নিশিডাকিনী – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

আত্মহত্যা – আফজাল হোসেন

আত্মহত্যা

লিজাদের বাড়ির দোতলায় নতুন ভাড়াটে উঠেছে। মধ্যবয়স্কা এক ভদ্রমহিলা আর তাঁর মেয়ে। মেয়েটির নাম হেলেন। লিজারই সমবয়সী। দেখতে খুবই সুন্দরী। বলা যায় হেলেন অভ ট্রয়।

কয়েক দিনেই হেলেনের সঙ্গে লিজার অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। রোজ বিকেলে দু’জন বাড়ির ছাদে উঠে আড্ডা দেয়। অনেক গল্প-গুজব হয় তাদের মাঝে। দু’জন দু’জনার নিজ-নিজ ভাল লাগা-খারাপ লাগা, শখের কাজ, পছন্দ- অপছন্দ, প্রিয় নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, লেখক, এমনকী কোন মজার ঘটনা ঘটলে বা দুঃখজনক ঘটনা ঘটলে সব কিছু একে অপরকে জানায়। যতই দিন গড়াচ্ছে ততই দু’জনার বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হচ্ছে। আজকাল মাঝে-মাঝে সন্ধ্যার পরও তাদের আড্ডা জমে ওঠে। ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে লোডশেডিং-এর সময়।

তবে হেলেনের একটা আচরণ লিজার একটুও ভাল লাগে না। তা হলো- দু’জনার গল্পের মাঝে হঠাৎ-হঠাৎ হেলেন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গম্ভীর গলায় আত্মহত্যার কথা বলে। যেমন: লিজা হয়তো বলছে, ‘জানো, আজ মা আমায় খুব বকেছে। শুধু-শুধুই বকেছে। আমার কোন দোষ ছিল না।

হেলেন থমথমে গলায় বলবে, ‘তোমার আত্মহত্যা করা উচিত। বেঁচে থেকে কী লাভ বলো? একমাত্র মৃত্যুই মানুষকে এনে দিতে পারে পরম নিশ্চয়তা আর শান্তি। সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। পৃথিবীর কোন দুঃখ-কষ্ট-সমস্যাই আর তখন ছুঁতে পারে না। তুমি আত্মহত্যা করো। মুক্তির জন্য তোমার আত্মহত্যা করা উচিত।’

এভাবে লিজা হয়তো বলল, আজ ক্লাসে স্যর আমাকে মন্দ বলেছেন, অথবা ক্লাসমেট এক মেয়ে খারাপ বিহেভ করেছে, অথবা রাস্তায় বখাটে একটা ছেলে বাজে কথা বলেছে, অথবা গলির মুখের দোকানদার ব্যাটা যেন কেমন-কেমন করে তাকিয়েছে…সব ক্ষেত্রেই হেলেন বলে উঠবে, তোমার আত্মহত্যা করা উচিত। বেঁচে থেকে কী লাভ…

এ ছাড়া লিজা যদি বলে, আমার মনটা ভাল নেই, অথবা কিছু ভাল লাগছে না, অথবা ভীষণ মাথা যন্ত্রণা করছে, অথবা রাতে ভাল ঘুম হয়নি…এসব ক্ষেত্রেও বলে উঠবে, তোমার আত্মহত্যা করা উচিত। বেঁচে থেকে কোন লাভ নেই…

হেলেন যেন সারাক্ষণ অপেক্ষায় থাকে কখন আত্মহত্যার কথা বলার সুযোগ পাবে। শুধু আত্মহত্যা করতে বলেই ক্ষান্ত হয় না। কী-কী পদ্ধতিতে আত্মহত্যা করা যায় তা-ও বলে।

লিজা মাঝে-মাঝে রেগে-মেগে ধমকে ওঠে, ‘আত্মহত্যার কথা বলা ছাড়া আর কোন কথা তুমি জানো না?! আমার সামনে কখনও আর এসব কথা বলবে না।’

তখন হেলেন কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থেকে বলে, ‘যা বলি ঠিকই বলি। ভাল করে ভেবে দেখো, আত্মহত্যাই একমাত্র মুক্তির পথ।’

.

এক

মাঝ রাত। বাইরে ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিকট শব্দে বাজ পড়ছে। কাচ বসানো জানালার শার্সি আর ভেন্টিলেটরের মাঝ দিয়ে আসা বিজলির নীলচে আলোতে অন্ধকার ঘর ক্ষণে-ক্ষণে আলোকিত হয়ে উঠছে।

দুঃস্বপ্ন দেখে লিজা ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। খুবই ভয়ানক দুঃস্বপ্ন। স্বপ্নে সে আত্মহত্যা করেছে। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা। সে কী কষ্ট! দমটা আটকে যায়। একটু শ্বাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে শুরু করে। ঝুলন্ত অবস্থায় প্রাণপণে হাত-পা ছুঁড়তে থাকে। চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। জিভটা বেরিয়ে ঝুলে পড়ে। নাকের ফুটো, কানের ফুটো, চোখ-মুখ দিয়ে চুইয়ে রক্ত বেরোতে আরম্ভ করে।

অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে-করতে ঘুম ভেঙেছে লিজার। ঘামে ভিজে গেছে তার সমস্ত শরীর। মুখ হাঁ করে টেনে-টেনে শ্বাস নিচ্ছে। তাতেও তার ফুসফুস অক্সিজেনে পরিপূর্ণ হচ্ছে না। যেন কোন কারণে এই ঘরের বাতাস কমে গেছে। সেই সঙ্গে ঘরের পরিধিও। নিজেকে কেমন বন্দি মনে হচ্ছে।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। এখনও লিজার বুকটা হাপরের মত ওঠা-নামা করছে। খুব পিপাসা লেগেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। বেডসাইড টেবিলে পিরিচ দিয়ে ঢাকা এক গ্লাস পানি রয়েছে। ভাবছে, উঠে বসে পানিটা খাবে। কিন্তু উঠে বসার মত গায়ে জোর পাচ্ছে না। হাত-পা, সমস্ত শরীর অসাড় লাগছে।

এমন ভয়ঙ্কর স্বপ্ন সে কী করে দেখল?! কী জীবন্তই না ছিল স্বপ্নটা! যেন সত্যি-সত্যিই আত্মহত্যা করছিল। মনে পড়লেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।

হঠাৎ লিজার চোখ পড়ল তার সোজা উপরে সিলিং ফ্যানের দিকে। ফ্যানের দিকে চোখ যেতেই আতঙ্কে একেবারে জমে গেল।

ঘুমোবার আগে ফ্যান ছেড়ে শুয়েছিল। ইলেকট্রিসিটি নেই বলে এখন ফ্যানটা বন্ধ। ক্ষণে-ক্ষণে আসা বিজলির নীলচে আলোতে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, থেমে থাকা ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস নিয়ে কে যেন ঝুলছে। একটা মেয়ে। ঘাড়টা ভেঙে মাথাটা সামনের দিকে নুয়ে কুঁজোদের মত বাঁকা হয়ে ঝুলছে। মুখের উপর পড়ে আছে এক রাশ আলুথালু চুল। তাই মুখ দেখা যাচ্ছে না। হাত-পাগুলো টান-টান হয়ে রয়েছে।

আচমকা ঝুলন্ত অসাড় শরীরটা প্রচণ্ড একটা ঝাঁকি মেরে উঠল। যেন সাড় ফিরে পেয়েছে। নুয়ে থাকা মাথাটা ঝটকা মেরে সোজা হলো। এলোমেলো চুলগুলো মুখের দু’পাশে সরে গেল। মুখ দেখা গেল। চোখ দুটো উল্টানো। কোটর ছেড়ে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। মুখটা হাঁ হয়ে জিভ বেরিয়ে আধ হাতের মত ঝুলছে। চোখ-নাক-জিভের ডগা দিয়ে চুইয়ে রক্ত ঝরছে। স্বপ্নে লিজা নিজেকে যে অবস্থায় দেখেছিল ঠিক তেমন।

আতঙ্কে লিজা একেবারে বোবা হয়ে গেছে। কিছুতেই গলা দিয়ে চিৎকার বেরোচ্ছে না। গলার ভিতরেই দলা পাকিয়ে বেধে আছে। আটকে থাকা গলা দিয়ে শুধু গোঙানির মত শব্দ হচ্ছে।

ঝুলে থাকা বিভীষিকাটা ঘর কাঁপিয়ে খল-খল করে হাসতে শুরু করল। ঘরের চার দেয়ালে হাসির প্রতিধ্বনি হতে লাগল। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো মেয়ে হাসছে। এক পর্যায়ে হাসতে-হাসতে টেনে-টেনে বলতে লাগল, ‘তোর আত্মহত্যা করা উচিত। আত্মহত্যা! বেঁচে থেকে কী লাভ! তুই আত্মহত্যা কর, তুই আত্মহত্যা কর…’

লিজা আতঙ্কের চরম সীমায় পৌঁছে গেল। আর নিতে পারল না। গোঙাতে- গোঙাতে জ্ঞান হারাল।

সকালে মায়ের ডাকে ঘুম থেকে জেগে উঠল লিজা।

ওর রুমের বন্ধ দরজায় আঙুলের গাঁট দিয়ে টক-টক শব্দ করে তার মা ডাকছেন, ‘লিজা, এই, লিজা, এখনও ঘুম থেকে উঠিস না কেন? এত বেলা হয়ে গেল। আজ কলেজে যাবি না?’

ঘুম ভেঙে লিজা আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে জড়ানো গলায় সাড়া দিল, ‘এই তো, উঠছি, মাম্মি।’

দরজার ওপাশ থেকে লিজার মা বললেন, ‘তাড়াতাড়ি আয়। তোর নাস্তা দিচ্ছি। নাস্তা করে কলেজে যা।’

‘আচ্ছা, মাম্মি, আসছি।’

দরজার সামনে থেকে লিজার মা চলে গেলেন। লিজা উঠে বসল। তখনই মনে পড়ল গত রাতের কথা। মুহূর্তে ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেল। ভীত চোখে মাথার উপর ফ্যানের দিকে তাকাল। না, ফ্যানে কেউ ঝুলছে না। ঝুলে থাকার কথাও নয়। নিশ্চয়ই সব দুঃস্বপ্ন ছিল। অনেক সময় স্বপ্নের মাঝেই মনে হয় ঘুম থেকে জেগে উঠেছি। আসলে জেগে উঠতে দেখা-সেটাও একটা স্বপ্ন। জেগে উঠেছি মনে হবার পর যে স্বপ্ন দেখা হয়-সেটাকে তখন সত্যি বলে মনে হয়। গত রাতে তার ক্ষেত্রেও বোধহয় তেমনই ঘটেছে।

লিজার মনে পড়ল গত রাতে স্বপ্নে ঝুলে থাকা মেয়েটার নাক-মুখ দিয়ে চুইয়ে রক্তের ফোঁটা সোজা এসে পড়ছিল তার গায়ে আর বিছানায়। ওটা যে দুঃস্বপ্নই ছিল, আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিছানার চাদরে রক্তের ফোঁটার দাগ খুঁজতে লাগল। স্বপ্নে ঝরে পড়তে দেখা রক্তের দাগ নিশ্চয়ই পাওয়ার কথা নয়।

কী আশ্চর্য! এ কী অবাক কাণ্ড! সত্যিই তো বিছানায় কয়েক ফোঁটা রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে।

লিজা বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে ভয়ার্ত গলায়, ‘মাম্মি, মাম্মি,’ বলে চিৎকার করতে-করতে দরজা খুলে ছুটে গেল।

মেয়ের ত্রস্ত গলা শুনে লিজার মা-ও রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন। লিজা তার মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।

একটু ধাতস্থ হবার পর ও মায়ের কাছে গত রাতের সব কথা বলল। তার রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানার চাদরে রক্তের দাগও দেখাল।

লিজার মা সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘তুই প্রথমে যা ভেবেছিলি সেটাই ঠিক ছিল। সবই দুঃস্বপ্ন। চাদরে রক্তের দাগের কারণ অন্য।’

লিজা জানতে চাইল, ‘অন্য কী কারণ, মাম্মি?’

মা হাসি মুখে বললেন, ‘বোকা মেয়ে, এবছর ইণ্টার পরীক্ষা দেবে, এখনও বোঝে না—অন্য কী কারণ। তোর বোধহয় গত রাতে ঘুমের মধ্যেই মিনস শুরু হয়েছে। সেই রক্তের দাগ। প্রতি মাসের এই সময়টাতেই তো তোর মিনস হয়।’

লিজা উপলব্ধি করল, মা যা বলছেন, ঠিকই বলছেন।’ এতক্ষণ উত্তেজনায় বুঝতে পারেনি।

.

দুই

প্রায় মাসখানিক কেটে গেছে। লিজার জীবনটাই এখন একটা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। ঘুমালেও দুঃস্বপ্ন দেখে, জেগে থাকলেও।

সেদিনের পর থেকে প্রতি রাতেই সে আত্মহত্যার স্বপ্ন দেখছে। একেক দিন একেকভাবে আত্মহত্যা করতে দেখছে। কখনও গলায় ফাঁস দিয়ে, কখনও বিষ খেয়ে, কখনও ঘুমের ওষুধ খেয়ে, কখনও ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে, কখনও গায়ে আগুন লাগিয়ে, কখনও শ্বাসনালী বা হাতের শিরা কেটে, কখনও চলন্ত গাড়ি বা ট্রেনের নিচে পড়ে, কখনও ইলেকট্রিক শক্ নিয়ে, কখনও পেটের ভিতর ছুরি ঢুকিয়ে, কখনও নদীতে বা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে।

আর জেগে থাকলেও সেই একই ব্যাপার ঘটছে। একা হলেই চোখের সামনে ভুলভাল দেখছে। হয়তো গোসল করতে বাথরুমে ঢুকেছে, দেখবে, বাথরুমের মেঝেতে তার মতই একটা মেয়ে লুটিয়ে পড়ে রয়েছে। হাতের শিরা কাটা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সমস্ত বাথরুম। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মেয়েটা হঠাৎ মুখ তুলে বলবে, ‘তোর আত্মহত্যা করা উচিত। বেঁচে থেকে কী লাভ! তুই আত্মহত্যা কর।’

আবার কখনও নিজের রুমে ঢুকে দেখবে তার বিছানায় তার মত কেউ একজন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ঠোঁটের কোনা বেয়ে ফেনা গড়াচ্ছে। সমস্ত শরীর নীলচে রঙ ধারণ করেছে। বোঝাই যাচ্ছে বিষ খেয়েছে মেয়েটা। মৃতপ্রায় মেয়েটা হঠাৎ মাথা তুলে বলবে, ‘তোর আত্মহত্যা করা উচিত। তুই আত্মহত্যা কর। বিষ খেয়ে আত্মহত্যা কর।’

ছাদে উঠলে দেখবে, তার মত একটা মেয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ছে। নিচে পড়ে রক্তাক্ত মেয়েটা সেই একই কথা বলবে, ‘তুই আত্মহত্যা কর। ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা কর।’

বিছানায় শুলে দেখবে ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে, রান্নাঘরে গেলে দেখবে আগুনে পুড়ে, রাস্তায় নামলে দেখবে গাড়ির নিচে পিষ্ট হয়ে, খাবার ঘরে গিয়ে দেখবে ফল কাটার ছুরি পেটে ঢুকিয়ে তার মত কেউ আত্মহত্যা করছে। আর তাকে উদ্দেশ্য করে সেই একই কথা আওড়াবে, ‘বেঁচে থেকে কী লাভ! তুই আত্মহত্যা কর…’

লিজা হরহামেশাই চোখের সামনে যে মেয়েটাকে আত্মহত্যা করতে দেখে, প্রথম দিনই মনে হয়েছিল মেয়েটাকে সে কোথায় যেন দেখেছে। তার খুব পরিচিত মুখ। পরে বুঝতে পারে সে নিজেকেই দেখে। আত্মহত্যা করতে দেখা মেয়েটা অন্য কেউ নয়, সে নিজেই। যেমন সে ঘুমের মাঝে আত্মহত্যার স্বপ্ন দেখে, তেমনি জেগে থাকতেও নিজেকেই চোখের সামনে আত্মহত্যা করতে দেখে।

শুধু নিজেকে আত্মহত্যা করতে দেখেই শেষ হচ্ছে না, আরও একটা ব্যাপার চোখের সামনে ঘটছে। হয়তো লিজা বারান্দায় বসে রয়েছে, সামনের কাঁঠাল গাছটায় একটা কাক উড়ে এসে বসল। কাকটা তার দিকে ফিরে মানুষের মত গলায় সেই একই কথা বলবে, ‘তোর আত্মহত্যা করা উচিত….’

আবার হয়তো লিজা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, রাস্তার একটা নেড়ি কুকুর তার পাশ থেকে যাওয়ার সময় মানুষের মত গলায় সেই একই কথা বলবে, ‘তুই আত্মহত্যা কর…’

আবার হয়তো ঘরের দেয়ালে ঘুরে বেড়ানো টিকটিকিও সেই একই কথা বলছে।

পাশের বাড়ি থেকে আসা বিড়ালটাও ওকথাই বলছে।

খাবার ঘরে উড়ে বেড়ানো তেলাপোকাও সেই একই কথা বলছে।

এমনকী অনেক আগেই মারা যাওয়া লিজার বাবার ফটোও কথা বলে উঠছে। তাঁরও সেই একই কথা, ‘তুই আত্মহত্যা কর…

লিজা বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছে। সারাক্ষণ ভয়ে গুটিসুটি মেরে থাকে। তটস্থ হয়ে থাকে এই বুঝি কেউ আশপাশ থেকে বলে উঠবে, ‘তোর আত্মহত্যা করা উচিত।’

তাদের দোতলার ভাড়াটে হেলেন মেয়েটার সঙ্গে এখন আর সে মেশে না হেলেন মেয়েটার মুখে আত্মহত্যার কথা শুনতে-শুনতেই বোধহয় আজ তার এই পরিণতি।

.

তিন

লিজা আত্মহত্যা করেছে।

বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে।

পুরো এলাকার মানুষ লিজাদের বাড়িতে ভিড় জমিয়েছে। খবর পেয়ে থানা থেকে পুলিশও চলে এসেছে। লিজার মৃতদেহ পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। লিজার মায়ের চিৎকার করে কান্না আর বিলাপে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

তিনি বার-বারই বিলাপ করছেন, ‘আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না! ও আত্মহত্যার কথা শুনলেও ভয়ে শিউরে উঠত। সেই মেয়ে কী করে আত্মহত্যা করে? কেউ ওকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। আমি বিচার চাই। আমার মেয়ে কিছুতেই আত্মহত্যা করতে পারে না। ও সেরকম মেয়েই নয়। কেউ ওকে মেরে ফেলেছে….

.

চার

লিজার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বেরিয়েছে।

পোস্টমর্টেম রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, উপর থেকে পড়ে আঘাতজনিত কারণে মৃত্যু। সবচেয়ে বেশি আঘাত লেগেছে মুখের ডান পাশে। মুখের ডান পাশটা প্রায় থেঁতলে গেছে। ঘাড়টাও ভেঙে গেছে। ফলে মাথাটা ডান পাশ দিয়ে ঘুরে পুরোপুরিই পিছন দিকে উল্টে গেছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক লেগেছে যে বিষয়টা তা হলো-মেয়েটার শরীরের ২০৬ খানা হাড়ই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। যেন বুলডোজার দিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে এই হাল করা হয়েছে। উপর থেকে পড়লে শরীরের বেশ কিছু হাড় ভাঙবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শরীরের সমস্ত হাড়ই ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়া খুবই অস্বাভাবিক-তা যত উপর থেকেই পড়ুক। বিশেষজ্ঞরা এর আগে এমনটা আর কখনও দেখেননি।

লিজার মৃত্যুর কারণ তদন্তের ভার পড়েছে তরুণ সাব-ইন্সপেক্টর মোঃ আরিফের উপর

সাব-ইন্সপেক্টর আরিফ লিজাদের বাড়িতে এসেছে। সারা বাড়িতে তল্লাশি করে দেখতে চায় কোথাও কোন ক্লু পাওয়া যায় কি না। অন্তত সুইসাইড নোট। লিজার মায়ের কাছ থেকে আগেই জেনেছে আত্মহত্যা নিয়ে লিজার মধ্যে কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। মানে সে প্রায়ই আত্মহত্যার স্বপ্ন দেখত। এমনকী জেগে থাকলেও হ্যালুসিনেশন হত। চোখের সামনে নিজের আত্মহত্যার দৃশ্য দেখতে পেত। তবে মেয়েটার আত্মহত্যা করার কোন প্রবণতা ছিল না। বরং আত্মহত্যার নাম শুনলেও ভয়ে-আতঙ্কে কেঁপে উঠত। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে, কেউ আত্মহত্যার কথা বলেছে এবং পরবর্তীতে সত্যিই সে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে লোকটা আসলে আত্মহত্যা করেনি। কেউ তাকে খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিয়েছে। লোকটা আত্মহত্যা করার যে হুমকি দিয়েছিল সেই সুযোগটাই খুনি গ্রহণ করেছে। লিজা মেয়েটার ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটল কি না সেটাই এখন তদন্তের মূল বিষয়।

এস. আই. আরিফ লিজাদের বাসায় খোঁজাখুঁজি করে কিছুই পেল না। এমনকী লিজার ঘরেও আতিপাতি করে খুঁজে তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। তবে লিজার ক্লাসের একটা নোট খাতায় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু লেখা তার চোখে পড়েছে।

যেমন খাতার এক জায়গায় লেখা: ‘হেলেন মেয়েটা যেন কেমন, সুযোগ পেলেই শুধু আত্মহত্যার কথা বলে।’

আরেক জায়গায় লেখা: ‘রোজ রাতে আত্মহত্যার স্বপ্ন দেখছি। নিশ্চয়ই হেলেনের সঙ্গে মেশার ফল। হেলেন মেয়েটার কি আর কোন কাজ নেই, সারাক্ষণ আত্মহত্যার গল্প ছাড়া!’

আরেক জায়গায় লেখা: ‘হেলেনের সঙ্গে আর মিশব না। ও একটা ম্যানিয়াক। সুইসাইড ম্যানিয়াক। ওর পাগলামি আমার মধ্যেও ঢুকিয়েছে। প্রতি মুহূর্তে চোখের সামনে শুধু আত্মহত্যার দৃশ্য দেখতে পাই।’

আরেক জায়গায় লেখা: ‘হেলেন আসলে কী?! ও কী চায়? পৃথিবীর সব মানুষ আত্মহত্যা করুক, এটাই কি ওর চাওয়া?’

আরেক জায়গায় লেখা: ‘আজকাল হেলেনকে দেখলেই ভয়ে শিউরে উঠি মনে হয় ও মানুষ নয়, অন্য কিছু! ওর মধ্যে অশুভ কোন ব্যাপার রয়েছে।’

এ ধরনের আরও অনেক কিছু লেখা রয়েছে। এস. আই. আরিফ পুরো খাতায় যেখানে যা লেখা রয়েছে সব গভীর মনোযোগে পড়ল। একবার নয়, পর-পর তিনবার।

.

পাঁচ

এস. আই. আরিফ হেলেনের সঙ্গে কথা বলতে, ওদের বাসায় এসেছে। বসার ঘরে অপেক্ষা করছে।

ছোট্ট ফিটফাট বসার ঘর। দেয়ালে তিনটা পেইন্টিং আর কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি দেখা যাচ্ছে।

ছবির বিখ্যাতরা হচ্ছেন জীবনানন্দ দাস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ভিনসেন্ট ভ্যান গগ, অ্যাডলফ হিটলার, ভার্জিনিয়া উলফ, চিত্রনায়ক সালমান শাহ আর টিভি অভিনেত্রী মিতা নূর।

জল রঙে আঁকা পেইন্টিং তিনটির একটিতে দেখা যাচ্ছে, একটি মেয়ের সারা গায়ে দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলছে আর মেয়েটি নির্বিকার, ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি ফুটিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। মেয়েটার চোখের মণিতেও দাউ-দাউ করে জ্বলা আগুনের প্রতিচ্ছায়া। আরেকটি পেইন্টিং-এ একটি ডুবন্ত মেয়ের ছবি। অর্থাৎ পানিতে একটি মেয়ে ধীরে-ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে, সেই চিত্র। এ ছবিতেও মেয়েটি নির্বিকার চেহারায় তাকিয়ে রয়েছে। অন্য পেইন্টিংটিতে একটি ঝুলন্ত ফাঁসির দড়ির ছবি।

এস. আই. আরিফ ভুরু কুঁচকে পেইন্টিং তিনটে আর বিখ্যাতদের ছবিগুলো দেখছে। এর মানে কী? যে ক’জন বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি এই ঘরে রয়েছে তারা প্রত্যেকেই আত্মহত্যা করেছিলেন। এটা কি কোন কাকতালীয় মিল?

ভিতর থেকে কেউ আসছে টের পেল এস. আই. আরিফ। নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল।

বয়স্কা এক ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকলেন। হাতে ধরা ট্রে। ট্রেতে চা-নাস্তা নিয়ে এসেছেন। আরিফের সামনে চা-নাস্তা বাড়িয়ে দিতে-দিতে বললেন, ‘আমি হেলেনের মা।

এস. আই. আরিফ সালাম জানিয়ে আন্তরিক গলায় বলল, ‘আপনি আবার কেন কষ্ট করে এসব আনতে গেলেন?’

‘না, বাবা, তাতে কী হয়েছে। আমাদের বাসায় কোন কাজের লোক রাখি না। তাই নিজেদের কাজ নিজেরাই করি।’

এস. আই. আরিফ চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘হেলেনের আসতে কি দেরি হবে?’

হেলেনের মা বললেন, ‘না, এখুনি এসে পড়বে। বাথরুমে।

আরিফ কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, এই ঘরের দেয়ালে টানানো পেইন্টিং আর ছবিগুলো কার পছন্দে টানানো হয়েছে?’

হেলেনের মা একটু ভেবে বললেন, ‘হেলেনের পছন্দে। ওর রুমেও এ ধরনের অনেক পেইন্টিং রয়েছে।’

‘আচ্ছা, তাই!’

হেলেনের মা গলার স্বর নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলে উঠলেন, ‘বাবা, কিছু মনে না করলে তোমাকে একটা কথা বলব?’

আরিফ অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ‘বলুন। সঙ্কোচ করার কিছু নেই।’

হেলেনের মা গলার স্বর আরও খাদে নামিয়ে বলতে লাগলেন, ‘জানি, বাবা, তুমি এসেছ আমাদের বাড়িওয়ালীর মেয়ে লিজার আত্মহত্যা প্রসঙ্গে হেলেনের সঙ্গে কথা বলতে। আমি বলি কী ওর সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই। ওর সঙ্গে কথা বলে কোনই লাভ হবে না। বরং ক্ষতি হবে।’

আরিফ অবাক গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী ক্ষতি হবে?!’

ভদ্রমহিলা গলার স্বর কঠিন করে বলে উঠলেন, ‘কী ক্ষতি হবে তা ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। তুমি চলে যাও। ওর সঙ্গে দেখা কোরো না।’

এমন সময় হেলেন এসে ঢুকল।

হেলেনকে দেখে এস. আই. আরিফ ধাক্কার মত খেল। এত রূপবতী মেয়ে সে এর আগে কোনদিনও দেখেনি। মাখনের মত ফর্সা মোলায়েম গায়ের রঙ। আয়ত চোখ। বড়-বড় আঁখি পল্লব। ভরাট গোলাপী ঠোঁট। প্রশস্ত কপাল। ছোট্ট চিবুক। বাঁশির মত নাক। লম্বা দীঘল রেশমি চুল।

হেলেন এসেছে চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে। কাঁধের উপর থেকে বাম পাশে চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে আঁচড়াচ্ছে। এমন রূপবতী কেউ সামনে পড়লে যে-কোন যুবকেরই প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ে যাবার কথা।

আরিফ ভাবল, চাকরি পাবার পর থেকেই তার মা তার জন্য মেয়ে খুঁজছে। মানানসই মেয়ে খুঁজে পায়নি বলে এখনও তার বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। তার মা যদি হেলেনকে দেখত, তা হলে কী বলত?

চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে হেলেন একটা সিঙ্গেল সোফায় বসল। তার মা উঠে চলে গেলেন। ভদ্রমহিলাকে কেমন বিচলিত দেখাল।

হেলেনই প্রথমে কথা বলে উঠল, ‘আপনি তো লিজার আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলতে এসেছেন, কী জানতে চান বলুন?’

হেলেনের গলার স্বরও চমৎকার। স্পষ্ট, সুরেলা। যেন রেডিও উপস্থাপিকা। এস. আই. আরিফ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘তার আগে আপনার সম্পর্কে একটু জেনে নিই। আপনি কীসে পড়াশুনা করেন?’

হেলেন বিরক্ত গলায় বলল, ‘আমি পড়াশোনা করি না। একটা ঘটনার পর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি। ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছিলাম। এস. এস. সি. পরীক্ষা আর দেয়া হয়নি।’

‘এমন কী ঘটনা ঘটেছিল যে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন?’

‘বলা যাবে না, ব্যক্তিগত।’

‘আপনার বাবা কী করেন?’

‘আমার বাবা নেই। রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। অনেকের ধারণা বাবা ইচ্ছে করেই গাড়ির নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল। বাবা একটা বীমা কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিল।

‘সরি, আপনার বাবার কথা জানতে চেয়ে আপনাকে কষ্ট দিলাম। আচ্ছা, তিনি কবে মারা গেছেন?’

‘বছর তিনেক আগে।’

‘আপনার মাকে দেখে বুঝলাম তিনি একজন হাউসওয়াইফ, কিছু মনে করবেন না, বাবার অবর্তমানে আপনাদের সংসার চলছে কীভাবে?’

‘বাবার নামে মোটা অঙ্কের বীমা করা ছিল। সে টাকার ইন্টারেস্ট দিয়েই আমাদের সংসার খুব ভালভাবে চলে যায়।’

‘আচ্ছা, এ বাড়িতে ভাড়া আসার আগে আপনারা কোথায় ছিলেন?’

‘চিটাগাং। চিটাগাঙের হালিশহরে।’

‘চিটাগাং থেকে বরিশালে চলে এলেন, এর পিছনে কি কোন কারণ আছে?’

‘না, তেমন কোন কারণ নেই। এক জায়গায় বেশি দিন ভাল লাগে না।’

‘আচ্ছা, এখন মূল প্রসঙ্গে আসি, লিজার সঙ্গে আপনার পরিচয় কবে থেকে? এ বাড়িতে ভাড়া আসার পর থেকে, না আগেই পরিচয় ছিল? শুনেছি আপনারা খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন।’

‘ওর সঙ্গে পরিচয় এ বাড়িতে ভাড়া আসার পর থেকে। ঘনিষ্ঠতা বলতে মাঝে- মাঝে কথা হত।’

‘তা হলে আপনি বলতে চাচ্ছেন তেমন ঘনিষ্ঠ ছিলেন না? কিন্তু সবাই যে বলছে আপনাদের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল?’

হেলেন গলার স্বরে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল, ‘এটা কেমন কথা বললেন, কারও সঙ্গে দু’-একবার কথা হলেই কি সে বন্ধু হয়ে গেল? তা হলে তো এখন আপনাকেও বন্ধু ভাবতে পারি।

‘এখন আপনাকেও বন্ধু ভাবতে পারি’-এ কথাটা শুনে এস. আই. আরিফ মনে-মনে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করল। এমন রূপবতীর বন্ধু কে না হতে চায়! খুক- খুক করে কেশে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘লিজা কি কখনও আপনাকে আত্মহত্যার কথা বলত?’

‘না, তা বলত না। তবে ওর কথাবার্তা শুনে বোঝা যেত ও অনেক সমস্যায় ছিল। আত্মহত্যা করে ভালই করেছে।’

আরিফ অবাক চোখে কিছুক্ষণ হেলেনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আপনি কি ওকে আত্মহত্যার পরামর্শ দিতেন?’

হেলেন থতমত খাওয়া গলায় বলল, ‘না, তা ঠিক না। ও ওর সমস্যার কথা বলত, আমি সমাধানের পথ বাতলে দিতাম। সত্যি কথা বলতে সব সমস্যা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ তো আত্মহত্যাই।’

আরিফ ছোট্ট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘আপনি কি জানেন আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়া অপরাধ? আইনে এর জন্যে শাস্তির বিধান রয়েছে।’

হেলেন কিছু বলল না। শীতল চোখে আরিফের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে চোখ পড়ল। আরিফের বুকের ভিতরটা অকারণেই ধক করে উঠল।

আরিফ তার হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠে বলল, ‘এখন আমাকে উঠতে হবে। প্রয়োজন হলে আবার আপনার সঙ্গে মিট করব। থানায় ডেকে পাঠাতেও পারি। প্লিজ, কো-অপারেট করবেন। একটা কেসের ঠিক মত তদন্ত না হলে সব দোষ গিয়ে পড়ে আমার মত তদন্ত অফিসারের ঘাড়ে। এমনিতেই সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের লোকেদের দোষের সীমা নেই। সুযোগ পেলেই গাল-মন্দ করে। পেটের দায়ে চাকরি ছাড়তে পারি না। না হলে কবে…আর ভাল লাগে না!’

হেলেন থমথমে গলায় বলে উঠল, ‘আপনার তো আত্মহত্যা করা উচিত একমাত্র আত্মহত্যাই আপনাকে এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারে।’

কথাটা শুনে এস. আই. আরিফ হাঁ করে বিস্মিত চোখে পলকহীন কিছুক্ষণ হেলেনের দিকে তাকিয়ে রইল। আবার চোখে চোখ পড়ল। মেয়েটার চোখের মধ্যে কোন ব্যাপার রয়েছে। চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না। নিজেকে কেমন সম্মোহিত মনে হয়।

চোখে চোখ রেখে কেমন ধাতব গম্ভীর গলায় আবার হেলেন বলে উঠল, ‘একমাত্র আত্মহত্যাই দিতে পারে পরম নিশ্চয়তা আর মুক্তি।’

কথাগুলো যেন আরিফের মগজের ভিতর ঢুকে গেল। ভীষণ চমকে উঠল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।

সাংঘাতিক অবাক হয়েছে এস. আই. আরিফ। লিজার খাতায় যা কিছু লেখা রয়েছে সবই তো এখন সত্যি মনে হচ্ছে। সত্যিই কি হেলেনের মধ্যে অশুভ কিছু রয়েছে? নাকি শুধুমাত্র এক ধরনের মানসিক সমস্যা? স্রেফ একজন ম্যানিয়াক? মুদ্রাদোষের মত একটু হলেই মুখে আত্মহত্যার কথা চলে আসে।

আরিফ হেলেনের আরও একটা বিষয় লক্ষ করে বেশ অবাক হয়েছে। তা হলো হেলেনের হাত। হেলেনের হাতের তালুতে কোন রেখা নেই। আঙুলের কড়া নেই। রেখাহীন তেলতেলে হাত। পোশাকের দোকানে থাকা ম্যানিকুইনের (বড় পুতুল) হাতের মত।

হাতের তালুতে রেখা নেই এটা আরিফের নজরে পড়ার কথা নয়। হেলেন হাত ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল বলেই চোখে পড়েছে। ভাল করে খেয়াল করে দেখেছে দু-হাতের একটিতেও কোন রেখা নেই।

.

ছয়

এস. আই. আরিফ হেলেন সম্পর্কে ব্যাপক খোঁজ নিয়েছে।

খোঁজ-খবর করে জানতে পেরেছে হেলেনরা কোথাও বেশি দিন থাকে না। এমনকী এক শহরেও নয়। এক শহর থেকে অন্য শহরে চলে যায়। এর পিছনে কারণও রয়েছে। কারণ হচ্ছে, হেলেনরা যেখানেই থাকতে শুরু করে সেখানেই কেউ না কেউ আত্মহত্যা করে মারা যায়। বিশেষ করে যার সঙ্গে হেলেনের ঘনিষ্ঠতা হয়, সে। এজন্য অল্প কিছুদিনেই বদনাম ছড়িয়ে পড়ে। তখন সেখান থেকে তারা অন্য কোথাও ভাড়া চলে যায়।

হেলেনদের বাড়িতে কাজের মানুষও রাখা হয় না এই একই কারণে। তাদের বাড়ির বেশ কয়েকটা কাজের মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। সবার ধারণা হেলেনের মাঝে এমন কোন অশুভ শক্তি রয়েছে, যার প্রভাবে মানুষ আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত হয়।

এত কিছু জানার পরও তরুণ সাব-ইন্সপেক্টর আরিফের মনে হেলেনকে নিয়ে অন্য রকমের এক ভাবনা জন্মেছে। সে হেলেনের প্রেমে পড়ে গেছে। সারাক্ষণই তার হৃদয়ের মণিকোঠায় শুধু হেলেনের মুখটা ভেসে ওঠে। হেলেনের জন্য এখন সে পাগলপ্রায়। হেলেনের সুন্দর মুখটা একটি বারের জন্য দেখার লোভে প্রায়ই বিভিন্ন ছুতোয় সে হেলেনদের বাড়ি গিয়ে ওঠে। এত দিনে হেলেনের সঙ্গে সম্পর্কটাও বেশ সাবলীল হয়ে উঠেছে। অনেক গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা হয় তাদের মাঝে। যতই দিন গড়াচ্ছে আরিফ হেলেনের প্রেমে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। ভেবে কূল পাচ্ছে না কীভাবে কী করবে! কীভাবে ভালবাসার কথা জানাবে।

হেলেন একই ধর্মাবলম্বী হলেও হত। হেলেন খ্রীষ্টান আর সে মুসলমান। আরিফ কথার ছলে জেনেছে হেলেন তার মায়ের খুব ভক্ত। মা মনে কষ্ট পাবেন এমন কোন কাজ সে কোন দিনও করবে না। তার মানে প্রেমের প্রস্তাবে সে রাজি হবে না। দিতে হলে সরাসরি তার মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিতে হবে।

মুসলমান হয়ে খ্রীষ্টান মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব কীভাবে দেবে এই ভেবে তার ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

.

সাত

আরিফ হেলেনদের বসার ঘরে হেলেনের মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ মনে- মনে ঠিক করে এসেছে যে করেই হোক হেলেনের মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। তাঁকে বোঝাবে আজকাল এক ধর্মের ছেলে-মেয়েদের অন্য ধর্মের কাউকে বিয়ে করাটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। উন্নত দেশগুলোতে হরহামেশাই এমন বিয়ে হচ্ছে।

প্রথম দিনের মত নাস্তা হাতে হেলেনের মা এসে বসার ঘরে ঢুকলেন। আরিফ উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখাল। প্রথম দিন সালাম জানিয়েছিল। সেদিন আরিফ জানত না হেলেনরা খ্রীষ্টান।

হেলেনের মা বললেন, ‘বসো, বাবা, বসো, দাঁড়াতে হবে না।’

আরিফ বিনয়ের সঙ্গে ধীর ভঙ্গিতে বসল। হেলেনের মা চা-নাস্তা এগিয়ে দিতে- দিতে বললেন, ‘লিজার আত্মহত্যার তদন্ত কত দূর এগোল?’

‘না, তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। স্রেফ আত্মহত্যাই। কেস ক্লোজ হয়ে যাবে।’

ভদ্রমহিলা হতাশ গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘কী করে বুঝলে আত্মহত্যাই?’

আরিফ বলল, ‘তাকে খুন করা হয়েছে এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি।’

ভদ্রমহিলা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ও, আচ্ছা!’

আরিফ নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে বলল, ‘আণ্টি, আজ আমি কেসের তদন্তে আসিনি। এসেছি অন্য একটা ব্যাপারে কথা বলতে।’

হেলেনের মা কৌতূহলী গলায় বললেন, ‘কী ব্যাপারে?’

আরিফ একটু ভেবে কোন ভণিতা না করে সরাসরি বলল, ‘আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।’

ভদ্রমহিলা চোখ বড় করে বজ্রাহতের মত বললেন, ‘তুমি হেলেনকে বিয়ে করতে চাও?!’,

আরিফ হড়বড় করে, বলতে লাগল, ‘আণ্টি, এই একবিংশ শতাব্দীর সভ্য মানুষেরা এখন আর কেউ ধর্মীয় ভেদাভেদ নিয়ে পড়ে থাকে না। আমি মুসলমান, আপনারা খ্রীষ্টান—এই কারণ দেখিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। প্লিজ, আন্টি! প্লিজ!’

হেলেনের মা বিচলিত গলায় বললেন, ‘আমি ও বিষয়টা ধরছি না। অন্য একটা দিক নিয়ে ভাবছি।’

আরিফ মরিয়া গলায় বলে উঠল, ‘কী সেটা?’

‘তুমি হেলেনের সম্পর্কে কিছুই জানো না বলে বিয়ের কথা বলছ। জানলে আর বিয়ে করতে চাইতে না।’

আরিফ বলে উঠল, ‘জানি, আমি সবই জানি। হেলেনের সঙ্গে কারও ঘনিষ্ঠতা হলে সে আত্মহত্যা করে। এতে হেলেনের দোষ কোথায়? যে আত্মহত্যা করে তার দোষ। হেলেন হয়তো কথায়-কথায় আত্মহত্যার প্রসঙ্গ ওঠায়। সেটা হেলেনের এক ধরনের রোগ। মানসিক ব্যাধি। ভাল একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখালেই এ সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। হেলেনের মুখে আত্মহত্যার কথা শুনে যারা আত্মহত্যা করে তারা দুর্বল মনের মানুষ। দুর্বল মনের মানুষেরা অল্পতেই প্রভাবিত হয়। হেলেন তো আমাকেও কতবার আত্মহত্যার কথা বলেছে। তাতে কী হয়েছে? আমি তো বুঝে গেছি ওটা ওর স্বভাবগত ত্রুটি। ও কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, বরং খোলা মনে বা বলা যায় মুখ ফসকে বলে ফেলে। অনেকের ধারণা হেলেনের বাবা গাড়ির নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। বাবার মৃত্যুতে নিশ্চয়ই অনেক আঘাত পেয়েছিল। এ থেকেই হয়তো হেলেনের মাথায় আত্মহত্যার ব্যাপারটা ঢুকে গেছে। হয়তো বেঁচে থাকতে বাবাকে দেখেছে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ আর সমস্যা নিয়ে থাকতে। মৃত্যুর পর সেই বাবাই পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এ থেকে হয়তো ওর মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে আত্মহত্যাই মুক্তির একমাত্র পথ। তাই হয়তো কেউ সমস্যার কথা বললে মুখে আত্মহত্যার কথা চলে আসে, যা অন্যেরা পরামর্শ হিসেবে নেয়। তবে আত্মহত্যার ব্যাপারটা কারও মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া মোটেই ঠিক নয়। এমনিতেই প্রকৃতিগতভাবে প্রত্যেকটা মানুষের ভিতর সুপ্ত অবস্থায় আত্মহত্যার বীজ লুকিয়ে থাকে। সেই বীজকে জাগিয়ে তোলা কোনক্রমেই উচিত নয়। এজন্যেই ওকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার। যাতে ওর মাথায় গেঁথে থাকা আত্মহত্যার ব্যাপারটা মুছে ফেলা যায়।’

হেলেনের মা প্রায় ধমকে উঠলেন, ‘কিছুই জানো না তুমি। না জেনেই বলে যাচ্ছ।’

আরিফ অবাক গলায় বলল, ‘আর কী জানার আছে?’

ভদ্রমহিলা কিছুটা চটে যাওয়া গলায় বলতে লাগলেন, ‘হেলেনের হাতের তালুতে কোন রেখা নেই তা তুমি জানো? হেলেন কখনও ঘুমায় না তা কি জানো? সারাক্ষণ জেগেই থাকে। বলা যায় নিদ্রাহীন মানুষ। হেলেন মাঝে-মাঝে সপ্তাহখানিক ধরে তার রুমের বাইরে বেরোয় না, দরজা বন্ধ করে থাকে, তা কি তুমি জানো? এই এক সপ্তাহের মধ্যে সে কিছু খায়ও না। কবে থেকে হেলেনের মধ্যে এসব দেখা দিয়েছে তা কি জানো? আর তুমি যে বলছ হেলেনের বাবার মৃত্যুতে হেলেনের মধ্যে আত্মহত্যার পরামর্শ দেবার ব্যাপারটা ঢুকে পড়েছে, সেটাও ঠিক নয়। হেলেনের বাবা যদি আত্মহত্যা করে থাকে তার জন্যে হেলেনই দায়ী। হেলেনের পরামর্শেই সে-ও আত্মহত্যা করেছিল।’

আরিফ কিছুটা দমে গিয়ে বলল, ‘আমি প্রথম দিনই দেখেছিলাম হেলেনের হাতে কোন রেখা নেই। তাতে কী হয়েছে? অনেকেরই জন্মগতভাবে হাতে রেখা থাকে না। নিদ্রাহীনতা এক ধরনের অসুখ, যাকে ডাক্তারি ভাষায় ইনসমনিয়া বলে। ওর হয়তো মারাত্মক ধরনের ইনসমনিয়া হয়েছে বলে কখনও ঘুম হয় না। সপ্তাহখানিক ধরে রুমের দরজা বন্ধ করে থাকা, উপোস দেয়া সবই মানসিক সমস্যার লক্ষণ। আগেই তো বলেছি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’

হেলেনের মা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘কিছুই ঠিক হবে না। হেলেন এমন ছিল না। জন্মগতভাবে হেলেনের হাতের তালুতে ঠিকই রেখা ছিল। একটা ঘটনার পর সব বদলে যায়।’

আরিফ অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে উঠে বলল, ‘কী সেই ঘটনা?’

হেলেনের মা গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে বললেন, ‘গত তিনদিন ধরে হেলেন রুমের দরজা বন্ধ করে আছে। তাই তো নির্ভয়ে তোমার সঙ্গে এত কথা বলতে পারছি। শোনো তা হলে-

হেলেন তখন ক্লাস টেনে পড়ে। খুবই মেধাবী ছিল। সারাক্ষণ পড়াশুনা নিয়েই থাকত। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া ছাড়াও সকালে-বিকেলে দুটো কোচিং সেন্টারে যেত। ছোটবেলা থেকেই ও অনেক সুন্দর ছিল। সহজেই সবার নজরে পড়ত। স্কুলের কিছু লম্পট স্যর সুযোগ পেলেই বিভিন্ন অজুহাতে ওর গায়ে হাত ছোঁয়াত। এমন ভাব করত যেন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রীকে একটু আদর করছে। হেলেন সব বুঝতে পারত। বুঝতে পেরে খুব মন খারাপ করত। কোচিং সেন্টারেও সেই একই ব্যাপার ঘটত। স্কুলের চেয়েও বেশি। কোচিং সেন্টারের অল্পবয়সী স্যরেরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। রাস্তায়ও বখাটেদের উৎপাত। দিনে-দিনে স্কুলে, কোচিং সেন্টারে, রাস্তায় উৎপাত বাড়তেই থাকল। ও সব সহ্য করেও কোনমতে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল।

‘একদিন সন্ধ্যায় কোচিং সেন্টার থেকে ফিরছিল। সবে সন্ধ্যা হয়েছে। রাস্তা-ঘাট কেমন ফাঁকা-ফাঁকা। অবশ্য মূল রাস্তা ধরে আসছিল না। শর্টকাটে ভিতরের রাস্তা ধরে আসছিল। নির্জন একটা জায়গায় পৌঁছবার পর কয়েকজন বখাটের খপ্পরে পড়ে যায়। ওরা বিভিন্নভাবে উৎপাত করতে শুরু করে। পিছু নিয়ে অশালীন মন্তব্য করতে থাকে। এক পর্যায়ে গায়ে হাতও দিতে চায়। হেলেন রেগে গিয়ে বখাটেদের একজনকে চড় মেরে বলে, ‘যা, বাড়ি গিয়ে নিজের মা-বোনদের সঙ্গে এমন কর। অসভ্য জংলি কোথাকার।’

‘বখাটেরা আরও খেপে যায়। ওদের একজন বলে ওঠে, ‘মাগির দেমাগ দেখছস? ধর তো, মালডারে আইজ রাস্তার মইধ্যে লেংটা কইরা ভিডিও করমু।

‘বখাটেগুলো ওর গায়ের ওড়না ফেলে দেয়। এরপর টেনে-ছিঁড়ে ওর গায়ের কামিজ-সালোয়ার প্রায় খুলে ফেলে। সবই ভিডিও করতে থাকে। ভয়ে-আতঙ্কে হেলেন হিস্টিরিয়াগ্রস্তদের মত চিৎকার করতে থাকে। একটু দূরেই একটা মসজিদ ছিল। মসজিদের মুসল্লিরা মাত্র মাগরিবের নামাজ শেষ করে রাস্তায় বেরিয়েছে। হেলেনের ‘চিৎকার শুনে তারা ছুটে আসে। তাদের হস্তক্ষেপে বখাটেরা হেলেনকে ছেড়ে দেয়। বিশেষ ভূমিকা নেন মসজিদের ঈমাম সাহেব। প্রথমেই তিনি তাঁর গায়ের পাঞ্জাবি খুলে হেলেনের দিকে বাড়িয়ে দেন। এমনকী তাঁর কাঁধের বড় রুমালটাও হেলেনের হাতে দেন। যাতে পাঞ্জাবির উপর রুমালটা ওড়নার মত করে গায়ে পেঁচিয়ে নিতে পারে। এরপর তিনি বখাটেদের দিকে তেড়ে যান আর অন্যান্য মুসল্লিদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা সবাই হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন? আমরা কি সেই নবীর উম্মত নই, যিনি অন্যায়কে রুখে দাঁড়াতেন?’

‘ঈমাম সাহেবের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলে বখাটেদের বেধড়ক পিটিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরবর্তীতে কয়েকটা খবরের কাগজে ‘ঈমামের নেতৃত্বে বখাটেদের রাম ধোলাই’ শিরোনামে খবরটা ছাপাও হয়েছিল।

‘বখাটেদের উচিত শিক্ষা দেবার পর ঈমাম সাহেব নিজে হেলেনকে বাসায় পৌঁছে দেন। হেলেন তখনও ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। হেলেনকে আমার হাতে দিয়ে ঈমাম সাহেব বলেন, ‘বোন, আপনার এই মেয়েটা বড় ভাল। বড় লাজুক মেয়ে। একটু চোখে-চোখে রাখবেন। আজকের এই ঘটনায় ওর শিশু মনে বিরাট প্রভাব পড়েছে।’ হেলেনের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, ‘মা, তুই এত কাঁদিস না। এত ভেঙে পড়ার কিছু নেই। মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই চিরকাল কিছু খারাপ লোক ছিল। খারাপ লোকদের ভয়ে কাঁদলে চলবে? ওদেরকে শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে।’

‘আমি বললাম, ‘ভাই, আপনি অন্য ধর্মের একজন যাজক হয়ে একটা খ্রীষ্টান মেয়েকে যে মমতা দেখালেন তা কোন দিনও ভুলব না।’

ঈমাম সাহেব বললেন, ‘বোন, ধর্মের প্রয়োজনে মানুষ, নাকি মানুষের প্রয়োজনে ধর্ম? যে ধর্ম মানুষের কোন উপকারে আসে না, সেটা কোন ধর্মই নয়। আমাদের নবী সেই শিক্ষাই দিয়েছেন।’

‘সেদিন ঈমাম সাহেবকে দেখে বুঝেছিলাম, কেন মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলা হয়। কেন তাঁর আদর্শকে একমাত্র শান্তির পথ বলা হয়। কেন আজও অন্য ধর্মের মানুষ তাঁর চারিত্রিক গুণে প্রভাবিত হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে।

‘ওই ঘটনার পর হেলেন কেমন চুপচাপ হয়ে যায়। বাসা থেকে বেরোতে চায় না। স্কুলে কোচিং-এ ঠিক মত যায় না। পড়াশোনায়ও মন নেই। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকে। আমি আর ওর বাবা অনেক বোঝাই, ‘দেখ, মা, ওই বখাটেগুলো তো উচিত সাজা পেয়েছে। এর পরও তোর এত ভয় কীসের? ঈমাম সাহেব কী বলেছেন মনে নেই, অন্যায়কে রুখতে হবে। ভয়ে গুটিয়ে থাকলে চলবে না।’

‘তারই মধ্যে পর-পর দুটি ঘটনায় হেলেন আরও বড় ধাক্কা খায়। একেবারে ভেঙে পড়ে। ঈমাম সাহেব খুন হন। কারা যেন ঈমাম সাহেবকে জবাই করে খুন করে ফেলে রেখে যায়। তা-ও আবার আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায়। এদিকে বখাটেরা সেদিন যে ভিডিও করেছিল, টেনে-ছিঁড়ে হেলেনের পোশাক খুলে ফেলার-সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে।

‘হেলেনকে কিছুতেই সুস্থির করা যায় না। পাগলের মত আচরণ করতে শুরু করে। কখনও কাঁদে, কখনও আবার অপ্রকৃতিস্থের মত হাসে। উদ্ভট কথা বলে, ‘যিশুকে ওরা মেরে ফেলেছে! আবারও মেরে ফেলেছে! এবারে ক্রুশ বিদ্ধ করে নয়, জবাই করে। যে পৃথিবীতে যিশুরই স্থান নেই, সেখানে আমরা সাধারণরা কী করে বাঁচব!’

হেলেন যে এমন একটা কাজ করে বসবে বুঝতে পারিনি। এক গাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলে। যখন বুঝতে পারি তখন অবস্থা খুবই শোচনীয়। জ্ঞান নেই। সমস্ত শরীর বরফের মত ঠাণ্ডা হয়ে নীলচে রঙ ধরেছে। মুখ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছে।

‘দ্রুত হসপিটালে নিয়ে যাই। কর্তব্যরত ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, হেলেন আর বেঁচে নেই। অনেক আগেই মারা গেছে। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। ওর বাবা আর আমি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। খবর পেয়ে আত্মীয়- স্বজনরা চলে আসে। রাতের জন্য হেলেনের বডি হসপিটালের মর্গে রাখা হয়। সকালে পোস্টমর্টেম করা হবে। পোস্টমর্টেমের আগে লাশ নেয়া যাবে না।

‘আত্মীয়-স্বজনরা আলোচনায় মেতে ওঠে কোথায় কবর দেয়া হবে। গ্রামে ওর ঠাকুরদা-ঠাকুরমার কবরের পাশে নাকি এখানকার স্থানীয় গোরস্থানে? সে আলোচনায় আমার আর ওর বাবার বুকটা আরও দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

‘সকাল বেলায় পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাটা ঘটে। মর্গ থেকে হেলেনের বডি বের করে অটোপসি রুমে নেবার জন্য কেয়ারটেকার মর্গে ঢোকে। সে অবাক চোখে দেখতে পায়, মর্গের নীলচে আধো আলোতে অন্যান্য লাশের মত হেলেন স্ট্রেচারে শোয়া অবস্থায় নেই। স্ট্রেচারের উপর জবুথুবু হয়ে বসে রয়েছে। লাশ ঢেকে রাখার সাদা কাপড় গায়ে জড়িয়ে বসে রয়েছে।

‘কেয়ারটেকারের আতঙ্কিত গলার চিৎকারে কয়েকজন ডাক্তার-নার্স সহ অনেকে ছুটে যায়। একজন ডাক্তার হেলেনকে পরীক্ষা করে বললেন, ‘ভয় পাবার কিছু নেই। হেলেন মৃত ছিল না। যে ডাক্তার হেলেনকে মৃত ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁর নিশ্চয়ই কোন বড় রকমের ভুল হয়েছিল।’

‘পরবর্তীতে হেলেনকে মৃত ঘোষণাকারী ডাক্তার ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত মাত্রায় ট্র্যাঙ্কুইলাইজার জাতীয় ঘুমের ওষুধের প্রভাবে অনেক সময় স্নায়ু এমনভাবে নিস্তেজ হয়ে যায় যে তখন রোগী বেঁচে আছে কি না বুঝতে অসুবিধে হয়। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আমি হাত জোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি। ডাক্তার হলেও আমিও একজন মানুষ। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’

‘ওই ঘটনার পরই হেলেন বদলে যেতে থাকে। একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায়। লেখা-পড়া বাদ দিয়ে দেয়। অস্বাভাবিক রকমের সুন্দরী হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক বলছি এ জন্যে, কিছু-কিছু সৌন্দর্য আছে যা দেখলে স্বাভাবিক মনে হয় না। মনে হয় এর পেছনে কোন গভীর রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। হাতের রেখা মুছে যায়। নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়। কথায়-কথায় আত্মহত্যার কথা বলতে শুরু করে। ওর ‘আত্মহত্যা প্ররোচনা’-র প্রথম শিকার হয় ওর বাবা। তবে জানি না কী কারণে যেন ও আমাকে কখনও আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয় না। আমার সঙ্গে কথাই বলে খুব কম। প্রয়োজনের বেশি একটি কথাও নয়।’

হেলেনের মা বলা শেষ করলে কিছুক্ষণ বাদে এস. আই. আরিফ গলা খাঁকরে ধীর ভঙ্গিতে বলতে লাগল, ‘একটা বাচ্চা মেয়ে পুরো একটা রাত মর্গে কাটালে তার মনোজগতে যে কী সাংঘাতিক প্রভাব পড়তে পারে তা কি কখনও ভেবে দেখেছেন? ভাবুন তো, সেই রাতে হেলেন মর্গে জ্ঞান ফিরে কী দেখতে পেয়েছিল? শব্দহীন নীলচে আধো আলোর একখানা ঘর। হিমশীতল ঠাণ্ডা। আশপাশে স্ট্রেচারে শোয়ানো কতগুলো লাশ। ফিনাইলের কড়া গন্ধ। সে সঙ্গে লাশের গায়ের চিমসে গন্ধের মিশেল। কেউ নেই পাশে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও কেউ শুনবে না। আপনি নিজে যদি কখনও ঘুম থেকে জেগে এমন দৃশ্য দেখেন তা হলে আপনার মনের অবস্থা কী হবে ভাবুন তো। হাতের রেখা মুছে যাওয়া, হতে পারে কোন এক ধরনের চর্মরোগ। অথবা অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুমের ওষুধের প্রভাবে হাতের তালুর চামড়ার কোষ কোন কারণে মরে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে আর রিকভার করেনি। নিদ্রাহীনতা, হতে পারে সেই একই কারণ। অতি মাত্রার ঘুমের ওষুধের প্রভাবে হয়তো মস্তিষ্কের নার্ভাস সিস্টেমে বড় ধরনের কোন পরিবর্তন হয়েছে, যে কারণে ঘুম হয় না। আর অতিরিক্ত সুন্দরী হওয়া, খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিশোরী বয়স পেরিয়ে যৌবনে পা রাখলে যে-কোন মেয়েই আরও বেশি সুন্দরী হয়ে ওঠে। তাই বলে ওর মধ্যে কোন রহস্যময় ব্যাপার রয়েছে, এটা ভাবা একেবারেই অমূলক।’

হেলেনের মা বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে আমি আর তর্কে যাব না। চার্চের কোন একজন ফাদারকে ওর সম্পর্কে সব জানিয়ে, তিনি যদি ওকে বিয়ে দেবার অনুমতি দেন, তা হলে আমি আর অমত করব না। তোমার সঙ্গেই ওর বিয়ে দেব।’

.

আট

এস. আই. আরিফ ছোটবেলায় পড়াশোনা করেছিল একটি খ্রীষ্টান মিশনারী স্কুলে। সে সুবাদে তার সঙ্গে একজন ফাদারের বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। ফাদার জন স্যামুয়েল।

আরিফ ফাদার জন স্যামুয়েলের কাছে গিয়ে হেলেন সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছে। সে যে হেলেনকে বিয়ে করতে চায় তা-ও বলেছে।

সব শুনে ফাদার জন বলেন, ‘মাই সান, আমি আগে স্বচক্ষে সেই মেয়েটিকে দেখতে চাই। এরপর ভেবে দেখব অনুমতি দেয়া ঠিক হবে কি না।’

আরিফ ফাদার জন স্যামুয়েলকে নিয়ে হেলেনদের বাড়িতে এসেছে। বসার ঘরে বসে আছে। হেলেনের আসার অপেক্ষা করছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে হেলেন আসছে না।

এক সময় হেলেনের মা এসে বসার ঘরে ঢুকলেন। তিনি ফাদারকে শুভ সন্ধ্যা জানালেন। ফাদারও তাঁকে শুভ সন্ধ্যা জানালেন। ফাদার তাঁকে বসতে বললেন।

হেলেনের মা মুখোমুখি সোফায় বসলেন।

ফাদার হেলেনের মাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন, ‘হেলেন নিশ্চয়ই আমার সামনে আসতে চাইছে না?’

হেলেনের মা কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, ‘ফাদার, আপনি ঠিক ধরেছেন। ও কিছুতেই আসতে চাইছে না। রাগ দেখাচ্ছে। আপনাকে চলে যেতে বলছে। রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। অদ্ভুত পুরুষালী গলায় আপনাকে কুৎসিত গালি-গালাজ করছে। ওকে এমন রেগে যেতে আর কখনও দেখিনি। আর এমন পুরুষালী গলায় কথা বলতেও শুনিনি।’

ফাদার জন তাঁর স্বভাবসুলভ নিরুত্তাপ গলায় বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, আসতে না চাইলে কী আর করার। আপনার সঙ্গেই কথা বলি।’

একটু সময় নিয়ে ফাদার জন জানতে চাইলেন, ‘আপনার মেয়ের জন্ম তারিখ কত?’

হেলেনের মা বললেন, ‘১৩ই জানুয়ারি।’

ফাদার আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল কত তারিখ?’

‘৩১শে অক্টোবর রাতে।’

ফাদার বললেন, ‘আচ্ছা, শুনেছি ওই ঘটনার পর ওর হাতের রেখা মুছে গেছে। এ ছাড়াও ওর হাতে কি অন্য কোন পরিবর্তন এসেছে? মানে হাতের ব্যবহারে। যে-কোন কাজ বা খাওয়া-দাওয়ায় ডান হাতের বদলে বাম হাত ব্যবহার করছে?’

হেলেনের মা বিস্মিত গলায় বললেন, ‘ঠিক বলেছেন, ফাদার! হেলেন ওই ঘটনার আগে ডান হাতি ছিল। এখন বাঁ হাতি হয়ে গেছে। সব কাজ বাম হাত দিয়ে করে। অনেক গাল-মন্দ করি, অন্তত খাবারটা তো ডান হাতে খেতে পারে। তা রেগে উঠে বলে, ‘আমরা বাম হাতেই খাবার খাই।’ আমরা বলতে ও কাদের বোঝাতে চায় জানি না।’

ফাদার বললেন, ‘আচ্ছা, এখন তা হলে উঠি। ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন।’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন। কেমন ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়লেন। যেন ফেলে আসা কোন কাজের কথা মনে পড়েছে, যা এখনই গিয়ে করতে হবে।

হেলেনের মা গলায় অনুনয় ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফাদার, আপনি তো বললেন না আমার মেয়েকে কি বিয়ে দিতে পারি?’

ফাদার কিছুই বললেন না। বুকে ক্রুশ এঁকে আরিফকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।

.

নয়

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মত বাজে। ফাদার জন আর এস. আই. আরিফ ফুটপাথ ধরে ধীর ভঙ্গিতে হাঁটছে। একটু দূরেই ছোট্ট একটা পার্ক। তারা পার্কের উদ্দেশে এগোচ্ছে। ফাদার প্রস্তাব করেছেন পার্কে গিয়ে বসে কথা বলবেন।

নিরিবিলি দেখে পার্কের এক কোনার বেঞ্চে পাশাপাশি দু’জন বসল। ফাদার জন এমনিতেই চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। আজ তাঁকে আরও চুপচাপ মনে হচ্ছে।

এস. আই. আরিফ বলে উঠল, ‘ফাদার, আপনি কিছু বলছেন না কেন? চুপ করে আছেন! আপনাকে অত্যন্ত চিন্তিত মনে হচ্ছে।’

ফাদার জন মুখ খুললেন। চিন্তিত গলায় বললেন, ‘মাই সান, এই মেয়েকে তুমি বিয়ে কোরো না।’

আরিফ আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘ফাদার, এ কথা কেন বলছেন?’

ফাদার শান্ত-ধীর গলায় বলতে লাগলেন, হেলেনের জন্ম ১৩ই জানুয়ারি। এক জানুয়ারি থেকে আরেক জানুয়ারি হচ্ছে ১৩তম মাস। ১৩তম মাসের ১৩ তারিখে তার জন্ম। মানে অশুভ সংখ্যায় জন্ম তার। সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল ৩১শে অক্টোবর রাতে। ৩১শে অক্টোবর রাত হচ্ছে সেই রাত যে রাতে সমস্ত মৃত আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসে। যে ডাক্তার হেলেনকে মৃত ঘোষণা করেছিল, সে ভুল ছিল না-সে ঠিকই বলেছিল। সত্যিই হেলেন মারা গিয়েছিল। মৃত্যুর পর সমস্ত আত্মা ঈশ্বরের কাছে ফিরে যায়। যেহেতু সেদিন ছিল ৩১শে অক্টোবরের রাত তাই হেলেনের আত্মা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছবার আগেই আবার ফিরে আসতে শুরু করে। সেই সময় হেলেনের আত্মার দখল নিয়ে নেয় লুসিফার। মানে শয়তান। হেলেনের জন্ম ১৩ সংখ্যায়, শয়তানের প্রিয় সংখ্যাও ১৩-তাই খুব সহজেই হেলেনের আত্মার সঙ্গে শয়তানের আত্মা মিশে যায়। সেই দ্বৈত আত্মা ফিরে এসে আবারও হেলেনের দেহে আশ্রয় নেয়। হেলেন জীবিত হয়ে ওঠে। ফের জীবিত হওয়া হেলেনের হাতের রেখা মুছে যাওয়া, বাম হাতে খাওয়া-দাওয়া সহ সব কাজ করার কারণ, শয়তানের হাতে কোন রেখা নেই, আর শয়তান সব কাজই করে বাম হাতে। তোমাদের নবী মুহাম্মদও একদিন এক বালককে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘হে, বালক, বিসমিল্লাহ বলে ডান হাত দিয়ে খাও। কারণ, শয়তান বাম হাতে খায়।’

‘শয়তান সর্বদাই মানুষের অনিষ্ট করতে চায়। হেলেন যে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়, ওটা শয়তান ওকে দিয়ে দেওয়ায়। হেলেনকে বিয়ে করা কিছুতেই ঠিক হবে না, তাতে শয়তানের বংশধর পৃথিবীতে চলে আসতে পারে। কারণ, শয়তান পুরুষ বা নারী কোনটাই নয়, আবার দুটোই-বলা যায় উভলিঙ্গ।’

ফাদার কথাগুলো এমনভাবে বললেন যে আরিফ অবিশ্বাস করতে পারল না। আরিফ বসে-যাওয়া গলায় প্রশ্ন করল, ‘ফাদার, হেলেনের আত্মাকে শয়তানের দখলমুক্ত করার কি কোন উপায় নেই?’

ফাদার বললেন, ‘একটা উপায় আছে। সেটা খুবই জটিল। তাতে হেলেনের প্রাণ সংশয়ও হতে পারে।’

আরিফ মরিয়া গলায় বলে উঠল, ‘সেটা কী উপায়? যাতে হেলেনের আত্মাকে শুদ্ধ করা যাবে?’

ফাদার বলতে লাগলেন, ‘আবার কোন ৩১ অক্টোবর রাতে হেলেনের আত্মহত্যা করতে হবে। মানে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে বুকে ছুরি বিধাতে হবে। সাধারণ ছুরি নয়, বহু পুরানো রূপার তৈরি মন্ত্রপূত বিশেষ ছুরি, যে ছুরির হাতলটা ক্রুশের মত দেখতে। আর যেটির হাতলে খোদাই করে লেখা রয়েছে বাইবেলের কয়েকটা লাইন। এবং সেই ছুরি বুকে বিদ্ধ করার সময় তার সামনে বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায়ের কিছু অংশ জোরে-জোরে পাঠ করতে হবে।

আরিফ চিন্তিত মুখে বলল, ‘হেলেন কি তাতে রাজি হবে? নিজের বুকে নিজে ছুরি চালাতে?’

ফাদার বললেন, ‘না, হবে না। শয়তান তা তাকে করতে দেবে না। দেখলে না সে আমার সামনেই আসেনি। তবে চেষ্টা করে দেখতে পারো। একমাত্র তুমিই হয়তো পারো ওকে রাজি করাতে।’

আরিফ আগ্রহী গলায় বলে উঠল, ‘সেটা কীভাবে?’

ফাদার বললেন, ‘তোমার ভালবাসার শক্তি দিয়ে। ভালবাসার শক্তির অনেক ক্ষমতা। চিরকালই শয়তানের শক্তি ভালবাসার শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে। ভালবাসার শক্তির উৎস স্বয়ং ঈশ্বর। যেখানে ভালবাসা সেখানেই ঈশ্বর। ঈশ্বর পাশে থাকলে যে-কোন অসম্ভবকেই সম্ভব করা যায়।’

আরিফ বলে উঠল, ‘আমি জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করব হেলেনকে রাজি করাতে। সত্যিই, ফাদার, আমি ওকে অনেক ভালবেসে ফেলেছি! অনেক! যে করেই হোক ওকে শয়তানের দখলমুক্ত করব।’

ফাদার বললেন, ‘মাই সান, যদি কখনও ওকে রাজি করাতে পারো, আমি সবরকম সাহায্য করব। রূপার তৈরি মন্ত্রপূত সেই বিশেষ ছুরির ব্যবস্থা করা, বুকে ছুরি চালানোর সময় বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায়ের কিছু অংশ জোরে-জোরে পাঠ করা—সবই আমি করব। তুমি শুধু ওকে রাজি করাও।’

.

পরিশিষ্ট

হেলেনরা কোথায় যেন চলে গেছে। সম্ভবত রাতের আঁধারে পালিয়েছে। এস. আই. আরিফ হন্যে হয়ে সব জায়গায় তাদের খোঁজাখুঁজি করেছে। কোথাও খোঁজ পায়নি হেলেনের সুন্দর মুখটা আরেকবার দেখার জন্য সে অস্থির হয়ে উঠেছে। কোন কাজেই মন বসাতে পারছে না। ডিপার্টমেন্ট থেকে লম্বা ছুটি নিয়েছে। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকে। নাওয়া-খাওয়া-ঘুম কোন কিছুতেই তার মন নেই। শুধু হেলেনের কথা ভেবে সময় পার করে। ভেবে কূল পায় না কোথায় গেলে আবার হেলেনের দেখা পাবে।

.

বদ্ধ ঘরের দরজা ভেঙে পুলিশ একটা লাশ উদ্ধার করেছে। এক যুবকের লাশ। যুবক ফ্যানের সঙ্গে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

সাধারণত গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যাকারীদের ঘাড় ভাঙা থাকে। এই লাশের শুধু ঘাড়টা ভাঙাই নয়, ভেঙে পিছন দিকে মোচড়ানো। হাত-পাগুলোও ভাঙা। একইভাবে ভেঙে পিছন দিকে মুচড়ে দেয়া। সমস্ত দেহটাই মোচড়ানো। যেন গলায় দড়ি দিয়ে নয়, অতি শক্তিশালী কেউ প্লাস্টিকের পুতুলের মত মুচড়ে তাকে হত্যা করে ঝুলিয়ে দিয়েছে।

মৃত যুবককে পুলিশ চিনতে পেরেছে। তাদের ডিপার্টমেন্টেরই লোক। সাব- ইন্সপেক্টর আরিফ। কিছু দিন আগে লিজা নামে একটা মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। সেই কেসের তদন্ত অফিসার ছিল।

লিজা মেয়েটা ছাদ থেকে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল। মেয়েটার শরীরের সমস্ত হাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। এস. আই. আরিফ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার সমস্ত শরীর মোচড়ানো। কোথায় যেন এই দুই আত্মহত্যার মধ্যে বেশ মিল রয়েছে। ছাদ থেকে পড়ে বা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার কোন ক্ষেত্রেই ওরকম হবার কথা নয়। এর পিছনে কী রহস্য? কেউ কিছুই বুঝতে পারছে না। নিশ্চয়ই কোন একদিন এই রহস্যের জট খুলবে।

.

আফজাল হোসেন