আত্মা – রিয়াজুল আলম শাওন
আত্মা
এক
হঠাৎ ঘুম ভেঙে রুমি দেখল টিউলিপ পাশে নেই। বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল তার। বিয়ের পর ছোটখাট ব্যাপারেই তার বুক কাঁপে। সব ছেলেরই কি এমন হয়, নাকি রুমি একটু বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছে? বাথরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে। রুমি নিশ্চিন্ত বোধ করল, টিউলিপ বাথরুমে। পানি পতনের একটানা শব্দ, মনে হচ্ছে শাওয়ার চলছে। তা হলে কি টিউলিপ গোসল করছে?
রাত দুটোর একটু বেশি। বেশ কড়া শীত পড়েছে। এত রাতে গোসল করা অস্বাভাবিক ব্যাপার। বিশ মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পরেও বাথরুম থেকে বেরোল না টিউলিপ। আবারও চিন্তায় পড়ে গেল রুমি। নতুন বউকে নিয়ে নানা বাজে চিন্তা মাথায় আসে। মাথা ঘুরে পড়ে যায়নি তো? বা খারাপ কিছু…
দ্রুত উঠে দাঁড়াল রুমি। বাথরুমের দরজায় নক করতে শুরু করে বলল, ‘টিউলিপ…’
কেউ সাড়া দিল না।
এবার জোরে বলল, ‘টিউলিপ! টিউলিপ?’
এবারও কেউ সাড়া দিল না।
রুমি দরজায় ধাক্কা দিল। ছিটকিনি নেই, দড়াম করে খুলে গেল কবাট। কিন্তু বাথরুমে কেউ নেই। শাওয়ার চলছে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল রুমি।
ডাইনিং রুম, ড্রইং রুম কোথাও নেই টিউলিপ 1
মায়ের রুমের সামনে দাঁড়াল রুমি। দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘আম্মা! আম্মা?’
দু’বার ডাকার পর দরজা খুলে দিলেন আমেনা জাহান, যেন রুমির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।
রুমি কাঁপা গলায় বলল, ‘আম্মা, টিউলিপকে কোথাও পাচ্ছি না।’
‘টিউলিপ আমার ঘরে।’
‘আপনার ঘরে?’
‘হ্যাঁ। একটু দরকার ছিল। ও এখন ঘুমাচ্ছে।’
ভয়ে ছাইয়ের মত ধূসর হয়ে গেল রুমির মুখ।
‘বউকে নিয়ে এত ভাবতে হবে না। তোর ঘরের বাথরুমে ঝর্না চলছে, বন্ধ
করে দিস,’ বললেন আমেনা জাহান।
রুমি একবার ভাবল, জিজ্ঞেস করবে, ‘আমার বাথরুমের খবর আপনি কীভাবে জানলেন?’ প্রশ্নটা দমন করল সে।
আমেনা জাহান ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘আজ রাতের কথা কি তুই সব ভুলে গেছিস?’
রুমির মনে পড়ল আজ বৃহস্পতিবার, দিবাগত রাত। মা আগেই বলেছিল এই রাতে যেন তাকে বিরক্ত না করা হয়।
আমেনা জাহান আবার বললেন, ‘যা, নিজের ঘরে যা।’
‘কিন্তু, আম্মা, টিউলিপ?’
‘তুই আমার অনুমতি ছাড়াই টিউলিপকে বিয়ে করেছিস। এই মেয়েকে চিনি না, জানি না। তবে আজ জানতে চেষ্টা করব, তোর বউ সতী কি না। তার গোপন কোন ইতিহাস আছে কি না।’
‘আম্মা, এসব কী বলছেন? আপনি টিউলিপকে কী করেছেন? ওকে কষ্ট দেবেন না।
‘বেশি ভালবাসা দেখাবি না, রুমি। তা হলে কিন্তু সব হারাবি। যা ঘুমিয়ে পড়।’
রুমি হাতজোড় করে বলল, ‘প্লিজ, আম্মা, ওর কোন ক্ষতি করবেন না।’ এমন সময় ভিতর থেকে মহিলা কণ্ঠ এল, ‘আমেনা, কই গেলি? কতক্ষণ একা বসে থাকব?’ কথাটা শুনে দ্রুত ঘরে ঢুকলেন আমেনা জাহান
বেশ কিছুক্ষণ মায়ের ঘরের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল রুমি। ঘরের ভিতর থেকে আসছে চাপা হাসির শব্দ। এই হাসি রুমির অনেক দিনের চেনা, তবু বারবার বুকটা কেঁপে উঠছে তার।
পরদিন সকালে রুমি ঘুম ভেঙে দেখল, টিউলিপ বিছানায় বসে আছে। ধড়মড় করে উঠে বসল রুমি। ‘টিউলিপ, তুমি ঠিক আছ তো?’
‘হ্যাঁ, ঠিক আছি।’
‘গতকাল কি আম্মা তোমাকে নিজের রুমে নিয়ে গিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ। রাতে উনি আমাদের রুমের দরজায় ধাক্কা দেন। তুমি তখন গভীর ঘুমে। উঠে দরজা খুলে দিলাম। আম্মা বললেন তাঁর রুমে যেতে। গেলাম। এরপর…’
‘এরপর কী?’
আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠল টিউলিপের চেহারায়। ‘উনি আমাকে খুব খারাপভাবে জিজ্ঞেস করেন, আমি ভাল মেয়ে না খারাপ মেয়ে। বললাম, ‘মা, এসব কী বলছেন? আমি সারাজীবন সৎ থাকার চেষ্টা করেছি।’
‘তখন তিনি বললেন, ‘আমি জানতে চাই তোমার জীবনে রুমিই প্রথম পুরুষ কি না!’
‘হ্যাঁ, আম্মা।’
‘আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না। আজকে তোমাকে পরীক্ষা করবে একজন, তারপর জানব তুমি সত্যি না মিথ্যা বলছ।’
‘আমি তখন বললাম, ‘আম্মা, পাগলের মত কী বলছেন? কে পরীক্ষা করবে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘তোমার বুঝতে হবে না।’ ঘরের মধ্যে অন্য কেউ বলল।
‘আমি চমকে উঠে বললাম, ‘কে! কে?’
‘আমি বুবু, তোর সতীন। হি-হি।’ বয়স্কা মহিলার কণ্ঠস্বর। বাজেভাবে হেসে উঠেছিলেন তিনি
‘আমি তোমাকে ডাকতে চাইলাম, তখন কেউ একজন রুমাল দিয়ে চেপে ধরল আমার মুখ। ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। সকালে ঘুম ভেঙে দেখি আমার পোশাক এলোমেলো। মনে হয়েছে, কেউ যেন আমার কাপড় খুলে, আবারও পরিয়ে দিয়েছে।’
কেঁদে ফেলল টিউলিপ।
ওর মাথায় হাত রাখল রুমি 1
টিউলিপ কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তোমার মা কি পাগল?’
‘না, টিউলিপ। আমার মা একটু অন্যরকম। আসলে….’
‘আমরা ঢাকা চলে যাব। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকব না।’
‘ঠিক আছে।’
‘আমি ব্যাগ গুছাচ্ছি।’
‘আচ্ছা।’
টিউলিপ ব্যাগ গোছাতে লাগল।
অন্যদিকে তাকিয়ে রুমি বলল, ‘আম্মা না চাইলে আমরা এ বাসা থেকে যেতে পারব না টিউলিপ।’
‘মানে?’
‘আম্মার কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে।’
‘আমি এসব বিশ্বাস করি না। তুমি তৈরি হয়ে নাও।’
‘ঠিক আছে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুমি।
কিছুক্ষণ পর রেডি হয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেল রুমি। ‘আম্মা, পরশু থেকে অফিস। আমরা আজ চলে যাচ্ছি।’
‘আমরা মানে? তোর না বউমাকে কিছু দিন এখানে রেখে যাওয়ার কথা? নতুন বউ এনেছিস, এখনও ভালভাবে কথা বলার সুযোগও হয়নি।’
‘না, মানে, টিউলিপ যেতে চাইছে।’
‘ও, আচ্ছা। তা হলে যা।’
এত সহজে মা রাজি হবেন, ভাবেনি রুমি। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ঢাকায় গিয়ে টিউলিপকে সব বুঝিয়ে বলতে হবে। তারা যখন বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত, তখন ডাইনিং রুমে কিছু একটা পড়ার তীব্র শব্দ হলো। রুমি, টিউলিপ দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখল, মাটিতে পড়ে আছেন আমেনা জাহান। মনে হচ্ছে, জ্ঞান নেই।
.
আমেনা জাহানকে দেখতে এসেছেন ডাক্তার। রোগিণীর জ্ঞান ফিরেছে। আমেনা একটু পর পর কোমরের ব্যথায় গুঙিয়ে উঠছেন।
রুমিকে বাইরে এনে বললেন ডাক্তার, ‘কোমরে এবং মেরুদণ্ডে ব্যথা পেয়েছেন আপনার মা। কিছুদিন তাঁর চলাফেরায় খুব কষ্ট হবে। ওষুধ দিচ্ছি, ব্যথা কমলে ঢাকায় নিয়ে বড় ডাক্তার দেখাবেন। আগামী কিছু দিন খুব যত্নে রাখতে হবে তাঁকে।’
‘জী, আচ্ছা,’ শুকনো মুখে বলল রুমি।
‘নিয়মিত বিরতিতে কয়েকদিন গরম সেক দেবেন,’ যোগ করলেন ডাক্তার।
‘আচ্ছা।’
মুখ কালো করে আমেনা জাহানের পাশে বসে আছে টিউলিপ।
অস্পষ্ট গলায় বললেন আমেনা জাহান, ‘রুমি, তোরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না, রহিমার মা আছে দেখাশোনার জন্য। তোরা ঢাকায় চলে যা।’
‘না, আম্মা, এই অবস্থায় আপনাকে রেখে কোনভাবেই ঢাকা যাওয়া চলে না।’
‘কিন্তু তোর চাকরি? এমনিতেই তো অনেকদিন ছুটি নিয়েছিস।’
‘কাল পর্যন্ত ছুটি আছে। আমাকে তো যেতেই হবে। টিউলিপ কিছু দিন এখানে থাকুক। আমি পরের সপ্তাহে নিয়ে যাব।’
চোখ তুলে রুমির দিকে তাকাল টিউলিপ।
আমেনা জাহান বললেন, ‘ঠিক আছে, বউমা, একটু গরম সেকের ব্যবস্থা করো।’
উঠে দাঁড়াল টিউলিপ। কেন জানি কান্না পাচ্ছে ওর। এই মহিলাকে একদম পছন্দ হয়নি। কিন্তু এমন অসুস্থ অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে যাওয়াও সম্ভব নয়।
.
দুই
অনেকক্ষণ ধরে আনোয়ারকে অনুসরণ করছে কেউ একজন। প্রথমে বিষয়টা বুঝতে পারেনি আনোয়ার। কিন্তু বাস থেকে ফার্মগেটে নেমে বিষয়টা নিশ্চিত হয়েছে। ওর পিছনে আসছে এক লোক।
রাস্তার পাশে দাঁড়াল আনোয়ার।
লোকটাও দাঁড়াল। বোঝা গেল না তার উদ্দেশ্য। ছিনতাই বা অন্য কোন মতলব থাকতে পারে। তবে সে ভুল লোকের পিছনে ঘুরছে।
আনোয়ার নিজেও সহজ পাত্র নয়। লোকটা তেড়িবেড়ি করলে একটা রক্তারক্তি কাণ্ডও ঘটে যেতে পারে।
হঠাৎ দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল আনোয়ার। লোকটাও পিছু নিল।
আনোয়ার ইচ্ছা করেই ঢুকল একটা সরু গলিতে।
লোকটাও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অনুসরণ করল।
গলির মাঝে গিয়ে আবার ফিরতি পথে পা বাড়াল আনোয়ার।
এজন্য প্রস্তুত ছিল না লোকটা। আনোয়ারকে সামনে দেখে হকচকিয়ে গেল।
মুখোমুখি হয়ে আনোয়ার বলল, ‘আপনি অনেকক্ষণ ধরে পিছনে ঘুরছেন। সম্ভবত বাস থেকেই ফলো করছেন। ছিনতাই করার ইচ্ছা থাকলে সরাসরি বলুন। আপনার সুবিধার জন্যই এ গলিতে এসেছি। কী করতে চান করুন।
আনোয়ারের কথা শুনে কেমন করুণ হয়ে গেল লোকটার মুখ।
তাকে ভাল করে লক্ষ্য করল আনোয়ার।
এই লোকের বয়স হবে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। সুপুরুষ। পোশাক- আশাকে বেশ সচেতন। চোখে দামি ফ্রেমের চশমা। পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। শার্টটা কোন দামি ব্র্যাণ্ডের। চেহারাটা অতিরিক্ত ভদ্র, কোন কুমতলব আছে বলে মনে হয় না। তবে কারও ভালমানুষী চেহারা দেখে তাকে বিচার করা চরম বোকামি, জানে আনোয়ার। ও আবারও বলল, ‘বলুন, আমার কাছে কী চান।’
লোকটার চোখে-মুখে বিষাদের ছায়া। মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে সে বলল, ‘আমি রুমি আমিন। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’
‘আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য পিছনে-পিছনে ঘুরছেন? বলুন তো আপনার মতলবটা কী?’ ঝাঁঝ নিয়ে বলল আনোয়ার।
‘আসলে আমার কোন খারাপ মতলব নেই,’ অপরাধীর মত গলা করে বলল রুমি আমিন। ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে এক ধরনের সঙ্কোচ বোধ করি। তাই অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে ফলো করছিলাম। প্লিজ, কিছু মনে করবেন না।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু আমার সঙ্গে কী দরকার?’
‘আমি একটা বিষয়ে আপনার সাহায্য চাই।’
‘কী সাহায্য?’
‘আপনি কি কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসবেন?’
কয়েক মুহূর্ত ভাবল আনোয়ার। অচেনা এক মানুষ রেস্টুরেন্টে যেতে বলছে। ঢাকা শহরে অচেনা কাউকে বিশ্বাস করার পরিণাম ভাল হয় না। তবু আনোয়ার বলল, ‘চলুন, বসি।’
আনোয়ারকে নিয়ে একটা দামি রেস্টুরেন্টে ঢুকল রুমি আমিন।
আনোয়ার ভাবল, কাজটা হয়তো বোকার মতই হচ্ছে। রুমি আমিনের মনে বড় ধরনের কুমতলব থাকতে পারে। তবে বিপদে জড়াতে তার ভালই লাগে।
রুমি আমিন চেয়ারে বসেই ঢকঢক করে দুই গ্লাস পানি খেল। এরপর আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী খাবেন?’
‘খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত নই। আপনি যা খাবেন, তা-ই খাব।’
‘পুডিং আর কফিতে আপত্তি নেই তো? এদের দোকানের পুডিং আর কফিটা খুবই ভাল।’
‘বেশ।’
রুমি আমিন ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার দিল।
একটু ঝুঁকে বলল আনোয়ার, ‘কিছু মনে করবেন না, আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে। তাই চটপট আলাপ সেরে নিলে ভাল হয়। সত্যি বলতে আমার কাছে আপনার কী প্রয়োজন, সেটা একদমই আন্দাজ করতে পারছি না।’ একটু বিরতি নিয়ে বলল, ‘আপনি আমাকে চেনেন কীভাবে?’
‘আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনি দেশের রহস্যময় সব জায়গাতে ঘুরে বেড়ান। মানুষের বিপদেও সাহায্য করেন।’
‘ঘুরে বেড়াই এটা সত্য। তবে মানুষের বিপদে খুব একটা জড়াই না।’
‘আপনার সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর নিয়েই এসেছি। পত্রিকায় আপনাকে নিয়ে লেখা কিছু ফিচারও পড়েছি।’
আনোয়ার বলল, ‘পত্রিকার প্রসঙ্গ বাদ দিন। বলুন আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’
কপালের ঘাম মুছল রুমি। নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি কখনোই অশরীরী কিছু বিশ্বাস করি না। তবে এমন কিছুই উল্টেপাল্টে দিয়েছে আমার জীবনটা।’
‘ব্যাপারটা খুলে বলুন।’ আগ্রহী হয়ে উঠেছে আনোয়ার।
রুমি বক্তব্য শুরু করবে, এমন সময় বেজে উঠল তার ফোন। কল রিসিভ করে চুপচাপ শুনল সে। কিছুক্ষণ পর উত্তেজিত কণ্ঠে কথা বলতে লাগল। দু’মিনিট পর ফোন রেখে রুমি বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, আমার অফিসে খুব বড় ঝামেলা হয়েছে। আমাকে যেতে হবে। আমি আপনার সঙ্গে অন্য একদিন দেখা করব।’
আনোয়ারকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বিল মিটিয়ে ঝড়ের গতি তুলে রেস্টুরেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে গেল রুমি।
একা একাই পুডিং এবং কফি শেষ করল আনোয়ার।
.
তিন
মাত্র জ্বর ছেড়ে উঠেছে আনোয়ার, শরীর বেশ দুর্বল। কথাবার্তা বলতে ভাল লাগে না। সারাদিন ইচ্ছা করে শুধু শুয়ে থাকতে। ওর ঘর বাদ দিয়ে ছাদের চিলেকোঠায় থাকছে কয়েক দিন ধরে।
চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল আনোয়ার। হঠাৎ বাসার দারোয়ান মনির এসে জানাল, এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছে।
আনোয়ার জানিয়ে দিল, সে এখন কারও সঙ্গেই দেখা করবে না।
দারোয়ান মিন-মিন করে বলল, ‘স্যর, উনি এই নিয়ে তিনবার আপনার খোঁজে এসেছেন। আপনার মোবাইল নাম্বার চেয়েছিলেন, তা-ও আমি দিইনি।’
বিরক্ত মুখে আনোয়ার বলল, ‘কী দরকারে এসেছেন? নাম কী?’
‘ওঁর নাম রুমি আমিন। বলছেন খুব জরুরি দরকার। আমাকে বলা যাবে না।’
রুমি আমিন নামে কাউকে চেনে বলে মনে করতে পারল না আনোয়ার। নিতান্ত অনিচ্ছায় বলল, ‘ঠিক আছে, ওপরে পাঠিয়ে দাও।’
ড্রয়িং রুমে বসেছে রুমি আমিন।
ঘরে ঢুকে তার দিকে তাকাল আনোয়ার। পরিচিত মুখ। ওকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল রুমি আমিন।
‘আমি রুমি আমিন,’ বলেই হ্যাণ্ডশেকের জন্য হাত বাড়াল সে।
করমর্দন করল আনোয়ার।
‘দুই সপ্তাহ আগে ফার্মগেটে আমাদের দেখা হয়েছিল।’
‘ও, মনে পড়েছে। আসলে জ্বর এত কাহিল করে দিয়েছে যে, সবকিছু ঘোলা ঘোলা লাগছে।’
‘আমি কি তবে অন্য একদিন আসব?’
‘না, আজই আপনার কথাগুলো শুনব।’
‘আপনি ভৌতিক এবং আধিভৌতিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলে শুনেছি, সেজন্যই আসা।’
‘আমি কোন বিশেষজ্ঞ নই। ভৌতিক, রহস্যময় বিষয়গুলোর প্রতি আকর্ষণ আছে, সুযোগ পেলে সেসবের পিছনে ছুটতে ভালবাসি। এটুকুই।’
‘আসলে আমি খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।’
‘কী ধরনের বিপদ?’
‘সবই বলব। প্লিজ, আমাকে সাহায্য করুন।’
‘দেখুন, মানুষকে খুব বেশি সাহায্য করার ক্ষমতা আমার নেই। সত্যি বলতে সবসময় ইচ্ছাও থাকে না।’
‘জানি, আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন।
‘আগে পুরো বিষয়টা খুলে বলুন। সম্ভব হলে আমি চেষ্টা করব সাহায্য করতে।’
‘জী।’
বাড়ছে আনোয়ারের জ্বর। রুমির কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। তবুও ভদ্রতার খাতিরে সব হজম করতে হবে। অবশ্য, অচেনা মানুষের সঙ্গে ভদ্রতা না করলেও খুব ক্ষতি নেই। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে, খুব আশা নিয়ে এসেছে লোকটা। চোখে-মুখে পরিশ্রান্ত ভাব। বারবার রুমাল বের করে মুছছে কপালের ঘাম। তাই কথা বলতে তাকে বাধা দিল না আনোয়ার।
‘আসলে পুরো ব্যাপারটাই আমার মাকে নিয়ে। তাঁর কিছু অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে,’ বলল রুমি
‘ও।’ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল আনোয়ার
‘আমার বয়স যখন দশ, তখন মারা যান বাবা। সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার আগে বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করেছিলেন। হাতে কয়েকটা টাকা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আইসক্রিম কিনে খাস।’ সেদিন আমার আনন্দের সীমা ছিল না। আইসক্রিম আমার খুব পছন্দের খাবার। টিফিনের পর প্রথম পিরিয়ডে হঠাৎ আমার ডাক পড়েছিল হেড স্যরের রুমে। সেসময়ে হেডস্যরের রুমে ডাক পড়া কোন ছাত্রের জন্যই সুখকর ছিল না।
‘সেদিন প্রথম হেডস্যরের মুখে কোমল ছায়া দেখেছিলাম। স্যর বলেছিলেন, ‘রুমি, তোর বাসা থেকে ফোন এসেছে। তুই বাসায় চলে যা।’
‘আমি সাহসে ভর দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কী হয়েছে, স্যর?’
‘স্যরের বিষণ্ণ মুখটা স্পষ্ট মনে আছে। ‘তোর বাবার শরীরটা হঠাৎ খারাপ করেছে।’
‘আমি কীভাবে যেন বুঝে গেলাম, স্যর মিথ্যা বলছেন এবং বাবা বুঝি আর নেই। আমাদের বাসাটা স্কুল থেকে বেশি দূরে ছিল না। তাই একা-একা স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম।
‘বাসায় গিয়ে দেখলাম, সাদা কাফনে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে বাবাকে। আম্মা এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন নানী আমার বাবা ছিলেন দাদা-দাদীর একমাত্র সন্তান। দাদা-দাদী মারা গেছেন অনেক আগেই। তাই আব্বার তেমন কোন আত্মীয়-স্বজন সেদিন উপস্থিত ছিল না।
কে জানি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘তোমার বাবা মারা গেছেন রুমি।’
‘আমি চাপা গলায় বলেছিলাম, ‘কীভাবে?’
‘বাথরুমে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। মাথায়, ঘাড়ে আঘাত পেয়েছিলেন খুব।’
‘তখন বললাম, ‘আমি আব্বাকে দেখব।’
‘উপস্থিত মুরব্বিদের কেউ-কেউ রাজি ছিলেন না। তাঁদের যুক্তি, আমি ছোট মানুষ, মৃত বাবাকে দেখে আমার খারাপ লাগবে। আরেক পক্ষ বলছিল, সন্তান হিসাবে অবশ্যই বাবাকে শেষ দেখার অধিকার আমার আছে। শেষ পর্যন্ত বাবার মুখটা আমি দেখতে পেলাম। তাঁর মুখ দেখে বুকে ধাক্কার মত লেগেছিল। কেন জানি মনে হচ্ছিল, বাবা মরেননি। তাঁকে জোর করে মৃত সাজানো হয়েছে। চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলাম। ‘আমার বাবা মরেনি, আমার বাবা মরেনি।’
‘আমাকে শক্ত করে ধরে রাখা হলো। বাবার লাশ কাঁধে করে সবাই কবরস্থানের দিকে গেল।
‘ততক্ষণে চিৎকার করে মুখে ফেনা উঠে গেছে আমার। ‘আমার বাবা মরেনি। তোমরা তাকে কবর দিয়ো না!’
‘শোকাতুর মানুষ এমন আহাজারি করবে এটা অস্বাভাবিক নয়। তাই আমার কথা কেউ কানে তুলল না। রাতে আমাদের বাসার ভিড় একদম কমে গেল। আম্মা এবং নানী স্বাভাবিক মানুষের মত খাওয়া-দাওয়া করলেন। মরা বাড়িতে নাকি তিন দিন চুলো জ্বালানো নিষেধ। বাবার মৃত্যুর সময় এই নিয়ম মানা হয়নি।
‘আমাকে কয়েকবার রাতে খেতে বলা হলেও খেতে পারিনি। তখন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছিলাম বাবাকে। করুণ মুখে আমাকে বলছিলেন, ‘দেখলি, আমি মরিনি, তবুও আমাকে কবর দিয়ে দিল।’
‘আমি তখন বাবা-বাবা বলে চিৎকার করে উঠি। শুধু ওই একদিনই নয়, এরপর ক্রমাগত শুনতে লাগলাম বাবার কথা। চোখ বন্ধ করলেই দেখি বাবার করুণ মুখ। আমার মনের কষ্ট ধীরে-ধীরে রূপান্তরিত হয়েছিল ভয়ে। কেন মৃত বাবাকে দেখতে পাচ্ছি? আম্মা এবং নানীকে সব খুলে বলেছিলাম। একজন হুজুরকে বাড়িতে ডেকে আনা হলো। তিনি আমাকে একটা তাবিজ দিলেন। আর বললেন যে বাবা হয়তো মনের মধ্যে কোন কষ্ট নিয়ে মারা গেছেন। তাই বারবার তিনি দেখা দিচ্ছেন। হুজুর আমাকে বিভিন্ন দোয়া দরুদও শিখিয়ে দিলেন। এরপর থেকে বাবার করুণ মুখটা আর দেখতে পাইনি। তাবিজ-কবচে আমার বিশ্বাস নেই বলে কিছুদিন পর সেটা অযত্নে হারিয়ে গিয়েছিল।’
বাবার মৃত্যুর পরবর্তী বিষয়গুলো খুব দ্রুত বলল রুমি।
আনোয়ারের মনে হলো, ওসব নিয়ে রুমির মনে কোন অস্বস্তি কাজ করছে। সম্ভবত কোন কিছু লুকাচ্ছে সে।
অবশ্য রুমিকে নিজের মনোভাব বুঝতে দিল না আনোয়ার।
আবারও খেই ধরল রুমি, ‘আমাদের গাজীপুর সদরে একটা দোতলা বাড়ি আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর ভাড়ার টাকা আর বাবার প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের কিছু টাকা দিয়েই আমাকে নিয়ে সংগ্রাম শুরু করেন আম্মা। বাসায় আমরা তিনজন মানুষ। আমি, আম্মা এবং নানী। নানী অনেক আগে থেকেই আমাদের বাসায় থাকতেন। তাঁর ছেলে থাকা সত্ত্বেও মেয়ের কাছে থাকতেই পছন্দ করতেন। তিনিও অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন। তাই মেয়েকে নিয়েই তাঁর জীবন আবর্তিত। এই মানুষটাকে কখনোই ঠিক পছন্দ হত না আমার। সবসময় কড়া মেজাজে কথা বলতেন। পাঁচ বছর বয়সে আমি একদিন চকলেট নিয়ে বায়না ধরায়, আমাকে দেয়ালের ওপর ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। সেদিন আমার কপাল, মাথা কেটে গিয়েছিল। বাবা সেদিন খুব খেপে যান। নানীর সঙ্গে খুব ঝগড়া করেন। নানীকে যাচ্ছেতাইভাবে গালাগালিও করেছিলেন। সেদিন আম্মার রুদ্র মূর্তি দেখেছিলাম তিনি রান্নাঘর থেকে বঁটি হাতে বের হয়েছিলেন। চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আমার মাকে খারাপ কিছু বললে, একেবারে দু’টুকরো করে ফেলব।’ সেদিন থেকেই সম্ভবত আব্বার সঙ্গে মায়ের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। কিংবা কে জানে, দূরত্ব হয়তো আগে থেকেই ছিল। নানী সবসময় চেষ্টা করতেন আমার এবং আব্বার কাছ থেকে আম্মাকে দূরে সরিয়ে রাখতে। আব্বা মরে যাওয়ার পর তাঁর কাজ আরও সহজ হয়ে গেল। মাকে বুঝিয়ে তিনি আমাকে একটা বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিলেন। আমি অনেক কাঁদলেও লাভ হয়নি। আম্মা বা নানীর এতটুকু দয়া হয়নি।’
একটু থেমে রুমি আবার বলল, ‘আম্মার সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল না আমার। আমি ছুটিতে বাসায় এলেও তাঁর মধ্যে কোন ভালবাসা দেখিনি। আব্বা মারা যাওয়ার পর বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গিয়েছিল। আমি তখন এইচ.এস.সি. পরীক্ষার্থী। তখন খবর পেলাম মারা গেছেন নানী। আব্বার মৃত্যুর সময় আম্মাকে যেমন শান্ত দেখেছিলাম, নানীর মৃত্যুর সময়ও ঠিক তাই দেখলাম। তবে চোখ অশ্রুসিক্ত ছিল। বুঝতে পেরেছিলাম মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে আম্মার। আমার মামা, মানে নানীর একমাত্র ছেলে চাঁদপুর থেকে এসেছিলেন মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে। মামার মধ্যেও তেমন প্রতিক্রিয়া লক্ষ করিনি। আগেই জানতাম, নানীর সঙ্গে সম্পর্ক ভাল ছিল না তাঁর। তবে মামা আমাকে দেখে খুব উৎফুল্ল হয়েছিলেন। জন্মের পর সেবারই প্রথম দেখা হয়েছিল মামার সঙ্গে। মামা সেদিন আমাকে বারবার চাঁদপুর যেতে অনুরোধ করেছিলেন। মামাকে দেখে আম্মা যেন ক্রোধে ফেটে পড়লেন। যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করতে লাগলেন।
‘মামা তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। ‘আমেনা, তুই শান্ত হ।’
‘আম্মা চেঁচিয়ে বললেন, ‘তুই আমার কেউ না! আমার মাকে তুই কষ্ট দিয়েছিস! তোকে আমি ছাড়ব না!’ রান্নাঘর থেকে বঁটি নিয়ে এসেছিলেন আম্মা। অনেক কষ্টে তাঁকে নিরস্ত্র করা হয়েছিল। এলাকার ডাক্তার অখিল বাবুকে খবর দেয়া হলো। তিনি আম্মাকে ঘুমের ইনজেকশন দিলেন। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন আম্মা। নানীর লাশ দাফন সংক্রান্ত ঝামেলা শেষ করে মামা চলে যেতে চাইলেন। যাওয়ার সময় বললেন, ‘রুমি, তোর মাকে দেখিস। পারলে তাকে ভাল একটা ডাক্তার দেখাস।’
‘জিজ্ঞেস করলাম, ‘আম্মা আপনাকে দেখে এমন রেগে গেল কেন?’
‘ও তুই বুঝবি না, এসব ব্যাপার তোর জানার দরকার নেই,’ মামা আমার হাত ধরে বললেন। ‘তুই একবার চাঁদপুর আসিস, খুব খুশি হব। তোর ওখানে মামী আর দুটো ভাই-বোন আছে। একবার সময় করে অবশ্যই আসবি।’ আমাকে ঠিকানা দিলেন মামা। এরপর চোখ মুছতে-মুছতে চলে গেলেন। সবসময় শুনেছি আমার বড় মামা একজন নিষ্ঠুর মানুষ। মায়ের খোঁজ কখনও নেননি। এজন্যই নানার মৃত্যুর পর নানী গ্রামের সবকিছু বিক্রি করে আম্মার কাছে চলে এসেছিলেন। কিন্তু সেদিন মামার চোখের জল দেখে মনে হয়েছিল, কোথাও যেন একটা সমস্যা আছে।’ আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে বলল রুমি, ‘এক গ্লাস পানি খাব।’
আনোয়ার পানি এনে দিল।
এক শ্বাসে পানি শেষ করল রুমি।
আনোয়ার বলল, ‘আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?’
‘না, শরীর খারাপ লাগছে না। আসলে আমি এখন আসল ঘটনায় ঢুকব, তাই মনের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করছে।’
‘আপনি ধীরে-সুস্থে বলুন। কোন সমস্যা নেই।’
‘নানী মারা যাওয়ার পর কয়েক দিন পার হয়েছে। বাসায় আমরা দুটোমাত্র মানুষ। আম্মা আর আমি। সামনে এইচ.এস.সি. পরীক্ষা, তাই দিনরাত পড়ার টেবিলেই থাকতাম। আম্মা আমার সঙ্গে বিশেষ কথা বলতেন না। খাওয়ার টেবিলেই আমাদের দেখা হত। অন্য সময়ে হয় আম্মা রান্না করতেন, নতুবা দরজা বন্ধ করে রুমে বসে থাকতেন।
‘একদিন হঠাৎ আম্মার রুম থেকে হাসির শব্দ শুনলাম। আমার কেমন যেন খটকা লাগল। আম্মা তো এত জোরে হাসেন না। আম্মার রুমের সামনে গেলাম। রুম ভেতর থেকে লক করা। আমার মনে হচ্ছিল, আম্মা কারও সঙ্গে কথা বলছেন। মাঝে-মাঝে আম্মার হাসির শব্দও শুনছি। চারদিক জর্দার গন্ধে ম-ম করছে। দরজা ধাক্কা দিলাম। কাঁপা গলায় ডাকলাম, ‘আম্মা।’
‘ভেতরের কথাবার্তা একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আম্মা দরজা খুললেন। চুল এলোমেলো। চোখের দৃষ্টিও কেমন অস্বাভাবিক। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুই এখানে কী করছিস?’
‘না মানে ইয়ে…’
‘আমার রুমের সামনে কী?’ আম্মার গলার স্বর শুনে আমার কেমন যেন ভয়-ভয় করতে লাগল।
এমন সময় রুমের ভেতর থেকে কেউ বলল, ‘আমেনা, এমন করছিস কেন? পোলাডারে ভেতরে আসতে দে।’
‘কেমন এক ঠাণ্ডা শিহরণ বয়ে গিয়েছিল আমার পুরো শরীরে। এ আমি কী শুনছি? অবিকল নানীর গলা। নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে।
‘আম্মার মুখ থেকে রাগের ছায়া নিমিষেই উধাও হলো, তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘আয়, ভেতরে আয়।’ আমার ঘরে ঢোকার সাহস ছিল না। মনে হচ্ছিল ওখানে গেলেই ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে। আম্মা আমার ঘাড়ে হাত রাখলেন। কী শীতল হাত। আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। ঘরের ভেতরটা আবছা অন্ধকার। মনে হচ্ছিল, ঘরের এক কোনায় চেয়ারে সটান হয়ে বসে আছে কেউ। পুরো ঘর জুড়ে পান ও জর্দার তীব্র গন্ধ। ঘরের কোনায় বসে থাকা সেই মানুষটা বলল, ‘কেমন আছিস, রুমি?’
‘আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। এটা নানী ছাড়া আর কেউ নয়।
‘নানী বললেন, ‘কী রে, কথা বলবি না? আমি তোর নানী।’
‘আমি মাথা দোলাতে দোলাতে বললাম, ‘এ হতে পারে না। আমি ভুল দেখছি। ভুল, সব ভুল!’
‘আম্মা আর নানী এবার একসঙ্গে হেসে উঠলেন। আম্মা হাসলেন জোরে, আর নানী অন্য ভঙ্গিতে। মনে হচ্ছিল কোন ছোট বাচ্চা হাসছে। নানী চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন। আমার দিকে আসতে লাগলেন। একদম কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীরের গন্ধ পাচ্ছি। তবু ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছি। হঠাৎ নানী আমার মুখে আঘাত করলেন। আমি ছিটকে পড়লাম। বললেন, ‘আমাকে তুই ঘৃণা করিস, না?’
‘মেঝেতে পড়ে গোঁ-গোঁ শব্দ করছি। নানীর চিৎকারে পুরো ঘর যেন কেঁপে উঠল। ‘আমাকে ঘৃণা করলে তোকে আমি মেরে ফেলব। মশার মত টিপে মেরে ফেলব!’
‘আমি জ্ঞান হারালাম। চেতনা ফিরে দেখলাম আছি নিজের বিছানায়। সকালে আম্মাকে দেখে অস্বাভাবিক কিছু মনে হলো না। কিন্তু ভয় ঢুকে গেল আমার মনে। নিজের রুম থেকে বেরুনো বন্ধ করে দিলাম। এইচ.এস.সি. পাশের পর পুরোপুরি বাসা ছাড়লাম। ঢাকার এক কলেজে অনার্সে ভর্তি হলাম। বাসায় যেতে কেমন ভয়-ভয় লাগত। তাই বাসায় যাওয়া একদম কমিয়ে দিয়েছিলাম। আর কখনও বাসায় গেলে রাতে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকতাম। কখনও আম্মার ঘর থেকে ভেসে আসত হাসির শব্দ। কেউ যেন পুরো ঘর দাপিয়ে বেড়াত। শুয়ে-শুয়ে দোয়া-দরুদ পড়তাম। শুধু ভয় হত, নানী আমাকে মেরে ফেলবেন। যাই হোক, সত্যি বলতে ধীরে-ধীরে বিষয়টার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মৃত নানী যে-কোন উপায়ে ফিরে এসেছেন, এটা মেনে নিয়েছিলাম।’
‘আপনার সঙ্গে নানীর আর কখনও দেখা হয়েছিল?’
‘না। আমি অনেকবার তাঁর হাসির শব্দ শুনেছি। বাসার মধ্যে অনেক আশ্চর্য কাণ্ডও ঘটেছে। তবে তাঁর সঙ্গে সামনাসামনি আর দেখা হয়নি। বছরে তিন- চারবারের বেশি বাসায় যেতাম না, তাই দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও কম ছিল। তবে সমস্যা হয়েছে অন্যখানে।’
‘বুঝিয়ে বলুন।’
‘আমি টিউলিপ নামে এক মেয়েকে খুব পছন্দ করতাম। ওর মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। মামার কাছে বড় হয়েছে। মামা বাড়িতে খুব বেশি সুখে ছিল না টিউলিপ। তাই আমরা বিয়েটা সেরে ফেলেছিলাম। চাকরিটা নেহাত মন্দ করি না, একটা ফ্ল্যাটও কিনেছি। তাই বিয়ে করে সংসার শুরু হলো স্বচ্ছন্দে। আম্মাকে কিছু জানাইনি। কেন জানি মনে হচ্ছিল, এভাবে বিয়ে করাটা তিনি ভালভাবে নেবেন না। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, আম্মা একদিন নিজেই ফোন করলেন। সচরাচর আমাকে ফোন করেন না।
‘আমাকে ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেললি, রুমি?’
‘আম্মার কথা শুনে প্রচণ্ড চমকে উঠলাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না।
‘আম্মা আবার বললেন, ‘তোর নানীর কাছ থেকে সব জানতে পারলাম। নানী তোদের দেখতে গিয়েছিল। কাজটা ভাল করিসনি।’
‘আমি কাতর গলায় বলেছিলাম, ‘আম্মা, আমাদের ক্ষমা করে দিন। কোন রাগ রাখবেন না।’
‘আমার কোন রাগ নেই। তুই খুব দ্রুত বউমাকে নিয়ে বাসায় আয়।’
‘আমি কোন উত্তর দেয়ার আগেই আম্মা ফোন রেখে দিলেন। গভীর চিন্তায় পড়লাম। নিজেই বাসায় যেতে ভয় পাই। সেখানে টিউলিপকে নিয়ে গেলে কোন সমস্যা হবে না তো? মনের মধ্যে নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। টিউলিপকে নানীর কথা বা মায়ের অস্বাভাবিকতার কথা কিছুই জানালাম না। অফিস থেকে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে গাজীপুর চলে গেলাম। আমার মন বলছিল, নানী আমার কোন ক্ষতি কখনও করেননি, তাই টিউলিপের কোন ক্ষতিও করবেন না।’
‘টিউলিপের কোন ক্ষতি হয়েছিল?’ জিজ্ঞেস করল আনোয়ার।
‘না, ক্ষতি হয়নি। তবে একদিন গভীর রাতে আম্মা টিউলিপকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের রুমে। সেদিন নানীও এসেছিলেন। আম্মা আমাকে বলেছিলেন, বউমা সতী কি না এটা বের করবেন। আম্মার কথার বাইরে যাওয়ার সাহস আমার হয়নি। টিউলিপ খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তবে নানীর বিষয়টি সে ভালভাবে বুঝতে পারেনি। আমিও তাকে সব বলে ভয়টা বাড়িয়ে দিতে চাইনি।’
‘পরবর্তীতে কী হলো?’
‘আম্মা পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছিলেন, তাই কয়েক দিন টিউলিপকে বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু ওই সময়ে টিউলিপ আর কোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি।’
‘এখন টিউলিপ কোথায়?’
‘ঢাকাতেই। আম্মাকে তার একটুও পছন্দ হয়নি তা বেশ বুঝতে পারি।’
‘আপনার ঘটনাগুলো আমার আগ্রহকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাকে বলুন, আমি ঠিক কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’
‘আসলে আমি নানীকে দেখেছি, তাঁর কথা শুনেছি। এমনকী টিউলিপও নানীর কথা শুনেছে। কিন্তু মনের ভেতর মাঝে-মাঝে সংশয় জাগে, আসলে কি সত্যিই নানী ফিরে এসেছেন? নাকি সব কিছুর অন্য কোন ব্যাখ্যা আছে?’
আনোয়ার আচমকা বলে বসল, ‘রুমি সাহেব, আমার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, গল্পের ভেতর গল্প লুকিয়ে থাকে। অনেক সময় লুকিয়ে থাকা সেই গল্পটা প্রকাশ্যে এলে, মেনে নেয়া কঠিন হয়।’
‘আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।’
‘আমার ধারণা, আপনি যেসব ঘটনা বললেন, এর মধ্যে অজানা আরও অনেক কিছু লুকিয়ে আছে যা হয়তো কঠিন বাস্তব।’
আনোয়ারের কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল রুমি। আনোয়ার বলল, ‘আমি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নই। তবু আমার মনে হচ্ছে, আপনার মায়ের মানসিক সমস্যা আছে। তাই একজন সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে। এরপর তাঁর মতামত শুনে আমরা পরের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করব।’
‘তার মানে আম্মাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে বলছেন?’
‘হ্যাঁ। আমিও সঙ্গে থাকব। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছ থেকে আমরা নিশ্চিত হতে পারব, আপনার আম্মার কোন মানসিক সমস্যা আছে কি না। এরপর পরের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা যাবে।’
‘আমার আম্মা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে রাজি হবেন বলে মনে হয় না।’
‘তবু চেষ্টা করে দেখুন। যদি বুঝিয়ে শুনিয়ে নিতে পারেন।’
‘আপনি কি আমার নানীর অস্তিত্বকে প্রথমেই নাকচ করছেন?’
‘না, জীবনে অনেক ব্যাখ্যাতীত জিনিসের সম্মুখীন হয়েছি। তাই কোন ঘটনা শুনেই কোন সিদ্ধান্ত নিই না।’
.
চলে গেছে রুমি আমিন। পুরো বিষয়টা গভীরভাবে ভাবছে আনোয়ার। এ মুহূর্তে তার জ্বর নেই। রুমি আমিন যা যা বলল, সেসব ঘটনা একসূত্রে ফেলা যাচ্ছে না অনেক খটকা আছে। প্রথম খটকা হচ্ছে, রুমি মাত্র একবার তার নানীকে দেখেছে। তার মানে, এমন হতে পারে যে পুরোটাই রুমির কল্পনা। এমনকী সে তার মা সম্পর্কে যা যা বলছে, তা-ও ভুল হতে পারে। হয়তো মা এবং নানীর প্রতি রুমির কোন আক্রোশ রয়েছে, তাই দু’জনকে জড়িয়ে আজব কল্পনা জুড়ে বসেছে তার মাথায়। দ্বিতীয় খটকা: তার বাবার মৃত্যুর পরের বিষয়গুলো কেমন যেন এড়িয়ে যেতে চাইল রুমি। বলেছে, তার বাবাকে সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল, কিন্তু আনোয়ারের ধারণা এখানে কিছু একটা গোপন করেছে রুমি।
আরও এক খটকা হচ্ছে তার মামাকে নিয়ে। মামার কথার মধ্যেও কোন রহস্যের আভাস আছে। হয়তো রুমির মামা এমন কিছু জানেন, যা অন্য কেউ জানে না।
.
চার
রুমির কথায় আমেনা জাহান খুব সহজেই সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে রাজি হলেন। নিজেই বললেন, ‘নিজেরও মনে হচ্ছে আমার কোন মানসিক সমস্যা আছে। তাই আমি তোর সঙ্গে যাব।’
রুমি জানে, নামকরা ডাক্তার মহসিন কামাল অস্বাভাবিক বিষয়ে নানান ব্যাখ্যা খুঁজে বের করেন। বিশ্বাস করেন, পৃথিবীতে মানসিক রোগ ভৌতিক ব্যাপারের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
এখন ডা. মহসিন কামালের চেম্বারে বসে আছে রুমি, আমেনা জাহান এবং আনোয়ার। ইতিমধ্যে আনোয়ারের সঙ্গে মায়ের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে রুমি বলেছে, ‘ওঁর নাম আনোয়ার। আমার বন্ধু।’
আমেনা জাহান হাসিমুখে আনোয়ারকে দেখেছেন।
কিন্তু কেন জানি, তাঁর হাসিমাখা মুখ দেখে বুকের ভিতর কাঁটা দিয়ে উঠেছে আনোয়ারের।
প্রথমে আমেনা জাহানের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বললেন ডা. মহসিন কামাল। এই কেসটাতে খুব আগ্রহ বোধ করছেন। সময় নিয়ে রোগিণীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। তারপর কথা বললেন রুমির সঙ্গে। ঠিক হলো আগামী কয়েক দিন ধরে রুমির আম্মার সঙ্গে কথা বলবেন তিনি।
সেই অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে কয়েক সিটিং দিয়ে খুঁটিনাটি অনেক কিছু জানার চেষ্টা করলেন ডাক্তার। দুই দফা কথা বললেন রুমির সঙ্গেও। আনোয়ারের মুখ থেকেও রুমি আমিনের ঘটনাগুলো শুনেছেন। মহসিন কামাল অবাক হয়ে লক্ষ করেছেন, তিনি বিশেষ কোন সমাধানে আসতে পারছেন না, বরং আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে সব।
.
তাঁর চেম্বারে আধশোয়া হয়ে বসে আছেন ডা. মহসিন কামাল। সামনে আনোয়ার এবং রুমি। চেম্বারের বাইরে বসে আছেন আমেনা জাহান।
যেন কথা বলতে অস্বস্তিবোধ করছেন মহসিন কামাল। এক গ্লাস পানি খেয়ে বললেন, ‘আপনারা কি হ্যালুসিনেশন সম্পর্কে জানেন?’
‘হ্যাঁ,’ বলল আনোয়ার, ‘কয়েক ধরনের হ্যালুসিনেশন সম্পর্কে ধারণা আছে। তবে খুব বিস্তারিত কিছু জানি না।’
‘আসলে সিজোফ্রেনিয়া এবং হ্যালুসিনেশন হাত ধরাধরি করে চলে। প্রথমে হ্যালুসিনেশন বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলি। আসলে হ্যালুসিনেশনও নানা ধরনের হয়। যেমন, এক্ষেত্রে মানুষ দেখা সংক্রান্ত বিভ্রান্তিতে ভোগে। সব হ্যালুসিনেশন সম্পর্কে একটা কাল্পনিক গল্প বলছি, তা হলে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে। ধরুন, আমি এই রুমে বসে আছি, হঠাৎ স্পষ্ট দেখলাম আমার মৃত বাবা এই রুমে বসে আছেন। ঘটনা এখানেই থেমে থাকল না, আমার বাবা ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এটাই Visual hallucination. এরপর আমার হঠাৎ মনে হলো, বাবার শরীর থেকে আসছে আতরের তীব্র গন্ধ এবং এই গন্ধে আমার শরীরের ভিতরটা গুলিয়ে উঠছে। এই গন্ধ সংক্রান্ত বিভ্রান্তি হচ্ছে Olfactory hallucination. এরপর কিছু মুহূর্ত পার হলো বা ধরুন আমি বাবাকে বেশ কিছু দিন দেখতে পাচ্ছি, আতরের গন্ধও পাচ্ছি। প্রথমে হয়তো বাবার অস্তিত্ব বিশ্বাস করতে চাইনি, কিন্তু এই কয়েক দিনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, আমার বাবা সত্যিই ফিরে এসেছেন। এই বিশ্বাসটাই আমার রোগটা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেবে। এখন হুট করেই আমার বাবা কথা বলতে শুরু করবেন। আমিও ধীরে- ধীরে তাঁর সঙ্গে কথা বলা শুরু করব। শুরু হবে Auditory hallucination. এভাবে সময় কাটতে লাগল। ধীরে-ধীরে বিভিন্ন বিষয়ে বাবার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। তখন বাবা আমার মাথায় হাত রাখলেন, আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। আমি অনুভব করলাম তাঁর হাতটা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। এই স্পর্শ সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকে বলতে পারি Tactile hallucination. আসলে যেভাবে ক্রমানুসারে একটার পর একটা হ্যালুসিনেশনের কথা বললাম, বিষয়টা এরকম ছকে বাঁধা নয়। আপনাদের বোঝানোর জন্যই একটা গল্প বললাম মাত্র।’
একটু থেমে মহসিন কামাল আবার বললেন, ‘এবার আসি সিজোফ্রেনিক রোগী বিষয়ে। সিজোফ্রেনিক রোগীর হ্যালুসিনেশন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই সব হ্যালুসিনেশন দেখা দেয় না। কেউ হয়তো শুধু গন্ধ পাচ্ছেন, আবার কেউ হয়তো অবাস্তব কিছু দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু জটিল কেসের ক্ষেত্রে রোগীদের সব ধরনের হ্যালুসিনেশন হতে পারে। আমি নিশ্চিত হয়েছি, রুমি সাহেবের মা একজন সিজোফ্রেনিক রোগী। আপনারা কেউই তার রোগ আগে ধরতে পারেননি। তাই দিনে দিনে বেড়েছে রোগ। আপনার মায়ের অবস্থা খুব বেশি ভাল নয়। যে-কোন সময় একটা অঘটন ঘটতে পারে। আপনি ভাগ্যবান যে আপনার এখনও কোন ক্ষতি হয়নি।
‘অবশ্যই আপনার মায়ের Sub-conscious mind-ই সৃষ্টি করেছে নানীকে। আমেনা জাহান, তার মায়ের প্রতি এতই নির্ভরশীল ছিল, তার মৃত্যুটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। ওলটপালট হয়ে গেছে মনোজগৎ। যে মানুষটা জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপ মায়ের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছে, সেই মায়ের অনুপস্থিতি সহ্য করা অনেক কষ্টকর ছিল তার জন্য। তাই কাল্পনিক মাকে সৃষ্টি করতে বেশি সময় লাগেনি। ভয়ের কথা হলো, এই কাল্পনিক মা বাস্তবের মায়ের চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর, কুচক্রী। কারণ, কল্পনার মানুষ বাস্তবের মানুষের চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর।’
‘কিন্তু…আমি নিজে আমার নানীর কথা শুনেছি।’
‘কতবার শুনেছেন?’
‘তিন-চারবার।’
‘নানীকে দেখেছেন কয়বার?’
‘জী, একবার।’
‘আপনি আপনার মায়ের কথা দ্বারা প্রভাবিত। এ ছাড়া, নানীর প্রতিও রয়েছে আপনার তীব্র ক্ষোভ। কারণ নানীর জন্যই আপনি মায়ের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই নানী আপনার কাছে ভিলেন ছাড়া কিছুই নন। এজন্য আপনার মধ্যেও কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এখন আপনিও যদি পুরো বিষয়টা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তা হলে ধীরে-ধীরে বিপদে পড়বেন।’
‘তা হলে, আমিও কি একজন মানসিক রোগী?’
‘এটা এখনই বলতে পারছি না। আপনাকে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে কোন সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। তবে প্রথম থেকে সচেতন হলে আপনার উপর রোগটা জেঁকে বসতে পারবে না।’
‘আমার স্ত্রীও কিন্তু নানীর কথা শুনেছিল।’
‘আপনার স্ত্রীর সঙ্গে যেহেতু কথা বলিনি, তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করব না। তবে মনে রাখবেন, বেশিরভাগ ভৌতিক জিনিসেরই ব্যাখ্যা আছে।’
‘এখন আমার আম্মাকে নিয়ে কী করব?’
‘সত্যি বলতে, আপনার মাকে এখন বাড়িতে রাখা নিরাপদ নয়, যে-কোন মুহূর্তে অঘটন হবে। তাকে ইচ্ছার বিপরীতে ক্লিনিকে ভর্তি করলেও হিতে বিপরীত হবে। তাই আপাতত যেসব ওষুধ দিচ্ছি, সেগুলো এক মাস খাওয়াতে থাকুন। তারপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করব।’
‘ঠিক আছে।’
‘আর যত দ্রুত সম্ভব আপনার মাকে অন্য পরিবেশে সরিয়ে নেবেন।
‘আমি চেষ্টা করব।’
‘একটা কথা বলতে চাইছিলাম না, তবে আমার মনে হয় আপনার সব কিছু জানা উচিত।’
‘বলুন।’
‘এই কয়েক দিন আপনার মায়ের সঙ্গে অনেক কথা বলেছি। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, সে আমার সঙ্গে বেশ প্রাণ খুলেই কথা বলেছে। টের পেয়েছি কৌশলে বেশ কিছু ব্যাপার এড়িয়ে গেছে। এ জন্য আপনার মাকে হিপনোটাইজ করে বেশ কিছু ব্যাপার জেনে নিতে হয়েছে।’
‘আমাকে সব খুলে বলুন।
‘আমার ধারণা, আপনার বাবার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। আপনার মা এবং নানী তাঁকে খুন করেছে।
ঘরের ভিতর যেন বাজ পড়ল। কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। রুমি অবিশ্বাসের সুরে বলল, ‘আপনি কী বলছেন!’
‘হ্যাঁ। সম্ভবত ঠিকই বলছি। আপনার বাবার মৃত্যুর ঘটনাটা আমি শুনেছি। স্কুল থেকে ফিরে এসে আপনি শুনলেন, বাবা বাথরুমে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। আর বাথরুমেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। ঠিক?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাঁর মাথা এবং ঘাড়ে আঘাত লেগেছিল। ঠিক?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু সত্যটা হচ্ছে, আপনার নানী তাঁর মাথার পিছনে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছিল। আপনার বাবা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর আপনার মা বালিশ চাপা দিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল বাথরুমের ঠিক সামনে। হত্যাকাণ্ডের পর আপনার বাবার লাশটা রাখা হয় বাথরুমে। এমনভাবে ঘটনাটি সাজানো হয়েছিল যে, সবাই এটাকে দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেনি। রুমের মেঝের রক্তের দাগ মুছে ফেলা হয়। বাথরুমের দরজাটা ভেঙে ফেলা হয়েছিল। যেন সবাই ভাবতে বাধ্য হয় যে, দরজা ভেঙে আপনার বাবাকে উদ্ধার করা হয়েছে।’
আনোয়ার বলল, ‘কিন্তু এমন ঘটনা ঘটাবার কারণ কী?’
‘সম্ভবত রুমি সাহেবের নানীও সিজোফ্রেনিক রোগী ছিল। রুমি সাহেবের নানী জামাইকে পছন্দ করত না, রুমি সাহেবের মা-ও না। দু’জনের আক্রোশের বলি হয়েছেন ভদ্রলোক। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে…’ একটু থামলেন মহসিন কামাল।
‘বলুন।’
‘রুমি সাহেবের মা এবং নানী আরও বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিছু হত্যাকাণ্ড দু’জন মিলে…আর কিছু সম্ভবত আমেনা জাহান একাই ঘটিয়েছে। তবে সেই কাল্পনিক মা সঙ্গেই ছিল। লাশ লুকিয়ে ফেলার কৌশলেও সে বেশ পারদর্শী।’ চশমাটা মুছতে-মুছতে বললেন মহসিন কামাল, ‘সাধারণত ভয়াবহ সিজোফ্রেনিক রোগীরা একটা খুন করেই বসে থাকে না। এরা নির্দিষ্ট সময় অন্তর খুন করতে থাকে।
‘আপনি কি জানেন আর কে কে খুন হয়েছিলেন?’ আনোয়ার জিজ্ঞেস করল। ‘কতজনকে খুন করেছে সঠিকভাবে বলতে পারব না। তবে দুইজন গৃহপরিচারিকাকে খুন করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হয়েছি। এদের একজন রুমি সাহেবের বাবার হত্যাকাণ্ডটি দেখে ফেলেছিল।’
মহসিন কামাল রুমির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মি. রুমি, আপনি কিছু লুকিয়েছেন, সেটা কি আমাদের বলবেন?’
‘কী লুকিয়েছি আমি?’ নিচের দিকে তাকিয়ে বলল রুমি।
‘সেটা ঠিক জানি না। তবে আনোয়ারও বলেছে, তাঁরও সন্দেহ আপনি কিছু লুকাতে চাইছেন।
‘আমি যে বিষয়টা এড়িয়ে গেছি, সেটা আপনারা ইতিমধ্যে জেনে গেছেন।’ বিড়বিড় করে বলল রুমি। ‘বিষয়টা আমি ভুলে থাকতে চাই, তাই চেপে গিয়েছিলাম।’
‘এবার বলুন।’
‘আমি আগেই জানতাম আম্মা এবং নানী খুন করেছেন আমার বাবাকে।’
‘এমন কিছুই অনুমান করেছি। কীভাবে জানতে পেরেছিলেন?’
‘আসলে বাবা মারা যাওয়ার পর কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটতে শুরু করল। তাঁকে চোখের সামনে দেখতে শুরু করেছিলাম। তিনি আমাকে একটা কথাই বলতেন, ‘আমাকে তোর নানী আর আম্মা মেরে ফেলেছে। তোকেও মেরে ফেলবে। তুই এর প্রতিশোধ নে।’ আমি বাবার কথা বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু মনের ভিতর অজানা ভয়ও ঢুকে গিয়েছিল। তাই এই বিষয়টা কখনও সামনে আনতে চাইনি।’
‘মি. রুমি, একটা কথা মনে রাখবেন, আপনার মা একজন মানসিক রোগী। তাই তার রোগ আমাদেরকে সারিয়ে তুলতে হবে। মাকে কোনভাবেই ঘৃণা বা অযত্ন করবেন না।’ অনেকটা আদেশের সুরে বললেন মহসিন কামাল। ‘আচ্ছা, রুমি, আপনি বাইরে মায়ের কাছে যান। আমি আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলব।’
রুমি বাইরে চলে গেল।
বাথরুমে গেলেন ডা. মহসিন হোসেন। একটু পর ফিরে এলেন, চেহারা প্রচণ্ড গম্ভীর।
আনোয়ারের মনে হলো, তিনি আরও কিছু বিষয় বলতে চান।
‘আনোয়ার।’
‘জী, মহসিন ভাই।’
‘ডাক্তারদের জীবন খুব কঠিন। আর যারা সব কিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজে, তাদের জীবন কখনও-কখনও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।’ মহসিন কামালের মুখে অস্বস্তির ছাপটা স্পষ্ট।
‘কেন এ কথা বলছেন?’
‘আসলে সব বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু কিছু বিষয়…’
‘কিছু বিষয় কী?’
‘না, থাক। এসব আলোচনা মানে ভুল জিনিসকে বিশ্বাস করা।’
‘আমার শোনার কৌতূহল হচ্ছে। প্লিজ বলুন।’
‘ইয়ে মানে…রুমি সাহেবের নানীকে আমিও দেখতে পেয়েছি। একবার না, একাধিকবার। আমার এই চেম্বারে গতকাল রাতেও তাকে দেখেছিলাম। আজও দেখেছি।’
‘কোথায় দেখেছেন?’
‘বাথরুমে। আমি একটু আগে বাথরুমে ঢুকতেই বৃদ্ধা মহিলাকে দেখলাম। গতকাল কোন কথা বলেনি। কিন্তু আজ ফোকলা দাঁতের বুড়ি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেমন আছ, মহসিন। আমি রুমির নানী।’
‘আমি কি একবার বাথরুমে উঁকি দিয়ে দেখব?’
‘কী বলব বুঝতে পারছি না। খুব ভয় পেয়েছি। বৃদ্ধার চেহারা ভয়ঙ্কর। আমারও কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে?’
আনোয়ার ধীর পায়ে বাথরুমের দিকে গেল। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। বাথরুমের কমোডের উপর এক বৃদ্ধা মহিলা বসে আছে। পরনে সাদা সুতির শাড়ি, সামনের বেশ কয়েকটা দাঁত নেই, মুখের চামড়া জায়গায় জায়গায় কালো, চোখ খুব উজ্জ্বল। হুট করে এমন দৃশ্য দেখে ক্ষণিকের জন্য যেন বন্ধ হয়ে গেল আনোয়ারের হৃৎপিণ্ড।
আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে হাসল বৃদ্ধা। কুৎসিত হাসিটা দেখে পুরো শরীর শিউরে উঠল আনোয়ারের। মাথা দোলাতে দোলাতে বৃদ্ধা বলল, ‘ভাইডি, ভাল আছ?’
আনোয়ার নিজের মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করল, ‘কে আপনি?’
‘চিনতেই তো পারছ। আবার জিজ্ঞেস করছ কেন?’
‘এখানে কী করছেন?’
‘ডাক্তার দেখাতে আসছি। আমার মেয়ে বলল, এই ডাক্তারটা নাকি অনেক ভাল। বাতের ব্যথা কি দূর করতে পারবে?’
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ভাল করে দরজাটা বন্ধ করল আনোয়ার।
ডা. মহসিন হোসেন ক্রমাগত ঘামছেন। চোখ বুজে ছিলেন, আনোয়ারকে দেখে মেললেন। শঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমিও কি বৃদ্ধাকে দেখতে পেয়েছ?’
আনোয়ার না-সূচক মাথা নাড়ল।
‘নাহ্! কিছুই দেখতে পাইনি।’
‘বুঝতে পেরেছি, রুমি সাহেব এবং তার মায়ের ঘটনাটা খুব প্রভাবিত করেছে, তাই ভুলভাল দেখেছি,’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন ডা. কামাল। ‘আজ রাতে ভাল করে ঘুমাতে হবে। চলো, কফি খেয়ে আসি। শরীরে ক্যাফেইন গেলে ভাল হবে।’
.
পাঁচ
আমেনা জাহান যেহেতু ঢাকায় ডাক্তার দেখাবে, তাই ছেলের বাড়িতেই ছিল। এই ক’দিন তার মামার বাড়িতে থেকেছে টিউলিপ। রুমিকে বলেছে, তার পক্ষে আমেনা জাহানের সঙ্গে বসবাস করা সম্ভব নয়।
আজ রুমির মা আমেনা জাহান ফিরে গেছে গাজীপুর। আগের থেকে কমিয়ে দিয়েছে কথা বলা। রুমি যথাসম্ভব যত্ন নেয়ার চেষ্টা করেছে। মায়ের দেখাশোনার জন্য বাড়িতে ছিনু নামে এক কাজের লোক রেখে দিয়েছে। নিজে শুক্র ও শনিবার এই দু’দিন নিজেই গাজীপুরে মায়ের সঙ্গে কাটায়। ছিনুর কাছে খোঁজ নিয়ে দেখেছে, নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছে মা। রাতে টানা ঘুমাচ্ছে, এমনকী খাওয়া-দাওয়াও ঠিকমত করছে। ছিনু বাড়িতে অদ্ভুত কিছু দেখেছে কি না, এটা রুমি প্রায়ই কৌশলে জিজ্ঞেস করে। ছিনু প্রশ্নটা ঠিকমত বুঝতে পারে না। ছিনুর কথা বলার ভঙ্গি দেখে রুমি বুঝেছে, বাড়িতে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে না। কে জানে, হয়তো মা ধীরে-ধীরে সেরে উঠছে।
সেদিন রুমি ইতস্তত করে আমেনা জাহানকে বলল, ‘আম্মা, এবার আমার সঙ্গে ঢাকা চলেন।’
আমেনা জাহানের মুখে হাসি ফুটল। আনন্দিত গলায় বলল, ‘অবশ্যই যাব, বাবা। কিন্তু…’
‘কিন্তু কী, আম্মা?’
‘বউমা তো আমাকে পছন্দ করে না।’
‘সব ঠিক হয়ে যাবে, আম্মা। টিউলিপকে আমি বোঝাব।’
‘আচ্ছা। আর কিছু দিন পরেই তোর সঙ্গে ঢাকা যাব।’
মায়ের কথায় খুশি হলো রুমি। মা সেরে উঠছে। ডা. মহসিন কামালের চেম্বার থেকে আসার পর আর নানীর কথা বলেনি। বাবাকে হত্যার কথা জানার পরেও রুমি কেন জানি মায়ের প্রতি এক ধরনের মমতা অনুভব করে। একজন রোগীর উপর রাগ করাটা সমীচীনও নয়।
একদিন আমেনা জাহান বলল, ‘তুই বউমাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে কিছু দিনের জন্য এখানে নিয়ে আয়। বড্ড একা লাগে রে।’
‘আমি টিউলিপকে বলব, আম্মা।’
‘মেয়েটা মনে হয় আমার উপর খুব রাগ করেছে। ওর উপর খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছি। মিথ্যা সন্দেহ করেছিলাম।’ আমেনা জাহানের মুখে বিষাদের ছায়া পড়ল।
‘না, আম্মা, এসব মাথায় আনবেন না। আপনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। আমরা এসব ভুলে গেছি।’
‘তুই তো কাল ঢাকা যাচ্ছিস, এবার সপ্তাহ শেষে যখন আসবি, বউমাকেও নিয়ে আসবি।’
‘আচ্ছা, আম্মা।’
পরের সপ্তাহে টিউলিপকে নিয়ে গাজীপুর এল রুমি। টিউলিপকে অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করাতে হয়েছে।
টিউলিপ বলেছে, সে মাত্র এক সপ্তাহ থাকবে, এরপর ঢাকা ফিরবে। এবার টিউলিপের যত্নের চূড়ান্ত করল আমেনা জাহান। সব দেখে কেমন ভড়কে গেছে টিউলিপও। শাশুড়ির এমন সুব্যবহার প্রত্যাশা করেনি। বউয়ের জন্য শুক্রবার নানান খাবারের আয়োজন করে শাশুড়ি। বউকে প্রথমবারের মত সোনার এক সেট গহনাও দিল। মায়ের অসুস্থতা এবং এমন ভয়াবহ পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে টিউলিপকে কিছু বলেনি রুমি। আর মা পুরোপুরি সুস্থ হলেও হয়তো তাকে কোনদিনও ক্ষমা করতে পারবে না টিউলিপ। মানুষ হত্যাকারীকে কি ক্ষমা করা যায়?
আজীবন মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে ঠিক করেছে রুমি।
.
আজ অফিস থেকে ফিরে রুমির শরীর ও মন দুটোই খারাপ। মনে কেমন যেন সব খারাপ চিন্তা উঁকি দিচ্ছে। ডাক্তার বলেছিলেন, মাকে সবসময় চোখে-চোখে রাখতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব ভর্তি করতে হবে ক্লিনিকে। মনের অস্বস্তি দূর করতে আনোয়ারকে ফোন করল রুমি।
দুইবার রিং বাজতেই ফোন ধরল আনোয়ার। ‘হ্যালো, রুমি সাহেব, কেমন আছেন?’
‘জী, ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?’
‘জী, ভাল।’
‘আসলে একটা বিষয় শেয়ার করতে আপনাকে ফোন করেছি। এত রাতে ফোন করাটা ঠিক শোভন নয়, কিন্তু খুব অস্বস্তি হচ্ছিল, তা-ই…’
‘এত অস্বস্তির কিছু নেই। আমি গত কিছু দিন ধরেই আপনার মায়ের ব্যাপারটা ভাবছি। একবার আপনাদের বাড়িতে যেতে চাই।’
‘অবশ্যই যাবেন।’
‘আচ্ছা, এবার বলুন আপনার অস্বস্তির কারণটা।’
‘আসলে গতকাল টিউলিপকে আম্মার কাছে রেখে এসেছি। আম্মা এখন আগের চেয়ে সুস্থ, মানে নানীকে নিয়ে আর কোন কথাও বলেননি।’
‘টিউলিপ কি জানে আপনার মায়ের অসুস্থতার কথা?’
‘না।’
‘আপনি সর্বশেষ কখন কথা বলেছেন টিউলিপের সঙ্গে?’
‘দুপুরের দিকে।’
আনোয়ার নিজের আতঙ্কটা ঢাকতে পারল না। কাঁপা গলায় বলল, ‘মস্তবড় ভুল করেছেন। এখনই টিউলিপকে ফোন করুন।’
আতঙ্কটা রুমির মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল। ‘কী ভুল করেছি? কী বলতে চাইছেন?’
‘হ্যাঁ। ভয়ঙ্কর ভুল করেছেন। টিউলিপকে এখনই বলুন ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিতে।’
‘কেন?’
আমার মনে হচ্ছে, টিউলিপ মারাত্মক কোন বিপদে পড়তে যাচ্ছে। তার কোন ক্ষতি হবে। এসব ব্যাপারে আমার অনুমান-শক্তি খুবই ভাল। চাই এবার আমার অনুমান ভুল প্রমাণিত হোক।’
‘কে ক্ষতি করবে টিউলিপের? আম্মা?’
‘সেটা জানা এখন জরুরি নয়। এসব নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। আপনি এখনই টিউলিপকে ফোন করুন।’
‘রাত বারোটার বেশি বাজে। এত রাতে ও কীভাবে ঢাকায় আসবে?’
‘অন্তত তাকে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বলুন, প্লিজ!’ জোরের সঙ্গে বলল আনোয়ার।
ফোন কেটে দিল রুমি। টিউলিপের নাম্বারে ডায়াল করতে গিয়ে কাঁপছে তার হাত।
দুইবার রিং হলো। ফোন ধরল না টিউলিপ।
বুকের ভিতরটা কাঁপতে লাগল রুমির। পর-পর সাতবার কল করল। কিন্তু ফোন ধরল না টিউলিপ।
মায়ের নাম্বারে ফোন করে রুমি বুঝল ওই ফোনও বন্ধ।
আবারও আনোয়ারকে ফোন করল রুমি। ‘টিউলিপ ফোন ধরছে না!’
হাত মুষ্টিবদ্ধ করল আনোয়ার। হয়তো তার অনুমানই সত্যি, তবুও ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘চিন্তা করে এখন লাভ নেই। যত দ্রুত সম্ভব গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা দিন।’
‘হতে পারে না, ঘুমিয়ে পড়েছে টিউলিপ?’ কাতর গলায় বলল রুমি। ‘তা হতে পারে
‘আমার খুব ভয় লাগছে।’
‘আরও কয়েকবার ফোন করুন। যদি এত রাতে গাজীপুর যেতে সমস্যা হয়, তবে যত ভোরে সম্ভব রওনা দিন।’
টিউলিপের নাম্বারে আবার ফোন করল রুমি। এবার রিসিভ করা হলো ফোন। রুমি উত্তেজিত গলায় বলল, ‘হ্যালো।’
ওপাশ থেকে শোনা গেল আমেনা জাহানের কণ্ঠ, ‘কেমন আছিস, বাবা?’
‘আম্মা, টিউলিপ কোথায়?’
‘আছে। জায়গামত আছে।’
‘আম্মা, টিউলিপকে একটু দেন, প্লিজ!’
পিশাচের হাসি হেসে আমেনা জাহান বলল, ‘তোর নানী চেপে ধরে রেখেছে টিউলিপকে। বৃদ্ধ বয়সেও গায়ের জোর দেখে অবাক হয়ে যাই।
রুমি চিৎকার করে বলল, ‘আম্মা, আপনারা কী করেছেন টিউলিপের?’
‘তোর নানী চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে টিউলিপকে। আর আমি বের করেছি হাতুড়িটা।’
‘আম্মা! আপনার পায়ে পড়ি, টিউলিপকে ছেড়ে দেন! আম্মা!’
রুমির কথা আমেনা জাহানের কানে গিয়েছে বলে মনে হলো না। বলতে লাগল, ‘আমি গুনে গুনে দুটো বাড়ি দেব বউমার মাথায়। এই দুই বাড়িতে মরলে মরবে, নতুবা বেঁচে যাবে।
রুমি শুনতে পাচ্ছে তার নানীর কথা। ‘এদিকে আয়, আমেনা, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
গোঙানির মত শব্দ তুলছে কেউ একজন।
রুমি বুঝল, টিউলিপই।
সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করতে থাকল রুমি: ‘আম্মা! না-না! না!’
বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল রুমি। পাগলের মত ছুটল।
ক্রুর হাসি হেসে টিউলিপের কপালে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিল আমেনা জাহান। প্রচণ্ড আঘাতে দেহটা কেঁপে উঠল টিউলিপের। কপাল ফেটে গলগল করে বেরোচ্ছে রক্ত। আমেনা জাহান এবং নানী এক দৃষ্টিতে দেখছে। কেউ দেখলে তার মনে হবে, পুরো বিষয়টায় এরা ব্যথিত।
ঠাণ্ডা গলায় বলল নানী, ‘আমেনা, দ্বিতীয় বাড়িটা দে।’
দাঁতে দাঁত ঘষে প্রচণ্ড আক্রোশে টিউলিপের মাথার মাঝখানে সজোরে আঘাত করল আমেনা জাহান।
জিভ বেরিয়ে এল টিউলিপের। মাথা, কপাল ফেটে ছিটকে বেরোচ্ছে তাজা রক্ত। ভিজে গেল মুখ, গলা, পিঠ ও বুক। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে টিউলিপ, অথবা মারা গেছে।
.
ছয়
গাজীপুরে পাশের বাসার মোসলেম কাকাকে ফোন করল রুমি। জানাল, দ্রুত তাদের বাসায় যেতে। বিপদ হয়েছে টিউলিপের।
গুছিয়ে কথা বলতে পারছে না রুমি।
কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে রুমিদের বাসায় গেলেন মোসলেম কাকা। তাঁকে দেখে কাঁদতে লাগল আমেনা জাহান।
মোসলেম সাহেব বললেন, ‘কী হয়েছে, ভাবী? রুমি আমাকে ফোন করে কী বলল…কিছু বুঝতে পারিনি। শুধু বুঝেছি, বউমার কোন বিপদ হয়েছে।’
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, বিপদ হয়েছে। আমাদের বউমা বাথরুমে পড়ে মাথায়, কপালে গুরুতর আঘাত পেয়েছে।
‘বলেন কী! বউমাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
‘হ্যাঁ, নিয়ে চলুন। কিন্তু বউমা আর বেঁচে আছে কি না আল্লাই জানেন।’ বাথরুমের মেঝেতে পড়ে আছে টিউলিপ। বাথরুমের দরজাটা ভাঙা। সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেল টিউলিপকে।
মনে-মনে হাসছে আমেনা জাহান। দুই বাড়িতেই থেমে থাকেনি, গুনে গুনে পাঁচটা বাড়ি দিয়েছে। ছিনুকেও আগেই বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। কারণ, ছিনু থাকলে কাজটা সারতে সমস্যা হত। সব জেনে গেছে রুমি। তাই এখন ওকেও সরিয়ে দিতে হবে। এমনিতেই রুমির সঙ্গে অনেক দিনের দেনা-পাওনা বাকি আছে। তার কারণে যদি পুলিশ এসে তাকে ধরেও নিয়ে যায়, তাতেও সমস্যা নেই। আম্মা তো আছেনই। তিনিই সব সামলাবেন। মনের ভিতর বিভিন্ন ভাবনা ঘুরতে থাকল আমেনা জাহানের।
.
টিউলিপকে কাছের হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
রোগিণীর অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন ডাক্তার।
এবার আগের মত ভালভাবে কাজটা সমাধা করতে পারেনি আমেনা জাহান। ডাক্তার দেখেই বুঝলেন, ধাতব কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে রোগীকে। সে চলে গেছে কোমায়। বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
যা বোঝার বুঝে গেলেন মোসলেম সাহেব।
আমেনা জাহান বলল, ‘আমি বাড়িতে যাই, একা আছেন আম্মা।’
‘আম্মা মানে?’
কিছু না বলে হাসল আমেনা জাহান।
বুকের ভিতরটা ছ্যাত করে উঠল মোসলেম সাহেবের। তিনি জানেন, অনেক আগেই মারা গেছেন আমেনা জাহানের মা। তা হলে এখন কার কথা বলছেন, টিউলিপকেই বা কে আঘাত করল?
আমেনা জাহান আর কথা না বাড়িয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল।
.
রুমির কান্নায় ভারী হয়ে উঠল হাসপাতালের পরিবেশ। মায়ের কুকীর্তির কথা সে সবাইকে জানিয়ে দিল। মোসলেম চাচা বললেন, ‘শান্ত হও, বাবা। এসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আগে বউমা সুস্থ হয়ে উঠুক।’ একটু থেমে বললেন, ‘আমি এত বছর ধরে তোমাদের পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করছি, কিন্তু তোমার মা যে এমন ভয়ঙ্কর মানুষ কখনও বুঝতেই পারিনি।’
রুমি যখন রক্ত ও ওষুধ নিয়ে ছোটাছুটি করছে, তখন ফোন করল আনোয়ার।
রুমি জড়ানো গলায় বলল, ‘আপনার আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে।’
‘হুম, আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। টিউলিপের কী অবস্থা?’
‘আম্মা আর নানী তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। এখন হাসপাতালে আছে। কী হবে কিছু বলা যাচ্ছে না।’
‘কোন্ হাসপাতালে? আমি গাজীপুর চলে এসেছি।
‘এত ভোরে কীভাবে এলেন?’
গতরাতে আপনার সঙ্গে কথা শেষ করে আমিও গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছি। শুধু উপদেশ দিয়ে বাড়ি বসে থাকার মানুষ আমি নই।’
রুমি হাসপাতালের নাম বলল।
পনেরো মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছে গেল আনোয়ার। রুমির কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘টিউলিপের বাসায় জানিয়েছেন?’
‘টিউলিপ তো মামার বাসায় থাকত। মামাকে কিছু জানানোর সাহস হয়নি।’
‘আপাতত কিছু জানানোর দরকার নেই। আপনার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে?’
‘না। ওই ডাইনীর সঙ্গে দেখা করতে চাই না। তার নামে কেস করব। ওকে ফাঁসিতে ঝোলাব।’
‘শান্ত হোন।’
‘আমাকে বোঝাতে আসবেন না! আপনি এবং ডা. মহসিন কামাল দু’জনেই আমাকে ভুল বুঝিয়েছিলেন!’
‘কী বিষয়ে?’
‘ডা. মহসিন বলেছিলেন, আমার নানী আমার মায়ের কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। এখন সেই নানীই আমার জীবনটা বিষিয়ে দিচ্ছে। আমি গতকাল টেলিফোনেও তার কথা শুনতে পেয়েছি।
আরও গম্ভীর হলো আনোয়ারের মুখটা।
রুমি আক্রোশে ফেটে পড়ে বলল, ‘আসলে আমার মা কোন রোগী নয়, সে ভয়ঙ্কর এক খুনি! আর আমার নানীর অস্তিত্বও সত্যি! আপনাদের সব অনুমান ভুল!’
‘এত দ্রুত কোন সিদ্ধান্তে আসাটা ঠিক হবে না। আমি কিন্তু একবারও বলিনি আপনার নানীর অস্তিত্ব মিথ্যা। এটা ডাক্তারের বক্তব্য। আর ডা. মহসিন কামালের সব কথাই সঠিক, শুধু আপনার নানীর বিষয়টা ছাড়া।’
‘বুঝতে পারছি না আপনার কথা।’
‘আপনার মা এবং নানী দু’জনেই সিজোফ্রেনিক রোগী-এটা সত্য। তবে আপনার নানীর অস্তিত্ব মিথ্যা নয়। মৃত নানীর ফিরে আসার বিষয়টা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। অতিপ্রাকৃত বিষয়ে আমার স্বল্প জ্ঞান আছে। তার উপর ভিত্তি করে বলতে পারি, খারাপ অতৃপ্ত আত্মা নানা বেশে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সব মন্দ আত্মা প্রকাশ্যে আসতে সাহস পায় না। কিন্তু নানীর সাহস আপনার মা। আপনার মায়ের শক্তিকে পুঁজি করে সে ফিরে আসার সাহস দেখিয়েছে। দিনে দিনে আপনার মায়ের মাধ্যমে তার শক্তি এবং সাহস বেড়েছে। আনোয়ারের গলার স্বর কিছুটা কঠিন শোনাল, ‘আপনাকে বলা হয়নি, আমি কিছু দিন আগে চাঁদপুর গিয়েছিলাম আপনার মামার কাছে।’
আনোয়ারের দিকে বিস্মিত চোখে তাকাল রুমি। ‘মামার কাছে গিয়েছিলেন কেন?’
‘আমার মনে হয়েছিল আপনার মামা এমন কিছু জানেন, যা অন্য কেউই জানে না। সে ব্যাপারে জানতেই গিয়েছিলাম। প্রথমে আপনার মামা কিছুতেই মুখ খুলতে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে তাঁকে সব খুলে বললাম। আপনার মায়ের অতীত কুকীর্তির কথা, অসুস্থতার কথা। এসব শুনে ধীরে-ধীরে তিনি সব বললেন।’
‘মামা কী বলেছিলেন?’
‘ভয়ঙ্কর এক তথ্য জানতে পেরেছি। আপনার নানীই আপনার নানাকে খুন করেছিল।’
‘ওহ, আল্লাহ!’ উত্তেজনায় বেঞ্চি ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল রুমি।
‘আপনার নানীর এ খুনের বিষয়টি আপনার মামা বুঝতে পেরেছিলেন। এজন্য তাঁকেও একাধিকবার মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তাই আপনার মামা তার মা এবং বোন থেকে সারাজীবন পালিয়ে বেড়িয়েছেন।’
‘আমি আমার মা এবং ওই বদমাস নানীর ওপর প্রতিশোধ নেব,’ দাঁতে দাঁত চেপে বলল রুমি।
‘মা শত অপরাধ করলেও মায়ের উপর প্রতিশোধ নেয়া যায় না। আর আপনার মায়ের চিকিৎসা প্রয়োজন। তাকে দ্রুত ক্লিনিকে ভর্তি করুন। রোগী না হলে কোন বিশেষ কারণ ছাড়া এমন আক্রোশ দেখাতে পারে না কেউ।’ কয়েক সেকেণ্ড পর বলল আনোয়ার, ‘আপনার মায়ের এই অবস্থার জন্য নানীই দায়ী। সে-ই ছোটবেলা থেকে আপনার মাকে এমন অসুস্থ করে গড়ে তুলেছে। অন্যকে কষ্ট দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পেত। এবং আমি জানি, আপনার মা, নানী আপনাকেও খুন করার চেষ্টা করবে। এমনকী আমাকেও।’
‘ওই বদমাস নানীর বিষয়ে কি আমাদের কিছু করার আছে?’
‘আজ রাতেই আমি কিছু করার চেষ্টা করব।’
‘কী ধরনের চেষ্টা?’
‘আপনাকে সবই বলব। আপনার সাহায্যও চাই। আমি আজ রাতে আপনার বাড়িতে থাকব এবং নানীর মুখোমুখি হব।’
‘কিন্তু ওরা দু’জন তো আপনাকে মেরে ফেলবে। আপনি এত বড় ঝুঁকি কেন নেবেন?’
‘দেখা যাক মেরে ফেলতে পারে কি না।’
‘আপনি কি নানীর আত্মাকে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন?’
‘হ্যাঁ। তবে মন্ত্র দিয়ে বা বিশেষ কোন পদ্ধতিতে নানীকে তাড়ানো কঠিন হবে। বুদ্ধি করে পরাজিত করতে হবে তাকে।’
‘কীভাবে?’
‘আত্মার বিরুদ্ধে আত্মাকে দাঁড় করিয়ে দেব।’
‘মানে!’
‘আপনার নানীকে পরাজিত করতে ফিরবে আপনার বাবা।’
আমার বাবাকে আপনি ফিরিয়ে আনবেন? কীভাবে? প্ল্যানচেট?’
‘না। আপনার বাবাকে ফিরিয়ে আনা হবে না। আমরা শুধু এমন পরিস্থিতি করব, যেন মনে হয় আপনার বাবার আত্মা ফিরেছে।’
আমি এসব ভাল করে কিছুই বুঝতে পারছি না!’
‘আপনি আমাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন। মাকে বলবেন, আজ রাতে আপনাদের বাসায় থাকব আমি। আপনার মা এতে খুশি হবে। আজ রাতে চেষ্টা করবে আমাকে শেষ করতে। আপনার মা জানবে আপনি হাসপাতালে টিউলিপের কাছে আছেন, কিন্তু আপনি লুকিয়ে থাকবেন বাড়িতেই।’
‘বাড়িতে লুকিয়ে থেকে কী লাভ?’
‘লাভ আছে। যা বলছি, মন দিয়ে শুনুন: আপনি আপনার মায়ের খাটের নিচে কৌশলে লুকিয়ে পড়বেন। আপনার মায়ের রুমে বসেই নানীর মোকাবেলা করব আমি। যখন আপনার বাবার আত্মাকে আহ্বান করব, তখন খাটের নিচ থেকে আপনি সাড়া দেবেন। আপনিই হবেন আপনার বাবার আত্মা।’
‘খানিকটা বুঝতে পেরেছি আপনার পরিকল্পনা। তবে পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।’
‘আপনার বাবা ফিরে এসেছে এটা জেনে আপনার নানী এবং মা ভয় পাবে। আপনিও দৃঢ় কণ্ঠে তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। এরপর সুযোগ মত খাটের তলা থেকে বেরিয়ে আসবেন। রুম থাকবে অন্ধকার এবং আপনার মুখে থাকবে মুখোশ। তাই তারা আপনাকে চিনতে পারবে না। এরপর…’
আনোয়ারকে থামিয়ে দিয়ে রুমি বলল, ‘বিষয়টা কি এতই সহজ?’
‘আপনি সব ঠিকঠাক করতে পারলে অবশ্যই সহজ। কিছু সময়ের জন্য আপনি সুলতান মাহমুদ হয়ে যাবেন। আপনার হাতে থাকবে একটা হাতুড়ি।’
‘হাতুড়ি দিয়ে কী করব?’
‘আপনার নানীর মাথায় আঘাত করবেন।’
‘একটা আত্মাকে আঘাত করব? তা কি সম্ভব?’
‘হ্যাঁ, সম্ভব। এই আঘাত ফলপ্রসূ হবে।’
‘যদি আমাকে উল্টো মারতে আসে?’
সে সম্ভাবনা আছে। তবে এটুকু ঝুঁকি নিতেই হবে। নানী আপনার বাবার উপর অবিচার করেছিল, তাই অবশ্যই পুরো বিষয়টায় ভয় পাবে। শক্তিশালী খারাপ আত্মা মানুষকে ভয় পায় না, তবে একটা ভাল আত্মাকে অবশ্যই ভয় পাবে।’
তার রুমের খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে আমেনা জাহান। চেয়ারে বসে আছে আনোয়ার। ঘরে টিমটিম করে জ্বলছে বাল্ব। আমেনা জাহানের মুখে হাসি। মনে হচ্ছে কিছু একটা নিয়ে মজা পাচ্ছে। পানের বাটা থেকে এক খিলি পান মুখে দিল। পান চিবুতে-চিবুতে বন্ধ হয়ে এল তার চোখ। বলল, ‘আনোয়ার?’
‘জী।’
‘তুমি আজ এই বাড়িতে থাকবে?’
‘জী।’
‘তুমি তো বুদ্ধিমান ছেলে। তারপরও এই বাড়িতে থাকবে?’
‘জী। রুমি সাহেব বলেছেন বাসায় থাকতে। ভাবী অসুস্থ শুনে এসেছিলাম।’
‘আমার তো মনে হয় তুমি আমার কাছে এসেছ।’ বিস্তৃত হলো আমেনা জাহানের মুখের হাসি।
আনোয়ারও হাসল।
আমেনা জাহান আবার বলল, ‘আমার ছেলে কিন্তু হাসপাতালে চলে গেছে। এখন বাড়িতে তুমি আর আমি। ও, ভুল বললাম- আরও একজন আছে।’
আনোয়ার হাই তুলল।
আমেনা জাহান মুখটা বিকৃত করে বলল, ‘তোমার ভয় লাগছে না? টিউলিপ মেয়েটার অবস্থা কী হয়েছে দেখোনি?’
‘হ্যাঁ, দেখেছি। আপনি খুব ভাল খেলোয়াড়।
‘খেলোয়াড়?’
‘হ্যাঁ। আপনার আম্মা কোথায়? তাকে ডাকুন।
চেহারা ধীরে-ধীরে বদলে যেতে থাকল আমেনা জাহানের। ক্রমশ লাল হয়ে যাচ্ছে মুখ, চোখের মণি এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। বালিশের নিচ থেকে হাতুড়িটা বের করল। এমন সময় কমে গেল বাল্বের আলো। সরু, লাল তারের মত কাঁপছে। হঠাৎ করে ঘরের ভিতর বয়ে গেল দমকা এক হাওয়া।
কেউ একজন আনোয়ারের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পচা গন্ধ আসছে তার শরীর থেকে। অনেকটা পচা ডিমের মত। আমেনা জাহান কড়া গলায় বলল, ‘আম্মা, এই ছেলের অনেক সাহস। মরতে ভয় পায় না।’
ধীর পায়ে আনোয়ারের সামনে এসে দাঁড়াল মানুষটি। তার মুখ ভালভাবে দেখতে পাচ্ছে না আনোয়ার।
লালা টেনে বলল নানী, ‘মরতে সবাই ভয় পায় রে। শুধু বোকারা মরতে ভয় পায় না।’
‘না, আম্মা, এ বোকা নয়। তবে আসলেই ভয় পায় না।’
‘তাই নাকি!’ আনোয়ারের মুখের উপর নখ দিয়ে মৃদু আঁচড় কাটল নানী। ফোকলা দাঁতের হাসি দেখে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল আনোয়ারের।
নানীর আঁচলের মধ্য থেকে বেরোল একটা হাতুড়ি।
উঠে দাঁড়াল আনোয়ার। ওর ঘাড় চেপে ধরল নানী।
বৃদ্ধার শক্তি দেখে চমকে গেছে আনোয়ার। বাধ্য হলো চেয়ারে বসতে। উঠে দাঁড়াল আমেনা জাহানও। আকাশের দিকে চেয়ে বলল, ‘আজ তোর ঘিলু বের করব। তোর শরীরের প্রতিটা হাড় ভাঙব।’
আনোয়ার ফিসফিস করে বলল, ‘তোমরা আমার কিছু করতে পারবে না। একজন আমাকে রক্ষা করবেন।’
আমেনা জাহান বলল, ‘কে?’
‘তোমার স্বামী সুলতান মাহমুদ, যাঁকে হত্যা করেছিলে। তিনি আমাকে বাঁচাবেন।’
‘না-না, এ হতে পারে না, তুই মিথ্যা বলছিস,’ চাপা আতঙ্ক নানীর গলায়। ‘মিথ্যা নয়। তিনি বসে আছেন খাটের তলে।
পিশাচীর মত হেসে উঠল আমেনা জাহান। তার হাসিতে যোগ দিল নানীও। শ্লেষ্মাজড়িত গলায় বলল, ‘এমন বোকা ছেলে আর দেখিনি, বুঝলি, আমেনা!’
‘আমিও দেখিনি, আম্মা।’
‘এই বোকা রুমির সঙ্গে বুদ্ধি পাকিয়েছে। ভেবেছে আমরা কিছু জানি না।’
‘রুমিকে সুলতান মাহমুদ বানাতে চেয়েছিল, হা-হা,’ বহুদূর যেন ছড়িয়ে পড়ল হাসির শব্দ। ‘বোকা ছেলে। আমাদেরকে কী মনে করিস?’
‘রুমিকে কোথায় রেখেছিস, আমেনা?’
‘ওর মাথার পিছনে জম্পেশ বাড়ি দিয়েছি। মনে হয় অজ্ঞান, বা মারা গেছে। গেস্টরুমে ফেলে রেখেছি।’
ওই জঞ্জালটাকে আর বাঁচিয়ে রাখব না। আজই রুমিকে মেরে ফেলব। অনেক জ্বালাচ্ছে হারামজাদা।’
‘হ্যাঁ, আজকে কাজ শেষ করে চলে যাব অনেক দূরে। সব ঠিক করা আছে। গা ঢাকা দিতে হবে।’ একটু বিরতি দিয়ে নানী বলল, ‘ডা. মহসিন কামালকেও শিক্ষা দিতে হবে। পাগলের ডাক্তার আমাকে প্রথমবার দেখেই ভয় পেয়েছে। ওকে মারতে মজা লাগবে।’
এবার সত্যি আনোয়ারের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। ভাবল, আজ খুব খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে ওর জন্য।
কী করে সব জেনে গেল এরা?
উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল আনোয়ার।
কিন্তু নানীর লোহার মত শক্ত হাত তাকে নড়তে দিচ্ছে না।
হাতুড়িটা উঁচু করল আমেনা জাহান। প্রথম আঘাতটা আমেনা জাহানই করবে, এটা অনেক দিনের নিয়ম। ঘরের ভিতরের আলোটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল 1 আতরের তীব্র ঘ্রাণে ভরে উঠল ঘরটা। ঝিরঝিরে বাতাসে জুড়িয়ে গেল আনোয়ারের শরীরটা। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে আমেনা জাহান এবং নানী। ঘরের ভিতর অদ্ভুত কিছু ঘটছে। হাত নিচে নামিয়ে ফেলল আমেনা জাহান।
খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এল একজন মানুষ। মুখে কালো মুখোশ। কঠিন গলায় বলল, ‘ওকে ছেড়ে দাও!’
মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরল আনোয়ারের। নিশ্চয়ই রুমি কৌশলে বেরিয়ে পড়েছে গেস্টরুম থেকে। লুকিয়ে ছিল খাটের নিচে। তবে আনোয়ারের মনে সংশয় এল। এরা সব জেনে গেছে, আদৌ ভয় পাবে কেন রুমিকে?
আমেনা জাহান কাঁপা গলায় বলল, ‘কে-কে?’
‘আমি। চিনতে পারছ না, আমেনা?’
‘নাহ্! নাহ্! এসব মিথ্যা!’
নানীর দিকে দৃষ্টি দিয়ে সে বলল, ‘আম্মা, ভাল আছেন? আমি সুলতান।’
কয়েক কদম পিছনে গেল নানী। বোঝা যাচ্ছে ভয় পাচ্ছে।
আনোয়ার বুঝতে পারল, এরা চিনতে পারেনি রুমিকে।
নানী বলল, কী চাও তুমি?’
‘তোকে নরকে পাঠাতে চাই।’
‘না! তুমি চলে যাও!’
হাতুড়ি বের করল রুমি। পিছনে সরছে আমেনা জাহান এবং নানী। তাদের হাত থেকে পড়ে গেছে হাতুড়ি।
একটা হাতুড়ি তুলে নিল আনোয়ার। বলল, ‘ভাল আত্মার কাছে আজ খারাপ আত্মার পরাজয় ঘটবে। আজ তোমাদের দু’জনের ওপর একই সঙ্গে আঘাত করা হবে। প্রচণ্ড আঘাত। ভয়াবহ আঘাত।’
আনোয়ার এবং রুমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। রুমিকে কেন জানি একটু বেশি লম্বা লাগছে। গলার স্বরও কেমন বদলে গেছে। শরীর থেকে ভুর-ভুর করে আসছে আতরের ঘ্রাণ।
আনোয়ারের হাত ধরল রুমি। শীতল কিন্তু ভরসামাখা একটা হাত। সেই হাতটা যেন বলছে, কোন ভয় নেই, আমি আছি। প্রচণ্ড আক্রোশে নানীকে প্রথম আঘাতটা করল রুমি। শোনা গেল অশরীরী এক আর্তনাদ!
কাতর গলায় বলল নানী, ‘আমাকে মারিস না। আমাকে মারিস না। আমি চলে যাব।’ রুমির কোন ভাবান্তর হলো না। চোয়ালে দ্বিতীয় আঘাতটা করল সে। এরপর একের পর আঘাত চলতেই থাকল। প্রতিটা আঘাতই নির্দিষ্ট সময় পর- পর। যেন ঘড়ির কাঁটা ধরে দুই সেকেণ্ড অপেক্ষা করছে, তারপরেই আঘাত। নানীর মাথাটা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেল, বাম দিকে বেঁকে গেল মুখটা। লুটিয়ে পড়ল দেহটা, মেঝে প্লাবিত হলো কালো রক্তে।
রুমি বলল, ‘এবার তোমার পালা।’ হাতুড়ি তুলে আমেনা জাহানের মাথায় আঘাত করল সে। এক আঘাতেই কুপোকাত। আমেনা জাহানের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। তাল হারিয়ে পড়ে গেছে মহিলা। রুমি বলল, ‘এবার মারবে তুমি, আনোয়ার। বাড়ি দাও ওর মাথায়।’
আনোয়ার বলল, ‘না, উনি মানসিক রোগী। ক্লিনিকে ভর্তি করতে হবে।’
কথাটা যেন মেনে নিল না রুমি, তবে আমেনা জাহানকে ছেড়ে সরে গেল। এরপর চুল ধরে নিয়ে যেতে লাগল নানীকে।
রুমির শরীরের শক্তি দেখে আনোয়ার হতবাক। এক হাত দিয়ে সে নানীর দেহটা টেনে নিচ্ছে। নানী মৃদু গলায় বলছে, ‘মাফ করে দাও! মাফ!’ আমেনা জাহান পড়ে আছে মেঝেতে। মনে হচ্ছে কাঁদছে। নানীকে টেনে হিচড়ে পাশের রুমে নিয়ে গেল রুমি। আনোয়ারকে বলল, ‘তুমি এই রুমেই থাকো।
পাশের রুমে শুরু হলো তীব্র হুটোপুটির শব্দ। কিছুক্ষণের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল বিশ্রী পোড়া গন্ধ। নানীর তীব্র আর্তনাদ শুনল আনোয়ার। কৌতূহল ঠেকাতে না পেরে পাশের রুমে চলে এল ও। দেখল নানীর শরীরে দাউ-দাউ জ্বলছে আগুন। বুড়ি ছটফট করছে। রুমিই তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু যুবককে কোথাও দেখল না আনোয়ার। মিনিট তিনেকের মধ্যে অদৃশ্য হলো নানীর শরীরটা। মাটিতে শুধু পড়ে রইল কিছু ছাই।
আনোয়ারের মনে হলো, আর কোন ভয় নেই। এমন সময় গেস্টরুম থেকে কারও চিৎকার শুনল ও। কেউ একজন ভেঙে ফেলতে চাইছে দরজা।
ওদিকে এগিয়ে গেল আনোয়ার। ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।
ছিটকিনিটা খুলে দিল আনোয়ার।
প্রায় লাফিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল রুমি। মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল সে, আমি আপনাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম আপনাকে ওরা মেরে ফেলেছে।’
বিস্মিত হয়ে ভাবল আনোয়ার, গেস্টরুমে কী করছে রুমি? বাইরে থেকে ছিটকিনি দিল কে?
‘আমার মাথায় আঘাত করেছিল দুই বদমাস,’ বলল রুমি, ‘জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কীভাবে যেন জেনে গিয়েছিল আমাদের প্ল্যান।
চমকে বলল আনোয়ার, ‘তার মানে ওই লোকটা আপনি ছিলেন না?’
‘কোন্ লোক?’
‘এ জন্যই তাকে আপনার চেয়ে লম্বা লাগছিল। গলার স্বরও অন্যরকম। আর আপনার আম্মা এবং নানী তাকে ভয়ও পেয়েছিল।’
‘কার কথা বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘সম্ভবত আপনার বাবা ফিরে এসেছিলেন, রুমি। ভাল আত্মা খারাপ আত্মাকে পরাজিত করেছে। আর কোন ভয় নেই।’
হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল রুমি। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বাবা এসেছিলেন? সত্যি?’
‘হ্যাঁ, রুমি। আপনার বাবা বদমাস নানীকে ধ্বংস করে আমাদেরকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।’
‘বাবা অনেক আগেই সাবধান করতে চেয়েছিলেন, আমার পাশে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি বাবাকে ভয় পেয়েছি। তাই হয়তো এতদিন অভিমান করে তিনি দেখা দেননি।’
‘ঠিকই বলেছেন, রুমি। আপনার বাবার মৃত্যুর পর, তিনি বারবার আপনার কাছে এসেছেন। কিন্তু আপনি তাঁকে ভালভাবে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু আজ তিনি ঠিকই ফিরে এসে আমাদের রক্ষা করলেন।’
‘আমি আমার বাবাকে দেখতে চাই।’
‘আমার মনে হয় না তিনি আর দেখা দেবেন। আপনার নানীর সঙ্গে-সঙ্গে তিনিও হারিয়ে গেছেন।’
আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল রুমি।
‘আপনাকে হাসপাতালে যেতে হবে,’ বলল আনোয়ার, ‘আপনার আম্মাও আহত। তারও চিকিৎসা প্রয়োজন। আমি হাসপাতালে ফোন করছি। অ্যাম্বুলেন্স আসবে।’
.
পরিশিষ্ট
প্রায় ছিয়ানব্বুই ঘণ্টা পর মারা গেছে টিউলিপ। মেয়েটা বাঁচবে না প্রথমেই বুঝতে পেরেছিল আনোয়ার।
খুব ভেঙে পড়েছে রুমি। ওর বড় মামা-মামী খবর পেয়ে গাজীপুরে এসেছেন। রুমির এমন বিপদে দূরে থাকতে পারেননি।
আমেনা জাহানকে ভর্তি করা হয়েছে এক মেন্টাল হসপিটালে। সবসময় তার হাতে-পায়ে পরিয়ে রাখা হয় শিকল। পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। ডাক্তার বলেছেন, তার ভাল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সব কিছু মিলিয়ে আনোয়ারের মন খুব খারাপ। টিউলিপ মেয়েটাকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতা তাকেও ক্ষত-বিক্ষত করছে। আমেনা জাহানকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে আনোয়ার। তার চিকিৎসার খরচও বহন করছে। রুমির এখন যে অবস্থা সুযোগ পেলে সে নিজের হাতে তার মাকে খুন করবে। তাই বাধ্য হয়েই সব দায়িত্ব আনোয়ারকেই নিতে হচ্ছে।
আজ অচেনা এক নাম্বার থেকে এল ফোন। কল রিসিভ করল আনোয়ার, ‘হ্যালো।’
‘আনোয়ার সাহেব বলছেন?’
‘জী।’
‘আমি ডাক্তার শফিক।’
‘জী, ডাক্তার সাহেব, বলুন।’
‘আপনার রোগী আমেনা জাহান কিছুক্ষণ আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।’
‘এসব কী বলছেন?’
‘জী। আপনি চলে আসুন। আমেনা জাহানের পরিবারের লোকজনকে খবর দিন।’
ডা. শফিক ফোন রেখে দিলেন।
মাথা কাজ করছে না আনোয়ারের এখন কী করবে?
রুমিকে নিশ্চয়ই জানানো উচিত। কিন্তু কয়েক দিন ধরেই রুমির ফোন বন্ধ। রুমির গাজীপুরের বাসায় গিয়েই খবরটা জানাতে হবে। তার মামা যেহেতু সেই বাড়িতে আছেন, তিনি কোন ব্যবস্থা নেবেন।
ভাবতে ভাবতে আনোয়ারের ঘরের ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে অন্ধ লাগল ওর। হঠাৎ অনেক দূর থেকে কেউ মোমবাতি হাতে নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে এল।
মহিলাটিকে চিনল আনোয়ার।
।আমেনা জাহান। বামহাতে মোমবাতি। ডানহাতে হাতুড়ি। হাঁটছে সোজাসুজি, ধীরে-সুস্থে। দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর আর কোন বিষয়েই কোন তাড়াহুড়ো নেই।
আনোয়ারের ধারণা হলো, যা দেখছে সবই ভ্রান্তি। আবার একইসঙ্গে কেউ মনের গহীনে বলছে, ‘পালিয়ে যাও! পালাও!’
ডা. শফিক আবারও ফোন করেছেন।
ফোন ধরল আনোয়ার।
ডা. শফিক উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘আনোয়ার সাহেব, বড় একটা ঝামেলা হয়েছে।’
‘কী হয়েছে?’
‘আমেনা জাহানের ডেডবডি মিসিং। আর…’
ফোন রেখে দিল আনোয়ার।
খুবই কাছে চলে এসেছে আমেনা জাহান, মাথার ওপর হাতুড়ি তুলে গুনগুন করে গান গাইছে:
‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার,
মৌনতার সুতোয় বোনা,
একটি রঙিন চাদর,
সেই চাদরের ভাঁজে ভাঁজে নিঃশ্বাসেরই ছোঁয়া,
আছে ভালবাসার আদর।’
.
রিয়াজুল আলম শাওন
