নিশিডাকিনী – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

নিতাই ফকির – তৌফির হাসান উর রাকিব

নিতাই ফকির

এক

শেষ বিকেলের রাঙা আলোর পরতে-পরতে বিষাদ মাখানো। শঙ্খ নদীর শান্ত জলের ওপর পাতলা একখানা চাদরের মতই ছড়িয়ে আছে সে লালচে আভা।

নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে বুনো পাখির ঝাঁক। পদ্মপাতার আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে থাকা ব্যাঙের দলের কোলাহলও খানিকটা থিতিয়ে এসেছে।

গাছের সবুজ পাতার শরীর ছুঁয়ে বয়ে চলা বাতাসে কীসের যেন চাপা হাহাকার। কান পেতে শোনা যায় না বটে, তবে দিব্যি অনুভব করা যায়।

এমন পরিবেশে মানুষের নিজেকে বড্ড ক্ষুদ্র মনে হয়, উদাস-উদাস লাগে। প্রকৃতির সীমাহীন রহস্যময়তা তাকে বিমোহিত করে, বিরক্ত করে না।

কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে রেগে বোম হয়ে আছে নিতাই ফকির; মেজাজ পুরোপুরি খিঁচড়ে আছে তার। অবশ্য এজন্য তাকে খুব একটা দোষ দেয়ারও উপায় নেই; পেট খালি থাকলে কারই বা মন ভাল থাকে?

আজ দু’দিন হতে চলল উদরে কোন দানাপানি পড়েনি তার। সহসা কিছু জোগাতে পারবে, তেমন কোন সম্ভাবনাও চোখে পড়ছে না। মেজাজ তিরিক্ষি না হয়ে উপায় কী?

চম্পকনগর হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম। মুসলমান পরিবার প্রায় নেই বললেই চলে। জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে চলা শঙ্খ নদীতে মাছ ধরে তিন বেলার আহার জোগায় কয়েক ঘর জেলে পরিবার; বাকি সবাই কৃষিকাজ করে। কারও নিজের জমি আছে, কেউবা বর্গা চাষি।

তবে অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্য না থাকলেও, গ্রামবাসীদের কেউই তেমন অসুখী নয়। যেখানে প্রত্যাশা রুম, সেখানে অতৃপ্তির কালো ছায়াও কদাচিৎই চোখে পড়ে।

গাঁয়ের শেষ মাথায়, যেখানে শঙ্খ নদী বাঁক নিয়ে হারিয়ে গেছে দূর দিগন্তে; পাশাপাশি হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে দুটো প্রকাণ্ড তালগাছ। জায়গাটা বেশ উঁচু, ভরা বর্ষাতেও ডোবে না। জোড়া গাছের গোড়া থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত সবুজ গালিচার মত বিছিয়ে আছে কচি দূর্বাঘাস। ঝোপঝাড়ের লেশমাত্রও নেই কোথাও।

মাথায় পাকা তাল পড়ে অক্কা পাওয়ার আশঙ্কাটুকু আমলে না নিলে, জায়গাটা হাত-পা ছড়িয়ে বসে গল্প করার জন্য পুরোপুরি আদর্শ। তবুও চম্পকনগরের লোকেরা নিতান্ত ঠেকায় না পড়লে, ও পথ মাড়ায় না।

জায়গাটাকে ভয় পায় ওরা; ভীষণ ভয়।

বুড়োরা বলে, মাঝরাতে অশরীরীদের হাট বসে ওখানটায়। অতীতে বেশ কয়েকবারই রাতের বেলায় ওখানে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে গাঁয়ের লোক। স্বভাবতই তালতলাটার বদনাম রটে গেছে। অতি উৎসাহ দেখাতে গিয়ে বেঘোরে জান খোয়ানোর কোন মানে হয় না। তাই এড়িয়ে চলার পন্থাটুকু বেছে নিতে কসুর করেনি চম্পকনগরের মানুষজন।

তবে অন্য সবাই ঢিবিটা থেকে দূরে-দূরে থাকলেও, একজন থাকেনি; নিতাই ফকির! এক সন্ধ্যায়, ভূতের ভয়ে জবুথুবু সবার চক্ষু চড়কগাছ করে দিয়ে, অভিশপ্ত তালতলাটাতেই গিয়ে আবাস গেড়েছে ক্ষ্যাপা লোকটা!

উন্মাদটা কে, কোত্থেকে এসেছে; কেউই জানে না। নিজের সম্পর্কে কোন কিছুই খোলসা করে বলেনি সে। উৎসুক জনতার হাজারো প্রশ্নের জবাবে নিজের নামটাই কেবল বিরক্তভরা কণ্ঠে বয়ান করেছে সে; নিতাই।

সঙ্গে ‘ফকির’ পদবীটা লোকে স্বপ্রণোদিত হয়েই জুড়ে দিয়েছে; নিতাইয়ের মতামতের ধার ধারেনি। নিতাইও কখনও এর প্রতিবাদ করেনি, বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছে। অবশ্য তার এহেন নামকরণের পিছনে তার চেহারা-সুরত আর কিম্ভূতকিমাকার পোশাক-আশাকের যে একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল, তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তারপর কালে-কালে শঙ্খ নদীতে গড়িয়ে গেছে অনেকখানি জল। চম্পকনগরের বাসিন্দাদের কাছেও ধীরে-ধীরে খোলতাই হয়েছে নিতাই ফকিরের স্বরূপ। পাগলাটে লোকটা যে আদতে কত শক্তিশালী একজন গুণিন; অদ্ভুত বেশভূষার আড়ালে কতটা ভয়ঙ্কর ক্ষমতা রাখে, সেসব বুঝতে আর বাকি নেই কারও।

নিতাই ফকির এমন একজন মানুষ, যাকে উৎসব-পার্বণে নিমন্ত্রণ করা হয় না ঠিকই, কিন্তু বিপদে পড়া মাত্রই তার কথা স্মরণ করা হয়।

বাড়ি বন্ধ করা থেকে শুরু করে বদ নজর কাটানো, এসব কাজে হরহামেশাই তার ডাক পড়ে। আর আলগা বাতাস কিংবা জিনে ধরা রোগীর কথা তো বলাই বাহুল্য।

মানুষের রকমারি মুশকিল আসানে সর্বদা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও, অজ্ঞাত কারণে কেউই খুব একটা পছন্দ করে না তাকে। এড়িয়ে চলে; ভয় পায়। তার কাছে ঘেঁষার কিংবা তাকে ঘাঁটানোর সাহস করে না কেউ। লোকটার মধ্যে অশুভ কী যেন একটা আছে। একশো হাত দূর থেকেও যেটা স্পষ্ট ঠাহর করা যায়।

অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে বিড়-বিড় করে কাকে যেন অভিসম্পাত করল নিতাই ফকির। গলা খাঁকারি দিয়ে একদলা থুতু ফেলল দোরগোড়ায়। তারপর কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে ধপ্ করে বসে পড়ল স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে। আলো ভাল লাগে না তার, সে ভালবাসে অন্ধকার।

ছোট্ট খুপরি ঘরটায় আসবাবপত্রের কোন বালাই নেই। মেঝেতে জরাজীর্ণ একখানা চাটাই আর ঘরময় ছড়িয়ে থাকা কিম্ভূতকিমাকার কিছু জিনিসপত্র; সম্পত্তি বলতে কেবল এই-ই আছে নিতাই ফকিরের।

চারপাশে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নড়বড়ে চারটে বাঁশের বেড়া। ওদের যে কোন একটা বয়সের ভারে হাল ছেড়ে দিলেই যে হুড়মুড় করে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে সব ক’টা, সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপও নেই ঘরের মালিকের।

চালার ছনগুলোর দশাও তথৈবচ; আর কতদিন টিকবে খোদা মালুম! মাঝারি আকারের একটা ঝড়েও যে চালাসুদ্ধ উড়ে যাবে ঘরটা, এহেন বাজি ধরার লোকের অভাব হবে না চম্পকনগরে।

হাত বাড়িয়ে তেল চিটচিটে ঝোলাটা কাছে টেনে নিল নিতাই; ইতিকর্তব্য ঠিক করে ফেলেছে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে, আঙুল বাঁকা করতেই হয়। কী আর করা?

আবারও নিচু স্বরে বার কয়েক খিস্তি করল সে; রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলছে তার। ভূত-প্রেতের দল সব গেল কোথায়? ওরা দলবেঁধে তল্লাট ছেড়ে পালালে তো তার অন্নসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে!

ঝোলাটা থেকে ছোটমতন একটা খুলি বেরোল। খুলিটা মানুষের না, বিড়ালের। লোকের ধারণা, কালো বিড়ালের ভিতরে অতিপ্রাকৃত কোন ব্যাপার রয়েছে। একারণেই কালো বিড়ালকে ভয়ানক অশুভ মনে করা হয়।

তবে নিতাই জানে, প্রেতলোকে সংযোগ স্থাপনের জন্য বিড়ালের খুলি ভীষণ উপকারী হলেও, রঙের কোন প্রভেদ নেই এখানে। সাদা-কালো-বাদামী, যে কোন রঙের বিড়াল দিয়েই দিব্যি কাজ চালিয়ে নেয়া যায়।

তবে জন্মান্ধ বিড়ালের ব্যাপারটা পুরোপুরি আলাদা। অন্যদের তুলনায় এই বিড়ালদের ক্ষমতা অনেক বেশি। যে কোন গুণিনের কাছেই তাই বাড়তি কদর পায় একটা জন্মান্ধ বিড়াল!

খুলিটা সামনে রেখে শিরদাঁড়া সোজা করে পদ্মাসনে বসল নিতাই ফকির। ঝোলা ঘেঁটে সবুজ রঙের ছোট একটা শিশি বের করা হয়েছে। লম্বা দম নিয়ে শিশিটা থেকে দু’ফোঁটা তরল খুলিটার শূন্য দুই অক্ষিকোটরে ফেলল সে। বিচ্ছিরি একটা শব্দ হলো। নির্নিমেষ দৃষ্টিতে সেদিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল সে, তারপর চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা সশব্দে ছাড়ল।

বেশ খানিকটা সময় নিয়ে আলতো করে চোখ মুদল নিতাই; পরক্ষণেই অনুচ্চ স্বরে মন্ত্র জপতে শুরু করল। মন্ত্রের ভাষাটা প্রাচীন, চেনা কোন ভাষার সঙ্গে বিন্দুমাত্র মিলও নেই।

ধীরে-ধীরে বাড়তে লাগল তার গলার আওয়াজ; দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ভরাট কণ্ঠের উত্তাপ।

নড়বড়ে ঘরটাকে ঘিরে থাকা বাতাসে তীব্র আলোড়ন উঠল। গোত্তা মেরে নেমে আসা সাঁঝের আঁধারও যেন অদৃশ্য দেয়ালে বাধা পেয়ে থমকে দাঁড়াল।

একঘেয়ে অপার্থিব কণ্ঠে অশরীরীদেরকে ডেকে চলেছে নিতাই ফকির!

অল্পক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেল। ঝোড়ো হাওয়ায় ভর করে একের পর এক এসে হাজির হতে লাগল ধোঁয়াটে ছায়ারা! যেন হ্যামিলিনের বংশীবাদকের বাঁশির টানে ছুটে এসেছে ইঁদুরের পাল!

ছোট্ট কুঁড়েটাতে যখন আর তিল ধারণের জায়গাও রইল না, তখনই কেবল মন্ত্ৰ জপায় ক্ষান্ত দিল নিতাই ফকির। রক্তবর্ণ চোখে ফিরে তাকাল তাকে ঘিরে থাকা কায়াহীনদের দিকে।

তার অগ্নিঝরা দৃষ্টির সামনে রীতিমত কুঁকড়ে গেল দলটা; মৃদু একটা গুঞ্জন উঠল জটলায়। নিতাইয়ের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে ওরা।

নিতান্ত বাধ্য হয়েই আজ এখানে সমবেত হতে হয়েছে ওদের, কেউই স্বেচ্ছায় আসেনি। অন্যের মর্জিমাফিক চলতে কারই বা ভাল লাগে? অশরীরীরাও যে তীব্র অনুভূতিপ্রবণ, ক’জনই বা জানে সেটা!

দীর্ঘ সময় নিয়ে চারপাশে নজর বুলাল নিতাই ফকির। চোখ জোড়া ভাঁটার মত জ্বলছে তার; হাপরের মত ওঠানামা করছে শীর্ণ পাঁজর।

আচমকা বাম হাত বাড়িয়ে খপ্ করে একটা ধূসর ছায়াকে চেপে ধরল সে। তার হাতের মুঠোয় গুঙিয়ে উঠল ওটা, দ্রুত পিছিয়ে গেল অন্যরা।

মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে ডান হাতটা দোলাল নিতাই ফকির; আপাতত অন্য কাউকে আর দরকার নেই তার।

হাত নাড়াতে যা দেরি, চোখের পলকে একযোগে বাতাসে মিলিয়ে গেল সবক’টা ছায়া। বেমালুম গায়েব হয়ে যাবে ওরা; ফের নিতাই ফকির না ডাকলে, এই তল্লাটে ওদের টিকিটিরও সন্ধান মিলবে না আর।

মুঠোবন্দি অবয়বটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কী যেন বলল নিতাই ফকির। সমঝদারের ভঙ্গিতে মাথা দোলাল ওটা।

মুক্তি পাওয়া মাত্রই একছুটে হারিয়ে গেল বাইরের অন্ধকারে। কাঁধে অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদন করতে চলেছে।

দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে বসল পরিশ্রান্ত নিতাই ফকির।

বীজ বপন করা হয়ে গেছে; এখন শুধু ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষা।

.

দুই

কৃষ্ণপক্ষ চলছে। আকাশে ঝুলে থাকা ক্ষয়া চাঁদকে সঙ্গ দিচ্ছে উজ্জ্বল কিছু তারা। দুধের সরের মত মিহি কুয়াশা ঝরছে বিরামহীন।

শনের বনে আছড়ে পড়া বাতাসের আর্তনাদ পিলে চমকে দেয়। তার সাথে যদি যোগ হয় দলছুট শেয়ালের হাঁক, তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

ভেজা আইলের ওপর দিয়ে জোর কদমে হেঁটে চলেছে কালু লাঠিয়াল, পিছন থেকে তাকে ছায়ার মত অনুসরণ করছে নিতাই ফকির। কয়েক কদম পরপরই ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকাচ্ছে কালু, তারপর আবারও পা বাড়াচ্ছে সামনে। মন মেজাজ ভাল নেই তার; চেহারা ভরা আষাঢ়ের আকাশের মতই গুমট।

নিতাইকে দু’চোখে দেখতে পারে না সে। আর আজ কিনা তাকেই জামাই আদর করে চেয়ারম্যান বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে! কপালের ফের বুঝি একেই বলে।

না নিয়ে অবশ্য উপায়ও ছিল না। সন্ধ্যার পরপরই আচমকা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে চেয়ারম্যানের ছোট মেয়ে চৈতালি।

আলগা বাতাসের লক্ষণগুলো বুঝতে বেগ পেতে হয়নি কারও। তাই একান্ত বাধ্য হয়েই নিতাই ফকিরকে নিতে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত লাঠিয়াল, কালুকে পাঠিয়েছে নরেন চেয়ারম্যান।

আশপাশে দশ গাঁয়ে নিতাই ফকিরের মত কামেল গুণিন আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই সুবোধ বালকের মত নিজের পছন্দ-অপছন্দের তালিকাটা আপাতত শিকেয় তুলে রাখতে হয়েছে তাকে। ইতিপূর্বে কখনওই আর চেয়ারম্যান বাড়িতে ডাক পায়নি নিতাই ফকির।

চরম অস্বস্তি নিয়ে আবারও পিছন ফিরে তাকাল কালু। সঙ্গের অদ্ভুতুড়ে লোকটাকে একবিন্দুও বিশ্বাস করে না সে। সারাক্ষণ অশুভ একটা বলয় ঘিরে থাকে লোকটাকে; কাছাকাছি হলেই গা শিউরে ওঠে। ব্যক্ত করা যায় না; কিন্তু বুকে ঠিকই কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়।

একটা অভিশপ্ত জায়গায় একা-একা থাকে। দিনরাত কী যে করে, ভগবানই জানেন! কোত্থেকে এসেছে, কেন এসেছে, জিজ্ঞেস করলেও বলে না। নির্ঘাত কোন বদ মতলব নিয়েই চম্পকনগরে এসে হাজির হয়েছে ব্যাটা। ভূত-প্রেত নিয়ে কারবার কি আর ভালমানুষে করে? ভাবতেই তো গায়ে কাঁটা দেয়।

কালুর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তাকে দাঁত কেলানো একটা বিটকেলে হাসি উপহার দিল নিতাই ফকির। জানে, হাসিটা নির্বোধ লাঠিয়ালের পিত্তি জ্বালিয়ে দেবে।

হলোও তাই।

রাগে চাঁদিতে আগুন ধরার উপক্রম হলো কালুর। পাকা বাঁশের তেলতেলে লাঠিটার ওপর তার চেপে বসা আঙুলগুলো নিমিষেই রক্তশূন্য হয়ে উঠল I

দেবে নাকি হারামজাদার মাথা বরাবর একটা ঘা বসিয়ে? এক আঘাতেই কম্ম কাবার হয়ে যাবে, দ্বিতীয়বার লাঠি তোলার ফুরসত মিলবে না। তল্লাটের সেরা পালোয়ান কালু। তার লাঠির বাড়ি খেয়ে যমের দুয়ার থেকে বেঁচে ফেরার কোন নজির নেই।

বহু কষ্টে নিজের ওপর জোর খাটিয়ে ছলকে ওঠা রাগটাকে দমন করল কালু। আচমকা চৈতালির পবিত্র মুখখানা ভেসে উঠেছে তার মনের পর্দায়। এই মুহূর্তে নিতাই ফকিরকে প্রাণে মেরে ফেললে, চৈতালিকেও হয়তো আর বাঁচানো যাবে না। আপাতত হিসেবটা তোলা থাকুক। পরে একসময় কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে নেয়া যাবে।

কালুর বেহাল দশাটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল নিতাই ফকির। মুখ টিপে হাসল খানিকক্ষণ।

বিশালদেহী পালোয়ানের মনের কথাগুলো বুঝতে মোটেও বেগ পেতে হচ্ছে না তাকে, সবকিছু তার কাছে ভরদুপুরের দিবালোকের মতই ফকফকা পরিষ্কার।

তবে ও নিয়ে মোটেও দুশ্চিন্তায় ভুগছে না সে; উল্টো পুরো ব্যাপারটায় ভীষণ আমোদ পাচ্ছে। বলদটাকে আরও খানিকটা বাজিয়ে দেখলে কেমন হয়?

গলা খাঁকারি দিল নিতাই ফকির। হালকা গলায় বলল, ‘তুমি আমারে এত অপছন্দ কর ক্যান, কালু?’

ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল কালুর সম্মুখগতি, পরক্ষণেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিল সে। ‘আফনেরে আমি অপছন্দ করুম ক্যান? অপছন্দ করি না।’

হো-হো করে হেসে উঠল নিতাই, সশব্দে থুতু ফেলল পাশের সরিষা খেতে। ‘কর, কর। মুখে স্বীকার যাও আর না যাও, তুমি যে আমারে দেখবার পার না, হেইডা আমি জানি।’

জবাব দিল না কালু, নীরবে পথ চলতে লাগল।

তবে এত সহজে তাকে নিস্তার দেয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও নেই নিতাই ফকিরের। আবারও মুখ খুলল সে, ‘আমারে দেখলেই তোমার মুখ-চোখ কিরাম জানি শক্ত হইয়া যায়। কারণডা কী?’

‘আমার চেহারাই এমুন,’ বিরস কণ্ঠে বলল কালু। পথ চলা থামায়নি। ‘ভগবান তো আর সবতেরে এক রহম কইরা বানায় নাই।’

‘তোমার চেহারা কিন্তুক খারাপ না। বেহুদা ভগবানের দোষ দিতাসো ক্যান?’ দরাজ গলায় বলল নিতাই ফকির। ‘কেবল আমার সামনে আইলেই তোমার খোমাড়া ফাইলার তলার মতন কালা হইয়া যায়। ব্যাপার কিছু মাথায় আহে না।’

চুপ করে রইল কালু; কী জবাব দেবে? মিথ্যে কিছু বলেনি নিতাই ফকির। মনের ভাব গোপন করার কায়দা-কানুন কমই জানে কালু।

‘চেয়ারম্যান সাবের বাইত্তে তো আচার-অনুষ্ঠান লাইগাই থাকে বারো মাস। তুমিই তো হগলতেরে দাওয়াত দেও। ঠিক না?’ শীতল স্বরে বলে উঠল নিতাই; কণ্ঠের আমুদে ভাবটা নেই আর। ‘কই, আমি তো কুনুদিন কুনু নিমন্তন্ন পাইলাম না?’

পুরোপুরি ঘাবড়ে গেল কালু, দু’চোখে অন্ধকার দেখছে সে। কথার মারপ্যাচে তাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করবে গুণিন, এটা সে কস্মিনকালেও ভাবেনি। তা নাহলে জবাবটা নির্ঘাত চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে জেনে আসত সে। তাহলে আর এখন এভাবে ফেঁসে যেতে হত না তাকে।

একটা জুতসই জবাবের আশায় মরিয়া হয়ে স্মৃতির ঝাঁপি হাতড়ে বেড়াল কালু। নিজের স্বল্পবুদ্ধির জন্য এই প্রথম ভীষণ আফসোস হচ্ছে তার।

শেষটায় অনেকটা যন্ত্রচালিতের মত বলে উঠল, ‘আমি হইলাম গিয়া হুকুমের গোলাম। হুকুম দেয়ার মালিক তো আর আমি না।’

বিস্ফারিত নেত্রে কয়েক মুহূর্ত কালুর দিকে তাকিয়ে রইল নিতাই ফকির, পরক্ষণেই হেসে উঠল গলা ফাটিয়ে। ‘তুমি তো দেখতাসি দার্শনিক হইয়া গেসো, কালু! তাজ্জব কারবার!’

মুখ ব্যাদান করে তার দিকে তাকিয়ে রইল কালু। দার্শনিক বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছে তান্ত্রিক, ব্যাপারটা সে পুরোপুরি বোঝেনি। কথাটা ভাল নাকি মন্দ?

যা হয় হোক; এসব তত্ত্ব কথার ধার ধারে না কালু লাঠিয়াল। যার জীবন চলে পেশি-শক্তি আর লাঠির জোরে, বাঁকা কথার মানে বোঝার দরকার নেই তার!

হাসি থামা মাত্রই আবারও গম্ভীর হয়ে গেল নিতাই ফকির। ভারিক্কি গলায় বলল, ‘আমারে ক্যান যে তোমাগো পছন্দ হয় না, বিষয়ডা হাছাই আমার মাথায় আহে না, কালু। আমি তোমাগো উপকার ছাড়া অপকার করি নাই কুনুদিন। কাউরে জিনে আছর করলে হেইডা ছাড়াই, আলগা বাতাসও খেদাই। এর কুনু দাম নাই তোমাগো কাছে?’

অপ্রত্যাশিতভাবে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল কালু পালোয়ান। হাঁটা থামিয়ে ঝট্ করে ঘুরে দাঁড়াল। নিতাই ফকিরের আধহাত তফাতে এসে ক্রোধান্বিত গলায় বলল, ‘আফনে আসার আগে এই চম্পকনগরে কুনু ঝামেলা আছিল না। কাউরে কুনুদিন জিনে ধরে নাই। আলগা বাতাস লইয়াও কাউর কুনু দুচ্চিন্তা আছিল না। আফনে গেরামে আসার পর থাইকাই বেবাক হাঙ্গামা শুরু হইসে। আফনেই যে সব নষ্টের গোড়া, হেই কথা হগলেই জানে।’

ভীষণ চমকে উঠল নিতাই ফকির। গ্রামের চাষাভুষারা যে গোটা ব্যাপারটাকে এভাবে দেখে, এটা তার কল্পনাতেও আসেনি কখনও। জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল সে; কালুর পেট থেকে আরও খানিকটা কথা বের করা দরকার।

তাকে অবশ্য বাড়তি কোন কৌশল খাটাতে হলো না। আপনমনেই তোতাপাখির মত বকবক করে চলল কালু। রোখ চেপে গেছে তার; ঠিকরে পড়ছে কণ্ঠের ঝাঁঝ। ‘আফনে আইসা বসত গাড়সেন ওই ভুতুইড়া তালতলায়। জিন- পেন্ডুনিগুলারে তাগো আস্তানা থাইকা খেদাইসেন। হের লাইগাই অরা অহন পুরা গেরামে ছড়াইয়া গেসে। আফনের ঝাল আমাগো উপরে ঝাড়তাসে।’

স্বস্তির নিঃশ্বাসটা সশব্দেই ফেলল নিতাই ফকির। যতটা আশঙ্কা করেছিল, পরিস্থিতি মোটেও ততটা গুরুতর নয়। আসল রহস্য এখনও গুপ্তই আছে। অযথাই তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল খচ্চরটা।

তবে আপাতত মুখে কুলুপ এঁটে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। হাতির বাচ্চাটাকে আজ আর বেশি খেপানোটা উচিত হবে না। মাথায় আগুন চড়ে গেছে ব্যাটার; এখন অযথা ঘাঁটাতে গেলে ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আপাতত খুনোখুনি করার কোন মানে হয় না। কী দরকার অহেতুক খাল কেটে কুমির আনার?

বাকি পথটুকু কোনরকম উচ্চবাচ্য ছাড়াই নিরাপদে পাড়ি দিল ওরা।

মাঝে অবশ্য আচমকা জলা থেকে উঠে আসা একটা তাগড়া মেছোবাঘের সামনে পড়তে হয়েছিল ওদের! তবে নিতাইয়ের ওপর চোখ পড়া মাত্রই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হয়েছিল ওটার। কালবিলম্ব না করে তড়িৎ গতিতে পাশের কাশবনে সেঁধিয়ে গিয়েছিল চারপেয়ে জানোয়ারটা।

প্রথম সাক্ষাৎ হলেও, নিতাই ফকিরকে ঠিকঠাক চিনে নিতে এক লহমার বেশি লাগেনি বেচারার!

.

তিন

প্রফুল্লচিত্তে চেয়ারম্যান বাড়ির টানা বারান্দায় বসে আছে নিতাই ফকির। পাশে রাখা একটা জলচৌকির ওপর শোভা পাচ্ছে কাঁধের সার্বক্ষণিক ঝোলাটা।

সামনে রাখা নাস্তার পিরিচগুলো ছুঁয়েও দেখেনি সে। তীব্র ক্ষুধার সময় এসব সাধারণ খাবার মুখে রোচে না তার।

পাশেই একটা বেতের চেয়ারে গোমড়া মুখে বসে আছে নরেন চেয়ারম্যান। মেয়ের দুশ্চিন্তায় শ্যামবরণ মুখখানা হাঁড়ির তলার মত কালো হয়ে আছে তার। বার-বার কী যেন বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিচ্ছে সে; গুণিনকে তাগাদা দিতে সঙ্কোচ হচ্ছে।

সেদিকে অবশ্য বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপও নেই নিতাই ফকিরের; চেয়ারম্যানের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না সে।

ক্ষমতাবান মানুষজনকে উপেক্ষা করার মধ্যে পৈশাচিক একটা আনন্দ আছে। নিজেকে সেই সুখ থেকে কিছুতেই বঞ্চিত করতে রাজি নয় নিতাই।

কামলা শ্রেণীর কিছু লোক ইতিউতি হাঁটাচলা করছে। তাদের উপরেই ঘোরাফেরা করছে তান্ত্রিকের নজর। এদের প্রায় প্রত্যেকেরই স্বাস্থ্য ভাল; ত্বকে বাড়তি একটা তেলতেলে ভাব আছে। হলফ করে বলা যায়, চেয়ারম্যান বাড়িতে খেয়ে-পরে বেশ সুখেই আছে ওরা।

অন্তরের অন্তস্তলে ঈর্ষার একটা ছাইচাপা আগুনের অস্তিত্ব টের পেল নিতাই; বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা দীর্ঘশ্বাস। বিমর্ষ মুখে আলতো করে মাথা নাড়ল সে; ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকাল চেয়ারম্যানের দিকে।

‘সমস্যা কার?’

‘আমার ছোট মাইয়া, চৈতালির,’ আমতা-আমতা করে বলল নরেন চেয়ারম্যান।

‘কী হইসে, বিস্তারিত খুইলা কন।’

‘সারাদিন মাইয়াডা ভালই আছিল। সন্ধ্যার পর হঠাৎ কইরা কেমুন জানি হইয়া গেল! কী থাইকা যে কী হইল, কিচ্ছুই বুঝলাম না। রসুই ঘরে অর মায়ের লগে খাড়াইয়া-খাড়াইয়া কথা কইতাসিল। দুম্ কইরা মাথা ঘুরান দিয়া পইড়া গেল! মাটিতে পড়ার পর কতক্ষণ এক নাগাড়ে গড়াগড়ি করল। ইচ্ছামতন চিল্লাইল। শেষমেশ আমার কইলজার টুকরাডার মুখ দিয়া ফেনা বাহির হইয়া গেসিল, ফকির সাব…’ বলতে-বলতে গলা ধরে এল তার। সাময়িক বিরতি দিয়ে আবারও মুখ খুলল সে, ‘এরপর শুরু হইল পাগলামি। হায়, ভগবান! যারে সামনে পাইসে, তারেই মারসে। কিল-ঘুষি-লাথি কিছুই বাদ দেয় নাই। এমনকী কয়েকজনরে কামড়াইয়া রক্তও বাহির কইরা ফালাইসে! অর মা-বইনের কথা আর কী কমু, আমারেও ছাড়ে নাই সে! শেষ পর্যন্ত আর দিশ-মিশ না পাইয়া আফনের লাইগা লোক পাঠাইসি।’

গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল নিতাই ফকির। ‘মাইয়া কই অহন?’

‘অর ঘরেই আছে। তালা মাইরা থুইসি।’

মেরুদণ্ড টানটান করে বসল নিতাই। ‘কাঁচা বয়স। এই বয়সে কী দরকার আছিল সন্ধ্যাবেলায় চুল ছাইড়া পুকুর ঘাড়ে যাওনের?

‘পুকুর পাড়ে তো সে খুব একটা যায় না…’ বলতে গিয়ে বাধা পেল নরেন চেয়ারম্যান।

রীতিমত খেঁকিয়ে উঠল নিতাই ফকির, ‘আফনে সারাদিন থাহেন বিচার-সালিশ লইয়া ব্যস্ত। মাইয়ার খবর আফনে জানবেন ক্যামনে? মাইয়ার মা’য় কই? তারে ডাকেন।’

ডাকতে হলো না। চৈতালির মা, হেমা, পর্দার আড়ালেই ছিল; ওদের কথোপকথনের সবটুকুই কানে গেছে তার। গুটি গুটি পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল মহিলা!

একে চেয়ারম্যানের স্ত্রী, তায় আবার অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে; স্বভাবতই অন্য দশ জন সাধারণ গ্রাম্য মহিলার তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক হেমা। চলাফেরায়ও বেশ সাবলীল সে; পরপুরুষের সামনে আসা নিয়ে খুব একটা জড়তা নেই তার ভিতরে। আর যেখানে নিজের মেয়ের জীবন বিপন্ন, সেখানে জড়তার কারণে আত্মগোপন করে থাকার তো প্রশ্নই আসে না।

তবে নিতাই ফকিরের সঙ্গে চোখাচোখি হওয়া মাত্রই তার মনে হলো, কাজটা করা মোটেও ঠিক হয়নি! আলাপচারিতাটা আড়াল থেকে চালালেই ভাল ছিল। লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ওই চোখ দুটো কি মানুষের নাকি পিশাচের? মানুষের চোখ বুঝি এমনও হয়!

সর্বাঙ্গ ঢাকা থাকা সত্ত্বেও লোকটার সর্বগ্রাসী দৃষ্টির সামনে নিজেকে নগ্ন মনে হলো হেমার। অস্ফুট শব্দ করে নিজের অজান্তেই সভয়ে এক কদম পিছিয়ে গেল সে।

জিভ বের করে নিজের শুকনো ঠোঁট জোড়া আচ্ছামতন চেটে নিল নিতাই। ইত্যবসরে একাধিকবার মহিলার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নজর বুলিয়ে নিয়েছে সে।

পেটানো দেহ, চমৎকার গড়ন; দেখলেই ভীষণ লোভ লাগে।

মনে-মনে নিজেকে অশ্রাব্য কিছু গালি দিল নিতাই। মেয়ের পিছনে না লাগিয়ে প্রেতটাকে মায়ের পিছনে লেলিয়ে দেয়া উচিত ছিল তার। তাহলে ফূর্তি খানিকটা বেশি মিলত।

তবে আফসোসের কিছু নেই। এবারে করা হয়নি বলে ভবিষ্যতেও আর কখনও করা যাবে না, এমন কোন মাথার দিব্যি দেয়নি কেউ! এই খেলা এখানেই শেষ নয়; অনন্তকাল ধরে চলবে।

নিতাই কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কথা বলে উঠল হেমা। ‘চৈতালি আইজ সারাদিন ঘরেই আছিল, পুকুর পাড়ে যায় নাই। অর চুলও খোলা আছিল না; আমি নিজে তেল দিয়া খোঁপা বাইন্ধা দিসি।’

নিজের চেয়ারে খানিকটা নড়েচড়ে বসল তান্ত্রিক। ভারী গলায় বলল, ‘আফনে সত্য কইতাসেন তো? মিথ্যা কইলে কিন্তুক বিপদ হইতে পারে।’

নিস্পৃহ দৃষ্টিতে নিতাইয়ের দিকে তাকাল হেমা, একবারের জন্যও চোখের পলক ফেলছে না। ‘সত্য কইতাসি। মিছা কথা কওনের কী আছে এইখানে?’

তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না গুণিন, হাতের ইশারায় যেতে বলল।

ঝড়ের বেগে প্রস্থান করল হেমা। লোকটার কুৎসিত দৃষ্টির সামনে রীতিমত গা জ্বালা করছিল তার।

.

চার

চৈতালির ঘরটা অন্ধকার। কোনার দিকে অল্প আঁচে একটা দিয়াড়ি জ্বলছে, এছাড়া অন্য কোন আলো নেই বিশাল ঘরটায়। দরজা-জানালার কবাটগুলো বন্ধ। ভিতরের বাতাস ভারী হয়ে আছে ধূপের কড়া গন্ধে।

খাটের ওপর চিত হয়ে শুয়ে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে যুবতী মেয়েটা। নিতাই ফকিরের আরকের ফল; কয়েক ঢোক পেটে পড়লে মদ্দা হাতিও ঘুমিয়ে কাদা হতে দিশ পায় না।

ঘরে ঢুকে ধীর পায়ে খাটের দিকে এগিয়ে গেল নিতাই ফকির। শ্বাসের তালে- তালে ওঠানামা করছে মেয়েটার উন্নত বুক; মন্ত্রমুগ্ধের মত দৃশ্যটা খানিকক্ষণ গিলল সে। নিজে সে শক্তসমর্থ একজন পুরুষ মানুষ; রিপুর তাড়না এখনও কমেনি তার। এখনই মেয়েটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছেটা পরিহার করতে নিজের সঙ্গে রীতিমত যুদ্ধ করতে হলো তাকে।

অন্ধকার জগতের বাসিন্দা সে। ক্ষমতা বজায় রাখতে তাকেও কিছু অলিখিত বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হয়। চাইলেই যা খুশি করার সুযোগ নেই। নয়তো ভয়াবহ অনর্থ ঘটে যাবে।

চকিতে গত মাসের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল তার।

শিকার হিসেবে ধনবানরা আদর্শ হয়। তাদের কাছ থেকে অন্ন সংস্থান করাটাই সবচাইতে সহজ। ঝুঁকির পরিমাণও তুলনামূলক কম। এসব তত্ত্ব মাথায় রেখেই বিষ্ণু পালের স্ত্রী মালতীর পিছনে অশরীরী লেলিয়ে দিয়েছিল নিতাই।

বাজারে ব্যবসায়ী হিসেবে বেশ নামডাক আছে বিষ্ণু পালের। ক’খানা ফটকা ব্যবসায় টাকা খাটিয়ে স্বল্প সময়েই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে সে। তাকে নিশানা করতে একবারের বেশি দু’বার ভাবতে হয়নি নিতাইকে।

কিন্তু বিষ্ণুর বউটা যে এতটা সুন্দরী হবে, এটা নিতাই ভাবতেও পারেনি। নিজের কামনা দমনে সেদিনের মত কষ্ট আর কখনও করতে হয়নি তাকে!

মালতীর নধর দেহটা স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠতেই হাসি ফুটল নিতাইয়ের মুখে; দু’চোখে দানা বাঁধল রাজ্যের লোভ। ক’দিন পর আবারও একবার বিষ্ণু পালের বাড়িতে হানা দিলে কেমন হয়?

.

নরেন চেয়ারম্যান আর হেমা হতবিহ্বল হয়ে বসে আছে বারান্দায়। দু’জনে করুণ চোখে বার-বার ফিরে তাকাচ্ছে চৈতালির ঘরের বন্ধ দরজার দিকে।

কী হচ্ছে ঘরের ভিতরে?

তাদের আদরের মেয়েটার সাথে কী করছে নিতাই ফকির?

হেমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মুখ নামিয়ে নিল নরেন। কাজটা স্ত্রীর অমতে করতে হয়েছে বলে খানিকটা অনুতপ্ত। ওই বদ তান্ত্রিকের হাতে নিজের কন্যাকে সঁপে দেয়ার ইচ্ছে তো তারও ছিল না। কিন্তু এই দুঃসময়ে আর কী-ই বা করার ছিল?

তবে চৈতালির সঙ্গে নোংরা কিছু করার চেষ্টা করলে, আজ এখানে, এই চেয়ারম্যান বাড়িতেই মারা পড়বে গুণিন। কালুর লাঠিয়াল বাহিনীকে সেরকমই নির্দেশ দেয়া আছে।

দাঁতে দাঁত চেপে আবারও মেয়ের ঘরের দিকে তাকাল নরেন। করছেটা কী ওই হারামজাদা?

ঠিক তখনই অপার্থিব চিৎকারটা শুনতে পেল সবাই!

ভয়ঙ্কর হিংস্র একটা গর্জন! যেন হাজারটা বাঘের টুটি চেপে ধরেছে কেউ, আর সবক’টা বাঘ একযোগে হুঙ্কার ছাড়তে চাইছে! সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে অসহ্য একটা গোঙানি আর বিরামহীন হিস্ হিস্ শব্দ। আর যা-ই হোক, কোন মানুষের পক্ষে অমন আওয়াজ করা সম্ভব নয়!

তীব্র আতঙ্কে স্বামীর হাত আঁকড়ে ধরল হেমা; সারা শরীর ক্রমাগত কাঁপছে তার। বাহুতে নখ দেবে গিয়ে যে প্রচণ্ড ব্যথা পাচ্ছে নরেন, সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়ালও নেই তার।

আচমকা এক ঝলক দমকা হাওয়া এসে আছড়ে পড়ল ঘরের চালায়। পট্-পট্ করে নিভে গেল বারান্দার সবক’টা হারিকেন!

‘ও, মা গো! অইডা কী? অইডা কী?’ তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল একজন বুড়োমতন কাজের মহিলা। পরক্ষণেই হাত পা ছড়িয়ে মূর্ছা গেল সে।

উত্তেজনায় দৌড়ে গিয়ে উঠনে দাঁড়াল কালু; উদ্ভ্রান্তের মত এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছে। তার দলের অন্য কেউ অবশ্য তার সঙ্গী হলো না; ওরা বারান্দায় দাঁড়িয়েই সম্মিলিতভাবে ইষ্টনাম জপ করা শুরু করল।

ততক্ষণে প্রায় সবাই-ই দেখতে পেয়েছে ওটাকে। চৈতালির ঘর থেকে বেরিয়ে, শূন্যে ভর করে, ভেসে ভেসে দূরে সরে যাচ্ছে একটা ধূসর ছায়া! প্রতি মুহূর্তেই পাল্টে যাচ্ছে ছায়াটার আকৃতি!

আচমকা আরেক পশলা ঝোড়ো হাওয়া প্রবল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওটার ওপরে! পরমুহূর্তেই সবার চোখের সামনে থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে গেল ছায়াটা। কোথাও আর ওটাকে দেখা গেল না।

এই হৈ-হট্টগোলের মাঝে কখন যে ভয়ঙ্কর আর্তনাদটা থেমে গেছে, কেউই সেটা খেয়াল করেনি। এখন আচমকা চারপাশ নীরব হয়ে যাওয়ায়, যে যার জায়গায় স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইল বাড়ির বাসিন্দারা। কী করবে, কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।

ঠিক তখনই চৈতালির ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল নিতাই ফকির সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজব করছে।

দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে চেয়ারম্যানের পাশের খালি চেয়ারটায় বসল সে। তারপর মুখ তুলে তাকাল নরেনের দিকে। ‘আফনের মাইয়া ভালা হইয়া গেছে। সব সমস্যা খতম।

আর শোনার অপেক্ষা করল না হেমা, সবেগে ছুটে গেল চৈতালির ঘরের দিকে।

অপ্রকৃতিস্থের মত ঠায় বসে রইল নরেন চেয়ারম্যান। চোখেমুখে ফুটে উঠেছে একরাশ কৃতজ্ঞতা। অবাধে গড়িয়ে পড়া তার দু’ফোঁটা অশ্রুতে কতখানি ভালবাসা নিহিত আছে, সেটা পরিমাপ করার সাধ্য নেই কারও!

দাঁত কেলিয়ে হাসল নিতাই, ভেজা ঠোঁটে জিভ বুলাল। ‘কিছুদিন কিন্তুক দুব্বল থাকবে মাইয়াডা। যা একখান ধকল গেল! এই সময় অরে ভাল-মন্দ খাইতে দিতে হইবে। দুধ-ডিম, মাংস; শিঙি-মাগুরের ঝোল। এগুলান খাইলে শইল্যে রক্ত হয়। রক্ত তো বেবাকতেরই দরকার। কিপ্টামি করন যাইবে না কিন্তুক। নাইলে বিরাট ক্ষতি হইয়া যাইবার পারে।’

সজোরে মাথা নাড়ল নরেন চেয়ারম্যান। হাতের চেটো দিয়ে চোখ মুছল। ‘কী কন এগুলা! কিপ্টামি করুম ক্যান আমি! ভগবান কি আমারে কিছু কম দিসে নাকি? যা-যা কইসেন, সবই আমি খাওয়ামু আমার মাইয়ারে।’

‘হের লাইগাই তো ট্যাকা-পয়সাওয়ালা মালদার পার্টিই আমার পছন্দ…’ অনুচ্চ স্বরে বিড়বিড় করল নিতাই।

‘কিছু কইলেন নাকি, ফকির সাব?’ বুঝতে না পেরে জানতে চাইল নরেন।

‘নাহ্। কইতাসিলাম যে, মাইয়াডারে আমি একটা মাদুলি পরাইয়া দিসি। মন্ত্র পরা মাদুলি; রক্ষাকবচ। ওইডা এক মাস গলায় রাখতে হইবে, খোলা যাইবে না। এমুনকী গোসলের সময়ও খোলা যাইবে না। তাইলে আবারও আলগা বাতাসটা ফেরত আইবার পারে। আবার যদি ফেরত আহে, ওইডারে খেদানো কিন্তুক খুবই কঠিন হইবে।’

আতঙ্ক ভর করল চেয়ারম্যানের চেহারায়। ‘না, না। খুলবে ক্যান? খুলবে না। আফনে যেমনে কইবেন, হেমনেই চলবে হে। হেইডা নিয়া দুইকথা হইবে না।’

না খুললেই ভাল; মনে-মনে বলল নিতাই ফকির। তাহলে আর গলার দগদগে ক্ষতটা চোখে পড়বে না কারও। দিন পনেরোর মধ্যেই দাগ দুটো মিলিয়ে যাওয়ার কথা; সবার ক্ষেত্রে তা-ই হয়। তবুও বাড়তি সতর্কতা হিসেবে এক মাস রাখতে বলা।

‘আফনে কিন্তুক আজকে এইখানে খাইয়া যাইবেন। মানা করতে পারবেন না,’ আর্দ্র গলায় বলে উঠল নরেন চেয়ারম্যান। নিতাইয়ের ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিয়েছে সে।

মুচকি হাসল গুণিন।

তাজা রক্ত পেটে পড়েছে আজ। মুখের স্বাদটা নষ্ট হবে, এমন কিছু আর আগামী কয়েকদিন খাবে না সে। উষ্ণ রক্তের সাথে পৃথিবীর অন্য সব খাবারের কোন তুলনাই চলে না। একবার যে এর স্বাদ পেয়ে যায়, বাকি সমস্ত খাবার তার কাছে পানসে লাগে!

‘হেইডা পরে দেখা যাইবে। আফনে অহন মাইয়াডার কাছে যান। অরে প্রাণ ভইরা আদর করেন।’

তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল নরেন, পা বাড়াল চৈতালির ঘরের দিকে। কন্যার কাছে যাওয়ার জন্য সেই তখন থেকেই প্রাণ আইঢাই করছিল তার। তান্ত্রিককে একা রেখে যাওয়াটা শোভন হবে না বলে যেতে পারছিল না।

উঠন থেকে পায়ে-পায়ে নিতাই ফকিরের সামনে এসে দাঁড়াল কালু। চৈতালিকে সুস্থ করে তোলায়, আদতেই গুণিনের প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করছে সরলমনা বিশালদেহী মানুষটা।

তাকে আপাদমস্তক নিরীখ করল তান্ত্রিক। দিব্য চোখে দেখতে পেল, কালুর প্রকাণ্ড দেহটার শিরা-ধমনীতে তীব্র বেগে ছুটে চলছে উষ্ণ রক্তের স্রোত! কয়েকবার করে পান করলেও যে ভাণ্ডার সহসা নিঃশেষ হবে না!

আবারও ঠোঁট চাটল নিতাই ফকির।

বহু কষ্টে কালুর ওপর থেকে নজর সরিয়ে উঠে দাঁড়াল

ভ্যাম্পায়ার হওয়ার কত যে জ্বালা, কেবল ভ্যাম্পায়াররাই সেটা জানে!

.

তৌফির হাসান উর রাকিব

***