শেষ রাতের ট্রেন – রাজীব চৌধুরী
শেষ রাতের ট্রেন
‘এই চা! গরম-চা-গরম!’
চিকন গলায় চিৎকার করে চলেছে মিশকালো এক লোক-হাতে এক বিশাল চায়ের ফ্লাস্ক। এভাবেই সে রাজু সাহেবের সামনে মিনিট তিনেক ধরে ঘুর-ঘুর করছে। যতবার সামনে আসছে, ততবার বিরক্ত হচ্ছেন রাজু সাহেব। কিন্তু চাওয়ালার কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। ফেনীর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আজ রাতের গুটিকয়েক যাত্রীর একজন রাজু সাহেব। সুট-বুট পরা বলে তাঁর দিকে বারবার আসছে একের পর এক হকার। তিনি সবাইকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মা ভরপেট খাইয়ে দিয়েছেন। পই পই করে বলে দিয়েছেন, তিনি যেন রাস্তার কোন খাবার না খান। আর মায়ের কথা তিনি কখনও ফেলেন না।
‘এই ডিম-ডিম-ডিম-সিদ্ধ-ডিম,’ বলে এক ছোট বাচ্চা এসে ডিমের ঝুড়িটা রাজু সাহেবের সামনে রেখে বলল, ‘স্যর, একটা ডিম নেন, অনেক ভাল লাগব। খাইবেন? দিমু ছুইলা?’
একটা ডিম নিয়ে ছুলতে শুরু করেছে ও।
রাজু সাহেব ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন ডিমওয়ালা ছেলেটার দিকে। তারপর গলাটা একটু চড়িয়ে বললেন, ‘আমি কি ডিম ছিলতে বলছি? তুমি ডিম ভাঙলা কেন?’
হলদে দাঁত বের করে ছেলেটা একগাল হেসে বলল, ‘স্যর, সবাইরে দশ ট্যাহা কইরা দেই, আপনেরে আট ট্যাহায় দিমু। নেন, খাইয়া দেহেন, কেমুন মজা।’ ডিমটা ছোট এক কাগজে নিয়ে চামচ দিয়ে দু’ভাগ করে নুন ছিটিয়ে এগিয়ে দিল রাজু সাহেবের দিকে।
রাগে মগজ জ্বলতে শুরু করল রাজু সাহেবের। এমনিতেই ট্রেন আসছে না ঘণ্টা দুয়েক হয়ে গেছে, এর মাঝে এসব উৎপাত ভাল লাগে? প্রচণ্ড খেপে গেলেন তিনি। কিন্তু একটু পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘না, আমি খাব না। তুমি টাকা নিয়ে বিদায় হও।’ মানিব্যাগ থেকে দশ টাকার একটা নোট দিলেন ছেলেটাকে।
টাকা নিয়ে ডিমটা রাজু সাহেবের পাশে বেঞ্চে রেখে হন হন করে চলে গেল ছেলেটা। ওর চলে যাওয়া দেখে রাগে জ্বলতে লাগল রাজু সাহেবের পিত্তি। মনে- মনে বিড়বিড় করে কী যেন বলে আবার মনোযোগ দিলেন ট্রেন লাইনের দিকে।
রাজু সাহেব একা এক ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকেন ঢাকায়। ঢাকা হাইকোর্টের উকিল। মা থাকেন ফেনীর ফুলগ্রামে। অনেক চেয়েছেন মাকে ঢাকায় নিয়ে আসতে, কিন্তু স্বামীর কবর ওখানে, তাই মা কখনোই ঢাকায় আসতে রাজি হননি। আজও রাজু সাহেরের সঙ্গে তিনি যাচ্ছেন না। তাঁকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল সিলেটের সুনামগঞ্জের প্রফেসর আকমল সাহেবের বাসায়। ভদ্রলোকের মেয়ের সাথে রাজু সাহেবের বিয়ের কথা চলছে দুই সপ্তাহ ধরে।
মেয়ে দেখাবার জন্য রাজু সাহেবের পরিবারকে দাওয়াত দিয়েছেন প্রফেসর। কিন্তু রাজু সাহেবের মা যেতে রাজি হননি। তাই শেষ পর্যন্ত কনে দেখার জন্য নিজেকেই যেতে হচ্ছে রাজু সাহেবের। তাঁর কোন ভাই-বোনও নেই যে সাথে যাবে। তাই এই মাঘের শীতের রাতে তিনি টিকেট কেটে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছেন ঢাকা-সিলেটগামী ট্রেনের জন্য।
‘স্যর, স্যর, পেপার নেন, পেপার-পেপার, নেন, গরম-গরম-খবর, মজার- মজার-খবর,’ বলে তাঁর সামনে এসে ১৮-১৯ বছরের এক ছেলে মাসিক পত্রিকা বাড়িয়ে দিল।
তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। যাত্রাপথে ঘুমিয়ে কাটান। এই রঙচঙে পত্রিকা কোনদিন তাঁকে টানেনি। মাসিক পত্রিকার চেয়ে ঢের বেশি পড়েন দৈনিক পত্রিকা। কিন্তু ছেলেটা নাছোড়বান্দা। পেপার বিক্রি করেই ছাড়বে। বিক্রি করতে না পেরে শেষে একটা নগ্ন ছবিওয়ালা চটি বই রাজু সাহেবের চোখের সামনে ধরে নাচাতে-নাচাতে বলল, ‘স্যর, দেখেন কত গরম-গরম জিনিস! নিবেন? স্যর, আরও ভাল-ভাল জিনিস আছে।’ বলে দাঁত বের করে হাসতে লাগল।
এবার রাজু সাহেব চোখে আগুন নিয়ে এমনভাবে তাকালেন যে প্রায় পালিয়ে বাঁচল ছেলেটা। সময় কোনভাবেই কাটছে না। কিছু করা দরকার।
অনেকক্ষণ আগে স্টেশন মাস্টার জানিয়েছেন, ট্রেন আসতে আরও দু’ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু ওই দু’ঘণ্টা এখন সাড়ে তিন ঘণ্টায় পরিণত হয়েছে। আরও বেশ কিছুক্ষণ দেরি হবে মনে হচ্ছে। এই সময়টা কীভাবে কাটাবেন তিনি বুঝে উঠতে
পারছেন না।
নিজের ব্যাগ থেকে শরৎ সাহিত্য সমগ্র বের করে খেয়াল করলেন, হাত বিশেক দূরে এক দম্পতি। নিজেদের মাঝে গল্প-গুজব করছে তারা। নতুন বিবাহিত বলে মনে হলো। তিনি উঠে গিয়ে তাদের সাথে ভাব জমাবেন ভাবলেন, কিন্তু পরে চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললেন।
একটু পর ঢাকা-চট্টগ্রামগামী ট্রেন এলে তারা চলে গেল সেই ট্রেনে করে। আবারও সাহিত্যের বইয়ে মন দিলেন তিনি।
অনেকক্ষণ পর হঠাৎ খেয়াল করলেন, তাঁর চারপাশ কেমন যেন সুনসান। বই থেকে মুখ তুলে কান পাতলেন রাজু সাহেব। শুনতে পেলেন না কোন শব্দ। দু’পাশ দেখলেন। হালকা টিমটিমে চল্লিশ ওয়াটের বাতি জ্বলছে চারটে, এতে চারপাশের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে। এর মাঝে মাঘ মাসের ঘন কুয়াশা। কান পেতে থাকলেন অনেকক্ষণ। নাহ, কোন ঝিঁঝি পোকার ডাকও শুনতে পেলেন না।
এমনিতে তিনি তুখোড় উকিল হলেও একাকীত্ব কিছুটা ভয় পান। তাই বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে স্টেশন-মাস্টারের রুমের দিকে গেলেন।
কিন্তু সেখানে গিয়েও হতাশ হলেন। সেখানে এক পাগলি ছাড়া কেউ নেই। স্টেশন-মাস্টার কখন যেন চলে গেছেন নিজের বাড়িতে।
শেষবার স্টেশন-মাস্টারের বেঁধে দেয়া সময় আছে মাত্র দশ মিনিট। রাজু সাহেব ঘড়ি দেখতে দেখতে ফিরলেন আগের সিটের দিকে। এবং বসতে গিয়ে দেখলেন, যেখানে বসেছিলেন, তার পাশেই বসে আছেন এক বৃদ্ধা মহিলা। গলা খাঁকরে নিয়ে মহিলার পাশে বসে পড়লেন, রাজু সাহেব। এই ঠাণ্ডায় মহিলা কুঁকড়ে আছেন। পরনে সাদা শাড়ি। মুখ ঢাকা ঘোমটার আড়ালে। রাজু সাহেব ভাবতে লাগলেন, এই সুনসান রাতে এই মহিলা এলেন কোত্থেকে? মহিলা বসে আছেন কেন? কে তিনি? কেন এলেন এখানে?
এমনটা ভাবতে-ভাবতেই মহিলা নিজ থেকে বললেন, ‘ভাবছেন তো কেন আমি এখানে?’
কথাটা শুনে চমকে উঠলেন রাজু সাহেব।
মহিলার গলার আওয়াজ ভাঙা-ভাঙা, যেন অনেক কষ্ট করে কথা বলছেন। রাজু সাহেবের দিকে তাকালেন তিনি।
সেই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলেন না রাজু সাহেব। বিশ্রী এক অস্বস্তিতে ঘেমে উঠলেন এই প্রচণ্ড শীতের মাঝেই।
‘আমি লাকসাম যাব, বাবা। আমার ছেলের কাছে। শুনেছি ট্রেন আসতে অনেক বাকি, তাই ঘর থেকে বের হয়েছি দেরিতে। আমার বাড়ির পাশেই থাকেন স্টেশন-মাস্টার সাহেব। আমাকে বললেন, পাঁচ মিনিট পরেই ট্রেন আসবে। তাই চলে এলাম। তোমার কোন অসুবিধা নেই তো এখানে বসলে?’ বলেই জ্বলজ্বলে চোখে তাকালেন বৃদ্ধা।
এই কথায় বেশ অস্বস্তি হলো রাজু সাহেবের, তবে ভদ্রতার খাতিরে বললেন, ‘না-না, কোন সমস্যা নেই আপনি বসলে। আমি তো এখানে সিট দখল করে রাখতে আসিনি।’ বইটা খুলে পড়তে শুরু করলেন তিনি।
মিনিট খানেক পরেই এল ট্রেন। ‘ট’ বগিটা খুঁজে নিয়ে তিনি উঠে পড়লেন ট্রেনে। তাঁর পিছু পিছু উঠল বৃদ্ধা মহিলাও। তাঁদের সিট একই বগিতে পড়েছে। এবং সেই বগিতে আর কোন মানুষজন নেই।
সিটে বসেই বইটা ব্যাগে রেখে ঘুমিয়ে পড়বেন মনস্থির করলেন রাজু সাহেব। ব্যাগে বই রাখবেন, এমন সময় স্টেশন-মাস্টারের রুমে বসে থাকা সেই পাগলি রাজু সাহেবের বগির বাইরে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘ওই! তুই যাইস না এই ট্রেনে! এই ট্রেন তোর লাইগা আহে নাই! এটা তোরে শেষ কইরা দিব! তুই যাইস না! অমঙ্গল হইব! ঘোর অমঙ্গল..
চিৎকার করে বলতে-বলতেই ছেড়ে দিল ট্রেন।
রাজু সাহেব মনে-মনে পাগলের প্রলাপ মনে করে ব্যাগটা মাথার নিচে রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করলেন। ততক্ষণে ট্রেন পেরিয়ে গেল স্টেশন।
একটু পরেই এক গুন-গুন শব্দে ভেঙে গেল রাজু সাহেবের কাঁচা ঘুম। তিনি গলা বাড়িয়ে বাইরে চেয়ে দেখলেন বগি থেমে আছে। ট্রেন চলছে না। চারদিকে প্রচণ্ড বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই শব্দেই ঘুম ভেঙেছে। উঠে বাইরে বেরোবার দরজার দিকে এগোলেন। বাতাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেট খুলে যা দেখলেন, তাতে কয়েক গুণ বেড়ে গেল তাঁর হার্টবিট।
তাঁর বগির কোন দিকেই কোন বগি নেই! হয়তো খেয়াল করেননি যে, শেষ বগিতে উঠেছেন! এবং চলতি পথে কোনভাবে ট্রেনের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এই বগির!
ভাবতে গিয়ে ঘেমে গেলেন রাজু সাহেব। চারপাশে শব্দ করে বইছে হু-হু, শীতল বাতাস। বগিতে কেউ নেই। চারদিকে ফাঁকা জায়গায় একা ট্রেনের বগিতে তিনি, ভাবতে গিয়ে ঘাড়ের পাশে ব্যথা করতে লাগল তাঁর। কয়েক বছর ধরেই হাই প্রেশার। ভেবে পেলেন না এখন কী করবেন।
মোবাইলে কাউকে সাহায্যের জন্য কল করতে যেতেই টের পেলেন, যেখানে আছেন, সেখানে কোন মোবাইল নেটওঅর্ক নেই।
মাথার উপর আকাশ ছাড়া কিছুই খেয়াল করছেন না। বগিতেও বসে থাকতে কেমন যেন লাগছে। অন্ধকার বগি, বাইরে ঝড়। এমন সময় হঠাৎ করেই থেমে গেল ঝড়। ঠিক সেই সময় খুট করে শব্দ হলো। এবার সত্যি ভয় পেলেন তিনি শব্দটা এসেছে বগির পেছন থেকে। তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তার বিপরীত দিক থেকে। ভালভাবে খেয়াল করতে চাইলেন। দেখলেন সেই ঘোমটা পরা বৃদ্ধা এসে দাঁড়াল সামনে। তাঁর গলা টিপে ধরল প্রচণ্ড শক্তিতে…
ঘুম ভেঙে যেতেই এক ঝটকা দিয়ে উঠে বসলেন রাজু সাহেব।
এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলেন। বইটা কোলে রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আর স্বপ্নে কী সব ছাইপাঁশ দেখেছেন বলে মনে-মনে দোয়া-দরুদ পড়লেন। চারপাশে সেই পুরানো কোলাহল শুনে শরীরে সাহস পেলেন। তারপর দেখলেন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সিলেটগামী ট্রেন। তাঁর বগি নাম্বার ‘ট’। দেরি না করে উঠলেন নির্দিষ্ট বগিতে। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে-নিতেই শুনলেন বাইরে চিৎকার। দেখলেন স্টেশন-মাস্টারের রুমে বসে থাকা সেই পাগলি চিৎকার করছে: ‘ওই! তুই যাইস না এই ট্রেনে! এই ট্রেন তোর লাইগা আহে নাই! এটা তোরে শেষ কইরা দিব! তুই যাইস না! অমঙ্গল হইব! ঘোর অমঙ্গল…
পাগলিকে জিজ্ঞেস করবেন ভাবছিলেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতা মেলাতে-মেলাতে ছেড়ে দিল ট্রেন। পাগলিকে কিছু বলতে পারলেন না। তিনি তাঁর সিটে এসে বসতে গিয়েই হঠাৎ খেয়াল করলেন-পুরো বগি খালি, কিন্তু একদম শেষের দিকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বসে আছে কেউ এবং তিনি সিট পেয়েছেন একদম শেষ বগিতে। তাঁর বগির পরে আর কোন বগি নেই…
.
রাজীব চৌধুরী
