, ‘ও, হারুন, কে যেন হাঁটে, বাপ। ডর করে। কোনদিন তো এমুন হয় নাই।’
মাকে অভয় দিল হারুন, ‘ভয়ের কিছু নাই, মা। ঘুমাও। আমি জাইগ্যা আছি।’
সেদিন রাতে আর কোন ঘটনা ঘটল না।
নিরাপদেই কেটে গেল রাত।
ঘটনা ঘটল পরের রাতে।
ভীষণ গরম পড়েছে। কারেন্ট নেই। আই.পি.এস.-টাও নষ্ট।
দক্ষিণের জানালা খুলে ঘুমিয়েছে হারুন। পাশে মোমেনা। হঠাৎ মোমেনার নাকে এসে ঝাপটা মারল বেলিফুলের তীব্র গন্ধ। এ গন্ধটা তার চেনা। বুড়োর গা থেকে আসে। বেলিফুলের আতর।
বুড়োর কথা মনে হতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল মোমেনা। ঘর অন্ধকার। জানালা দিয়ে একফালি চাঁদের রুপালি আলো ঘরের মেঝেতে পড়েছে।
জানালার দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠল সে।
জ্বল-জ্বল চোখে কেউ তাকিয়ে আছে ওদের খাটের দিকে!
বুড়ো!
ওহ্, খোদা, এ যে সেই বুড়োটাই!
বেড়ালের মত জ্বলছে চোখ। বাইরে থেকে জানালার গ্রিলে ঠেকিয়ে রেখেছে মাথা। সুরমা মাখা চোখে পলকহীনভাবে তাকিয়ে আছে।
আর্তচিৎকার বেরোল মোমেনার গলা দিয়ে।
ঝটকা দিয়ে উঠে বসল হারুন মিয়া। ‘কী হইছে, মোমেনা, কী হইছে?’
আঙুল দিয়ে জানালা দেখাল মোমেনা।
কিন্তু ওখানে কেউ নেই এখন।
মোমেনা বলল, ‘জানালার ওই পাশে, জানালায় মাথা ঠেকাইয়া দাঁড়াইয়া ছিল ওই বুইড়া। আমাদের দেখতেছিল।’
হারুন মিয়া বলল, ‘তোমার চোখের ভুল, মোমেনা। তারে তো তুমি পছন করো না, তাই হয়তো দুঃস্বপ্ন দেখছ। ঘুমাও।’
মোমেনা মাথা নাড়ল। ‘না, আমার চোখের ভুল না।’
হারুন মিয়া ঘর থেকে বেরোল টর্চ নিয়ে। বাংলা ঘরের সামনে এসে হাঁক দিল, ‘চাচা মিয়া, কী, ঘুমান নাকি?’
সাড়া নেই।
দরজা ধাক্কা দিল হারুন মিয়া। আবারও ডাকল।
এবার সাড়া মিলল।
ঘুম-চোখে দরজা খুলল বৃদ্ধ। হারুনের টর্চের আলো চোখে পড়তেই চোখ কুঁচকে গেল। ‘কী হইছে, বাবা?’ জিজ্ঞেস করল।
হারুন বলল, ‘না, কিছু না।’
.
দুই
বুড়ো লোকটাকে দেখলেই গা ছমছম করে মোমেনার। লোকটাকে মানুষ মনে হয় না। মনে হয় অন্য ভুবনের কেউ। হারুন মিয়ার মা-ও, পছন্দ করে না বুড়োটাকে। প্রায়ই মোমেনাকে বলে, ও, বউ, ওই বুইড়ার কাছে যাইস না। ও একটা পেরেত। ও একটা আজব। ও, বউ, কাছে যাইস না। হারাইন্যা ওইডা কী ধইরা আনছে…ও, বউ, ওইডারে তিন কোনা ছন দিয়া মুখ পুইড়া বাইর কইরা দে।
শুনে খ্যাক্-খ্যাক্ করে হাসে বুড়োটা।
মোমেনার শরীর শির-শির করে। বুড়োর হাসিটা ভয়ঙ্কর লাগে তার কাছে।
তারপর, বুড়োটা আসবার দশদিন পর ঘটল সেই ঘটনা। সেদিন সকাল থেকেই মেঘ করেছে আকাশে। কেমন গুমট ভাব। বাতাস নেই এক রত্তি। ভাপসা গরম। দুপুরের দিকে নামল বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টি। তা আর থামতে চাইল না। বিকাল গিয়ে সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা গিয়ে রাত, বৃষ্টির বিরাম নেই। কখনও হালকা, আবার কখনও মুষলধারে।
সন্ধ্যা থেকেই বিদ্যুৎ নেই। গ্রামের কারেন্ট! ভাল দিনেই থাকে না, আর আজ তো বৃষ্টিই।
রাত ঠিক দুটো, চারদিক নিঝুম। শুধু থেকে-থেকে ডাকছে ব্যাঙ।
বৃষ্টিটাও ধরে এসেছে।
ঠিক সেই সময় খুলে গেল বুড়োর ঘরের দরজাটা।
ঘর থেকে বের হয়ে এল হালকা একটা নীলাভ ধোঁয়ার মনুষ্য অবয়ব। আস্তে-আস্তে হেঁটে গেল হারুন মিয়ার শোবার ঘরের দিকে।
ঘরের কাছে যেতেই খুলে গেল দরজা নিঃশব্দে। বিছানার কাছে চলে গেল অবয়বটা।
খাটে চিত হয়ে হাঁ করে ঘুমিয়ে আছে হারুন মিয়া। হাঁটুর ওপর উঠে আছে লুঙ্গি।
মোমেনাও চিত হয়ে ঘুমিয়ে আছে পাশেই। সুউচ্চ বুকের ওঠা-নামা চোখে পড়ছে। ধোঁয়াটে দেহটা হঠাৎ করেই কুণ্ডলী পাকিয়ে একটা রেখার আকার ধারণ করল, তারপরই হারুন মিয়ার হাঁ করা মুখে ঢুকে গেল। আপনা থেকে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা।
হঠাৎ করেই উঠে বসল হারুন মিয়া। শরীরটা হঠাৎ করেই যেন সতেজ মনে হলো ওর। অন্ধকার বিছানায় বসে রইল কিছুক্ষণ। আড়মোড়া ভাঙল। দৃষ্টি গেল স্ত্রীর মুখে। হঠাৎ করেই জৈবিক তাড়না অনুভব করল। কামতৃষ্ণা জেগে উঠেছে বুকে। হাত বাড়াল সে স্ত্রীর…
.
হারুন মিয়ার আনন্দ আর বুকে ধরছে না। তার স্ত্রী পোয়াতি হয়েছে। সন্তান হবে তার। গঞ্জে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এনেছে। স্ত্রীর যত্নের জন্য আরও দু’জন কাজের মেয়ে রেখে দিয়েছে। তাতে ঝামেলা সহ্য করতে হয়েছে খানিকটা। এই বাড়িতে থাকতে ভয় পায় সবাই ওই বুড়োটার কারণে।
বদলে গেছে বুড়োর পোশাক-আশাক। মোমেনাকে দেখতে আসে চোখে সুরমা ও গায়ে আতর লাগিয়ে। এসেই জিজ্ঞেস করে, ‘কী গো, হারুনের বউ, আছ কেমন? নিজের যত্ন নিয়ো। পেটে যে আছে সে কিন্তু অন্যের আমানত। তার যেন ক্ষতি না হয়।’
মোমেনা ঠিক বুঝতে পারে না বুড়ো কী বলতে চায়। ওর মন চায় জিজ্ঞেস করতে, কিন্তু ভয়ে তা আর হয়ে ওঠে না। তা ছাড়া, বুড়োটাকে আসতে দেখলেই লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে শাশুড়ি, চেঁচাতে থাকে, ‘ওই, বুইড়া! মড়াখেকো। খাটাস কোন্খানকার! আমার পোয়াতি বউয়ের কাছ থাইক্যা দূরে যা! মর তুই-মর!’
দৌড়ে পালায় বুড়ো।
শাশুড়ির প্রতি অদ্ভুত মমতা অনুভব করে মোমেনা। মহিলা মেয়ের মতই আগলে রাখে তাকে।
বুড়োর কোন বদ মতলব থাকলেও তার শাশুড়ির জন্য কিছুই করতে পারছে না।
মোমেনার নানান কিছু খেতে ইচ্ছে করে আজকাল। তা, গর্ভবতী মেয়েদের এমন তো হবেই। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু মোমেনার যেটা খেতে ইচ্ছে করে, তা ভাবতেই শিউরে ওঠে নিজেই!
ইশ্, সে যদি কচ্-কচ্ করে চিবিয়ে খেতে পারত কাঁচা মাংস! ভেবে পায় না এ কথাটা কেমন করে বলবে স্বামীকে। এই ইচ্ছার কথা শুনলে আতঙ্কে আঁতকে উঠবে তার স্বামী। যে শুনবে ওকে রাক্ষস ভাববে। কিন্তু মনের ইচ্ছেটাকে কোনভাবেই দমন করতে পারছে না ও। মনটা আঁকুপাঁকু করছে অন্তত একটা জ্যান্ত মুরগি চিবিয়ে খেতে। এর মধ্যে বুড়ো এক ফাঁকে ওর শাশুড়ির চোখ এড়িয়ে কাছে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘কাঁচা মাংস খাইতে মন চায়, হারুনের বউ?’
অবাক হলো মোমেনা। মাথা নেড়ে সায় দিল বুড়োর কথায়। ভাবল, বুড়োটা জানল কেমন করে?
বুড়ো ফিসফিস করে বলল, ‘মনে চাইলে খাও। মানা করে কেডা?’
.
তিন
খাবার খুঁটতে-খুঁটতে ঘরের বারান্দায় উঠে এসেছে মোরগটা। নিঝুম দুপুর, কেউ কোথাও নেই। বারান্দায় চেয়ারে বসে ছিল মোমেনা। ঘরে ভাতঘুম দিয়েছে শাশুড়ি। উঠানটাও ফাঁকা। লালসাটা আবারও জেগে উঠল মোমেনার বুকে। কানে বাজল বুড়োর ফিসফিস করা কথা, ‘মনে চাইলে খাও। মানা করে কেডা?’
ঝটকা দিয়ে মোরগটার দিকে চাইল মোমেনা।
লাল-কালোয় মেশানো সুন্দর শরীর। খুঁটে-খুঁটে খাচ্ছে কিছু। চেয়ারে বসা অবস্থাতেই বিদ্যুদ্গাতিতে থাবা বসাল মোমেনা। কক্-কক্ করে প্রতিবাদ করল মোরগটা মোমেনার হাতের মুঠোয়। ওটার গলায় কামড় বসাল মোমেনা রাক্ষসের মত! নিজের কাজে নিজেই অবাক। তবে খাওয়া থামাল না। কাঁচা মাংস! কচ্- কচ্…
মোমেনাকে দেখছে একজোড়া চোখ
সে খেয়াল ওর নেই।
সেই বুড়ো লোকটা। সব দেখছে সে তার ঘরের জানালা দিয়ে। তার ঠোঁটে খেলে গেল এক পৈশাচিক হাসি। ইচ্ছাপূরণ হচ্ছে। জানালার কাছ থেকে সরে গেল সে।
আস্ত মোরগটা চেটেপুটে খেয়ে ঘরের পেছনে পালক ও নাড়ি-ভুঁড়ি ফেলে এল মোমেনা। সত্যি অসাধারণ স্বাদ, ভাবল মনে-মনে। বেড়ে গেল ওর লোভ। কাঁচা মাংস খেতে হবে তাকে।
কাঁচা মাংস!
নইলে সে বাঁচবে না।
প্রতিদিন চাই কাঁচা মাংস…
সেদিন রাতেই ঘটল আরেক ঘটনা।
তখন রাত দেড়টা। বাড়ির সবাই ঘুমে অচেতন। আজ বাড়ি নেই হারুন মিয়া। গঞ্জে গেছে। একা ঘুম আসছে না মোমেনার বিছানায়। ছটফট করছে। কীসের যেন এক আকুলি-বিকুলি। রক্ত চাই! মাংস চাই!
উঠে বসল সে। ঘরে নীলাভ আলো। ডিম লাইট। সেই আলোতে ভয়ঙ্কর লাগছে তাকে। চুল এলোমেলো। আস্তে করে দরজা খুলে বের হয়ে এল সে। বারান্দায় কতক্ষণ দাঁড়াল। তারপর নেমে এল উঠানে। ঠিক তখনই খুলে গেল বুড়োর ঘরের দরজা। বেরিয়ে এল সে-ও। দাঁড়িয়ে থাকল বারান্দার অন্ধকারে।
বাইরে চাঁদের আলো। সব দেখা যাচ্ছে। জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে রইল বুড়ো মোমেনার দিকে
দ্রুত হেঁটে গোয়াল ঘরের সামনে চলে এল মোমেনা।
ধাক্কা দিতেই খুলে গেল দরজা।
মোমেনাদের দুটো গরু। তার মধ্যে একটা দুধেল গাই। আর আছে দুটো ছাগল।
একটা ছাগলের দিকে নজর দিল মোমেনা। ওটাকে জাপটে ধরতেই তীব্র স্বরে ম্যা-ম্যা করে ডেকে উঠল। মোমেনা ততক্ষণে ওটার গলায় বসিয়ে দিয়েছে দাঁত।
ওদিকে গোয়াল ঘরের লাগোয়া ঘরে ঘুমায় বাড়ির কামলা হারেস আলী। হাতে টর্চ নিয়ে বেরিয়ে এল সে। চোর ধরার ইচ্ছা। হাতেনাতে ধরবে।
গোয়াল ঘরে ঢুকেই টর্চ জ্বেলে দিল হারেস আলী।
ঝটকা মেরে মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে তাকাল মোমেনা। ওর ঠোঁটের দু’কশ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। বড়-বড় চোখ। অগোছাল চুল। ভয়ঙ্কর লাগছে দেখতে। টর্চের আলোটা পড়েছে মোমেনার মুখে।
হারেস আলীর কণ্ঠ চিরে আর্তচিৎকার বেরোতেই পেছন থেকে বজ্রমুষ্টিতে কে যেন ধরে ফেলল তার ঘাড়টা। ততক্ষণে হারেস আলীর হাত থেকে পড়ে গেছে টর্চটা। শীর্ণ কিন্তু প্রবল শক্তি ওই হাতে, এক ঝটকায় হারেস আলীর ঘাড়টা ভেঙে ফেলল।
ততক্ষণে আবারও খাওয়ায় মন দিয়েছে মোমেনা। জানে, আর কোন ঝামেলা হবে না।
পরদিন সকালে হারেস আলীর লাশ মিলল গ্রামের শেষ মাথায় হোগলা বিলের কিনারে। শরীরের নানা স্থান থেকে মাংস খেয়ে গেছে কীসে যেন!
খবর পেয়ে বাড়ি ফিরল হারুন মিয়া। তার মা চিৎকার করে বলল, ‘ও, হারুন, এইডা ওই পেরেতের কাম! তরে আগেই কইসি ওই বুইড়া একটা পেরেত! ওইডারে দূর কর! নাইলে ওইডা সবাইরে শেষ করব!’
হারুন খেঁকিয়ে উঠল, ‘মা, চুপ কর তো! এমনেই থানা-পুলিশের ঝামেলা মিডাইতে-মিডাইতে জানডা শেষ, তার উপর আজাইরা প্যাঁচাল ভালা লাগে না।’
হারুন মিয়া তার মায়ের কথাকে আমলে নিল না। ওর মা চিৎকার করতেই থাকল, ‘ও, হারুন, আমি দেখছি, বাজান। নিজের চওক্ষে দেখছি…ও, হারুন, ওই বুইড়া একটা পেরেত…’
.
চার
হারুনের মা নিজ চোখে কী দেখেছে তা আর কাউকে বলে যেতে পারল না। কেউ কোনদিন জানতে পারবে না কী দেখেছিল। এমনিতেই ভয়ে পালিয়েছে বাড়ির সব কাজের মেয়ে। আছে শুধু হারুনের মায়ের সাথে থাকে যে মেয়েটা। জয়তুন বিবি।
হারুনের মায়ের স্নান করার অভ্যাস পুকুরে। বাড়ির লাগোয়া বাঁধানো ঘাটলার পুকুর। সেখানেই সে স্নান করে। অন্যদিনের মত আজও জয়তুনকে ডেকে বলল, ‘ও, জয়তুন, গোসল করব। আমারে পুস্কুনিতে নিয়া চল। ও, জয়তুন, তুই কই গিয়া মরলি!’
জয়তুন এসে বলল, ‘চলেন। এত চিল্লানের কী হইল? আসেন।’
পুকুরের ঘাটে এসে খেয়াল হলো বুড়ি গামছা নিয়ে আসেনি।
জয়তুন বলল, ‘আপনে পানিতে নামেন। আমি গামছা নিয়া আসি।’
পুকুরটা ছায়া ঘেরা। চারপাশে গাছপালায় ঘের দেয়া। হারুনের মায়ের ভয় করে এখানে এলে। গলা উঁচিয়ে বলল, ‘যা, জলদি নিয়া আয়। আমার একলা ডর করে।’
জয়তুন চলে গেল।
গা ছমছম করে উঠল হারুনের মায়ের। ঠিক তখনই তার মনে হলো কে যেন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সময়টা ঠিক দুপুর।
আশপাশে কেউ নেই।
ভয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করল হারুনের মায়ের। ঠিক তখনই অদৃশ্য কেউ যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল পানিতে। চিৎকার করল বটে কিন্তু আওয়াজটা এত কম যে কেউ শুনল না। পানিতে পড়েই ডুবে গেল। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে পানির উপর তুলল মাথাটা। সাথে-সাথে কেউ যেন মাথাটা শক্ত হাতে চেপে ধরে তলিয়ে দিল পানির নিচে সে।
শত চেষ্টা করেও মাথা তুলতে পারল না হারুন মিয়ার বৃদ্ধ মা।
জয়তুন বিবি এসে কোথাও খুঁজে পেল না বৃদ্ধাকে।
বিকালে পুকুরঘাটে ভেসে উঠল লাশ।
হারুন কেমন বিহ্বলের মত হয়ে গেল।
এটাকে একটা দুর্ঘটনা হিসেবেই ধরে নিল সে।
ভয় পেয়ে মিয়া বাড়ির কাজ ছেড়ে দিল জয়তুন বিবি। বাড়ি ছেড়ে পালাল এভাবেই দিন কাটতে লাগল। আস্তে-আস্তে মারা পড়ছে হারুন মিয়ার সব গরু- ছাগল-হাঁস-মুরগি। কীসে যেন খেয়ে ফেলছে ওগুলোকে।
গ্রামে আবির্ভাব ঘটেছে কোন হিংস্র মাংসাশী প্রাণীর।
মিয়া বাড়ির পশু-পাখি শেষ হবার পর গ্রামের অন্যদের বাড়িরগুলো একে- একে শেষ হতে থাকল।
সবাই মিলে পাহারা দিয়েও কিছু হলো না।
তবে যারা পাহারা দিচ্ছে, তাদের অনেকেই পাহারা দেয়াকালীন সময়ে একটা দৃশ্য দেখেছে।
এক মহিলা!
রাতে তারা মহিলাকে দেখেছে বিভিন্ন জায়গায়।
যারাই দেখেছে তারা বেশিরভাগ সময়ই ওই মহিলাকে দেখার মুহূর্তে একা ছিল। কেউ হয়তো সিগারেট ধরাতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, অথবা হয়তো প্রস্রাব করতে বসেছিল কেউ।
মহিলাটা নাকি দ্রুত হেঁটে উধাও হয়ে গিয়েছিল।
আরও যা আশ্চর্যের, যে বাড়ির কাছাকাছি ওই মহিলাকে দেখা গেছে, সে বাড়িরই কোন না কোন পশু মারা পড়েছে।
সব পশুই পাওয়া যেতে লাগল আধ-খাওয়া অবস্থায়।
এদিকে মোমেনারও সময় ঘনিয়ে এসেছে সন্তান প্রসবের।
তাকে গঞ্জের এক ক্লিনিকে ভর্তি করা হলো।
সুন্দর ফুটফুটে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিল মোমেনা।
বুকে আনন্দ আর ধরল না হারুনের। গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করল সে। গ্রামের মানুষও কিছুদিনের জন্য স্বস্তিতে আছে। ক’দিন হলো অদ্ভুত জন্তুটা
আর কোন পশু খুন করছে না। হয়তো চলে গেছে অন্য কোন গ্রামে।
এদিকে হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে মোমেনার দেহে খিঁচুনি। মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে গাঁজলা। চিৎকার করতে-করতে চুল ছিঁড়তে লাগল সে। যখন খিঁচুনি থাকে না, পাগলের মত সারা বাড়ি জুড়ে দৌড়াতে থাকে।
বারান্দায় জলচৌকিতে বসে তীব্র চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে বুড়ো লোকটা, খ্যাক্-খ্যাক্ করে হাসে।
অবশেষে সাঙ্গ হয় মোমেনার জীবন-নাটক।
সেদিন বাড়িতে কেউ ছিল না। ছিল শুধু বুড়োটা।
হারুনের বাচ্চাটাকে দেখতে বাড়িতে এসেছিল প্রতিবেশী দু’জন মহিলা। তখন বিকেল। হারুন গেছে ডাক্তারের কাছে। মহিলারা বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই মোমেনা বাচ্চাটাকে ঘরের দাওয়ায় ফেলে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপ দিল পুকুরের পানিতে। আর উঠল না।
চিৎকার জুড়ল দুই মহিলা।
.
পাঁচ
স্ত্রী মারা যাওয়ায় অকূল পাথারে পড়ল হারুন মিয়া।
কে দেখবে এই দুধের বাচ্চাকে?
কেউ এসে তো তার বাড়ি থাকতে চায় না।
বৃদ্ধ অতিথি বলল, ‘বাজান, আমি দেখমু তোমার পোলারে।’
হারুন মিয়া বলল, ‘আমারে বাঁচাইলেন, চাচা!’
ছোট বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল বুড়ো।
গ্রামের সবাই ধন্য ধন্য করল বুড়োকে। বুড়ো আড়ালে মুচকি হাসল।
মা-স্ত্রী হারিয়ে কেমন উদাসীন হয়ে গেছে হারুন মিয়া। সংসারে মন বসে না। মন টেকে না ব্যবসা-বাণিজ্যে। শুধু মন পড়ে থাকে ছোট ছেলেটার কাছে।
বুড়োর হাতে ছেলেকে দিতে পেরে খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়েছে সে।
এভাবে কিছুদিন গত হলো। তারপরই একদিন অস্বাভাবিক ব্যাপারটা ধরা পড়ল হারুন মিয়ার চোখে।
হারুন মিয়া ক’দিন ধরে খেয়াল করছে ছেলের জন্য যে রোজ দুধের বরাদ্দ দেয়া আছে, তা পাত্রেই পড়ে থাকে। তা হলে তার ছোট ছেলেটা খায় কী?
ওকে দেখেও তো তেমন দুর্বল মনে হয় না।
বুড়োকে জিজ্ঞেস করবে-করবে করেও জিজ্ঞেস করা হয় না।
কিন্তু সেদিন সহসা বাড়ি চলে এল হারুন মিয়া। ঘরে ঢুকতেই দেখল তার সন্তানকে একমনে খাওয়াচ্ছে বুড়োটা। হারুন যে ঘরে ঢুকেছে, সে খেয়াল নেই।
এগিয়ে গেল হারুন মিয়া। কিন্তু বাচ্চাটাকে যে পাত্র থেকে খাওয়াচ্ছে বুড়ো, সেদিকে চেয়ে থমকে গেল সে।
ওহ্, খোদা! বাটিতে ওসব কী! লাল-কালচে তরল, ঘন থকথকে! এ যে রক্ত! লাল হয়ে আছে বাচ্চাটার ঠোঁট।
চিৎকার করে উঠল হারুন, ‘বুড়ো মিয়া, কী করতেছেন আপনে!’
চমকে চাইল বুড়ো, খ্যাক্-খ্যাক করে হেসে উঠল। কর্কশ স্বরে বলল, ‘দেইখা ফালাইছ? বেশ, বেশ, তাইলে তো আর তোমারেও বাঁচাইয়া রাখা যাইব না।’
নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে গেল ঘরের দরজাটা।
হাত-পা অবশ হয়ে এল হারুন মিয়ার।
বুড়ো বলতে লাগল, ‘আমারে চিনতে পারো নাই, বাপজান? কলিম শেখের কথা মনে নাই? যার রাইস মিলের কর্মচারী ছিলা তুমি? যারে মাইরা তুমি রাইস মিলের মালিক হইছ? যার পোলারেও মারছ তুমি! আমি সেই কলিম শেখ! ফিরা আইছি মরণের ওই পার থাইকা! তোমার বাড়ির চাকর হারেস আলীরে মারছি। সে দেইখা ফালাইছিল অনেক। তোমার মায়েরে মারছি, সে জাইনা ফালাইছিল বেশি। তোমার বউরে মারছি। কারণ, তারে আমার আর দরকার ছিল না। কিন্তুক্ তার গর্ভের সন্তানডা দরকার ছিল আমার। …ওইডা তোমার ছাওয়াল হইলেও তোমার না। …তাইলে কার কও দেখি?’ কথা শেষ করেই খ্যাক্-খ্যাক্ করে হাসল বুড়ো।
ওকে এখন আর বুড়ো মনে হলো না। চোখ দুটি জ্বলন্ত কয়লা যেন, জ্বল-জ্বল করে উঠছে। এগিয়ে গেল সে হারুনের দিকে। বলল, ‘তোমারেও মরতে হইব, হারুন। চিন্তা করবা না। তোমার পোলা বাঁইচ্যা থাকব। ও হইব একটা পিশাচ রক্তখেকো পিশাচ…’
হারুন নড়তে পারল না। পায়ে যেন শিকড় গজিয়েছে। বুকে জমাট বেঁধেছে ভয়ের শীতলতা। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল সে। ঝাপসা অন্ধকারেও তার মনে হলো, ওর ছেলে ওর দিকে চেয়ে ফিক করে হেসে উঠল!
.
রতন চক্রবর্তী
