কালচৈত্রীর বজ্রপাত – মোঃ নাসির খান
কালচৈত্রীর বজ্রপাত
চৈত্র মাসের তুমুল ঝড়কে কী বলা উচিত? অবশ্যই কালচৈত্রী ঝড়! অথচ গত কয়েক দিন ধরে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে:
‘কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে বিপন্ন বাগমারা!’
‘কালবৈশাখী ঝড়ে গৃহহীন ১৩ পরিবার!’
‘বজ্রপাতে মৃত্যু ১৭ জনের; কালবোশেখীর বিভীষিকা!’ কোন মানে হয়!
সারাদিন কাঠফাটা রোদে মাথার ঘিলু গলে যায়। আর সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় ভয়ানক তাণ্ডব।
আজ ৯ এপ্রিল। তিন-চার দিন পর পহেলা বৈশাখ। এবারের পহেলা বৈশাখ একটু অন্যরকম করে কাটাব বলে এসেছি রাজবাড়িতে। আমার মেঝো আপার বাড়ি। অবশ্য পহেলা বৈশাখ উদযাপনই আমার মূল উদ্দেশ্য নয়। আপার ডেলিভারি ডেট পড়েছে এই দু’তিন দিনের ভেতর।
সপ্তাখানেক আগে আপা ফোন করে বলল, ‘বাবু, আমার বাচ্চা হবে।’
এমনভাবে কথাটা ও আমাকে বলল, যেন জীবনে আমি এমন কথা প্রথমবার শুনছি। আমি কাটা কাটা গলায় বললাম, ‘তো কী? আমি জানি না নাকি?’
বলে আর যাই কোথায়, ফোনে শোনা গেল আপার নাক টানার শব্দ। কণ্ঠে যথাসম্ভব নাকী-নাকী ভাব এনে আপা কাঁদতে লাগল: ‘তার মানে তুই আসবি না? আমার আপন বলতে আর কে আছে?’
‘কেন? বড় আপা আছে না? তা ছাড়া, ছোট খালাও তো আছে তোর ওখানে। কেন এত ভণিতা করিস, আপা?’
অবশেষে তার দু’দিন পর আমাকে রাজবাড়ি আসতে হলো। যে ক’দিন আছি, তার বেশিরভাগ সন্ধ্যা, রাতই ছিল দুর্যোগের। এমনিতেই আমার মেঝো আপার শ্বশুরবাড়ি এলাকা ভাল লাগে না। তার উপর আবার ঝড়-বৃষ্টি। এলাকার নামটিও আমার কাছে বেশ অপছন্দ। চরনারায়ণপুর। নামের মধ্যে ‘নারায়ণ শব্দটি আছে বলে সবসময় আমার চোখে দেব-দেবীর মূর্তি ভাসে। সারাদিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরি। সন্ধ্যা হলেই বিছানায় শুয়ে কড়াৎ-কড়াৎ মেঘের গান শুনি জঙ্গলের কথা বললাম এ কারণেই, এলাকাটাকে সুন্দরবন বললে ভুল হবে না। চারদিকে এত পরিমাণে জংলা গাছপালা, দিনের বেলাতেও এখানে শেয়াল ডাকে আমার ধারণা, এখানে কিছু বাঘ-ভাল্লুক ছেড়ে দিলে এটাও হবে ছোটখাটো একটা সুন্দরবন। অবশ্য আগের চেয়ে এখন অনেক বসতি গড়ে উঠেছে। এবার নিয়ে মোট চারবার এলাম আপার বাসায়।
সকাল থেকেই আজ ভাল না আপার শরীরটা, তামাটে হয়ে গেছে। মাথার চুলগুলো কুড়কুড়ে হয়েছে কেমন। ছোটবেলায় হাতের কাছে চুল পেলে বাতির আগুনে ধরলে যেমন দেখাত, তেমন। পুষ্টিহীনতায় ভুগছে কি না কে জানে!
দুপুরের দিকে আপা শুয়ে ছিল। গেলাম আপার কাছে। ফ্যাকাসে চোখে আপা আমার দিকে তাকাল। আমি হেসে ফেলে বললাম, ‘আপা, তোকে দেখতে রোনালদোর মত লাগছে। হা-হা-হা!’
আপা নড়েচড়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। মুখ ফিরিয়েই বলল, ‘উনি কে?’
‘কে? কার কথা বলছিস?’
‘ওই যে রোনালদো বললি যে।’
‘বাদ দে, আপা, তোকে মরা মানুষের মত লাগছে কেন?’
আপা আমার দিকে আবার ফিরে তাকাল। বিড়বিড় করে বলল, ‘বাবু, এখান থেকে যা। ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে আজকেই বাচ্চা হয়ে যাবে।’
সন্ধ্যা থেকেই আকাশ কালো হতে শুরু করেছে। নিশ্চিত আজও তুমুল ঝড়- বৃষ্টি হবে। আমি বিছানাতে কাঁথা গায়ে বসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রজাপতির মৃত্যু ও পুনর্জন্ম’ বইটা পড়ছি। এতটুকুন একটা উপন্যাস শেষ করতে আমার ঝাড়া তিন ঘণ্টা লাগল। এর মাঝে একবার আপার বড় মেয়ে জেরিন এসেছে আমার কাছে। কথা নেই বার্তা নেই সোজা খাটে উঠে আমার কাঁথার নিচে। আমি বই থেকে মাথা না তুলেই বললাম, ‘এখানে কী চাই, জেরিন?’
কাঁথা থেকে মুখ বের করে উঠে বসল মেয়েটা। আমার দিকে তাকিয়ে পটপট করে বলল, ‘কিছু চাই না, মামা। আমি আজ তোমার এখানে ঘুমাব। আমার খুব ভয় লাগছে। আমাকে ডিস্টার্ব করবা না।’
বলেই আগের মত ধুপ করে শুয়ে পড়ল। মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। গ্রামে মানুষ হলেও এই মেয়েটা আদর্শ পাচ্ছে তার মামার মত। আমি ওর কথা শোনার জন্য বই বন্ধ করে ফেললাম। নরম কণ্ঠে বললাম, ‘তুমি যেন কীসে পড়ো?’
কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের না করেই জেরিন উত্তর দিল, ‘ফোরে। রোল এক।’
‘তোমার সবচেয়ে অপছন্দের স্যর কে স্কুলে?’
‘উঁহু, স্যর না, ম্যাডাম। ঝর্না ম্যাডাম। সবাইকে শুধু শুধু ধমকায়।’
‘তোমার বান্ধবীদের নাম বলো।’
‘আমার কোন বান্ধবী নেই। একজন আছে। বীথিকা। তবে ও একদিনও পড়া করে আসে না।’
‘তুমি প্রতিদিন পড়া করো?’
‘মামা, ডিস্টার্ব করছ কেন? আমি ঘুমাব।’
‘আম্মুর কাছে গিয়ে ঘুমাও।’
‘নাহ্। আম্মুর গা দিয়ে গন্ধ বের হয়।’
এবার শব্দ করে হেসে ফেললাম, বললাম, ‘তাই নাকি? আমার গায়েও তো গন্ধ।
এ কথায় জেরিন বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে বলল, মুরগির পা আগুনে পুড়িয়ে ছাল বের করার সময় যেমন গন্ধ হয়, তেমন পোড়া গন্ধ বেরোয় নাকি ওর মায়ের গা দিয়ে।
জেরিন চলে যাওয়ার পর বই বন্ধ করে দরজা লাগিয়ে দিলাম। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে নিতে রাত প্রায় দশটা বাজল। বৃষ্টির ঠাণ্ডা আমেজে চোখে কেবল ঘুম এসেছে, তখনি দরজা ধাক্কানোর শব্দ পেলাম। জেরিন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে চেঁচাচ্ছে, ‘মামা, দরজা খোলো! মা মরে যাচ্ছে, মামা!’
দরজা খুলে দেখি জেরিন থরথর করে কাঁপছে। আমি ওকে কোলে তুলে বললাম, ‘ভয় নেই, জেরিন। আমি আছি।’
আমার গা শক্ত করে পেঁচিয়ে ভীত কণ্ঠে কেঁদে ফেলল, ‘মামা, দেখো, মা আজ মারা যাবে। আমার অনেক ভয় লাগছে।’
আপার কাছে এসে দেখি অবস্থা সত্যিই ভয়ানক। হঠাৎ করেই ব্যথা উঠেছে। আপা সহ্য করতে পারছে না। ওকে দেখতে কী যে বীভৎস লাগছে! সম্ভবত হাসপাতালে নিতে হবে। এদিকে ছয় মাস হলো দুলাভাই গেছে বিদেশে। তবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আপার চাচাশ্বশুর একটা অটোরিকশা নিয়ে এল কোথা থেকে। সম্ভবত পাশের বাসার কারও হবে।
আপাকে ছাদওয়ালা অটোরিকশার লম্বা সিটে শুইয়ে দেয়া হলো। আপার সঙ্গে উঠল ছোট চাচা আর আপার শাশুড়ি-মা। আমাকে বলা হলো জেরিনকে নিয়ে বাড়িতে থাকতে। কী হয় না হয় আমাকে ফোনে জানানো হবে। অবশ্য ইলেকট্রিসিটি না থাকার কারণে আমার মোবাইলের চার্জ বিকাল থেকেই শেষ। ফোনও অফ করা। তারপরও কোন চিন্তা করলাম না। ছোট চাচীর ফোনে যোগাযোগ করা হবে। উনিও কিছু দিন ধরে অসুস্থ, তাই তাঁর উপর ভরসা না করে আমাকে থাকতে বলা হলো বাড়িতে।
রাত এগারোটার দিকে ছোট চাচী চিঁ-চিঁ করে আমাকে কী যেন বলার চেষ্টা করলেন। আমি তাঁর কথা কিছুই বুঝলাম না। উনি তাঁর মোবাইল ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিতেই বেজে উঠল ফোনটা। আশ্চর্য, রিসিভ করেই আপার কণ্ঠ শুনলাম, ‘হ্যালো, বাবু, একটা কাজ কর…
‘আপা, তুই কি সুস্থ আছিস? বল, কী করব?’
‘আলমারির নিচের ড্রয়ারে পাঁচ হাজার টাকা আছে। নিয়ে চলে আয় হাসপাতালে। চাবি আমার বিছানার তোশকের নিচে আছে।’
ঝড়-বৃষ্টির রাতে রিকশা পাওয়ার আশা নেই, তাই আমি হেঁটেই রওনা দিলাম। বৃষ্টি নেই। কেবল ঘুটঘুটে অন্ধকারে দমকা বাতাস বইছে। হেঁটে যেতে তেমন ভরসা পাচ্ছি না। রাস্তাঘাট তেমন পরিচিত নয়। মাত্র চারবার এসেছি রাজবাড়িতে। চারবারে সবকিছু চিনে ফেলা যায় না। যেবার জেরিনের জন্ম হলো, সেবার প্রথম হাসপাতালে গিয়েছি। মনে হচ্ছে না হেঁটে গেলে হাসপাতাল চিনব। ভাবলাম হেঁটে স্টেশন পর্যন্ত গেলে সেখানে রিকশা, ভ্যান যে-কোন কিছু পাব নিশ্চয়ই।
প্রবল ঠাণ্ডা বাতাসে গা শিউরে উঠছে বারবার। এই বাতাসের মধ্যেই হেঁটে ড্রাই-আইস ফ্যাক্টরি পার হলাম। সঙ্গে সঙ্গে আকাশ ভেঙে বড় বড় ফোঁটায় শুরু হলো বৃষ্টি। বুঝলাম, নির্ঘাত ভিজে যাব। আমি ভিজলে তেমন সমস্যা নয়। আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা আছে এই একটা বড় সমস্যা। ডান পাশে মোটামুটি ঝাঁকড়া একটা পাকুড় গাছ দেখলাম। তাতে মনে সায় পেলাম না। পাকুড় গাছ বৃষ্টির পানি ঠেকাতে পারবে না। মাঝে মধ্যে যে বিদ্যুৎ ঝলকানির আলো, তাতে দেখলাম একটু সামনে বিরাট একটা কড়ই গাছের নিচে একটা বাড়ি। চারপাশ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হলেও মনে হলো, সদর গেট একদম হাঁ করে খোলা। ত্রিশ-চল্লিশ সেকেণ্ড দৌড়ে গেট দিয়ে সোজা ঢুকে পড়লাম। সামনে ছোটখাটো বারান্দামত এক ছাদওয়ালা জায়গা। সেখানেই আশ্রয় নিলাম বারান্দার পিছনে কাঁচিগেট। ভিতরের সব দেখা যায়। লম্বা প্যাসেজের মত জায়গা। দু’পাশে সম্ভবত আবাসিক হোটেলের মত অনেকগুলো রুম বা এরকম কিছু। সারা বাড়িতে কোন লাইট জ্বলছে না। কোন সাড়াশব্দও নেই।
বাড়িটাকে পরিত্যক্ত ভাবতে পারছি না। কারণ, পুরো বাড়িতেই করা হয়েছে নতুন রঙ। ধবধবে সাদা। আমি হাত দিয়ে মাথা ঝাড়ছি, আর খোলা গেট দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি। পাঁচ-দশ মিনিট পার হতে না হতে আমার গা কেমন ভারী হয়ে উঠল। মনের ভেতর লাগল ভয়। কেন জানি মনে হচ্ছে, অসংখ্য চোখ প্রাচীর ঘেরা এই বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমাকে লক্ষ করছে।
ঝড়-বৃষ্টির রাত।
ঘুটঘুটে অন্ধকার। তার মধ্যে নির্জন বাড়ির সামনে একা। ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক। সান্ত্বনা দিয়ে একটু ধাতস্থ করছি নিজেকে, ঠিক তখনি পেছনের কাঁচিগেট সশব্দে এক হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল কে যেন!
চমকে পেছন ফিরে তাকালাম। অন্ধকারে কাউকে দেখলাম না। তবে বিশ্রী একটা গন্ধ এসে আছড়ে পড়ল নাকে।
খুব শীতল অথচ খ্যাসখ্যাসে গলায় কেউ বলল, ‘ভিতরে আহেন।’
আমি সাহস করে বললাম, ‘কে!’
লোকটি উত্তর না দিয়ে বলল, ‘কইলাম ভিরে আহেন। বিজলী বহুত খারাপ, ঠাডা পড়ব।’
কথা না বাড়িয়ে সম্মোহিতের মত ভিতরে ঢুকলাম। বাধ্য হলাম নাকে হাতচাপা দিতে। যা বিশ্রী গন্ধ!
প্যাসেজের কাছে একবার বিদ্যুৎ ঝলকানির আলো পেলাম। দু’এক সেকেণ্ডের আবছা আলোয় দেখলাম খেজুর পাতার তৈরি পাটি গায়ে জড়িয়ে থাকা লুঙ্গি পরনে লোকটিকে। ফস্ করে বলে ফেললাম, ‘আপনার গায়ে পার্টি কেন?’
প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই উত্তর পেলাম। যেন লোকটি জানত কী প্রশ্ন করব। ‘বড্ড শীত করে গো, ভাইসাব। সোজা যায়া পুবের ঘরডায় বসেন, ভাইসাব কপাট খোলা আছে।
ভাবলাম ঝড়-বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত রুমে গিয়ে বসি। লোকটা হয়তো কেয়ারটেকার হবে এ বাড়ির। অন্ধকারে আস্তে আস্তে পা ফেলে সোজা এলাম। যখন হাতড়ে হাতড়ে খোলা দরজাটা পেলাম, ঠিক তখনি আমার কানে এল একটা শব্দ। চপচপ করে কিছু চেটে খাওয়ার আওয়াজের মত। যথেষ্ট ভয় পেলেও ভড়কে গেলাম না। রুমের ভেতর ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই আমার সারা গায়ে কাঁটা দিল। দেখলাম, ঘুটঘুটে অন্ধকারে দশ-বারোটা জ্বলন্ত চোখ আমার দিকে ফিরে তাকাল। চোখগুলো মেঝে থেকে উচ্চতায় আমার উরু পর্যন্ত হবে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্বলে উঠল রুমে বিশ ভোল্টের একটা হলুদ লাইট। সে আলোয় দেখলাম পুরো ঘরটাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তিন-চারটা মানুষের লাশ। কোনটা বুক থেকে পিঠ পর্যন্ত মসৃণভাবে কেটে ফাঁক করা। কোনটার মাথা বিধ্বস্ত। আর সেগুলো ঘিরে আছে পাঁচ-ছয়টি কুকুর (আমার মনে হলো শেয়াল। কিন্তু শেয়ালের গায়ের রং তো কালো হয় না।)। আমাকে দেখে লাশগুলো খাওয়া বাদ দিয়ে স্থির হয়ে গেছে কুকুরের দল। ওদের তাকানো দেখে মনে হলো ওদের আমি প্রচণ্ড বিরক্ত করে ফেলেছি। আতঙ্কে শুরু হলো আমার পেটের মধ্যে কাঁপুনি। মনে হলো বুঝি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। বীভৎস লাশগুলোর গন্ধে পেটের নাড়ি-ভুঁড়ি উল্টে আসছে আমার।
পেটে হাত রেখে বমি করতে যাব, ঠিক তখনি সব থেকে পেছনের কুকুরটা ছুটে এসে কামড়ে ধরল আমার ডান পা। কুকুরটার ধারাল দাঁত বসে গেল জিন্স প্যান্টে। দাঁতগুলো পায়ের চামড়া তখনও স্পর্শ করেনি। কোনরকম প্রতিরোধ করতে পারছি না। সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে। তখনই আতঙ্কিত দৃষ্টিতে লক্ষ করলাম, হিংস্রভাবে আমার দিকে এগিয়ে আসছে কুকুরগুলো।
তখনই খুব কাছে কোথাও আকাশ কাঁপিয়ে বাজ পড়ল। মনে হলো বাজ পড়ার শব্দে যেন শরীরে শক্তি ফিরে পেলাম। এক ঝটকায় পা কামড়ে থাকা কুকুরটাকে লাথি মেরেই ঝেড়ে দৌড় দিলাম।
ভেবেছিলাম পেছনে পেছনে কুকুরগুলোও আসবে। কিন্তু আশ্চর্য, হুট করে উধাও হলো সবক’টা কুকুর!
আমি এসব নিয়ে মাথা ঘামালাম না। দৌড়ে কাঁচিগেট পার হওয়ার সময় কোন কিছুতে পা বেধে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। যখন আমি রুমে ঢুকি, তখনই চলে এসেছিল ইলেকট্রিসিটি। তাই আলোয় দেখলাম যেটাতে পা বেধে পড়ে গেছি, সেটা হচ্ছে সেই পাটি দিয়ে পেঁচানো লোকটির লাশ। যার পাটির অর্ধেক কিছুতে ছিঁড়ে খেয়ে নিয়েছে।
বিদ্যুদ্গতিতে দৌড়ে রাস্তায় এলাম। তারপর সোজা রাস্তা ধরে দৌড়ে সরকারি কলেজ, গির্জাঘর পার হয়ে এক দৌড়ে আর. এস. কে.।
ইনস্টিটিউশনের সামনে দিয়ে স্টেশনে এসে ধপ করে বসে পড়লাম। মোটামুটি দশ-পনেরো মিনিট রেস্ট নিয়ে টিকেট কাউন্টারের সামনে বসে থাকা কয়েকজন উৎসুক জনতার প্রশ্নের উত্তর দিলাম। এর মধ্যে একজন ভ্যানচালক। বাড়ি নাকি মেঝো আপার বাসার কাছেই। তিনি সব শুনে তাঁর ভ্যানে আমাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে রাজি হলেন। তখন রাত প্রায় একটা।
ভ্যানে সামনের দিকে বসলাম। আমার পেছনে দুটি বস্তা বোঝাই কী যেন। চাচামিয়াকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, বস্তা ভর্তি আলু। হাসপাতালে পৌঁছাতে আমার দশ থেকে পনেরো মিনিট মত লাগল।
হাসপাতালটা কেমন জনশূন্য মনে হলো আমার কাছে। হয়তো রোগী কম বলেই এমন। জানি না আপা কোথায় আছে। আমাকে প্রত্যেক ওয়ার্ড আর কেবিন খুঁজতে হবে হয়তো। না, অত কষ্ট করতে হলো না আমার। দোতলায় সিঁড়ির মাথায় অ্যাপ্রন পরা মধ্যবয়সী এক ডাক্তারকে দেখলাম। রোগীর ব্যাপারে সম্পূর্ণ খুলে বলে তার অবস্থান জানতে চাইলে তিনি মুখে কোন উত্তর দিলেন না। তবে অদ্ভুতভাবে জানিয়ে দিলেন। পশ্চিম দিকে সোজা তর্জনী তুলে খাড়া করলেন বৃদ্ধ আঙুলটি।
অর্থাৎ সোজা শেষপ্রান্তে গিয়ে বাঁয়ের কেবিনে আপা আছে।
সোজা হেঁটে যাচ্ছি। একদম ফাঁকা প্রত্যেকটা বেড। আজকাল মানুষের অসুখ হয় না নাকি? হলেও তারা হাসপাতালে আসে না নাকি? ওয়ার্ডের শেষ প্রান্তে পৌঁছালাম। বাঁ-পাশের কেবিনটি খোলা। ভিতরে লাইট জ্বলছে কম পাওয়ারের।
সোজা ভিতরে ঢুকলাম। দেখলাম আপার শাশুড়ি, ছোট চাচা বা ডাক্তার-নার্স কেউ নেই ভিতরে। তবে বেঢপ পেটওয়ালা একজনকে দেখলাম, যার সমস্ত শরীর সাদা নোংরা চাদরে ঢাকা। এমন কী মুখটাও। লাশ যেভাবে ঢেকে রাখে, তেমন। আমার মেঝো আপার অভ্যাস আছে এমন করে ঘুমানোর
নিশ্চয়ই এটা আপা। আমি সাহস করে মুখ থেকে চাদর সরিয়েই ভয়ে জমে গেলাম। দেখলাম আপার মুখ আর চুল পোড়া। কদাকার দেখাচ্ছে ওকে। মুখের সমস্ত অংশ পোড়েনি বলে বোঝা যাচ্ছে এটা আমার মেঝো আপা।
সত্যি সত্যি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। আমার পা জমে গেল যেন। এক পর্যায়ে ধক করে চোখ খুলে আমার দিকে তাকাল আপা। ফ্যাসফ্যাস করে বলল, ‘বাবু, ভয় পাচ্ছিস?’
বিড়বিড় করে বললাম, ‘তোর কী হয়েছে? ছোট চাচা কোথায়? মাওই মা কোথায়?’
আমার প্রশ্নের উত্তরে আপা যা বলল, তাতে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। মনে হলো দুঃস্বপ্ন দেখছি। আপা ধীরে ধীরে স্পষ্ট করে বলল, ‘বাবু, আমি তো মারা গেছি গতকাল ভোরে। ভোরবেলা অনেক ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল, মনে আছে তোর? আমি বাথরুম করতে বাইরে এলাম। বাথরুম থেকে ঘরে আসব, ঠিক তখনি আমার মাথায় বজ্রপাত হলো। সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলাম। আর মারা যাওয়ার পরও দেখলাম আবার জীবিত হয়ে গেছি। আমার পেটের সন্তান জীবিত আছে। আমার কানে কানে শত শত মানুষ বলে গেল-চৈত্র মাসের ঝড়ের বজ্রপাতে তোমার মৃত্যু। তুমি অসম্ভব ক্ষমতার অধিকারী এখন। তুমি এখনি মরছ না। তবে খুব শীঘ্রিই আমাদের কাছে চলে আসবে। আমার তখনি মনে হলো আমার পেটের বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হবে। ও, বাবু, তুই ভয় পাচ্ছিস? অমন করছিস কেন? আয়, আমার কাছে আয়।’
বলেই আমার শার্টের এক কোনা টেনে ধরল আপা।
আমি হাসপাতাল কাঁপিয়ে বিকট চিৎকার দিয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন আমার পাশে তিন-চারজন নার্স-ডাক্তার। একজন আমার মুখের উপর ঝুঁকে এসে বললেন, ‘মর্গে কী করছিলেন আপনি?’
আপার কথা খুলে বললাম। ডাক্তার বলল, আপাকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। অবস্থা সিরিয়াস দেখে সে অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ফরিদপুর মেডিকেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আপা নাকি ফোনে কথা বলার মত কোন অবস্থায় ছিল না। আমি কোন ভুল করেছি, ডাক্তারদের ধারণা। মর্গে কোন লাশ নেই।
মাথার চুল খামচে ধরলাম আমি। নিশ্চয়ই কিছু একটা হচ্ছে আমার সঙ্গে। আর এসব নিয়ে মাথা ঘামালাম না। ভাবলাম রাত দুটো-তিনটে যা-ই বাজুক, এখন বাসায় যাব, যদি হাসপাতালের সামনে গাড়ি পাওয়া যায়। না পেলে আজ রাত আমাকে হাসপাতালেই কাটাতে হবে।
হাসপাতাল গেটে এসে অবাকই হলাম। দেখলাম আরোগ্য ফার্মেসীতে ভ্যানওয়ালা চাচা বসে আছেন। রাস্তায় বস্তাসহ ভ্যান দাঁড় করানো। আমাকে দেখে উনি হাসলেন।
বাসায় ফিরতে চাই বললাম তাঁকে 1
উনি বুঝলেন যে আমার উপর দিয়ে যথেষ্ট ধকল গিয়েছে। উনি আশ্বস্ত করলেন, ওঁর ভ্যানে আমাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন। তাঁর বাড়িও ওদিকেই, তাই কোন সমস্যা হবে না।
চাচার গ্রামের নাম গঙ্গাপ্রসাদপুর। চরনারায়ণপুরের একটু পাশেই। ভ্যানে উঠে বসলাম। ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলেও আকাশে যথেষ্ট মেঘ। রাস্তাঘাট জমাট অন্ধকার ঠাসা। ভ্যানের নিচে অস্পষ্ট আলোর হারিকেন পরিবেশকে করে তুলেছে আরও ভৌতিক।
ভ্যানচালক আর আমি দু’জনেই চুপচাপ আছি। কথা বলতে একটুও ইচ্ছা করছে না। কী মনে হতে উনি হুট করে বলে ফেললেন, ‘বাবা, আপনি ঝড়ের মধ্যে যে ঘরডায় দাঁড়াই ছিলেন, ওইডা কিন্তুক কারও বাড়ি না। হেইডা আছিল লাশকাটা ঘর। ওইহানে পোস্টমর্টেম করা হয়।’
নড়েচড়ে বসলাম। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাম, ‘বলেন কী, চাচা?’
‘হ, বাবা। আপনে যে জান নিয়া বাইর হইছেন ইহান থোন, এইডা আপনার ভাইগ্য। আল্লাহর অসীম দয়া। এইরম ঘটনা পেরাই ঘড়ে। যেইদিন পাহারাদার থাহে না, গুইনা গুইনা হেইদিনই ঘড়ে।’
‘চাচা, আমি তিন-চারটা লাশ দেখলাম…’
‘ঠিকই দেখছেন। গতকাইল দুই-তিনডা ঠাণ্ডা পড়া লাশ আইছে ঘরে।’
পুরো ঘটনা আবার মনে মনে জাবর কাটলাম। আমার গায়ের লোম সব দাঁড়িয়ে গেল। কী ভয়ানক অভিজ্ঞতার সামনে যে পড়েছি ভাবতেই পারছি না।
ভ্যান যখন সরকারি কলেজের সামনে, তখন চাচা কোমর থেকে বিড়ি বের করে ধরালেন। আমার দিকেও ধরানো একটা বাড়িয়ে দিলেন। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ‘চাচা, আমি সিগারেট পছন্দ করি না।’
চাচা সুন্দর শব্দ তুলে হাসলেন। ওঁর সশব্দ হাসি আমার ভয় অনেকখানি কাটিয়ে দিল। নিজেকে অনেক হালকা মনে হলো। ভাবলাম, এরকম ভৌতিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া কোন ব্যাপার নয়।
চাচা আবার বললেন, ‘বিড়ি না খাইলেও ধইরা রাহেন। আগুন ঠিক রাহার জন্য মাঝে মইদ্যে দুই-এক টান দেন। ওইগুলান আগুনরে খুব ডরায়।’
চাচার কথা যৌক্তিক মনে হলো। বিড়ি নিয়ে টান দিলাম। আনাড়ির মত কাশতে লাগলাম।
যখন ভ্যান লাশকাটা ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছে, তখন পুরো পরিবেশ স্বাভাবিক দেখলাম। খোলা গেট, চুপচাপ সবকিছু। উল্টাপাল্টা ভাবছিল আমার মস্তিষ্ক। মনে হলো পাটি জড়ানো লাশটি আমার মাথার মধ্যে বলে যাচ্ছে, ‘পারলি না তো পিশাচগুলোর হাত থেকে আমাদেরকে বাঁচাতে। আমাদের জীবন্ত চামড়ায় দাঁত বসিয়ে খেয়ে গেল ওরা।
চাচা ভ্যান চালিয়ে তালতলা মসজিদের কাছে এসে থেমে গেলেন। বিশাল একটা আম গাছ আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে রাস্তার মাঝখানে, যে কারণে ওদিক দিয়ে ভ্যান নেয়া সম্ভব নয়।
চাচার অস্বস্তি দেখে বুঝলাম, তিনি অপারগ। তাঁর রাস্তা হলো মসজিদের পাশ দিয়ে রেল লাইনের দিকে যে রাস্তা গিয়েছে, সেটা। আর আপার বাসা তার বিপরীত দিকের রাস্তায় সোজা।
নীরবতা ভেঙে বললাম, ‘চাচা, আমি এখন একাই যেতে পারব। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই আপার বাসা। আপনি চলে যান।’
চাচা বুঝলেন আমার বলার মধ্যে অনেক আত্মবিশ্বাস আছে। তিনি কোমর থেকে দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘ম্যাচটা সাথে রাহেন, বাবা। আর কুনো বিপদ আইব না। কাঠি জ্বালাইলে সাহস পাইবেন।’
তাঁর হাত থেকে ম্যাচ নিলাম।
মসজিদ থেকে আসা আলোতে সেই প্রথম তাঁর চেহারা সচেতন মস্তিষ্কে লক্ষ করলাম। মুখে দাড়ি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নূরানী চেহারা তাঁর। আশ্চর্য, তখনই নাকে আতরের গন্ধ পেলাম। খুব হালকা অথচ মিষ্টি গন্ধ। আমি প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে বললাম, ‘আপনার নাম কী, চাচা?’
আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। সুন্দর করে হাসি দিয়ে উনি ভ্যান নিয়ে বিপরীত দিকে রওনা দিলেন।
পা বাড়ালাম। আম গাছটা পার হওয়ার সময় ডান হাত একটা ডালে পেঁচিয়ে দেশলাইটা পড়ে গেল। কোন্ কোনায় পড়েছে কে জানে, পাঁচ মিনিট খোঁজ করার পরও পেলাম না
অবশেষে যা পেলাম, তা কাদাপানিতে মাখামাখি হওয়া অকেজো দেশলাই। ওটা কাদাপানিতে বিসর্জন দিলাম। মনে আর ভয় নেই।
পাঁচ মিনিট হাঁটলেই আপার বাসা। আশপাশে বাড়িঘরও আছে কয়েকটা।
ডাক্তার বদরুল চাচার বাড়ি পেরিয়ে একটু সামনে এগোলাম।
নিথর ঘন কালো আকাশ। এখন কোন বাতাসও নেই। গুমট অবস্থা। রাস্তার পাশের খালে সম্ভবত পানি জমে গেছে। আমার মনে হলো সেই পানিতে ছপছপ শব্দ তুলে হাজার হাজার পায়ে দৌড়ে রাস্তায় উঠে আসছে কিছু।
খুবই ভয়ানক অবস্থা!
দেখলাম সত্যি সত্যি খাল থেকে অসংখ্য জ্বলন্ত চোখ জোনাকীর মত রাস্তায় এসে স্থির হচ্ছে। অসংখ্য চোখের দৃষ্টি আমার দিকে। কেঁপে কেঁপে উঠল আমার হৃৎপিণ্ড। সেইসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিকভাবে শুরু হলো দমকা বাতাস ও মেঘের গর্জন
হাজার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমি তাদের একসময় খুব বিরক্ত করেছি! সেই প্রতিশোধ ওরা নেবে!
একসময় উপলব্ধি করলাম, প্রবল আতঙ্কে আমার মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ আওয়াজ বের হচ্ছে। কারণ সেই হিংস্র চোখগুলো এগিয়ে আসছে আমার দিকে মনে মনে এই প্রথম আল্লাহকে ডাকলাম: হে, আল্লাহ, আমার উপর বজ্রপাত ঘটাও। এত আতঙ্ক সহ্য করতে পারছি না। আমার মৃত্যু দাও।
বলা শেষ হতেই আমাকে অবাক করে দিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে প্রচণ্ড শব্দে কড়াৎ করে পড়ল বাজ।
তবে আমার মাথায় না পড়ে পড়ল ওই প্রাণীগুলোর উপর, যাদের গায়ের রঙ কালো, দেখতে শেয়ালের মত।
মুহূর্তেই উধাও হলো ওরা। রাস্তা ফাঁকা। প্রচণ্ড শব্দে আমার কানে তালা লেগে গেছে। জীবনে প্রথম নিজ চোখে বজ্রপাত দেখলাম। তা-ও আবার কালচৈত্রীর বজ্রপাত। কী চোখ ধাঁধানো আগুনের ফুলকি! দেখে মনে হয়েছে আসলেই এই বজ্রে অনেক রহস্য।
নির্বাক দাঁড়িয়ে আছি। নড়তে পারছি না ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও। একটু পরেই বুঝলাম, পেছন থেকে টর্চের আলো ফেলে কেউ একজন আসছে। কাছে এসেই অবাক হওয়া গলায় বলল, ‘কে, বাবু না!’
দেখলাম বদরুল চাচা। যেন হুঁশ ফিরে পেলাম। বুঝলাম সারা শরীর ঘেমে ভিজে একাকার আমি।
তিনি আবার বললেন, ‘তুমি জেরিনের মামা না? তোমার আপার কী অবস্থা?’
তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। তিনি আমাকে ধরে বাসায় পৌঁছে দিলেন।
বাসায় পৌঁছে মোটামুটি ঘণ্টা দুই ঘুমালাম। সকালে ঘুম ভেঙে দেখি বাড়ি ভর্তি লোকজন। বড় আপা তার তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে হাজির। ছোট খালা এসেছে। দুলাভাইয়ের কিছু আত্মীয়-স্বজন এসেছে। সবারই আনন্দ চোখে পড়ার মত। মেঝো আপার ছেলে হয়েছে!
রাতের ঘটনা যে আমার জীবনে চরম দুর্বিষহ ছিল, তা কাউকে বললাম না। বদরুল চাচা সবাইকে বলেছেন, ভোররাতে দু’তিন শ’ শেয়ালের পায়ের শব্দ শুনে ঘটনা কী বুঝতে রাস্তায় আসেন তিনি। আমাকে রাস্তায় মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সামান্য ভয় পেয়েছেন।
দুপুরের দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মেঝো আপাকে আনা হলো। আমি বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে ছুটে গেলাম আপার কাছে। অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর থেকেই আপা বলল, ‘বেঁচে গেলাম রে, বাবু। মরিনি।’
আমি তেতে উঠলাম, ‘মরবি কেন?’
‘বাচ্চা হতে গিয়ে মানুষ মরে না? দেখ, আমার বাবুটা কী সুন্দর হয়েছে! আগুনের মত গায়ের রঙ। ওর নাম কী দেব, কী দেব…ওর নাম দিলাম বজ্ৰ।’
আমি চারদিকে তাকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘এত নাম থাকতে বজ্র কেন?’
আমার অনুসন্ধানী চোখ দেখেই হয়তো আপা বলল, ‘বাবু, যা তো এখান থেকে। আমার রাগ লাগছে।’ বলেই আপা রহস্যময় এক হাসি হাসল।
আমি খেপে গিয়ে মেঝো আপার মাথা থেকে কাপড় ফেলে দিলাম চুলগুলো দেখার ইচ্ছায়। আমার ক্ষিপ্রতা হয়তো অস্বাভাবিক ছিল। দেখলাম বড় আপা ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে আর বলছে, ‘ও, বাবু, অমন করিস কেন? কী হইছে? তোমরা কেউ পানি আনো, বাবুর মাথায় পানি দিতে হবে।’
আমার প্রচণ্ড হাসি পেল।
.
মোঃ নাসির খান
