নিশিডাকিনী – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

অশুভের বিদায় – সাঈদ শিহাব

অশুভের বিদায়

আবারও অধ্যক্ষের অফিসে যেতে হলো অপু ভাইকে। বেচারার জন্য খারাপই লাগল। এই নিয়ে তিনবার ডাকা হলো তাঁকে। অবশ্য না ডাকলেই অস্বাভাবিক হত। হল-এ তাঁর সাথে কেউই থাকতে চায় না। সবার এক কথা: অপু ভাইয়ের সাথে অতিপ্রাকৃত কিছু আছে। ছেলেগুলোর মাথায় সমস্যা আছে, ভেবেছিলাম। কিন্তু এক-এক করে • তিনজনই বা একই কারণ দেখাবে কেন! বিষয়টা আশ্চর্যজনক। আজ রুম ছাড়ল তৃতীয়জন। এ কারণেই অধ্যক্ষের তলব অপু ভাইকে। তিনি মনে করেন, অপু ভাই রুমে একা থাকার জন্য ভয় দেখিয়েছেন ওদেরকে।

করিডোর ধরে বিষণ্ন মনে হেঁটে আসতে দেখলাম অপু ভাইকে। বুঝলাম, আবারও সেই একই ঘটনা ঘটেছে। ধমক দেয়া হয়েছে তাঁকে। দু’জনেই বই- পড়ুয়া বলে তাঁর সাথে আমার ভাল বোঝাপড়া ছিল। এগিয়ে গেলাম।

আমাকে দেখে বললেন, ‘আমার কী দোষ? আমি কিছুই করিনি।’

মায়া হলো তাঁর অপমানিত চেহারা দেখে। সারাদিন বইয়ে গুঁজে রাখেন মুখ। মনে হয় না তাঁর কোন দোষ থাকতে পারে।

দুপুরে খাওয়া শেষ করে আয়েশ করে শুয়ে চেতন ভগতের ‘টু স্টেট্স’ বইটা পড়ছিলাম, এমন সময় দপ্তরী এসে বলল, হল কেয়ারটেকার হুকুম করেছেন, আমাকে রুম পাল্টিয়ে যেতে হবে অপু ভাইয়ের রুমে। বাজ পড়ল মাথায়। আমাকে ভীরু বলা যাবে না। আবার খুব সাহসীও নই। কী আর করা, ভয়ের চেয়ে একরাশ বিরক্তি নিয়ে পাল্টালাম রুম। কেমন খচ খচ করতে লাগল মনটা।

নিজের জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হয়েছি অপু ভাইয়ের রুমে। আমাকে দেখে অপু ভাই খুব খুশি হলেও খুশি হতে পারলাম না আমি

‘এবার তা হলে তোমাকে পাঠাল, ফারহান? ভালই হলো তুমি আসাতে। তুমি নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে ওই ছেলেগুলোর মত অধ্যক্ষের কাছে কথা শোনাবে না? আমরা মিলেমিশে থাকব। আর প্রচুর বই পড়ব।’ এক নাগাড়ে বলে তিনি থামলেন।

আমি মনে-মনে বললাম, তাই যেন হয়।

মনে-মনে একটু কৌতূহলী ছিলাম, রহস্যটা কী

আশা করি এবার জানা যাবে।

রাতে খাওয়া শেষে অপু ভাইয়ের সাথে অনেক গল্প হলো। একটা জিনিস খেয়াল করলাম, বাবা ও ভাই-বোনের বিষয়ে অনেক কথা বললেও, কিছুই বললেন না অপু ভাই তাঁর মা’র বিষয়ে। আমিও আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।

.

রাতটা পার করলাম ঘুমিয়ে। সকালে ফিরে এল মনে সাহস। না, কোন সমস্যাই তো হলো না। কিন্তু আমি তো জানতাম না সেদিন রাতে আমার জন্য কী অপেক্ষা করছিল।

ঘুম ভাঙার পর দেখি লাইট জ্বলছে। মনে পড়ল, অপু ভাই পড়ছিলেন। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন পড়তে-পড়তে। উঠে বন্ধ করে দিলাম লাইট। যখন আবারও ঘুম ভাঙল, তখন পুরো রুমে ভালই অন্ধকার। আমার পাশের জানালাটা দিয়ে হালকা আলো আসছে। কেন জানি অপু ভাইয়ের বেডের দিকে নজর গেল। আর ভয়ে হারিয়ে ফেললাম নড়াচড়ার শক্তি।

অপু ভাইয়ের বেডের পাশে ওটা কী দাঁড়িয়ে আছে?

মানুষের অবয়ব, লম্বা, সারা গা কালো আলখাল্লায় ঢাকা।

কেমন ঠাণ্ডা হয়ে আছে সারা রুম!

বিশ্রী পোড়া গন্ধ, সেঁতসেঁতে ভাব।

আমি ঘামছি, চিৎকার করতে চাচ্ছি, পারছি না। জ্ঞান হারালাম। চোখ খোলার পর দেখি মুখে সূর্যের আলো এসে পড়ছে। সাথে-সাথে মনে পড়ল গতরাতের কথা। অপু ভাইয়ের বেডের দিকে তাকিয়ে দেখি বেড খালি। বুঝলাম ক্লাসে গেছেন।

কিন্তু গতরাতে আমি ওটা কী দেখেছিলাম?

সকালের আলো দূর করে মনের সব ভয়। তাই রাতের ঘটনাটি আমার চোখের ভুল ছাড়া কিছুই মনে হলো না। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, ভূত-প্রেতে বিশ্বাস আমায় মানায় না। তার ওপর এই একবিংশ শতাব্দীতে যখন মানুষ সৌরজগৎ পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে, সে সময়ে ভূতের চিন্তা করাই হাস্যকর। উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে। মিস হয়ে গেল আজ ক্লাস। বাইরে গিয়ে নাস্তা করতে হবে।

রাতে দেরি হয়ে গেল রুমে ফিরতে। লাইট জ্বলছে, ঘুমিয়ে পড়েছেন অপু ভাই। ফ্রেশ হয়ে লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায়। চোখ খুলেই দেখলাম বুকের উপর বসে আছে মস্ত বড় এক সাপ। ভয়ে জ্ঞান হারালাম চিৎকার দিয়ে। জ্ঞান ফিরতে দেখলাম আমার মুখে পানি ছিটাচ্ছেন অপু ভাই, আর আমাকে ঝাঁকাচ্ছেন। চোখ খুলতেই বলে উঠলেন, ‘কী হয়েছে, ফারহান? চিৎকার করে উঠলে যে?’

আমি হতভম্বের মত উঠে বসলাম। অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলাম না।

ওদিকে অপু ভাই বলেই যাচ্ছেন, ‘আমি ভাবলাম কী না কী হলো। আরেকটু হলে হল কেয়ারটেকারকে ডাকতে যেতাম।’

তাঁর মন খারাপ হয়ে গেছে। বিমর্ষ সুরে বললেন, ‘কেয়ারটেকার বলেছে, আবারও কাউকে ভয় দেখিয়ে রুম থেকে ভাগালে, আমাকে হল থেকে বের করে দেবে। তাই তাকে ডাকতে ভয় হচ্ছিল, তোমার এ অবস্থার জন্য যদি আমাকে দায়ী করে?’

‘না, অপু ভাই,’ বললাম, ‘আপনার কোন দোষ নেই।’

‘যাক বাঁচালে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো।’

লাইট নিভিয়ে শুতে গেলেন অপু ভাই।

লাইট নেভাবার আগে ঘড়িতে দেখেছি, রাত আড়াইটা বাজে। শুয়ে শুয়ে গতকালের ঘটনা আর আজকেরটা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। বুঝলাম, আমার ভুল নয়। আসলেই কোন সমস্যা আছে এখানে। হঠাৎ খুব গরম লাগল। ফ্যান চলছে, তারপরও ঘামছি। আচমকা বুঝতে পারলাম, গরম হয়ে উঠছে আমার বেড। পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে হাত-পায়ের চামড়া। লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম।

অপু ভাই বিছানায় উঠে বসলেন। ‘কী হয়েছে, ফারহান?’

আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। ‘কিছু না। একটু টয়লেটে যাব।’

‘ও, আচ্ছা, এমনভাবে লাফ দিলে যে আমি ভয়ই পেয়ে গেলাম,’ বলে শুয়ে পড়লেন।

আমি রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। ভয়ে কাঁপছে বুক। ভিজে গেছি ঘেমে। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হব নাকি ভাবছি, এমন সময় কোথা থেকে যেন ভেসে এল টেনে-টেনে কু-উ-উ-উ শব্দ। করুণ অথচ ভয়ানক সেই ডাক। তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম রুমে। মনে হয় ঘুমিয়ে গেছেন অপু ভাই। বেড়ে হাত দিয়ে দেখলাম। নাহ, ঠাণ্ডাই। শুয়ে পড়লাম। কখন ঘুমিয়ে গেছি নিজেই জানি না।

সকালে ক্লাসে বসে মন দিতে পারছি না লেকচারে। ঘুরে-ফিরে গতকালকের ঘটনাগুলো মনে পড়ছে। কী করব বুঝতে পারছি না। শুধু এতটুকুই বুঝলাম, আমাকে দিয়ে হবে না এর সমাধান। আর কলেজ কর্তৃপক্ষকে বলেও লাভ হবে না। বরং তারা অপু ভাইকেই বের করে দেবে হল থেকে।

আমাকে অন্যমনস্ক দেখে ক্লাস বিরতির সময় এগিয়ে এল আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু শান্ত। ‘কীরে, দোস্ত, মন খারাপ নাকি? তোর চোখ-মুখ কেমন শুকনো লাগছে?’

শান্তকে কী বলব?

অনেক দ্বিধা করে বলে ফেললাম সব।

ও কিছুক্ষণ ভ্রুকুটি করে বলল, ‘আজ বিকেলে ফ্রি থাকিস। তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাব।’

বিকেলে শান্তর সাথে চেপে বসলাম রিক্সায়।

‘আমার তিন চাচা,’ বলল শান্ত। ‘ছোট চাচা সবসময় পরিবারের সবার আদর পেয়ে বড় হয়েছেন। তাই বোধহয় একটু বিগড়ে যান। পরিবারের সবাইকে তাই আমেরিকায় রসায়নে উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছেন বলে গেলেও, পড়াশোনা করেন অকাল্ট নিয়ে।’

‘অকাল্ট কী রে, দোস্ত?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘এই…শয়তান বা লুসিফার, ব্ল্যাক ম্যাজিক, এসব বিষয়ে লেখাপড়া। আমার ছোট চাচার সঙ্গে আমাদের তেমন যোগাযোগ নেই। মাঝে-মাঝে কথা হয় ফেসবুকে। তবে ঠিকানাটা জানি। ওঁর কাছেই যাচ্ছি আমরা। আশা করি সাহায্য করতে পারবেন আমাদেরকে।

অভিজাত এক এলাকায় সুন্দর এক বিল্ডিং-এর সামনে এসে থামল আমাদের রিক্সা। পাঁচতলার অ্যাপার্টমেন্টের দরজা যিনি খুলে দিলেন, তাঁর বয়স বেশি নয়। খুশি মনে বললেন, ‘আরে, শান্ত যে! সাথে বন্ধু নিশ্চয়ই। ভেতরে আয়।’

ভদ্রলোকের ব্যবহার ভাল। সুন্দর সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট।

সোফায় গিয়ে বসলাম আমরা।

‘তারপর, শান্ত, বাসার সবাই ভাল আছে? তোর সাথে তো দুই বছর পর দেখা,’ বললেন ছোট চাচা।

‘সবাই ভাল আছে। তুমি তো বলেছিলে কয়েক বছরের ভেতরে বাংলাদেশে আসবে না। তা হলে কেন এসেছ?’

ছোট চাচা হাসলেন। ‘আসলে আমার যে কাজ, তা সারা বিশ্বে করা যায়। আর বাংলাদেশে তো অফুরন্ত সুযোগ। সেই প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশে বসবাস করছে শয়তান পূজারীরা। বর্তমানেও এরা লুকিয়ে এদেশে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের চর্চা। বাদ দে ওসব। তুই হঠাৎ কী মনে করে?’

আমার দিকে ইঙ্গিত করল শান্ত। ‘আসলে তোমার সাহায্য প্রয়োজন আমার বন্ধু ফারহানের। ‘

এরপর সব খুলে বললাম ছোট চাচাকে।

আমার কথা শেষ হওয়ার পর চিন্তিত দেখাল ছোট চাচাকে। ‘মনে হচ্ছে, বিপদে আছে তোমার রুমমেট অপু,’ বললেন। ‘তবে সব শুনে মনে হচ্ছে, ও এসবের কিছুই জানে না। এর শিকড় লুকিয়ে আছে অতীতে কোথাও। তোমাদের আপত্তি না থাকলে, চলো, আমি তোমাদের হলে যাব।’

খুশি হলাম, এবার হয়তো কূল হবে এই রহস্যের।

আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবার পর তিনি গুছিয়ে নিলেন ছোট একটা ব্যাগ। একটু পর রওনা হলেন আমাদের সাথে।

বন্ধুর ছোট চাচা মানে তিনি আমারও ছোট চাচা। মনে সাহস নিয়ে তাঁকে নিয়ে এলাম আমাদের হলে। রুমে ঢুকে দেখি অপু ভাই পড়ছেন। আমার আর শান্তর সাথে আরেকজনকে ঢুকতে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি।

‘ইনি শান্তর চাচা, অপু ভাই, আপনার সাথে কিছু কথা বলবেন,’ বলে শান্তকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম।

দশ মিনিট পর বেরিয়ে এলেন অপু ভাইও। আমাদের সাথে কোন কথা না বলে দাঁড়িয়ে থাকলেন চুপচাপ

এর পাঁচ মিনিট পর ছোট চাচা বেরিয়ে এসে অপু ভাইকে রুমে যেতে বললেন। আমাদেরকে জানালেন, ‘তোমরা অপুকে কিছুই জিজ্ঞেস করবে না, ঠিক আছে? আর আজ রাতে সাবধানে থাকবে। শান্ত, তুইও থাকবি ওদের সাথে। আশা করি কোন সমস্যা হবে না। কালই ফিরে আসব আমি। আশা করি এর ভেতর মিটে যাবে সব।’

আর কোন কথা না বলে চলে গেলেন ছোট চাচা।

রুমে ঢুকে দেখলাম পড়ছেন অপু ভাই।

রাতে আমার বেডে শান্ত থাকবে বলে কথা দিয়ে চলে গেল নিজের রুমে। চুপচাপ পড়তে বসলাম আমিও। কিন্তু মন দিতে পারলাম না পড়ায়। মন খচ খচ করতে লাগল: আজ রাতে আবারও কোন বিপদ হবে? অজানা আশঙ্কায় মনে কু ডাকছে।

আমার সাথে একটা কথাও বললেন না অপু ভাই। রাতের খাবার শেষ করে এসে শুয়ে পড়লেন।

আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম শান্তর জন্য। ও এল এগারোটার দিকে। দরজা-জানালা ভাল করে লাগিয়ে শুয়ে পড়লাম দু’জনে। কিন্তু আসছে না ঘুম। বুঝতে পারছি ঘুমায়নি শান্তও। কিন্তু কথা বলতেও ইচ্ছা করছে না। চারপাশে কেমন ভয়ানক এক নিস্তব্ধতা। ঘড়ির টিকটিক শব্দ মনে হচ্ছে আসছে দূরের কোন জগৎ থেকে। একসময়ে চোখে লেগে এল হালকা ঘোর, ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল শান্তর ঝাঁকুনিতে। কানের কাছে শুনলাম, ‘চুপ। জানালা… আরে, জানালাটা খোলা, নড়ছে হালকা বাতাসে। কিন্তু আমি তো জানালা বন্ধ করে শুয়েছিলাম। মনে হয় অপু ভাই খুলেছেন।’

শান্তকে বললাম, ‘দাঁড়া, বন্ধ করে আসছি।’

শান্ত টেনে ধরল। ‘শুয়ে থেকে জানালার দিকে দেখ!’

তাকালাম আর তখনই দেখলাম ওটাকে!

সেই কালো আলখাল্লা উড়ছে বাতাসে। জানালার কাছে আসছে, আবার সরে যাচ্ছে দূরে। মনে হয় ঢুকতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না। কেমন শীত-শীত লাগল। রুমে বিশ্রী সেঁতসেঁতে গন্ধ।

হঠাৎ কীসের শব্দ এল অপু ভাইয়ের বেড থেকে। সেদিকে তাকালাম। কিন্তু বিশ্বাস করাতে পারলাম না নিজের চোখকে।

হাওয়ায় ভাসছেন অপু ভাই! লাল হয়ে জ্বলছে তাঁর চোখদুটো! ‘হঠাৎ তাঁর বিকট হাসির শব্দে কেঁপে উঠল পুরো রুম। ভয়ে আমাকে জাপটে ধরল শান্ত। ‘দোস্ত! এসব কী হচ্ছে!’

‘তোরা কী ভেবেছিস, আমাকে দূরে সরিয়ে রাখবি?’ কেমন চাঁছা কণ্ঠে বললেন অপু ভাই। ‘এটা আমার শরীর! আমার শরীর থেকে আমাকে সরিয়ে রাখবি?’ বলে খাটের উপর পড়ে গেলেন অপু ভাই।

নীরব দর্শকের মত সব দেখে যাচ্ছি শান্ত আর আমি। ভয়ে কুঁকড়ে গেছি দু’জনে। বেড থেকে লাফ দিয়ে নামলেন অপু ভাই। এগিয়ে যাচ্ছেন জানালার দিকে। বুঝতে বাকি রইল না, কী হতে যাচ্ছে। অপু ভাইকে জানালা দিয়ে বের করে নিতে চাইছে ওই শয়তানটা! এরপর যা করলাম, তা করতে পারব আমি কোন দিনও ভাবিনি। লাফ দিয়ে উঠে জাপটে ধরলাম অপু ভাইকে। কিন্তু তাঁর গায়ে তখন ভর করেছে অস্বাভাবিক শক্তি। তাঁর হাতের ঠেলায় উড়ে গিয়ে তাঁর বেড়ে পড়লাম আমি।

‘শান্ত, অপু ভাইকে ধর!’ আমার কথায় যেন হুঁশ ফিরল শান্তর। শান্তর পেটা শরীর, নিয়মিত ব্যায়াম করে। ও গিয়ে দৌড়ে ধাক্কা দিল অপু ভাইকে। কাজ হলো এতে।

শান্তর ধাক্কায় মেঝের উপর পড়ে গেলেন অপু ভাই। এমন সময় বাইরে শুরু হলো প্রচণ্ড বাতাস। কালো অবয়বটা দেখলাম ভেসে আছে জানালার কাছে। তখনই লাফ দিয়ে গিয়ে চেপে ধরলাম অপু ভাইকে। আমার দেখাদেখি অপু ভাইকে চেপে ধরল শান্তও। প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে মুক্ত হতে চাইলেন অপু ভাই, শান্ত আর আমি প্রাণপণে ধরে রাখলাম তাঁকে। বিড়বিড় করে পড়ছি জানা সব দোয়া। ওদিকে বাইরে বেড়ে যাচ্ছে বাতাসের বেগ। প্রচণ্ড শব্দে পড়ছে বাজ। যেন মনে হচ্ছে সামনেই উপস্থিত কেয়ামত। হঠাৎ ভেঙে পড়ল জানালার সব কাঁচ। ভয় পেয়ে গেলাম। এবার রুমে ঢুকে পড়বে শয়তানটা?

কিন্তু না, ঢুকল না।

বোধহয় ঘরে কিছু করে গেছেন ছোট চাচা, যে-কারণে ঢুকতে পারেনি শয়তানটা। আস্তে-আস্তে থেমে গেল ঝড়। তখনই বাইরে থেকে ভেসে এল আযানের সুর।

এর চেয়ে মধুর কোন সুর বোধহয় কখনও শুনিনি।

সারারাত লড়ে ক্লান্ত আমরা। বিছানায় শুয়ে পড়তেই ঘুমিয়ে গেলাম।

সকালে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল অপু ভাইয়ের চেঁচামেচিতে: ‘আরে, আমি মেঝেতে শুয়ে আছি কেন? এই, তোমরা এখানে কেন? …কী হয়েছে…..

দেখি উঠে বসেছে শান্তও। পরস্পরের দিকে তাকালাম আমরা।

অপু ভাইকে তো কিছু বলা যাবে না।

বুঝে উঠলাম না কী করা উচিত এবার। এমন সময় দপ্তরী এসে বলল, ‘আপনাদেরকে ডাকছেন হল কেয়ারটেকার।

‘কেন?’ জিজ্ঞেস করলেন অপু ভাই।

‘জানি না, তাড়াতাড়ি আসেন,’ বলে চলে গেল দপ্তরী।

‘আমি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসি, তুইও রেডি হ, ফারহান,’ বলল শান্ত। বেরিয়ে গেল ও ঘর ছেড়ে।

দেখলাম মেঝে ছেড়ে উঠে পড়লেন অপু ভাইও। ভাবলাম, যাক, এ যাত্রায় তাঁকে কৈফিয়ত দেয়া থেকে বাঁচাতে পারলাম। কিন্তু আরেক দুশ্চিন্তা জুটল মনে: কেন ডাকল কেয়ারটেকার?

যাই হোক, দেরি না করে রেডি হয়ে নিলাম।

একটু পর হল কেয়ারটেকারের সামনে কাঁচুমাচু হয়ে হাজির হলাম আমরা তিনজন।

ভদ্রলোক বললেন, শান্ত, গতকাল রাতে তুমি ফারহানের রুমে ছিলে। কেন?’

কোন জবাব নেই শান্তর মুখে।

কিছুক্ষণ নীরবতা, তারপর হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন কেয়ারটেকার মি. জলিল। ‘কেন, শান্ত?’

এরকম জাঁদরেল লোক দেখিনি জীবনেও। বড় একটা ভুঁড়ি নিয়ে সব সময় ছাত্রদের শাস্তি দেয়ার অপেক্ষায় থাকেন।

না জানি আজ কপালে কী আছে!

‘বাঁদরামির জায়গা পাস না? বল কীভাবে ভেঙেছিস জানালার কাঁচ? ….আর এই যে, অপু সাহেব, আপনি তো পালের গোদা! বলেন তো কে ভেঙেছেন আর কীভাবে ভেঙেছেন সব জানালার কাঁচ?’

‘আমি তো কিছুই জানি না, স্যর!’ বললেন অপু ভাই। ‘জানালার কাঁচও যে ভাঙা, তাও তো জানি না!’

‘তাই নাকি?’ খ্যাক-খ্যাক করে হেসে উঠলেন কেয়ারটেকার।

আসলেই জানেন না অপু ভাই। তখন হুঁশ ছিল না তাঁর।

তাই বলে উঠলাম আমি, ‘স্যর, কাল রাতের ঝড়ে এসব ভেঙেছে।’

‘কালকের রাতের ঝড়ে ভেঙে গেছে?’ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন জলিল স্যর। ‘আমার সাথে মস্করা করিস?’

‘না, স্যর,’ জোর দিয়ে বললাম। ‘কাল রাতের ঝড়ে ভেঙে গেছে জানালার কাঁচ। আমি আর দেখিনি এরকম ঝড়, স্যর…

‘ঝড়-না? আমার সাথে মিথ্যা কথা!’ চেঁচিয়ে উঠলেন জলিল স্যর। ‘তোদের ঝড় আজ আমি বের করছি। তোদের সবগুলোর বাবাকে চিঠি দিচ্ছি!’

‘না, স্যর, করুণ মুখে বলে উঠলেন অপু ভাই।

তখনই বলে উঠল শান্ত, ‘স্যর, আমি ভেঙেছি।’

হাসি ফুটল জলিল স্যরের মুখে। ‘যাক, পাইলাম! অ্যাই, যা বাকিগুলা! শান্ত থাক!’

চিন্তা নিয়ে ফিরে এলাম রুমে। স্যরের কথা থেকে বুঝেছি, কোন ঝড় হয়নি কালকে রাতে।

তা হলে কী হয়েছিল?

সবই কি ওই শয়তানটার মায়া?

কখন আসবেন ছোট চাচা?

কখন কিনারা হবে এই রহস্যের?

এসব ভাবতে-ভাবতেই রুমে ফিরল শান্ত। দেখেই বুঝলাম ওকে পিটিয়েছেন ওই শয়তান স্যর।

কত্ত বড় হারামী!

কিন্তু সেদিকে যেন খেয়ালই নেই শান্তর। বলল, ‘ব্যাপারটা কী হলো, ফারহান? কিছুই তো বুঝলাম না!’

‘তুই তোর কাঁধে দোষ নিতে গেলি কেন?’ বললাম।

‘নইলে ওই ইবলিসটা অপু ভাইয়ের নামে নালিশ করত অধ্যক্ষের কাছে।’

ঠিকই বলেছে শান্ত, সায় দিলাম।

কিন্তু এসবের কিছুই জানতে চাইলেন না অপু ভাই। শুধু বললেন, ‘শান্ত,

মার কখনও এই রুমে আসবে না, যাও।’

বেশ অবাকই হলাম শান্ত আর আমি।

কথা না বাড়িয়ে উঠে চলে গেল শান্ত।

এখন অপেক্ষা ছোট চাচার আসার।

কিন্তু তিনি যেন আসবেনই না।

তখন রাত দশটা বাজে। আমি পড়ছিলাম। বেডে শুয়ে কী জানি পড়ছিলেন অপু ভাইও। এমন সময় এল শান্ত। দরজা থেকেই বলল, ‘একটু বাইরে আয় তো, ফারহান।

তাকালাম অপু ভাইয়ের দিকে। তাঁর চেহারা ভাবলেশহীন।

রুম থেকে বেরোলাম।

‘আমার রুমে চল, ছোট চাচা এসেছেন,’ বলল শান্ত।

ওর রুমে এলাম। ওর রুমমেট ছুটিতে। তাই একাই থাকে ও।

রুমে ঢুকে ধাক্কা খেলাম ছোট চাচাকে দেখেই। ফিটফাট মানুষটার এ কী হাল! যেন বের হয়ে আসছে চোখদুটো। হাতে ব্যাণ্ডেজ।

‘আপনার এই অবস্থা কেন, ছোট চাচা?’ জানতে চাইলাম।

‘সেটা পরে শুনো,’ বললেন ছোট চাচা। ‘আগে বলো দেখি গতরাতে এখানে কী হয়েছে? শান্তর কাছ থেকে শুনেছি একবার। এবার তোমার কাছ থেকে শুনি।’

তাঁকে গতরাতের কাহিনী এক নাগাড়ে বলে গেলাম।

চুপ করে শুনলেন ছোট চাচা, তারপর বললেন, ‘যাক, তা হলে কাজে লেগেছে আমার মন্ত্র।

‘কিন্তু আপনার এই হাল হলো কী করে?’ জানতে চাইলাম।

‘দাঁড়াও, বলছি,’ শুরু করলেন ছোট চাচা। ‘তোমাদের রুম থেকে বেরোবার আগে অপুর গ্রামের ঠিকানা জেনে নিয়েছিলাম। আর তোমাদের রুমে অনেক দোয়া পড়ে, তাবিজ লাগিয়ে পবিত্র পানি ছিটিয়ে দিয়েছিলাম। এই কারণেই ঢুকতে পারেনি শয়তানটা। এরপর সোজা যাই অপুর গ্রামে। সকালে পৌঁছেই গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারি, অপুর জন্মের পর পাগল হয়ে এক বছর পরে মারা যায় অপুর মা। অপু বড় হয়েছে ওর নানির কাছে। আরেকটা জার্নি করে যাই অপুর নানি-বাড়িতে। সেই বাড়িতে এখন কেউ থাকে না। আশপাশের লোকজন দেখলাম, কিছুই বলতে চায় না ওই বাড়ি সম্পর্কে। শেষে টাকা দিয়ে মুখ খোলালাম একজনের। তার কাছ থেকে জানলাম অনেক অদ্ভুত ব্যাপার। অপুর জন্মের পর ওর মায়ের ওপর নাকি ভর করেছিল শয়তান। জীবিত পোকা-মাকড় খেতে শুরু করে সে। গভীর রাতে বসে থাকত গাছে উঠে। এভাবে পেরিয়ে গেল এক বছর, তারপর একদিন সকালে রক্তবমি করে মারা যায় অপুর মা। এরপরেই মারা যেতে থাকল গ্রামের বিড়াল-কুকুর। অবশ্য কিছু দিন পর তা থামল। এর চার বছর পর মারা গেল অপুর নানি। অপুর বাবা এসে নিয়ে গেল অপুকে। পড়ে রইল খালি ঘরদোর। এক দিন গ্রামবাসীর প্রয়োজনে অপুর নানি- বাড়ির পিছনের জায়গায় খোঁড়া হলো পুকুর। আর তখন মাটির তলা থেকে বেরিয়ে এল অনেক কঙ্কাল। সব বিড়াল-কুকুরের। এরপর আর কেউ যেত না ওই পরিত্যক্ত বাড়িটায়।

এরপর পুরো ঘটনা অনুমান করতে কষ্ট হলো না আমার। অপুর নানি ছিল শয়তানের পূজারী!’ রুমে যেন বোমা ফাটালেন ছোট চাচা।

আমরা একদম চুপ।

‘হ্যাঁ, তবে ঠিক শয়তান নয়, ওটা এক পিশাচ। নাম ‘আযাখ’। এই আযাখের কোন শরীর নেই। শুধু একটা আত্মা, তবে ক্ষমতা এর অনেক। এরই পূজা করত অপুর নানি, ক্ষমতার আশায়। আমি বুঝলাম অপুর নানির ঘরে ঢুকে। সেখানে আযাখের পূজার অনেক চিহ্ন। যাই হোক, সেখানে আরেকটা জিনিস থেকে বুঝলাম, অপুর মাকে খুন করেছে অপুর নানিই।’

অস্ফুট শব্দ করে উঠল শান্ত।

‘মা কেন মেয়েকে খুন করবে?’ জানতে চাইলাম।

‘করেছে ক্ষমতার জন্য,’ বললেন ছোট চাচা। ‘সবই করতে পারে মানুষ ক্ষমতার জন্য। এ তো আশপাশেই দেখতে পাই আমরা। অপুর নানি পিশাচকে তার ছেলে সন্তান উৎসর্গ করবে বলেছিল, যাতে আযাখ ওই দেহ নিয়ে আসতে পারে পৃথিবীতে। কিন্তু তার একটি সন্তানই হয়েছিল, আর সে ছিল মেয়ে। এতে বন্ধ হয়ে যায় পিশাচটির আসার রাস্তা। ফলে সে চলে যায়। যাওয়ার আগে বলে যায়, আবারও আসবে সে। অপুর নানি তার সাধনা চালিয়ে যায়। এক সময় তার মেয়ে বড় হয়, তার বিয়ে দেয়া হয় এবং তার পেটে সন্তান আসে। তখন সেই আযাখ আবারও হাজির হয়। সে তার শরীর চায়। অপুর নানি ক্ষমতার বিনিময়ে রাজি হয় নাতী উৎসর্গ করতে। এসব কিছুই জানত না অপুর মা। অপু জন্ম নেয় এবং তার স্বপ্ন পূরণের অর্ধেক পথ এগিয়ে যায় আযাখ। পিশাচটার সাহায্যে অপুর মাকে সবার সামনে পাগল বানিয়ে এবং জিনে ধরেছে এই দোহাই দিয়ে খুন করে অপুর নানি। এরপর রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যায় তার। পুরো দমে উপাসনা শুরু করে আযাখের। উৎসর্গের রীতি মেনে আরও অনেক প্রাণ উৎসর্গ করা প্রয়োজন। যেই কারণে মারা পড়তে থাকে বিড়াল-কুকুর। অপুকে আযাখের কাছে উৎসর্গ করে অপুর নানি, আর তাকে আযাখ দেয় অনেক ক্ষমতা। কিন্তু এই ক্ষেত্রে একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। অপুর বিশ বছর হওয়ার আগে আযাখ প্রবেশ করতে পারবে না অপুর দেহে। বিশ বছর হওয়ার পর প্রথম অমাবস্যায় অপুর দেহ দখল করবে আযাখ। আর আজই সেই অমাবস্যা।’

‘বলেন কী, চাচা?’ চমকে গেলাম। ‘সর্বনাশ! তা হলে আমরা কী করব?’

‘দেখা যাক কী করতে পারি। তবে ওই আযাখ তার শরীর পাবে না।’

‘আচ্ছা, ছোট চাচা,’ বলল শান্ত। ‘কী হলো অপু ভাইয়ের নানির?’

‘আমার ধারণা আযাখই মেরে ফেলে তাকে। তার সমকক্ষ কাউকে পৃথিবীতে রাখতে চায়নি পিশাচটা।

‘হুম, লোভই তার ধ্বংস আনল,’ বলল শান্ত।

‘ফারহান, তুমি এখন রুমে যাও। খেয়াল রেখো অপুর দিকে। আশা করি বারোটার আগেই ঘুমিয়ে পড়বে সে।’ শার্টের পকেট থেকে এক পাতা ট্যাবলেট বের করে আমার হাতে দিলেন তিনি। ‘এই ট্যাবলেট পানির সঙ্গে গুলিয়ে খাইয়ে দেবে। আমরা বারোটার আগেই আসব।’

দুরুদুরু বুকে ফিরলাম রুমে। রুমে নেই অপু ভাই। সহায় হলো ভাগ্য। অপু ভাইয়ের পানির বোতলে ট্যাবলেট ফেলে কয়েকটা ঝাঁকুনি দিয়ে দেখলাম, মিলিয়ে গেছে বড়ি।

তখনই রুমে এলেন অপু ভাই। ‘তুমি আমার বোতল নিয়ে কী করছ, ফারহান?’ জানতে চাইলেন তিনি।

‘কিছুই না, অপু ভাই। একটু পানি খেলাম।’

‘ও, দাও, বোতলটা দাও।

বোতল ফেরত দিতেই কয়েক ঢোক পানি খেলেন অপু ভাই।

খুশিতে ভরে উঠল আমার মন। যাক, আমার কাজ আমি করেছি। এখন ঘুমানোর পালা অপু ভাইয়ের। এমন সময় চলে গেল ইলেক্ট্রিসিটি। রুমের সামনে চিৎকার করতে শুনলাম দপ্তরীকে, ঝড় আসার সম্ভাবনা আছে। আজ রাতে আর চান্স নেই ইলেক্ট্রিসিটি আসার।

‘তা হলে আর জেগে থেকে কী হবে,’ বলেই হাই তুললেন অপু ভাই। শুয়ে পড়লেন নিজের বিছানায় গিয়ে।

এত ভাগ্যবান আমি!

কিছুক্ষণ পর অপু ভাইয়ের শ্বাস নেয়ার শব্দ শুনে বুঝলাম, ঘুমিয়ে গেছেন উনি। কী ওষুধ দিলেন চাচা যে এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলেন! এখন বাজে সাড়ে এগারোটা।

পেরিয়ে গেল বেশ কিছুক্ষণ।

তারপর দরজায় টোকা দিল শান্ত। নিচু স্বরে বলল, ‘ঘুমিয়ে গেছে?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’

দরজা খুলে দিতেই ঘরে ঢুকলেন ছোট চাচা ও শান্ত।

ভাল করে দরজা আটকে দিলেন ছোট চাচা। তাঁর ব্যাগটা রাখলেন আমার খাটে।

‘এবার কী, ছোট চাচা?’ বললাম।

‘তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে না আমার এই অবস্থা কেন?’ বললেন ছোট চাচা। আমি মাথা নাড়লাম।

‘অপুর নানির ঘরে ঢুকে মনে হয়েছিল ওই ঘরেই হয়তো উৎসর্গ করা হয়েছে অপুকে। তাই ওখানে কিছু না থেকেই যায় না। ছিটাতে লাগলাম দোয়া পড়া পানি। হঠাৎ এক জায়গায় দেখলাম ধোঁয়া উঠছে। সেই জায়গাটা খুঁড়ে দেখলাম একটা কৌটায় সামান্য রক্ত ও সুতায় বাঁধা এক গাছি চুল। বুঝতে বাকি রইল না সেগুলো অপুর। সেগুলো ধরতে গেলেই কে যেন আমার পেটে প্রচণ্ড ঘুষি মারল। প্রায় উড়ে গিয়ে পড়লাম দূরে। তখনই বুঝতে পারি হাজির হয়েছে আযাখ। ওর সম্পত্তিতে হাত দিতে গেছি বলে রেগে গিয়েছে। তখন ওই জায়গা লক্ষ্য করে ছিটিয়ে দিই দোয়া পড়া পানি। সাথে-সাথে কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয় আযাখের চিৎকারে। এরপর আবারও যাই ওই চুল আর রক্তের গর্তের কাছে। কিছু প্রাচীন গোপন মন্ত্র আর দোয়া পড়ে লাগিয়ে দিই ওই গর্তে আগুন। সাথে- সাথে পুরো রুমটা ভরে যায় মাংস পোড়া গন্ধে। তখন বেরিয়ে চলে আসি।’

‘তা হলে তো ওই পিশাচটা মারাই গিয়েছে,’ বলল শান্ত।

মাথা নাড়লেন ছোট চাচা। ‘না রে। এত সোজা হলে তো কথাই ছিল না। আযাখ আবার আসবে। এত সহজে ছেড়ে দেবে না। এতগুলো বছর অপুকে পাহারা দিয়ে রেখেছে এত সহজে ছেড়ে দেয়ার জন্য নয়।’

‘আচ্ছা, চাচা, আপনি বললেন গোপন মন্ত্র পড়লেন, আবার দোয়াও পড়লেন। কেমন দু’মুখো হয়ে গেল না ব্যাপারটা?’ জানতে চাইলাম।

‘তুমি তো দেখি দারুণ ধর্ম সচেতন!’ বললেন চাচা।

এই কথায় কেমন যেন লজ্জা পেলাম।

‘না, দুই মুখো হয়নি,’ বললেন ছোট চাচা। ‘এসব অতিপ্রাকৃত জিনিস বহু আগে থেকেই চলে আসছে। সব ধর্মেই একই। আর জানো তো সব ধর্মের উৎপত্তি কিন্তু একই জায়গা থেকে। যাক, এসব পরে বলব। এখন আমার কিছু কাজ বাকি আছে।’

প্রথমেই জানালাগুলো বন্ধ করে দিলেন ছোট চাচা। এরপর সেখানে সুতো দিয়ে কী সব ঝুলিয়ে দিলেন। ভালমত দেখা যাচ্ছে না। এমনিতেই ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তার উপর বাইরে ঘন অন্ধকার। হঠাৎ পানির ছিটা লাগল গায়ে। সেই সাথে কেমন গুনগুন শব্দ। বুঝলাম ছোট চাচা। অনেকক্ষণ ধরে পুরো রুমে পায়চারী করলেন। নাকে লাগল রসুনের গন্ধ। সেই সাথে ধুপ পোড়ানোর গন্ধ।

আজ যে কীভাবে এই রুমে টিকব! শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেই সাথে উত্তেজনা।

কী ব্যাপার, অনেকক্ষণ ধরে শান্তর সাড়াশব্দ নেই।

বেডের দিকে এগোলাম। গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে শান্ত।

‘কী রে, কী হয়েছে?’ বলেই ওর পাশে বসে গায়ে হাত দিলাম যেন পুড়ে যাচ্ছে ওর শরীর!

‘চাচা, শান্তর জ্বর!’ জোরে বললাম।

তাড়াতাড়ি করে এগিয়ে এলেন ছোট চাচা। ‘দেখি…হুম, এসে গেছে আযাখ। শুরু হয়েছে অমাবস্যা।’

‘কিন্তু শান্তর জ্বর এল কেন?’ জানতে চাইলাম।

‘আযাখ রুমে ঢুকতে না পেরে বাইরে থেকে ওর শক্তি প্রয়োগ করে শোধ নিতে চাইছে। ওই শয়তানটাকে কোনভাবে আযান পর্যন্ত আটকে রাখতে পারলেই হবে। এরপর আর কিছু করতে পারবে না। ওর শরীরের অধিকার ফিরে পাবে অপু।

তখনই বিকট আওয়াজ তুলে বাজ পড়ল। শুরু হয়েছে প্রচণ্ড ঝড়। উন্মাদ হাওয়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে: শোঁও-শোও! প্রচণ্ড শব্দে দুলছে গাছপালা।

শুনতে পেলাম ছোট চাচার চিন্তিত কণ্ঠ, ‘হঠাৎ এরকম ঝড় ভাল লক্ষণ নয়!’ বাজ পড়ল আবারও। যেন ভেঙে পড়বে পুরানো বিল্ডিং। তখনই শান্তর দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলাম। কেমন মোচড়াতে লাগল শান্তর শরীর। কাপড়ের পানি ঝরিয়ে দেয়ার জন্য কেউ কাপড় মোচড়ালে যেমন হয়, ঠিক সেভাবে মুচড়ে যাচ্ছে ও।

ছোট চাচাও দেখেছেন। মুখে সেই ভৌতিক গুনগুন শব্দ।

ফট-ফট…

‘এটা কি হাড্ডির শব্দ? চাচা, শান্তর কী হচ্ছে?’

কোন কথা বললেন না ছোট চাচা। বেড়ে গেল তাঁর উচ্চারিত সেই ভৌতিক শব্দ। সেই সাথে বড়-বড় শ্বাস নেয়ার শব্দ শুনলাম।

তাঁর কি কষ্ট হচ্ছে?

বাজ পড়ল আবারও।

না-আ-আ-আ-আ! অপু ভাইয়ের পিছনে ওটা কার মুখ দেখলাম?

এরকম ভয়ানক মুখের বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়!

লাল চামড়া, চোখের জায়গায় আগুন… উফ্…এটা দুঃস্বপ্ন!

আমি কখন লাফ দিয়ে ছোট চাচার কাছে চলে এসেছি, নিজেও জানি না।

‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলেন ছোট চাচা।

‘আমি বলতে পারব না,’ কেঁদে দিলাম। সাথে-সাথে মনে পড়ল শান্তর কথা। গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, চুপচাপ শুয়ে আছে ও। এখন নেই গায়ের সেই তাপ।

‘এই আযাখ অনেক শক্তিশালী, ফারহান,’ বললেন ছোট চাচা। একে হারাতে পারব কি না জানি না, তবে আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব। শুধু ভয় পাবে না। ফারহান, তুমি শান্তর কাছে থাকো। ভয় করবে না, রুমের ভিতর ঢুকে গেছে আযাখ। এবার আমাকে নামতে হবে যুদ্ধে!’

কান ফেটে যাবে মনে হলো বিকট হাসির শব্দে। ঘন-ঘন বাজ পড়ছে। আর সেই আলোয় দেখলাম হাওয়ায় ভাসছেন অপু ভাই। চোখগুলো তাঁর লাল।

‘আমার সাথে যুদ্ধ করবি?’ বিশ্রী গলায় হাসলেন অপু ভাই। ‘আজই আমার জন্ম হবে এবং এই ছেলেটার শরীরেই। আটকাতে পারবি না কেউ।’

কোন্ দূর থেকে শুনতে পেলাম অপু ভাইয়ের গলা: ‘ফারহান, আমাকে বাঁচাও!’

অদ্ভুত কোন ভাষায় জোরে-জোরে কিছু বলে উঠলেন ছোট চাচা। আর সাথে- সাথে নিচে পড়ে গেলেন অপু ভাই। হঠাৎ বাতাস বেড়ে গেল রুমের ভিতর, তৈরি হলো ঘূর্ণি। চিৎকার শুনলাম ছোট চাচার: ‘ফারহান, অপুকে টেনে নিয়ে শান্তর সাথে রাখো তুমি!’

কথা না বাড়িয়ে টেনে আনলাম অপু ভাইকে। বাতাসে উড়ছে রুমের চেয়ার- টেবিল। ফ্লোরে লেগে আছে শুধু খাট। দেখলাম অদৃশ্য কারও সাথে হাতাহাতি করছেন ছোট চাচা। মনে হচ্ছে তাঁর গলা টিপে ধরেছে কেউ। ছোট চাচাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাতাসের আরেকটা ঘূর্ণি। হঠাৎ ছিটকে পড়লেন ছোট চাচা। হাঁপানোর শব্দ শুনলাম তাঁর 1

‘ছোট চাচা!’ ভয়ে ভয়ে ডাকলাম। মনে হচ্ছে গলার শব্দ শুনলেই চলে আসবে পিশাচটা।

‘ভয় পেয়ো না,’ শুনলাম ছোট চাচার ক্লান্ত গলা। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই।’

তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই মনে হলো কে যেন টানছে অপু ভাইকে। আমি তাঁকে জাপটে ধরলাম। ‘ছোট চাচা! নিয়ে যাচ্ছে অপু ভাইকে!’

ছোট চাচা লাফ দিয়ে ধরলেন অপু ভাইকে। অনেকক্ষণ টানাটানি চলল তাঁকে নিয়ে। সাথে-সাথে সেই গুনগুন করা মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন ছোট চাচা। সেই শব্দ বেশিক্ষণ সইতে পারল না পিশাচটা, ছেড়ে দিল অপু ভাইকে। আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল রুমের ঝোড়ো বাতাস।

হুটোপুটির শব্দ শুনে খেয়াল হলো, নিশ্চয়ই আবারও ছোট চাচাকে ধরেছে পিশাচটা! এভাবে কতক্ষণ চলল, জানি না। কে যেন আছড়ে পড়ল বেডের উপর।

ছোট চাচা…তাঁর গোঙানি শুনলাম: ‘আমি পারলাম না রে…’

বন্ধ হয়ে গেল তাঁর কথা। আর শরীরে টান পড়ল অপু ভাইয়ের। তখনই হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল আমার ভিতর। যেদিক থেকে টানছে অপু ভাইকে, লাফ দিলাম সেদিকে। আর বাড়ি খেলাম শক্ত কোন কিছুর সাথে। ফ্লোরে গিয়ে পড়লাম পিশাচটার এক ধাক্কায়। ঘুরতে লাগল আমার মাথা। মনে হচ্ছে জ্ঞান হারাব। তখনই সাদা আলোয় ভরে গেল পুরো রুম।

শুনলাম এক মধুর ডাক: ‘বাবা অপু, আমি চলে এসেছি, তোর আর কোন ভয় নেই।’

তখনই আমার মাথা ফেটে যেতে চাইল যেন এক ভয়াবহ চিৎকারে বুঝলাম, এবার ব্রেইন-স্ট্রোক করে মরব। আর তখনই শুনলাম আরেকবার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুর-আযান।

নিশ্চিন্তে জ্ঞান হারালাম।

.

সচেতনতা ফিরতেই দেখলাম মাথার কাছে মা। তাঁর মুখ দেখে নিজেকে খুব নিরাপদ মনে হয়েছিল। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

আজ কলেজ পেরিয়ে পড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলেজের হোস্টেলের ওই ঘটনার পর আমাকে আর হলে থাকতে দেয়া হয়নি। ভাড়া নেয়া হয়েছিল কলেজের কাছে বাসা। এর এক মাস পর কলেজে যাই। গিয়ে খুঁজে পাইনি অপু ভাইকে। সেই সকালেই নাকি কলেজ ও হল ছেড়ে চলে যান তিনি। আর শান্ত, আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধুটা চলে গিয়েছে শহর ছেড়ে। ওর সাথে দেখা করতে দেননি আমাকে ওর বাবা-মা।

কেন, তা আজও বুঝিনি।

.

সাঈদ শিহাব